১৪ আমলাকে পুরস্কার দিতে ঢাকাবাসীর ৮০০ কোটি টাকা গচ্চা

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। নবনির্বাচিত মেয়ররা নির্বাচনী বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে যোগ দিয়েছেন নগর ভবনে। কিন্তু এর আগে সেখানে দায়িত্ব পালন করে গেছেন ১৪ জন আমলা। যারা সকলেই ছিলেন সরকারের ঘনিষ্ঠ। সিটি করপোরেশনে নিয়োগ পেয়েছিলেন পুরস্কারস্বরূপ। এসেছিলেন রাতারাতি লাল হয়ে যাওয়ার স্বপ্নে। করেছেনও তাই। মাত্র তিন বছরে লাভের ধারায় থাকা দুই সিটি করপোরেশনে লালবাত্তি জ্বালিয়ে দিয়েছেন তারা। লাগামহীন এই দুর্নীতির ফলাফল হচ্ছে ঢাকাবাসী জনগণের ৮০০ কোটি টাকা গচ্চা।

প্রশাসক আমলে নিয়োগ পাওয়া অতিরিক্ত সচিবদের জন্য এই পদটি ছিল পুরস্কারস্বরূপ। সরকারের আস্থাভাজনরাই এই পদে নিয়োগ পেত। আর এই পদে নিয়োগ পাওয়ার অর্থই ছিল, রাতারাতি লাল হয়ে যাওয়া। এর আগে যখন ২০১১ সালে বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা মেয়রের পদ থেকে বিদায় নেন তখনও করপোরেশন লাভে ছিল। কিন্তু প্রশাসকদের অবাধ দুর্নীতির ফলে লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র তিন বছরে শত শত কোটি টাকার দেনার মধ্যে পড়ল!

২০১১ সালে মেয়র খোকার আমলে উদ্বৃত্ত ছিল ৩০০ কোটি টাকা। দক্ষিণে এখন দেনা ৫০০ কোটি টাকা, আগের উদ্বৃত্ত পেয়েছিল ১৫০ কোটি টাকা। সাড়ে তিন বছরের প্রশাসক আমলে দক্ষিণে প্রতি মাসে ঘাটতি হয় ১৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। দুই করপোরেশন মিলে এর পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা।

অনির্বাচিত যেসব প্রশাসকের আমলে অবাধ দুর্নীতি হয়েছে, করপোরেশন থেকে ফিরে তারা এখনও সরকারের বড় বড় পদে আসীন। এক প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তিনি এখন সবেতন ছুটিতে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই প্রশাসক পদ সৃষ্টি হয়। সিটি করপোরেশন বিভাজনে সরকারি দলের লোক ছাড়া নাগরিকরা কোনো সুফল পাননি।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের দাবি, মেয়র প্রার্থীদের নির্বাচনের আগেই সম্পদের হিসাব দিতে হয়। সাবেক প্রশাসকদেরও সম্পদের হিসাব নিতে হবে। কিন্তু কে করবে তা। সরকার বরং তাদের অনেকের পদোন্নতি ঘটিয়েছে। বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে আমলা দিয়ে করপোরেশন চালালে এমনটা ঘটতে বাধ্য। তাই বিষয়টি সরকারের অনুধাবন করা দরকার এবং অন্ধকার আমলের দায় থেকে দুই করপোরেশনকে মুক্ত করা দরকার। যদিও আশঙ্কাটা থেকেই যাচ্ছে, এই দায় কেউ নিবেন কি!

প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়ে আসলে যে সরকার তার অনুগত আমলাদের পুরস্কার দিচ্ছিল এর প্রমাণ পাওয়া যায় দুটি নিয়োগের ক্ষেত্রে। ২৯ মে, ২০১৩ স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) অশোক মাধব রায়কে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের একান্ত সচিবেরও দায়িত্ব পালন করবেন বলে তখন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়। আইন অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়োগকর্তা হলেও স্থানীয় সরকার বিভাগ জোর করেই এ নিয়োগ দেয়। আইনি জটিলতার সমাধান না পেয়ে শেষে পাঁচদিন পর এই দুজনের নিয়োগের সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, প্রশাসক পদটা ছিল আমলাদের জন্য পুরস্কারস্বরূপ।

দক্ষিণের প্রথম ও বড় প্রশাসক খলিলুর রহমানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুদক মামলা করেছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেই, তিনি এখন সবেতন ছুটিতে আছেন। দক্ষিণ নগর ভবনে খলিলের পরে প্রশাসক হয়ে আসেন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিল্লার রহমান। ২০১২ সালের নভেম্বরে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে দুই ধাপে ৩০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন অভিযোগ ওঠে, ওই দরপত্র আহ্বানের মধ্য দিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তারা ১০ শতাংশ কমিশন আদায় করে কাজগুলোর অনুমোদন দিয়েছেন।

২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রশাসক ইব্রাহিম হোসেন খানের মেয়াদ শেষ হলে ওই দিন সকালেই তিনি ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন। তারপর ওই দিনই সন্ধ্যায় নগর ভবনে ফিরে পেছনের তারিখ দিয়ে তিনি চেক ইস্যু, পদোন্নতিসহ কিছু ফাইলে স্বাক্ষর করেন, যা নিয়মের লঙ্ঘন।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা উত্তরের প্রশাসক ফারুক জলিল এবং দক্ষিণের প্রশাসক মো. ইব্রাহিম হোসেন খান তাদের মেয়াদের ৬ মাসই আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে ব্যাপক লোক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বদলির নামে গণহারে বাণিজ্যের নজির স্থাপন করেন। ২ প্রশাসকই পদোন্নতি এবং বদলি বাণিজ্যে সফল হয়েছেন। এগুলো তো কিছু খন্ড উদাহরণ, বাস্তবে লাগামহীন চলেছে লুটপাট।

দুর্নীতির তোড়ে এমনকি প্রশাসক আমল শেষের কয়েক মাস আগেই দক্ষিণ করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির লাগাম টানতে সংস্থাটির ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। বিধান করা হয় মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এবং টাকার ব্যবস্থা না করে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। এ ছাড়া বরাদ্দ সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে আগেই মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

পরিষ্কার বোঝা যায়, দুর্নীতির পারদ কতটা চড়া হয়েছিল! উত্তরে অবস্থা কিছুটা ভালো থাকলেও দক্ষিণের অবস্থা দাঁড়ায় ভয়াবহ। প্রশাসক নিয়োগের অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ঘুষ, দুর্নীতি আর অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার মাত্রা বাড়তে বাড়তে নাগরিক সেবার মান হারাতে বসে। তখন নাগরিকরা তাদের সেবা দানকারী দুটি করপোরেশনের নাম পাল্টে ‘সিটি করাপশন’ উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু নানা অভিযোগও কোনো কাজে আসেনি। কর্মকর্তাদের কোনো প্রকার জবাবদিহিতা না থাকায় একের পর এক চলতে থাকে দুর্নীতি আর লুটপাটের রাজত্ব।

প্রশাসকরা সকলেই ছিলেন ক্ষমতাবান। তাদের ক্ষমতার বৃত্ত বুঝতে এখানে নাম ও কে কোথায় আছেন, সেই তালিকাটা তুলে দিচ্ছি। প্রথমে উত্তর, পরে দক্ষিণ।

প্রশাসকের নাম—–বিদায়—–বর্তমান অবস্থা
রাখালচন্দ্র বর্মণ—–৬ মে, ১৫—–অতি. সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় #
ফারুক জলিল—–১০ ডিসে, ১৪—–অতি. সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ
আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার—–১৮ মে, ১৪—–অতি. সচিব, ওএসডি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
আকতার হোসেন ভূঁইয়া—–২৩ নভে, ১৩—–অতি. সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় #
মাহমুদ রেজা—–২ জুন, ১৩—–অতি. সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় #
শাহজাহান আলী মোল্লা—–২৬ নভে, ১২—–সচিব, সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়*
খোরশেদ আলম চৌধুরী—–৩১ মে, ১২—–সচিব, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়*

শওকত মোস্তফা—–৬ মে, ১৫—–অতি. সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়
ইব্রাহিম হোসেন খান—–১০ ডিসে, ১৪—–অতি. সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
মো. আলমগীর—–১৬ জুন, ১৪—–মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর #
নজমুল ইসলাম—–২৪ নভে, ১৩—–অতি. সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়
নজরুল ইসলাম—–২ জুন, ১৩—–চেয়ারম্যান, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ #
জিল্লার রহমান—–২৬ নভে, ১২—–কমিশনার, ঢাকা বিভাগ*
খলিলুর রহমান—–৩১ মে, ১২—–অতি. সচিব, ওএসডি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

এই ভাগ্যবানদের উদর পূর্তির নিমিত্তেই গচ্চা গেছে জনগণের ৮০০ কোটী টাকা। কেউ কেউ পুনঃপুরস্কৃত হয়েছেন। আগামীতে তাদের দুর্নীতির আরো খবর নিয়ে আসব। প্রথম দুই প্রশাসক যোগদান করেন ৩ ডিসেম্বর, ২০১১ তারিখে। এরপর ক্রমান্বয়ে একজনের বিদায়ের তারিখে অন্যজন যোগদান করেন। যোগদানের এবং বিদায়ের সময় প্রত্যেক প্রশাসকেরই পদমর্যাদা ছিল অতিরিক্ত সচিব। যাদের পদোন্নতি হয়েছে তাদের নামের পাশে তারকাচিহ্ন। আর মর্যাদা বৃদ্ধিপ্রাপ্তদের নামের পাশে দেয়া হ্যাশ। পাঠকদের আহবান জনসম্পদ লুটকারী এই আওয়ামী আমলাচক্রকে চিনে রাখুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “১৪ আমলাকে পুরস্কার দিতে ঢাকাবাসীর ৮০০ কোটি টাকা গচ্চা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 48 = 52