আওয়ামী এক রাজপুরুষের কাহিনী!

একটি সরকারি নাগরিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কার্যত পুরোপুরি অচল। নগরবাসী এ থেকে সুষ্ঠুভাবে কোনো সেবাই পাচ্ছে না। কারণ প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব এখন দেশের সর্বময় ক্ষমতার যিনি প্রধান, তার এক আত্মীয়ের হাতে। সুপেয় ও ব্যবহার্য পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন তথা স্যুয়ারেজ-ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা ও নগরীর খাল-বিল রক্ষা করে নগরীকে পানিজনিত দুর্ভোগ থেকে মুক্ত রাখাটাই এই প্রতিষ্ঠানের কাজ। নাম তার ঢাকা ওয়াসা।

কেবল রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার সুবাদে চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি করেও অযোগ্য একটি লোক এহেন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পথ আঁকড়ে ধরে আছেন। বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে টানা তিন মেয়াদে এই এক ব্যক্তিই সর্বেসর্বা। তার স্বৈরতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পত্র-পত্রিকায় কম লেখা হয়নি। কিন্তু রাজহাসের গায়ে পানি জমে না- প্রবাদটিকে স্বার্থক প্রমাণ করে চলেছেন তিনি। কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগের দায় পুরোটাই বইতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রতিষ্ঠানটির এই বৃত্ত থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তাও দেখা যাচ্ছে না। চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে নগরীর সমস্যা-সঙ্কট।

রাজপুরুষের পরিচয় ও ক্ষমতাভোগ
আলোচিত এই রাজপুরুষের নাম তাকসীম এ খান। তিনি ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। মাদারীপুরের শিবচরের সংসদ সদস্য নূর ই আলম চৌধুরী লিটনের ভগ্নিজামাই এই তাকসীম খান। নূর ই আলম চৌধুরীর মা আবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো বোন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দূরবর্তী এই আত্মীয়তার সূত্রেই তাকসীম খান ওয়াসায় নিয়োগ পান। ২০০৯ সালে ওয়াসার তৎকালীন চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা এমডি পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য তাকসিম এ খানকে দেশে নিয়ে আসেন। তাকসীম এ খান একজন দ্বৈত নাগরিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ, দুই দেশেরই নাগরিকত্ব রয়েছে তার। সংবিধান অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করেন, এমন কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিন্তু তাকসীম এ খানকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডেকে এনেই দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন ওই পদে প্রার্থী হওয়ার মতো তার কোনো যোগ্যতাই ছিল না।

?oh=9b00800924cda5e270827a3a926a3547&oe=567ED1CD” width=”400″ />
রাজপুরুষ মার্কিন নাগরিক তাকসিম, এমডি-ওয়াসা

এমডি পদের জন্য আবেদন করলে প্রথম দফা মৌখিক পরীক্ষায় তিনি অযোগ্য হয়ে যান। পরে তৎকালীন চেয়ারম্যান কৌশলে চার-পাঁচ জনের নামে মৌখিক পরীক্ষার জন্য পুনরায় চিঠি পাঠান। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তাকসীম এ খান। কিন্তু দ্বিতীয় দফা মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েও তিনি যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। সেখানে প্রথম হন মো. আবদুল্লাহ, যিনি বর্তমানে খুলনা ওয়াসায় এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার পরও দ্বৈত নাগরিক তাকসীমকে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর কেবল প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হওয়ার সুবাদেই তিন বছরের জন্য তিনি নিয়োগ পান এমডি হিসেবে।

আত্মীয়তার এই সূত্র এতই দুর্বল যে, হয়তো সরকারপ্রধানের মনে করতেও কষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু ক্ষমতার ভাগাভাগি এমনই এক জিনিস যে, যোগ্যতার কোনো বালাই নেই, তবু তাকসিমের মেয়াদ বাড়ছে তো বাড়ছেই। এ পর্যন্ত টানা তিন দফা নিয়োগ পেয়েছেন তিনি একই প্রতিষ্ঠানে। যদিও তার তৃতীয় দফার নিয়োগে নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে। ওয়াসার বোর্ডসভাও তার নিয়োগ নিয়ে ‘বিব্রত’ বলে জানায়। নিয়ম হলো, এমডি নিয়োগের সুপারিশ করে ওয়াসা বোর্ড। আর সরকার তা অনুমোদন করে।

প্রথম দফায় ২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর তিন বছরের জন্য এমডি হিসেবে নিয়োগ পান তাকসীম এ খান। ২০১২ সালে মেয়াদ শেষে বোর্ড তাকে ওই পদে আবারও নিয়োগের সুপারিশ করে। সুপারিশের ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ অক্টোবর তাকে আবার এক বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ দেয়া হয়। তৃতীয় দফায় নিয়োগের প্রশ্ন এলে বোর্ড এমডি নিয়োগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দেশে না আসা পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আগের বারের সুপারিশ পুনরায় ব্যবহার করে মন্ত্রী আসার আগেই সচিব আবু আলম শহীদ তার নিয়োগের কাগজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠালে তা অনুমোদন পায়। বোর্ড ও মন্ত্রীকে কাটিয়ে মন্ত্রণালয় তাকে তৃতীয় দফা নিয়োগ দেয়। যদিও বোর্ড ওই সুপারিশকে তামাদি বলে উল্লেখ করে। এ নিয়ে হাইকোর্টে পরবর্তীতে একটি রিট হয়। কিন্তু গত এপ্রিলে আদালত তা খারিজ করে দেয়।

বোর্ডের এই শক্ত অবস্থানের পেছনে ছিলেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রহমতুল্লাহ। ২০১২ সালের ৮ মে ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন তিনি। যোগদানের পর থেকেই ওয়াসার বিভিন্ন পর্যায়ে নানা অনিয়ম ও এমডির একচ্ছত্র আধিপত্যের বিষয়টি নজরে আসে চেয়ারম্যানের। লিখিত অভিযোগও আসে তার কাছে। এসবের বিরোধিতা করে তিনি এমডির বিরাগভাজন হন। শুধু তা-ই নয়, একপর্যায়ে তিনি চেয়ারম্যানের বেতন-ভাতা, গাড়িসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেন। এমডির প্রভাব ও আধিপত্যের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন চেয়ারম্যান। যার ফলে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই গত ১৯ জুন মো. রহমতুল্লাহ নিজের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ওই পত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে পুনঃনিয়োগে বোর্ডের সিদ্ধান্ত মানা হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাকে অব্যাহতি দেয়া হোক।’

মোটকথা, তাকসিমের ক্ষমতার দাপটের কাছে বিরোধীরা কেউই টিকতে পারেনি। বারবার নিয়োগ নিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন তাকসীম। চলছে তার একচ্ছত্র আধিপত্য।

রাজপুরুষের কার্যকলাপ
নিয়োগ বাণিজ্য, সিন্ডিকেট পরিচালনা করে অর্থ আয়ই এখন তাকসিমের মূল কাজ। গত বছর সরকারের বিদায়ের ঠিক আগ মুহূর্তে ডিসেম্বরে ১১৩২ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। তখন ওই নিয়োগ নিয়ে ৫০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। চাকরিপ্রার্থীরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কাছে রাজস্ব কর্মকর্তা ১০ লাখ থেকে মেকানিক তিন লাখ- এরকম বিভিন্ন ক্যাটাগরির ঘুষের তালিকা প্রকাশ করে দেন। তখন এই নিয়োগ বাণিজ্যের প্রধান হিসেবে তাকসীম এ খানের নাম আসে।

এসব কাজের জন্য মহামতি এই রাজপুরুষ চার সদস্যের একটি সিন্ডিকেট গঠন করেছেন বলে অভিযোগ আছে। ওয়াসার কর্মকর্তারা তাকসিমের এই চার অনুসারীকে ‘চার খলিফা’ নামে ডাকেন। ওয়াসায় যত ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থের লেনদেন হয় তার সবই ঘটে এ চার খলিফার হাত দিয়ে। চার খলিফা হচ্ছেন, পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিডি প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম, তাকসিম খানের ব্যক্তিগত স্টাফ এবং আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী আকতারুজ্জামান, বিভিন্ন কনস্ট্রাকশনের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মহসিন এবং ওয়াসার ক্রয় বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী আনোয়ার সাত্তার সবুজ। এ চারজনের মাধ্যমেই এমডি তাকসিম খান সব প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করেন। এর বাইরে কর্মচারী-কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে এমডির মূল লোক সিবিএ নেতা হাফিজ উদ্দিন।

রাজভক্তির করুণ দশা!
আর সব রাজপুরুষের মতো এই রাজপুরুষেরও একটি বড় কাজ হচ্ছে বিদেশ ভ্রমণ। ওয়াসার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী ওয়াসা এমডি তাকসীম এ খান ২০০৯ সালে এমডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শতাধিক দেশে গিয়েছেন সরকারি টাকায়। ওয়াসার বিভিন্ন কাজের অজুহাতে তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন তখনই ছুটে গেছেন দেশের বাইরে। তার এ বিদেশ ভ্রমণের সব অর্থই জোগান দিতে হয়েছে ওয়াসার কোষাগার থেকে। এসব বিদেশ ভ্রমণ ঘুরেফিরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে শেষ হয়। কারণ বর্তমান দুনিয়ার ট্রেন্ড হচ্ছে, গরিব দেশগুলোর রাজপরিবারের সদস্যরা থাকবেন লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে। সেই হিসেব মোতাবেক তাকসিম খানের পরিবারের আবাস নিউ ইয়র্কে হয়েছে। সেখানে তার স্ত্রী ও সন্তান রয়েছেন। তাই এমডি যখনই কোনো দেশে সফরে গেছেন, ফেরার পথে তিনি নিউইয়র্ক হয়ে দেশে ফিরতেন। এই যাতায়াতের সব খরচ বহন করতে হয় ওয়াসাকেই।

নিয়ম অনুযায়ী বিদেশ সফরের অনুমতি মন্ত্রণালয় থেকে নিতে হয়। কিন্তু রাজপুরুষদের বেলায় আইন খাটে না। মন্ত্রণালয়ে তাকসিম খানের একজন বিশেষ সহযোগী আছেন, তার মাধ্যমেই এসব কাজ সহজে হয়ে যায়। মন্ত্রী যার অনেক কিছুই অবগত নন। বিনিময়ে এমডির সব ধরনের আয়ে তার রয়েছে অংশীদারিত্ব। এমডি দেশে তেমন কোনো কেনাকাটা করেন না। টাকা হুন্ডি করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। ওয়াসা কর্মকর্তারা অনেকেই দাবি করেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন যদি তদন্ত করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে তার বিপুল অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাবে। সেখানে তার জমি, বাড়ি, দোকান ও ব্যবসা আছে।

রাজপরিবারের এই দূরবর্তী সদস্য এত সুযোগ সুবিধা ভোগ করলেও তার রাজভক্তির অবস্থা খুবই করুণ। গত মহাজোট সরকারের শেষ দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে তিনি গত বছরের ২৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। প্রায় এক মাস সেখানে কাটিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে আসার পর দেশে ফিরেন। কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূলে গেলে তিনি আবারো সেদিকেই পা বাড়াবেন বলে এক পা উঁচু করে রেখেছেন। এই হচ্ছে রাজভক্তির নমুনা!

ওয়াসার অব্যবস্থাপনা
তাকসিম খানের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে ওয়াসার কার্যক্রম। নতুন নতুন নানা প্রকল্প খোলা হলেও তাতে অগ্রগতি সামান্যই। নগরবাসী পাচ্ছে না কোনো সুযোগ সুবিধা। পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। বর্তমানে ওয়াসায় বড় কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগর নির্মাণ প্রকল্প, তেঁতুলঝরা-ভাকুর্তা ওয়েলফিল্ড নির্মাণ প্রকল্প এবং এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত আরও কয়েকটি প্রকল্প। এর মধ্যে পদ্মা প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। বাকি প্রকল্পগুলোর প্রতিটিতে বরাদ্দ হাজার কোটি টাকার ওপরে।

?oh=d05ab148bbd66850f641d7e2dc6b02e1&oe=56394554″ width=”400″ />
সাম্প্রতিক এক বৃষ্টিতে মতিঝিল

কীভাবে কাজ চলছে, তা একটি প্রকল্পের বর্ণনা থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাবে। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া রাজধানীর স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির অবস্থা এতটাই করুণ যে, পাঁচ বছরমেয়াদি প্রকল্পটির মেয়াদ এরই মধ্যে আরও এক বছর বাড়িয়ে ৬ বছর করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও কাজ হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। জানা গেছে, শুরুর দিকে কিছু কাজ হয়। এর পরের বছর দায়িত্ব নেন তাকসীম। তার পর থেকে প্রকল্পটি ধুঁকছে। এত ধীরগতিতে কাজ হচ্ছে যে, ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকার প্রকল্পে ৬ বছরে খরচ হয়েছে মাত্র ১২৮ কোটি টাকা।

এই প্রকল্পের আওতায় বক্স কালভার্ট, খাল উন্নয়ন, ড্রেনের জন্য দেয়াল নির্মাণ করার মতো অনেক কাজ ছিল। এর কিছুই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হয়নি। হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি। বিভিন্ন নির্মাণ কাজে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) গত জুন মাসের সরেজমিন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৬ বছরে খরচ করা হয়েছে মাত্র ১২৮ কোটি টাকা। এ দিয়ে রাজধানীর বাউনিয়া বাঁধ, মহাখালী খাল ও জিরানী খালের উন্নয়ন করা হয়েছে। কিন্তু কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের কাজের সিংহভাগ বাকি থাকলেও এখনই ভেঙে পড়ছে আরসিসি দেয়াল আর বক্স কালভার্টগুলো। এতে মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। বিষয়টি অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংককেও ভাবিয়ে তুলেছে।

?oh=8b9a844ca03f6775760f2a04a366bc1a&oe=563E5B0B” width=”400″ />
সাম্প্রতিক এক বৃষ্টিতে গুলিস্তান

আইএমইডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাউনিয়া খাল উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের কাজের কালভার্টের দুপাশে রাস্তার মাটি প্রোটেকশন দেয়ার জন্য নির্মিত দেয়াল ফেটে গেছে। এছাড়া নির্মিত ব্লকের সাইড কর্নার ভাঙা, অমসৃণ ও ব্লকগুলোর মাঝে অতিরিক্ত ফাঁক রাখা হয়েছে। এক কথায় বাউনিয়া খালের উন্নয়নে এ প্রকল্পের অধীনে যে টাকা ব্যয় করা হয়েছে, সে অনুপাতে মান নিশ্চিত করা হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মহাখালী খাল পরিদর্শনে গিয়ে একই চিত্র দেখা যায়। এখানে নির্মিত আরসিসি দেয়াল ওপরের অংশে ভাঙা, যেখান দিয়ে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে নিচে গিয়ে পড়বে। এছাড়া সাইড দেয়ালে লিংকেজ ও যথাযথভাবে ফিনিশিং করা হয়নি। জিরানী খাল উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, খালের আরসিসি চ্যানেল নির্মাণে নকশা অনুসরণ করা হয়নি। আঁকাবাঁকা নির্মাণ করা হয়েছে। এ খালের কদমতলী এলাকায় আরসিসি দেয়ালে বড় আকারের গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা বালুভর্তি বস্তা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া নতুনপাড়া এলাকায় বক্স কালভার্টের ডিক স্লাবের জয়েন্টে ফাঁকা (হানিকম্ব) লক্ষ করা গেছে। এছাড়া এ প্রকল্পের অধীনে পাম্প হাউসগুলোর নির্মিত কলামগুলোর জয়েন্টে ফাঁকা রয়েছে। আর দেয়ালগুলোকে শুকনো পাটের চট দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে।

তাকসীম এ খানের আমলে অধিকাংশ প্রকল্পের অবস্থাই এই। এর ফলে সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন এবং দেশের সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। ওয়াসার বিশুদ্ধ পানি প্রকল্প, বোতলজাত পানি ‘শান্তি’ বাজারে কোনো অবস্থানই তৈরি করতে পারেনি। ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিপনা এবং দায়সারা মনোভাবের কারণে ‘শান্তি’ দীর্ঘ আট বছরেও সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি পায়নি। সবচেয়ে বিশুদ্ধ পানি এবং কম দামের এ পানির বোতল খোদ সরকারি অফিসেই ব্যবহার করা হয় না। সরকারি প্রতিষ্ঠানে শান্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কোনো উদ্যোগও নেয়নি ওয়াসা। একটা চিঠি পাঠিয়েই তারা দায়সারাভাবে দায়িত্ব শেষ করেছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্য পানি বিক্রেতাদের জোট ও ওয়াসার কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেনের মাধ্যমে শান্তির প্রচারণা ও বিক্রি ঠেকিয়ে রাখার অভিযোগ আছে। প্রতিবছর এ খাতে লোকসান হচ্ছে কোটি টাকারও বেশি। ২০০৬ সালের ৩০ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ১৬ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে মিরপুরে বোতলজাত পানি শান্তির কারখানা চালু করা হয়। এ কারখানায় প্রতিদিন বিভিন্ন আকারের মোট ৪২ হাজার পানির বোতল উৎপাদন করা সম্ভব। চাহিদা বেশি না থাকায় এখন এক শিফটে (১২ ঘণ্টা) কাজ চলে। গড়ে ৮ হাজার পানির বোতল উৎপাদন হয় দিনে। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই এমডি বলেছিলেন, শান্তিকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে সবকিছুই করা হবে। পাঁচ বছরেও তার কোনো পরিবর্তন আসেনি।

নাগরিক দুর্ভোগের চিত্র
ওয়াসার অব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট নাগরিক অব্যবস্থাপনার হিসাব দিয়ে শেষ করা যাবে না। প্রবল বর্ষণে এ বছরও পানিতে ভেসেছে ঢাকার অধিকাংশ এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনের স্লোগান মূলত সরকারের বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ। বর্ষা মৌসুমজুড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। প্রতি বছর জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যাপক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কিন্তু বর্ষা শুরু হলেই কীভাবে যেন এসব প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। তারপর বর্ষার পানিতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে একপর্যায়ে কাজ বন্ধ। শেষে প্রকল্পগুলো ফাইলবন্দী হয়ে যায়। ২০১০ সালে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্যুয়ারেজ লাইন স্থাপন, খাল দখলমুক্তসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে দাতা সংস্থার সহায়তায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ।


লেক দখল হলে ওয়াসা ঠেকায় না, তারা চায় নতুন খাল কাটার টাকা

ঢাকা মহানগরীর ৪৩ খালের মধ্যে ২৫টি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে যে খালগুলোর অস্তিত্ব আছে সেগুলোও দখল হয়ে যাচ্ছে। ওয়াসা খাল অবৈধ দখলমুক্ত করার কথা বললেও তা শুধু কাগজে কলমেই। এছাড়া বিভিন্ন সময় খাল খনন ও পরিষ্কারের যে ঘোষণা আসে তা-ও লোক দেখানো। দখল হওয়া খালগুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণে ১০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হলেও ফল নেই কোনো। মাঝে মাঝে ওয়াসা খাল উদ্ধারে বের হয় এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের আপ্যায়ন নিয়ে ফিরে আসে।
সম্প্রতি সরকারকে দেয়া বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঢাকা শহরের মাত্র ৩ শতাংশ এলাকায় ওয়াসা পরিচালিত স্যুয়ারেজ লাইন আছে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন মজুদ হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার মে. টন বর্জ্য। এর মধ্যে মাত্র ৩ হাজার ৮০০ মে. টন বর্জ্য ডাম্পিং করা হয়। রিপোর্টে বলা হয়, উত্তরা, মিরপুর, শ্যামলীসহ অনেক এলাকায়ই স্যুয়ারেজ লাইন নেই। রিপোর্টে আরও বলা হয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের মূল কারণ বিষয়ে খতিয়ে দেখতে সুনির্দিষ্ট কোনো কো-অর্ডিনেটিং বডি নেই।

পানি ঘাটতির সমস্যা তো নিত্যদিনের। রাজধানীতে প্রতিদিন ২৩০ কোটি লিটার পানি চাহিদার বিপরীতে মোট চারটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও ৫২৫টি গভীর নলকূপ থেকে আসে ২০০ কোটি লিটারের মতো। ২৫ শতাংশ যায় সিস্টেম লস। নগরবাসী পায় ১৫০ কোটি লিটারের মতো। প্রতিদিন প্রায় ৭০/৮০ কোটি লিটার পানি ঘাটতি নিয়ে চলছে ঢাকা ওয়াসা। লোডশেডিংয়ের কারণে পানি ঘাটতি মাঝে মাঝে ৯০ কোটি লিটারে গিয়ে ঠেকে। পদ্মা ও মেঘনার পানি শোধন করে রাজধানীতে সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয়া হলেও তারও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

এই হচ্ছে ওয়াসা। পুরোদস্তুর ব্যর্থ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। যার মূল কারণ এক রাজপুরুষের এমডি বনে যাওয়া। দেশে এমন সব সমস্যা প্রাধান্য বিস্তার করে আছে যে, মানুষ এখন ওয়াসা নিয়ে কথা বলার সময় পাচ্ছে না। আর এভাবেই লতিফ-কাদের-ইমরান-পিয়াসদের দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে এসব রাজপুরুষেরা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে ওয়াসার এসব অব্যবস্থাপনার জন্য যেকোনো সরকারই সঙ্কটে পড়ে যেত। কিন্তু বর্তমান সরকারের এ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছে না। সরকার তাকসীম খানকে পুনঃনিয়োগ দিয়েছে। তার ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কোনো পর্যালোচনা ও অনুসন্ধান হয়নি। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের প্রধানদের আত্মীয়-স্বজনদের অধিকাংশের কপাল এমনই চড়া। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, আর জামাত, জাতীয় পার্টি, যাই ব্লুন না কেন, ক্ষমতাসীন রাজপরিবারের সদস্যদের গায়ে কাদা লাগার কোনো নিয়ম এদেশে নেই!

[তথ্যসূত্র দিলাম না। যে কেউ যেকোনো তথ্য চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। সূত্র হাজির করতে এক মিনিটও লাগবে না আমার। ধন্যবাদ সবাইকে।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৫ thoughts on “আওয়ামী এক রাজপুরুষের কাহিনী!

  1. [তথ্যসূত্র দিলাম না। যে কেউ

    [তথ্যসূত্র দিলাম না। যে কেউ যেকোনো তথ্য
    [তথ্যসূত্র দিলাম না। যে কেউ যেকোনো তথ্য
    চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। সূত্র হাজির
    করতে এক মিনিটও লাগবে না আমার। ধন্যবাদ
    সবাইকে।

    চমৎকার একটা পোস্ট দিলেন। চ্যালেঞ্জ কে করবে??

  2. স্বজনপ্রীতি বলে গণতান্ত্রিক
    স্বজনপ্রীতি বলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একটা শব্দ আছে। কিন্তু তা দিয়ে বাস্তব অবস্থা বোঝা যায় না কিছুতেই। বাস্তব অবস্থাটা হচ্ছে রাজত্ব। হিরক রাজার দেশের মতো। একটু ভেতরে গেলেই বেরিয়ে আসে এমন রাজপুরুষদের কর্মকান্ড- দেশ লুটেপুটে খাওয়ার নমুনা।

    1. বিএনপি’র কাজ কি এর চেয়ে ভিন্ন
      বিএনপি’র কাজ কি এর চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল। জাতিয়তাবাদি রাজনীতির ধারনাটা এসছে বুর্জোয়া অর্থনীতি বিকাশের জন্য।

  3. দুর্নীতিতে বিএনপি যে ধারায়
    দুর্নীতিতে বিএনপি যে ধারায় হেটেছিল আওয়ামীলীগও একই ধারায় হাটছে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আত্মীয়-স্বজন বসিয়ে দেশের বারোটা বাজাচ্ছে বর্তমান সরকার। যোগ্যতা সম্পন্ন আত্মীয়-স্বজনকে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসালে তা মানা যায়। কিন্তু অযোগ্যদের পদায়ন করে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিলে সেখানে দুর্নীতি হতে বাধ্য। আওয়ামীলীগ আর বিএনপি’র মধ্যে আসলে নীতিগত কোন পার্থক্য নাই। মন্দের ভালো বলে আর কত দিন!

    চমৎকার অনুসন্ধানী লেখা। শেয়ার দিলাম।

    1. অযোগ্যদের পদায়নের কারনেই
      অযোগ্যদের পদায়নের কারনেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় বেশি। রাজপরিবারে সদস্যদের যোগ্যতার দরকার হয় না। সে রাজপরিবারে আত্মীয়, এটাই তার যোগ্যতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

  4. বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে
    বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে দূর্বল দিক এটাই। তিনি কখনো আত্মীয়-স্বজনকে বিমূখ করেন না। অথচ ১/১১ বা দলের দু:সময়ে এদের খুঁজে পাওয়া যায় নাই। ভবিষ্যতেও পাওয়া যাবে না। যেই তৃণমূলের উপর ভর করে দল ঠিকে থাকে, তাদের কোন মূল্যায়ন হয় না।
    এই ধরনের অনুসন্ধানী পোস্ট দিয়ে দূর্বলতা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ভবিষ্যতে কাজে লাগাতে চেষ্টা করবো।

  5. ব্লগারদের অনেকেই তো নিউ
    ব্লগারদের অনেকেই তো নিউ ইয়র্কে থাকেন। যদি এই রাজপুরুষের সেখানকার আলীশান জীবনের কিছু তথ্য পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো বিষ্ময়কর ও নতুন অনেক কিছু জানা যেত।

    1. নিউইয়র্কের অনেকেই এই
      নিউইয়র্কের অনেকেই এই রাজপুত্তরকে চিনেন। ইচ্ছে করলেই তথ্য দিতে পারেন। আর সে যদি দ্বৈত নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে তার পদায়ন সরকারী চাকুরীবিধি মতে অবৈধ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

62 − = 60