আরব থেকে দেওবন্দ হয়ে হাটহাজারীঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক বোঝাপড়া। পর্ব – ৩

দ্বিতীয় পর্বের লিংক এখানে

মুঘল আমলের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা

এই লেখার পরবর্তী পর্যায়ে কোনও এক সময় মাদ্রাসা শিক্ষার চারটি পর্বের মধ্যে এক ধরনের তুলনামুলক আলোচনা করবো যা দেখাবে কিভাবে মাদ্রাসা শিক্ষা তাঁর মূলধারা থেকে আজকের পর্যায়ে এসে পৌছুলো। মাদ্রাসা শিক্ষার এই চারটি পর্যায় হচ্ছে – প্রাথমিক পর্যায় যা ইসলামের শুরু থেকে দিল্লী সুলতানাত এর সময় পর্যন্ত, দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে মুঘল আমল, যাকে অনেক গবেষক বলেছেন প্রাক-কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা, তৃতীয় পর্যায়টি হচ্ছে কলোনিয়াল যুগের বা ব্রিটিশ আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সব শেষ পর্যায়টি হচ্ছে পোস্ট কলোনিয়াল বা স্বাধীন ভারতবর্ষের সময়কালীন। বিগত দুটি পর্বে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এই পর্ব ও আগামী পর্বে থাকবে মুঘল আমল বা প্রাক – কলোনিয়াল যুগের মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে আলোচনা।

মুঘল সাম্রাজ্যঃ মুসলিম শাসনের অপেক্ষাকৃত গোছানো অধ্যায়
পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদীকে পরাজিত করে ভারতের একটি বিশাল অংশের ক্ষমতা দখল করেন প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর।মুঘলরা ছিলেন মধ্য এশিয়ার তুর্কি-মঙ্গোল বংশোদ্ভূত, তাঁরা নিজেরা দাবী করতেন চেঙ্গিস খানের বংশধর হিসাবে। যদিও মুঘল সম্রাটগণ নিজেদেরকে কে তিমুর বংশোদ্ভূত পরিচয় দানে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। পারস্যের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি এদের ছিলো দারুন আবেগ ও ঘনিষ্ঠতা। সক্রিয় ভাবে ফারসী সংস্কৃতির চর্চাকারী এই মুঘলদের যাত্রা শুরু হয় সম্রাট বাবর এর হাতে এবং কার্যত বিনা যুদ্ধে খমতাহীন হয়ে শেষ হয় সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহর মাধ্যমে। মুঘল সম্রাটরা মুসলমান ছিলেন যদিও আকবর ও তাঁর পুত্র জাহাঙ্গির পরবর্তীতে “দ্বীন ই ঈলাহী” বলে একটি স্ব প্রচারিত ধর্ম পালন করতেন। এখানে লক্ষনীয় যে, মুঘলরা বংশের দিক থেকে ছিলেন তুর্কী – মোঙ্গোল বংশোদ্ভুত আর সাংস্কৃতিক দিক থেকে ছিলো পারস্যর ঐতিহ্যের ধারক আর তাদের প্রজাদের একটা বড়ো অংশ ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষাভাষী ও ভিন্ন সংস্কৃতির চর্চাকারী – ভারতীয়। তাই মুঘলদের ক্ষমতা দখলের পরে আবারো এদেশে মানুষের মধ্যে আরেক ধরনের ভাষা ও সংস্কৃতির চল শুরু হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের মূল দাপ্তরিক ভাষা ছিলো ফারসী। উর্দু ও খানিকটা চলতো তবে ফারসী ভাষাভাষীদের জন্যে রাজ দরবারে চাকুরি পাবার অগ্রাধিকার ছিলো। প্রায় দুশো বছরের অধিক কাল ধরে শাসন করা এই মুঘল পরিবারের বিভিন্ন শাসকদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও বৈশিস্টর উপরে অনেক খানি নির্ভর করেছে সেই সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষত মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ। প্রায় সকল গবেষকগণ মনে করেন, মাদ্রাসা শিক্ষার সবচাইতে প্রাগ্রসর বিকাশ লক্ষ্য করা গেছে সম্রাট আকবরের আমলে।

মাদ্রাসা শিক্ষার বিকাশঃ মুঘোলদের দরাজ আনুকূল্য
মুঘল আমলেই ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষার ধ্রুপদী বিকাশ ঘটে। মুঘল আমলেও মাদ্রাসার সংখ্যা বহুগুন বেড়ে যায়।তবে দিল্লীর সুলতানাত এর সময়ের মতো এই বৃদ্ধির কারণ শাসকদের মাঝে প্রতিযোগিতা নয়। দুটি সুস্পষ্ট কারণ ছিলো মুঘল আমলে মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধির। ১ – আপাত ভাবে নির্ঝঞ্ঝাট শাসন কাল, ক্ষমতার বিপুল কেন্দ্রীভবন এবং সে কারনে কেন্দ্রে একটি সুগঠিত আমলাতন্ত্রের বিকাশ এবং দুই – রাজ দরবারের জন্যে প্রচুর ফারসী ভাষা জানা কর্মচারীর চাহিদা। আর মাদ্রাসা গুলোর অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রধান কারণ ছিলো রাজকীয় আদালতের আনুকূল্য। মুঘল আমলে শাসক নির্বিশেষে, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা রাজকীয় আদালতের এক ধরনের আনুকূল্য পেয়েছে। সম্রাট বাবর এর আমলের (১৫২৬ – ১৫৩০) রাজদরবারের কাগজপত্র থেকে জানা যায় যে, বাবর এর প্রশাসন মনে করত জনগনের শিক্ষা হচ্ছে রাস্ট্র বা শাসকের দায়িত্ব। আকবরের আমলে শিক্ষাকে প্রমোট করবার জন্যে তিনি একটি বিশেষ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। সম্রাট জাহাঙ্গির এর আমলে (১৬০৫ – ১৬২৭) একটি বিশেষ আইন জারী ছিলো যার বলে, যখন কোনও বিদেশী নাগরিক বা কোনও দেশীয় ব্যবসায়ী কোনও উত্তরাধিকারী না রেখে মৃত্যুবরণ করতেন, তখন তার রেখে যাওয়া ভবনগুলো মেরামত করে মাদ্রাসা কিম্বা অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হতো ব্যবহারের জন্যে। শিক্ষা ক্ষেত্রে মুঘলদের অবদানের অন্যতম সেরা নিদর্শন সম্ভবত ১৬৫০ সালের দিকে সম্রাট শাহজাহানের আমলে দিল্লীতে ইম্পেরিয়াল কলেজ এর প্রতিষ্ঠা।

মাদ্রাসা শিক্ষা ও মুঘল অভিজাততন্ত্র

একটি বিষয়ে প্রায় সকল গবেষক একমত যে মুঘল আমলে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি এই ব্যাপক রাজকীয় আনুকূল্য থাকা সত্ত্বেও, মাদ্রাসা শিক্ষা মুলত সীমিত ছিলো সমাজের এলিট এবং ধনী গোষ্ঠীর সন্তানদের মাঝেই। মাদ্রাসা শিক্ষিত উলামাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে মুঘল শাসকদের সাথে এমন কি কোনও কোনও সম্রাট এই ধরনের উচ্চ শিক্ষিত উলামাদের যুদ্ধক্ষেত্রেও নিয়ে যেতেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেবার জন্যে। অন্যদিকে উচ্চ শিক্ষিত উলামাদেরও একটা বিশেষ আগ্রহের দিক হিসাবে গড়ে উঠেছিলো, শাসকদের কাছাকাছি থাকা। শুধু মাত্র ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাই এই আগ্রহের কারণ ছিলোনা, বরং উলামাদের মাঝে অনেকেই আগ্রহী ছিলেন তাদের দেয়া পরামর্শ, ফতওয়া কিভাবে আইন ও সামাজিক নিয়মের ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা দেখবার জন্যে। এমন কি এই বিষয়গুলো নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষিত উমালাদের কারো কারো সাথে রাজ পরিবারের মতভিন্নতাও দেখা গেছে ইতিহাসে। সুতরাং একটি বিষয় পরিস্কার তাহলো, মুঘল আমল থেকেই মাদ্রাসা শিক্ষা আর শুধুমাত্র শিক্ষার জায়গা নয়, বরং মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত হবার সাথে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া কিম্বা নিদেন পক্ষে সমাজের এলিট বা অভিজাত শ্রেনীর অন্তরভুক্ত হওয়ার একটি সম্পর্ক ছিলো। মাদ্রাসা শিক্ষা ও অভিজাততন্ত্রের এই সম্পর্ক টির কথা মনে রাখতে বলবো পাঠককে, কেননা আমরা পরবর্তীতে দেখবো কিভাবে মাদ্রাসা শিক্ষা কালের স্রোতে এই অভিজাততন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো।

মুঘল আমলে “আলিম” বা উচ্চ শিক্ষিত মানুষের কদর ছিলো। প্রধানত তিনটি বিশেষ কাজে এঁরা রাজকীয় প্রশাসন কে সহযোগিতা করতেন – রাজপরিবারের শিক্ষা দীক্ষায়, রাজ আদালতে বিচারকের কাজে এবং সম্রাটদের বিভিন্ন রকমের দাতব্য কাজকর্মের তদারক করার মাধ্যমে । অবশ্য আলিম – উলামা বৃন্দও রাজশক্তির কাছাকাছি থাকতে অধিক স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন, এটাও কোনও কোনও গবেষক মত প্রকাশ করেছেন।

মাদ্রাসা শিক্ষাঃ মুঘল আমলাতন্ত্রের “কেরানী কারখানা”

একটা বিষয় নোট করা দরকার এখানে, যেহেতু রাজদরবারে কাজ করার উপযুক্ত আমলা ও কেরানী তৈরী করা একটা প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো মুঘল আমলের মাদ্রাসা গুলোর, তাই এই সময়ে বহু মাদ্রাসায় ইসলামী শিক্ষার বাইরেও কিছু কিছু সেকুলার বা পার্থিব বিষয়ে পাঠদান করা হতো। যেহেতু রাজদরবার ও আদালতের ভাষা ছিলো ফারসী এবং ফারসী ভাষা শেখার একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিলো মাদ্রাসা তাই রাজ দরবারে কাজ করতে আগ্রহী এমন বহু হিন্দু ও অমুসলিম ছাত্রদেরকেও দেখা গেছে মাদ্রাসায় পড়াশুনা করতে। এই বিষয়টি একটি আগ্রহ উদ্দীপক বিষয় হতে পারে মুঘল আমলের মাদ্রাসা ও আজকের মাদ্রাসার মধ্যে এক ধরনের তুলোনামুলক আলোচনার জন্যে। যাই হোক, সেই আলোচনা টি আমরা আপাতত মুলতুবী রেখে, মুঘল আমলের মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করি। মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যম ছিলো ফারসী, আরবী এবং অংশত উর্দু। যেহেতু দিল্লী সুলতানাত ও মুঘলদের ভাষা ছিলো আরবী ও ফারসী, তাই এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ফারসী ও আরবী ভাষার প্রচলণের ক্ষেত্রে রাজ কর্তৃপক্ষের এক ধরনের পরোক্ষ চাপ ছিলো। এই বিশয়টিও লক্ষনীয়, যেকোনো বহিশক্তি যখন কোনও রাজ্য বা রাস্ট্র দখল করে নেয়, একটি পর্যায়ে ভাষার উপরে এক ধরনের খবরদারি বা চাপিয়ে দেয়ার প্রবনতা থাকে। আমরা জানি এবং এই লেখার শেষাংশে দেখবো, কিভাবে ইংরাজ দখলদার গোষ্ঠীও তাদের দখলদারিত্ব শেষ করে, এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরাজী ভাষার প্রবর্তন করেছিলো। কারণ টি ছিলো সেই একই মুঘলদের মতই। মুঘলরা যেমন তাদের রাজদরবারের কেরানী তৈরি করবার জন্যে মাদ্রাসায় ফারসী ভাষার উপর জোর দিয়েছিলো, একই ভাবে ইংরাজদের ক্ষেত্রেও সেই প্রবনতা ইতিহাসে দেখা যায়।

শিক্ষা দর্শনের দুইটি ধারা

মুঘল আমলে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ধারা শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান ছিলো। একটি ধারা মনে করতো শিক্ষা আসলে সমাজের সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া দরকার এবং এটা যথা সম্ভব মুক্ত হওয়া দরকার এবং অন্য ধারাটি মনে করতো শিক্ষা ব্যবস্থা হওয়া দরকার সংরক্ষনবাদী এবং সকল ধরনের বিধর্মী ও বিদেশী প্রভাব থেকে মুক্ত ও আলাদা। মুঘল আমলের শেষের দিকে, মাদ্রাসা শিক্ষায় কালক্রমে “মাকুলাত” বা র্যা শনাল সায়েন্স বা যৌক্তিক বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষাকে সরিয়ে জায়গা দখল করে নেয় “মানকুলাত” বা “প্রথাগত জ্ঞান” ভিত্তিক শিক্ষা। আগ্রহউদ্দিপক সত্যি য্ মুঘোল আমলে মাদ্রাসা শিক্ষার শুরুতে “মাকুলাত” বা যৌক্তিক বিজ্ঞান ভিত্তিক কারিকুলাম ছিলো মূলধারার মাদ্রাসার প্রধান পাঠ্যক্রম। মুঘল আমলে বিভিন্ন শাসকের ব্যক্তিগত মতামতের ও চিন্তার ভিন্নতা কিভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাকে প্রভাবিত করেছে আমরা তা দেখবো এই লেখায়। একই ভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলামকে মুক্ত ও যৌক্তিক পাঠ্যক্রম হিসাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উলামা সম্প্রদায় ঐতিহাসিক ভাবে কি ভুমিকা রেখেছেন তাও আমরা উল্লেখ করবো এই লেখায়।

মুঘলদের দরাজ দিলের আনুকুল্য সত্ত্বেও মাদ্রাসা শিক্ষা সেই সময়ের বৈশ্বিক জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চাকে তার পাঠ্যক্রমে অন্তরভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।ইউরোপ ও আরব সহ বিশ্বের অন্যান্য স্থানে বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, ভাষা সহ আরো বহু সামাজিক ও কারগরি বিদ্যার যে সকল অগ্রসর পড়াশোনা ও গবেষণা চলছিলো, ভারতবর্ষের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা জ্ঞান বিজ্ঞানের সেই সকল অংশের প্রতি এক রকমের মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিলো। এটা হয়ত খানিকটা মুঘলদের ব্যক্তিগত আগ্রহহীনতা ও এক ধরনের বদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার প্রভাব। সেই সময়ে, দামাস্কাস, গ্রানাডা, করডোবা বা আরবের অন্যান্য কিছু অংশে মুসলমানেরা সিরিয়ান, গ্রীক সহ আরো কিছু ভাষা শিখছে, তখন এই উপমহাদেশের মুসলিম শাসকেরা ভিন্ন ভাষা, দর্শন, বিজ্ঞান পাঠের ব্যাপারে প্রায় মুখ ঘুরিয়ে রেখেছেন। ফলশ্রুতিতে, ভাষার দিক থেকে পিছিয়ে থাকার জন্যে এই উপমহাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা তথা মাদ্রাসায় শিক্ষিত মুসলমানেরা পিছিয়ে পড়েছিলেন তাদের সময়ের থেকে অনেক খানি। উপমহাদেশের মানুষদের সমকালীন জ্ঞান বিজ্ঞানের জগত থেকে পিছিয়ে পড়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে – শিক্ষার সুযোগ লাভের ক্ষেত্রে অসমতা এবং সেই অসমতার ব্যাপারে বেশীরভাগ মুসলিম শাসকের উদাসীনতা। দিল্লী সুলতানাত ও মুঘল সাম্রাজ্য এই বিশাল সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র সম্রাট আকবর ও সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমলেই শিক্ষা ক্ষেত্রে অসমতা দূর করার প্রত্যক্ষ উদ্যোগ দেখা যায়। উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের শুরুতে এবং শেষের দিকে মাদ্রাসা শিক্ষা প্রধানত এলিট মুসলিমদের জন্যেই সীমিত ছিলো। রাজ দরবারের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু হিন্দু ও ভিন্ন ধর্মের মানুষেরা মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত সুযোগ পেয়েছিলেন বটে, তবে তা ছিলো সীমিত।

ভারতের মুসলিম শাসনের ইতিহাসে সম্ভবত আকবরই প্রথম মুসলিম শাসক যিনি আইন করে নিশ্চিত করতে চেয়েছেন শিক্ষায় হিন্দু জনগোষ্ঠী যেনো মুসলমানদের মতই অংশগ্রহনের অধিকার লাভ করে। আকবর নিশ্চিত করেছিলেন যেন মাদ্রাসা সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম ও হিন্দু ছাত্ররা একই সাথে পড়াশুনা করতে পারে। শিক্ষার জন্যে যে সকল বৃত্তি চালু করেছিলেন, সেই বৃত্তি যেন হিন্দু ও অমুসলিম ছাত্ররা সমান ভাবে পেতে পারে তা নিশ্চিত করেছিলেন। রাজকীয় আদালতের মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করা হয়েছিলো যেন মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত হিন্দু ছাত্ররা তাদের নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও পড়াশুনা করতে পারে। মুঘলদের ইতিহাস যারা মোটামুটি পড়েছেন তাঁরা জানেন, মুঘল সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট আকবরই ছিলেন ধর্ম বিষয়ে উদারনৈতিক এবং শেষ জীবনে দীন-ই-ইলাহী নামে একটি নতুন ধর্মের প্রবর্তন করেন, যার অন্যতম একটা উদ্দেশ্য ছিলো উপমহাদেশে হিন্দু – মুসলমানের মাঝে বিদ্বেষ কমিয়ে আনা। যদিও সেই ধর্মটি পরবর্তীতে আর চর্চিত বা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। ধর্ম বিষয়ে আকবরের উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলাফল হিসাবে আমরা দেখি, তার আমলেই হিন্দুদের তীর্থ যাত্রার জন্যে আলাদা করে কর বা ট্যাক্স এর প্রথা তিনি উঠিয়ে দেন এবং ইসলামী আইনে ভিন্ন ধর্মীদের উপরে ইসলামী ভুখন্ডে থাকার জন্যে যে বিশেষ কর বা “জিজিয়া” দিতে হতো, তাও উঠিয়ে দেন তিনি। ধর্ম সম্পর্কে, সম্রাট আকবরের এই অবস্থানের কথাটি বলা দরকার এই জন্যেই যে শুধুমাত্র আকবর ও জাহাঙ্গীরের সময়টিতেই মাদ্রাসা শিক্ষা সবচাইতে বেশী উদারনৈতিক ও আপাত আধুনিক শিক্ষাক্রম অনুসরন করেছিলো। প্রেক্ষিত উল্লেখ না করেই, অনেক লেখক আকবরের এই সময়টির কথা উল্লেখ করে সমগ্র মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসটিকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেন যা আদতে সত্যনিষ্ঠ নয়। মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসে, আমরা আকবরের আমলের সাথে অন্যান্য মুঘলদের আমলের একটা ছোট তুলনামুলক আলোচনা এই লেখায় উপস্থাপন করবো।

মাদ্রাসা পাঠ্যক্রম ও পাঠ পদ্ধতির সংস্কার
সম্রাট আকবরের আমলে মাদ্রাসা শিক্ষায় সবচাইতে বড়ো দুটি পরিবর্তন ছিলো, এক – পাঠদান ও শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহনের পদ্ধতির বিষয়ে এবং দুই – মাওলানা মির ফতেহউল্লাহ সিরাজীর নেতৃত্বে মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলাম সংস্কার করার উদ্যোগ। সম্রাট আকবরের আমলেই প্রথম গুরুত্ব দেয়া হয়, মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে কোনও কিছু না বুঝে মুখস্থ করবার প্রবনতার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে। গুরুত্ব আরোপ করা হয় যেন শিক্ষার্থীরা মুখস্থ বিদ্যার চাইতে সঠিক বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা করে, আলোচনা করে আত্মস্থ করার চেষ্টা করে। শিক্ষকদের প্রতি নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো মাদ্রাসার ছাত্ররা যেন তাদের পাঠ নিজেরাই অনেক বেশী করে বোঝার চেষ্টা করে এবং শিক্ষকের সহযোগিতা ছাড়াই যেনো তাঁরা আত্মস্থ করতে পারে এমন ভাবে তাদের কে গড়ে তোলার জন্যে। মাওলানা মীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী ছিলেন সুলতান আলী আদিল শাহ’র দরবারের উচ্চ পদস্থ উলামা। আলী আদিল শাহ’র পতন ও মৃত্যুর পরে মাওলানা সিরাজী বন্দী হয়েছিলেন এবং সম্রাট আকবরের অনুরোধে তাকে মুক্ত করা হয় এবং তিনি আকবরের রাজকীয় আদালতে প্রধান কাজী হিসাবে যোগদান করেন। সম্রাট আকবর এই ভদ্রলোক কেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার কাজের জন্যে। মাওলানা সিরাজীর নেতৃত্বে যে সংস্কার সাধন করা হয়, তারই প্রেক্ষিতে তৎকালীন মাদ্রাসা কারিকুলামে অন্তরভুক্ত হয়ঃ

 

  • এথিক্স বা নীতিশাস্ত্র
  • গনিত
  • এস্ট্রোনমি বা জ্যোতির্বিজ্ঞান
  • কৃষিবিজ্ঞান
  • চিকিৎসাবিজ্ঞান
  • যুক্তিবিদ্যা ও রাজনীতি
  • সংস্কৃত ব্যাকরণ
  • বেদান্ত(দর্শন)
  • পতঞ্জলি (ইয়োগা)

 

পাঠক, খেয়াল করে দেখুন, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে, মাদ্রাসা শিক্ষায় মুখস্থ বিদ্যার বদলে সঠিকভাবে বুঝে পড়ার ও শেখার উপরে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মাদ্রাসায় না বুঝে মুখস্থ করার যে প্রবনতা সেই প্রবনতাকে নিরুতসাহিত করা হচ্ছে। ছাত্রদের ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং বা চিন্তা করবার শক্তিকে উতসাহিত করা হচ্ছে। আর পাঠ্যক্রম সংস্কার করে এমন সব বিষয় অন্তরভুক্ত করা হয়েছিলো যা দিয়ে ততকালিন সমাজে উলামা হওয়া ছাড়াও আরো একাধিক পেশার সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছিলো। সম্রাট আকবরের এই সংস্কারের কথা ভাবুন এবং তুলনা করুন আজকের বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারের কথা। সম্রাট আকবরের আমলে মাদ্রাসা যতটুকু আধুনিক বিশয়াদির উপরে পাঠদান করতো, আজ প্রায় সাড়ে চারশো বছর পরে মাদ্রাসা শিক্ষা, বিশেষত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা তার চাইতেও অনাধুনিক বিশয়াদির উপরে পাঠাদান করে থাকে। পরবর্তী কোনও এক পর্বে আমরা এর কারণ খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো।

মাদ্রাসা শিক্ষায় যৌক্তিক বা র‍্যাশনাল উপাদান অধিক পরিমানে উপস্থিত থাকার কারনে সম্রাট জাহাঙ্গীর এর আমলে গোঁড়া মুসলিম উলামাদের তোপের মুখে পড়তে হয় তাকে। কোনও কোনও উলামা (যেমন – মাওলানা শেখ আব্দুল হক) নতুন করে “মানকুলাত” বা প্রথাগত ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্যে চেষ্টা তদবীর চালান। কেউ কেউ রাজদরবার ছেড়ে চলেও যান। পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করবো, কিভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার এই সংস্কার কর্মকাণ্ডকে থানিয়ে দেয়া হয়েছিলো এবং ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিলো দিল্লী সুলতানাত এর আমলে কিম্বা আরো পেছনের সময়ে।

(চলবে)

References:

1. Faithful Education: Madrassahs in South Asia, Ali Riaz, Rutgers University Press, 2013

2. The Deoband Madrassah Movement: Counter cultural trends and tendencies, Muhammad Moj, Anthem Press, 2015

3. Islamic Civilization in south Asia: A history of Muslim power and presence in the Indian sub-continent, Burjor Avari, Routledge, 2013

4. A concise history of India, Barbara D Metcalfe, Cambridge University press, 2002

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “আরব থেকে দেওবন্দ হয়ে হাটহাজারীঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক বোঝাপড়া। পর্ব – ৩

  1. আকবরের সময়ের মাদ্রাসা শিক্ষা
    আকবরের সময়ের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে এখনকার সময়ের তুলনা করলে অবশ্যই আকাশ-পাতাল তফাৎ। অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন? মুসলমানরা সব সময়ই পশ্চাৎগামী ছিলেন। এরা জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে দুরে থাকতেই পছন্দ করেন। তার কারণ হচ্ছে ধর্মভীতি। আরবের অশিক্ষিত বর্বরদের মাঝে যে ধর্মের প্রচলন মুহাম্মদ তখন করেছিলেন, সেই সময়ের জন্য এটা ছিল আধুনিক। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষ যে আরো আধুনিক হয়ে গেছে এটা এখনকার ধার্মিক বিশেষভাবে কট্টর মোল্লারা মেনে নিতে পারে না। মানতে গেলেই ১৪০০ বছর আগের আধুনিকতা হুমকির মুখে পড়বে। তাই তারা নিজেদেরকে এবং অনাগত ভবিষ্যতদের সব সময় ১৪০০ বছর আগের সভ্যতায় আবদ্ধ রাখতে চান।

    বুঝে পড়লে সমস্যা আছে। এখনকার মানুষের জ্ঞান অনেক সমৃদ্ধ। বুঝে পড়লে ভুলগুলো চোখে পড়বে বলেই মাদ্রাসাগুলো মুখস্তবিদ্যার উপর আস্থাশীল।

    ভাল লাগল এই পর্বটাও। মোঘল আমল নিয়ে পড়া লেখা করছিলাম। আপনার এই পর্বটা আমার নিজেরও কাজে লাগবে।

  2. সম্রাট আকবর বেশ আধুনিক ও
    সম্রাট আকবর বেশ আধুনিক ও প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন এবং বড় শিক্ষানুরাগীও ছিলেন। এই উপমহাদেশের সকল দেশের বর্তমান শাসকরা আকবরের সমকক্ষ হবে না। বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একদল ছাগল উৎপন্ন হচ্ছে। এরা জাতির বোঝা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 40 = 42