মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদ : লেনিন

এই প্রবন্ধটি কমরেড লেনিন লিখেছিলেন ৩ এপ্রিল, ১৯০৮ তারিখে। আকারে ক্ষুদ্র হলেও তাত্ত্বিক ভিত্তির বিবেচনায় রচনাটির গুরুত্ব অসীম। এই প্রবন্ধটির বিস্তারিত আলোচনা করতে লেনিন ‘বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা’ নামে একটি সুবিশাল বই লিখেছেন। যাতে মার্কসবাদী নীতিমালার সারবস্তু কি, এর বিকাশের শর্তগুলো কি, তা পরিস্কার হয়েছে। বিপ্লবী রাজনীতিতে আগ্রহীদের অবশ্যই এই রচনাটি অনুসরণ করা উচিত। বর্তমান প্রবন্ধটির সূত্র ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্সের অক্টোবর, ২০০৬ সালের প্রকাশনা। অনুবাদ করেছেন সেরাজুল আনোয়ার। তিনি নিয়েছেন লেনিন রচনা সংকলন, ১৫ খণ্ড, ইং সংস্করণ, ১৯৬৩ থেকে।

একটা সুবিদিত উক্তি আছে যে, জ্যামিতি শাস্ত্রের স্বতঃসিদ্ধ সত্যগুলি যদি মানুষের স্বার্থকে আঘাত করতো, তাহলে সেগুলিকে খণ্ডন করার জন্যও নিশ্চিতই প্রচেষ্টা নেয়া হতো। প্রকৃতি বিজ্ঞানের যে তত্ত্বগুলি ধর্মশাস্ত্রের পুরানো কুসংস্কারগুলোর সাথে সংঘাত সৃষ্টি করে তা অত্যন্ত ক্ষিপ্ত সংগ্রামের উদ্রেক করেছিল, এবং এখনও তা করছে। সুতরাং এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই যে, যে-মার্কসীয় তত্ত্বমত আধুনিক সমাজের সবচেয়ে অগ্রবর্তী শ্রেণীকে আলোকিত ও সংগঠিত করার জন্য প্রত্যক্ষভাবে সেবা করছে, এই শ্রেণীর সম্মুখে উপস্থিত কর্তব্যকর্ম নির্দেশ করছে এবং (অর্থনৈতিক বিকাশের দরুন) এক নয়া ব্যবস্থার দ্বারা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার অনিবার্য প্রতিস্থাপন প্রতিপাদ্য করছে, সেই তত্ত্বমতকে তার বিকাশের গতিপথে প্রতি পদক্ষেপেই সংগ্রাম করে এগুতে হচ্ছে।

বুর্জোয়া বিজ্ঞান ও দর্শন সম্পর্কে বলার কোন প্রয়োজন নেই, যা পদাধিকারী অধ্যাপকেরা বিত্তবান শ্রেণীগুলোর উঠতি বংশদরদের নেশাগ্রস্ত করে রাখার জন্য এবং বিদেশী ও অভ্যন্তরীণ শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদের ‘প্রশিক্ষিত করে তোলার’ জন্য আনুষ্ঠানিক বিদ্যা দান করেন। এই বিজ্ঞান মার্কসবাদের এমন কি নামও শুনতে চাইবে না এবং ঘোষণা করবে যে, মার্কসবাদকে খণ্ডন করা হয়েছে এবং সম্পূর্ণ খতম করা হয়েছে। সমাজতন্ত্রকে খণ্ডন করেই যে নবীন পণ্ডিতরা তাদের পদপ্রতিষ্ঠা গড়ে তুলছে, আর সকল ধরণের জীর্ণ ‘চিন্তা-পদ্ধতির’ ঐতিহ্যকে রক্ষা করেছে যে-জরাগ্রস্ত বৃদ্ধরা, তারা সকলেই সমান উৎসাহ নিয়ে মার্কসকে আক্রমণ করে। মার্কসবাদের অগ্রগতি আর শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে তার ভাবধারার বিস্তার ও প্রতিষ্ঠা অর্জনের বাস্তব ঘটনা অবশ্যম্ভাবী রূপেই মার্কসবাদের উপর এই বুর্জোয়া আক্রমণের তৎপরতা ও তীব্রতাকে বাড়িয়ে তুলে, আর সরকারী বিজ্ঞান যতবারই মার্কসবাদকে ‘খতম করে দেয়’ ততবারই তা আরো শক্তিশালী, আরো মজবুত ও আরে তেজীয়ান হয়ে ওঠে।

কিন্তু এমনকি শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত তত্ত্বমতগুলির মধ্যে, এবং প্রধানত সর্বহারাশ্রেণীর মধ্যে বিরাজমান ধারাগুলোর মধ্যে, মার্কসবাদ কোনক্রমেই হঠাৎ করে তার অবস্থান সংহত করতে পারেনি। নিজ অস্তিত্বের প্রথম অর্ধশতকে (১৮৪০-এর দশক থেকে শুরু করে) মার্কসবাদকে নিয়োজিত থাকতে হয় তার প্রতি মৌলিকভাবে বৈরী-ভাবাপন্ন তত্ত্বসমূহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে মার্কস ও এঙ্গেলস র‍্যাডিকেল তরুণ হেগেলবাদীদের সাথে তাদের হিসেবে-নিকেশ চুকিয়ে ফেলেন, যাদের দৃষ্টিভঙ্গী ছিল দার্শনিক ভাববাদ। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে অর্থনৈতিক তত্ত্বমতের পরিমণ্ডলে, প্রুধোঁপন্থার (১) বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু হয়। পঞ্চাশের দশকে এই সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে, যে সংগ্রাম ছিল সেসব পার্টি ও তত্ত্বমতেরই সমালোচনা যেগুলো ১৮৪৮ সালের ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ বছরে নিজেদের প্রকাশ ঘটিয়েছিলো। ষাটের দশকে সাধারণ তত্ত্বের রাজ্য থেকে সংগ্রাম স্থানান্তরিত হয় প্রত্যক্ষ-শ্রমিক আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ পরিমণ্ডলে- বাকুনিনবাদকে (২) বিতাড়িতকরণে। সত্তরের দশকের শুরুতে জার্মানীর রঙ্গমঞ্চ অল্প সময়ের জন্য দখল করে প্রুধোঁবাদী মুলবার্গার এবং সত্তরের দশকের শেষদিকে প্রত্যক্ষবাদী ড্যুরিং। কিন্তু সর্বহারাশ্রেণীর উপর উভয়টির প্রভাব ছিল ইতোমধ্যেই চূড়ান্তভাবে নগণ্য। ইতোমধ্যেই অন্য সকল আদর্শের চাইতে শ্রমিক আন্দোলনে মার্কসবাদ তর্কাতীত বিজয় অর্জন করছিল।

নব্বই-এর দশক নাগাদ এই বিজয় মূলত সম্পূর্ণতা লাভ করে। এমনকি যে লাতিন ভাষাভাষি দেশগুলিতে প্রুধোঁবাদের ঐতিহ্য সবচেয়ে বেশী দিন মাটি আঁকড়ে পড়েছিল, সেখানেও শ্রমিক পার্টিগুলো প্রকৃতপক্ষে তাদের কর্মসূচী ও রণকৌশল মার্কসবাদী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। নির্দিষ্ট সময় অন্তর আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের আকারে, শ্রমিক আন্দোলনের পুনরুজ্জীবিত আন্তর্জাতিক সংস্থা শুরু থেকেই, আর প্রায় কোন রকম সংগ্রাম ছাড়াই, সমস্ত মূল বিষয়ে মার্কসবাদী দৃষ্টি ভঙ্গী গ্রহণ করে। কিন্তু কমবেশী সুসংবদ্ধ অন্যসব বিরোধী তত্ত্বমত মার্কসবাদ কর্তৃক বিতাড়িত হওয়ার পর, এসব তত্ত্বমতে অভিব্যক্ত ঝোঁকগুলো অন্য ধারায় আত্মপ্রকাশের পথ খুঁজতে শুরু করে। সংগ্রামের রূপ ও কারণগুলো বদলে যায়, কিন্তু সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। আর মার্কসবাদের অস্তিত্বের পরবর্তী অর্ধ-শতাব্দী শুরু হয় (নব্বই-এর দশকে) মার্কসবাদের খোদ অভ্যন্তরেই মার্কসবাদবিরোধী এক ঝোঁকের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

এককালের গোঁড়া মার্কসবাদী বার্নস্টাইন সবচেয়ে বেশী হৈ-হল্লা সহকারে এবং মার্কসকে সংশাধনের সবচেয়ে পুর্ণাঙ্গ অভিব্যাক্তি সমেত অগ্রসর হয়ে এই ঝোঁকের নাম প্রদান করেন- মার্কসের সংশোধন, সংশোধনবাদ (৩)। এমনকি রাশিয়াতে- দেশের অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা আর ভূমিদাস-প্রথার অবশেষের দ্বারা নিপীড়িত কৃষক জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে- অমার্কসবাদী সমাজতন্ত্র স্বভাবতই সবচেয়ে বেশী সময় মাটি আঁকড়ে পড়েছিল, সেখানেও এই ঝোঁক আমাদের চোখের সামনেই সংশোধনবাদের দিকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে চলেছে। ভূমির প্রশ্ন- এই উভয় প্রশ্নেই আমাদের সামাজিক-নারদপন্থীরা (সোশ্যাল নারদনিকস) তাদের পুরানো চিন্তাপদ্ধতির মুমূর্ষ ও সেকেলে অবশেষের জন্য অধিক থেকে অধিক মাত্রায় মার্কসের ‘সংশোধন’ প্রতিস্থাপন করছে, যে চিন্তাপদ্ধতি ছিল নিজস্ব দিক থেকে সুসংবদ্ধ ও মৌলিকভাবেই মার্কসবাদের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন।

প্রাক-মার্কসবাদী সমাজতন্ত্র পরাজিত হয়েছে। এই সমাজতন্ত্র এখন তার নিজস্ব স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সংগ্রাম অব্যাহত রাখছে না, বরং তা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কসবাদের সাধারণ ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে- সংশোধনবাদ হিসেবে। তাহলে চলুন, সংশোধনবাদের আদর্শগত সারবস্তুকে পরীক্ষা করে দেখা যাক।

দর্শনের রাজ্যে সংশোধনবাদ অনুসরণ করেছিল বুর্জোয়া অধ্যাপকীয় ‘বিজ্ঞানের’ পিছু পিছু। অধ্যাপকরা ‘কান্টের মতামতে ফিরে’ যায়Ñ আর সংশোধনবাদ নয়া কান্টবাদকে (৪) অনুসরণ করে; দার্শনিক বস্তুবাদের বিরুদ্ধে পাদ্রীরা হাজারো বার যে নীরস মামুলী মন্তব্য করেছে, অধ্যাপকরা তারই পুনরাবৃত্তি করে- আর সংশোধনবাদীরা, প্রসন্ন চিত্তের হাসি হেসে, (সর্বশেষ হ্যান্ডবুক থেকে অক্ষরে অক্ষরে) আমতা আমতা করে বলে যে, বহু পূর্বেই বস্তুবাদকে ‘খণ্ডন’ করা হযেছে। অধ্যাপকরা হেগেলকে ‘মৃত কুকুর’ বলে গণ্য, করে এবং যদিও তারা নিজেরাই ভাববাদ প্রচার করেছিল, এমন ভাববাদ যা হেগেলের চেয়েও হাজার গুণ বেশী তুচ্ছ ও গতানুগতিক, তথাপি তারাই দ্বন্দ্বতত্ত্বের প্রতি ঘৃণায় ঘাড় নেড়েছিল- আর সংশোধনবাদীরা ‘সরল’ (আর প্রশান্ত) ‘বিবর্তনবাদের’ দ্বারা ‘কুশলী’ (আর বিপ্লবী) দ্বন্দ্বতত্ত্বকে প্রতিস্থাপিত করে বিজ্ঞানের দার্শনিক বিকৃতির জলাভূমিতে তাদেরকে অনুকরণের হাস্যকর চেষ্টা করেছিল। আধিপত্যশীল মধ্যযুগীয় দর্শনের (অর্থাৎ ধর্মতত্ত্বে) সাথে উভয়ত নিজেদের ভাববাদী ও ‘সমালোচনামূলক’ চিন্তাপদ্ধতিকে সমন্বিত করে অধ্যাপকরা তাদের সরাকারী বেতন ভাতা ভোগ করছিল- আর আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়, বরং অগ্রগামী শ্রেণীর পার্টির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, ধর্মকে এক ‘ব্যক্তিগত ব্যাপারে’ পরিণত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে সংশোধনবাদীরা তাদের খুব কাছে গিয়ে ভিড়েছিল।

শ্রেণী দৃষ্টিকোণের দিক থেকে মার্কসের এরূপ ‘সংশোধনের’ অর্থ কী ছিল তা উল্লেখ করার প্রয়োজ নেই; সেটা স্বতঃপ্রমাণিত। আমরা কেবলামাত্র এটুকুই উল্লেখ করবো যে, আন্তর্জাতিক সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক অন্দোলনের ক্ষেত্রে সংশোধনবাদীদের অবিশ্বাস্য গতানুগতিক বক্তব্যগুলিকে সঙ্গতিপূর্ণ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের অবস্থান থেকে একমাত্র যে-মার্কসবাদী সমালোচনা করেছিলেন তিনি হলেন প্লেখানভ। এটা আরো জোরের সাথে গুরুত্ব দিয়ে বলতে হবে এই কারণে যে, বর্তমান সময়ে প্লেখানভের কৌশলগত সুবিধাবাদের সমালোচনার ছদ্মাবরণে পুরানো ও প্রতিক্রিয়াশীল দার্শনিক জঞ্জালকে চালান করে দেয়ার সুগভীরভাবে ভ্রান্ত প্রয়াস নেয়া হচ্ছে।***

রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের দিকে চোখ ফেরালে সর্বপ্রথম এটাই নজরে পড়বে যে এই ক্ষেত্রে সংশোধনবাদীদের ‘সংশোনগুলি’ ছিল আরো অনেক বেশী সহজবোধ্য ও আনুষঙ্গিক; ‘অর্থনৈতিক বিকাশের নতুন উপাত্ত’ উল্লেখ করে জনসাধারণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এটা বলা হয়েছিল যে বৃহদায়তন উৎপাদন দ্বারা ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন ও উচ্ছেদ কৃষির ক্ষেত্রে মোটেই সংঘটিত হয় না, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে তা অগ্রসর হয় অত্যন্ত ধীর গতিতে। এরূপ বলা হয়েছিল যে, সংকট এখন বিরল ও দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর কার্টেল ট্রাস্ট সম্ভবত সেগুলিকে সামগ্রিকভাবে দূরীভূত করায় পুঁজিকে সমর্থ করে তুলবে। এরকম বলা হয়েছিল যে, শ্রেণীবৈরিতা কমে যাওয়ার ও তীব্রতা হ্রাসের প্রবণতার কারণে, পুঁজিবাদ যে পতনের দিকে এগুচ্ছে সেই ‘পতনের তত্ত্ব’ ত্রুটিপূর্ণ। সর্বশেষে, এটা বলা হলো যে, বোম বাভের্কের (৫) অভিমত অনুসরণ করে মূল্য সম্পর্কিত মার্কসের তত্ত্বকেও সংশোধন করা ভ্রান্ত হবে না।

বিশ বছর পূর্বে ড্যুরিং-এর সাথে এঙ্গেলসের বিতর্ক যেমনটা করেছিল, তেমনি এসব প্রশ্নে সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে তত্ত্বগত চিন্তার ফলপ্রসু পুনরুজ্জীবনকে উপস্থিত করালো। তথ্য ও পরিসংখ্যানের সহায়তায় সংশোধনবাদীদের যুক্তিগুলোকে বিশ্লেষণ করা হলো। এটা প্রমাণ করা হলো যে, সংশোধনবাদীরা পদ্ধতিগতভাবেই আধুনিক ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনের এক সুশোভিত চিত্র অঙ্কনেরই চেষ্টা করেছিল। কেবলমাত্র শিল্পেই নয়, বরং কৃষিতেও ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনের চেয়ে বৃহদায়তন উৎপাদনের যে কারিগরী ও বাণিজ্যিক উৎকৃষ্টতা রয়েছে তা অখণ্ডনীয় তথ্যের দ্বারা সপ্রমাণ করা হলো। কিন্তু কৃষিতে পণ্য উৎপাদন ঢের বেশী কম বিকশিত, আর আধুনিক পরিসংখ্যানবিদ ও অর্থনীতিবিদরা, রীতিমাফিক, কৃষির ক্ষেত্রে বিশেষ শাখাগুলিকে (কোন কোন সময় এমনকি কৃষিকার্য প্রণালীকেও) বেছে নেয়ার দিক থেকে খুব একটা দক্ষ নয়, যা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির বিনিময় প্রক্রিয়ার মধ্যে ক্রমেই কৃষিকে বেশি করে টানা হচ্ছে। ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদন নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে স্বাভাবিক অর্থনীতির ধ্বংসাবশেসের ওপর- টিকিয়ে রেখেছে পুষ্টির নিয়ত অবনতি, লাগাতার অনশন, শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করে, গবাদি পশুর গুণমান ও যত্নের অবনতি ঘটিয়ে, এক কথায়, যে যে পদ্ধতিতে হস্তশিল্প উৎপাদন পুঁজিবাদী কারখানা-উৎপাদনের বিরুদ্ধে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিল সেই সেই পদ্ধতিতেই ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদন আজ নিজেকে টিকিয়ে রাখছে। পুঁজিবাদী সমাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতিটি অগ্রগতি অনিবার্যরূপে ও বিরামহীনভাবে ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনের ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে দেয়; আর সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক-অর্থনীতির কর্তব্য হলো- সমস্ত রূপের দিক থেকেই এই প্রক্রিয়ার ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানো, যে রূপগুলি প্রায়শঃ জটিল ও সূক্ষ্ম, আর পুঁজিবাদী ব্যবস্থাধীনে নিজের টিকে থাকার অসম্ভাব্যতা, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাধীনে ক্ষুদে কৃষক চাষাবাদের নৈরাশ্যজনক অবস্থা ও কৃষকের পক্ষে সর্বহারাশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ক্ষুদে উৎপাদকদের সামনে তুলে ধরা। বৈজ্ঞানিক অর্থে, এই প্রশ্নে সংশোধনবাদীরা, একপেশেভাবে বাছাইকৃত তথ্যসমূহের ভিত্তিতে বাহ্যিক সাধারণীকরণ করে এবং, সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কোন উল্লেখ না করে অন্যায় করে; রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, তাদের অন্যায় হলো এ ঘটনার মধ্যে যে, তার চেয়েই থাকুক, আর নাই থাকুক, বিপ্লবী সর্বহারার দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করার আহ্বান না জানিয়ে তারা অনিবার্যরূপে কৃষকদেরকে আহ্বান বা উৎসাহ প্রদান করেছিল ক্ষুদে উৎপাদকের দৃষ্টিভঙ্গী (অর্থাৎ, বুর্জোয়াশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গী) গ্রহণ করতে।

সংকট (ক্রাইসিস) সম্পর্কিত তত্ত্ব ও পতন (কলাপস) সম্পর্কিত তত্ত্বের ব্যাপারে সংশোধনবাদের অবস্থান ছিল আরো নিকৃষ্ট। কয়েক বছরের শিল্প-উৎপাদনের হঠাৎ-বৃদ্ধি (ইন্ডাস্ট্রিয়াল বুম) ও সমৃদ্ধির প্রভাবে মার্কসীয় তত্ত্বমতের ভিত্তিমূলকে পুনর্গঠনের কথা নিছক স্বল্পতম সময়ের জন্য কিছু লোক চিন্তা করতে পারে- তাও যারা অত্যন্ত অদূরদর্শী। কিন্তু বাস্তবতা অতিদ্রুতই সংশোধনবাদীদের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকট করে দিল যে, সংকট অতীতের বস্তু হয়ে দাঁড়ায়নি- সমৃদ্ধির পরেই এসেছিল এক সংকট। কোন বিশেষ সংকটের রূপ, পূর্বাপরক্রম বা চিত্র বদলাতে পারে, কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এক অপরিহার্য উপাদন হিসাবে সংকট বিদ্যামান থাকে। উৎপাদনকে একত্রসংবদ্ধ করার সাথে সাথে, কার্টেল, ট্রাস্টগুলি, একই সময়ে ও সবার কাছে স্পষ্ট পন্থায়, উৎপাদনের নৈরাজ্য, সর্বহারাশ্রেণীর অস্তিত্বের নিরাপত্তাহীনতা আর পুঁজির নিপীড়নকে গভীরতর করে তুলেছিল, আর এভাবে নজীরবিহীন মাত্রায় শ্রেণী-বৈরিতাকে তীব্রতর করে তুলেছিল। স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট আর গোটা পুঁজিবাদী ব্যস্থার পরিপূর্ণ পতন- এই উভয় অর্থে পুঁজিবাদ যে পতনের দিকে এগিয়ে চলেছে তা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে, আর যথাযথভাবে নতুন দৈত্যাকারের ট্রাস্টগুলোর দ্বারা তা বিশেষভাবেই ব্যাপক আকারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যে আসন্ন শিল্প-সংকটের বহু লক্ষণই সুতীক্ষ্ণ হয়ে ওঠেছে তার কথা বাদ দিলেও আমেরিকার সাম্প্রতিক কারের আর্থিক সংকট এবং সমগ্র ইউরোপব্যাপী বেকারত্বের ভয়াবহ বৃদ্ধি- এইসব সমস্ত কিছুর ফলাফল হিসেবে সংশোধনবাদীদের সাম্প্রতিক ‘তত্ত্বগুলোকে’ সবাই ভুলে যাচ্ছে, এমনকি মনে হচ্ছে সংশোধনবাদীদের অনেকে নিজেরাও ভুলে যাচ্ছ। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের এই অস্থিরতা শ্রমিকশ্রেণীকে যে শিক্ষা দিয়েছে তা ভুলে গেলে চলবে না।

মূল্যতত্ত্ব (থিওরি অব ভ্যালু) সম্পর্কে বলতে গেলে, কেবল এইটুকুই বলা প্রয়োজন যে, বোম বাভের্কের ভঙ্গীতে, অত্যন্ত ইঙ্গিত ও দীর্ঘশ্বাস ছাড়া, সংশোধনবাদীরা এ ব্যাপারে চূড়ান্তভাবেই কোন অবদান রাখতে পারেনি, আর সেকারণে বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিকাশে কোনরূপ চিহ্নই তারা রাখতে পারেনি।

রাজনীতির ক্ষেত্রে, সংশোধনবাদ মার্কসবাদের ভিত্তিমূল, অর্থাৎ শ্রেণীসংগ্রামের তত্ত্বমতকেই, সংশোধন করার প্রকৃত চেষ্টা চালিয়েছিল। আমাদের বলা হয়েছিল- রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সর্বজনীন ভোটাধিকার অপসারিত করেছে শ্রেণীসংগ্রামের ভিত্তিকেই এবং শ্রমিকশ্রেণীর কোন দেশ নেইÑ কমিউনিস্ট ইশতেহারের এই পুরানো প্রস্তাবনাকে অসত্য প্রতিপন্ন করেছে। কারণ, তারা বলেছিলো, যেহেতু গণতন্ত্রে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা’ বিরাজমান থাকে, সেহেতু রাষ্ট্রাকে শ্রেণীশাসনের এক যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা যেমন চলবে না, তেমনি প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল, সামাজিক-সংস্কারবাদী বুর্জোয়াদের সাথে মৈত্রীকেও বর্জন করা চলবে না।

তর্কের কোন অবকাশ নেই যে, সংশোধনবাদীদের এসব যুক্তিতর্ক বেশ পরিমাণে সুসঙ্গত এক চিন্তা-পদ্ধতি, অর্থাৎ, পুরাতন ও সুবিদিত উদারনৈতিক বুর্জোয়া চিন্তাপদ্ধতি গঠন করেছিল। উদারনীতিকরা সব সময়ই বলে এসেছে যে বুর্জোয়া পার্লামেন্টবাদ শ্রেণী ও শ্রেণীপার্থক্যকে ধ্বংস করে দেয়, কারণ সকল নাগরিকই ভোটের অধিকার ও দেশর সরকারী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার পার্থক্যহীনভাবে ভোগ করে। এ ধরণের চিন্তাধারা কীরূপ অবাস্তব তা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্বের ইউরোপের গোটা ইতিহাস, আর বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের রুশ বিপ্লবের গোটা ইতিহাস সুস্পষ্টভাবে প্রদর্শন করছে।

‘গণতান্ত্রিক’ পুজিবাদের স্বাধীনতার অধীনে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পায় না বরং গভীরতর ও তীব্র হয়। পার্লামেন্টবাদ শ্রেণী-নিপীড়নের যন্ত্র হিসেবে এমনকি সবচেয়ে গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রের অন্তর্নিহিত চরিত্রকেও উদ্ঘাটন করে দেয়, তাকে দূরীভূত করে না। পূর্বে যত সংখ্যায় রাজনৈতিক ঘটনায় সক্রিয় অংশ গ্রহণ করতো তার চেয়ে অপরিমেয়রূপে ব্যাপকতর সংখ্যক জনগণকে সংগঠিত ও সচেতন করায় সাহায্য করলেও, পার্লামেন্টবাদ সংকট ও রাজনৈতিক বিপ্লবের বিলোপ ঘটায় না, বরং এরূপ বিপ্লবের সময় গৃহযুদ্ধের সর্বোচ্চ তীব্রতা দান করে। ১৮৭১ সালের বসন্তকালে প্যারির ঘটনাবলী (৬) এবং ১৯০৫ সালের শীতকালে রাশিয়ার ঘটনাবলী এই তীব্রতা কীরূপ অনিবার্যরূপে ঘটে তা দেখিয়েছে। ফরাসী বুর্জোয়াশ্রেণী এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে সর্বহারা বিপ্লবকে পিষে মারার উদ্দেশ্যে গোটা জাতির শত্রুর সাথে, যে বিদেশী সেনাবাহিনী তাদের দেশকে ধ্বংস করেছে তাদের সাথে আপোষ রফা করে। পার্লামেন্টবাদ ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অনিবার্য অভ্যন্তরীণ ‘ডায়ালেকটিস’ হলো তা পূর্বের তুলনায় ব্যাপক হিংসা প্রয়োগের দ্বারাই বিবাদ বিসম্বাদের অধিকতর তীক্ষ্ণ সাধানের দিকে চালিত করে, সেই ‘ডায়ালেকটিকস’ যিনি বুঝেন না তিনি এই পার্লামেন্টবাদের ভিত্তিতে এমন প্রচার-প্রোপাগাণ্ডা ও বিক্ষোভ পরিচালনা করতে সমর্থ হবেন না, যা নীতির দিক দিয়ে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এরূপ ‘বিসম্বাদের’ ক্ষেত্রে বিজয়মণ্ডিত অংশগ্রহণের জন্য শ্রমিকশ্রেণীকে প্রকৃতই প্রস্তুত করে। পাশ্চাত্যে সমাজ-সংস্কারবাদী উদারনীতিকদের সাথে এবং রুশ-বিপ্লবে উদারনৈতিক সংস্কারবাদীদের (কাদেত [৭]) সাথে মৈত্রী, চুক্তি ও জোট (আলায়েন্সেস, অ্যাগ্রিমেন্টস অ্যান্ড ব্লক্‌স্‌) গঠনের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে প্রদর্শন করছে যে, এসব চুক্তি কেবলমাত্র ব্যাপক জনগণের চেতনাকে ভোঁতাই করে, আর সংগ্রাম করতে সর্বাধিক অসমর্থ এবং সবচেয়ে দোদুল্যমান ও বিশ্বাসঘাতক লোকজনদের সাথে সংগ্রামী যোদ্ধাদের সংযোগ ঘটায়, সেগুলো তাদের সংগ্রামের প্রকৃত তাৎপর্যকে জোরদার করে না, বরং দুর্বলই করে। ব্যাপক অর্থাৎ প্রকৃতই জাতীয় পরিধিতে সংশোধনবাদী রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো ফ্রান্সের মিলেরাঁবাদ, (৮) যা সংশোধনবাদের এমন এক বাস্তব মূল্যায়ন উপস্থিত করেছে যা বিশ্বব্যাপী সর্বহারাশ্রেণী কখনোই ভুলবে না।

সংশোধনবাদের অর্থনৈতিক প্রবণতার এক স্বাভাবিক পরিপূরক হলো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গী। ‘আন্দোলনই সব, চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছু নয়’- বার্নস্টাইনের এই প্রচলিত বুলি বহু দীর্ঘ যুক্তিতর্কের চেয়ে সংশোধনবাদের সারবস্তুকে ভালোভাবেই তুলে ধরছে। একেক ঘটনায় একেক রকম আচরণ র্নিধারণ, দৈনন্দিন ঘটনাবলী আর ছোটখাট রাজনীতির টুকরো টুকরো পরিবর্তনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া, সর্বহারাশ্রেণীর মৌলিক স্বার্থ ও গোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এবং সমস্ত পুঁজিবাদী বিবর্তনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যাবলীকে ভুলে যাওয়া, ক্ষণিকের প্রকৃত কিংবা অনুমিত আশু সুবিধার জন্য মৌলিক স্বার্থকে বিসর্জন দেয়া- এগুলোই হচ্ছে সংশোধনবাদের কর্মনীতি। আর এই কর্মনীতির খোদ প্রকৃতি থেকে স্পষ্টত বেরিয়ে আসে যে, সংশোধনবাদ অসংখ্য বিচিত্র রূপ পরিগ্রহ করতে পারে, আর প্রত্যেকটি কমবেশী ‘নতুন’ প্রশ্ন, ঘটনাবলীর প্রতিটি কমবেশী অপ্রত্যাশিত ও অদৃষ্টপূর্ব মোড় পবিরর্তন-এমনকি যদিও তা কেবল নগণ্য মাত্রায় ও অত্যল্প সময়ের জন্য বিকাশের মৌলিক গতিপথের পরির্বতন ঘটায়Ñ তাহলেও তা অনিবার্যরূপে এক বা অন্য প্রকারের সংশোধনবাদের জন্ম সব সময় দিয়ে থাকে।

সংশোধনবাদের অনিবার্যতা নির্ধারিত হয় আধুনিক সমাজে তার শ্রেণীউৎস দ্বারা। সংশোধনবাদ এক আন্তর্জাতিক ব্যাপার। সবচেয়ে কম ওয়াকিবহাল কোন চিন্তাশীল সমাজতন্ত্রীর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকতে পারে না যে জার্মানীতে গোঁড়াপন্থী ও বার্নস্টাইনপন্থীদের মধ্যেকার, ফ্রান্সে গেদেবাদী (৯) ও জরেসবাদীদের ([১০] আর এখন বিশেষ করে ব্রুসবাদীদের) মধ্যেকার, গ্রেট বৃটেনে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশন ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টির (১১) মধ্যেকার, বেলজিয়ামে ব্রুকের ও ভান্দেরভেল্‌দবাদীদের মধ্যেকার, ইতালীতে ইন্ট্রিগ্যালিষ্ট (১২) ও সংস্কারবাদীদের মধ্যেকার, রাশিয়ায় বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যেকার সম্পর্ক হচ্ছে সর্বত্রই অপরিহার্যরূপে অভিন্ন, এসব সকল দেশে, বর্তমান বিরাজমান অবস্থায় জাতীয় শর্তাবস্থা আর ঐতিহাসিক উপাদানগুলির বিপুল বিচিত্রতা সত্ত্বেও। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যস্থিত ‘বিভক্তি’ এখন দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে একই লাইন ধরে অগ্রসর হচ্ছে, যা ত্রিশ বা চিল্লশ বছর আগের তুলনায় বিপুল অগ্রগতিই প্রমাণ করছে, যখন বিভিন্ন দেশে বিচিত্রমুখী ঝোঁকসমূহ একই আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে পরস্পর সংগ্রাম করছিল। আর লাতিন ভাষাভাষী দেশগুলিতে বিপ্লবী সিন্ডিক্যালবাদের (১৩) মধ্যে যে ‘বাম তরফের সংশোধনবাদের’ উদ্ভব ঘটেছে, তাও মার্কসবাদকে ‘সংশোধন’ করে নিয়ে মার্কসবাদের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে; ইতালীতে লাব্রিওলা আর ফ্রান্সে লার্গাদেল ভুলভাবে বোঝা মার্কস থেকে সঠিকভাবে বোঝা মার্কসকে প্রায়শই আবেদন জানাচ্ছেন।

আমরা এখানে এই সংশোধনবাদের আদর্শগত সারবস্তুকে বিশ্লেষণ করার জন্য থেমে থাকতে পারি না, যা সুবিধাবাদী-সংশোধনবাদ যে পরিমাণে বিকাশ লাভ করেছে সে পরিমাণে এখনও বিকাশ লাভ থেকে অনেক দূরেই রয়েছে; তা এখনও আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেনি, এবং তা একক কোন দেশেও এক সমাজতান্ত্রিক পার্টির সাথে একক বৃহৎ বাস্তব লড়াইয়ের পরীক্ষার সম্মুখীন হয়নি সুতরাং আমরা ‘ডান তরফের সংশোধনবাদের’ সমালোচনার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবো।

পুঁজিবাদী সমাজে কোথায় এর (ডান তরফের সংশোধনবাদ- অনুঃ) অনিবার্যতা নিহিত রয়েছে? জাতীয় বৈশিষ্ট্যের বিচিত্রতা ও পুঁজিবাদী বিকাশের মাত্রার ক্ষেত্রে পার্থক্যের চেয়েও তা কেন আরো গভীরে অবস্থান করে? এর কারণ প্রত্যেক পুঁজিবাদী দেশে, সর্বহারাশ্রেণীর পাশাপাশি, সব সময় রয়েছে পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণীর, ক্ষুদে-মালিকদের ব্যাপক স্তর। ক্ষুদে-উৎপাদন থেকেই পুঁজিবাদের উদ্ভব, আর প্রতিনিয়ত তার উদ্ভব ঘটছে। পুঁজিবাদ অনিবার্যরূপে পুনঃ পুনঃ সৃষ্টি করে এক পর্যায়ক্রমিক নতুন ‘মধ্যস্তর’ (বাইসাইকেল ও মটর গাড়ী শিল্প ইত্যাদির মতো বড় শিল্পের প্রয়োজন পূরণের জন্য সমস্ত দেশ জুড়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কারখানা, কুটির শিল্প, ছোট মেরামতখানার অনুষঙ্গ)। এসব নতুন ক্ষুদে-উৎপাদকরা একান্ত অনিবার্যরূপে পুনরায় সর্বহারাশ্রেণীর সারিতে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এটাই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক যে, ব্যাপকভিত্তিক শ্রমিক পার্টিগুলোর সারিতে পেটি-বুর্জোয়া বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গী বারবারই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এটাই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক যে, তা এ রকমই হবে এভং সবসময় তাই হতে থাকবে, সর্বহারা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নিয়তির পরিবর্তন ঘটার ঠিক পূর্ব পর্যন্তই হবে। কারণ এটা মনে করা হবে এক সুগভীর ভুল যে, এরূপ বিপ্লব সাধনের জন্য জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশের ‘পরিপূর্ণ’ সর্বহারাকরণ আবশ্যক। কেবলমাত্র আদর্শের রাজ্যে আমরা এখন যা প্রায়শ দেখতে পারছি, অর্থাৎ, মার্কসবাদের তত্ত্বগত সংশোধন নিয়ে বিরোধ; প্রয়োগের ক্ষেত্রে শ্রমিক-আন্দোলনের আলাদা আালাদা আংশিক সমস্যা নিয়ে, সংশোধনবাদীদের সাথে যা এখন কেবলমাত্র রণকৌশলগত মতপার্থক্য হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং তার ভিত্তিতে ভাঙন হচ্ছে- সেটাই আরো অতুলনীয়ভাবে বৃহৎ আকারে শ্রমিকশ্রেণী কর্তৃক নিশ্চিতই পরিদৃষ্ট হবে, যখন সর্বহার বিপ্লব সমস্ত বিরোধপূর্ণ বিষয়কে তীক্ষè করে তুলবে এবং জনগণের আচরণ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশু গুরুত্বের প্রশ্নাবলীতে সকল মতপার্থক্যকে কেন্দ্রীভূত করবে, আর যখন লড়াইয়ের উত্তাপের মধ্যে শত্রুর সাথে মিত্রের পার্থক্য নির্ণয় ও শত্রুকে মোক্ষম আঘাত হানার জন্য অবিশ্বস্ত মিত্রকে দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়া একান্ত আবশ্যকীয় করে তুলবে।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী মার্কসবাদের আয়োজিত আদর্শগত সংগ্রাম হলো সর্বহারাশ্রেণীর মহান বিপ্লবী লড়াইয়ের ভূমিকাস্বরূপ, যে লড়াই পেটি বুর্জোয়াশ্রেণীর সকল দোদুল্যমানতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও তার লক্ষ্যের পরিপূর্ণ বিজয়ের দিকেই সামনে এগিয়ে চলেছে।

*** দ্রষ্টব্য : বোগদানভ, বাজারভ ও অন্যদের লিখিত ‘মার্কসবাদী দর্শনের ওপর অধ্যয়ন’ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এই বই নিয়ে আলোচনার স্থান এটা নয়। এই মুহূর্তে একথা বলার মধ্য দিয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই যে, অদূর ভবিষ্যতে একটা ধারাবাহিক প্রবন্ধ বা একটা পৃথক পুস্তিকায় আমি সপ্রমাণ করব যে, নয়া কান্টবাদী সংশোধনবাদীদের সম্পর্কে যা কিছুই আমি মূলগ্রন্থে বলেছি, তা অপরিহার্যরূপেই এসব ‘নতুন’ নয়া হিউমবাদী ও নয়া বাকলেবাদীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দেখুন লেনিন রচনা সংকলন, খন্ড ১৪। এখানে দেয়া কথা অনুযায়ী লেনিন পরবর্তীতে লেখেন তার ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা’।

আলোচ্য তথ্যসূত্র : সংখ্যানুক্রমে উল্লেখ করা নোটগুলোতে তথ্যসূত্র নয়, আছে অনেকগুলো পাদটীকা। প্রুধোঁপন্থা থেকে শুরু করে সিন্ডিক্যালবাদ পর্যন্ত ১৩টি টীকা রয়েছে এখানে। সেগুলো দিলে লেখাটি বড় হয়ে যাবে বিধায় পৃথকভাবে তা উপস্থাপন করা হলো। এই লিঙ্কে গেলেই পাদটীকাগুলো দেখতে পাবেন- মতবাদ, মতাদর্শ ও ইতিহাস (১)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদ : লেনিন

  1. লেনিন রচনাবলীর খুব সামান্যই
    লেনিন রচনাবলীর খুব সামান্যই অনলাইনে পাওয়া যায়। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছি। সবাই এভাবে চিরায়ত মার্কসবাদী সাহিত্যগুলোকে অনলাইনে সুলভকরণে ভূমিকা রাখলে তা হবে একটা বিরাট কাজ। এই বিরাট যজ্ঞের সূচনার জন্য পোস্টদাতাকে তাই ধন্যবাদ।

    আরেকটা বিষয়, এই লেখাটা সম্পর্কে মার্কসবাদীদের মতামত চাই। লেখাটা পড়ে বলুন তো এই অনুবাদ দিয়ে কি আসলে শোধনবাদ বোঝা যায়? এর কি পুনঃঅনুবাদ দরকার, নাকি এ বিষয়ে অন্য কোনো যুৎসই লেখা আছে? আমার নিজের অবশ্য এ অনুবাদটি বিশেষ ভালো লাগেনি।

  2. চমৎকার উদ্যোগ। অনলাইনে
    চমৎকার উদ্যোগ। অনলাইনে মার্কসবাদী লেখা তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। এই উদ্যোগ যেন থেমে না যায়।

  3. এককালের গোঁড়া মার্কসবাদী

    এককালের গোঁড়া মার্কসবাদী বার্নস্টাইন সবচেয়ে বেশী হৈ-হল্লা সহকারে এবং মার্কসকে সংশাধনের সবচেয়ে পুর্ণাঙ্গ অভিব্যাক্তি সমেত অগ্রসর হয়ে এই ঝোঁকের নাম প্রদান করেন- মার্কসের সংশোধন, সংশোধনবাদ

    এই ইতিহাসটা জানা ছিল না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 3