মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাম্প্রতিক ব্যাকরণ

[প্রবন্ধটি লিখেছেন, আজফার হোসেন। এটি ছাপা হয়েছিল ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্তে। ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০০৭ থেকে নেয়া। লেখাটি বেশ আগের হলেও মোটেও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। বরং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাম্প্রতিক চেহারার যে বয়ান লেখক দিয়েছেন তা আরো ভয়ঙ্কর হচ্ছে দিনকে দিন। বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট বুঝতে প্রবন্ধটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।]

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে বিভিন্ন বিশেষণে চরিত্রায়িত করার রেওয়াজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই চালু হয়েছে। ২০০৩ সালে সিয়াটল্‌ মহানগরীতে অনুষ্ঠিত এক বিশাল যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে ফিলিস্তিনি তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংগঠক জুবায়ের বিন তালেব সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন বিশেষণের একটা ফর্দ পেশ করেন এভাবে : ‘নতুন সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘সামরিক সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ,’ ‘অগ্রসর সাম্রাজ্যবাদ’ এবং এমনকি ‘অতিপ্রাকৃত সাম্রাজ্যবাদ।’

এও বলা দরকার যে, ১১ই সেপ্টেম্বরের আগে একদল ‘উত্তর-বাদী’ (পোস্ট-অল্‌) তাত্ত্বিক, অর্থাৎ উত্তর-কাঠামোবাদী ও উত্তর-আধুনিকতাবাদী তাত্ত্বিক, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী চেহারাকে প্রচ্ছন্ন করার উদ্দেশ্যেই ‘উত্তর-সাম্রাজ্যবাদ’ বা ইংরেজিতে ‘পোস্ট-ইম্পিরিয়ালিজম’ বর্গটি চালু রেখেছিলেন। কিন্তু, না, শেষ পর্যন্ত ওই বর্গটি ধোপে টেকে নি, কেননা সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে দ্বিধাবোধ করছে না মোটেই। মার্কিন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক জন্‌ বেলামি ফস্টারের মতে ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’-এর ধারণাটিই এখন সবচাইতে যুৎসই ধারণা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে অনেকের কাছে। এ-বিষয়টি তলিয়ে দেখা বর্তমান রচনার একটি উদ্দেশ্য, যদিও একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু তার আগে জুবায়ের বিন তালেবের ওই ফর্দের তাৎপর্য নিয়ে কিছু বলা দরকার।

সাম্রাজ্যবাদকে বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত করার ব্যাপারটি একাধিক ইঙ্গিতকেই সামনে আনে। প্রথমত, সাম্রাজ্যবাদের যুগ শেষ হয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, বরঞ্চ সাম্রাজ্যবাদ আরো আগ্রাসী হয়ে তার উপস্থিতি সরবে ঘোষণা করছে এমনভাবে যে, খোদ মার্কিনীদের মধ্যেই যারা একসময় সাম্রাজ্যবাদকে সেকেলে রেটোরিক বলে উড়িয়ে দিত, এমনকি তারাও সাম্রাজ্যবাদকে ওই সাম্রাজ্যবাদ নামেই ডাকতে বাধ্য হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ওই ফর্দ আরো নির্দেশ করে যে, সাম্রাজ্যবাদের চেহারা একটি নয়, একাধিক। অথবা বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদ বিভিন্ন বেশে বিভিন্নভাবেই উপস্থিত হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছে। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন ধরনের অসম ক্ষমতা-সম্পর্ক তৈরী করে তাকে বিভিন্ন পরিসরে বিকীরিত করে চলেছে আজকের সাম্রাজ্যবাদ। এই সাম্রাজ্যবাদ একই সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক, মতাদর্শিক এবং পরিবেশগতও। সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন কিন্তু পরস্পর-সম্পর্কিত চেহারা ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা করাও বর্তমান রচনার একটি উদ্দেশ্য।


কিন্তু ‘সাম্রাজ্যবাদ বলাটাই যথেষ্ট নয়, বলতে হবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথা’-এমনি একটি স্লোগান ২০০৩ সালেই লাতিন আমেরিকার-বিশেষ করে ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা ও এল সালভেদরের-একাধিক যুদ্ধবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে অনিবার্য ভাবেই উঠে এসেছিল। জোর দিয়েই বলা দরকার যে, এ-স্লোগান ওই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উত্তরবাদী কেতাবি তত্ত্বের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে থাকে। এখানে একটি বহুল-আলোচিত ও বিতর্কিত বইয়ের নাম উল্লেখ করতে হয়। বইটির নাম এম্পায়ার। লিখেছেন মাইকেল হার্ট ও আন্তোনিও নেগ্রি। প্রথমজন মার্কিন অধ্যাপক আর দ্বিতীয়জন ইতালীয় তাত্ত্বিক ও এ্যাকটিভিস্ট। উভয়েই হাল আমলের নতুন নতুন ইউরোপীয় তত্ত্বে আগ্রহী। এ-সব তত্ত্বে বুঁদ হয়ে এবং জনগণের চলমান সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে নাত্রিক দূরত্বে অবস্থান করেই হার্ট ও নেগ্রি তাঁদের ওই ঢাউস বইটি লিখেছিলেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আগেই, অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক-সামরিক শক্তির প্রতীক নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও ওয়াশিংটন ডিসি’র পেন্টাগন ধসে যাওয়ার আগেই। কিন্তু আমরা দেখছি যে, প্রতীকের চেয়ে আরো বাস্তব এবং নিঃসন্দেহে অনেক বেশি শক্তিশালী হচ্ছে যা প্রতীকায়িত, অর্থাৎ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেই, যা অবশ্য দেখেন নি হার্ট ও নেগ্রি। দেখেন নি বলেই ২০০০ সালে প্রকাশিত ওই বই-এ উত্তর-আধুনিকতাবাদী হার্ড ও নেগ্রি তাঁদের মূল কথাটা বলেন এভাবে :

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বা কোনো জাতি-রাষ্ট্রই, এখন আর সাম্রাজ্যবাদ প্রকল্পের কেন্দ্রে অবস্থান করে না। সাম্রাজ্যবাদ এখন বিগত। কোনো জাতির পক্ষে এখন আর বিশ্বের মোড়ল হওয়া সম্ভব নয়, যা একসময় ইউরোপীয় জাতিগুলোর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল।

বলা দরকার যে, হার্ট ও নেগ্রি উত্তর-আধুনিকতাবাদী কায়দায় সাম্রাজ্যের সর্বত্রগামী শক্তির কথা বলতে গিয়েই তার কেন্দ্রকে দেখতে চান নি। তাঁরা অবশ্য ‘সাম্রাজ্য’ কথাটা রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু বাদ ফেলতে চাইছেন ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বর্গটিকে। কারণ-তাঁদের মতে-বর্গটি সেকেলে এবং বর্তমান সময়ে বর্গটি তার বিশ্লেষণী শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এভাবে জোর ক’রে নতুন কিছু বলার এবং চমক দেয়ার তাগিদেই হার্ট ও নেগ্রি বলেছেন নামহীন, অবয়বহীন, সীমাহীন, কেন্দ্রহীন, ভূতুড়ে, সার্বভৌম সাম্রাজ্যের কথা। তাঁদের মতে এই সাম্রাজ্যের ভেতরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি সুবিধাজনক পরিসর দখল করে আছে মাত্র। হার্ট ও নেগ্রির এই ‘যুক্তি’গুলোকে এবং বিশেষ ক’রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়-দেয়ার বিষয়টিকে এর মধ্যেই তুলোধুনো করেছেন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক লড়াকু তাত্ত্বিক। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন ফিলিপিনি তাত্ত্বিক ই-স্যান হুয়ান, পুর্তো-রিকোর সমাজতাত্ত্বিক হোসে আনাজাগাস্তি, ভারতীয় সংস্কৃতি-সমালোচক এজাজ আহমেদ, কেনিয়ার ঔপন্যাসিক-তাত্ত্বিক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো ও ফিলিপাইনের নারীবাদী তাত্ত্বিক ডেলিয়া আগুইল্যার। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই মান্থলি রিভিউ পত্রিকাটি হার্ট ও নেগ্রির সমালোচনায় মুখর ছিল, যেমন রিথিংকিং মার্কসিজম পত্রিকাও একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে হার্ট ও নেগ্রির যুক্তিগুলোকে বিভিন্নভাবে মোকাবেলা করার লক্ষ্যেই।

এখানে ওইসব সমালোচনার খুঁটিনাটিতে প্রবেশ করা সম্ভব না হলেও সমালোচনাগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যকে মোটা দাগে অল্পায়াসেই শনাক্ত করা যায়। সাম্রাজ্যবাদ বিভিন্ন বেশে ও চেহারায় বিভিন্ন পরিসরে বা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় উপস্থিত, প্রভাবশালী ও আগ্রাসী হওয়ার অভূতপূর্ব ক্ষমতা অর্জন করলেও সাম্রাজ্যবাদ নির্দিষ্ট নামে এবং নির্দিষ্ট জাতীয় পতাকা নিয়েই উপস্থিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, ইরাকে ও আফগানিস্তানে তো বটেই। এই সাম্রাজ্যবাদের নাম মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই, কেননা কোথাও নিজের পতাকা লুকিয়ে ফেলার এখন কোনো ইচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেই। শুধু নিজের দেশের সুপারমার্কেটগুলোতে বিভিন্ন পণ্যের গায়েগায়েই যে মার্কিন পতাকা লেপ্টে থাকে তা নয়, এখন সারাপৃথিবীতেই তৈরী-করা তার প্রায় ৭০০টি সামরিক ঘাঁটিতে পতপত করে উড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। ইউরোপসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় তৈরী-করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রায় ৭০০টি সামরিক ঘাঁটি কোনো অদৃশ্য, বায়বীয়, ভূতুড়ে জায়গা নয় মোটেই। সারা পৃথিবীকে একলা শাসন করবে বলেই এই ঘাঁটিগুলো তৈরী করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে বিষয়টি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এক অভূতপূর্ব সামরিকায়নকেই নির্দেশ করে বটে। এ-অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ এমনকি ঈশ্বরের মতো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হতে চাইলেও চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে সে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। শুধু দৃশ্যমানই নয়, সে কেন্দ্রীয় অবস্থানেই দৃশ্যমান বটে।

দ্বিতীয়ত, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জনগণের চলমান সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনগুলো থেকে উঠে-আসা যুক্তি ও তত্ত্বগুলো সরাসরিই বলে দেয় যে, আমরা এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাম্প্রতিকতম স্তরেই বাস করছি। বছর কয়েক আগে ক্যারিবীয় অঞ্চলে-বিশেষ করে গ্রানাডায়-একাধিক যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে গ্রানাডার বিপ্লবী মরিস বিশপের ওই কথাটা নিঃশ্বাসের মতো অনিবার্য হয়ে বারবারই উচ্চারিত হয়েছে : ‘আমাদের সময়ের প্রধান ও প্রাথমিক সমস্যা হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।’ দুটো বিকল্প বৈশ্বিক মিডিয়া-‘ইন্ডি-মিডিয়া’ ও ‘জি-নেট’-গত কয়েক বছরে ইরাকের প্রায় শতাধিক ছোটো-বড়ো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন ও তৎপরতার খবর আমাদেরকে দিয়েছে। ওইসব তৎপরতা হার্ট ও নেগ্রিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই চিনে নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদকে-যে-সাম্রাজ্যবাদের নাম মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

তৃতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদের চরিত্রায়নে ‘কেন্দ্রহীন’ বা ‘নামহীন’ বা ‘অবয়বহীন’ বা ‘ভূতুড়ে’ বা ‘ঠিকানা-সীমানাবিহীন’ ইত্যাকার বিশেষণের ব্যবহার ওই সাম্রাজ্যবাদকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার ঘোর তৈরী করে এমনভাবে যে, সুনির্দিষ্ট সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তখন অর্থহীন ঠেকে। অর্থাৎ হার্ট ও নেগ্রির উত্তর আধুনিকতাবাদী চরিত্রায়ন সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার এক ধরনের বিরাজনীতিকরণকেই উৎসাহিত ও সহায়তা করে।

চতুর্থত, যেখানে হার্ট ও নেগ্রি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আড়াল করতে গিয়েই বলেছেন কেন্দ্রহীন ও অবয়বহীন ভূতুড়ে সাম্রাজ্যের কথা (হায়রে উত্তর-আধুনিকতা-বাদীদের কেন্দ্র-ভাঙার নমুনা!), সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘থিংক-ট্যাংকে’র আলোচনা এবং এমনকি কিছু সরকারি পলিসি-সংক্রান্ত আলোচনা সাম্রাজ্যবাদ কথাটাকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে নির্দ্বিধায়। অর্থাৎ ৱায়ুযুদ্ধ চলাকালীন পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ছদ্মবেশে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবেই হাজির থেকেছে, সেখানে আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পরিত্যাগ করেছে তার সকল ছদ্মবেশ, এমনকি খুলে ফেলেছে তার সমস্ত বসন। জন বেলামি ফস্টার একেই বলেছেন ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ।’ তিনি তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ নেকেড ইম্পিরিয়ালিজম-এ অসংখ্য প্রমাণ হাজির করেছেন ওই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের ধারণাকে পরিষ্কার করার জন্যই।


জন বেলামি ফস্টারের নেকেড ইম্পিরিয়ালিজম প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক মহলে তা বেশ সাড়া জাগায়। শুধু তাই নয়, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে বইটি। বইটির মূল বক্তব্য সংক্ষেপে এভাবে পেশ করা যায় : যদিও ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক তৎপরতা অনেকের কাছে ‘নতুন সামরিকবাদ’ ও ‘নতুন সাম্রাজ্যবাদ’-এর আকারে হাজির হয়েছে, আসলে সামরিকবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মোটেই নতুন কোনো বিষয় নয়, কেননা তার জন্মলগ্ন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেই তার আধিপত্য বৈশ্বিক পরিসরে বিস্তৃত করতে চেয়েছে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সাম্রাজ্যবাদী আকাঙা ঊনিশ শতকে সাংস্কৃতিক বৈধতাও লাভ করে এমনি এক মাত্রায় যে, গণতান্ত্রিক, মহৎ, মানবতাবাদী কবি ব’লে বিশ্বখ্যাত ওয়ল্ট্‌ হুইটম্যানও তাঁর কিছু কিছু কবিতায় সে আকাঙা সরাসরি প্রকাশ করেন।) কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সামরিকবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ নতুন কোনো বিষয় না হলেও তাদের ইতিহাস কি কেবল স্থিরই থেকেছে? উত্তরে ফস্টার ‘না’ বলেছেন অবশ্যই। তবে, ফস্টারের মতে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেহারায় যে পরিবর্তন লণীয়, তা হচ্ছে তার নগ্ন বর্বরতা বা বর্বর নগ্নতার অভূতপূর্ব প্রকাশ, যে-নগ্নতার প্রমাণ বাস্তব পৃথিবীতে তো বটেই, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিসিয়াল রেটোরিক’-এ পাওয়া যায়। এখানে কয়েকটি প্রমাণ হাজির করা যাক।

২০০০ সাল। তখন রিচার্ড হাস্‌ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরা কাউন্সিলের একজন প্রভাবশালী সদস্য। শুধু তাই নয়, প্রথম বুশের একজন বিশেষ সহকারীও সে, যাকে পরবর্তী সময়ে নব্য-নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রতি জর্জ ডাব্লিউ বুশের স্বরাষ্ট্র বিভাগের নীতি প্রণয়ন ও পরিকল্পনার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই রিচার্ড হাস্‌ ২০০০ সালের ১১ই নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘পলিসি-পেপার’ পেশ করেন, যার শিরোনাম ‘ইম্পিরিয়াল আমেরিকা’। শিরোনাম নিজেই তাৎপর্যপূর্ণ বটে। নীতিমালা প্রণয়ন-সংক্রান্ত ওই রচনায় পরিষ্কারভাবে বলা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ‘সনাতন জাতি-রাষ্ট্রের ভূমিকা পালনের পরিবর্তে সরাসরি সাম্রাজ্যের শক্তির চেহারা নিয়ে উপস্থিত হতে হবে, (নেকেড ইমপিরিয়ালিজম, পৃ ১৭)। ফস্টার নিজেই ওই রচনাকে এভাবে উদ্ধৃত করেন :

সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্র নীতির জন্য প্রয়োজন এমন এক নীতি যা কতোগুলো বিশেষ কৌশলে পৃথিবীর পুনর্বিন্যাসে সহায়তা করবে… এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে ঊনবিংশ শতাব্দীর গ্রেট ব্রিটেনের মতোই। (পৃ ১৭)

ঊনবিংশ শতাব্দীর গ্রেট ব্রিটেনের মতো? হ্যাঁ, জোরেশোরেই সেই তুলনাটাকে সামনে এনেছেন রিচার্ড হাস্‌। দরকার হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিরে যাবে ধ্রুপদী উপনিবেশবাদের যুগেই; দরকার হলে সে জোর করেই দখল ও শাসন করবে অন্যের ভূমি। না, এখানে ছদ্মবেশ ধারণ করার কোনো অবকাশ নেই। হাসের বক্তব্য অনুসারে সাম্রাজ্যের কৌশল প্রয়োগই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখন অনিবার্য মিশন। আমরা তো জানিই যে, ১১টি ভার্জিন আইল্যান্ডসহ পুর্তোরিকো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপনিবেশ। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক ও আফগানিস্তান দখল এবং সে-সব অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি শারীরিক উপস্থিতি হার্ট-ও-নেগ্রি-কথিত অবয়বহীন ভূতুড়ে সাম্রাজ্যের উত্তর-আধুনিকতাবাদী ধারণাকে নিমেষেই অকেজো প্রমাণ করে এবং এমনকি যাকে মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও ভূগোলবিদ ডেভিড হারভি তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত দ্য নিউ ইম্পিরিয়ালিজম গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদের ‘টেরিটোরিয়াল লজিক’ বলেছেন, তারই প্রাসঙ্গিকতাকে প্রমাণ করে।

ডেভিড হারভি’র দ্য নিউ ইম্পিরিয়ালিজম দু’টো পরস্পর-সম্পর্কিত সাম্রাজ্যবাদী ‘লজিক’-এর ধারণাকে সামনে আনে : একটি হচ্ছে ক্ষমতার পুঁজিবাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ‘লজিক’ এবং অপরটি ক্ষমতার ‘টেরিটোরিয়াল’ বা ভূগোল-ও-ভূমি-সংক্রান্ত লজিক। পরের লজিকের মোদ্দা কথাটা হচ্ছে এই : আজকের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কেবল অনানুষ্ঠানিক ও পরো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শাসনকে বা আধিপত্যকেই নির্দেশ করে না; পুঁজিবাদের বিকাশের ও পুঁজির সংবর্ধনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক তাগিদেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে সরাসরি ভূমিদখল, ভূমিদস্যুতা বা ভূমিলুণ্ঠন, যে-কাজটি করার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এসেছে নিদেনপক্ষে সেই ঊনিশ শতক থেকেই। আজ সেই ভূমিদখল বা ভূমিলুণ্ঠন পেয়েছে আরো তীব্রতা। আসলে শুধু ধ্রুপদী উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রেই নয়, আজকের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেহারা ও চরিত্র বোঝার জন্যই ভূমি-প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়।

‘ভূমিতেই সাম্রাজ্যবাদ সবচাইতে দৃশ্যমান ও নগ্ন হয়’-কথাটা একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো। ভূমি যে সাম্রাজ্যবাদের জন্য-বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য-ঐতিহাসিকভাবে কতটা জরুরী হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে ক্যাস্ত্রোর একটি চমৎকার আলোচনা আছে তার সাম্প্রতিক গ্রন্থ ওয়ার, রেইসিজম্‌ এ্যান্ড একোনমিক ইনজাস্টিস-এ। সেখানে ক্যাস্ত্রো আমাদের জানাচ্ছেন যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস এবং তার ভূমিদখলের ও ভূমিদস্যুতার ইতিহাস কেবল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কালেই সীমাবদ্ধ নয়।

ক্যাস্ত্রোর মতে সেই ইতিহাসের জন্য আমাদেরকে যেতে হবে ঊনিশ শতকেই। তিনি তিনটি গরুত্বপূর্ণ সনের ওপর জোর দেন। এগুলো হচ্ছে ১৮২৩, ১৮৪৮ এবং ১৮৯৮। হ্যাঁ, ১৮২৩ সালে সরবে ঘোষিত হয় ‘মনরো ডকট্রিন।’ তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতির নামাঙ্কিত এই মতবাদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিদস্যুতার একটি মতাদর্শিক ভিত্তি তৈরি করার তাগিদেই প্রচার করে যে, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের হাত থেকে রা করার জন্যই লাতিন আমেরিকাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে রাখা জরুরী। রাষ্ট্রপতি মনরো নিজেই একটি রূপক চালু করেন : ‘লাতিন আমেরিকা হচ্ছে আমাদের বাড়ীর পশ্চাদ্ভাগের উঠোন।’ কিন্তু মতবাদ ও রূপকের চেয়ে আরো সত্য ও বাস্তব হয়ে থাকে ইতিহাসে মূর্ত-হয়ে-ওঠা ঘটনা। ১৮৪৮ সালে মেক্সিকোর অর্ধেকেরও বেশি ভূমি ছিনিয়ে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ভৌগোলিক সীমানা সম্প্রসারিত করে। এভাবে নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে ওঠেন অসংখ্য মেক্সিকান। এরপর ১৮৯৮ সালে উঠতি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিদখলের ও ভূমিদস্যুতার চেহারা আরো নগ্ন হয় : কিউবা, পুর্তো-রিকো, গুয়াম, হাওয়াই এবং ফিলিপাইনস্‌ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপনিবেশে রূপান্তরিত হয়। মার্কিন সামরিক ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ব্লামের গবেষণা-মোতাবেক ভূমিদখলের জন্য বিংশ শতাব্দীতে কেবল লাতিন আমেরিকাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় শতাধিক ছোটো-বড়ো ও প্রত্য-পরো সামরিক যুদ্ধ পরিচালিত হয়।

এই ইতিহাস থেকে আজকের নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপতৎপরতাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না মোটেই। এমনকি মার্কিন সরকারের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীসহ সরকার-প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রিত পত্রিকাগুলো ওই ইতিহাসকেই স্মরণে রেখে আজকের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সরাসরি মতাদর্শিক বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে ইতিমধ্যেই। ফস্টার নিজেই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের ধারণাকে পরিষ্কার করার জন্য উদাহরণ জড়ো করেছেন একের পর এক। যেমন ধরা যাক, ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশানস’-এর কথা এবং তার সিনিয়র ফেলো ম্যাকস্‌ বুটের একটি রচনার কথা। ২০০৩ সালে ৬ই মে ইউ.এস.এ টুডে নামের একটি প্রধান পত্রিকায় ম্যাকস্‌ বুট-এর যে প্রবন্ধটি ছাপা হয়, তার শিরোনামই চট করে বলে দেয় ওই প্রবন্ধের মূল কথাটাই। শিরোনামটি হচ্ছে ‘আমেরিক্যান ইম্পিরিয়ালিজম? : নো নীড টু রান ফ্রম দি লেবেল।’ ম্যাকস্‌ বুটের মতে সাম্রাজ্যবাদকে গালি হিসেবে বিবেচনা না ক’রে বরঞ্চ ঐতিহাসিকভাবে কার্যকর তাবৎ সাম্রাজ্যবাদী কলাকৌশল ও অনুশীলনকে যথাযথভাবে ব্যবহার করাই হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজ। ওই ২০০৩ সালেই এ্যান্ড্রু বেইস্‌ভিচের সম্পাদনায় বের হয় একটি প্রবন্ধ-সংকলন, যার শিরোনাম দ্যা ইম্পিরিয়াল টেনস্‌। সেখানে দীপক লাল নামের আরেক ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর একটি প্রবন্ধ আছে। ওই প্রবন্ধটির শিরোনামই বলে দেয় লালের বক্তব্যটা কি। শিরোনামটি হচ্ছে ‘ইন ডিফেন্স অব এম্পায়ারস্‌।’ সেখানে লাল বলছেন :

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজ হবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ব্যবস্থা তৈরী করা। অনেকেই দোষারোপ করে বলেন যে, স্থিতাবস্থার এ-ধরনের পুনর্বিন্যাস সাম্রাজ্যবাদের কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের তেল নিয়ন্ত্রণের আকাঙাকেই নির্দেশ করবে। কিন্তু আপত্তিকর হওয়া তো দূরের কথা, সাম্রাজ্যবাদই এখন জরুরী, ওই মধ্যপ্রাচ্যে একটি ব্যবস্থা নির্মাণের স্বার্থেই (নেকেড ইম্পিরিয়ালিজম-এ উদ্ধৃত, পৃ ৭)

লণীয় যে, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই যেখানে উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবীরা বড়ো জোর আভাসে-ইঙ্গিতে ইনিয়ে-বিনিয়ে সাম্রাজ্যবাদের কথা বলেন, বা যেখানে তাঁরা সাম্রাজ্যবাদ শব্দটিই উচ্চারণ করতে নারাজ, সেখানে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের আলোচনায় বা সরকারী আলোচনায় ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বর্গটি কেবল স্পষ্টোচ্চারণেরই বিষয় থাকছে না, বরঞ্চ তা লাভ করেছে এক অভূতপূর্ব মতাদর্শিক বৈধতা। আবারও ওই ২০০৩ সালের ৫ জানুয়ারী নিউ ইয়র্ক টাইমস্‌ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেই মুদ্রিত হয়েছে এই পঙ্‌ক্তিটি-‘আমেরিকান এম্পায়ার : গেট ইউজড্‌ টু ইট।’ অর্থাৎ পত্রিকাটি ডাক দিচ্ছে আমাদেরকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য। আমাদের প্রাত্যহিক অনুশীলনে বা আমাদের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতায়, অনুষঙ্গে, অনুপুঙে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ লাভ করুক প্রশ্নাতীত স্বাভাবিকতা, এই ল্যেও তো কাজ করে চলেছে মার্কিন রাষ্ট্রসহ তার মতাদর্শিক ও দমনমূলক সব ‘এ্যাপারেটাস্‌’, বিশেষ ক’রে তার সামরিক বাহিনী, মিডিয়া ও ভাড়াটে বা তাঁবেদার বুদ্ধিজীবীদের দল, যাদের আবার জাতীয় সংস্করণ পাওয়া যাবে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। বাংলাদেশেও আছে ওইসব বুদ্ধিজীবী যাদের কিছুদিন আগেই দেখা গিয়েছে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিসের বিদায়ী সম্বর্ধনায়। এটা বলাই যথেষ্ট নয়। আসলে গত ছত্রিশ বছরে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেই সংস্কৃতিই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সত্যিকার অর্থে শুধু প্রশ্নাতীত করেই রাখে নি, বরঞ্চ তার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লেনদেনের প্রায়-নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস তৈরী করে রেখেছে। সেটি আরেক প্রসঙ্গ। সে-প্রসঙ্গে পরে ফিরে আসা যাবে।


নিঃসন্দেহে নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঐতিহাসিকতা ও সাম্প্রতিকতাকে স্পষ্ট করার ভেতর দিয়ে ওই সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বায়নে জন বেলামি ফস্টারের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁর তত্ত্বায়নের পেছনে রয়েছেন তৃতীয় বিশ্বের-অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার-এক দল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তাত্ত্বিক। এখানে তাঁদের প্রসঙ্গে দু-একটা কথা বলা দরকার।

১৯৬৬ সাল। কিউবার হাভানায় অনুষ্ঠিত হয় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবীদের নিয়ে এক মহাসম্মেলন। এর নাম দেয়া হয় ‘ত্রিমহাদেশীয় মহাসম্মেলন’ বা ‘ট্রাইকন্টিনেন্টাল কনফারেন্স।’ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা-বিপ্লবী সংহতি নির্মাণের এক উজ্জ্বল পদপে। এই মহাসমাবেশে ফিদেল ক্যাস্ত্রো উপস্থিত ছিলেন তো বটেই, আরো ছিলেন ভিয়েতনামের হো চি মিন, ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে এইমে সেজেয়ার, ঘানার কোয়ামে নক্রুমা, চিলির সালভেদর আয়েন্দে, কেইপ ভার্দের আমিলকার কাবরালসহ আরো অনেকে। সমাবেশে এশিয়া থেকে ১৯৭ জন ও আফ্রিকা থেকে ১৫০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আরো উপস্থিত ছিলেন লাতিন আমেরিকার ২৭টি দল থেকে ১৬৫ জন প্রতিনিধি। যদিও মহাসমাবেশটি কিউবায় অনুষ্ঠিত হয়, চে গুয়েভারা সেখানে উপস্থিত হতে পারেন নি, কেননা তিনি তখন বলিভিয়ায় বিপ্লবী গেরিলা যুদ্ধে ব্যস্ত। তবে সেখান থেকে তিনি পাঠিয়েছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত ‘মেসেজ টু দ্য ট্রাইকন্টিনেন্টাল।’ বলা দরকার, ‘ত্রিমহাদেশীয়’ বা ‘ট্রাইকন্টিনেন্টাল’ বর্গটি চে গুয়েভারাই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।

এখানে ‘ত্রিমহাদেশীয় মহাসম্মেলন’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ আখ্যান বা এমনকি তার কোনো সংপ্তি রেখালেখ্যও উপস্থিত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে, ইতিহাসের এ ঘটনাটিকে স্মরণে বা বিবেচনায় রাখা দরকার এ-কারণে যে, ষাটের দশকের শেষ দিক থেকেই, অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রস্থানের মুহূর্তেই, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্নতাকে বিবেচনায় রেখেছিলেন তৃতীয় বিশ্বের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবীরা, যাঁরা সাম্রাজ্যবাদ-বিষয়ক তত্ত্ব উপস্থিত করেছিলেন চলমান আন্দোলনের ভেতর থেকেই। এখানে বলে রাখা দরকার যে, ইতিহাসের সে মুহূর্তে ওই ত্রিমহাদেশীয় সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, ঠিক তখনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চলছিল ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তির লড়াই। একই সময়ে ওই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেই চলছিল ভেনেজুয়েলা, পেরু, গুয়াতেমালা ও কলোম্বিয়ায় জনগণের সশস্ত্র লড়াই। এছাড়া এ-সময় ক্যারিবীয় অঞ্চলের ডমিনিকান রিপাবলিক সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক সন্ত্রাসে আক্রান্ত ছিল এবং একই সঙ্গে সেখানেও চলছিল জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম। এখানেই শেষ নয়। সে সময় পুর্তোরিকো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপনিবেশ তো ছিলই (এখনও আছে), তার ওপর তাকে রূপান্তরিত করা হয়েছিল একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটিতে। এছাড়া পানামার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে একটি স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর সেখান থেকে জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী ক্যারিবীয় অঞ্চলের জনগণের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক আক্রমণ অব্যাহত রেখেছিল।

ইতিহাসের এমনি এক ঘটনাবহুল, মার্কিনআক্রান্ত ও জনবিুব্ধ মুহূর্তেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওই ত্রিমহাদেশীয় মহাসম্মেলন। আর এই সম্মেলন থেকেই বেরিয়ে এসেছে ‘ত্রিমহাদেশবাদ’ নামের এক গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদ-বিষয়ক তত্ত্ব। অবশ্যই বলা যাবে যে, এই তত্ত্ব এখনও প্রাসঙ্গিক। এবং জন বেলামি ফস্টারের নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বকে এই ‘ত্রিমহাদেশবাদ’ বা ‘ত্রিমহাদেশীয়’ তত্ত্ব প্রয়োজনীয় রসদ জুগিয়েছে। ‘ত্রিমহাদেশীয়’ তত্ত্বের পরিসর নিঃসন্দেহে বিস্তৃত। তবে এই তত্ত্বের কয়েকটি মূল বক্তব্যকে দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।

প্রথমত, ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাকে-তাদের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও-একটি বৃহৎ ঐক্যের ভিত্তিতে একই সমতলে আনতে চায় এই যুক্তিতে যে, এই তিনটি মহাদেশের ইতিহাসে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিভিন্ন ধরনের আগ্রাসন বর্তমান। দ্বিতীয়ত, শুধু সাম্রাজ্যবাদের কথা বলাটা যথেষ্ট নয়; বর্তমান সময়ের সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করতে হলে বলতে হবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথা। তৃতীয়ত, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জনগণের ‘পয়লা নম্বর শত্রু’ হচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। চতুর্থত, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই অর্থনৈতিক শোষণের বৈশ্বিক ব্যবস্থার একটি প্রধান ভিত্তি। পঞ্চমত, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একই সঙ্গে যেমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, তেমনি সে একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও সামরিকও বটে। ষষ্ঠত, তবে সামরিক যুদ্ধ ছাড়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে টিকে থাকা ও আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব নয়। সপ্তমত, সামরিক যুদ্ধের কারণেই যেখানেই যায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সেখানেই সে নগ্ন হয়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের ধারণাটি ওই ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্বের মধ্যেই নিহিত ছিল। বলা প্রয়োজন যে, এই ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্ব আসলে তৃতীয় বিশ্বের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বায়নের বিপ্লবী ঐতিহ্য বা ধারারই অন্তর্গত। এও বলা দরকার যে, এই ধারা থেকে নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের ধারণা জন বেলামি ফস্টারের কাছে উপস্থিত হলেও তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্নতাকে ধরতে চেয়েছেন মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ভাষ্যে। কিন্তু ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নগ্নতা নির্দিষ্ট হয়েছে তার সামরিক আগ্রাসনের ভেতর দিয়েই। এভাবেও বলা যায় : ৱায়ুযুদ্ধ চলাকালীন পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে নিজেকে সাম্রাজ্যবাদী না বললেও সে নগ্ন হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার সামরিক অপতৎপরতার ভেতর দিয়েই, আজ সেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেকে নগ্ন করে রেখেছে ঘোষণা দিয়েই; বলছে সে, সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া তার কোনো বিকল্প নেই।


মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার নগ্নতাকে আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় বেশী স্পষ্ট করেছে বটে, কিন্তু এই বিশেষ চরিত্রায়ন যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেহারা ও চরিত্রের সমগ্রকে নির্দেশ করে তাও বলা যাবে না। একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ হিসেবে জন বেলামি ফস্টারও সে-কথা বলেন না। যেমন বলে না ত্রিমহাদেশীয় তত্ত্বও। প্রশ্ন তো থাকেই : কেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আগের তুলনায় এতো বেশী নগ্ন হয়েছে? এ নগ্নতার ঐতিহাসিক ও বস্তুগত ভিত্তিই বা কি? সাম্রাজ্যবাদ কি কেবলই নীতিমালা-প্রণয়নের বিষয়?

এখানে স্পষ্ট ক’রেই বলা দরকার যে, লেনিন-যিনি নিঃসন্দেহে সাম্রাজ্যবাদের একজন প্রধান ও প্রাসঙ্গিক তাত্ত্বিক-কাউটস্কির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে বিতর্ক করতে গিয়ে কাউটস্কির যুক্তিকে খণ্ডন করেছেন এই বলে যে, সাম্রাজ্যবাদ কোনো পলিসির বিষয় নয়; সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদী বিকাশের যৌক্তিক পরিণতি। অর্থাৎ, লেনিনের মতে, আমরা সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ উদঘাটনে ব্যর্থ হবো যদি তার সঙ্গে পুঁজিবাদের সম্পর্ককে না-বুঝি। লেনিন তাঁর ইম্পিরিয়ালিজম : দ্য হাইয়েস্ট স্টেইজ অব ক্যাপিটালিজম পুস্তিকায় ওই সম্পর্কের তত্ত্বকে হাজির করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে : ‘সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তর’ (পৃ ৮৮)। লেনিন এও বলেন, ‘পুঁজিবাদের বিকাশের একটি নির্দিষ্ট, খুবই উঁচু স্তরে পুঁজিবাদ রূপান্তরিত হয় পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদে।’ (পৃ ৮৮)

সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে লেনিনীয় তত্ত্বের বিচার-বিশ্লেষণ ও সেই তত্ত্ব ঘিরে বিভিন্ন ধরনের তর্ক-বিতর্ক এখনও চলছে, যেমন চলেছে আগেও। তবে এখানে লেনিনকে আনার কারণ হচ্ছে মূলত এটাই বোঝানো যে, পুঁজিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া বর্তমান সময়ের নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পুরোটা বোঝা মোটেই সম্ভব নয়।

এখানে এটাও বলা দরকার যে, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজির বিচিত্রমাত্রিক বহিরঙ্গ এবং আগ্রাসনের মুখে পুঁজিবাদকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়েছে : ‘বহুজাতিক ফিন্যান্স পুঁজিবাদ,’ ‘নব্য-পুঁজিবাদ,’ ‘অগ্রসর বা ‘লেইট’ পুজিবাদ,’ ‘উত্তরফোর্ডবাদী পুঁজিবাদ,’ ‘উত্তরআধুনিকতাবাদী পুঁজিবাদ,’ ‘ইলেক্ট্রো পুঁজিবাদ,’ এমনকি ‘হাইড্রোকার্বন পুঁজিবাদ’ ইত্যাদি। নামের এই ছড়াছড়ি মাঝে মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলেও লেনিনের ওই কথাটা ফিরে আসে : ‘পুঁজি তার শক্তি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশ করে।’ (দ্য স্টেট এ্যান্ড রেভ্যুলিউশন, পৃ ২২০)। লেনিনের আগে মার্কস নিজেই তাঁর গ্রুনড্রিস-এ বলেছেন ‘বহুরূপী পুঁজি’-এর কথা। এছাড়া পুঁজির ‘নমনীয়তা’ বা ‘ফেকসিবিলিটি’ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন বিশ শতকের একঝাঁক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ- বেলজিয়ান তাত্ত্বিক আর্নেস্ট ম্যান্ডেল (যিনি তাঁর গ্রন্থ লেট ক্যাপিটালিজম-এর জন্য বিখ্যাত), ইতালীয়-মার্কিন তাত্ত্বিক জিয়োভানি আরিঘি, মিশরীয় তাত্ত্বিক সমির আমিন এবং ইংরেজ তাত্ত্বিক ডেভিড হারভি (যিনি তাঁর ‘পুঁজির নমনীয় সংবর্ধন’-এর তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত)।

বিষয়গত, শৈলীগত ও পদ্ধতিগত ভিন্নতা সত্ত্বেও এঁদের কাজ এক সঙ্গে জড়ো করলে কতোগুলো সাধারণ বিষয় চোখে পড়ে। প্রথমত, পুঁজির ইতিহাসে পুঁজি নিজেই বিভিন্ন চেহারা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। অর্থাৎ পুঁজির নিজস্ব ইতিহাস থেমে থাকে নি মোটেই। দ্বিতীয়ত, পুঁজির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার নমনীয়তা (কেউ কেউ পুঁজির ‘অসীম নমনীয়তা’র কথাও বলেছেন)। তৃতীয়ত, তবে ‘নমনীয়তা’ মোটেই শেষ কথা নয়; পুঁজি নমনীয় হয় একচেটিয়া হয়ে ওঠার ল্যেই। হ্যাঁ, চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে পুঁজি সবসময়ই একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারে আগ্রহী। আমাদের সময়ে পুঁজিকে যে-নামেই ডাকা হোক না কেন, তার একচেটিয়া হয়ে-ওঠার প্রবণতাকে অস্বীকার করা যাবে না মোটেই। বরঞ্চ জোর দিয়েই এ-কথা বলা দরকার যে, আমরা একচেটিয়া পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম স্তরে বাস করছি। আর ওই একচেটিয়া পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম স্তরের নাম নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। হ্যাঁ, লেনিন বলেছিলেন ‘পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তর’-এর কথা; আর আমরা লেনিনকে খানিকটা সম্প্রসারিত করেই বলতে পারি ‘একচেটিয়া পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম স্তর’-এর কথা। এর আরেক নাম আজকের ‘গোলকায়ন’ (যদিও গোলকায়নের ইতিহাস পুঁজিবাদের ইতিহাসের মতোই দীর্ঘ)। এ-বিষয়গুলোকে উদাহরণ সহযোগে তলিয়ে দেখা যাক।

পুঁজির একচেটিয়া চরিত্র ও আচরণ কোন্‌ জায়গায় আছে-যে-চরিত্র যুগপৎ উৎপাদনম ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে-তা বোঝার জন্য আজকের বহুজাতিক কোম্পানীগুলো কীভাবে এবং কি বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করছে তা বোঝা দরকার, যদিও কোম্পানীগুলো বর্তমান সময়ের পুঁজিবাদের তাবৎ অনুশীলনের একমাত্র ক্ষেত্র বা প্রতিনিধি নয়। বিভিন্ন পরিসরেই পুঁজি কাজ করে বা সঞ্চালিত হয় বা সংবর্ধনের পথ খুঁজে পায়। ব্যাংক, ফান্ডস্‌, বন্ড, সিকিউরিটি এবং জাতি-রাষ্ট্র নিজেই পুঁজির বিনিয়োগের সুযোগ বিভিন্নভাবে খোলা রাখে বা সেই বিনিয়োগের সুযোগকে সহায়তা ও ত্বরান্বিত করে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানীর সম্পর্ক যে সবসময় সহজ ও খোলামেলা থাকে তাও নয়। মাঝে মাঝে বহুজাতিক পুঁজির সঙ্গে একটি জাতি-রাষ্ট্র সংঘর্ষেও জড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু এরপরেও যদি আমরা বর্তমান সময়ে বহুজাতিক কোম্পানী বা কর্পোরেশনগুলোর কেবল বিক্রির পরিমাণ লক্ষ্য করি, তাহলে চট করেই বোঝা সম্ভব কিভাবে ওই কোম্পানী বা কর্পোরেশনগুলো তার শক্তি ও প্রভাব বজায় রেখেছে। তাহলে একটা ছোটো কিন্তু ইঙ্গিতবহ পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক। বর্তমান পৃথিবীর সবচাইতে প্রভাবশালী ও ধনবান পাঁচটি বৃহত্তম কর্পোরেশনের নাম হচ্ছে জেনারেল মটরস, ওয়ালমার্ট, এঙন-মবিল, ফোর্ড এবং ডাইমলার-ক্রাইসলার। এই পাঁচটি কর্পোরেশনের সামগ্রিক বিক্রি পৃথিবীর ১৮২টি দেশের জি.ডি.পি’র চেয়েও বেশি। মার্কিন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ রিচার্ড জে বার্নেট-এর মতে,

এসব কর্পোরেশন সারা পৃথিবী চষে বেড়ায়, সস্তা শ্রম খুঁজে ফিরে, লন্ডন থেকে হংকং পর্যন্ত তাদের স্টক বিক্রি করতে থাকে এবং গজিয়ে-ওঠা বাজারগুলোর মক্কেলকে বশ করা শুরু করে। (পৃ ৩৬)

বার্নেট আরো জানাচ্ছেন যে, ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর ১১ পর্যন্ত সময়ে পৃথিবীর ২০০টি কর্পোরেশনের মুনাফা শতকরা ৩৬২.৪ বৃদ্ধি পেয়েছে। আরো উল্লেখযোগ্য হলো এই যে, ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাদের মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে আরো।

কেবল বিক্রি আর মুনাফার অংক কষে বর্তমান সময়ের পুঁজিবাদের মতো একটি জটিল ও অগ্রসর উৎপাদন-প্রণালীর সাম্প্রতিক একচেটিয়া চেহারা ও চরিত্রের সমগ্রকে যে ধরা সম্ভব হবে, সেটা আমরা মোটেই বোঝাচ্ছি না। তবে বিক্রি ও মুনাফা সাধারণভাবে কোম্পানী বা কর্পোরেশনগুলোর অর্থনৈতিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আসলে বড়ো আকারের মুনাফা ছাড়া কোনোভাবেই কর্পোরেশন-যাকে মার্কিন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ পল সুইজি ও পল ব্যারান বলেছেন ‘পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের প্রকৃষ্ট নমুনা’-তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে না। সুতরাং মুনাফা একমাত্র বিবেচ্য বিষয় না, হলেও গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই। কিন্তু কর্পোরেশনগুলোর মুনাফাভিত্তিক অর্থনৈতিক শক্তি নির্দেশ করার পাশাপাশি আরেকটি সংলগ্ন ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে শনাক্ত করা জরুরী। সেটি হলো কর্পোরেশনগুলোর হাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির অভূতপূর্ব কেন্দ্রীভবন। বেশ আগেই ওয়ার্ল্ড ব্যাংক নিজেই তো আমাদের জানিয়ে দিয়েছে যে, পৃথিবীর ৩ থেকে ৬টি সবচাইতে বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানী বৈশ্বিক পরিসরে খাদ্য ও পানীয়, কাঁচামাল এবং খনিজ ও ধাতব পদার্থের শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রপ্তানী নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

কিন্তু এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থানটা কোথায়? আগেই আমরা বর্তমান পৃথিবীর সবচাইতে বৃহৎ পাঁচটি কর্পোরেশনের নাম উল্লেখ করেছি। এদের মধ্যে প্রথম চারটিই হচ্ছে মার্কিন কর্পোরেশন : জেনারেল মটরস্‌, ওয়ালমার্ট, এঙন-মবিল এবং ফোর্ড। এছাড়া রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরো কয়েকটি কর্পোরেশন, যেগুলো শক্তিতে ও বিস্তারে নিঃসন্দেহে বিশ্বখ্যাত : মাইক্রোসফ্‌ট্‌, কোকা-কোলা এবং আই.বি.এম.। এদের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের সম্মিলিত জি.ডি.পি’র অঙ্ককেও ছাড়িয়ে যায়। এ-কারণেই কোকা-কোলার প্রাক্তন সভাপতি ডনাল্ড আর. কিয়ৌ এক সাংবাদিককে যথার্থই বলেছিলেন যে, আজকের পৃথিবীতে বহুজাতিক কোম্পানীর কথা বলা মানেই আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্যের কথা বলা। কথাটি তিনি অবশ্য বর্তমান সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করার জন্য বলেননি; বলেছেন তিনি তাঁর মার্কিন জাতীয়তাবাদী অহংকার ও গৌরবকে উৎসাহে ও উল্লাসে প্রকাশ করার জন্যই।

মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীর সঙ্গে, বা বৈশ্বিক পুঁজির সাম্প্রতিক মার্কিনায়নের সঙ্গে, বর্তমান সময়ের পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তরের যোগাযোগকে দতা সহকারে প্রত্য করেছেন ফরাসী তাত্ত্বিক মিশেল বড্‌। ২০০০ সালে বড্‌ একটি সাড়া-জাগানো গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এর শিরোনাম এ হিস্ট্রি অব ক্যাপিটালিজম। গ্রন্থটিতে তিনি ১৫০০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাদের ঘটনাবহুল, পর্বভিত্তিক, সম্ভাবনাময় ও সংকটাপন্ন ইতিহাসকে তত্ত্ব ও উপাত্ত সহযোগে ধরার চেষ্টা করেছেন। সেই গ্রন্থটির শেষের দিকে মিশেল বড্‌ বলেন,

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র [বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বে] প্রধান আধিপত্যবাদী চালক। কার্যত প্রতিটি েত্েরই সে প্রধান, কাউকেই সে কোনো কিছুর জন্য জবাব দেয় না, বা তোয়াক্কা করেনা; বরঞ্চ সবার ওপরে সে তার আইন-কানুন চাপানোর চেষ্টা করে। (পৃ ২৮৫)

বড্‌ আরো বলেন,
ইতিহাসে আমরা প্রথমবারের জন্য লক্ষ্য করছি যে, কর্পোরেশনগুলো এখন একেবারে সেই সব মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে সম, যেগুলো গোটা মানবজাতিসহ জীবন ও পৃথিবীকে আক্রান্ত করে। এসব কর্পোরেশন এখন অভূতপূর্ব আর্থিক, প্রযুক্তিগত, বৈজ্ঞানিক ও শিল্পোপণ্যোৎবাদী শক্তির অধিকারী। অবশ্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখেই এসব কর্পোরেশন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। (পৃ ৩১০)

কিন্তু কর্পোরেশনের বা মার্কিন কর্পোরেশনের অভূতপূর্ব ক্ষমতার অর্থ এই নয় যে, পৃথিবী থেকে জাতি-রাষ্ট্রগুলো উবে যাচ্ছে। না, যাকে কর্পোরেট পুঁজিবাদ বলা হচ্ছে-যা আসলে একচেটিয়া পুঁজিবাদের আরেক নাম-তা মোটেই জাতি-রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘোষণা করে নি, যদিও একদল উত্তর-আধুনিকতাবাদী তাত্ত্বিকসহ কিছু অর্থনীতিবিদ ও সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক এর মধ্যেই জাতি-রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘোষণা করেছেন। চট করেই মনে পড়ে কেনিচি ওহমায়ে’র বহুল-আলোচিত বই দ্য এন্ড অব দ্য নেশান-স্টেট-এর কথা। এই শিরোনাম নিজেই বইটির মূল প্রতিপাদ্যকে সরবে ঘোষণা করছে।

কেন্‌চি ওহমায়ে’র বিপরীতে অবশ্য সমির আমিন এবং ডেভিড হারভিসহ আর্জেন্টিনার মার্কসবাদী চিন্তাবিদ এনরিক ডুসেল এবং মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী সাসকিয়া সাসেন জাতি-রাষ্ট্রের পইে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে এবং পরিসরে তাঁদের যুক্তি উত্থাপন করেছেন। তাঁদের মতে কর্পোরেট পুঁজির অভূতপূর্ব উত্থান ও বিস্তারের যুগে সেই পুঁজির সঙ্গে জাতি-রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক সবসময় একমাত্রিক বা একরকম থাকে না সত্য, কিন্তু পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণই জাতি-রাষ্ট্রের উপস্থিতিকে শুরুতেই ধরে নেয়। সত্য, পুঁজির ইতিহাসই আমাদের বলে দেয় যে, পুঁজি আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে চায় বা এমনকি পুঁজি মানেই আন্তর্জাতিক পুঁজি। এও সত্য যে, ক্ষেত্রবিশেষে এমনকি ‘জাতীয় পুঁজি’র ধারণাটিও ধোপে টেকে না। তার অর্থ এই নয় যে, পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণে জাতি-রাষ্ট্রের ভূমিকা নেই। আসলে ‘আন্তর্জাতিক’ কথাটার ভেতরেই তো ‘জাতি’ কথাটা থেকে যাচ্ছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলা যাবে যে, আন্তর্জাতিক পুঁজিও জাতীয় রূপ নিতে পারে, যাকে আরেক প্রসঙ্গে আর্নেস্ট ম্যান্ডেল বলেছিলেন পুঁজির ‘ফেনোমেনাল ফর্ম’।

জাতি-রাষ্ট্র কিভাবে কাজ করে, সেটা বোঝার জন্য রিচার্ড রবিনস্‌-এর একটা উদ্ধৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে :

জাতিরাষ্ট্রগুলো বাজার উন্মুক্ত করার ল্যেই আইন ও চুক্তি তৈরী করে; একই সঙ্গে জাতিরাষ্ট্রগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর জোর দেয় (রাস্তাঘাট, বিমান ও নৌবন্দর, বিদ্যুৎ সরবরাহ, আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যান্য দিক, ইত্যাদি)। কেননা এ-সব কিছুই পণ্য উৎপাদনে, সার্ভিস বিতরণে এবং মূল্য নির্ধারণে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে পুঁজিকে সাহায্য করে। জাতি-রাষ্ট্রগুলো বিনিয়োগকে রা করার ও বাজারকে উন্মুক্ত করার স্বার্থে এমনকি সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করে। (গ্লোবাল প্রবলেমস্‌ এ্যান্ড দ্য কালচার অব ক্যাপিটালিজম, পৃ ৫৯-৬০)

কিন্তু রিচার্ড রবিনস্‌ যেখানে ছাড়েন, সেখানে আরেকটু অগ্রসর হন এনরিক ডুসেল। তিনি দেখান যে, বর্তমান বিশ্বের মার্কিনায়িত একচেটিয়া পুঁজিবাদের জন্য জাতি-রাষ্ট্র কেবল জরুরীই নয়, বরঞ্চ তা পুঁজিবাদের গতিপ্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যেরই অন্তর্গত বটে। ডুসেল আরো মনে করেন যে, জাতিরাষ্ট্র মাঝে মাঝে একাই উদ্বৃত্ত মূল্যের স্থানান্তরকে যুগপৎ একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে।

হ্যাঁ, জাতি-রাষ্ট্র থাকেই, যেমন থাকে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের অসম উন্নয়ন, তবে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের সঙ্গে জাতি-রাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময় একরকম বা স্থির থাকে না, যে-বিষয়টির ইঙ্গিত আমরা আগেই দিয়েছি। উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের টানা-পোড়েনও থাকতে পারে। এ-সব কিছুই নির্ভর করবে একটি জাতি-রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপর।

বর্তমান বিশ্বের একচেটিয়া পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম স্তর হিসেবে নগ্ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য অনেকেই ‘আন্তর্জাতিক শ্রেণী জোটে’র ধারণাকে সামনে এনেছেন। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন সমির আমিন ও কেভিন ড্যানাহার। এঁরা মনে করেন যে, জাতি-রাষ্ট্রের ধারক হিসেবে মার্কিন সরকার নিজেই, মার্কিন কর্পোরেশন, মার্কিন সামরিক বাহিনী, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-আই.এম.এফ-ডাব্লিউ.টি.ও) এবং অন্যান্য জাতীয় শাসক শ্রেণী বিভিন্ন কায়দায় জোট বেঁধে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক লেনদেন ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী উৎপাদন-সম্পর্ক এবং সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা-সম্পর্ককে পুনরুৎপাদিত করতে থাকে। এও বলা যাবে যে, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি বা পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের সংকটের বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে ওই জোট-সম্পর্কেরই সংকট।


ফিরে আসি একচেটিয়া পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম স্তর হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে বোঝার জন্য কেবল কর্পোরেট পুঁজির একচেটিয়া কর্তৃত্বকে বোঝাই যথেষ্ট নয়। একচেটিয়া পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের আরো প্রকাশক্ষেত্র চিহ্নিত করা দরকার। এ-প্রসঙ্গে আমি সমির আমিনের একটি মডেলকে খানিকটা সম্প্রসারিত ক’রে প্রথমত একটা অনুচিত্রের মাধ্যমে তাকে উপস্থিত করতে চাই এভাবে :

হ্যাঁ, আমিন নিজেই সার্বিকভাবে একচেটিয়া আধিপত্যের পাঁচটি পরস্পর-সম্পর্কিত এলাকা বা বলয়কে শনাক্ত করেছেন : ১. প্রযুক্তিগত আধিপত্য, ২. বিশ্বব্যাপী ফাইন্যান্স বাজারের নিয়ন্ত্রণ, ৩. পৃথিবীর তাবৎ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আধিপত্য, ৪. মিডিয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য, এবং ৫. গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ওপর আধিপত্য (ক্যাপিটালিজম্‌ ইন দ্য এজ অব গ্লোবালাইজেশান্‌, পৃ ৪-৫)। এগুলোকে আমরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পঞ্চবলয়ও বলতে পারি। কারণ, বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রার যোগসাজশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ওই পরস্পর-সম্পর্কিত পাঁচটি বলয়ে তার প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য জারি রেখেছে, যদিও এই আধিপত্য সব ক্ষেত্রে যান্ত্রিকভাবে একই ধরনের নয়। বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ওই আধিপত্যের হেরফেরও ঘটে। এই পাঁচটি বলয় নিয়ে এখন সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।

প্রথমেই আসি প্রযুক্তি প্রসঙ্গে। কর্পোরেশনগুলো-বিশেষ করে মার্কিন কর্পোরেশন-ধনবান রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। আর এ-ধরনের আধিপত্য বিশাল ব্যয়ভার বহন ব্যতিরেকে অসম্ভবই বটে। আমিন ঠিকই বলেন, ‘বিশেষ করে সামরিক খরচাপাতির ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের সাহায্য ও সহযোগিতা ছাড়া আধিপত্যের বলয়ের অধিকাংশই টিকে থাকতো না’ (ক্যাপিটালিজম্‌ ইন দ্য এজ অব গ্লোবালাইজেশান, পৃ ৪)। আর মিশেল বড্‌ তো মনে করেন যে, সাম্প্রতিক কর্পোরেট পুঁজিবাদ তথা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আসলে মূলত চেনা যায় তার প্রযুক্তিগত আধিপত্যের ভেতর দিয়েই। বড্‌ বলেন,

পুঁজিবাদ আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশী শক্তিশালী হয়েছে আর আমরা দেখছি পুঁজিবাদের এক নতুন যুগের সূচনাকে। এ-যুগে নতুন পণ্য আর প্রকল্পের উদ্ভাবনে কর্পোরেশনগুলো অভাবনীয় মাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে চলেছে। (এ হিস্ট্রি অব ক্যাপিটালিজম্‌, পৃ ৩০২)

বড্‌ ‘মহাপ্রযুক্তিময় পুঁজিবাদ’-এর কথাও বলেছেন। এ পুঁজিবাদেই আমরা প্রত্য করছি কিভাবে টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কগুলো বেঁধে ফেলেছে কম্পিউটার, ফোন এবং টেলিভিশনকে। আমরা এও দেখছি কিভাবে ‘সাইবার স্পেস’ উঁচুপ্রযুক্তির নমুনা হিসেবে হাজির হয়েছে। এছাড়া তো রয়েছেই কম্পিউটারায়িত শেয়ার বাজার। এভাবে অসংখ্য উদাহরণ জড়ো করা সম্ভব। তবে বোধ করি বিষয়টি এর মধ্যেই পরিষ্কার হয়েছে যে, বাজার থেকে যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত প্রায় সবক্ষেত্রেই উন্নত ও অগ্রসর প্রযুক্তির ব্যবহার করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেশনগুলোর পক্ষে যতোটা সম্ভব, অন্যদের পক্ষে ততোটা নয়। আর তাদের জন্য প্রযুক্তি কেবল ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়, তা নিয়ে তাদের বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিস্তৃত হয়েছে অভাবনীয় মাত্রায়।

প্রযুক্তির পরেই আসে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আধিপত্যের বিষয়টি। বিশেষ ক’রে তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ ও লুণ্ঠন করার ক্ষেত্রেও ওই মার্কিন কর্পোরেশনগুলো (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সহযোগিতায়) সবচাইতে এগিয়ে আছে। এখানেও কোনো জাতি-রাষ্ট্রের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে এমনকি জাতি-রাষ্ট্রের বিভিন্ন দমনমূলক হাতিয়ার (যেমন সেনাবাহিনী) ব্যবহার করা ছাড়া পুঁজিবাদী কর্পোরেশনগুলো তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদকে নিজেদের আয়ত্তে আনতে পারে না। অসংখ্য উদাহরণ দেয়া সম্ভব। তবে একটি পুরাতন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এখানে উপস্থিত করা যায়। নাইজেরিয়ার কথাই ধরা যাক। এই দেশের তেলসম্পদের প্রায় অর্ধেকটা চলে যায় ইঙ্গ-ডাচ কোম্পানী শেল-এর কাছে আর বাকি অর্ধেকের বেশীটা নিয়ে নেয় মার্কিন কোম্পানী শেভরন। এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো তাঁর আপসাইড ডাউন গ্রন্থে আমাদের জানাচ্ছেন যে, তেলসম্পদ লুটপাট করতে গিয়ে শেল ও শেভরন নাইজেরিয়ার অগোনি জনসম্প্রদায়ের ভূমি ও নদী-নালা সহ তাদের সমগ্র পরিবেশকেই ধ্বংস করে ফেলেছে।

নাইজেরিয়ার এ-অবস্থাকে চিত্রায়িত করতে গিয়ে নাইজেরিয়ার লড়াকু লেখক কেন্‌ সারো উইয়া নিজেই বলেছিলেন ‘মার্কিন কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ’-এর কথা। তিনি এ-কথা বলেই ক্ষান্ত হন নি। অগোনি জনসম্প্রদায়ের পক্ষে এবং সঙ্গে থেকেই সারো উইয়া লড়েছেন ওইসব কোম্পানীর বিরুদ্ধে; তাঁর লেখায় কর্পোরেশনগুলোর নগ্ন অপতৎপরতার বিভিন্ন দিক তিনি তুলে ধরেছেন এবং এও বলেছেন যে, তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট এবং ভূমি-ও-পরিবেশ-ধ্বংসের আরেক নাম ‘গণহত্যা।’ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ যেমন মানুষকে নির্দ্বিধায় হত্যা করে, কর্পোরেট পুঁজির প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটও ভূমি এবং পরিবেশকে ধ্বংস করার ভেতর দিয়েই মানুষকে হত্যা করে। এ-ধরনের অবস্থান থেকে টগবগে ভাষায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লেখালেখির জন্যই নাইজেরিয়ার লেখক কেন্‌ সারো উইয়াকে প্রাণ দিতে হয়। নাইজেরিয়ার সামরিক সরকার-শেল ও শেভরনের সুপারিশেই-সারো উইয়াকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলায়।

অবশ্যই নাইজেরিয়া একমাত্র উদাহরণ নয়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ নিঃসন্দেহে। পৃথিবীর তাবৎ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য প্রসঙ্গে মার্কিন ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিন তাঁর এ পিপলস্‌ হিস্ট্রি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস্‌ নামের গ্রন্থে আমাদের জানান যে, পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের শতকরা ষাট ভাগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার কর্পোরেশনগুলো বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১১টি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদে মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর একচেটিয়া প্রবেশাধিকার রয়েছে। বলার অপো রাখে না যে, ইরাক এখন মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর লুটপাটের একটি প্রধান ক্ষেত্র। আর ঐতিহাসিকভাবে লাতিন আমেরিকা তো রয়েছেই। বিনিয়োগের নামে মার্কিন কর্পোরেশন এই মহাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ কিভাবে লুটপাট করেছে তার বোধ করি সবচাইতে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যাবে এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো’র সাড়া-জাগানো গ্রন্থ ওপেন ভেইনস্‌ অব ল্যাটিন আমেরিকা-তে। গ্যালিয়ানো রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি ইঙ্গিতজ্ঞাপক কূটাভাসকে চিহ্নিত করেন এই বলে যে, ‘যে-দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে যত সমৃদ্ধ, সে-দেশ তত দরিদ্র।’ (পৃ ৭৬) হ্যাঁ, বিভিন্ন সময়ে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ সেটাই প্রমাণ করেছে বটে।

এবারে আসি কর্পোরেট পুঁজির একচেটিয়া আধিপত্যের তৃতীয় বলয়ে। এটি গণমাধ্যম ও যোগাযোগের বলয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুগে আজ পৃথিবীর সবচাইতে বড়ো গণমাধ্যমগুলোর স্বত্বাধিকারী হচ্ছে গুটিকয়েক কর্পোরেশন। গণমাধ্যমবিশারদ রবার্ট ম্যাকচেছনি তাঁর দ্য নিউ গ্লোবাল মিডিয়া গ্রন্থে আমাদের জানান,

আটটি বহুজাতিক কর্পোরেশন এখন বৈশ্বিক গণমাধ্যমের বাজারকে শাসন করছে : জেনারেল ইলেকট্রিক (এন.বি.সি.’র স্বত্বাধিকারী), এ.টিএ্যান্ডটি/ লিবার্টি মিডিয়া, ডিজনি, টাইম ওয়ারনার, সনি, নিউজ কর্পোরেশন, ভিয়াকম (সিবিএস-এর স্বত্বাধিকারী) এবং বার্তেলসমানসহ সি-গ্রাম। (পৃ ২২)

এছাড়া তো এটা গত দশ বছরে বেশ পরিষ্কার হয়েছে যে, রূপার্ট মারডোক, সিলভিয়া বার্লুসকোনি এবং ওয়ারনার ভাতৃদয়সহ হেনরি লুচে মিডিয়া সম্রাট হিসেবে তাদের মিডিয়া-সাম্রাজ্য বিস্তৃত করে চলেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ও মহাদেশে। এরা বেতার-শিল্প, মুদ্রণ-শিল্প ও চলচ্চিত্র-উৎপাদনের ওপর তাদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব জারি রেখেছে, যেমন তারা নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে স্যাটেলাইট ও কেব্‌ল নেটওয়ার্কগুলো।

হ্যাঁ, বইপত্র এবং পত্রপত্রিকা থেকে শুরু ক’রে ভিডিও এবং খেলনাসহ টেলিভিশন প্রোগ্রাম এবং চলচ্চিত্র পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া-পণ্যের উৎপাদন, বিনিময়, বণ্টন ও ভোগের বিষয়টি গণমাধ্যম ও যোগাযোগের রাজনৈতিক অর্থনীতিকেই সামনে আনে। আর এই রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর আবারো ওই মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য জারি রয়েছে। নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারমান তাঁদের গ্রন্থ ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট-এ বর্তমান বিশ্বের মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদকে মার্কিন আধিপত্য দিয়েই বিচার করেছেন। তাঁরা বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব চাইতে উঁচু পর্যায়ের ২৪টি বৃহৎ মিডিয়া-সংস্থার আধিপত্যের কথা। চমস্কি ও হারমান আরো বলেন,

এই চব্বিশটি মিডিয়া-সংস্থা নিজেরাই বড়ো আকারের মুনাফাভিত্তিক কর্পোরেশন। এদের মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ একচ্ছত্র ভাবে ধনবান ব্যক্তিদের হাতেই।… একটি বাদে উঁচু পর্যায়ের সকল কোম্পানীরই সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি… এই বৃহৎ মিডিয়া-সংস্থাগুলোর প্রায় তিন-চতুর্থাংশের কর-পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ডলারকেও ছাড়িয়ে যায় এবং তাদের গড় মুনাফা দাঁড়ায় ১৮৩ মিলিয়ন ডলারে। (পৃ ৪)

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমান বিশ্বের মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে একচেটিয়া কর্পোরেট পুঁজির সাম্প্রতিকতম স্তর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ কেবল রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয় নয়; তা সাংস্কৃতিকও বটে। প্রকৃতপক্ষে, মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির উৎপাদন-বিনিময়-ভোগ-বন্টনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মার্কিন মিডিয়া-সংস্থাগুলো ব্যবসায় করার পাশাপাশি এবং ব্যবসার স্বার্থেই বাজারের মতাদর্শ ও পুঁজিবাদী মূল্যবোধ বিভিন্নভাবেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে থাকে। হ্যাঁ, সত্য, মিডিয়া তো কেবল প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠানই নয়, তা আখ্যানও বটে, যে-সব আখ্যানের পুনরাবৃত্ত প্রাত্যহিকতায় মগজ ও মনোজগতেরও বাজারায়ন ঘটে চলেছে এমনি এক মাত্রায় যে, মানুষের চিন্তা ও জ্ঞানের মূল্যও নির্ধারিত হয় বিনিময়-মূল্যের নিরিখে। ‘সবার ওপরে বাজার ও বিনিময়-মূল্য সত্য, তাহার ওপরে নাই’-এই মতাদর্শটাকে আধিপত্যবাদী এবং এমনকি একচেটিয়া করার ক্ষেত্রে মার্কিন মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন গত দশ বছরে অভূতপূর্ব তীব্রতা লাভ করেছে, যে-কথাটি আমাদের জানাচ্ছেন মিডিয়া-নৃতাত্ত্বিক কেলি আসকিউ ও রিচার্ড উইলক্‌। তাঁরা আরো বলেন যে, মানুষের জন্য ‘বিশ্বের সংস্কৃতি’কে সংজ্ঞায়িত করার কাজ নিয়েছে এখন মার্কিন মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ।
এবারে আসকিউ ও উইলক্‌ থেকে একটি উদ্ধৃতি :

পৃথিবীর অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর সামনে এখন সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করে সি.এন.এন., হলিউড ও এম.টি.ভিসহ অন্যান্য ক্ষমতাবান বৈশ্বিক মিডিয়া। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই স্থানীয় জনগণ মুদ্রিত চিত্রকল্পে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা চলচ্চিত্রে দূর-দেশের জীবনাচরণকে দৃশ্যমান দেখে। বেতার-সম্প্রচার, সঙ্গীত-ভিডিও এবং গণহারে উৎপাদিত ক্যাসেটের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ অপরিচিত গান-বাজনা এবং ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। (পৃ ১)

অভিজ্ঞতা অর্জনের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া তো ভালো কথা, কিন্তু সমপর্কিত হওয়ার অর্থ যদি দাঁড়ায় অসম বা বৈষম্যমূলক উৎপাদন-সম্পর্কের ও ক্ষমতা-সম্পর্কের বিস্তার ও আগ্রাসন, তাহলে তো প্রশ্ন থাকবেই। এখানে মার্কিন মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদের আরেকটি আগ্রাসী চেহারার দিকে তাকানো যাক। হলিউডের চলচ্চিত্র, ম্যাকডোনাল্ডের বার্গার, লেভি-স্ট্রাউস কোম্পানির জিনস্‌, নাইকি কোম্পানীর জুতো, কোকা-কোলা কোম্পানীর পানীয়সহ অন্যান্য পণ্যকে জনগণের আফিমে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে। তৃতীয় বিশ্বে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীর কার্যকলাপ সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক শক্তি অর্জন করে। তাহলে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে: মার্কিন মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ নিজেই সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক-অর্থনীতিকে সাংস্কৃতিক করে তুলেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, একচেটিয়া পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম স্তরে সংস্কৃতির আলোচনা রাজনৈতিক অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনা সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে সবসময়ই অপর্যাপ্ত থেকে যায়।

এবারে ফেরা যাক একচেটিয়া আধিপত্যের আরেকটি বলয়ে-গণবিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র প্রসঙ্গে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান সময়ে যেমন, পুঁজিবাদের আগের পর্বেও তেমনি স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, অস্ত্রের বিষয়টি একই সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। মার্কিন পুঁজিবাদের প্রধান মুখপত্র ফরচ্যুন পত্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচ্ছদের উদাহরণ ব্যবহার করা যাক। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের কিছু দিন পরে প্রকাশিত ফরচ্যুন পত্রিকাটির একটি বিশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদে একটি ছবি ছাপা হয়। সে-ছবিটি ফোর্ড কোম্পানীর একজন হিসাব-ব্যবস্থাপকের। কিন্তু ছবিতে সেই ব্যবস্থাপককে দেখা যায় সামরিক পোশাকে। আর ছবির নিচে বেশ বড়ো হরফে লেখা আছে : ‘বাণিজ্য যুদ্ধে যায়।’

হ্যাঁ, যেখানেই যুদ্ধ, সেখানেই তো অস্ত্রের ব্যবসায় জমে ওঠে। আর যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের ব্যবসায়কেই আকৃষ্ট ও ত্বরান্বিত করে না; তা একই সঙ্গে ‘যুদ্ধকালীন পণ্যে’র উৎপাদন-বিতরণ-বিনিময়-ভোগের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকেও চালু রাখে। আর এভাবেই তো কর্পোরেশনগুলো মুনাফা লোটে। এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো তাঁর আপসাইড ডাউন গ্রন্থে লেখেন,

আমরা জানি যে, সন্ত্রাস উস্কে দেয় সন্ত্রাসকে, কিন্তু সন্ত্রাস আবার কোম্পানীগুলোর মুনাফাকেও বৃদ্ধি করে, যে-কোম্পানীগুলো সন্ত্রাসকে পণ্যে রূপান্তরিত করে তাকে পরে দৃশ্যকল্প হিসেবে বিক্রি করে। (পৃ ২৭১)

এ-প্রসঙ্গে অবশ্যই বলা দরকার বেলজিয়ামের প্রভাবশালী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ আর্নেস্ট ম্যান্ডেল-এর লেট ক্যাপিটালিজম গ্রন্থটির কথা। যুদ্ধের সঙ্গে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ককে তিনি তত্ত্বায়িত করেছেন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই। লেট ক্যাপিটালিজম্‌-এ ম্যান্ডেল লেখেন,

তিরিশের দশকের শেষ দিক থেকেই সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতিতে অস্ত্রের উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।… অদূর ভবিষ্যতে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই যে, চিরস্থায়ী অস্ত্রের অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতি কোনোভাবে হ্রাস পাবে। আর এভাবেই তো আমার লক্ষ্য করি সাম্প্রতিকতম পুঁজিবাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিরস্থায়ী অস্ত্র অর্থনীতিকে। (পৃ ২৭৩-৭৪)

হ্যাঁ, অস্ত্র অর্থনীতির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিঃসন্দেহে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনিবার্য সামরিকায়িত চেহারাকেই নির্দেশ ও নির্দিষ্ট করে। আর ঊনিশ শতক থেকে আজ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের ইতিহাস একই সঙ্গে মার্কিন পুঁজিবাদের ইতিহাসও বটে। মার্কিন সামরিক ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ব্লাম আমাদেরকে জানান যে, ১৯৪৫ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বের ৬৯টি দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক যুদ্ধ পরিচালিত করেছে বা সামরিক হামলা চালিয়েছে। এবং ১৯৪৫ সাল থেকেই সারা পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ-অর্থনীতির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর পরিসংখ্যান মোতাবেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই অস্ত্র-ব্যবসায় পয়লা স্থান অধিকার করে আছে।

অস্ত্রের ব্যবসায় থেকে কিভাবে মার্কিন কর্পোরেশনগুলো মুনাফা লোটে তার অনেক উদাহরণ জড়ো করা সম্ভব। তবে এখানে শুধু বোয়িং কোম্পানীর কথা উল্লেখ করাটাই যথেষ্ট হবে। বোয়িং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম রপ্তানীকারী পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান, দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র-উৎপাদক এবং জাতীয় মিসাইল প্রতিরা প্রকল্পের বৃহত্তম ঠিকাদার। কেভিন মার্টিন ও তাঁর দলের একটি সমীক্ষা অনুসারে ‘বোয়িং-এর বার্ষিক আয় ২০০০ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মোট ৫১.৩ বিলিয়ন ডলারে’, (‘বোয়িং কর্পোরেশন,’ পৃ ৩৪)। ওই সমীক্ষা থেকে একটি উদ্ধৃতি :

বোয়িং-এর ‘এ-এইচ-৬৪/এ আপাচে’ বিক্রি করা হয়েছে মিশর, গ্রীস, ইজরায়েল, সৌদি আরব এবং যুক্ত আরব আমিরাতের কাছে। ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে ইজরায়েল ব্যবহার করেছে বোয়িং-এরই তৈরী করা হেলিকপ্টার। বোয়িং-এর ‘এফ-১৫ ঈগল’ বিক্রি করা হয়েছে ইজরায়েল, জাপান এবং সৌদি আরবের কাছে। আর অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফিনল্যান্ড, কুয়েত, মালয়েশিয়া, স্পেন এবং সুইজারল্যান্ডের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বোয়িং-এর ‘এফ/এ-১৮ হর্নেট।’ ইরাকের বিরুদ্ধে ১১ বছর ধরে বোমাবাজি অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ব্যবহার করেছে বোয়িং-এর ‘এফ-১৫’। বোয়িং তার নিজস্ব যুদ্ধ-বিমানের চাহিদাকে চিরস্থায়ী করার জন্যই কৌশলে অস্ত্র রপ্তানী করে থাকে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য আবার বোয়িং নিজেই নতুন নতুন অস্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদন করে। একই অস্ত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তিদের কাছেও বিক্রি করে থাকে বোয়িং। অস্ত্রের রপ্তানী আবার নিজেই উন্নততর ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তির উদ্ভাবন দাবি করে, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যকে সবসময়ই নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। (‘বোয়িং কর্পোরেশন’, পৃ ৩)

ওপরে উদ্ধৃত আখ্যানটি চিরস্থায়ী অস্ত্র-অর্থনীতির চেহারাকেই তুলে ধরে। এই অর্থনীতির সঙ্গে পৃথিবীব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক উপস্থিতির বিষয়টিও যুক্ত বটে। জন বেলামি ফস্টার তাঁর ‘ইম্পিরিয়ালিজম এ্যান্ড এম্পায়ার’ নামের প্রবন্ধে জানান, ‘পৃথিবীর ৬৯টি দেশে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আছে; এ-সংখ্যা কেবলই বাড়ছে।’ (পৃ ৫) হ্যাঁ, এভাবেই মার্কিন কর্পোরেশন, চিরস্থায়ী অস্ত্র-অর্থনীতি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়-বিশেষ করে এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকায়-মার্কিন সামরিক বাহিনীর সরাসরি উপস্থিতি ও হামলা গভীর ভাবে পরস্পর-সম্পর্কিত হয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাম্প্রতিক ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককেই নির্দেশ করে।

এবারে আসা যাক আধিপত্যের পঞ্চম ও শেষ বলয়ে। সমির আমিন এ-বলয়ের নাম দিয়েছেন ‘অর্থের বাজারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ।’ বিশ্বব্যাপী ফাইন্যান্স পুঁজির আনাগোনা বা আমদানী-রফতানী একচেটিয়া পুঁজিবাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বিদেশী মুদ্রার লেনদেনের বৈশ্বিক বাজার পর্যবেণে নিয়োজিত ‘ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস্‌’-এর পরিসংখ্যান মোতাবেক পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে যে-পরিমাণ অর্থ বিনিময় করা হয়, তার অংক ১,৪৯০,০০০,০০০,০০০ ডলার। শূন্যের এই অব্যাহত মিছিল কোনো পরাবাস্তববাদী প্রপঞ্চকে নির্দেশ করে না; বরঞ্চ তা নির্দেশ করে বিশ্বায়িত ফাইন্যান্স পুঁজির বাজারের বৈভব ও বিস্তার, গতি ও শক্তিকেই। এই বাজারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যাকে রাজনৈতিক-অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয় ‘ফো’ বা ‘প্রবহ’। ওই বাজারের মোট আটটি প্রবহকে অল্পায়াসেই শনাক্ত করা যায় : ১. দেশ থেকে দেশে নিট দীর্ঘমেয়াদী সম্পদের প্রবহ; ২. প্রাতিষ্ঠানিক প্রবহ ; ৩. প্রাইভেট প্রবহ; ৪. প্রাইভেট ঋণ প্রবহ; ৫. বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রবহ; ৬. বন্ডের প্রবহ; ৭. পোর্টফোলিও ইকুইটির প্রবহ; এবং ৮. সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের প্রবহ। এ-সব প্রবহই অর্থের বাজারের চেহারাকে তুলে ধরে। আর মিশেল বড্‌ ও সমির আমিনের মতে এ-প্রবহের ওপর প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য করছে মার্কিন কর্পোরেশনগুলোই।

এখানে বলা দরকার যে, অর্থের বাজারকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে অনেক। প্রযুক্তির কারণেই লক্ষ্য করছি ‘ভারচুয়াল’ শেয়ার বাজারের অভূতপূর্ব বিস্তৃতি। আর প্রযুক্তির কারণেই তো উদ্ভাবিত হয়েছে যাকে বলা হচ্ছে ‘ইলেকট্রনিক অর্থ’। হ্যাঁ, ওই প্রযুক্তির কারণেই অভাবনীয় অংকের টাকা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে স্থানান্তরিত হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই। উড়ে-উড়ে ঘুরে-বেড়ানো এবং জুড়ে-বসা পুঁজির আরেক নাম ওই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই। আর এই পুঁজির দুনিয়া-সফরকে অবাধ করার ক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকায় থাকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আই.এম.এফ. এবং ডাব্লিউ.টি.ও.।

তবে অর্থের বাজারের সঙ্গে পণ্যের বাজার যুক্ত থাকে বটে। বস্তুত, অর্থের বাজার পণ্যের বাজারকেও গতিশীল করে। সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমা মুলুকের কিছু কিছু রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক পুঁজির নতুন চেহারাকে বোঝার জন্য জল্পনামূলক পুঁজির ওপর জোর দিয়েছেন। এঁদের ভাষ্য অনুসারে বর্তমানের কর্পোরেশনগুলো পণ্যোৎপাদনের চেয়ে জল্পনামূলক পুঁজিতে বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের চেয়ে অর্থ দিয়ে অর্থ আনার বিষয়টিতে বেশী আগ্রহী হয়ে উঠেছে আজকের কর্পোরেশনগুলো। কিন্তু এর অর্থ আবার এও নয় যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এখন উৎপাদন ও পণ্যের মৃত্যু ঘটেছে। মিশেল বড্‌ আমাদের জানাচ্ছেন যে, ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এই দশ বছরে পণ্যোৎপাদনের পরিমাণ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্যই লক্ষ্য করা যাবে বিশ্বব্যাপী মার্কিন পণ্যের ছড়াছড়ি-গাড়ি ও অস্ত্র থেকে টুথব্রাশ ও দাঁতের খিলাল পর্যন্ত। পুঁজিবাদের সেই পুরনো সংজ্ঞার্থটা এখনো কার্যকর ঠেকে : পুঁজিবাদ হচ্ছে সাধারণীকৃত পণ্যোৎপাদনের বৈশ্বিক ব্যবস্থা, যে-ব্যবস্থার বিকশিত রূপ আজ আমরা প্রত্য করি ওই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেই।


আগের অংশে আলোচিত আধিপত্যের পাঁচটি বলয়-যা আসলে পরস্পর-সম্পর্কিত-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাম্প্রতিক ব্যাকরণকেই নির্দেশ করে। তবে আবারও বলা দরকার যে, বলয়গুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক সবসময় যে যান্ত্রিকভাবে কাজ করে তা নয়। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আমরা জানি যে, তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটের ইতিহাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে এগিয়ে আছে। কিন্তু এ লুটপাটের জন্য প্রয়োজন পড়ে প্রযুক্তির। প্রযুক্তির উদ্ভাবনে, উন্নয়নে এবং প্রয়োগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আছে। কিন্তু নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। এ-সংকট একই সঙ্গে অর্থের ও পণ্যের বাজারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল। এছাড়া আধিপত্য রক্ষা ও বিস্তারের ক্ষেত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অবশ্যই তার আপাত-প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপ ও জাপানকে মোকাবেলা করতে গিয়েও সংকটে পতিত হয়েছে একাধিকবার।

বলা দরকার, একচেটিয়া পুঁজিবাদ প্রতিযোগিতাকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত করতে পারে না এবং পারে নি। এখানে আধিপত্য মানেই নিরঙ্কুশ আধিপত্য নয়; আর একচেটিয়া পুঁজিবাদ মানেই প্রতিযোগিতাহীনতা নয়। বস্তুত, আন্তঃপুঁজিবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৪৫ সাল থেকেই বিভিন্নভাবেই সংকটে পতিত হয়েছে, যার একটি খতিয়ান পাওয়া যাবে হাওয়ার্ড জিন-এর এ পিপলস্‌ হিস্ট্রি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস্‌-এ। এ খতিয়ান মার্কসের সেই পুরনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বকেই সামনে আনে : একচেটিয়া আধিপত্যই প্রতিযোগিতাকে উস্কে দেয় আর প্রতিযোগিতাই তৈরী করে একচেটিয়া আধিপত্য। ‘এ-দ্বান্দ্বিকতা আবার সাম্রাজ্যবাদকে সংকটাপন্ন করে,’ যে-কথাটা বলেছেন ডেভিড হারভি।

এখানে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম স্তর হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দুটো বড়ো সংকটকে মোটা দাগে চিহ্নিত করা যাক। প্রথম সংকটটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ঘিরেই আবর্তিত। এ-সংকটের বয়ান উপস্থিত করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই একাধিক তাত্ত্বিক ও লেখক : নোম চমস্কি, ম্যানিং ম্যারাবেল, মাইকেল এ্যালবার্ট ও পেরি নেলসন। এঁদের মতে গত প্রায় দুই দশক ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট বেড়েই চলেছে, যাকে আসলেই মোকাবেলা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয় নি। এ-সংকটের খুঁটিনাটিতে প্রবেশ না-করেও কয়েকটি কথা অনায়াসেই বলা যায়। হ্যাঁ, সামরিক খাতে দানবীয় হারে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। এর ফলে মধ্যশ্রেণীসহ শ্রমিক শ্রেণী ও দরিদ্র মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে। তার ওপরে রয়েছে শ্রম-সরবরাহের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। প্রকৃতপক্ষে, গত পনের বছরে বিত্তশালী হয়েছে আরো বিত্তশালী, দরিদ্র হয়েছে আরো দরিদ্র। পেরি নেলসন তাঁর দ্য ফিউচার ইজ আপটু আস গ্রন্থে লিখছেন, ‘সারা পৃথিবীতে তো বটেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও শ্রেণী সংগ্রাম আগের তুলনায় প্রবল হয়েছে।’ (পৃ ২১) হ্যাঁ, গত পনের বছরে বেড়েছে যেমন বেকার-সমস্যা, মার্কিন মধ্যশ্রেণী ও দরিদ্র জনগণের জন্য তেমনি কমেছে শিা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ-সুবিধা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক সংকটের আরেকটি মাত্রা নিহিত আছে তার রাষ্ট্রীয় ঋণেই। এ ঋণের পরিমাণও মোটামুটিভাবে গত পনের বছরে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এ কথাটা নোম চমস্কি ও হাওয়ার্ড জিন বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন একাধিকবারই।

কিন্তু আমরা তো দেখেছি যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুগে আধিপত্যের বিভিন্ন বলয়ে একচেটিয়া কর্তৃত্ব জারি রেখেই মার্কিন কর্পোরেশনগুলো তাদের লুটপাট ও মুনাফা বৃদ্ধি করেছে। তাহলে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট? হ্যাঁ, পুঁজিবাদের ইতিহাস বিসংগতি ও দ্বন্দ্ব উৎপাদনের ইতিহাসও বটে। পুঁজিবাদের বিকশিত রূপ হিসেবে সাম্রাজ্যবাদ সেই সব বিসংগতি ও দ্বন্দ্বকে জিইয়ে রাখে, এমনকি সম্প্রসারিতও করে। হ্যাঁ, মুনাফা-বৃদ্ধি মানেই জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। আসলে ওই মুনাফা-বৃদ্ধির সঙ্গে শ্রেণী-বৈষম্যেরই বিচিত্রমাত্রিক যোগাযোগ রয়েছে। লাতিন আমেরিকার লড়াকু কবি এনরিক লিন কথাটা তাঁর কবিতাতেই বলেন এ-ভাবে :‘তোমার ২+২ মানেই আমার ২-২’। মুনাফা প্রসঙ্গে আরেকটি কথা এখানে বলে নেয়া দরকার। ডেভিড হারভিসহ একাধিক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ বলেছেন যে, মুনাফা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও মার্কিন কর্পোরেশনগুলো ক্ষেত্রবিশেষে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, কারণ মুনাফা বৃদ্ধির হার আর মুনাফার পরিমাণ বা অঙ্কের বৃদ্ধি এক জিনিস নয়। হারভির মতে, কিছু কিছু মার্কিন কর্পোরেশনের মুনাফার সার্বিক পরিমাণ বছরে বছরে বেড়ে গেলেও বৃদ্ধির হার ন্বিমুখী হওয়ার প্রবণতাও দেখাচ্ছে। এই আপাত-পরো মুনাফা-সংক্রান্ত সংকটকেও খেয়াল করা দরকার।

এবারে আসি দ্বিতীয় সংকটের প্রশ্নে। আন্তোনিও গ্রামসির ওই পুরাতন কথাটা বোধ করি আরো সহজে বলা যায় এ-ভাবে : পৃথিবীতে এমন কোনো আধিপত্য নেই, যে-আধিপত্য একই সঙ্গে সকলকেই বশ করতে পারে, অধীনস্থ করতে পারে। আর আধিপত্য আবার তার বিপরীতকে অর্থাৎ বিদ্রোহকেও উস্কে দেয়। তরুণ চিকানো তাত্ত্বিক টোনি সারাগোসা তাঁর ‘কাস এ্যান্ড লেবার স্ট্রাগল’ প্রবন্ধে আমাদেরকে জানান, ‘কেবল ২০০০ সালেই এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং আই.এম.এফ.-এর বিরুদ্ধে প্রায় ২০০টি আন্দোলন শুরু হয়েছে।’ (পৃ ১) হ্যাঁ, বর্তমান সময়ের একচেটিয়া পুঁজিবাদকে বিভিন্নভাবে সংকটাপন্ন করে চলেছে পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনগুলো নিজেই। টোনি সারাগোসা একুশ শতকের একচেটিয়া পুঁজিবাদের ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের একটি আখ্যান তুলে ধরেন এভাবে :

সিয়াটল ও লস এঞ্জেল্‌সের রাস্তায় বিুব্ধ মানুষ নেমেছিল ডাব্লিউ.টি.ও. ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে; মেলবোর্ন ও ডেভোসেও দেখা গেছে ওয়ার্ল্ড একনমিক ফোরামের বিরুদ্ধে জনতার ঢল। এছাড়া ওয়াশিংটন ডি.সি., ফিলাডেলফিয়া, এবং কিয়েভে মানুষ তাদের দুর্বৃত্ত পুঁজিপুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। আই.এম.এফ.-এর নীতিমালার বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে মানুষ আর্জেন্টিনায়, বলিভিয়ায়, ব্রাজিলে, কলাম্বিয়ায়, কোস্তারিকায়, ইকুয়েডরে, হনডুরাসে, কেনিয়ায়, নাইজেরিয়ায়, তুরস্কে, দণি আফ্রিকায়। এছাড়া আই.এম.এফ. ও পুঁজিবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার হয়েছে প্রাগে। এশিয়া ডেভলপমেন্ট ব্যাংককে বন্ধ করে দেয়ার জন্য আন্দোলন চলছে হাওয়াই-এ। এমনকি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চলছে কলাম্বিয়ায়, ফিলিপাইনসে, ইন্দোনেশিয়ায়, পেরুতে, মেক্সিকোতে। এছাড়া তো রয়েছেই মধ্যপ্রাচ্যসহ আরবজগত। (পৃ ১)

বলা দরকার যে, টনি সারোগোসা সে-সময়টাকে ওপরের আখ্যানে ধরেছেন, তা ১৯৯৯-২০০১। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত পুঁজিবাদবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে তীব্র মাত্রায়। ২০০৬ সালে একটি সাাৎকারে মার্কিন তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মী উইলিয়াম টাকামাৎসু টমসন জানান,

সেপ্টেম্বর ১১ থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, পেশাজীবী মানুষের আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, জাতীয় মুক্তির আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন ইত্যাদি একটি কথা স্পষ্ট করেই বলে : একদিকে সাম্রাজ্যবাদ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় যেমন আগ্রাসী হয়েছে, ঠিক তেমনি বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়।

টমসনের ফর্দের অন্তর্ভুক্ত আন্দোলনগুলোর অনুপুঙ্খে প্রবেশ করার অবকাশ এখানে নেই। তার জন্য একটি আলাদা প্রবন্ধই রচনা করতে হয়। তবে বলা যাবে যে, ওই আন্দোলনগুলোরই তীব্র ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় সাধন ছাড়া পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। ওই আন্দোলনগুলো এও বলে যে, আমাদের সময়ের একটি প্রধান ও প্রাথমিক সমস্যা হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেই। এবং আরো বলে যে, বর্তমান সময়ের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে গেলে একই সঙ্গে সে-লড়াইকে জোরদার করতে হবে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যুক্ত তাবৎ ক্ষমতা-সম্পর্কসহ জাতীয় শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধেও। এভাবেও বলা যায় : বর্তমান সময়ের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করার জন্য শ্রেণী সংগ্রাম যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি জাতীয় মুক্তির লড়াইও। অবশ্য এ দুয়ের মধ্যে যোগসাধন করা বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

সেই চ্যালেঞ্জকে বিবেচনায় রেখেই এও বোঝা দরকার যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একই সঙ্গে বর্ণবাদী ও পিতৃতান্ত্রিক। ফিলিপিনি মার্কসবাদী সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক ই. স্যান হুয়ান তাঁর রেইসিজম্‌ এ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ গ্রন্থে জানান যে, বর্ণবাদবিরোধী ও পিতৃতন্ত্রবিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতাকে পুঁজিবাদবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বিত না করলে এইসব আন্দোলনের কোনোটাই শক্তিশালী হবে না। মার্কস ও এঙ্গেলসের ওই কথাটা আবারো সময়ের তাগিদে জরুরি হয়ে ওঠে : সকল ধরনের শোষণ, নিপীড়ন ও শ্রেণী বৈষম্য থেকে সমাজকে মুক্ত না-করলে শ্রমিক শেণীসহ কোনো শোষিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জনগণ এখনও কোনোভাবেই মুক্ত নয়। ১৯৭১ সালে একটি পৃথক রাষ্ট্রিক সত্তা হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত ছত্রিশ বছরে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন কায়দায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেনদেন অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কিভাবে কাজ করেছে, তা বিশদভাবে বোঝাতে গেলে একটি আলাদা প্রবন্ধই লিখতে হয়। তবে একচেটিয়া আধিপত্যের যে পাঁচটি বলয়কে আমরা এর মধ্যেই চিহ্নিত করেছি, সেগুলো বিবেচনায় রাখলে অবশ্যই আমাদের শাসক শ্রেণীর সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যে-সম্পর্ক অব্যাহত আছে তা চট করেই বোঝা সম্ভব। আর এ সম্পর্কটা সবসময় খেয়ালে রেখেই আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে। কিন্তু এ-আন্দোলনকে একই সঙ্গে হতে হবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। আসলে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতাকে আমাদের প্রাত্যহিক অনুশীলনে রূপান্তরিত করে তাকে অভ্যেসে পরিণত করাও আমাদের সময়ে সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ।

তথ্যসূত্র
Amin, Samir, Capitalism in the Age of Globalization, London: Zed Books, 1997
Arrighi, Giovanni, The Long Twentieth Century, London: Verso, 1994
Askew, Kelly & Richard R. Wilk, eds. The Anthropology of Media. Malden: Blackwell Publishers, 2002
Bagdikian, Ben, The Media Monopoly. Boston: Beacon Press, 2000
Beaud, Michel, A History of Capitalism: 1500-2000. trans. Tom Dickman & Anny Lefebvre. New York: Monthly Review Press, 2001
Bishop, Maurice, Maurice Bishop Speaks: The Grenada Revolution, 1979-82. New York: Pathfinder Press, 1983
Blum, William, “War Against Terrorism or Expansion of the American Empire?” in Abuse Your Illusions: The Disinformation Guide to Media Mirages and Establishment Lies. ed. Russ Kick. New York: The Disinformation Company Ltd. 2003
Brewer, Anthony, Marxist Theories of Imperialism: A Critical Survey. 2nd ed. London and New York: Routledge, 1989
Chomsky, Noam, Hegemony of Survival: America’s Quest for Global Dominance. New York: Metropolitan Books, 2003
—, Pirates and Emperors, Old and New: International Terrorism in the Real World. Cambridge, MA: South End Press, 2002
—, Rogue States: The Rule of Force in World Affairs. Cambridge, MA: South End Press, 2000
Danaher, Kevin, ed. Corporations are Gonna Get Your Mama: Globalization and the Downsizing of the American Dream. Monroe: Common Courage Press, 1996
Dussell, Enrique, “Marx’s Economic Manuscripts of 1861-63 and the ‘Concept’ of Dependence,” Latin American Perspectives 65 (17/2) (Spring 1990): 62-101
Dyer-Witheforde, Nick, Cyber-Marx: Cycles and Circuits of Struggle in High-Technology Capitalism, Urbana: University of Illinois Press, 1999
Fortune Magazine, “Business Goes to War” (cover page). October 15, 2001. 144.7
Foster, John Bellamy, “Imperialism and ‘Empire.’” Monthly Review 53.7 (2001): 1-9
— Naked Imperialism, New York: Monthly Review Press, 2006
Galeano, Eduardo, Open Veins of Latin America: Five Centuries of the Pillage of a Continent. trans. Cedric Belfage. New York: Monthly Review Press, 1973
— Upside Down: A Primer for the Looking-Glass World. New York: Picador USA, 2000
Hardt, Michael and Antonio Negri, Empire, Cambridge, MA: Harvard University Press, 2000
Harvey, David, The New Imperialism. Oxford : Oxford University Press, 2003
— Spaces of Hope, Berkeley: University of California Press, 2000
Harman, Edward and Noam Chomsky, Manufacturing Consent: The Politcal Economy of the Mass Media, New York: Pantheon Books, 2002
Lenin, V. I. Imperialism: The Highest Stage of Capitatism. San Francisco: Chian Books, 1965
– – -, “The State.” In Paul Le Blanc, ed. From Marx to Gramsci: A Reader in Revolutionary Marxist Politics. New Jersey: Humanities Press, 1996. 208-222
Magdoff, Harry, Imperialism Without Colonies. New York: Monthly Review Press, 2003
Mandel, Ernest. Late Capitalism, trans. Joris Des Bres. Norfolk: Lowe and Brydon, 1975
Marable, Manning, “The Economic Crisis and Globalization.” Left Turn 1 (2001): 1-4
Martin, Kevin, Tim Nafziger, Jeremy Schenk, & Mark Swier, “Boeing Corporation.” Z Magazine 14.11 (November 2001): 31-36
Marx, Karl, A Contribution to the Critique of Political Economy. New York: International Publishers, 1970
– – -, Capital Vol. 1, trans. B. Fowkes. New York: Vintage, 1977
– – -, Capital Vol. 2-3. trans. D. Fernbach. New York: Vintage, 1981
– – -, Grundrisse: Foundations of the Critique of Political Economy. trans. M. Nicoleus. New York: Random House, 1973
Marx, Karl and Friedrich Engels, The Communist Manifesto. intro. Eric Hobsbawm, London: Verso, 1998
McChesney, Robert W, “The New Global Media.” Nation 29 Nov. 1999. 23 Aug. 2001
McMurty, John, The Cancer Stage of Capitalism, London: Pluto Press, 1999
Murdock, Graham & Peter Golding, “Digital Possibilities, Market Realities: The Contradictions of Communications Convergence.” Socialist Register 2002. eds. Leo Panitch & Colin Leys. London: Merlin Press, 2001. 111-129
Ohmae, Kenichi, The End of the Nation-State: The Rise of Regional Economies, New York: Free Press, 1995
Robbins, Richard, Global Problems and the Culture of Capitalism, 2nd ed. Boston: Allyn and Bacon, 2002
San Juan, E. Jr, Racism and Cultural Studies. Durham : Duke University Press, 2002
Zaragosa, Tony, “Class and Labor Struggle.” dis / content 4.1 (2001) : 1-5
Zinn, Howard, A People’s History of the United States. New York : Harper Perennial, 2003

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাম্প্রতিক ব্যাকরণ

  1. An excellent piece of essay.
    An excellent piece of essay. I suggest everyone who wants to understand how the US is running its ‘solo-show’ world-wide, reads this article . We love it or loathe it, America is now the first truely global empire. Scholars like Tariq Ali thinks, it’s the first and most probably the last global empire. Even China with its enormous economic power doesn’t have a chance to stand up to America militarily for many years to come – perhaps they will never have. Looks like China has to content itself with economic success. Some scholars think, only a crisis from within can tame American power like all its predecessors in the past. So if only the good American people rise , then we have a chance to reverse its insidious effect in the world. Otherwise brace yourself for another American century.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 4 =