গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি যে কারণে অবৈধ ও গণবিরোধী | বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন

অধ্যাপক এম শামসুল আলম জ্বালানি ব্যবস্থার খুঁটিনাটি সমস্যা থেকে শুরু করে বিরাটাকারের দুর্নীতি ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ভোক্তা পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সরব আছেন। জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিইআরসির জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির শুনানিগুলোতে তিনি প্রচুর তথ্য, উপাত্ত ও যুক্তি নিয়ে হাজির হন। ফলে এই খাতে যে কোনো মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে এখন গণস্বার্থের প্রশ্নটি বিবেচনায় নিতেই হয়। যা তাকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। কিন্তু গ্যাসের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিটা হয়েছে অসাংবিধানিক ও অবৈধভাবে। তামাদি হয়ে যাওয়া একটা শুনানীকে ব্যবহার করে সরকারপক্ষ অসাংবিধানিক উপায়ে গ্যাসের ময়ল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। কিছুদিন আগে সাপ্তাহিকে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক শামসুল আলম কি কি কারণে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিটা অবৈধ ও গণবিরোধী, তা ব্যাখ্যা করেছেন সহজ ভাষায়। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তার মূল্যায়ন এখানে তুলে ধরছি।

//গ্যাস খাতে মূল্যবৃদ্ধির সরকারি একটা নীতি বা দর্শন রয়েছে। তা হচ্ছে, এই খাত পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ রাজস্ব চাহিদার প্রয়োজন, যদি খাত থেকেই সে পরিমাণ আয় হয়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি করা হবে না। আর যদি রাজস্ব আয় কমের ফলে ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে সে পরিমাণ মূল্যহার বৃদ্ধি করে আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করা হবে। মূল্যবৃদ্ধির মানদণ্ড এটাই।

আমাদের গ্যাস খাত মূলত লাভজনক। ২০০৮ সালে লাভজনক ছিল। ওই বছর যখন ৬৫ শতাংশ হারে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব এলো, তখন শুনানিতে প্রমাণ হলো, গ্যাস খাতে কোনো ঘাটতি নেই। তাই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব সেই যাত্রায় বাতিল হয়ে যায়। তখন বলা হয় যে, আগামীতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি পাবে। কারণ বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে গ্যাস কিনতে উত্তরোত্তর ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। তখন সেই মূল্যের সঙ্গে এমনকি সরবরাহ ব্যয়ও বাড়বে। ফলে ভোক্তাদের অনেক বেশি খরচ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম অনেক কম বিধায়, কিছু দাম এখন বাড়ানো হলে তেমন চাপ হবে না। সেই বাড়তি অর্থ দিয়ে একটি তহবিল গঠন করা হবে। যা দেশীয় গ্যাস কোম্পানির উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে। এর ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তাদের কাছ থেকে বেশি গ্যাস পাওয়া গেলে, বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমলে গ্যাসের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তুলনামূলক কম খরচে ভোক্তাদের কাছে গ্যাস পৌঁছানো যাবে। এই যুক্তিতে তখন গ্যাসের মূল্য ১১.২২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। এক হিসাবে এটা দাম বাড়ানো নয়, কারণ এটা আবার ভোক্তার উন্নয়নের জন্যই সঞ্চয় ও কাজে লাগানো হচ্ছে, যাতে পরে দাম না বাড়ে। কিন্তু এই টাকা বণ্টন হয়েছে আগের পদ্ধতিতেই। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে সামান্য কিছু টাকা এসেছে। এ বিষয়ক বিইআরসি’র নীতিমালা একেবারেই অনুসরণ করা হয়নি। যদি মূল্যবৃদ্ধিকৃত অংশের পুরোটা গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে যেত, তাহলেই এটা আইনসঙ্গত হতো। কিন্তু দেখা গেল, বাড়তি এই অর্থ গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে সবটা আসেনি। অর্থাৎ যে লক্ষ্যে এটা করা হয়, তা অর্জন করা যায়নি। আবার বেআইনি পদ্ধতিতে এই টাকা ব্যয় হয়েছে।

২০১৪ সালে এরপর আবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আসে। তখনও গ্যাস খাত লাভজনক ছিল। তারা এতে ঘাটতি দেখানোর জন্য ‘গ্যাসের সম্পদমূল্য’ প্রতি হাজার ঘনফুট ২৫ টাকা হিসেবে ধার্য করে। এর আগে এরকম কোনোকিছু ছিল না। বিদ্যমান গ্যাসের দামের ওপর যখন এই বাড়তি দাম যোগ করা হয়, তখন দেখা যায় যে, ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম না বাড়ালে আর সমন্বয় করা যাচ্ছে না। এভাবে তারা সরকারি সম্পদমূল্য নামক একটি ধারণাকে সামনে এনে গ্যাস খাতে কৃত্রিম ঘাটতি পরিস্থিতি তৈরি করে। এর ভিত্তিতেই তারা নতুন মূল্যহার সমন্বয়ের দাবি জানায়। আমরা তখন এর বিরোধিতা করে বলি, ভোক্তারা গ্যাসের যে মূল্য পরিশোধ করে তা একান্তই এর উৎপাদন ব্যয় নয় বরং এর মধ্যেই সম্পদমূল্য হিসেবে সরকার তাদের কাছ থেকে কিছু অর্থ নিয়ে নিচ্ছে। এটা দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের উৎপাদন কোম্পানি থেকেই সরকার তার প্রকার-পদ্ধতির মাধ্যমে আদায় করছে। এর ফলে এই খাতে সরকারের লাভও হচ্ছে। সুতরাং আবার সম্পদমূল্য নাম করে নতুন করে টাকা নেয়াটা যৌক্তিক কিংবা আইনসম্মত নয়।

এর পরে প্রশ্ন উঠল, সরকার যদি সম্পদমূল্য হিসেবে বাড়তি এই মূল্য গ্রহণ করে তবে তা কীভাবে বণ্টন-ব্যয় হবে! আগের মূল্যের বণ্টন পদ্ধতি ছিল গ্যাসের ৫৫ ভাগ সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স হিসেবে কেটে নেয়, আর বাকি ৪৫ ভাগ থাকে পেট্রোবাংলার কাছে। দেখা গেল যে, নতুন এই সম্পদমূল্য হিসেবে নেয়া টাকাও বণ্টন হবে একই পদ্ধতিতে। অর্থাৎ আগের উপায়েই এই টাকা ভাগাভাগি হচ্ছে। আলাদা নামে নেয়া হলেও এ থেকে প্রাপ্ত অর্থের আলাদা কোনো কার্যকারিতা থাকছে না। এটা অর্থবহ হচ্ছে না দেখে তখন এ প্রস্তাবটা গ্রহণযোগ্যতা হারায়। কারণ এভাবে ভোক্তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার কোনো আইনি বৈধতা নেই। তারা যেভাবে এ প্রস্তাবটা নিয়ে এসেছিল, তাও আইনসম্মত ছিল না। তারা দাবি করে যে, প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু স্পষ্টতই দেখা যায়, জ্বালানি বিভাগ এটা বিশ্লেষণ করেনি এবং প্রধানমন্ত্রীকে ব্যাখ্যাও করেনি যে, এটা বেআইনি হওয়ার মতো নানা দিক রয়েছে। অর্থাৎ বলা যায়, তারা বিভ্রান্ত করেই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্বাক্ষর এনেছিল। কিন্তু কোনো মন্ত্রণালয়ের তো এই ক্ষমতা নেই যে, তারা প্রধানমন্ত্রীকে বেআইনি প্রস্তাব পাঠাবে ও তাতে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে আসবে। জ্বালানি বিভাগ এই কারচুপি করেছে, তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বেআইনি প্রস্তাব পাঠিয়ে তাতে স্বাক্ষর করিয়ে এনেছে। একে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডও বলা যায়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের চিহ্নিত করে কোনো ব্যবস্থা নিতে আমরা দেখিনি।

মূল্যবৃদ্ধির এই প্রক্রিয়াটা তখন থেমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আরও কিছু ঘটনা ঘটে। নিয়ম হচ্ছে ৯০ দিনের মধ্যে উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর গণশুনানির ভিত্তিতে কমিশন রায় দিবে এবং তা কার্যকরের সময়ও বলে দিবে। গ্যাস নিয়ে হওয়া শুনানির রায় হওয়ার কথা ছিল ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য। কিন্তু শুনানির আদেশ দিতে কালক্ষেপণ ঘটে। ফলে ওই অর্থবছর পার হয়ে যাওয়ার পর শুনানির আদেশ দেয়া হলেও তা কার্যকর হয় না। আইনগত এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে এ বিষয়ক কোনো আদেশ আর আসেনি। যে প্রক্রিয়ায় মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আনা হয়েছিল, তা আইনসম্মত ছিল না বিধায় এর কী সুরাহা হবে, তা কমিশন বের করতে পারেনি। যে কারণে শুনানি ও আদেশ একটা বিলম্ব বিপর্যয় দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে বলে আমার ধারণা। মন্ত্রণালয়সহ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবকরা বেকায়দায় পড়ায় এ বিষয়ে কোনো রায়ই দেয়া গেল না, বিষয়টা এভাবে দেখার মতো যুক্তি রয়েছে।

যাই হোক, এটুকু বলা যায় যে, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আগের প্রস্তাবগুলোর আর আইনি কার্যকারিতা নেই। ফলে প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতে কোনো আদেশ দেয়ার সুযোগ আর কমিশনের নেই। গ্যাস খাত এখনও লাভজনক। সুতরাং এখন যদি গ্যাসের দাম বাড়াতে হয়, তাহলে ভিন্নতর কোনো পদ্ধতিতে নতুন প্রস্তাব দিতে হবে। গতবার গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় কমিয়ে আনা ও দেশীয় কোম্পানির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আমরা মূল্যবৃদ্ধির আদেশ মেনে নেই। এখন যদি আবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করতে হয়, তাহলে গ্যাস খাত ঘাটতিতে আছে বা ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য মূল্যবৃদ্ধি প্রয়োজন, এমন বিধানের আশ্রয় নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর বাইরে এখন পর্যন্ত আরেকটা বিবেচনা আছে। যার ভিত্তিতে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবনা আসতে পারে। এটাকে আবার আমরা একেবারে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিচ্ছি না। আমরা মনে করি, এই বিবেচনার যৌক্তিকতা আছে ঠিকই, কিন্তু এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরেই এটা আলোচিত যে, দেশের বিরাট অংশের মানুষ গ্যাস পায় না। আর অল্প মানুষ কম দামে গ্যাসের সুবিধা ভোগ করে। এমনকি যারা এলপিজি ব্যবহার করে তাদের ব্যয়ের চেয়ে আবাসিক গ্যাস ব্যবহারকারীদের ব্যয় অনেক কম। এটা এক ধরনের বৈষম্য। বৈষম্যের রূপটা হচ্ছে মিশ্র জ্বালানি ব্যবস্থার উপস্থিতি। অর্থাৎ রান্নায় জ্বালানি হিসেবে এখন বিদ্যুৎ, গ্যাস, কাঠ ও নিম্নমানের বিভিন্ন বায়োমাস ব্যবহার হচ্ছে এবং গ্যাসে সিঙ্গেল ও ডাবল বার্নারের উপস্থিতি রয়েছে। এই বৈষম্যের ক্ষেত্রে সমতা আনতে এমন প্রস্তাব আছে যে, এলপিজির সঙ্গে অন্তত আবাসিক গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা দরকার। এই বিবেচনা সামনে আসছে এবং সরকার এটাকেই ভিত্তি করছে। এর যৌক্তিকতাও রয়েছে।
কিন্তু এর সঙ্গে কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। যদি তা না করে শুধু এলপিজির সঙ্গে আবাসিক গ্যাসের সমতা আনয়নের জন্য ঢালাওভাবে মূল্যবৃদ্ধি করা হয়, তাহলে তা যুক্তিসঙ্গত কোনো সমাধান হবে না। বিবেচ্য বিষয়গুলো হচ্ছে, এলপিজি ব্যবসার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যবৃদ্ধির বাড়তি অর্থের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা প্রদান।

এলপিজি গ্যাসের খাতটি এখন বেসরকারি খাতে। তারা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না করে বাজারে সংকট তৈরি করে রেখেছে। এর ফলে এখানে কালোবাজার তৈরি হয়েছে। যে কারণে ৭০০-৮০০ টাকার এলপিজি কোথাও কোথাও ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ এলপিজির এই চড়া দামটা হচ্ছে মুনাফাখোর উদ্যোক্তাদের দুর্নীতিমূলক তৎপরতার ফল। এখন যদি এই কালোবাজারির ফলে বাড়া এলপিজির দামের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য আবাসিক গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে এর মাধ্যমে কালোবাজারিকে বৈধতা দেয়া হবে এবং একে উৎসাহিত করা হবে। সরকারের উচিত কালোবাজারি বন্ধের পদক্ষেপ নেয়া। সেক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে বাজারে এলপিজি গ্যাস সরবরাহ করা যায়। নির্ধারিত মূল্যে যদি বাজারে সরকারি এলপিজি পাওয়া যায়, তাহলে ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের ‘মনোপলি’ ভেঙে পড়বে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সরবরাহ করতে বাধ্য হবে। এমন পদক্ষেপের মাধ্যমেই শুধু এই খাতের কালোবাজারি বন্ধ করা যায়। আর যদি এই কালোবাজারি বন্ধ না করে রাষ্ট্র এর কালোবাজারির ফলে সৃষ্ট বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য আবাসিক গ্যাসের দাম বাড়ায়, তাহলে এই অভিযোগ তোলাটা অন্যায্য হবে না যে, রাষ্ট্রই কালোবাজারিকে ‘প্রমোট’ করছে।

এখন আসা যাক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা কোনো গ্যাসই ব্যবহার করতে পারে না, তাদের বিষয়ে। গ্যাস জাতীয় সম্পত্তি। এর ওপর অধিকার সমগ্র জনগণের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে শুধু দু একটি শহরের জনগণই এর সুবিধা পাচ্ছে। রান্নায় জ্বালানি হিসেবে বিদ্যুতের ব্যবহারও শহরেই সীমাবদ্ধ। বাদবাকি জনগণ এখনও প্রাচীন ধারার জ্বালানি ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে কাঠ ও নিম্নমানের বায়োমাস ব্যবহৃত হচ্ছে। এ জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের স্বাস্থ্যহানির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। জ্বালানি ব্যয়ও বেশি গুণতে হচ্ছে। আবার এজন্য তাদের সময়ও লাগছে বেশি। এখন যদি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়, তাহলে তো এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, এই বাড়তি মূল্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো বা জ্বালানি খাতে বিদ্যমান মিশ্র জ্বালানির গুণগত উন্নয়নে ব্যবহার হচ্ছে। যদি আগের নিয়মেই পেট্রোবাংলা এবং সরকারের মধ্যে টাকা ভাগ হয়, তাহলে তো এর দ্বারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জ্বালানি পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন হবে না। তাহলে দাম বাড়াতে হলে সরকারকে এক্ষেত্রে এই বৃদ্ধিকৃত টাকা কীভাবে ব্যয় হবে এবং তার সুফল কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পাবে, সেই পরিকল্পনা হাজির করতে হবে।

দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমরা আরও একটি বিবেচনাকে সামনে এনেছি। এটা হলো সিঙ্গেল বার্নার। শহরে যারা সিঙ্গেল বার্নার ব্যবহার করে, তারা দরিদ্র জনগোষ্ঠী। তারা সিঙ্গেল বার্নারের কারণে রান্নার কাজে দ্বিগুণ সময় ব্যয় করছে। এই সময়টা অন্য জায়গায় ব্যয় করে তারা আয় বাড়াতে পারতো। তাদের এই সময়ের মূল্য সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা বলছি যে, সিঙ্গেল বার্নারের দাম বাড়ানো যাবে না। কারণ এই গ্রাহক দ্বিগুণ সময় ব্যবহার করেন কিছু ব্যয় কমানোর নিমিত্তে। তার ওপরে এই বাড়তি দামের খড়গ চাপিয়ে দেয়া যাবে না। তাছাড়া সরকারের প্রধানতম কর্মসূচি হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন ও জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের মান উন্নয়ন। শহরের দরিদ্র মানুষের অধিকাংশই বাসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির ভাড়া একত্রে একটা ঠিকা চুক্তিতে পরিশোধ করেন। যেমন তারা হয়তো তিন হাজার টাকায় একটি টিনের ঘর ভাড়া নিলেন, এর মধ্যেই আছে তার একটি বাতি, একটি ফ্যান এবং রান্না ও পানির খরচ। জ্বালানির ব্যয় বাড়লে তাদের এই মোট ভাড়াসহ সার্বিক খরচই বেড়ে যায়। যাতায়াতের খরচ বাড়ে, পণ্যমূল্যও বাড়ে। এ ধরনের মানুষ এতই কম আয় করেন যে, হঠাৎ করে ব্যয় বাড়লে তারা আর কুলিয়ে উঠতে পারেন না, তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। ফলে তারা আরও দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। এই দিক থেকে আমরা বলছি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চাপে ফেলতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাবে না। তা হবে দারিদ্র্য বিমোচন ও জনগোষ্ঠীর জীবন যাপনের মান উন্নয়নের সরকারি মূলনীতির বিরোধী। এজন্যই আমরা সিঙ্গেল বার্নারের দাম না বাড়ানোর বিষয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছি। যদি এসব ব্যবস্থা ছাড়া বাড়তি টাকা তুলে সরকারের সংস্থাগুলো ভাগাভাগি করে নিতে চায়, তাহলে সেটা বরং ভোক্তারাই পাক। দাম না বাড়িয়ে বরং ভোক্তাদের হাতেই সেটা থাকতে দেয়া হোক। তাতে তাদের প্রান্তিক অংশের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা হলেও ভালো থাকবে।
এরকম নানা দিক বিবেচনা করেই আমরা বলছি যে, বর্তমানে আবাসিক গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুযোগ অবশ্যই আছে। কিন্তু সেজন্য এই খাতে বিদ্যমান কালোবাজারি উৎখাত করতে হবে এবং মিশ্র জ্বালানির গুণগত মানের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সব ধরনের বৈষম্যকেই বিবেচনায় নিয়ে তার সমতাবিধানের জন্য সামগ্রিক যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। এর বাইরে গিয়ে শুধু এলপিজির সঙ্গে সমতা আনয়নের জন্য গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মোটেও যৌক্তিক হবে না। এটা এমনকি আইনসম্মতও হবে না, গণস্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে।

আবাসিক খাতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ঢালাও বিরোধিতা আমরা করি না। তবে সেজন্য অবশ্যই এই খাতে মিটারিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। গ্যাস ব্যবহারের হার নির্ণয়ের জন্য প্রত্যেক গ্রাহকের মিটার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাজারে এখনও আদর্শ মিটারের উপস্থিতি রয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে কোনো কোনো সচেতন গ্রাহক নিজেরাই মিটার লাগিয়েছেন। সরকার চাইলে আরও ভালো মানের ও ভোক্তাদের পছন্দমাফিক মিটার বাজারে সুলভ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা বিপুল পরিমাণ মিটার সরবরাহ করতে পারবে এবং এতে রাতারাতি গ্যাস ব্যবস্থা মিটারিংয়ের আওতায় চলে আসবে। অস্ট্রেলিয়ায় যখন হঠাৎ গরম পড়ল, চীন সেখানে সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থা করল। রাতারাতি হাজার হাজার ডলার ব্যবসা হলো এবং সিলিং ফ্যান ছড়িয়ে পড়ল। চাহিদা থাকলে সময় লাগে না।

মিটারের ব্যবস্থা করা গেলে প্রান্তিক গ্রাহকের জন্য আমরা লাইফ লাইন ট্যারিফের কথা বলব, বিদ্যুতে যেমনটা আছে। ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত এক রকমের দাম। পরবর্তী ইউনিটগুলোর বাড়তি দাম। অর্থাৎ কম ব্যবহারকারীকে সুরক্ষা প্রদান এবং বেশি ব্যবহারকারীর কাছ থেকে তুলনামূলক বাড়তি মূল্য আদায়। এটা করলে এই খাতে স্বচ্ছতা আসবে। সেই সঙ্গে আবাসিক খাতের গ্যাস কীভাবে ব্যবহার হয়, কারা এই গ্যাসকে কী কাজে লাগায় যে, এই খাতে এত গ্যাসের দরকার পড়ে, তাও পরিষ্কারভাবে জানা যাবে। আবাসিক খাতে মিটার ব্যবস্থাকে একটি বিশেষ গোষ্ঠী তথা স্বার্থান্বেষী মহল এগুতে দেয়নি। মিটার স্থাপন সম্ভব হলে এখন আবাসিকে যে গ্যাস খরচের হিসাব দেখানো হয়, তার অর্ধেকও লাগবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। এই অর্ধেক গ্যাস তাহলে কোথায় যাচ্ছে? আবাসিক খাত থেকে যে গ্যাস চুরি হচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই চুরির সঙ্গে যুক্ত মহলটি আবাসিক গ্যাসে মিটার স্থাপন করতে দিচ্ছে না।//

সুতরাং এই আলাপ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সরকার প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। যা কিনা জনস্বার্থবিরোধী ও অবৈধ এবং অসাংবিধানিকও বটে। মূল সাক্ষাৎকারটি দেখতে এই লিঙ্কে যান।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি যে কারণে অবৈধ ও গণবিরোধী | বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন

  1. ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে বিদেশী
    ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে বিদেশী জরিপে প্রমাণীত ‘জনপ্রিয়’ সরকার কিভাবে জনতার ওপর খড়গ চাপিয়ে দিয়েছে, কিভাবে তারা নিজেদের আইন নিজেরা ভেঙেছে, আর জনগণের সম্পদ লুটপাট করেছে রাষ্ট্রের সহায়তায়।

    পোস্টদাতাকে ধন্যবাদ বিষয়টিকে প্রাসঙ্গিক আলাপে টেনে আনার জন্য!

  2. দারুন মূল্যায়ন।
    সরকার

    দারুন মূল্যায়ন।
    সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলেই এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করছে। একনায়কতন্ত্রের এটাই বৈশিষ্ট্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 9