আরব থেকে দেওবন্দ হয়ে হাটহাজারীঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক বোঝাপড়া। পর্ব – ১

(এই লেখাটি কোনও মৌলিক গবেষণা কর্ম নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে এই বিশয়ের উপরে প্রকাশিত প্রতিনিধিত্তশীল পুস্তক, মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ, পর্যালোচনা মূলক প্রবন্ধ ও অন্যান্য অনলাইন প্রকাশনা পাঠ পরবর্তী একটি প্রতিক্রিয়া এবং লেখকের কিছু নিজস্ব বোঝাপড়ার সংকলন মাত্র। এই লেখায় লেখকের নিজস্ব মতামতের উপর যেকোনো সমালোচনা, বিতর্ক স্বাদরে গ্রহণযোগ্য।)

ভুমিকা
দেওবন্দ হচ্ছে ভারতের দিল্লী থেকে প্রায় ১৫০ কিমি উত্তরের একটি ছোট শহর এবং হাঠহাজারী হচ্ছে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একটি উপজেলা। ভৌগলিক ভাবে এই দুই স্থানের দূরত্ব প্রায় কয়েক হাজার মাইল, কিন্তু চেতনাগত দিক থেকে এই দুটি স্থানের নৈকট্য প্রশ্নাতীত। আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় হাঠহাজারী একটি প্রত্যন্ত উপজেলা হলেও, এই স্থানটিই বাংলাদেশে “দেওবন্দী” ধ্যান ধারনার প্রধান কেন্দ্র। এই লেখাটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, দেওবন্দ থেকে মুসলমানদের যে আন্দোলনের সুচনা তা নানান ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে কিভাবে আজকের হাঠহাজারী পর্যন্ত পৌছুলো সেই ভ্রমন বা যাত্রাটির কথা লেখা এবং বাংলাদেশের সমাজে এই “দেওবন্দী” ইসলামের সাম্প্রতিক স্বরূপ ও প্রভাব নিয়ে লেখা ।

আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা দুইটি প্রধান ধারায় বিভক্ত। একটি সরকার ও রাস্ট্র নিয়ন্ত্রিত আলিয়া মাদ্রাসার ধারা এবং অপরটি সরকার ও রাস্ট্রের নিয়ন্ত্রনের বাইরে স্বাধীন ধারা যাকে বলা হয় “দেওবন্দী” বা কওমি মাদ্রাসা। দেওবন্দী বা কওমি মাদ্রাসা ধারার সৃষ্টি ভারতের দেওবন্দ থেকে। “দেওবন্দ” মাদ্রাসা আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৮৬৬ সালে, ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে ইসলামী “মূলধারার” প্রথা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে এই ধারার জন্ম হয়েছিলো।উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পতন এবং ইংরেজ কলোনিয়াল শাসকদের সেকুলার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রেক্ষিতে, মুসলমানদের একটি ধারা এই আন্দোলনের সুচনা করে, ইসলামী সংস্কৃতি ও আদব কায়দা – রীতিনীতি সংরক্ষনের উদ্দেশ্যে।১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরাজয়ের পর ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে এক ধরনের হতাশা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রকট হয়ে ওঠে। মুসলিম ক্ষমতা পুনরুদ্ধার এর সকল সম্ভাবনা যখন সুদূর পরাহত তখন দেওবন্দ মাদ্রাসা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাটাগণ সিদ্ধান্ত নেন এক ধরনের বিশুদ্ধতাবাদী বিছিন্নতার, তারা সিদ্ধান্ত নেন, দেওবন্দ মাদ্রাসা আন্দোলনকে ভারতের মূল ধারার সমাজ থেকে এমন কি ভারতের মূল ধারার মুসলিম সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন রাখার। এই লেখাটি মুলত মাদ্রাসা শিক্ষার দেওবন্দী ধারার উপরে, সুতরাং আলিয়া মাদ্রাসা বা অন্যান্য স্বাধীন মাদ্রাসা বিষয়ক আলোচনা এই লেখায় অনুপস্থিত থাকবে।

দেওবন্দী চেতনার হদিস পেতে হলে আমাদের অন্তত খানিকটা পরিমানে মাদ্রাসা শিক্ষার মূল ইতিহাস জানা দরকার। ভারতবর্ষের মাদ্রাসাশিক্ষা তথা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস জানা দরকার এবং বিশেষত মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ দিক থেকে ইসলামের কোণঠাসা হয়ে পড়ার সময় টুকুকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। জানা দরকার দেওবন্দী ধারার প্রাণ পুরুষ শাহ ওয়ালিউল্লাহ এবং তাঁর অনুসারীদের তত্ত্ব, মতামত, পথ ও অনুশীলনের কথা। ইংরাজীতে দেওবন্দ মাদ্রাসা আন্দোলনের উপরে বেশ কিছু তথ্যবহুল পুস্তক, মৌলিক গবেষণার নজির আছে। বাংলায় মূলধারার গবেষকদের মাঝে এই বিশয়ের উপরে খুব বেশী সংখ্যক কাজ চোখে পড়েনা। বাংলাদেশের লেখক গবেষকদের মাঝে অধ্যাপক আলী রিয়াজ একমাত্র যার গবেষণাকর্ম বিভিন্ন জার্নাল এ প্রকাশিত হয়েছে এবং একাধিক পুস্তকে তিনি এই বিষয়ে আলোকপাতের চেস্টা করেছেন। অধ্যাপক আলী রিয়াজের পুস্তক গুলোও ইংরাজী ভাষায় লিখিত। এই লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে, পাচটি পুস্তক ও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য জার্নাল প্রবন্ধ এবং কিছু অনলাইন প্রকাশনার উপরে ভিত্তি করে।

মাদ্রাসা শিক্ষাঃ গোড়ার ইতিহাস

আরবী শব্দ “মাদ্রাসা”র অর্থ বিদ্যালয় বা বিদ্যাপীঠ, শেখার স্থান। এর উৎপত্তি হচ্ছে “দারস” থেকে, যার অর্থ শিক্ষা বা ইংরাজিতে “Lesson” অথবা “Instruction” এর মতো। আরবী ভাষাভাষী অঞ্চলে “মাদ্রাসা” শব্দটি দিয়ে অনেক ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে বোঝানো হলেও অ-আরবী ভাষাভাষী দেশ গুলোতে “মাদ্রাসা” মানেই ইসলামী শিক্ষার বিশেষ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয় যারা ইসলাম বিশয়ের বিশেষজ্ঞ বা “উলামা” তৈরি করে থাকে, তিনটি প্রধান বিশয়ের উপরে বিশেষায়িত শিক্ষা প্রদানের মধ্য দিয়ে, এসকল বিষয় হচ্ছে – কোরআন, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্র বা ইসলামী আইন।মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার এই প্রথা প্রায় ইসলামের ইতিহাসের সমবয়স্ক, অর্থাৎ ইসলামের নবী মুহাম্মদ এর সময় থেকেই চলে আসছে। যদিও সেই সময়, এই ব্যবস্থাটির নাম মাদ্রাসা ছিলোনা এবং আয়োজনের মধ্যেও পার্থক্য ছিলো।মদীনাতে মুহাম্মদ এর সময়ে মসজিদ ভিত্তিক পাঠচক্র ধরনের শিক্ষাস্থান ছিলো জাদেরকে বলা হতো “হালাকাহ” (Halaqah), এবং রাসুল মুহাম্মদ এর সময়ে এই রকমের ৯ টি উদ্যোগের কথা জানা যায়। ইসলামের প্রথম দিককার সময়ে যখন নতুন মানুষেরা ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছেন, সেই সময়ে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চক্র অনুষ্ঠিত হতো, নওমুসলিম দেরকে নবী মুহাম্মদের নবুওত সম্পর্কে জানানোর জন্যে। এই ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাচক্র গুলো মসজিদের বাইরেও কখনো কখনো নবী মুহাম্মদের বিভিন্ন অনুসারী বা সাহাবীদের বাসায় বা বাড়ীর আশে পাশে আয়োজন করা হতো। মাদ্রাসার এই পূর্বসূরি শিক্ষা ব্যবস্থা নবী মুহাম্মদের পরেও ইসলামের চার খলীফার আমলে উপস্থিত ছিলো।ইসলামের ইতিহাসে নিয়মতান্ত্রিক প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম নজির পাওয়া যায় খলীফা উমর এর আমলে (৬৩২ – ৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত), আনুষ্ঠানিক ভাবে মসজিদের সাথে সংযুক্ত মক্তব এর প্রথা চালু হয়।তবে অন্য কয়েকজন লেখকের মতে, মক্তব নামের প্রতিষ্ঠান গুলো মসজিদ কাঠামোর বাইরেও আয়োজিত হতো, যেমন কারো বাসায়, দোকানে এমন কি খোলা জায়গাতেও। ইসলামের প্রথম চারশো বছর শিক্ষা লাভের জন্যে এই সকল মক্তবই ছিলো একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরণ। এ সময়, মক্তব পর্যায়ের চাইতে উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্যে অনেকটা ব্যক্তিগত ভাবে যুক্ত হতে হতো আলেম বা পরিচিত সূফী সাধকদের সাথে।

এটা বলা কঠিন যে ঠিক কোন সময় থেকে মক্তবগুলো মাদ্রাসায় রুপান্তরিত হতে থাকে এবং এক সময় স্বাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়। দিন সাল ধরে এটাও বলা কঠিন যে ঠিক কোন সময় থেকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করতে থাকে। এই বিশয়ের উপরে ইস্লামীক ইতিহাসবিদ ও স্কলারদের মাঝে বিতরক ও দ্বিমত রয়েছে। যেমন, ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করেন যে ১০৬৭ সালে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা আল নিজামিয়া হচ্ছে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন নিজাম উল মুলক তুসী, যখন তিনি আব্বাসী খেলাফতের অধীনে একটি তুরকী রাজ্যের প্রধান উজির হিসাবে কর্মরত উজির ছিলেন। অন্যদিকে অপরাপর বেশ কয়েকজন গবেষক ও লেখক মতামত প্রকাশ করেন যে মাদ্রাসা আল নিজামিয়ার পূর্বেও একাধিক মাদ্রাসা সন্ধান পাওয়া যায় অস্টম থেকে দশমের শতকের শুরুর দিকে, সুতরাং মাদ্রাসা আল নিজামিয়া, এই ধারার প্রথম প্রতিষ্ঠান নাও হতে পারে। নিজাম উল মুলক প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসাটি ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা না হলেও, একথা অনস্বীকার্য যে এই মাদ্রাসাটিই প্রথম এক ধরনের মডেল হিসাবে আবির্ভূত হয় এবং এই রকমের বেশ কিছু মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয় সেই সময়ে তুরকী সেলজুক সাম্রাজ্য জুড়ে। নিজামুল মূলক তুসী এই মাদ্রাসা গুলো পরিচালনার জন্যে এক ধরনের পরিচালনা বোর্ড বা “ওয়াকফ” এর প্রচলন করেন যাদের দায়িত্ব ছিলো মাদ্রাসা গুলোর অর্থনৈতিক বিষয় গুলো দেখাশোনা করা ও এই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস, স্বায়ত্তশাসন ইত্যাদি বিষয়গুলো নিশ্চিত করা।

(চলবে)

দ্বিতীয় পর্বের লিংক এখানে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “আরব থেকে দেওবন্দ হয়ে হাটহাজারীঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক বোঝাপড়া। পর্ব – ১

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =