চারু মজুমদার | সংক্ষিপ্ত জীবন পরিচিতি

সোভিয়েত রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের কামানের গর্জন যখন সারা বিশ্বের মানচিত্রে সর্বহারার জয়যাত্রা সূচিত করছিল, ৪৭ বছর আগের নিভে যাওয়া প্যারি কমিউনের আগুন যখন রাশয়ার বুকে সর্বহারার একনায়কত্বের প্রবল শক্তি নিয়ে প্রত্যাঘাতে নির্মূল করছিল শাসক আর শোষকশ্রেণীকে, মানবসভ্যতার ইতিহাসে সেই রকম এক উত্তাল সময়ে জন্ম চারু মজুমদারের-১৯১৯ সালের জ্যেষ্ঠ মাসে (মে-জুন), উত্তর প্রদেশের বেনারসে। তাঁর পিতা বীরেশ্বর মজুমদার ছিলেন একজন প্রবীণ কংগ্রেসী এবং মা একজন প্রগতিশীল দয়াবতী মহিলা। বেনারসে কিছুকাল কাটবার পর, অল্প বয়সে চারু মজুমদার পরিবারের সাথে দার্জিলিং জেলায় শিলিগুড়ি চলে আসেন এবং শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

১৯৩৭ সালে তিনি পাবনার (বাংলাদেশে অবস্থিত) এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়েই আবার শিলিগুড়িতে ফিরে আসেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্বেও, পরীক্ষা না দেয়ায় তার কলেজের অধ্যক্ষ খুবই দুঃখিত হন এবং বুঝিয়ে তাঁকে পরীক্ষা দেয়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কলেজের গণ্ডী আর উন্নতির মোহ তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি ব্যক্তি স্বার্থের ছোট বেড়ার মধ্যে; এই সময়ই বৃহত্তর সমাজের চলমান জীবনের মধ্যে নিজেকে সঁপে দিলেন তিনি। পরবর্তীতে, ১৯৭০ সালে, বিপ্লবী যুবছাত্রদের প্রতি তাঁর আহবানে তিনি তাই বলেছিলেন আঠার থেকে চব্বিশ বছর বয়সটাতে মানুষ সারাজীবনে সবচেয়ে বেশী পরিশ্রমী, উৎসাহী, নির্ভীক ও আদর্শনিষ্ঠ হতে পারে। অথচ আামাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেই বয়েসটাতেই যুবছাত্রদের এই গণবিরোধী লেখাপড়া ও পরীক্ষায় পাশ করার জন্য ব্যস্ত রাখা হয়। তাই তিনি বলেন যে, বিপ্লবী যুবছাত্রদের উচিত ক্যারিয়ারের মোহ ত্যাগ করে শ্রমিক কৃষকের সাথে একাত্ম হওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া।

স্কুলে পড়ার সময়ই চারু মজুমদার বৃটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। কলেজে পড়বার সময় তিনি বামপন্থী রাজনীতির সাথে পরিচিত হতে থাকেন। ১৯৩৮ সালে তিনি কংগ্রেস সোশ্যালিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং তার যুব শাখার সম্পাদক নির্বাচিত হন। কিন্তু চারু মজুমদার চাইছিলেন একটি সত্যিকারের বিপ্লবী কর্মকান্ডের মধ্যে নিজেকে সঁপে দিতে। কৃষকদের মধ্যে সার্বক্ষণিক পার্টি কর্মী হিসাবে কাজ করার কথা তিনি এই সময়েই গভীরভাবে ভাবতে থাকেন। দার্জিলিং-এর পাশেই জলপাইগুড়ি জেলা। এই জেলার কৃষি অর্থনীতি দাঁড়িয়েছিল ‘আধিয়ার’ প্রথার ওপর। এই আধিয়া পদ্ধতি অনুযায়ী, উৎপন্ন ফসলের বেশীর ভাগ অংশটাই জোতদারদের দিয়ে দিতে হতো। আবার সেই জোতদারদের কাছ থেকেই কৃষকরা সংসার চালাতে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতো। তার ফলে এই ঋণ কোনো দিনই শোধ হতো না। সামন্ততান্ত্রিক শোষণের জোয়ালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকতো কৃষকশ্রেণী। ক্রমশ পরিণত হতো কপর্দকহীন ভূমিদাসে।

জলপাইগুড়ি জেলাতে ১৯৩৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্ম শুরু হয়। কমিউনিস্ট পার্টিকে পেয়ে কৃষকদের মধ্যে এতদিনের অসংগঠিত ক্রোধ ও ক্ষোভ প্রতিবাদ ও ক্রমে প্রতিরোধে পরিণত হয়। এদিকে সরকার ও জোতদার বাহিনীও বসে থাকে না। তারা আন্দোলন ভাঙ্গার জন্য প্রচন্ড সন্ত্রাস শুরু করে, ফলে সংগঠন ও সংগ্রাম দুই-ই ধাক্কার মুখে পড়ে। ঠিক এরকমই এক সময়ে, যখন পার্টিতে নতুন কর্মীর খুব প্রয়োজন, তখন একদিন তদানীন্তন জলপাইগুড়ির পার্টি সম্পাদক শচীন দাসগুপ্তর কছে এক যুবক এসে হাজির হলেন। উস্কোখুস্কো চুল, সুন্দর বড় বড় দুটো চোখ নিয়ে সপ্রতিভ এই যুবক শচীন দাসগুপ্তকে বললেন- ‘আমার নাম চারু মজুমদার। আমি কৃষকদের মধ্যে পার্টির কাজ করতে চাই।’ শচীনবাবু বললেন- ‘সে তো খুব কষ্টকর জীবন; তুমি পারবে তা সহ্য করতে?’ যুবকের একটিই বলিষ্ঠ উত্তর- ‘হ্যাঁ পারব।’

তারপর শুরু হলো শচীন দাসগুপ্তের সাথে চারু মজুমদারের কষ্টের জীবনের পরীক্ষা। কখনো কৃষকের গোয়াল ঘরে আধপেটা খেয়ে থাকা, কখনো খোলা আকাশের নীচে ভবিষ্যতের সুন্দর স্বপ্ন আঁকতে আঁকতে প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব- এইভাবে এক নাগাড়ে তিন মাস ডুয়ার্সের গ্রামে গ্রামে জেলা সম্পাদকের সাথে দিন কাটালেন চারু মজুমদার। প্রমাণ দিলেন তিনি একজন কৃতী ছাত্র, এই অগ্নি পরীক্ষার। তাঁর এই অভিজ্ঞতাই যেন সত্তর-এর দশকে বিপ্লবীদের কাছে তাঁর আহ্বানে মূর্ত হয়ে উঠছিল- ‘কৃষককে শ্রদ্ধা কর, তাদের জীবনের অংশীদার হও।’ ছাত্র যুবদের কাছে তার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল-‘শ্রমিক এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের সাথে একাত্ম হও, একাত্ম হও, একাত্ম হও।’ অল্পদিনের মধ্যেই কৃষকদের মধ্যে চারু মজুমদার দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। কৃষকরা তাকে দেখলেই খুশী হয়ে উঠতেন। তিনিও কৃষকদের মনের কথা চমৎকার ধরে ফেলতেন। ১৯৪২ সলে চারু মজুমদার পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।

৪২-এর পর চা ও রেল শ্রমিকদের মধ্যে কাজ শুরু হয়। এই ফ্রন্টগুলিতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে দেখা দিল মন্বন্তর। জলপাইগুড়ি টাউন কমিটি, খাদ্য কমিটির মাধ্যমে খাবার এলে বন্টন করতেন। গ্রামে ত্রাণ ঔষধের বন্টনের কাজ সার্বক্ষণিক কর্মীরাই করতেন। তাঁরা পার্টিকে উপলব্ধির কথা জানিয়ে বললেন যে- একদিকে যখন আধিয়ারা না খেয়ে মরতে বসেছে, তখন জোতদাররা ধান মজুত করে রাখছে ভবিষ্যতের মুনাফার জন্য। এখনই কর্মসূচী দরকার। পার্টি সাড়া দিল, কৃষকদের মধ্যে শ্লোগান উঠল- ‘না খেয়ে মরব না, মরতে হলে গুলিতে মরব।’ গ্রামের জনগণের মধ্যে ভীষণ সাড়া পড়ে গেল। কৃষক জনগণ নতুন বলে বলিয়ান হয়ে জোতদারদের গোলা ভেঙ্গে ধান নিয়ে নিতে লাগলেন। কমিটির মাধ্যমে এই ধান ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা হতো। বিক্রির টাকা জোতদারদের দিয়ে দেওয়া হতো। যে জোতদাররা টাকা না নিয়ে মামলা করতো, তাদের টাকা মামলা চালানোর জন্য জমা রাখা হতো। জলপাইগুড়িতে আধিয়াররাই ছিলেন কমিউনিষ্ট পার্টির ভিত্তি। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।

১৯৪৫ সালে আরম্ভ হলো অবিভক্ত বাংলার কৃষকের ‘তেভাগা আন্দোলন’। তেভাগা আন্দোলনের সময় তাঁকে পঞ্চগড় (বাংলাদেশের অন্তর্গত) এলাকার দায়িত্বে পাঠানো হয়। তেভাগা আন্দোলনের দাবি ছিল ফসলের এক ভাগ পাবে কৃষক, এক ভাগ উৎপাদনের ব্যয়, আরেক ভাগ পাবে জমির মালিক। এর আগে কৃষকের নির্ধারিত কোনো ভাগ ছিল না। জমির মালিক পেতো অর্ধেক। আর বাকিটাও ওই মালিক পানি, গরু, বীজের ব্যয় বাবদ কেটে নিতো। শেষে দেখা যেত কৃষকের সামান্যই থাকত। পঞ্চগড় ছিল তেভাগার কেন্দ্রস্থল। জলাপাইগুড়ি, দিনাজপুর ও রংপুর এই তিনটি জেলার (দ্বিতীয় জেলার একাংশ এবং শেষ জেলাটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্গত) নেতৃত্ব একসাথে বসে অলোচনা করে সংগ্রামের বিষয় ঠিক করতেন। আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে স্থির হয় গোলা থেকে ধান দখল করা হবে।

উত্তাল হয়ে উঠলো আন্দোলন। জোতদাররা হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা বাধিয়ে আন্দোলন ঠেকানোর চেষ্টা করলো। ১৯৪৬-এর আগষ্টের পর বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কোথাও দাঙ্গা বেঁধে গেল। পঞ্চগড় ছিল মুসলিম প্রধান এলাকা। মুসলিম জনগণ সেখানে আন্দোলনে নেমে পড়লেন। চারু মজুমদার ছিলেন তেভাগার পুরোভাগে। গোপনে থেকেই তিনি এই আন্দোলন পরিচালনা করতেন। জোতদারদের গোলায় ধান না তুলে আধিয়ারদের বাড়িতে বা অন্যত্র ধান তোলা হতে লাগলো। কেননা জোতদারদের গোলায় ধান উঠলে কৃষক প্রায় কিছুই পেতো না। যেসব জোতদার তাদের প্রাপ্য না পেয়ে মামলা করতো, এক্ষেত্রেও তাদের ধান মামলা চালানোর জন্য জমা রাখা হতো।

১১ নং ইউনিয়ন থেকে দেবীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছিল। ঐ অঞ্চলে চারু মজুমদারকে দেখলেও থানার দারোগা তাঁকে ধরার সাহস করতো না। চারু মজুমদার সাধারণত একটি নিরাপদ নির্দিষ্ট রাস্তা ধরেই যাতায়াত করতেন। একদিন তিনি কয়েকজন কমরেডের সঙ্গে অন্য রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে জোতদাররা লোকজন নিয়ে তাঁদের ঘিরে ফেলে। চারু মজুমদার কিন্তু পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এই সময় থেকেই তাঁর সম্পর্কে রটে যায় যে তাঁকে দেখা গেলেও ধরা যায় না। তাঁকে কেন্দ্র করে এরকম অনেক কাহিনী তখন লোকের মুখে মুখে শোনা যেতো।

কিছুদিনের মধ্যেই পঞ্চগড়ে পুলিশী আক্রমণ নামলো। পার্টি ঠিক করলো আন্দোলনকে এবার ডুয়ার্সে ছড়িয়ে দিতে হবে। ডুয়ার্সে আন্দোলন ব্যাপক রূপ নেয়। চারু মজুমদার সেখানে চা বাগানের কর্মীদের মধ্যেই পার্টির কাজে যুক্ত হন। শ্রমিকরাও কৃষকদের সাথে আন্দোলনে নামেন। মাঝে মধ্যেই দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক-কৃষকের জমায়েত অনুষ্ঠিত হতো। ডুয়ার্সে জোতদাররা নিজেদের গোলায় ধান তুলে ফেলেছিল। শ্রমিক ও কৃষকেরা মিছিল করে গিয়ে সেই ধান দখল করে নেন। জলপাইগুড়ির মঙ্গলবাড়ি-নেউরা-মাঝারি অঞ্চলে ধান দখলের সময় পুলিশের গুলিতে ১১ জন কৃষক নিহত হন, আবার কৃষকরাও পুলিশের রাইফেল ছিনিয়ে নেন। ডুয়ার্সের আন্দোলনের প্রভাব রেল শ্রমিকদের ওপরেও পড়ে। রেল শ্রমিকদের মধ্যে পার্টির কাজ প্রসারিত হয় ও ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। বাংলা-ডুয়ার্স রেলওয়েতে সংগঠন খুবই শক্তিশালী রূপ নেয়। আন্দোলন বাড়ার সাথে সাথে, জোতদার ও সরকারের যোগসাজশে পুলিশী দমন পীড়নও বাড়তে থাকে।

শ্রমিক-কৃষকের এই মিলিত আন্দোলনকে দমনের মধ্য দিয়েও কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এই প্রশ্ন যখন সামনে ওঠে এলো, তখন বিশ্বাসঘাতক নেতাদের প্রভাবে পার্টির রাজ্য কমিটি আন্দোলন তুলে নেবার নির্দেশ দিলো। চারু মজুমদার এবং ওখানে কর্মরত অন্যান্য কমরেডরা সেই নির্দেশের বিরোধিতা করেন। সংশোধনবাদী পার্টি নেতৃত্ব জানায় যে-সরকার আন্দোলনের ন্যায্যতা স্বীকার করে নিয়েছে, তাই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিতে হবে। চারু মজুমদার এবং অন্যান্য স্থানীয় নেতারা বললেন-আন্দোলন বন্ধ করে পিছিয়ে যাওয়া চলবে না; রাজ্য কমিটি বরং কিভাবে প্রতিকূলতা মোলাবেলা করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া যাবে সেই নির্দেশ পাঠাক; পর্যালোচনা করে দেখা হোক কেন দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে ব্যাপকভাবে আন্দোলনে নামানো গেল না। রাজ্য কমিটি থেকে তখন ভবানী সেনকে সেখানে পাঠানো হয় এবং তিনি গিয়ে বলেন যে পার্টির নির্দেশকে ‘ম্যানডেট’ হিসাবে বিবেচনা করে আন্দোলন তুলে নিতে হবে। এভাবে চারু মজুমদার সহ সমস্ত কমরেডদের চাপ দিয়ে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করা হলো। চারু মুজমদারের কাছে এটা ছিল বিরাট মানসিক ধাক্কা।

তখনকার কমরেডরা সকলেই মনে করলেন আন্দোলন তুলে নিয়ে বিরাট এক সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করা হলো। চারু মজুমদার জানতেন এবার ব্যাপক পুলিশী অত্যাচার শুরু হবে। আর হলোও তাই। পুলিশ শত শত কর্মীকে গ্রেপ্তার করে প্রচন্ড অত্যাচার চালালো। হাজার হাজার মামলা রুজু করা হলো। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে পার্টির রাজ্য নেতৃত্ব একটি কথাও বললেন না। জেলা নেতৃত্ব তবু চেষ্টা চালালেন যাতে কৃষকরা বোঝেন যে, এই অত্যাচারের দিনে পার্টি তাঁদের সঙ্গে রয়েছে। ব্যাপক সংখ্যায় ছাত্রদের দলে দলে ক্যাম্প করে গ্রামে প্রচারের জন্য পাঠানো হলো। এই সময়ে অস্ত্র ব্যবহারের চিন্তাও এসেছিল। কিন্তু রাজ্য কমিটির সিদ্ধান্তে বাধ্য হয়ে উদ্যোগ নেওয়া যায়নি। এভাবে সংশোধনবাদী নেতৃত্ব বিরাট আন্দোলনকে গলা টিপে হত্যা করলো। রংপুরেও তেভাগা আন্দোলন খুব উন্নত পর্যায়ে গিয়েছিল। সেখানেও একটা এলাকা প্রায় মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছিল। ওই অঞ্চলে অত্যাচারী দারোগাকে আটক করে গণ-আদালতে বিচার করা হয় এবং বিচারে তাঁকে ফাঁসি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু বিরাট এক পুলিশবাহিনী এসে পড়ায় সেই সিদ্ধান্ত আর কার্যকর করা যায়নি।

১৯৪৮-এ কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে স্থির হয় যে- পাকিস্তানে আলাদা পার্টি হবে। ফলে এই অংশে মূল কাজের এলাকাগুলি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পড়ে যায়। সমস্ত সংগঠক ও নেতারা সেখান থেকে চলে আসেন। ঠিক হলো আবার গ্রামে গ্রামে নতুনভাবে কাজ শুরু করতে হবে। কিন্তু পার্টি কংগ্রেসের রিপোর্ট নিয়ে পার্টি অফিসে বৈঠক চলাকানীল সময়ে পুলিশ হানা দিয়ে সকলকে গ্রেপ্তার করে। চারু মজুমদারও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। প্রথমে তাঁকে জলপাইগুড়ি জেলে ও পরে দমদম জেলে রাখা হয়। দমদম থেকে অবশেষে প্লেনে করে তাঁকে বক্সার জেলে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে ১৯৫১ সালে তিনি ছাড়া পান।

১৯৫২ সালের ৯ জানুয়ারি লীলা মজুমদারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। লীলা মুজমদারও পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলেন। বিয়ের পর চারু মজুমাদর শিলিগুড়িতে চলে আসেন। তিনি ও লীলা মজুমদার দুজনেই পার্টির দার্জিলিং জেলা কমিটির সদস্য হন। এই সময় তিনি গ্রামে কাজ করতেন আবার চা বাগানে শ্রমিকদের নিয়ে ইউনিয়নও গড়ে তুলতেন; আবার শিলিগুড়ি শহরের রিক্সা চালক ইউনিয়নের তিনি ছিলেন সভাপতি। ১৯৫৬ সালে পালঘাটে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। চারু মজুমদার এই কংগ্রেসে প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় থেকেই পার্টি লাইনের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব খুব তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৫৭ সালে পার্টি নেতৃত্ব তাঁকে কলকাতায় এসে পার্টি অফিস থেকে পশ্চিমবঙ্গের কৃষক আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব দিলে চারু মজুমদার তাতে রাজি হননি। ১৯৫৯-৬০ সালে তার পরিবারের ওপর নেমে আসে তীব্র আর্থিক সঙ্কট। সবকিছুর ওপরে পার্টি লাইনের সঙ্গে তীব্রতম বিরোধ-এসব কারণে এই সময় তীব্র মানসিক কষ্টের মধ্যে দিন কাটে তাঁর।

১৯৫৩ সালে ষ্ট্যালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েতে ক্রুশ্চেভচক্র ক্ষমতা দখল করে। এদের নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালে অুনষ্ঠিত সোভিয়েত পার্টির ২০তম কংগ্রেসে পার্টিকে সর্বহারার পথ থেকে সরিয়ে বুর্জোয়া পথের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘোষণা করা হয় মার্কসবাদ বিরোধী- শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ এবং শোষক ও শোষিতের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি। চেয়ারম্যান মাও-এর নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এর বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম পরিচালনা করে এবং এই সংশোধনবাদী লাইনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মতাদর্শগত সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। আরম্ভ হয় মতাদর্শগত মাহাবিতর্ক (গ্রেট ডিবেট)।

১৯৫৯ সালের পর থেকে ভারত চীন সম্পর্কের তিক্ততা শুর হওয়ার পর জেলার কমিউনিস্ট কর্মীদের মধ্যে আবার সক্রিয়তা দেখা দেয়। ঠিক হয় পার্টিকে সংহত করার কাজ শুরু করা হবে। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার দুটো অঞ্চল বেছে নিয়ে শুরু করা হবে মুক্তাঞ্চল গঠনের প্রচেষ্টা। চারু মজুমদারের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয় চীনা পত্রপত্রিকা পড়ে যা বুঝবেন, তার ভিত্তিতে একটা দলিল তৈরি করার। পাঁচজনকে নিয়ে মূল কমিটি তৈরি হয়। এই কমিটির অধীনে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলায় একটি করে কমিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়। জলপাইগুড়িতে প্রস্তাবিত কমিটি গড়ে না উঠলেও, দার্জিলিং-এ গড়ে ওঠে এবং চারু মজুমদার নকশালবাড়িতে সংগঠন শুরু করেন।

১৯৬২ সালে চারু মজুমদারের লেখা দলিলটি রাজ্য কমিটির কাছে পাঠানো হয়। পার্টির রাজ্য কমিটির নেতা প্রমোদ দাশগুপ্ত তখন জেলে ছিলেন। জেলে বসে এই চিঠি পেয়ে, কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়াই তিনি সাথে সাথে এই কমরেডদের পার্টি থেকে বের করে দেবার নির্দেশ দিন। কিন্তু বাইরে থেকে বলা হয় এই কমরেডরা অত্যন্ত মূল্যবান। তাছাড়া তদানীন্তন জেলা কমিটির সম্পাদক গণেশ ঘোষ এই দলিলকে সমর্থন করলে, প্রমোদ দাশগুপ্ত বলেন-তিনি জেল থেকে বেরিয়ে এসে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন।

এই সময় গণচীন বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা চীনকে আক্রমণ করলে, পার্টিতে এক তীব্র রাজনৈতিক ঝড় ওঠে। কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে কট্টর দক্ষিণপন্থীরা এই সময় ভারত সকরকারের পতিক্রিয়াশীল ভূমিকাকে সমর্থন জানায়। ডাঙ্গে, রাজেশ্বর রাও, ভূপেশ গুপ্তরা এই দলে ছিল। কিন্তু কর্মীরা এই লাইনকে প্রত্যাখান করাতে, পার্টিতে অরেকটি মধ্যপন্থী লাইন এলো-যার প্রতিনিধিত্ব করছিল রণদিভে, সুন্দরাইয়া, জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত প্রমুখ ব্যক্তিরা। এরা সাধারণ কর্মীদের আবেগ বুঝতে পেরে, তাদের চোখে বিপ্লবী সাজার উদ্দেশ্যে, আপাতভাবে চীনকে সমর্থন করে এবং দোদুল্যমান অবস্থান নেয়। এই সময় চারু মজুমদার দৃঢ়ভাবে সমাজতান্ত্রিক চীনের পক্ষ নেন এবং তত্ত্ব ও তথ্য সহযোগে ব্যাখ্যার ম্যধ দিয়ে ঘোষণা করেনÑ ‘ভারতই চীনকে আক্রমণ করেছে। তাই আমাদের উচিত এ যুদ্ধের বিরোধিতা করা।’

১৯৬২ সালের ১৭ নভেম্বর তাঁকে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। ইতিমধ্যে ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে শিলিগুড়ি বিধানসভা আসনে কংগ্রেস সদস্যের মৃত্যুতে যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে পার্টি কমরেডদের চাপে পার্টি নেতৃত্ব চারু মজুমদারকে প্রার্থী হিসাবে দাঁড় করাতে বাধ্য হয়। পার্টি নির্দেশ মেনে নিয়ে চারু মজুমদার জেল থেকেই মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। কিন্তু এই সময় থেকেই তিনি সংসদীয় রাজনীতির বিপক্ষে এবং সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের সপক্ষে দৃঢ়ভাবে প্রচারণা চালাতে থাকেন। নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। তিনি মাত্র দু’হাজার ভোট পান ও তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। তাঁর সাথে পার্টি নেতৃত্বের মতবিরোধ তীব্র হতে থাকে, এর পরবর্তীতে পার্টি ভাগ হলে তিনি জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সিপিআই (এম) পার্টিতে যোগ দেন।

১৯৬৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাঁকে ভর্তি করা হয় কলকাতার নীলরতন সরকার হাসপাতালে। ডাক্তাররা তাঁকে শারীরিকভাবে অক্ষম বলে ঘোষণা করে পূর্ণ বিশ্রাম নিতে পরামর্শ দেন। কিন্তু বিপ্লবী চারু মজুমদারের মানসিক জোরের কাছে তার শারীরিক অক্ষমতা বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। তাই অসুস্থ অবস্থাতেই সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে তিনি তত্ত্বগত সংগ্রাম শুরু করেন। জীবনের দীর্ঘ সময়, প্রায় ৪০ বছরেরও দীর্ঘ কাল জুড়ে যে রাজনীতির সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন, তার ভুল বুঝতে তিনি সমর্থ হন এবং এর বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন লাইনে সজ্জিত হওয়ার সংগ্রাম শুরু করেন। অসুস্থ শরীরে, বৃদ্ধ বয়সে এভাবে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল।

?oh=afcc4fac7918dc75d1d418f65a9cb9b7&oe=56A3DDB5″ width=”400″ />

১৯৬৪ সালের শেষের দিক থেকেই চারু মজুমদার শুরু করেন তাঁর ঐতিহাসিক আট দলিল রচনা (প্রথম দলিল-২৮ জানুয়ারি, ১৯৬৫)। এই দলিল রচনাকালেই ১৯৬৫ সালে, ভারত-পাক যুদ্ধের সময় আবার তাঁকে ভারতরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। অসুস্থতার জন্য জলপাইগুড়ি জেল থেকে তাঁকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানকার ডাক্তাররা তাঁর বাঁচার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। এখানে একটু সুস্থ হবার পর তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১৯৬৬ সালের মে মাসে তিনি ছাড়া পান। জেল থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি আবার তাঁর আট দলিল রচনার কাজে মন দেন। বিখ্যাত ‘আট দলিল’ রচিত হয় ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে। এরপর থেকেই তিনি নিজেকে ভারতের বুকে একটি মাওপন্থী কেন্দ্র বলে ঘোষণা করেন, বলেন- ‘আই অ্যাম দ্যা অলটারনেটিভ কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া।’ আমিই ভারতবর্ষের বুকে বিকল্প কমিউনিস্ট পার্টি। তিনি প্রশ্ন তোলেন- ‘কে ভাঙ্গবে পার্টি? অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই। ভারতবর্ষে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা নেই। সেই নেতা তৈরি হবে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। তাই যে বিপ্লবী তার কাজ হবে, কৃষকের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে গিয়ে বিপ্লবী পার্টি বানানোর কাজে হাত দেয়া।’ কত অসীম মনোবল ও জতার প্রতি কি গভীর আস্থা থাকলে, তবেই এই সময় একটি বৃহত্তর শোধনবাদী পার্টি ও তার প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নিজেকে একটি আলাদা কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা যায়, তা চিন্তা করলে সত্যিই বিষ্মিত হতে হয়।

শোধনবাদী পার্টি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তত্ত্বগত সংগ্রাম শুরু করার পাশাপাশি তিনি নিজের হাতে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে থাকেন। নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া- এই অঞ্চলগুলোতে কর্মী পাঠিয়ে তিনি নতুন ধাঁচের সংগঠন গড়ে তুলবার জন্য সচেষ্ট হন। ১৯৬৭ সালের প্রথম দিক থেকেই উত্তর বাংলার এই সমস্ত অঞ্চলগুলোতে জোতদারদের সাথে কৃষকদের ছোটখাট সংঘর্ষ শুরু হয়। অবশেষে মে মাসে এই সংঘর্ষ বিস্ফোরণের রূপ নিলো। ১৯৬৭ সালের ২৫ মে নকশালবাড়িতে, ভূমি সংঘর্ষের পরিণতিতে, ডান-বামে গড়া যুক্তফ্রন্ট সরকারের পুলিশের গুলিতে শিশুসহ নিহত হলেন এগার জন কৃষক রমনী। ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সংগ্রামের ইতিহাসে সংযোজিত হলো আর একটি নতুন নাম ‘নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান’। কমরেড মাও সেতুঙ-এর নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, রেডিও পিকিং মারফত যাকে অভিহিত করলেন- ‘ভারতের বুকে বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ’ বলে। সেই নতুন ইতিহাসের মহান নেতা হলেন কমরেড চারু মজুমদার।

পশ্চিশবাংলার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় তখন জ্যোতি বসু স্বরাষ্ট্র ও উপমুখ্যমন্ত্রী। এই কৃষক সংগ্রামের খবর সি পি এম রাজ্য দপ্তরে আসার পর তদানীন্তন ভূমি ও ভূমি রাজস্ব মন্ত্রী, কৃষকসভার নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙার ও প্রমোদ দাশগুপ্ত সহ বেশ কিছু নেতা নকশালবাড়ির সংগ্রামী নেতাদের সাথে বৈঠকের জন্য শিলিগুড়ি দৌড়ালেন। তাদের বক্তব্য, ‘এখন যুক্তফ্রন্ট-আমাদের সরকার; তাই সংগ্রাম তুলে নেয়া প্রয়োজন।’ হরেকৃষ্ণ কোঙারের এই বক্তব্যে কৃষক কমরেডরা যথেষ্ট উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং এই প্রস্তাবকে শোধনবাদী প্রস্তাব বলে নাকচ করে দেন। প্রমোদ দাশগুপ্তকে জলপাইগুড়ির কমরেডরা জিজ্ঞেস করেন যে, কোনো সংগ্রাম শুরু হলেই সংগ্রামকে নেতৃত্ব দেবার পরিবর্তে পার্টি নেতৃত্ব কেন বাম অথবা দক্ষিণপন্থী লাইন নেন? প্রমোদ দাশগুপ্ত কলকাতায় ফিরে আসেন এবং চারু মজুমদারসহ সমস্ত বিপ্লবী কমরেডদের পার্টি থেকে বহিষ্কার করে দেন।

নকশালবাড়ির সংগ্রামের গুরুত্ব বুঝে এবং এই সাংগ্রামকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য চারু মজুমদার এই সময় অন্যান্য কমরেডদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘নকশালবাড়ি সংগ্রাম সহায়ক কমিটি’। নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারববর্ষের শহরগুলিতেও ছাত্র-যুব-বুদ্ধিজীবীরা উত্তাল আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকেন। নকশালবড়ির সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়ে তার পাশে দাঁড়াবার অঙ্গীকার নিয়ে-হাজার হাজার কর্মী সিপিআই, সিপিআই (এম)সহ সংশোধনবাদী পার্টিগুলো ত্যাগ করে আসেন। জন্মলগ্ন থেকেই সংশোধনবাদী নেতাদের আওতায় থাকা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস এক যুগসন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছায়। একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ দাবানলে পরিণত হতে থাকে- বীজ থেকে জন্ম নিতে থাকে মহীরুহ। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে তৈরি হয়- সারা ভারতের বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি (All India Co-ordination committe of Communist Revolutionaries – AICCCR)।

সারা ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা মিলিত হলেন এই মঞ্চে। এই সময় প্রত্যেকদিন অগ্নিগর্ভ ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রান্তে, বিপ্লবী পরিস্থিতি দ্রুত পরিণত হচ্ছিলো। প্রতিদিনই ভারতবর্ষের গ্রাম-প্রান্তর থেকে আসছিল নতুন নতুন অভুত্থ্যান আর সংঘর্ষের খবর। ফলে এ অবস্থায় আর কোনো কো-অর্ডিনেশন কমিটির মতো আলগা সাংগঠনিক কাঠামোর পক্ষে এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। চারু মজুমদার ‘কেন এখনই পার্টি গঠন করতে হবে?’ এবং অন্যান্য লেখার মাধ্যমে ঘোষণা করলেনÑ ‘চেয়ারম্যানের শিক্ষা যে, বিপ্লবী পার্টি ছাড়া, ব্যাপক জনগণকে নেতৃত্ব দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও তার শিকারী কুকুরদের পরাজিত করা অসম্ভব।’ তাই ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল লেনিনের শততম জন্মদিনে গঠিত হলো ভারতের বুকে প্রথম বিপ্লবী পার্টি-ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) বা সিপিআই (এম-এল)। ১ মে শহীদ মিনার ময়দানের বিশাল ঐতিহাসিক জনসভায় প্রকাশ্যে ঘোষিত হলো বিপ্লবী পার্টির জন্মের কথা। চারু মজুমদার এই পার্টির প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সিপিআই (এম-এল) গঠিত হবার পর তা ভারতের শাসকশ্রেণী ও তার বিদেশী প্রভূদের সামনে মূর্তিমান ত্রাস হিসাবে উপস্থিত হলো। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ততন্ত্র ও মুৎসুদ্দি আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ-ভারতীয় জনগণের ওপর তীব্র শোষণের এই চার পাহাড়কে উচ্ছেদের জন্য কৃতসঙ্কল্প সিপিআই (এম-এল) চারু মজুমদারের নেতৃত্বে ঘোষণা করলো- ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) ভারতীয় জনগণের সামনে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের এই কর্মসূচি রাখছে এবং জনগণের বিপ্লবী আদর্শের স্বার্থে তার সবটুকু শক্তি উৎসর্গ করছে। পার্টি আস্থা রাখে যে, সমস্ত সমাজতান্ত্রিক ও নিপীড়িত জাতিগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে চীনা জনগণের সঙ্গে আমাদের জনগণের লৌহদৃঢ় ঐক্য যে শুধু ভারতীয় বিপ্লবকে বিজয়ী করবে তাই নয়, যে বিপ্লব, মাও সেতুঙ-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী মানব জাতির ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদী-প্রতিক্রিয়াশীল যুগের অবসান ঘটবে এবং বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের জয় সুনিশ্চিত করবে।’

এরপর সিপিআই (এম-এল)-এর নেতৃত্বে সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়লো ভারতবর্ষের প্রতিটি রাজ্যে; পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের প্রতিটি জেলায়; জেলাগুলোর সমস্ত গ্রাম ও শহরে। মেহনতি মানুষ ও ছাত্র-যুব-বুদ্ধিজীবীদের মেলবন্ধন ঘটলো। বিপ্লবী ছাত্র-যুবরা দলে দলে আত্মত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে গ্রামে যেতে লাগলেন। সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়লো নকশালবাড়ি থেকে শ্রীকাকুলামে, ডেবরা- গোপীবল্লভপুর থেকে লভিমপুর- মুশাহারীতে, মুঙ্গের-ভাগলপুর থেকে খেরিতে। ভীত সন্তস্ত্র শাসক শ্রেণী পুলিশ-মিলিটারির মাধ্যমে শুরু করলো অবর্ণনীয় নিপীড়ন ও অত্যাচার। তাদের সঙ্গে হাত মেলালো সংশোধনবাদীরা। লাগাতার ধরপাকড়, বিনা বিচারে হাজতে রেখে অত্যাচারে পঙ্গু করে দেয়া, সংঘর্ষের নামে বিনা বিচারে হত্যা, গুন্ডা ও সমাজবিরোধীদের দিয়ে গণহত্যা, সন্দেহমাত্র গুলি, গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া, শহরে চিরুনি তল্লাশী (কম্বিং অপারেশন)- এমন কোনো বর্বর পদ্ধতি বাদ পড়লো না, যা তারা বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেনি। তবুও সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল।

১৯৭০ সালের ১৫-১৬ মে চারু মজুমদারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় সিপিআই (এম-এল)-এর প্রথম কংগ্রেস, পার্টি আহবান রাখলো- ‘কমরেডগণ আসুন আমরা এগিয়ে যাই। সত্তরের দশক যে মুক্তির দশকে পরিণত হবেই তাতে সন্দেহ নেই।’ ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাস থেকে পার্টিতে বিভেদ আসতে শুরু হলো। সত্যনারায়ণ সিংহ-এর নেতৃত্বে বিহার রাজ্য কমিটির একাংশ পার্টি ও পার্টির নেতৃত্বের ওপর সংশোধনবাদী আক্রমণ চালালো। ধনী কৃষকদের বিপ্লবের মিত্র হিসাবে দেখা, দলের মধ্যে তথাকথিত কর্তৃত্ববাদ (অর্থাৎ চারু মজুমদারের কর্তৃত্ব বিষয়ক লাইন) খর্ব করা এবং লড়াইকে আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণমূলক এই দুটো ভাগে সুবিধামতো ভাগ করা-এই সবই হলো! পার্টি সংশোধনবাদী প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। সত্যনারায়ণ সিংহ ও তার অনুগামীরা পার্টি থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে পুরোদস্তুর সংশোধনবাদীতে পরিণত হয়।

পার্টিতে দ্বিতীয় বিরোধিতা আসে প্রায় কাছাকাছি সময়েই- সুশীতল রায়চৌধুরীর তরফ থেকে। মূল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় ছিল-মূর্তিভাঙ্গার রাজনীতি ও শহরের বুকে বিপ্লবী কার্যকলাপ প্রসঙ্গে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, প্রমুখের মূর্তি ভাঙার এবং কলকাতা শহরে ছাত্রদের বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিরোধিতা করেন সুশীতল রায়চৌধুরী। চারু মজুমদার এই যুক্তিগুলোকে খন্ডন করেন, তথাকথিৎ মণীষীদের মুৎসুদ্দি চরিত্র উদঘাটিত করে এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা, যা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়, সে সম্বন্ধে বিপ্লবী ছাত্র-যুবদের তীব্র ক্রোধের স্বরূপ তুলে ধরে। তা সত্ত্বেও তিনি সুশীতল রায়চৌধুরীকে আহ্বান জানান যে, পার্টির যে যে কর্মসূচি ও লাইন নিয়ে তার দ্বিধা রয়েছে এবং যা তিনি পার্টি কংগ্রেসে উত্থাপন করেননি- তা বিশদভাবে ব্যক্ত করার জন্য। কিন্তু এই বির্তক শেষ হবার আগেই সুশীতল রায়চৌধুরীর মৃত্যু হয়।

১৯৭১ সালের ২০ মে পার্টি কংগ্রেসের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে চারু মজুমদার বলেন, ‘সংগ্রাম যতই ব্যাপক ও তীব্র হচ্ছে ততই আমাদের রাজনৈতিক কাজের গুরুত্ব বাড়ছে। পার্টি কর্মীদের রাজনৈতিক মান উন্নত করতে হবে এবং জনতার রাজনৈতিক চেতনা বাড়াতে হবে। তবেই আমরা সংশোধনবাদের বিভিন্ন প্রকাশকে প্রতিরোধ করতে পারবো এবং সংগ্রামী জনতার মনোবল বাড়াতে সক্ষম হবো।’

১৯৭১ সালের মে-জুন মাসে পার্টির মধ্যে পরবর্তী বিরোধিতা আসে অসীম চট্টোপাধ্যায়দের কাছ থেকে। বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী পরোক্ষভাবে পাকিস্তানে ইয়াহিয়ার সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতে লিপ্ত ছিল-তখন অসীম চট্টোপাধ্যায় ও তার সহযোগীরা এক দলিল পেশ করে বলেল যে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের জাতীয় বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি এবং ভারত এক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারী। অতএব পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর উচিত ইয়াহিয়াকে সমর্থন করা। চারু মজুমদার তীব্র শ্রেণীচেতনার আলোকে, বামপন্থার মুখোশের আড়ালে, চেয়ারম্যান মাও-এর নামে ফেরি করা শ্রেণী সমঝোতার এই ক্রুশ্চেভি তত্ত্বের স্বরূপ উদঘাটন করেন। ইয়াহিয়া যে আদৌ জাতীয় বুর্জোয়া নয় এবং ‘জাতীয় আত্মরক্ষার’ নামাবলীতে সহযোগিতার এই তত্ত্ব যে শ্রমিক-কৃষক জনতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, তা চারু মজুমদার দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরেন। গণমুক্তিফৌজ গঠনের প্রশ্নে পার্টির যে লাইন ছিল-অর্থাৎ দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের ‘কমান্ডার’ নিয়োগের ওপর জোর দেয়া-অসীম চট্টোপাধ্যায়রা তারও বিরোধিতা করতে থাকেন। ঘাঁটি এলাকার প্রশ্নেও তারা রাজনীতি ও রাজনীতি সচেতন মানুষের ওপর জোর না দিয়ে, অস্ত্র-শক্তি-প্রযুক্তির ওপর জোর দিতে থাকেন। চারু মজুমদার অতি বামপন্থার নামাবলীতে আবৃত এসব সংশোধনবাদী বক্তব্যকে খন্ডন করেন এবং তার ঐতিহাসিক লেখাগুলির মাধমে মাও সেতুঙ চিন্তাধারার (পরবর্তীতে সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় মাওবাদ হিসেবে বিকশিত ও স্বীকৃত) আলোকে পার্টি লাইনকে ব্যাখ্যা করেন।

এই সময় থেকে ক্রমবর্ধমান পুলিশ-মিলিটারির অত্যাচার এবং পার্টির মধ্যকার সংশোধনবাদীদের কার্যকলাপে ধাক্কা আসতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ১৯৭১ সালে ৫ আগষ্ট-যেদিন চারু মজুমদারের ঘনিষ্ঠতম সহযোদ্ধা, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি ও পার্টির মুখপত্র ‘দেশব্রতী’র সম্পাদক কমরেড সরোজ দত্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং ওই দিনই কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে হত্যা করে। সরোজ দত্তের মৃত্যুতে পার্টির অপূরণীয় ক্ষতি হয় এবং সংগঠনও কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। চারু মজুমদার তাঁর উদ্দেশ্যে ‘শহীদ স্মরণে’ লেখায় বলেন-‘কমরেড সরোজ দত্ত পার্টির নেতা ছিলেন এবং নেতার মতোই তিনি বীরের মৃত্যু বরণ করেছেন। তাঁর বিপ্লবী নিষ্ঠা এক আদর্শ হিসাবে তরুণদের গ্রহণ করতে হবে, সমস্ত দুর্বলতা কাটিয়ে আরও দৃঢ়ভাবে বিপ্লবের পথ গ্রহণ করতে হবে। শ্রমিক এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের সাথে একাত্ম হয়ে এই হত্যাকান্ডের বদলা নিতে হবে।’

প্রকৃতপক্ষে এরপর থেকেই পার্টির বিপর্যয়ের দিন শুরু হয়। অধিকাংশ নেতাই ধরা পড়তে থাকেন; অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন- যেমন পঞ্চাদ্রি কৃষ্ণমূর্তি, ভেঙ্কটাপ্পম, সত্যম, আদিবাটলা কৈলাসম প্রভৃতি। এই সময় চারু মজুমদার বিপর্যয়ের দিনে পর্টিকে টিকিয়ে রাখার জন্য, শ্রমিক ও দরিদ্র এবং ভূমিহীন কৃষক শ্রেণীর মধ্যে পার্টিকে দৃঢ়ভাবে সংগঠিত করার কথা বারবার বলেন। শ্রমিকশ্রেণীকে আরও বেশি সংখ্যায়, সংশোধনবাদের প্রভাবমুক্ত করে টেনে আনার ওপর জোর দেন। রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেবার চেয়ারম্যান মাও-এর শিক্ষা বারবার কমরেডদের কাছে তুলে ধরেন। তিনি বলেন ‘এই দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষক আজ যত বেশি রাজনীতি আয়ত্ত করবেন, তত বেশি সংগ্রাম তীব্রতর হবে’। দৃঢ় প্রত্যয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘পার্টি বেঁচে থাকবে দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে। পার্টি বেঁচে থাকবে রাজনীতিকে জনতার গভীরে পৌঁছে দিয়ে।’

১৯৭২ এর জনু মাসে তার শেষ লেখা ‘জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ’তে চারু মজুমদার বলেন, ‘আজ আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ব্যাপক মূল জনগণের মধ্যে পার্টি গঠন করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং লড়াইয়ের ভিত্তিতে জনগণের ব্যাপকতম অংশের সাথে যুক্ত মোর্চা প্রতিষ্ঠা করা।’ কমরেডদের উদ্দেশ্যে তার আহ্বান হলো, ‘জনগণের স্বার্থই আজ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের দাবি জানাচ্ছে। জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ।’ অনেকেই মনে করেন, এই লেখায় প্রমাণ মেলে যে, চারু মজুমদার শেষ দিকে তাঁর গণসংগঠন বাতিলের লাইন থেকে সরে আসছিলেন। কিন্তু নতুন করে পার্টি পুনর্গঠনের ভাবনা ব্যক্ত করলেও তা আর বাস্তবায়িত করার সুযোগ পাননি ভারতের মেহনতি মানুষের আপোষহীন এই নেতা।

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই ভোর রাতে শিলিগুড়ির দীপক বিশ্বাসের বিশ্বাসঘাতকতায় চারু মজুমদার ভীষণ অসুস্থ অবস্তায় কলকাতার এন্টালী এলাকা থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। লালবাজারের পুলিশী হাজতে টানা বারো দিন পাশবিক অত্যাচার সহ্য করে ২৮ জুলাই শহীদের মৃত্যুবরণ করলেন আজীবন বিপ্লবী এই মানুষটি। তাঁর নৃশংস হত্যাকান্ড নিয়ে অনেক কথা ও কাহিনী চালু আছে। তবে চারু মজুমদারসহ তার পার্টির নেতাদের পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত যেভাবে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে, তাতে চিরায়ত সেই মার্কসবাদী বয়ানই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়- তা হলো, রাষ্ট্রমাত্রই তা একটি শ্রেণীর সেবা করে! বুর্জোয়া রাষ্ট্র যে নির্মমভাবে প্রতিপক্ষ শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রী ও তাঁদের পার্টিকে গুড়িয়ে দিবে তা জানাই ছিল, এ জন্যই চারু মজুমদার বার বার বলতেন, নিরীহ জনতাকে শত্রুর অস্ত্রের সামনে ঠেলে দেয়াটা আদতে তাদের সঙ্গে বেঈমানি। জনগণকে সঠিক পথ দেখাণোর দায়ে সামন্ত ও বুর্জোয়াদের ভারত তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। বিপরীতে চারু মজুমদার বিরোধী তথা শ্রমিক-কৃষক বিরোধী সংশোধনবাদী জ্যোতি বসুদের তারা দিয়েছে নিজ আধিপত্য ও আভিজাত্যের অংশীদারিত্ব। নবাগত কমিউনিস্ট কর্মীদের এ থেকে শিক্ষাগ্রহণের অবকাশ রয়েছে।

কমরেড চারু মজুমদার আজ নেই। কিন্তু তিনি ভারতবর্ষের শোষিত জনগণের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন শোষণমুক্তির এক অমোঘ অস্ত্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত নকশালবাড়ির রাজনীতি। সেই সংগ্রাম বিকশিত হয়ে আজ সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। চারু মজুমদার যেসব আদিবাসী অঞ্চলে জীবদ্দশায় সংগ্রামের ভিত্তি রচেছিলেন, সেসব এলাকা তো বটেই, লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামটা ছড়িয়ে পড়েছে আজ আরও বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে। আধুনিক, শক্তিধর ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই বিকশিত হচ্ছেন মেহনতিরা। চারু মজুমদার সংগ্রামী ও স্বাপ্নিক ছিলেন। মানুষের সমাজ থেকে শোষণ ও বৈষম্যের মূলোৎপাটন করতে চেয়েছেন তিনি। এ কাজে বাধা দিতে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বুর্জোয়াদের ও চিনির গোলা হাতে বসে থাকা সংশোধনবাদীদের বিপদ সম্পর্কে তিনি বার বার সতর্কবাণি উচ্চারণ করেছেন। আজীবন লড়াই করে শেষে নিজের জীবন দিয়ে গেছেন মেহনতিদের মুক্তির জন্য! নিঃসন্দেহে বলা যায়, মানবসভ্যতার ইতিহাসে মহান এই বিপ্লবীর নাম চিরদিন শোষকদের ত্রাস ও ঘৃণা এবং নিপীড়িত জনতার অন্তহীন আশা ও সাহসের প্রতীক হয়ে জলজ্বল করবে।

প্রতি বছর ২৮ জুলাই ভারতের মাওবাদী তথা নকশাল আন্দোলনের প্রাণপুরুষ কমরেড চারু মজুমদারের শহীদ দিবস পালন করে শাসকদের বার্তা পাঠান, বৈষম্যহীন পৃথিবীর জন্য মজুরেরা চিরকাল লড়ে যাবে! জয় সর্বহারা! জয় সাম্যবাদ!

[নোট : রেড টাইডিংস-এর সৌজন্যে এটি ছাপা হয় আবু সালেক সম্পাদিত ‘চারু মজুমদার রচনাসমগ্র’ বইয়ে। বইটি আজিজ সুপার মার্কেটে অবস্থিত ‘ঘাস ফুল নদী’ প্রকাশনা থেকে বেরিয়েছিল। মুদ্রিত কপি শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে এটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “চারু মজুমদার | সংক্ষিপ্ত জীবন পরিচিতি

  1. ভারতের বুকে প্রথম বিপ্লবী
    ভারতের বুকে প্রথম বিপ্লবী পার্টি গঠন ও বিপ্লবী লাইনের বিকাশ ঘটান কমরেড চারু মজুমদার। গ্রাম-শহরের নিপীড়িত মানুষদের কাতারে দাঁড়িয়ে মুক্তির পথ বরাবর হেঁটে চলেছেন আজীবন। মানবজাতির অগ্রগতির প্রক্রিয়ায় শ্রেণীসংগ্রাম ক্রমবিকশিত হলে চারু মজুমদার তার যোগ্য সম্মান পাবেন। রেড স্যালুট এই কমরেডকে। তার জীবনী তুলে ধরার জন্য পোস্টদাতাকে ধন্যবাদ।

  2. অল্পকথায় চারু মজুমদার
    অল্পকথায় চারু মজুমদার সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। আগের জানার সাথে বেশ কিছু যোগ হল। এই ধরনের বিপ্লবীদের সংক্ষিপ্ত জীবনী আপনার থেকে আশা করছি।

  3. যে ঢ্যাঙা পাতলা লোকটি
    যে ঢ্যাঙা পাতলা লোকটি সংশোধনবাদের ঘুপচি গলি থেকে একটি আন্দোলনকে এক ঝটকাটানে বিপ্লবের চৌরাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি কমরেড চারু মজুমদার। রেড স্যালুট কমরেড

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

20 − = 15