ইসলাম ও ধর্মীয় স্বাধীনতা

অন্দরের ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই। পর্ব -৪

ইসলামে ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকার করা হয় কি? অথবা ইসলাম ও সেকুলারিজম কি পরস্পর বিরোধী না কি সঙ্গতিপূর্ণ? এইসব বিষয়ে বর্তমানে জোর তর্ক চলছে। সমাজের বহু শ্রেণী ও পেশার মানুষ এই বিতর্কে যুক্ত হয়েছেন। কেউ নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকে, কেউ প্রেজুডিসের জায়গা থেকে, কেউ আবেগে, কেউ রাজনৈতিক কারনে আবার কেউ একেবারেই একাডেমিক কারনে অথবা একাধিক কারন ও অবস্থান থেকে এই বিতর্কে যুক্ত হয়েছেন। ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে এই সময়কার অন্যতম দিকপাল পেট্রিসিয়া ক্রোন, যিনি আধুনিক ইতিহাসবিদদেরকে ইতিহাসের সেকুলাইরাইজার বলে দাবি করেন, তিনিও এই বিতর্কে যুক্ত হয়েছেন। ইসলামের ইতিহাস চর্চায় অতীতে ক্রিটিকাল বিচার বিশ্লেষনের যথেষ্ট অভাব ছিল। ক্লাসিকাল মুসলিম ইতিহাস লেখকরা যে ধরণের ইতিহাস লিখেছেন তার মূল কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে বা তার বাইরে গিয়ে ভিন্ন কোন ইতিহাস লেখার চেষ্টা দীর্ঘদিন পর্যন্ত পশ্চিমের বাঘা বাঘা ইতিহাসবিদরাও করতে যান নাই। যাদের অবদানের কারনে ক্রিটিকাল বিচার বিশ্লেষনের এই অভাব কিছুটা হলেও ঘুচেছে পেট্রিসিয়া ক্রোন তাদের অন্যতম। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ক্রোন ও তার সহকর্মী মাইকেল কুক-এর সারা জাগানো বই ‘হাজেরাবাদঃ ইসলামিক দুনিয়ার জন্ম’ (Hagarism: The making of the Islamic world)-এর মূল হাইপোথিসিসটি একাডেমিয়াতে এবং এক পর্যায়ে মূল লেখকদের ঘোষনাতেই বাতিল হয়ে গেলেও ইসলামের ইতিহাস চর্চায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গী হাজির করার ক্ষেত্রে এই বইটি সূদুরপ্রসারী ভুমিকা রেখেছে। আপাতত আমরা ক্রোনের যেই লেখাটি নিয়ে আলোচনা করবো তার নাম ‘ইসলাম ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ (Islam and Religious freedom)। লেখাটি তিনি লেখেন ২০০৭ সালে ‘জার্মান কংগ্রেস ফর অরিয়েন্টাল স্টাডিস ফ্রেইবুর্গ’এর অধিবেশনের বক্তৃতা হিসাবে। এই লেখাটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারন লেখক ‘ইসলাম’ ও ‘ধর্মীয় স্বাধিনতা’ সাযুজ্যপূর্ণ কি না এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছেন। ক্রোন একজন একাডেমিশিয়ান, প্রিন্সটনের ইতিহাসবিদ্যার মেলন অধ্যাপক। তিনি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের আশ্রয় নেবেন তাই স্বাভাবিক। আমরাও ঐতিহাসিক বিচার বিশ্লেষনকে এই জাতীয় প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে জরুরি মনে করি বলেই পেট্রিসিয়া ক্রোনের দোহাই দিচ্ছি। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে আমরা ক্রোনের সাথে একমত নই। বিশেষ করে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের আশ্রয় নেয়ার যে কারন তিনি ব্যাখ্যা করেছেন আমরা তার সাথে একমত নই। কেনো নই, তা এই লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে।

প্রথমত জোর দিয়ে বলতে চাই যে ‘ইসলাম ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সাযুজ্যপূর্ণ কি না?’ এই প্রশ্ন ইতিহাসবিদ্যার প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটি চুরান্তভাবেই রাজনীতির প্রশ্ন। আমাদের আলোচ্য বিতর্কের নিমিত্ত রাজনীতি, ইতিহাস এখানে উপাত্ত মাত্র। ক্রোন যেহেতু রাজনীতিক নন, বরং ইতিহসবিদ, তাই এই বিতর্কে নামার একটি ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন। তার ব্যাখ্যা অনুসারে ‘ইসলামের সত্যসমূহ’ ইতিহাসের সাথে যুক্ত, ফলে ইসলাম ধর্মটি আদৌ সেকুলারস্ফিয়ারের সাথে সহাবস্থান করতে পারে কি না, বা পারলে কতোটুকু পারে সেই বিতর্কে ইতিহাসবীদদেরকেও নামতে হয় (ক্রোন, ২০০৭)। বলে রাখা ভালো যে ক্রোনের মতো ইসলামের কোন ‘সত্য’ বা ‘সত্যসমূহ’ নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধ্যান আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা ইতিহাস আলোচনা করছি কোন ‘বিশেষ’ রাজনৈতিক প্রশ্নের ‘সার্বিক’ উত্তর খোঁজার জন্যে নয়, বরং বিশেষের রাজনীতি অর্থাৎ ইসলামী দুনিয়ায় বিবদমান বিভিন্ন পক্ষের মধ্যকার ক্ষমতা সম্পর্কের ইতিহাস বিচার করার জন্যে। কোন মেটাফিজিকাল ‘সত্য’ সন্ধ্যান আমাদের কাজ নয়। আমরা রাজনীতি সচেতন হওয়ার জন্যে ইতিহাস সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র। তবে পেট্রিসিয়া ক্রোন-এর এই লেখাটিতে মুসলমানদের সম্পর্কে তার কিছু প্রচ্ছন্ন প্রেজুডিস এবং রাজনৈতিক বায়াস খুঁজে পাওয়া গেলেও দিনশেষে তিনি উত্তর দেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমান সততার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যথেষ্ট সৎভাবে লেখার একেবারে শুরুতেই বলে নিয়েছেন একটা মাত্র প্রবন্ধে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করার মানে হলো মাটির নিচে চাপা পরা কোন পুরণো শহরকে মাত্র এক সিজনে খুড়ে বের করে ফেলা। ক্রোন খুব সম্ভবত মিশেল ফুকোর আর্কিওলজিকাল এনালিসিস (ইতিহাসের প্রত্নসন্ধান) থেকে অনুপ্রানিত হয়ে এই খোড়াখুড়ির উপমা টেনেছেন। তিনি দাবি করেছেন এই লেখায় তিনি শুধু পরিখা খোড়ার কাজটি করেছেন, তার বেশি কিছু নয়। আমরা পরিখার চাইতে বেশি কিছু খুড়ে বের করার চেষ্টা করবো।

কোরানের সুরা বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াত ‘লা ইকরা ফিদ্দিন’, যার বাঙলা অনুবাদ হলো – ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই। আধুনিক যুগে ‘ইসলাম ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ বিষয়ক বিতর্কে এই আয়াতটি বহুল ব্যবহৃত। সাধারণত যারা ইসলাম ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সাযুজ্যপূর্ণ প্রমান করতে চান তার এই আয়াতটি বেশি ব্যবহার করেন। ইসলামে ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকার করা হয় না এইরকম সমালোচনার মুখে ইসলামকে ডিফেন্ড করতেই এই আয়াতটি আধুনিক কালে জরুরি হয়ে উঠেছে। পেট্রিসিয়া ক্রোন এই আয়াতটি কেন্দ্র করেই তার পুরা প্রবন্ধটি লিখেছেন। এই আয়াতের ঐতিহাসিক বিশ্লেষনই ক্রোনের খুড়ে বের করা পরিখা। কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল হয়েছিল? ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই – এই আয়াত নাজিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ইসলামী আইনে এর ব্যবহার সম্বন্ধে ধারণা দিতে তিনি ক্লাসিকাল মুসলিম পন্ডিতদের মধ্যে প্রচলিত ছয়টি ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। অবশ্য এই ছয়টি ব্যাখ্যার বাইরেও আরো কিছু ব্যাখ্যা আছে, যা তিনি দরকার ছিল না বলে উল্লেখ করেন নাই। এক ধরণের ব্যাখ্যা অনুযায়ি এই আয়াতটি আইনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ না, আরেক ধরণের ব্যাখ্যায় আইনের জন্যে দরকারি। ভিন্ন আরেক ব্যাখ্যা হলো, এই আয়াতের সাথে আইনের কোন সম্পর্ক নাই বরং ধর্মতত্ত্বের সম্পর্ক আছে। যারা আইনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন তাদের ব্যাখ্যা ছিল যে এই আয়াতটি ইহুদী ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধিম্মি গোষ্ঠির ধর্মীয় স্বাধীনতা ঘোষনা করেছে। তাদের মতে এই আয়াতটি নাজিল হয়েছিল সেই সময় যখন বিভিন্ন ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠি মুহাম্মদের শাসনের অধিনে এসেছিল। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, মুসলিম সাম্রাজ্যে ধিম্মি হিসাবে যে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা বসবাস করে তাদেরকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা যাবে না। এমনিতেও ধিম্মিদেরকে জোর করে মুসলমান না বানানোর বিষয়ে মুসলিম আইনজ্ঞরা একমত ছিলেন, তারপরও এই আয়াতটি ব্যবহার করে ইহুদী ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠির ধর্মীয় অধিকার রক্ষার বিভিন্ন ঐতিহাসিক মামলার উদাহরণ আছে বলে ক্রোন উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যা অনুসারে, ধর্মের ক্ষেত্রে জবরদস্তির মুখোমুখি না হওয়ার এই অধিকার শুধু ধিম্মিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুসলিমদের জন্যে এই স্বাধীনতা প্রযোজ্য না। অর্থাৎ কোন মুসলমান স্বাধীনভাবে ধর্ম ত্যাগের স্বাধীনতা এই আয়াত থেকে পায় নাই। ধিম্মি নয় এমন অমুসলিমরাও এই আয়াতের প্রদত্ত সুবিধা পাবে না। সীমাবদ্ধভাবে হলেও এই ব্যাখ্যা ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে আয়াতটিকে আইনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছে।

যারা দাবি করেছেন এই আয়াতের কোন আইনগত গুরুত্ব নাই, তাদের একাংশের মতে এই আয়াত নাজিল হয়েছিল মক্কায়, যেই সময় মুহাম্মদের কোন রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না তখন। তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে এই আয়াতটি কোরানের এবরোগেটেড আয়াতগুলোর একটা। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে মদিনায় মুহাম্মদ যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করেছেন, তখন নাজিল হওয়া ভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে এই আয়াতের মূল বক্তব্য খারিজ হয়ে গেছে। ক্লাসিকাল মুসলিম তফসির লেখক ও আইনবীদ যারা ছিলেন, তাদের একটি ক্রমবর্ধমান মুসলিম সাম্রাজ্যকে সমর্থন করতে হয়েছে, শাসক শ্রেনীর জিহাদ ও ধর্মের ক্ষেত্রে জোর জবরদস্তির পক্ষে তাদের আইনী বৈধতা দিতে হতো। এই বৈধতা দেয়ার কাজে যারা যুক্ত ছিলেন, ‘ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই’ এই আয়াত তাদের অনেকের জন্যেই একটা আইনি সমস্যা ছিল। এরাই মূলত এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘এবরোগেটেড’ তত্ত্ব হাজির করতেন। বর্তমানে অধিকাংশ জিহাদী তাত্ত্বিকরাও এই ব্যাখ্যার পক্ষে। অবশ্য ইসলামের সমালোচনাকারী অনেক লেখককেও এই ব্যাখ্যাটিকেই হাজির করতে দেখা যায়। তারাও মধ্যযুগের কিছু ব্যাখ্যাকার এবং আধুনিক জিহাদীদের সাথে সুর মিলিয়ে দাবি করেন যে, মদিনায় নাজিল হওয়া ভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে এই আয়াতটি ‘এবরোগেটেড’ হয়ে গেছে। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, পেট্রিসিয়া ক্রোনের ভাষায় – কম কথায় বলতে গেলে ইসলামে ধর্মীয় স্বাধীনতা আসলো এবং গেলো (ক্রোন, ২০০৭)। ক্লাসিকাল ব্যাখ্যাকারদের আরেক পক্ষের দাবি ছিল যে, এই আয়াতটি মক্কায় নয়, মদিনাতেই অবতির্ণ হয়েছে। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, মদিনার বহু পৌত্তলিক পরিবার তাদের সন্তানকে ইহুদীদের ঘরে মানুষ হওয়ার জন্যে পাঠাতেন, যে শিশুরা নিজেরাও ইহুদী হিসাবে বড় হতো। মুহাম্মদ মদিনায় পৌছানোর পর যখন মসিনার পৌত্তলিকদের অধিকাংশই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো, তখন না কি তারা ইহুদীদের ঘরে পালিত হওয়া নিজ সন্তানদেরকেও জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরের চেষ্টা করেছিল। তাদেরকে বিরত করতেই না কি এই আয়াতটি নাজিল হয়েছিল। যারা এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সমর্থক, তাদের দাবি একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষিতে এই আয়াতটি নাজিল হয়েছিল, যার কোন পুনরাবৃত্তি তাদের মতে আর কখনো সম্ভব না। সুতরাং, এই ব্যাখ্যা অনুসারে আয়াতটি এবরোগেটেড না হলেও এর আর কোন আইনগত গুরুত্ব তাদের সময়ে ছিল না।

এখন পর্যন্ত আমরা তিনটি ব্যাখ্যা আলোচনা করেছি। পরের পর্বে আরো কিছু ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা থাকবে। বিশেষ করে মুতাজিলাদের মধ্যে প্রচলিত দুটি ব্যাখ্যা আমাদের পরবর্তি আলোচনার জন্যে খুবি গুরুত্বপূর্ণ হবে। (চলবে)

তথ্যসূত্রঃ
Islam and Religious Freedom by Patricia Crone

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ইসলাম ও ধর্মীয় স্বাধীনতা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 − = 83