বেইজিং-দিল্লী মুদ্রা যুদ্ধ শুরু?

মুদ্রা যুদ্ধ (কারেন্সি ওয়ারস) প্রতিশব্দটি বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। ব্রাজিলীয় অর্থমন্ত্রী গিদো ম্যানটেগা ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরকারের মধ্যে চলা মুদ্রার মান কমিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়ার চেষ্টাকে সর্বপ্রথম ‘মুদ্রাযুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। একই বিতর্ক আবার উঠেছে। তবে সেই যুদ্ধের ফ্রন্ট এবার বেইজিং-ওয়াশিংটন থেকে সরে বেইজিং-দিল্লী সীমান্তে চলে এসেছে।

ব্যয় বাড়িয়ে এবং ব্যাংক রেট শূন্যের পর্যায়ে নামিয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে ও মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটানো হয়। এক দেশের মুদ্রার এই অবমূল্যায়নের ফলে- আর সেটা যদি হয় ডলার বা ইয়েন, যা দ্বারা অন্যান্য মুদ্রার মান ঠিক হয় বা যে মুদ্রায় বড় অরথনীতির রাষ্ট্রগুলো বেশি লেনদেন করে, তার অবমূল্যায়ন ঘটলে- অন্য দেশের মুদ্রাগুলোর মুদ্রামান তুলনামূলক বেড়ে যায়। এ কারণে সেসব দেশের প্রাথমিক পণ্যসামগ্রী যথা তেল, তামা ও লৌহের দাম বেড়ে যায়। এতে দেশগুলো প্রতিযোগিতামূলক বৈদেশিক বাণিজ্যে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথতর হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি বেইজিং নানা কৌশলে প্রায় তিনদফা তাদের মুদ্রার মান কমিয়েছে। রপ্তানি নির্ভর শিল্পকে চাঙ্গা করতে ১৩ আগস্ট, ২০১৫ তৃতীয়বারের জন্য মুদ্রার দাম কমিয়েছে চীন। এর ফলে বিশ্ব বাজারে চীনা পণ্য আরও সস্তা হবে। ইয়েনের দাম ১.১১ শতাংশ কমিয়েছে বেইজিং। এর ফলে ইয়েনের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে এক ডলারে ৬.৪০১০। আর তাতেই অশনি সঙ্কেত দেখতে শুরু করেছে প্রতিযোগী দেশগুলি। আর এটাকে তো সরাসরি আক্রমণ হিসেবে দেখছে দিল্লী।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, চীনা মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে রপ্তানি কমে যাওয়ার ভয়ে অন্যান্য দেশও তাদের দেশের মুদ্রার দাম কমাতে বাধ্য হবে। আর এর মাধ্যমেই শুরু হয়ে যাবে অঘোষিত মুদ্রা যুদ্ধ। ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করেন, বৈদেশিক বাজারে চীন তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও ব্রাজিলকে দুর্বল করতেই এবার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে আবার মার্কিন বলয় থেকে বেরিয়ে ব্রিকস ব্যাংকের মাধ্যমে যে নতুন অর্থনৈতিক বলয় সৃষ্টির চেষ্টা চলমান, তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন কেউ কেউ।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদরা সরকারকে দ্রুত করণীয় ঠিক করতে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা কিছু পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছেন। বাজার বিশ্লেষণ করে তারা দেখিয়েছেন, ইয়েনের অবমূল্যায়নের ফলে ভারতীয় রুপির দামও পাল্লা দিয়ে কমছে। বৃহস্পতিবার ডলার প্রতি রুপির দাম কমে দাঁড়িয়েছে ৬৫–তে। ২০১৩ সালের পর যা সর্বনিম্ন। এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ভারতীয় অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মুদ্রার দাম কমে যাওয়ায় ভারতের অর্থনীততে বিরূপ প্রভাব পড়তে চলেছে। কেননা ভারত রপ্তানির থেকে আমদানি করে বেশী। তাই অচিরেই খনিজ তেলের মতো পণ্যের দাম বাড়তে পারে। নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

তবে চীন এই যুদ্ধের প্রথম ধাপে জয় পেয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চীনের অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভাল নয়। আর্থিক প্রগতির হার কমতে শুরু করেছে। তাই ইয়েনের অবমূল্যায়নের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে বেজিং। সুফলও মিলেছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের শেয়ার বাজার টালমাটাল হলেও চীনের শেয়ার সূচক সাংহাই ইনডেক্স এ দিন.৭৪ শতাংশ বেড়েছে। এখন অপেক্ষার পালা, ভারতীয়রা এর বিপরীতে তাদের ঝোলা থেকে কেমন সঙ্গীন বের করে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “বেইজিং-দিল্লী মুদ্রা যুদ্ধ শুরু?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3