ব্রিটিশবিরোধী সেই বিপ্লবীরা!

ভারতের স্বাধীনতা সহজে আসেনি। কত তাজা রক্তের স্রোতে ধুয়ে গেছে, এই স্বাধীনতার রক্তিম ছ’টা, তার কতটুকুই-বা এই ৬৮ বছরে হিসেব করা হয়েছে? ভারতের সংবিধানের পৃষ্ঠা জোড়া কত মায়ের চোখের জল, কত স্ত্রীর নাছোড় সিঁথির সিঁদুরের দাগ, কত বোনের রক্তে গাঁথা রাখির সুতো, তার কতটুকুই-বা খোঁজ রেখেছে পরবর্তীরা!

সবাই কেবল জানে, ‘স্বাধীনতা এসেছে৷‌ আর তার সঙ্গে ঝুলি ভরে নিয়ে এসেছে ভোট নামক রাজসীক যজ্ঞ, প্রগতি নামক লোকঠকানো স্ট্যাটিসস্টি’, গণতন্ত্রের নামক চিরায়ত মাৎস্যন্যায়, ঐতিহ্য নামক মন্দির-মসজিদের ঝগড়া, আর আসমুদ্র ভরিয়ে দেওয়া ভাষণ, ভাষণ আর ভাষণ৷‌ আর মনে রেখেছি একটুকরো স্বাধীনতার জন্য শত মায়ের কোল খালি করা মাত্র কয়েকজন দামাল ছেলের নাম৷‌ কিন্তু প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মধ্যে যাঁরা থেকে গেলেন, যাঁদের স্বপ্ন সত্যি হল প্রাণের বিনিময়ে, তাঁদের কি এভাবেই ভুলে থাকব আমরা? চিরদিন? ভুলে যাওয়া কিছু দামাল ছেলের মুক্তির মন্দির সোপানতলে প্রাণ বলি দেওয়ার ইতিকথায় গাঁথা এই লেখা৷‌

নদীয়া কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হেমন্তকুমার সরকার৷‌ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রথমবার কারান্তরালে যান৷‌ এর পর গান্ধীজি ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ শুরু করলে, তিনিও তাঁকে অনুসরণ করেন৷‌ যুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ করার অপরাধে পুনরায় জেলে যেতে হয় হেমন্তকুমারকে৷‌ ইংরেজ অত্যাচারের ভয়াবহ কাহিনী সাধারণের মনে ছড়িয়ে দিতে সম্পাদনা করেন ‘সাপ্তাহিক জাগরণ’৷‌ এই অপরাধেও হয়ে ওঠেন ব্রিটিশের চক্ষুশূল৷‌ ইংরেজের বুটের খোঁচা আর লাঠির আঘাতে এক সময় শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন৷‌ ‘ভারত পথিক’ গ্রন্থে নেতাজি স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে, হেমন্তকুমারই সুভাষচন্দ্রকে রাজনীতির আঙিনায় অভিষিক্ত করেছিলেন৷‌

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনে মাস্টারদার অন্যতম প্রধান সহকারী ছিলেন অনন্ত সিংহ৷‌ অসহযোগ আন্দোলনে মূলত তাঁর উদ্যোগেই স্কুলের ছাত্ররা এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল৷‌ ১৯২৪ সালে ইংরেজ পুলিস তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং চার বছর কারাদণ্ড হয় তাঁর৷‌ দেশের তরুণ সমাজকে মাতৃমুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত করাই ছিল অনন্ত সিংহের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য৷‌ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ মামলায় তাঁর দ্বীপান্তর হয়৷‌ চলতে থাকে অকথ্য অত্যাচার৷‌ এর প্রতিবাদে সেলুলার জেলে অনশন শুরু করেন অনন্ত সিংহ৷‌ রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজি প্রমুখ মুখর হয়ে ওঠেন অনন্ত সিংহের ওপর এই নারকীয় অত্যাচারের প্রতিবাদে৷‌ দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে ভগ্নদেহে প্রায় মরণাপন্ন অনন্ত সিংহকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়৷‌

প্রদ্যোত ভট্টাচার্য৷‌ জন্ম ১৯১৩ সালে৷‌ ছাত্রাবস্থায় বাড়ির লোকের চোখের আড়ালে যোগ দেন বিপ্লবী দলে৷‌ মেদিনীপুরের ম্যাজিস্ট্রেট রবার্ট ডগলাসকে হত্যার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়৷‌ এই ডগলাসকে আক্রমণে তাঁর সঙ্গী ছিল আর এক বিপ্লবী প্রভাংশুশেখর পাল৷‌ ঘটনাস্থলেই রিভলভারসহ গ্রেপ্তার হন প্রদ্যোত৷‌ কিন্তু অনুসন্ধান করে জানা গিয়েছিল, তাঁর রিভলভারের গুলিতে ডগলাস নিহত হননি৷‌ তবু মেলেনি রেহাই৷‌ ইংরেজ সরকার প্রদ্যোত ভট্টাচার্যকে ফাঁসির হুকুম দেয়৷‌ কিন্ত এত সব সত্ত্বেও মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত প্রদ্যোতের সঙ্গীর নাম তাঁর মুখ থেকে বের করতে পারেনি ব্রিটিশ পুলিস৷‌

ছাত্রাবস্থাতেই গুপ্ত বিপ্লবী দলে যোগ দিয়েছিলেন ভবানী ভট্টাচার্য৷‌ বাংলার কুখ্যাত গভর্নর অ্যান্ডারসনকে হত্যার ভার পড়েছিল তাঁর ওপর৷‌ গভর্নর তখন দার্জিলিঙে৷‌ দুই সঙ্গীকে নিয়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন ভবানী৷‌ কিন্তু রেস গ্রাউন্ডে গুলি ছুঁড়ে মারতে পারেননি অ্যান্ডারসনকে৷‌ গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়৷‌ তিনজনই ধরা পড়ে যান ইংরেজ পুলিসের হাতে৷‌ বিচারে অন্যদের সঙ্গে রাজশাহি সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি হয়ে যায় ভবানী ভট্টাচার্যের৷‌

মেদিনীপুরের জেলাশাসক বার্জ সাহেবকে হত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রামকৃষ্ণ রায়৷‌ বলা যায়, এই ঘটনার নেতৃত্ব ছিল তাঁরই হাতে৷‌ বিচারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়৷‌ অবশেষে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি হয় রামকৃষ্ণ রায়ের৷‌

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর৷‌ বাবা সুধীন্দ্রনাথ৷‌ স্বপ্ন দেখতেন অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করার৷‌ কিন্তু দেশবাসীর গঞ্জনা ঘুরিয়ে দেয় তাঁর সেই লক্ষ্যের দিক৷‌ ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতার যুদ্ধে৷‌ অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন৷‌ দেশের বাইরে থেকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে চালিত করার লক্ষ্যে ১৯২৭ সালে ইউরোপ যাত্রা করেন৷‌ এক সময় সৌমেন্দ্রনাথ, মুজফ‍্ফর আহমেদ এবং নজরুল ইসলাম একসঙ্গে স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন৷‌ স্বাধীন ভারতে সৌম্যেন্দ্রনাথের হাতেই প্রতিষ্ঠা পায় বৈতানিক এবং টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট৷‌

বিপ্লবী যুগান্তর দলের অন্যতম নেতা ছিলেন ভূপেন্দ্রকুমার দত্ত৷‌ যুক্ত ছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও৷‌ বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানি করে এদেশে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের যে প্রস্তুতি যুগান্তর দল নিয়েছিল, সেই কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন ভূপেন্দ্রনাথ৷‌ বালেশ্বরে, বুড়িবালামের তীরে যে যুদ্ধ হয়, তাতেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল তাঁর৷‌ ১৯১৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিলাসপুর জেলে একটানা ৭৮ দিন অনশন করেছিলেন৷‌ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্বরাজ্য পার্টির সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল প্রবল৷‌ ১৯২৩ সালে পুনরায় গ্রেপ্তার হন এবং তাঁকে বন্দী করে রাখা হয় ব্রহ্মদেশে৷‌ কিন্তু জেলে থাকাকালীন অন্য বন্দীদের স্বদেশ ব্রতে দীক্ষিত করে কারাগারেই আন্দোলন শুরু করেন৷‌ তাঁর লেখা ‘ধন্য চট্টগ্রাম’ ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং টানা ৮ বছর জেলের অন্ধকূপে অমানুষিক অত্যাচার করা হয় ভূপেন্দ্রনাথকে৷‌

এরকমই কত তাজা প্রাণের বিনিময়ে এসেছে আমাদের আজকের স্বাধীনতা৷‌ যাঁদের স্মরণ করা হল, তাঁদের বাইরেও থেকে গেলেন হাজার হাজার নাম জানা বা অজানা স্বাধীনতার পুরোহিতরা৷‌ যাঁদের পুজোর পুণ্যে আমাদের আজকের এই ‘সবাই রাজা’র স্বপ্নফসল৷‌

গুরুত্বপূর্ণ এই নিবন্ধটি লিখেছেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ব্রিটিশবিরোধী সেই বিপ্লবীরা!

  1. ভাই সাম্যবাদী , বুঝতে পারছি
    ভাই সাম্যবাদী , বুঝতে পারছি না, লেখাটি অাপনার নাকি লোপামুদ্রা ভৌমিকের। উপরে বলছেন লেখাটি আপনি লিখেছেন অার নিচে রয়েছে লোপমুদ্রার নাম। যাইহোক এই জটিলতার অবোধ্যতা হয়তো আমারই ব্যর্থতা।
    ব্রিটিশ-বিরোধী অান্দোলনে নাম না জানা কিছু বাঙালি বিপ্লবীদের নিয়ে লিখেছেন সেজন্য সাধুবাদ জানাই। কিন্ত লেখকের কি একবারও মনে ‘খোচা‘ দেয়নি বা উদয় হয়নি, যে হিন্দু ছাড়া অন্যান্য ধর্মেরও কিছু লোক সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। আপনি লিখেছেন হেমন্ত, অনন্ত, প্রদ্যোত, ভবানী, রামকৃষ্ঞ, সৌমেন্দ্রের বিপ্লবী কর্মকান্ডের কথা । সৌমেন্দ্র প্রসঙ্গে ‘ইন পাসিং‘ মুজাফফর আহমদ আর নজরুলকেে উল্লেখ করেছেন সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্ত যেসব বিপ্লবীদের নিয়ে লিখেছেন, তাদের সবাই একটি বিশেষ ধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করে। এটা কী মৌলবাদ নয়, প্রক্রিয়াশীলতা নয়? এ্কই ধরনের অজ্ঞাত অবহেলিত মুসলমান বিপ্লবী কী বাংলায় নেই? অাপনি বলতে চাইছেন, শুধ হিন্দু বিপ্লবীরাই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছে? এতে দোষের কিছু নেই , এটা হতে পারে, নানা কারণে।
    অন্যদিকে মুসলমান কোন লেখক একই ধরনের লেখা লেখলে তাকে মৌলবাদী, ডানপন্হী, প্রতিক্রিয়াশীল ইত্যাদি বলে গালি দেয়া হবে -নি:সন্দেহে, ছোটবেলা থেকেই তা অবলোকন করে আসছি! কিন্ত ‘মৌলবাদ, প্রতিক্রিয়াশীলতা‘ মুসলমানদের মৌরসী সম্পত্তি নয় – অাশা করি অাপনার এই লেখা দিয়ে তা বুঝতে পারছেন? কিছুটা কি বুঝতে পারছেন, কেন ফরহাদ মজহারের মত লোকরা বলে যে, সূর্যসেনদের কথা বেশী বেশী বলা হয়, তিতুমীরদের উপেক্ষা করা হয়? আমি এটাকে ঠিক উপেক্ষা বলিনা, বিশেষ করে বাংলাদেশে (পশ্চিমবঙ্গেরটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না), কিছু মানুষ তিতুমীরদের স্মরন করার চেষ্টা করে। তার নামে দু‘একটা প্রতিষ্টানও আছে। তবে নি:সন্দেহে তিতুমীরদের নাম এই বাংলাদেশেরই মেইনস্ট্রীম মাধ্যমে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা হয়, সাম্যবাদের এই পোস্টটাই তার অকাট্য প্রমাণ। কী বলেন? কেউ সাম্যবাদের নামে মৌলবাদ চালিয়ে দেয়, অার কেউ সাম্যবাদী হলেও তাঁকে মৌলবাদী বলে গালি দেয়া হয় !! সত্যি সেলুকাস !!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

31 + = 33