আরব থেকে দেওবন্দ হয়ে হাটহাজারীঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক বোঝাপড়া। পর্ব – ২

প্রথম পর্বের লিংক এখানে

পূর্ব পর্বের পর থেকে –

একাংশ ইতিহাসবিদ, নিজাম উল মূলক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাটিকে প্রথম মাদ্রাসা বলে উল্লেখ করতে দ্বিমত পোষণ করেন।এদের কয়েকজন মনে করেন বর্তমান ইরানের “নিশাপুর”এ আল ইমাম আবু বকর একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা স্থাপন করেন এবং আল ইমাম আবু বকর এর মৃত্যু হয় ১০১৪ সালে, সেই হিসাবে এই মাদ্রাসা টি নিজামিয়া মাদ্রাসার বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত, প্রায় অনেকটা মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা কালিন সময়ের কাছাকাছি।নিশাপুরের স্থানীয় মানুষদের বয়ানে জানা যায়, আবু ইসহাক ইব্রাহিম আসফারাইনিও একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং আবু ইসহাক ইব্রাহীম মারা যান ১০২৭ সালে, সুতরাং এই মাদ্রাসাটির সময়কালও নিজামিয়া মাদ্রাসা থেকে বহু পূর্বে। তুর্কী শাসক সুলতান মাহমুদের নাম ও শোনা যায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সাথে। সুলতান মাহমুদ (৯৭১ – ১০৩০) গজনীতে প্রথম একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন, সেটাও হয়ত নিজামিয়া মাদ্রাসার পূর্বে। এই হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস সম্পর্কে ইতিহাসবেত্তা দের মতামত। তবে মোটের উপরে এটা বলা যায় যে প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসার যাত্রা শুরু এগারোশ শতকের কাছাকাছি কোনও একটা সময় থেকে। ইরাকের মাদ্রাসা নিজামিয়া কে প্রথম মাদ্রাসা হিসাবে স্বীকার করার ক্ষেত্রে দ্বিমত থাকলেও, এই মাদ্রাসাটিই যে পরবর্তীতে মাদ্রাসা শিক্ষার মডেল হয়ে ওঠে সে বিষয়ে বেশীরভাগ ইতিহাসবিদ ও ইসলামী শিক্ষাবিদ একমত। মাদ্রাসা আল নিজামিয়ার মতো করে অনেকগুলো মাদ্রাসা গড়ে ওঠে সেই সময় কালে, ইরান, ইরাক, সিরিয়া এবং মিশরে। নিজাম উল মূলক একাই প্রায় এগারোটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন আজকের ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে।

এটা বলে নেয়া ভালো যে, মাদ্রাসা শিক্ষার বাইরে আরেক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থাও চালু হয়েছিলো ইসলাম প্রতিষ্ঠার শুরুর সময় থেকেই। এই ব্যবস্থার নাম “মক্তব” বা “কুত্তুব”। সপ্তম থেকে দশম শতকের সময়ে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা ছিলো মুলত ছোট আকৃতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রধানত অক্ষর জ্ঞান, গননা শিক্ষা এই ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়া হতো এখানে।কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন, “মক্তব” বা “কুত্তুব” ছিলো সাধারণ মানুষের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর মাদ্রাসা ছিলো সামর্থ্যবান বা “এলিট” দের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

“মাদ্রাসা” প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা

মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারের জন্যে দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দি কে বলা হয়ে থাকে স্বর্ণযুগ। এ সময় পুরো আরব ও উত্তর আফ্রিকার দেশ গুলোতে একের পর এক মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা হয়। মাদ্রাসার সংখ্যার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে অনেকেই সাধারণ ভাবে ইসলামে জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব হিসাবে দেখাতে চান, যদিও ইতিহাসবিদদের মাঝে বিতর্ক আছে এ বিষয়ে। হয়ত জ্ঞানের প্রসারই ছিলো মাদ্রাসা শিক্ষার বিস্তারের প্রাথমিক কারণ, কিন্তু তার পরেও অস্বাভাবিক হারে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে আরো কয়েকটি কারণের উল্লেখ পাওয়া যায় ইতিহাসবিদদের লেখালেখি তে। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারের সাথে শাসক শ্রেনীর সক্রিয় সহযোগিতা একটি বড় কারণ, শাসকদের মাঝে বিদ্যমান প্রতিযোগিতাও এর একটি অন্যতম কারণ। বিভিন্ন শাসক ও অভিজাত নাগরিক যারা শাসন ক্ষমতার খুব কাছাকাছি ছিলেন তাদের মাঝে প্রতিযোগিতা মাদ্রাসার সংখ্যা কে বৃদ্ধি করেছে গুনোত্তর ধারায়। শিয়া – সুন্নী বিরোধ আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে। এমন কি শুধু শিয়া – সুন্নী বিরোধ নয়, সুন্নী মুসলমানদের মাঝেও মজহাব সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেও অসংখ্য আলাদা আলাদা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

মুসলমানদের মাঝে শিয়া – সুন্নী বিরোধ চরম পর্যায় লাভ করে এগারোশ শতকে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক বিরোধ ছাড়াও ধর্মতাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিরোধও এই সময়ে চরম হয়ে ওঠে। শিয়া মুসলিমদের সাম্রাজ্য তখন উত্তর আফ্রিকা ও মিশরে প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁরা বেশ কিছু উচ্চতর গবেষণা ধর্মী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করেন এই সময় কালে। মিশরে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৯৭৫ সালে। খানিকটা আশ্চর্য জনক হচ্ছে, শিয়া শাসকদের দ্বারা আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ঘটনাটি সুন্নী মুসলমান শাসকগণ সুন্নীশাসন বিরোধী এক বিরাট হুমকি হিসাবে গণ্য করেন। এই হুমকিকে তাঁরা সামরিক হুমকির চাইতেও বড়ো হুমকি হিসাবে নিয়েছিলেন। ফলে এর পরবর্তী সময়ে সুন্নী শাসকেরা সরাসরি “সুন্নী মতাবাদ” প্রচার করার জন্যে অসংখ্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। নিজাম উল মূলক এর মাদ্রাসা আল নিজামিয়ার সকল মাদ্রাসার মূল উদ্দেশ্য ছিলো – ইস্মাইলিয়া শিয়াবাদের বিরুদ্ধে গোড়া সুন্নী (Orthodox Sunniism) মতবাদ কে শক্তিশালী করে তোলা।


মাদ্রাসা শিক্ষার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যাক্তি নিজাম উল মূলক তূসী।

যদিও মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন কে বলা হয় সম্পূর্ণ জীবন বিধান বা complete code of life, কিন্তু বাস্তব ইতিহাস হচ্ছে ইসলাম প্রসারের সাথে সাথে মুসলমানরা নানান ধরনের বাস্তব, পার্থিব সমস্যা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হয় যার কোনও সরাসরি উত্তর কুরআনে বা হাদিসে পাওয়া যায়না। ইসলামী আইন বা “ফিকহ” শাস্ত্রের অপ্রতুলতা প্রকট হয়ে ওঠে, ফলে প্রয়োজন হয়, ইসলামী আইনের নতুন ব্যাক্ষা এবং প্রায়শই সম্প্রসারিত ব্যাক্ষা। এই নতুন ও সম্প্রসারিত ব্যাক্ষার যায়গায় বিভক্ত হয়ে পড়েন সুন্নী পন্ডিতগন। প্রাথমিক অবস্থায় এই বিভক্তির ধরন ছিলো মারাত্মক এবং প্রায় একশোরও বেশী মজহাব এর উত্থান ঘটে। পরবর্তীতে সুন্নী ধারা চারটি প্রধান মজহাব বা ঘরানায় বিভক্ত হয়ে পড়েন। আবু হানিফা আল নোমান এর অনুসারীরা হানাফি, মালিক বিন আনাস এর মতামত মালিকি, মুহাম্মাদ ইবনে ইদ্রিস আস শাফি’র ঘরানা “শাফিঈ” এবং আহমাদ বিন হানবালির ধারা কে “হানবালী” বলে আমরা জানি। সুন্নী মুসলমানদের তুলোনায় শিয়া মুসলিমদের মাঝে বিভাজনের নজির খুব কম। জাফর আস সাদিক এর অনুসারীদের শিয়া মূল ধারার বাইরে একটি আলাদা সেক্ট বা উপদল হিসাবে জানা যায়। সুন্নী চারটি প্রধান মজহাব এবং শিয়াদের দুইটি ধারার মাঝে দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও প্রতিযোগিতা মাদ্রাসা সংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়ক ভুমিকা পালন করেছিলো। কখনও কখনও শুধুমাত্র নিজদের মতামত প্রচারের জন্যে কিম্বা বিরোধী মতামত কে ঠ্যাকানোর জন্যেও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার নজির পাওয়া গেছে ইতিহাসে। সামান্য কিছু মাদ্রাসার নজির পাওয়া যায় যারা প্রায় সকল মজহাব কেই ধারন করতেন তাদের কারিকুলাম এ, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এই সকল মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষকদের মাঝে একাধিক মজহাব এর অনুসারীরা থাকতেন। এই সকল মাদ্রাসায় একাধিক পৃষ্ঠপোষকের নিজেদের দ্বন্দ্বকেও ভোগ করতে হতো।

শাসকদের মাঝে প্রতিযোগিতা আর ইসলামী মজহাব গুলোর মাঝে প্রতিযোগিতা ছিলো দুটি প্রধান কারণ দশম থেকে দ্বাদশ শতকে মাদ্রাসার সংখ্যার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এই দুটির বাইরে আরেকটা অপ্রধান কারণ ও ছিলো ভিন্ন ভিন্ন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে। ইসলামের মধ্যে মুতাজিলা ও আশারী ঘরনার পন্ডিতদের ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের কথা সুপরিচিত।মুতাজিলা ঘরনার উত্থান অস্টম শতকের দিকে এবং এই ধারার পন্ডিতগন প্রবল ভাবে গ্রিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, এরাই কুরানের মূলধারার অনেক ব্যাক্ষা কে চ্যালেঞ্জ করেন এমন কি কুরানের ঐশ্বরিক তকমা নিয়েও প্রশ্ন করেন। এঁরা কুরানের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাক্ষায় কারণ এবং ন্যায্যতার সন্ধান করতে চান, কুরআন ও ইসলামের বিভিন্ন বিশয়কে ব্যাক্ষা করার ক্ষেত্রে পার্থিব যুক্তিবোধ ও দৈব ব্যাক্ষার সমন্বয় করতে চান। অন্যদিকে আশারী পন্থীরা মনে করেন, আল্লাহ্র সকল বৈশিস্ট কে ব্যাক্ষা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই আল কুরানের আক্ষরিক অর্থই মুসলিমদের জন্যে শিরোধার্য, মানুষের স্বাধীন মতামতের কোনও মূল্য সেখানে থাকার কোনও সুযোগ নেই। মুতাজিলা ও আশারী ঘরানার পন্ডিতদের বিরোধের জের ধরেও বেশ কিছু মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। শাসকদের সাথে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের সুবাদে মুতাজিলাদের বিপরীতে আশারী ঘরনার মাদ্রাসা গুলোর দ্রুত প্রসার ঘটে। নিজাম উল মূলক, মুতাজিলাদের কে প্রতিরোধ করবার জন্যে সেই সময়ের প্রখ্যাত আশারী ধর্মতাত্ত্বিক পন্ডিত আল গাজ্জালী কে নিয়োগ দেন।

ইসলামে মুতাজিলা পন্থীদের নিস্ক্রিয়তা মাদ্রাসা শিক্ষায় “কারণ” ও “যুক্তি” ব্যাবহার কে বহুদিনের জন্যে নির্বাসিত করে। পরবর্তী ইতিহাসে কখনও কখনও মাদ্রাসা শিক্ষা কারন ও যুক্তিভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রনয়নের চেষ্টা করা হয়েছে, এবং সে সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা আরো খানিকটা আলোকপাত করবো পরবর্তী কোনও একটি পর্বে।

ভারতে মাদ্রাসার শুরুঃ প্রাথমিক পর্যায়

ভারতে মাদ্রাসা শিক্ষার শুরু কবে সেটা সুস্পষ্ট ভাবে জানা যায়না। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের পন্ডিতদের মতে, ভারতে মাদ্রাসা শিক্ষার শুরু ৭১১ সালে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পর পরই। সিন্ধু বিজয়ের মধ্যে দিয়ে মুসলমানেরা যখন সিন্ধু ও এর আশেপাশে কলোনী স্থাপন করেন সেই সময়, ভারতে আসে আরব ব্যবসায়ীরা, আসে কিছু অভিবাসী পরিবার, সূফী সাধক ও শিক্ষক। নতুন গড়ে ওঠা জনপদের প্রয়োজনেই গড়ে ওঠে মাদ্রাসা ও মক্তব (১)। অধ্যাপক আলী রিয়াজ এর পুস্তক “Faithful Education” এ খুব সংক্ষেপে ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষার শুরু ও বিস্তারের একটি বিবরন পাওয়া যায়। আলী রিয়াজ উল্লেখ করেছেন, উত্তর ভারতে ইসলামের যাত্রা শুরু হয় সামরিক অভিযানের মধ্যে দিয়ে, সপ্তম শতকের শেষে মুহাম্মদ কাসিমের অভিযান এবং এগারোশো শতকে মুহাম্মদ ঘোরীর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে ভারতের পূর্বাঞ্চলে, বিশেষত বাংলায় ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে সূফী সাধকদের মাধ্যমে। অঞ্চল ভেদে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের এই পার্থক্যটি ইসলামের শিক্ষা ব্যবস্থা বা মাদ্রাসার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য কে প্রভাবিত করেছে।

সপ্তম শতকে মুহাম্মদ বিন কাশিমের সিন্ধু আক্রমণের হাত ধরে ভারতে মাদ্রাসা শিক্ষা বা ইসলামী শিক্ষার যাত্রা শুরু হলেও, প্রথম সঙ্ঘবদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় আরো বেশ কিছু কাল পড়ে। মুহাম্মাদ ঘোরী, বারোশ শতকের শেষদিকে ভারতে তুর্কী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১১৯১ সালে আজমীরে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা ভারতের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা হিসাবে স্বীকৃত। আরব ও মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের একের পর এক ভারত আক্রমন ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ফলে এখানকার স্থানীয় প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পত্তনের বিষয়টি এই লেখায় প্রাসঙ্গিক নয়, তবে একথা উল্লেখ করা দরকার যে ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষার বিস্তার নানান অঞ্চলে ভারতীয় প্রথাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা “টোল” বা “পাঠশালা” নামে পরিচিত ছিলো সেসবের উপরে কি রকমের প্রভাব বা অভিঘাত তৈরী করেছিলো তা বিস্তারিত জানা যায়না এই সকল মাদ্রাসা বিষয়ক গবেষণাগুলোতে।

ভারতে “দিল্লী সুলতানাত” স্থায়ী হয় প্রায় ৩২৫ বছর (১২০১ – ১৫২৮)। চারজন তুর্কী ও একজন আফগান বংশোদ্ভূত সুলতান এই সময়ে দিল্লী ও এর আশেপাশের এলাকা নিয়ে সাম্রাজ্য করেন।খুব পরিকল্পিত ভাবে না হলেও এই সময়টিতে ভারতে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে ব্যাপক উদ্যোগ লক্ষ্য করা গেছে। এই উদ্যোগের একটি প্রধান দিক ছিলো মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ। দিল্লীতে প্রথম মাদ্রাসা স্থাপিত হয় শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ এর আমলে (১২১১-১২৩৬)। দিল্লী সুতানাত এর পাঁচটি রাজবংশের মাঝে তুঘলোকদের আমলে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ধুম লক্ষ্য করা যায়। এক মুহাম্মদ বিন তুঘলোক এর ২৫ বছরের শাসনামলে শুধুমাত্র দিল্লীতেই প্রায় এক হাজার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মাদ্রাসা গুলোর বেশীরভাগই তখন পরিচালিত হতো ইরাক ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন মাদ্রাসার আদলে, প্রায় একই রকমের কারিকুলাম অনুযায়ী। এই মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রমে তখন অন্তরভুক্ত ছিলো – ব্যাকরন, যুক্তিবিদ্যা, ইসলামী আইন, কুরআন, হাদিস, সুফীবাদ ও ধর্মীয় দর্শন। মঙ্গোলদের দ্বারা আব্বাসীয় রাজবংশের পতনের পরে একটা বড়ো অংশের ইসলামী স্কলার দল বেঁধে পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নেয়। ফলে উত্তর ভারতের এই সকল মাদ্রাসা গুলোর শিক্ষা পদ্ধতি, কারিকুলাম ব্যাপক ভাবে সূফী হানাফি মযহাব এর ইসলামিক চিন্তাধারা দিয়ে প্রভাবিত ছিলো। যেহেতু উত্তর ভারতের মুসলিম শাসকদের প্রায় সবাই সূফী ও প্রধানত হানাফি ঘরানার ছিলেন, উত্তর ভারতের অথবা বলা চলে সেই সময়ের প্রায় সকল মাদ্রাসাই ছিলো সূফী হানাফি মযহাব প্রভাবিত।

ভারতের প্রায় সকল মাদ্রাসাই ছিলো সুন্নী এবং হানাফি চিন্তার অনুসারী। খুব সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছিলো। দক্ষিন ভারতে ডেক্কান রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো স্বাধীন মুসলিম রাজত্ব যার ক্ষমতায় ছিলো বাহমানি রাজ বংশ। এ রাজবংশের, মাহমুদ শাহ এর উদ্যোগে ১৩৭৮ সালে স্থাপিত হয় প্রথম মাদ্রাসা। খানিকটা অবাক করা বিষয় হচ্ছে, সুফি হানাফিদের প্রবল প্রতাপের সময়ও ভারতের এই অঞ্চলে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় শিয়া ইসলামকে প্রচার এর লক্ষ্য নিয়ে। প্রায় দুই শতক ধরে এঁরা রাজত্ব করেন এবং এই এলাকায় গড়ে তোলেন বেশ কিছু মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসা গুলোতে কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে যা সূফী হানাফিপন্থী মাদ্রাসাগুলোর চাইতে বেশ খানিকটা আলাদা। এই মাদ্রাসা গুলোতে দেশ বিদেশ থেকে অনেক ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের আমন্ত্রন জানানো হয়েছিলো শিক্ষক ও গবেষক হিসাবে। এই মাদ্রাসাগুলোতেই ধর্মীয় এবং সেকুলার (পার্থিব) উভয় ধরনের বিশয়ই পড়ানো হতো। মাদ্রাসাগুলো কে ব্যক্তিগত অনুদানের বদলে রাস্ট্রিয় ফান্ডিং এর অধীনে নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং ছাত্রদের থাকা ও খাওয়া দাওয়ার ভারও মাদ্রাসা বহন করতো।

বাংলায় মাদ্রাসা শিক্ষার যাত্রা

এবার আসা যাক, তৎকালীন বাংলায় মাদ্রাসার আদি ইতিহাসের কথায়। বাংলায় আনুষ্ঠানিক ভাবে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা হয় দিল্লী সুলতানাত এর সময়ে, কিন্তু প্রাথমিক ও অস্থায়ী ভাবে বেশ কিছু ইসলামী আবহের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু ছিলো আরো অনেক আগে থেকেই। যেহেতু বাংলায় সরাসরি যুদ্ধ বা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত হয়নি, তাই এখানে ইসলাম প্রচারক হিসাবে এসেছেন বহু সুফীসাধু, সন্ন্যাসী এবং পীর। এই সকল সূফী সাধকরা এক স্থানে খুব দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেন না। তাঁরা স্থান বদল করতেন। আর জেখানেই জেতেন, তাঁরা চেষ্টা করেছেন এক ধরনের আলোচনা চক্র বা শিক্ষা চক্র গঠনের। প্রচলিত অর্থে এই ছোট ছোট দলের ধর্মীয় সমাবেশ গুলো কে বলা হতো “খানকাহ”। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই সকল “খানকাহ” ছিলো কোনও একজন সূফী সাধকের বাস স্থানে বা আখড়ায়। এই খানকাহ গুলোতে কোনও নির্দিষ্ট সিলেবাসের অধীনে পড়াশুনা বা অক্ষর জ্ঞান দেবার ব্যবস্থা ছিলোনা। এই ধরনের আয়োজনে, সূফী সাধকরা তাদের নিজের জ্ঞান ও বোঝাপড়া সরাসরি শেয়ার করতেন আগ্রহী ভক্তদের সাথে। এখানে কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে আলোচনা করা হতো, কিন্তু কোনও রকমের সুনির্দিষ্ট কাঠামো ব্যতিত। অনেক গবেষক মনে করেন, বাংলায় এই খানকাহ গুলোই ধীরে ধীরে মক্তবে রুপান্তরিত হয় যা কিনা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর বলে বিবেচিত হয়।

কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিত, বাংলায় সেই সময়কার বেশীরভাগ মাদ্রাসাই ধনী মানুষের সাহায্য ও সামাজিক অনুদানের অর্থে পরিচালিত হতো। ১১৯৭ সালে বখতিয়ার খিলজির সামরিক অভিযাণের পর থেকে মাদ্রাসা ও মক্তব গুলো কিছু কিছু করে শাসকদের অনুদান পেতে শুরু করে। বখতিয়ার খিলজি নিজে এবং তাঁর পরবর্তী শাসকেরাও বেশ কিছু মাদ্রাসা স্থাপন করেন।মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু জয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষে যে ইসলামী শিক্ষার শুরু টা দিল্লী সুলতানাত এর সময় খানিকটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করে, তবে সুনির্দিষ্ট নিতিমালা ও পাঠ্যক্রমের অধীনে মাদ্রাসা শিক্ষার শুরু হয় মুঘল আমলে। তাই ভারতবর্ষে মাদ্রাসার মূলধারা বলতে বোঝানো হয়ে থাকে ১৫২৮ সালে মুঘলেরা ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসকে।

(চলবে)

পরবর্তী পর্বে মুঘল আমলে মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস !

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “আরব থেকে দেওবন্দ হয়ে হাটহাজারীঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক বোঝাপড়া। পর্ব – ২

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 4