ঘিরে ধরা কুয়াশা। অতঃপর…

হঠাৎই নিশির ঘুম ভেঙে গেল। পাশে শুয়ে আছে তার স্বামী। পানি খেয়ে আবার বিছানায় ফিরে মোবাইলটি হাতে নিল সে। পাঁচটি মিসকল, একটি মেসেজ। নম্বরটা দেখেই বুক ধ্বক করে উঠলো। তাকিয়ে একবার দেখল পাশে শুয়ে থাকা স্বামীর দিকে। পুরনো সেই নম্বর। কত ফোন দিয়েছিল। শুধু ডিজিটাল অপারেটরের গলায় কৃত্রিম দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু শুনতে পায়নি। আজ আবার সেই নম্বর থেকে ফোন, মেসেজ। পুরনো সেই প্রেমিক। আজ এতদিন পর। ঠোটের কোণায় এক চিলতে হাসি খেলে গেল। ভুরুজোড়া তখনো কুঁচকে। টানা সাত বছরের প্রেম। মেসেজটা পড়ল সে। আজ আবার দুই বছর পর তার ডাক। দেখা করতে চায়।

ঘুম ঘুম চোখে মেসেজ আর কল হিস্ট্রি মুছে দিল নিশি। নিজেকে বোঝাতে লাগল, ‘বয়ে গেছে আমার, ওই উজবুকটার সঙ্গে দেখা করতে।’ কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে থাকল সে। ঘুম ছুটে গেছে বুঝতে পেরে নিজের ওপর চরম বিরক্ত হলো। ‘কী অবস্থা! এই বজ্জাতের কথা ভেবে আমি ঘুম নষ্ট করছি?’ আরো অনেক কথা মনে আসলো তার। একবার ইচ্ছে হলো ফোন করে যা তা বলে দিতে। কিন্তু পাশে শুয়ে থাকা স্বামীর কথা ভেবে সে ফোনটা আবার বালিশের নিচে রেখে দিল।

ভোরের মিষ্টি হাওয়া ছুটছে ঘরে। এখনো পুরোপুরি আলো ফোটেনি। দারুণ এই সময়টা নিশিকে নিয়ে গেল গহীন ঘুমের অরণ্যে। ঘুম ভাঙল একটু বেলা করেই। মোবাইল বের করে সে সময় দেখল। সাড়ে নয়টা। দ্রুত উঠে মুখে ব্রাশ গুঁজে রান্নাঘরের দিকে ছুটল। পেছন ফিরে একবার ভাবল ডাকবে কিনা স্বামীকে। তারপর আবার মনে হলো, থাক না। ছুটির দিনে একটু ঘুমাক। ভালোই লাগে তার মানুষটাকে। তার ভাগ্যে ভালো কিছুই জোটেনি ছোটবেলা থেকে। একটু প্রেম ট্রেম করতে না করতেই মা হুট করে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলল। উজবুকটা তখন একেবারেই লাপাত্তা। ফোন বন্ধ। যে মেসটাতে থাকত সেখানকার কেউ বলতে পারল না কোথায় গেছে। মায়ের আবদারে না, না, বলতে বলতে একদিন সে রাজিও হয়ে গেল।

বিয়ের পর দেখল মানুষটা ভালোই। শুধু মাঝে মাঝে রাতে মদ খেয়ে ঘরে ফেরে। নিশি তাকে প্রথম দিকে জিজ্ঞেস করত, ‘কিসের কষ্টে মদ খাও?’ একটাই জবাব, ‘কষ্ট হলে মানুষ মদ খায়, এটা তোমাকে কে বলল?’ নিশি আর বেশি জোরাজোরি করতে পারত না। কয়েকদিন টাকা পয়সা চাপ দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেখেছে, বান্দা কোথা থেকে যেন ঠিকই মদের টাকা জোগাড় করে ফেলে। এরপর হাল ছেড়ে দিয়েছে। এছাড়া আর তেমন কোনো সমস্যা নেই লোকটার। এনজিও’র চাকরি শেষে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা শেষে প্রতি রাতে বাড়ি ফেরা। কিছুক্ষণ টিভি দেখা। একটু-আধটু সাংসারিক আলাপ। তারপর আবার পরের দিনকে ডাকা। ভালোই লাগে তার।

রান্নাঘরে ঢুকে সকালের নাস্তার আয়োজনে লেগে যায় নিশি। থালা বাসন সরাতে গিয়ে হঠাৎ একটা তেলাপোকা দেখে ছিটকে দু হাত দূরে সরে আসে। অসাবধানতায় বেরিয়ে পড়া তীব্র চিৎকারটির জন্য নিজেকে তার বেকুব মনে হয়। বেডরুমে উঁকি দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়, ‘যাক ওর ঘুম ভাঙেনি’। আবার রান্নাঘরে ফিরে এসে আগের জায়গা থেকে একটু দূরেই তেলাপোকাটাকে দেখে তার খুশি লাগে। কিভাবে ওটাকে মারা যায় ভাবতে ভাবতে সে কি যেন একটা অস্বস্তির মধ্যে পড়ে। চারপাশে তাকিয়ে সে কোনো ভুল খুঁজতে থাকে। সব ঠিকঠাক আছে ভাবতেই বুকের মধ্যে ধ্বক করে ওঠে তার। ছুটে সে বেডরুমে যায়।

স্বামী তার আগের জায়গাতেই শুয়ে আছে। ঠিক ভোরে যেভাবে দেখেছিল সেই একই ভঙিতে। নিশি তার গায়ে হাত রাখে- শীতল। টান দিয়ে তাকে পাশ ফেরায়। ঠোটের কোণায় জমে থাকা ফেনা দেখে চিৎকার দিয়ে প্রথমে মাকে ডাকে। স্বামীটি মারা গেছে, এটা বুঝতেই মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয়, ‘এখন আমার কী হবে?’ তার গলা আটকে আসে। আর জোরে চিৎকার করতে পারে না। এতক্ষণের প্রিয় আপন মানুষটিকে দেখে এখন তার ভয় হয়। ভয়ে সে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে। পাশের ফ্ল্যাটের কলিং বেল চাপতে থাকে উত্তেজিতভাবে। তার মায়ের কথা মনে পড়ে। মাকে খবর দিতে হবে।

দরজা খোলার কোনো আভাস নেই। নিশি একবার ভাবে নিচ তলার দিকে যাবে কিনা। তারপর ওই দরজার পাশেই বসে পড়ে। কিছুক্ষণ বাদে রাজ্যের বিরক্তি চোখেমুখে মেখে দরজা খোলে প্রতিবেশি পুরুষটি। নিশিকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। নিশি বুঝতে পারে ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থার মধ্যেই লোকটা তার অগোছালো কাপড়ের ভেতরকার শরীরটাকে মেপে রাখার চেষ্টা করছে। সে কাপড় ঠিক করার কথা ভাবতে থাকে, কিন্তু পারে না। মুখ ফুটে একটি কথা বেরায়, ‘ও মরে গেছে।’ লোকটি দৌড়ে নিশির ঘরের দিকে যায়।

প্রতিবেশীর দরজায় বসে নিশি ডাক ছেড়ে কান্না শুরু করে। সেই পুরনো প্রেমিকের কথা মনে পড়ে। মনে হয়, ওকে একটা খবর দেয়া দকার। ছেলেটা ভালোই ছিল। কি না করত তার জন্য। নিশি জোর করে পুরনো প্রেমিকের মুখটি মাথা থেকে সরাতে চেষ্টা করে। প্রতিবেশী লোকটির বউ বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। মহিলা নিশিকে জিজ্ঞেস করে, ‘কি হয়েছে?’ সে কথা বলতে পারে না। লোকটি ফিরে আসে। স্ত্রীকে সে জানায়, ‘ওনার স্বামী মারা গেছে। সম্ভবত ঘুমের ঘোরে স্ট্রোক হয়েছে।’ নিশির দিকে তাকিয়ে লোকটি বলে, ‘আপনার আত্মীয় স্বজনদের খবর দেয়া দরকার। মহিলাটি দৌড়ে নিশির ঘরে ঢোকে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসে আতঙ্কিত মুখ নিয়ে। মহিলার ভীতু মুখ দেখে নিশি আরো জোরে হাঁক দিয়ে কাঁদতে শুরু করে।

নিশির পাশে বসে পড়ে মহিলাটি তার মাথাটা কোলে টেনে নেয়। এতক্ষণে নিশি একটু নি:শ্বাস নিতে পারে। লোকটি আবারো আত্মীয় স্বজনদের হদিশ চায়। নিশি কোনো রকমে বলে, ‘বালিশের নিচে মোবাইল।’ তার আবার পুরনো প্রেমিকের কথা মনে পড়ে, ও আবার ফোন দেয়নি তো। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কষ্ট করে সে স্বামীর মুখটা মনে করতে চায়। মুখে ফেনা তোলা মৃত মুখটা ছাড়া আর কিছুই স্মরণ করতে পারে না। একবার তার আবছা করে স্বামীর গভীর রাতে নেশাতুর মুখটির কথা মনে পড়ে। নিশির মনে হয়, টাকা না থাকলেও ও মদ খেত কি করে? ওর কোনো গোপন অ্যাকাউন্ট ছিল কি? থাকলেও আর কোনোদির জানা যাবে না। নিশি ভাবতে থাকে, এখন যদি একগাদা পাওনাদার এসে হাজির হয় কি করবে? নিশি আরো দুর্বল হয়ে পড়ে।

নিচতলা, ওপর তলার প্রতিবেশীরা একে একে জড়ো হচ্ছে। একটি শিশু নিশিকে খুব ভালোভাবে দেখছে, শিশুটির মুখে হাসি। তার ইচ্ছে করে ছেলেটিকে কষে একটা চড় দিতে। পারে না, শুধু উচ্চস্বরে কেঁদে চলে। প্রতিবেশী লোকটি তার মোবাইল ঘাটতে থাকে। কে যেন একজন তার ঘরের দিকে ঢুকতে যায়। আরেকজন বলে ওঠে, এভাবে মরা বাড়িতে ঢুকবেন না। পরে চোরের অপবাদ শুনতে হবে। নিশি ভাবতে চেষ্টা করে, ঘরে নগদ টাকা কত আছে? তার অলঙ্কারগুলো কোথায়। জমা টাকা যা আছে তা দিয়ে কতদিন চলতে পারবে। কদিনের মধ্যে নিশ্চয়ই তাকে এই বাসা ছাড়তে হবে। এরপর কোথায় যাবে। তার আবার পুরনো প্রেমিকের কথা মনে পড়ে। সে আবারো চেষ্টা করে স্বামীর কথা ভাবে। স্বামীর জন্য তার বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা মোচড় দেয়। এই কষ্টটা তার ভালো লাগে। অপরাধবোধ থেকে সে মুক্তি পায়।

বুকের কষ্টটা গলায় জমতে না জমতেই নিশির মনে পড়ে রাতে কানের দুল খুলে ড্রেসিং টেবিলে রেখেছিল। তার ঘরে যেতে ইচ্ছে করে। মৃত স্বামীর মুখ মনে পড়ে আবার আতঙ্ক হয়। সে চিৎকারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। চিৎকার করে সব ভাবনা থেকে পালাতে চায়। তার মনে হয়, ওর সাথে মরে যেতে পারলে ভালো হতো। প্রতিবেশী মহিলাটি তার মুখে পানি দেয়ার চেষ্টা করে। কান্নার রোল তুলে নিশি সেই পানি ঠেলে ফেলে দেয়। মহিলাটি গ্লাসে জমে থাকা বাকি পানিটুকু তার মাথায় ঢেলে দেয়। নিশি ঠাণ্ডা হয় না। আরো বেশি করে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতেই কিছুক্ষণের জন্য সব ভাবনা চিন্তা থেকে দূরে চলে যায়।

ইতোমধ্যে তার মা এসে পৌঁছেছে। মুখে পানি ছিটিয়ে মেয়ের জ্ঞান ফেরান তিনি। চোখ খুলে মাকে দেখে নিশির ভয় হয়। তার মা কি বেঁচে আছে না মরে গেছে সে মনে করতে পারে না। তবু সে মাকে জড়িয়ে ধরে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “ঘিরে ধরা কুয়াশা। অতঃপর…

  1. এই গল্পটা লিখেছিলাম প্রায় তিন
    এই গল্পটা লিখেছিলাম প্রায় তিন বছর আগে ২০১২ সালের জুনের প্রথম দিকে। তখন গল্পটি নাগরিক ব্লগে শেয়ার করেছিলাম। অনেকদিন ধরে নাগরিক বন্ধ, অনিয়মিত। লেখাটি তাই ইস্টিশনে পোস্ট করব করব ভাবছিলাম। আলসেমি করে করে অবশেষে তা আজ পারলাম। মনস্তাত্ত্বিক জগত নিয়ে এই গল্পটা লিখেছিলাম। আগে যারা পড়েননি, তাদের মতামত চাই।

  2. পুরোনো প্রেমের হঠাত
    পুরোনো প্রেমের হঠাত উপস্থিতি, এ নিয়ে দ্বিধা, সম্ভাবনা, স্বপ্ন উঁকি দেওয়া নিয়ে বলবো না, তবে যে বিষয়টা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো : “‘এখন আমার কী হবে?’”
    প্রথম এই কথাটাই মনে হয়েছে সদ্য বিধবা মেয়েটির! এটা চরম বাস্তবতা, আমাদের সমাজের সিংহভাগ মেয়েদের অকালে স্বামী মারা গেলে তাদের ভবিষ্যত হুমকির মুখে পরে! যদিও ইদানিং কিছু মেয়ে সাবলম্বী হচ্ছে, কিন্তু সে সংখ্যা অতি সামান্য। মেয়ের বাপের বাড়ীতে স্বামীর মৃত খবর পৌছালে সেখানেও তারা প্রথমে কেঁদে ওঠে “আমার মেয়ের এখন কি হবে……” বলে!
    ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।

  3. পড়ার জন্য ধন্যবাদ মোজাম্মেল।
    পড়ার জন্য ধন্যবাদ মোজাম্মেল। আপনি শোক দিবসে আসলেন না, উল্টো কমরেডশীপ নাম থেকে মুছে ফেললেন। এটা কী ইঙ্গিত বলে ধরে নেব?

    1. সেই কথা ফেসবুক কতৃ‍র্পক্ষের
      সেই কথা ফেসবুক কতৃ‍র্পক্ষের জিগান, হুদাই আমার দোষ দ্যান ক্যান ? হ্যারা নাম না পাল্টাইলে আইডি বন্ধ রাখলে আমার কী দোষ :কানতেছি: :মাথাঠুকি:

  4. আগে পড়ছি। চমৎকার গল্প। আপনার
    আগে পড়ছি। চমৎকার গল্প। আপনার গল্প লেখার প্রতিভার পরিচয় পেয়েছিলাম এই গল্পটা পড়ে। গল্প কম লিখেন কেন? নতুন গল্প চাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 65 = 70