পত্রিকা জগতের শূদ্রদের কি আপনি চেনেন মশাই?

?oh=ddaee9d2d1dd64a02dbf61948cae52af&oe=56023508&__gda__=1438590536_8d4068a15708f9f7971727624f166631″ width=”500″ />
সংবাদপত্র দেশের সমস্যা, সম্ভাবনা এবং চলমান ঘটনার খবরাখবর মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। বর্তমান সময়ে সংবাদপত্রের ব্যাপ্তি বেড়েছে অনেকখানি। জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে দাবি-দাওয়ার সংগ্রাম, সবকিছুর সঙ্গেই এখন সংবাদপত্র যুক্ত হয়ে গেছে। এর ফলে সংবাদপত্র ও সংশ্লিষ্টদের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব বেড়েছে। পত্রিকা সরবরাহ ব্যবস্থার একেবারে প্রান্তে যারা বাস করেন, তারাই পত্রিকাগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছান। আর পত্রিকা জগতের শেষপ্রান্তে বাস করা এই শূদ্রদের আলাদা কোনো নামও নেই। তারা হকার বলেই পরিচিত!

হকারদের জীবনের দিকে তাকালে ‘প্রদীপের নিচে অন্ধকার’ প্রবাদটি যেন একেবারে মূর্ত হয়ে ওঠে। তাদের আয়ের নিরাপত্তা নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই, দুর্ভোগ অসীম। জীবনযাপনের মান খুবই নিচু। অথচ পত্রিকার সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক, প্রকাশক- সবাই এ সমাজে বেশ প্রতাপশালী। আমরা সবাই তাদের খোঁজ-খবর রাখি। পত্রিকা জগতের হোমড়া চোমড়াদের সম্পর্কে নাগরিক সমাজ সব সময়ই সচেতন থাকে। তাদের লাইফস্টাইল-স্ক্যান্ডালের খবর রাখে, আদানপ্রদান করে। কিন্তু পত্রিকা যারা ফেরি করেন, তাদের সম্পর্কে কি আমরা কিছু জানি? প্রতিদিন ভোরে যারা বাসায় বাসায়, বাসে, রাস্তায়, চা দোকানে, আড্ডায় পত্রিকা দিয়ে যায় তারা কিভাবে জীবন যাপন করে, বেঁচে থাকে সে সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? আমরা খোঁজ নিয়েছি সমাজের এই নিপীড়িত বর্গটি সম্পর্কে। দেখে নিন কাছ থেকে, আপনার নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অংশ এই সাধারণ মানুষগুলোর বাস্তব অবস্থা।

বিশেষায়িত পেশা হলেও নেই কোনো বিশেষ অধিকার, বরং সাধারণ অধিকারগুলোও বিপন্ন। এক সরকার যদি কোনো সুবিধা দেয়, আরেক সরকার এসে তা কেড়ে নেয়। দিনে দিনে খরচ বাড়ে, কিন্তু আয় বাড়ে না। যদিও পত্রিকার দাম বাড়ছে, পত্রিকা বড় হচ্ছে, তার প্রভাব বাড়ছে। অথচ পত্রিকা হকারদের দুর্ভোগের কমতি নেই। গেল হরতাল-অবরোধের ফলে এ অবস্থা চরমে উঠেছে। কিন্তু তাদের খবর পত্রিকায়ও আসেনি তেমন। নানা কারণে উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছেন এই অংশটি।

সম্পাদকের রমরমা : হকারের দর কমা
পত্রিকাসংশ্লিষ্টরা সব সময় পাদপ্রদীপের আলোয় থাকলেও এর হকাররা খুবই অবহেলিত। সাধারণত সংবাদপত্র, সাংবাদিক, সম্পাদক এবং এ-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের সম্পর্ক তেমন একটা ভালো থাকে না। নানা ইস্যুতে পুলিশের গাফিলতি তুলে ধরে পত্রিকাগুলো কাটতি বাড়ায়। কিন্তু এর দায় পোহাতে হয় হকারদের। পত্রিকা ফেরি করতে গিয়ে বিপদে পড়ে তারা।

পত্রিকাগুলো সরকারবিরোধী খবর ছেপে নাম কামায়, দাম বাড়ায়। ফলে সব সরকারের কাছেই সামগ্রিকভাবে সংবাদপত্র এক নেতিবাচক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়। এতে এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবীরা সরকারের কুনজরে পড়েন। ফলে তাদের জন্য ভিন্ন কোনো নীতিমালা, তাদের জীবনযাপনের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারি কোনো প্রণোদনার উদ্যোগ চোখে পড়ে না। সংবাদপত্রের বেতন স্কেলের সঙ্গেও এই সংবাদপত্র হকারদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের কথা সংবাদপত্রেও তেমন আসে না। কারণ তাদের কঠিন দুরবস্থার কথা সামনে এলে সংবাদপত্র মালিকদেরই দায় ধরা পড়বে। এসব কারণে সরকার এবং পেশাসংশ্লিষ্ট, সব মহলের কাছেই তারা অবহেলিত এবং উপেক্ষিত।

তাদের যাওয়ার জায়গা একটাই, তা হলো ইউনিয়ন। কিন্তু সংবাদপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোকে তাদের সমস্যা-সংকট ও দাবি-দাওয়া নিয়ে খুব একটা মাঠে নামতে দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে দেখা যায় যে, হকার ইউনিয়নগুলো যুক্ত হকার্স সমিতির সঙ্গে। সেই সমিতি আবার বহুমুখী সমবায় সমিতি হওয়ায় তাকে নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে চলতে হয়। রাষ্ট্রের কাছে সে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত হয়। ফলে আন্দোলনের কর্মসূচিতে যাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। হকাররাও এর বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেদের কোনো অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন না বিধায় কষ্টে থাকলেও তাদের তেমন একটা মাঠে দেখা যায় না।

হকাররা জানিয়েছেন, তাদের আয় বাড়ানোর জন্য সমিতিসহ সব পক্ষের উদ্যোগ দরকার। তাদের জীবনের নিরাপত্তা এবং আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তারা। এ বিষয়ে সব মহলের মনোযোগ দাবি করেন হকাররা। সরকার, পত্রিকা মালিক এবং সমিতির মধ্যে সমন্বয় করে একটা সুষ্ঠু নীতিমালা দাঁড় করানো গেলে তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের একটা পথ বের হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা সেই ১৯৭৪ সালে যে কমিশনে পত্রিকা পেতাম, এখনও তাই। তখন একজন মানুষের ঘরভাড়া কত দিতে হতো? আয়ের কতভাগ কোথায় ব্যয় হতো, আর এখন কোথায় কত লাগে? যে কেউ হিসাব ছাড়াই বুঝবেন, হকাররা ভালো নেই। আজ পর্যন্ত আমরা হকাররা সরকারের কাছ থেকে কোনো সুবিধা পাইনি। উল্টো সমবায় সমিতি হওয়ায় দেশের যেকোনো দুর্যোগে আমরা সরকারকে তহবিল দেই। সব হকারের একদিনের আয়ের টাকা যায় সরকারের কাছে। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে আমরা বঞ্চনা ছাড়া কিছু পাইনি। সেই যে এরশাদ সরকারের আমলে কিছু পত্রিকা বিক্রয় কেন্দ্র করে দেয়া হলো, এরপর মানুষ বেড়েছে, কিন্তু পত্রিকা বিক্রয়কেন্দ্র আর বাড়েনি। উল্টো নানা সরকারের আমলে এর ওপর আঘাত এসেছে। বিভিন্ন অজুহাতে ভাঙা হয়েছে, কিন্তু বিকল্প জায়গা দেয়া হয়নি। শ’ থেকে কমে এখন এর সংখ্যা পঞ্চাশে নেমে এসেছে। এটা থেকেই বুঝতে পারবেন, হকারদের প্রতি সরকারের কতটা মানোযোগ। আর সাধারণ মানুষ তো হকারদের মানুষ মনে করে না। অনেকে ঘৃণাও করে। এই সাহেবেরাই আবার হকারদের টাকা দেয় না। মহল্লায় তাদের ওপর অত্যাচার চালায়। আমরা চাই স্থানীয় চাঁদাবাজ, মস্তান ও বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে হকাররা অভিযোগ আনলে সরকার তা বিশেষভাবে বিবেচনা করুক। সরকার উদ্যোগ নিয়ে এ বিষয়টার সমাধান করতে পারলে আমাদের অনেকখানি সমস্যা লাঘব হয়। আধিপত্য বিস্তার বন্ধ করা গেলে আমাদের আর একটা জিনিসের দরকার পড়ে, তা হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। সেটা আমরা করে নিতে পারব। সদস্যদের ঐক্যের ওপর ভিত্তি করেই আমরা এতদূর এসেছি। আমরা চাই সরকার স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখুক। আর মালিক ও সরকার, উভয়েই যেন হকারদের সমস্যাগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়।’

হকারদের দুঃখ : প্রথম আলো
সংবাদপত্র বিক্রি করে হকাররা লাভ পান কমিশন অনুযায়ী। প্রকাশকের কাছ থেকে হকার্স সমিতি পত্রিকা পায় ৩৫ শতাংশ কমিশনে। এর মধ্য থেকে হকাররা পত্রিকা পান ৩২ শতাংশ কমিশনে। মাঠ পর্যায়ের হকাররা অনেক পত্রিকার ক্ষেত্রেই নির্ধারিত কমিশন পান না। মধ্যস্বত্বভোগীরা তাতে ভাগ বসায়। ৪৪ বছর ধরে এই একই রেটে চলছে পত্রিকা বিপণন। অনেক সময় গড়িয়েছে। দুই টাকার পত্রিকা ১২ টাকা হয়েছে, সবার লাভ বেড়েছে। কিন্তু হকারদের আয় বাড়েনি। অনেকে পত্রিকার সংখ্যার কথা বলেন, কিন্তু হকাররা বলছেন, তাতে কাজ হচ্ছে না। সার্বিকভাবে তারা পিছিয়ে পড়ছেন। কোনো কোনো পত্রিকা তো অবিক্রীত থেকে গেলে ফেরত দেয়ারও সুযোগ থাকে না বা সীমিত থাকে। এর মধ্যে হকাররা বেশি সমস্যা পোহান প্রথম আলো নিয়েই!

ফার্মগেটের পত্রিকা হকার লাল মিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন আর প্রথম আলো ফেরত নেয় না। একটা পত্রিকা থেকে গেলে বিরাট ক্ষতি। আমাদের আয় কম। পাঁচটা পত্রিকা বেচলে ১০ টাকা লাভ। একটা থেকে গেলে তার পুরোটাই ক্ষতি। বড় পত্রিকাগুলো ফেরত দিতে ঝামেলা হয়। দু’চারটা ফেরত নেয়, বাকিগুলো নিজের পকেট থেকে গচ্চা দেয়া লাগে। এরকম কয়েকটা হলে আর কুলায়া ওঠা যায় না।’

শাহবাগের পত্রিকা হকার আলীরাজ বলেন, ‘২৩ বছর ধরে পত্রিকা হকারি করছি। আয়ের অবস্থা সঙ্গিন। এখন আগের জমা টাকা খেয়ে চলছি। আগে ম্যাগাজিন বিক্রি হতো অনেক। কিছু লাভ থাকতো। এখন ব্যবসা দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে। দৈনিক পত্রিকা ছাড়া আর কিছুর তেমন বাজার নেই। ফেসবুক এসেছে, সব পত্রিকা মোবাইলে ব্রেকিং নিউজ ছাড়ছে সারা দিন ধরে, টিভিতে সবকিছু দেখানো হচ্ছে, ফলে পত্রিকার বিক্রি এখন কম। যা-ও হয়, তা খেয়ে ফেলে বড় পত্রিকাগুলো। প্রথম আলো নিয়ে খুবই ঝামেলায় আছি। তাদের ঈদ সংখ্যা নিয়েছিলাম। তিন কপি রয়ে গেছে। এটা এখন আমাকে গচ্চা দিতে হবে। যে কয়টা বিক্রি করেছি, তার লাভ এখানে ঢেলে দেয়া লাগবে। তাহলে চলব কীভাবে? আয় বাড়ে না, প্রতিদিন কমে, তার ওপর বড় পত্রিকার এই ফেরত না নেয়ার সমস্যা- এগুলোর বিহিত হওয়া দরকার।’

পত্রিকা ফেরত নেয়ার একটা ন্যূনতম হিসাব নির্ধারণ করে দেয়া এবং কমিশন বাড়ানোটাই সাধারণ হকারদের দাবি।

হকারদের জীবন : অনিশ্চয়তার বৃত্ত
পত্রিকা হকারদের জীবনমান খুবই নিচু। দীর্ঘদিন ধরে যারা এ পেশার সঙ্গে জড়িত, তাদের কেউ কেউ হয়তো অন্য পেশার আয় দিয়ে কোনোভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু অধিকাংশ হকারের জীবনযাপনের তথা আয়ের অবস্থা খারাপ। বিপরীতে শ্রম দিতে হয় অনেক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার একজন পত্রিকা হকারকে ভোর চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠতে হয়। ঘুম থেকে উঠে ঘরে যা থাকে, তা থেকে কিছু মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়েন সাইকেল নিয়ে। সেন্টারে গিয়ে নিজের পত্রিকার কপিগুলো সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো গোছাতে হয়। গ্রাহকের হিসাব অনুযায়ী ভাগ করে ফেলতে হয়। তারপর শুরু হয় বিতরণ। হকাররা নিজ নিজ এলাকা অনুযায়ী পত্রিকা বিতরণ শেষে কেউ কেউ অন্য কাজে যোগ দেন। কেউ কেউ বাদবাকি পত্রিকা নিয়ে রাস্তায় বসেন বা বাসে উঠে সেগুলো বিক্রি করেন।

হকাররা জানিয়েছেন, ঝড়, বৃষ্টি, শীত, বন্যা, হরতাল, অবরোধ, অবস্থা যা-ই হোক না কেন ভোরে আলো ফোটার আগে বের হতেই হবে। সাধারণত এরকম সময়ে নিরাপত্তার সমস্যা হয় খুব। পুলিশের হাতে হেনস্তা হতে হয় অনেক সময়। ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসীদের হাতে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হয় প্রতিদিন। প্রত্যেক হকারই কোনো না কোনোদিন সকালে একবার থানায় গেছেন বা কোনোদিন সকালে হাসপাতালে গেছেন। যিনি যাননি, তাকে যেতে হবে। এটাকে হকারজীবনের এক অমোঘ সত্য বলে মনে করেন সব হকারই। ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসীদের দ্বারা সৃষ্ট নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হয়তো কমবেশি থেকেই যাবে। তবে পুলিশি হয়রানিটা শেষ করা যেত। কিন্তু তা-ও কখনো শেষ হয় না। হকাররা প্রতি ভোরেই এই আতঙ্কে থাকেন।

হকারদের আয় সীমিত। যা হয় তা-ও অনেকটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল থাকে। যেদিন ঝড়-বৃষ্টি নামে, সেদিন সব পত্রিকা হকারকেই অবধারিত ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। পত্রিকা বিক্রি তখন কমে যায়। হঠাৎ করে ঘটা কোনো নতুন ঘটনা আগের দিনের খবরগুলোকে মøান করে দেয়, এরকম অবস্থায় হকারদের প্রায়ই পড়তে হয়। তখন আর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পত্রিকা বিক্রি হয় না। হরতাল-অবরোধের কারণে রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে যায়, তখনও একই সমস্যায় পড়তে হয়।

সব মহল্লাতেই হকারদের পত্রিকা দিয়ে মাস শেষে বিল আদায় করতে গিয়ে কোথাও না কোথাও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। উঠতি মস্তানদের আড্ডাখানায় বিনা মূল্যে পত্রিকা দিতে হয়। অনেকে বাসা পাল্টে চলে যান, বিল পাওয়া যায় না। অনেকে বিল নিয়ে ঝামেলা করেন। মাঝে মাঝে হকারদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়, বকাঝকা, বাজে কথা শুনতে হয় হরদম। রাস্তায় বসে যারা পত্রিকা বিক্রি করেন, তাদের সমস্যা আরও বেশি। যেকোনো সময় পুলিশ এসে উঠিয়ে দিতে পারে। দোকানের মালামাল আটকে রাখতে পারে। এমনটা যেদিন ঘটে, পুরো দিনটাই মাটি।

আমরা হিসাব করে দেখেছি, ঢাকা শহরে যারা নিয়মিত পত্রিকা হকারি করেন, তাদের দৈনিক গড় আয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। যেদিন ভালো চলে সেদিন ৩০০ টাকা হয়। খারাপ হলে ২০০ টাকার মতো থাকে। কিন্তু এই আয়ের কোনো নিরাপত্তা নেই। এমনকি সামান্য এই আয়ের নিমিত্তে বিপন্ন হয় পুরো জীবনটাই। তাছাড়া পরিবার, পরিজন ও সন্তান লালন-পালন, তাদের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ আবাসন ব্যয় দিয়ে ঢাকার মতো শহরে এই আয় দিয়ে টিকে থাকা মুশকিল।

কামরাঙ্গীর চর নিবাসী পত্রিকা হকার আব্দুল মজিদ প্রায় ২৫ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত। তিনি রাজধানীর পিজি হাসপাতাল লাইনে ভোরে এসে পত্রিকা বিলি শুরু করেন, এরপর পিজির সামনের রাস্তায় বসে সারাদিন পত্রিকা বেচেন। আমরা যখন তার সঙ্গে কথা বলতে যাই, তখন তিনি হাতে থাকা বেশ কিছু পত্রিকা উঁচিয়ে বলেন, ‘কী আর বলব দেখেন, এই পত্রিকাগুলো বিক্রি হয়নি। দুপুর পেরুলেই আর দৈনিক পত্রিকা তেমন বিক্রি হয় না। আজকের আয়ের চেয়ে লস বেশি।’

তিনি জানান, কামরাঙ্গীরচরে একটি টিনশেডের বাসার জন্য তাকে মাসে ৩৫০০ টাকা ভাড়া গুনতে হয়। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। ছেলেটি তৃতীয় এবং মেয়েটি প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এই আয়ে চলতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে সারাক্ষণই। কিন্তু এর বাইরে কিছু করার মতোও পাচ্ছেন না। তার আর্জি একটাই, ‘জীবনের গ্যারান্টি নাই, এটা কোনো সমস্যা না। এদেশে কারোই জীবনের গ্যারান্টি নেই। কিন্তু কাজে গেলে আয় হবে, এইটুক ঠিক না থাকলে তো মুশকিল। এই যে হরতাল, অবরোধ গেল, তখন তো আর বাসে পত্রিকা বিক্রি হয় না। আমাদের বিক্রি অনেক কমে গেছে। মানুষ এমনিতেই খবরাখবর রাখে জীবনের ভয়ে। ফলে পত্রিকা কেনার আর দরকার পড়ে না। টিভি দেখেই সবাই বাসা থেকে বের হয়। আমরা তখন কিভাবে বাঁচলাম, তার খোঁজ কি কেউ নিয়েছে? আয়টা যেন ঠিকমতো করতে পারি, তার নিরাপত্তা তো থাকা লাগবে। আর সব পত্রিকার ফেরত দেয়ার একটা হিসাব বেঁধে দেয়া লাগবে। নইলে তো বিরাট সমস্যা। বিক্রি হলো না, খাইতে পারলাম না। তার ওপর যদি গচ্চা দেয়া লাগে, তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে?’

এ তো গেল শহুরে হকারদের হিসাব। ঢাকার বাইরে যারা থাকেন তাদের আয়ের কোনো হিসাবই নেই। একেবারে মাঠপর্যায়ে, গ্রামের একজন হকার দিনে ১০০ টাকা আয় করতে পারলে স্বস্তিবোধ করেন। ২০০ টাকা করতে পারলে তিনি বড় এবং প্রভাবশালী হকার। এর বাইরে বড় জেলা শহরগুলোতে হয়তো দু’চারজন এজেন্ট ব্যবসা করতে পারেন, কিন্তু সাধারণ হকারদের অবস্থা সেখানে খারাপ। ঢাকার বাইরের হকারদের প্রশাসনিক ও অন্যান্য সমস্যা কম থাকলেও আয়ের দিকে তাদের অবস্থা খুবই মানবেতর। মফস্বলে একক পেশা হিসেবে যিনি পত্রিকা হকারিকে নির্বাচন করেন, তিনি কোনোমতেই টিকে থাকতে পারবেন না।

চট্টগ্রামের এজেন্ট আব্দুল খালেক বলেন, ‘খরচ বাড়ছে, আয় কমেছে। সার্কুলেশন কমে গেছে। মানুষ পত্রিকা নিচ্ছে কম। বাদবাকি খরচ তো চালু আছে। ম্যাগাজিন ও কাগজের সংখ্যা কমে গেছে। আমরা চ্যালেঞ্জের মুখে আছি।’

গাইবান্ধার জেলা এজেন্ট আব্দুর রহমান শেখ বলেন, ‘খুব বিপদের মধ্যে আছি। দোকানপাট বন্ধ। হরতাল, অবরোধে আমাদের টাকা আটকে গেছে সমিতির কাছে। সমিতি টাকা দিতে পারছে না। আমাদের দেখার কেউ নেই। দিন দিন আয় কমছে। হকাররা কোনোভাবে টিকে আছে। কিন্তু এভাবে কয়দিন? ইদানীং নানা সমস্যার কারণে পত্রিকা দেরিতে আসছে। যেদিন পত্রিকা দেরিতে আসে, সেদিন অনেকে নিতে চায় না। পত্রিকা আটকে যায়, টাকা আটকে যায়। আমরা কী করব, জানি না।’

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হকার মান্নান বলেন, ‘এখানে মানুষ এমনিতেই পত্রিকা কম নেয়। একজন পত্রিকা রাখলে অন্যরা তারে সাহেব বলে। আরও সমস্যা আছে। পোলাপানের ইন্টারনেট আছে। বলে, দেশি-বিদেশি সব পেপার নাকি তাতে দেখা যায়। আমাদের বেচা বিক্রি কম। আগে যাও ছিল, এখন আরও কমে গেছে। মাস শেষে হাজার তিনেকও থাকে না। এর সঙ্গে আরও কিছু কাজকর্ম করে টিকে আছি। সমস্যার তো কোনো শেষ নাই। দেখা গেল কোনো মহল্লায় রাতে চুরি হইছে। সকালে হকার গেলে তারে চোর সাব্যস্ত করে থানায় নিয়ে যায়। সাধারণ মানুষ হকারদের সঙ্গে মানুষের মতো আচরণ করে না। একটু এদিক ওদিক হলেই তেড়ে আসে। আর জিনিসপত্রের যে দাম, তার তুলনায় এহ দেশে সম্ভবত পত্রিকার দামই সবচাইতে কম। এত কম দামের পত্রিকা বেচে যে দু’এক টাকা লাভ আসে, তা যদি অন্য পত্রিকার হিসাব মিলাইতে চলে যায়, তাহলে আমরা টিকব কিভাবে?

এ প্রসঙ্গে আমরা সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের সচিব, মর্তুজা আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। হকারদের জীবনমান উন্নয়নে কোনো সরকারি উদ্যোগ আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে পারব না। কোনো উদ্যোগ আছে কিনা তা অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে কথা বলে জানাতে হবে। আমি খোঁজ নিয়ে রাখব। আপনি একদিন সচিবালয়ে আসুন। এখন কিছু বলতে পারছি না।’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “পত্রিকা জগতের শূদ্রদের কি আপনি চেনেন মশাই?

  1. সমাজের প্রান্তিক মানুষদের
    সমাজের প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে কথা বলাটা আমাদের বর্তমান সামাজিক ভাবাদর্শের নিয়ম বিরুদ্ধ। এখানে মানুষ সমস্যায় থাকলেও আপনি উন্নয়নের গল্প করবেন। উন্নয়নের গল্পে যদি আপনার টান না থাকে, তাহলে ব্যস্ত থাকবেন সিনেমা, নাটক, মডেল নিয়ে। তাও যার ভালো লাগে না তিনি অনুসরণ করবেন স্কোর বোর্ড। সমাজটা এমনই যে, শেষ পর্যন্ত মুখ খুললেও আপনি দাঁড়াবেন ফিটফাট, সাজানো গোছানো মানুষগুলোর পক্ষেই।

    যাদের গায়ে কাদা লেপ্টে থাকে, তাদের হাসি আপনাদের সুন্দর লাগে না। যারা কাজ করে খায় তারা খাদ্যাভাবে কষ্ট পাবে, এটাতেই আপনারা অভ্যস্ত। এরকম বিষয়ে আলাপটা আপনাদের বিশেষ পছন্দ না। আপনারা বরং কনসার্ট, নতুন গান আর র‍্যাপ-জাজের মধ্যে মুক্তি খোঁজেন। কিন্তু এই মানুষগুলো ছাড়া যে সমাজের চলেই না! তাই মাঝে মাঝে সামনে চলে আসে তাদের কথাগুলো! আত্মপ্রবঞ্চনার দিনগুলো শেষ হলে হয়তো খোলা চোখেই দেখতে পাবেন এসব। এখন কাগজে পড়ে জানতে পারেন!

  2. চমৎকার বিষয় নিয়ে পোস্ট। এসব
    চমৎকার বিষয় নিয়ে পোস্ট। এসব প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে আমরা এখন ভাবিনা। অথচ এই ধরনের পেশার মানুষগুলো হঠাৎ করে তাদের কাজ বন্ধ করে দিলে কি বিপদেই না আমরা পড়ব।

  3. হকাররা জানিয়েছেন, ঝড়, বৃষ্টি,

    হকাররা জানিয়েছেন, ঝড়, বৃষ্টি, শীত, বন্যা, হরতাল, অবরোধ, অবস্থা যা-ই হোক না কেন ভোরে আলো ফোটার আগে বের হতেই হবে। সাধারণত এরকম সময়ে নিরাপত্তার সমস্যা হয় খুব। পুলিশের হাতে হেনস্তা হতে হয় অনেক সময়। ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসীদের হাতে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হয় প্রতিদিন। প্রত্যেক হকারই কোনো না কোনোদিন সকালে একবার থানায় গেছেন বা কোনোদিন সকালে হাসপাতালে গেছেন। যিনি যাননি, তাকে যেতে হবে। এটাকে হকারজীবনের এক অমোঘ সত্য বলে মনে করেন সব হকারই। ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসীদের দ্বারা সৃষ্ট নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হয়তো কমবেশি থেকেই যাবে। তবে পুলিশি হয়রানিটা শেষ করা যেত। কিন্তু তা-ও কখনো শেষ হয় না। হকাররা প্রতি ভোরেই এই আতঙ্কে থাকেন।

    মানুষের এ কী অবস্থা!

  4. শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে
    শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে রোদ্রে পোড়া মানুষের কষ্টের ভাগ নেয়াটা বড়ই হাস্যকর ব্যাপার হয়ে যায়।
    গরিব যারা তারাই বুঝতে পারে গরিবের কত কষ্ট জ্বালা থাকতে পারে? ধ্বনিদের পক্ষে গরিবের ব্যাথা বেদনা বুঝা মুসকিল-!!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − = 8