মতবাদ, মতাদর্শ ও ইতিহাস (১)

মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদ : লেনিন” শীর্ষক ব্লগপোস্টে উল্লেখিত পাদটীকাগুলো ছিল বেশ বড় বড়। তাই পাদটীকা জুড়ে ওই লেখাটিকে অতিরিক্ত বড় করে ফেলতে চাইনি। প্রুধোঁপন্থা থেকে শুরু করে সিন্ডিক্যালবাদ পর্যন্ত ১৩টি টীকা রয়েছে এখানে। যা থেকে মতবাদ, মতাদর্শ ও সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যাবে। লেখাটি সিরিজ করলাম এজন্য যে, এর পরের মূল লেখাগুলোতে এভাবেই অনেক পাদটীকা আসবে। সেগুলোকে এই শিরোনামে ভিন্ন ভিন্ন পর্বে প্রকাশ করব। সবাইকে ধন্যবাদ।

 

১। প্রুধোঁপন্থী : পিয়েরে যোসেফ প্রুধোঁ (১৮০৯-১৮৬৫) ছিলেন ফরাসী পেটিবুর্জোয়া সমাজতন্ত্রী ও নৈরাজ্যবাদী, মার্কসবাদের বিরোধী এক অবৈজ্ঞানিক মতধারার তিনি ছিলেন প্রবর্তক। পেটিবুর্জোয়া শ্রেণী অবস্থান থেকে তিনি বৃহৎ পুঁজিবাদী মালিকানার সমালোচনা করতেন এবং ক্ষুদে ব্যক্তিমালিকানা চিরস্থায়ী করে রাখার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি ‘জনগণের ব্যাংক’ ও ‘বিনিময় ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন, এর সাহায্যে শ্রমিকেরা নাকি নিজস্ব উৎপাদনযন্ত্র সংগ্রহ করে হস্তশিল্পীতে পরিণত হবে এবং নিজ নিজ মালের ‘ন্যায্য’ বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করবে। সর্বহারাশ্রেণীর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও তাৎপর্য প্রুধোঁ উপলব্ধি করতে পারেননি, আর তাই শ্রেণীসংগ্রাম, সর্বহারা বিপ্লব ও সর্বহারা একনায়কত্বের প্রতি তিনি এক নেতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করেন। নৈরাজ্যবাদী হিসেবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনকেও তিনি অস্বীকার করেন। প্রথম আন্তর্জাতিকে প্রুধোঁপন্থীরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে এবং মার্কস ও এঙ্গেলস সে চেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ়বদ্ধ সংগ্রাম চালান। মার্কস তাঁর ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ গ্রন্থে প্রুধোঁবাদের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম পরিচালনা করেন। মার্কস, এঙ্গেলস ও তাদের সহযোদ্ধাদের দৃঢ়বদ্ধ সংগ্রাম প্রথম আন্তর্জাতিকে প্রুধোঁবাদের উপর মার্কসবাদের পরিপূর্ণ বিজয়ে পরিসমাপ্তিলাভ করে। লেনিন প্রুধোঁবাদকে অভিহিত করেন ‘পেটিবুর্জোয়া ও গণ্ডমূর্খদের নির্বোধ ভাবনা’ বলে যা শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গী উপলব্ধি করায় একেবারেই অসমর্থ। বুর্জোয়া ‘তাত্ত্বিকরা’ তাদের শ্রেণীসহযোগিতার প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালাতে প্রুধোঁবাদের মতামতগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে।

২। বাকুনিনবাদ : মিখাইল আলেক্সান্দ্রাভিচ বাকুনিন (১৮১৪-১৮৭৬) ছিলেন রুশ বিপ্লবী নৈরাজ্যবাদী তত্ত্ববিদ। তিনি ছিলেন মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্রের ঘোর বিরোধী। মার্কসবাধী তত্ত্ব ও শ্রমিক আন্দোলনের মার্কসীয় রণকৌশলের বিরুদ্ধে বাকুনিনপন্থীরা একগুঁয়ে বিরোধিতা চালায়। বাকুনিনবাদের মৌলিক তত্ত্বমত ছিল সর্বহারা একনায়কত্বসহ সকল রূপের রাষ্ট্রের প্রতি অস্বীকৃতি; বাকুনিনপন্থীরা সর্বহারাশ্রেণীর ঐতিহাসিক ভূমিকা উপলব্ধি করতে পারেনি। বাকুনিন শ্রেণী ‘সমতার’ (লেভেলিং), নীচে থেকে ‘স্বাধীন সম্মিলনের’ জোট সম্পর্কিত মতামত প্রচার করতেন। ‘সুবিখ্যাত ব্যক্তিদের’ নিয়ে গঠিত গোপন বিপ্লবী সমিতিই নেতৃত্ব দিবে জনপ্রিয় বিদ্রোহের যা অবিলম্বেই শুরু করতে হবে।

রাশিয়ার ক্ষেত্রে, দৃষ্টান্ত স্বরূপ, বাকুনিনপন্থীরা ধরে নিয়েছিল যে, কৃষকরা এক আশু বিদ্রোহ আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। ষড়যন্ত্র, আশু বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত তাদের রণকৌশল ছিল নিছক জুয়াখেলা, সেটা ছিল অভ্যূত্থান সম্পর্কিত মার্কসবাদী তত্ত্বমতের একেবারে বিপরীত। বাকুনিনবাদ ছিল অন্যতম উৎস যা থেকে নারদপন্থীরা তাদের মতাদর্শ নিরুপণ করে। বাকুনিন ও বাকুনিনবাদ সম্পর্কে আরো জানতে হলে দ্রষ্টব্য : ‘সোশ্যল-ডেমোক্র্যাসি ও আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংস্থার মৈত্রী’ (১৮৭৩)- মার্কস ও এঙ্গেলস; ‘বাকুনিনপন্থীদের কাজ’ (১৮৭৩) ও ‘এমিজারদের সাহিত্য’ (১৮৭৫)- এঙ্গেলস এবং ‘অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার প্রসঙ্গে’- লেনিন। রচনা সংকলন. ৮ম খণ্ড, পৃ: ৪৬১-৮১।

৩। সংশোধনবাদ : বলতে ওখানে লেনিন বুঝিয়েছেন বার্নস্টাইনপন্থাকে, ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ দিকে জার্মান ও আন্তর্জাতিক সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক আন্দোলনের অভ্যন্তরে মার্কসবাদ বিরোধী এক দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী ধারা হিসেবে তা আবির্ভূত হয়। এই ধারার সবচেয়ে প্রকাশ্য প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বার্নস্টাইনের নামেই তা অভিধা লাভ করে। এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর বুর্জোয়া উদারতাবাদী চিন্তা-ভাবনা দ্বারা মার্কসের বৈপ্লবিক তত্ত্বকে তিনি খোলাখুলি সংশোধন বা পুনর্বিচারের প্রস্তাব করেন। ১৮৯৬-১৮৯৮ সালে জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাসির তাত্ত্বিক মুখপত্র নব যুগ (দিয়ে নিয়ু জীত) পত্রিকায় ‘সমাজতন্ত্রের সমস্যা’ নামে তিনি ধারাবহিক কয়েকটি প্রবন্ধ লেখেন। ‘সমাজতন্ত্রের নীতিমালা’ নামে এক সুবিধাবাদী পুস্তকও তিনি লেখেন। ‘সমালোচনার স্বাধীনতা’ এই অজুহাতে বিপ্লবী মার্কসবাদের দার্শনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল নীতিসমূহকে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সংশোধন করে শ্রেণী-বিরোধ নিরসন ও শ্রেণী-সহযোগিতার উদারনৈতিক বুর্জোয়া তত্ত্ব আমদানী করতে সচেষ্ট হোন; শ্রমিকশ্রেণীর দারিদ্র বৃদ্ধি, ক্রমবৃদ্ধিমান শ্রেণীবৈরিতা, শ্রেণীপার্থক্য, সংকট, পুঁজিবাদের অনিবার্য পতন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও সর্বহারা একনায়ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে তিনি মার্কসের মতবাদকে আক্রমণ করেন, সমাজতান্ত্রিক সংস্কারবাদের এক সর্মসূচী হাজির করেন, পার্টিকে এক পেটিবুর্জোয়া পার্টিতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেন। এগুলোতে তিনি উপস্থিত করেন তার সুবিখ্যাত প্রতিক্রিয়াশীল তত্ত্বমত, ‘গতিই সবকিছু, চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছুই নয়’। ১৮৯৯ সালে বার্নস্টাইনের নিবন্ধগুলি ‘সমাজতন্ত্রের পূর্বশর্ত ও সোশ্যল-ডেমোক্র্যসির কর্তব্য’ নামে পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দক্ষিণপন্থী অংশ আর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের অন্যান্য পার্টির সুবিধাবাদীরা, রাশিয়াতে ‘আইনী মার্কসবাদীরা’, অর্থনীতিবাদীরা, বুন্দপন্থীরা ও মেনশেভিকরা তাঁর পক্ষ সমর্থন করে।

৪। নয়া কান্টবাদ : ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জার্মানীতে উদ্ভূত বুর্জোয়া ভাববাদী দার্শনিক প্রবণতা; যা ছিল কান্টের দর্শনগত চিন্তার সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বিষয়বাদী-ভাববাদী ধ্যান-ধারণার সমর্থক। ১৮৬৫ সালে আটো লিয়েবম্যান ‘কান্ট অ্যান্ড এপিগনস’ নামে এক পুস্তক প্রকাশ করেন, তাতে প্রতি অধ্যায়ের শেষে ‘কান্টের কাছে ফির যাও’ আহ্বান সম্বলিত বাক্যাংশ যুক্ত করেন। এর পাশাপাশি কুনো ফিশার, এডওয়ার্ড জেলার ও ফ্রেডরিখ এলবার্ট লঙ্গে প্রমুখ লেখকও কাণ্টের মতবাদের পুনর্জন্ম ঘটানোর প্রচেষ্টা নেন। এসবের মধ্য দিয়ে তাঁরা ঐতিহাসিক ও দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের কঠোর বিরোধিতা করেন। বার্নস্টাইন প্রমুখ জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটরা ছিলেন নয়া কান্টবাদী, যাঁরা মার্কসের দর্শন, অর্থনৈতিক তত্ত্বমত, শ্রেণী সংগ্রাম ও সর্বহারা একনায়কত্বের তত্ত্বকে সংশোধন করেন। আগ্রহী পাঠকরা লেনিন, সংগৃহীত রচনাবলীর ১৪ খণ্ডের পাদটীকা ১৮, পৃ: ৩৬৮ দেখতে পারেন।

৫। অগ্যাঁ বোম বাভের্ক : অস্ট্রিয়ার বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ, মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্বকে বিরোধিতা করেন। মুনাফার উৎস পুঁজি কর্তৃক শ্রমিক শোষণ- এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেন।

৬। প্যারিস কমিউন : ১৮৭১ সালের ফ্রান্সের প্যারিস নগরীতে সশস্ত্র অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের দ্বারা ইতিহাসে প্রথম বারের মতো প্রতিষ্ঠিত শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী সরকার। ১৮ই মার্চ থেকে ২৩শে মে পর্যন্ত ৭২ দিন তা টিকে থাকে। প্যারি কমিউন রাষ্ট্র থেকে গীর্জাকে এবং গীর্জা থেকে স্কুলকে বিচ্ছিন্ন করে, স্থায়ী সেনাবাহিনীর স্থলে আনে সর্বজনীন রূপে সশস্ত্র জনগণকে, জনগণ কর্তৃক বিচারক ও সরকারী কর্মচারীদের নির্বাচন চালু করে স্থির করে দেয় কর্মচারীদের বেতন শ্রমিকদের বেতনের বেশী হওয়া চলবে না, শ্রমিক ও শহরে গরীবদের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়নে ইত্যাদি একগুচ্ছ ব্যবস্থা নেয়। ১৮৭১ সালের ২১ মে ত্রিয়েরে সংগঠিত প্রতিবিপ্লবী সৈন্যরা প্যারিসে প্রবেশ করে এবং শ্রমিকদের উপর বর্বর দমননীতি চালায়। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়, ৫০ হাজার জনকে গ্রেপ্তার ও হাজার হাজার লোক কারাদণ্ডিত হয়। অনেকে পালিয়ে জীবন বাঁচান। মার্কস তখন প্যারিসের শ্রমিকদের জন্য লন্ডনে একটি শরণার্থী শিবির খোলেন। সেখানে প্যারিসের অজ্ঞাত কোনো এক শ্রমিকের লেখা একটি গান নিয়ে আসেন অন্য একজন শ্রমিক। সেই গানটি আজ অবধি কমিউনিস্টদের সঙ্গীত হিসেবে ‘আন্তর্জাতিক’ নামে সমাদৃত।

৭। কাদেত : রাশয়ার উদারনৈতিক-রাজতন্ত্রী বুর্জোয়াদের প্রধান পার্টি, সাংবিধানিক-গণতন্ত্রী পার্টির সভ্য। ১৯০৫ সালে কাদেত পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়, এর সদস্যরা ছিল বুর্জোয়া, জমিদার ও বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধি। কাদেতরা নিজেদের বলতো ‘জনগণের মুক্তির পার্টি’, উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিক জনতাকে বিপথগামী করা। বাস্তবে তারা কখনই সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দাবির গণ্ডী অতিক্রম করেনি। জারতন্ত্রের সাথে তারা আপোষ-রফার ও ক্ষমতা ভাগাবাগির পক্ষে ছিল; নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তারা প্রজাতন্ত্র ধ্বনির বিরোধিতা করে, জমিদারী ভুমি মালিকানা বজায় রাখতে চায়, মূল কাজ হিসেবে বিবেচনা করে বিপ্লবী আন্দোলনের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কাদেতরা জার সরাকরের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী পররাষ্ট্র নীতিকে সমর্থন করে। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সময় তারা জার রাজতন্ত্রকে বাঁচাবার চেষ্টা করে। বুর্জোয়া সাময়িক সরকারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়ে তারা জনবিরোধী প্রতিবিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় এবং মার্কিন, বৃটিশ ও ফরাসী সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থানুকূল নীতি অনুসরণ করে। অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর কাদেতরা ছিল সোভিয়েত ক্ষমতার ঘোর শত্রু এবং প্রতিবিপ্লবী সশস্ত্র কর্মকাণ্ড ও বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে চৌদ্দটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ কর্তৃক পরিচালিত সশস্ত্র হস্তক্ষেপমূলক অভিযানের প্রধান অংশীদার। হস্তক্ষেপকারী ও শ্বেতরক্ষী বাহিনীর পরাজয়ের পর তারা বিদেশে থেকে প্রতিবিপ্লবী সোভিয়েত বিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে। মিলিয়াকভ, মাকলাকভ, শিঙ্গরিয়ভ স্ত্রুভে, রদিচেভ প্রমুখ ছিল কাদেতদের অন্যতম নেতা।

৮। মিলেরাঁবাদ : ফরাসী সমাজতন্ত্রী আলেক্সান্দ্রা এতিনে মিলেরাঁর (১৮৬৩-১৯৪৩) নামে সুবিধাবাদী প্রবণতা। ১৮৯৯ সালে ফ্রান্সের বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল সরকারে যোগ দেন। সরকারের সাম্রাজ্যবাদী জনবিরোধী নীতিসমূহ সমর্থন করেন। প্যারি কমিউনের কসাই জেনারেল গ্যাস্তোঁ গ্যালিফেতের সাথে সহযোগিতা করেন। মিলেরাঁবাদকে সংশোধনবাদ ও বিশ্বাসঘাতকতা অভিহিত করে লেনিন বলেন যে, বুর্জোয়া সরকারে অংশ নিয়ে সমাজতন্ত্রী-সংস্কারবাদীরা অনিবার্যভাবেই হয়ে দাঁড়িয়েছে সাক্ষীগোপাল, পুঁজিবাদের শিখণ্ডী, সরকার কর্তৃক জনগণকে প্রতারণার এক হাতিয়ার।

৯। গেদে-বাদী : জুলি গেদে (১৮৪৫-১৯২২) এবং পল লাফার্গের (১৮৬২-১৯১১) অনুসারী। ১৮৮২ সালে ফ্রান্সের ওয়ার্কার্স পার্টির বিভক্তির পর তাঁরা গঠন করেছিলেন একটি বাম মার্কসবাদী ধারা, যা ফরাসী সর্বহারাদের স্বাধীন বৈপ্লবিক রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ায়। গেদে চিলৈন সোশ্যালিষ্ট পার্টি অব ফ্রান্স ও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা। পল লাফার্গও ছিলেন এই উভয়টির নেতা এবং লেখক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত গেদে ছিলেন ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্বোক্ত ফরাসী পার্টির বাম বিপ্লবী অংশের নেতা, কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ বেধে যাওয়ার পর তিনি ফরাসী বুর্জোয়া সরকারে যোগ দেন। উল্লেখ্য, পল লাফার্গ ছিলেন মার্কস তনয়া ল্যরা মার্কসের স্বামী।

১০। জোরেসবাদী : জা লিয়ঁ জোরেস (১৮৫৯-১৯১৪) ছিলেন ফরাসী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রখ্যাত নেতা; লা হিউমেনাইট পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, ফরাসী সমাজতান্ত্রিক পার্টির দক্ষিণপন্থী, সুবিধাবাদী, সংস্কারবাদী অংশের নেতা। ‘সমালোচনার স্বাধীনতার’ অজুহাতে মার্কসীয় নীতিমালা সংশোধনের চেষ্টা করে জোরের অনুসারীরা। সর্বহারা ও বুর্জোয়াদের শ্রেণী-সহযোগিতার কথা তার বলত। ১৯০২ সালে মিলেরাঁকে নিয়ে সংস্কারবাদী নীতিমালার অনুসারী ফরাসী সমাজতান্ত্রিক পার্টি গঠন করে। জোরেস সমাজতন্ত্রের বিরোধী ছিলেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে সমরতন্ত্রীদের ভাড়া করা এজেন্টরা তাকে গুপ্তহত্যা করে।

১১। ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি : গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম পূর্বসূরী। ধর্মঘট সংগ্রামের বৃদ্ধি ও বুর্জোয়া পার্টি থেকে বৃটিশ শ্রমিকশ্রেণীর স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলন বৃদ্ধির কালে ১৮৯৩ সালে সংগঠিত সংস্কারবাদী সংগঠন। এতে যোগ দেয় ‘নয়া ট্রেড ইউনিয়ন’ তথা এক দল পুরানো ট্রেড ইউনিয়নের সভ্যরা। পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন জেমস কেউর হার্ডি, র‍্যামজে ম্যাকডোনাল্ড ও অন্যরা। কর্মসূচীতে ছিল সমস্ত উৎপাদন, বন্টন ও বিনিময়ের উপায়ের উপর যৌথ মালিকানা, ৮ ঘন্টা কর্মদিবস, শিশু শ্রম নিষেধ, সামাজিক বীমা ও বেকার ভাতা। উদ্ভব থেকেই এ পার্টি বুর্জোয়া সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করে, বিশেষত মন দেয় পার্লামেন্টারী সংগ্রাম ও উদারনৈতিক পার্টির সঙ্গে পার্লামেন্টারী চুক্তিতে। এই পার্টির চরিত্র নির্ণয় করে লেনিন লেখেন, ‘কার্যত এটি সর্বদাই বুর্জোয়াদের অধীন এক সুবিধাবাদী পার্টি’ এবং ‘শুধু সমাজতন্ত্র থেকেই তা ছিল স্বাধীন, কিন্তু খুবই অধীন উদারতাবাদের কাছে।’ পরবর্তীতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালে এই পার্টি সামাজিক জাত্যাভিমানী ভূমিকা গ্রহণ করে, এবং কার্ল কাউৎস্কির নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯২১ সালে এর বাম অংশ পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নবগঠিত গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়।

১২। ইন্ট্রিগ্যালিস্ট : ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টির একটি ধারার প্রতিনিধি। মোটের উপর পেটি বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিক ধারার প্রতিনিধি হলেও বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় এরা চূড়ান্ত সুবিধাবাধী মতবাদ পোষণকারী ও প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়ার সহযোগী সংস্কারবাদীদের বিরুদ্ধে কতক প্রশ্নে সংগ্রাম চালায়।

১৩। বিপ্লবী সিন্ডিক্যালবাদ : ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, পশ্চিম ইউরোপের বেশ কযেকটি দেশে আবির্ভূত পেটি বুর্জোয়া আধা নৈরাজ্যবাদী ধারা। সিন্ডিক্যালবাদীরা প্রত্যাখ্যান করতো শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রাম, পার্টির নেতৃত্বদায়ী ভূমিকা ও সর্বহারা একনায়কত্বকে; তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ট্রেড ইউনিয়ন (সিন্ডিকেট) বিপ্লব ছাড়াই শ্রমিকদের সাধারণ ধর্মঘটের মাধ্যমে পুঁজিবাদ উচ্ছেদ করতে পারবে, এবং অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারবে। লেনিন দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, ‘বহু দেশের বিপ্লবী সিন্ডিক্যালবাদ ছিল সুবিধাবাদ, সংস্কারবাদ ও পার্লামেন্টারী মূর্খতার প্রত্যক্ষ ও অনিবার্য ফলাফল।’ প্রয়োজনে দেখুন, লেনিন রচনা সংকলন ১৩ খণ্ড, পৃ: ১৬৬।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “মতবাদ, মতাদর্শ ও ইতিহাস (১)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 6 = 10