শেষ নিমন্ত্রণ (মূল গল্প)

চিঠিটা আবার পড়ল নওশাদ। কিছুটা চিন্তিত। হাতের লেখা তার পরিচিত। চিঠির লেখিকার সাথেও তার পরিচয় আছে। বলা যায় একটু ভালই পরিচয় আছে। নন্দিনীর হাতের লেখা বেশ সুন্দর। এই মোবাইল আর কম্পিউটার এর যুগে হাতে চিঠি লেখার ইচ্ছা কেবল নন্দিনীরই থাকতে পারে। চিন্তার কারন সেটা না। কারন হচ্ছে চিঠির বিষয়বস্তু। আরেকবার মন দিয়ে পড়ল নওশাদ।

প্রিয় পাগলের ডাক্তার,


চিঠিটা আবার পড়ল নওশাদ। কিছুটা চিন্তিত। হাতের লেখা তার পরিচিত। চিঠির লেখিকার সাথেও তার পরিচয় আছে। বলা যায় একটু ভালই পরিচয় আছে। নন্দিনীর হাতের লেখা বেশ সুন্দর। এই মোবাইল আর কম্পিউটার এর যুগে হাতে চিঠি লেখার ইচ্ছা কেবল নন্দিনীরই থাকতে পারে। চিন্তার কারন সেটা না। কারন হচ্ছে চিঠির বিষয়বস্তু। আরেকবার মন দিয়ে পড়ল নওশাদ।

প্রিয় পাগলের ডাক্তার,

আশা করছি পাগলের ডাক্তার বলাতে কিছু মনে করেন নি। মনে করলেও কিছু করার নেই। সাইকিয়াট্রিস্টদের কে তো পাগলের ডাক্তার বলাই যায়। কেমন আছেন? পাগলরা যেহেতু সবসময় ভাল থাকে সেই হিসাবে পাগলের ডাক্তারদেরও সবসময় ভালই থাকা উচিৎ। কি, ভুল বললাম? আপনাকে মোবাইলে পাচ্ছি না। তার মানে এখনো দেশে ফিরেন নি। শুনলাম সায়েন্টিফিক সেমিনার শেষে শুক্রবার দেশে ফিরবেন। আপনাকে কথা দিয়েছিলাম যে রান্না করে খাওয়াব। শুক্রবার সকালে দেশে ফিরছেন। সারাদিন বিশ্রাম নিয়ে রাতেই চলে আসুন। রাতে আমাদের সাথে ডিনার করবেন। আপনাকে তো বলেছিলাম শামস একটা মুরগীর ফার্ম দিয়েছে। সেই ফার্মের মুরগীগুলো বেশ নাদুসনুদুস হয়েছে। অল্প ঝোলে ভুনা মুরগীর মাংস খেয়েছেন হয়ত। কিন্তু কথা দিচ্ছি এত মজার রান্না কখনো আগে খেয়ে দেখেন নি। তাই না আসলেই মিস করবেন। আর শামসের ব্যাপারেও কিছু কথা বলার ছিল। কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে ও। ওর আচরণের কোন দিশা খুঁজে পাচ্ছি না। এই খুব ভাল তো ৫ মিনিট পরেই যেন অন্য গ্রহের মানুষ। দুনিয়ার কিছুতেই যেন তার কিছু যায় আসে না। একদম নিঃস্পৃহ। ইদানিং সমস্যাটা আরো বেড়েছে। আসুন তো আগে। তারপর বিস্তারিত কথা হবে। থাইল্যান্ড থেকে আচার নিয়ে আসবেন বলেছিলেন। আচার যদি না নিয়ে আসেন তাহলে কিন্তু ঘরে ঢুকতে দিব না এই ব্যাপারটা মাথায় রাখবেন। ডিনার এর পর বোনাস হিসাবে খুব কাছ থেকে এরোপ্লেন দেখার সুযোগ পাবেন। বাউনিয়াতে আমাদের বাসাটা এয়ারপোর্টের একদম লাগোয়া। প্লেনগুলো ল্যান্ড করার আগে এত নিচু দিয়ে উড়ে যায় যে মনে হয় হাত বাড়ালেই স্পর্শ করা যাবে। আর ভাল কথা, আমাদের বাসাটা মেইন রোড থেকে অনেক ভিতরে। গাড়ি ঢুকবে না গলি দিয়ে। CNG নিয়ে আসাটাই ভাল হবে। শুক্রবার তাহলে দেখা হচ্ছে।

ভাল থাকবেন।

নন্দিনী

নওশাদ একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। ১৫ দিনের জন্য সে থাইল্যান্ড গিয়েছিল একটা সায়েন্টিফিক সেমিনারে অংশ নিতে। আজই ফিরল। বাসায় ঢুঁকে লেটার বক্সে উঁকি দিয়েই চিঠিটা তার চোখে পড়েছে। আজকাল কেউ চিঠি লেখে না। লেটার বক্সটাও কাজে আসে না। তাই চিঠিটা পেয়ে কিছুটা অবাক হয়েছে সে। অবশ্য প্রেরিকার নাম দেখে বুঝেছে এটাই স্বাভাবিক। নন্দিনী এমনই। তার স্বামীর মতই কেমন যেন খাপছাড়া।

নন্দিনীর সাথে তার পরিচয় মাস তিনেক আগে। একদিন বিকেলে চেম্বারে ঢুকেই সে দেখতে পায় অদ্ভুত সুন্দরী কমবয়সী একটা মেয়ে তার চেম্বারে বসে আছে। তার স্বামীর আচরণ ইদানিং কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে, এই বিষয়েই নন্দিনীর খুব উৎকণ্ঠা ছিল। এমন না যে শামস নন্দিনীকে মারধোর করে। শামস স্বামী হিসাবে খুবই পারফেক্ট। কিন্তু ওর আচরণে নিঃস্পৃহতার মাত্রা দিন দিন বাড়ছিল। নিঃস্পৃহতার সাথে সাথে সন্দেহপ্রবণতাও ছিল। এর পিছনের কারন বের করা এবং তার চিকিৎসার জন্য পরামর্শ নেওয়ার জন্যই নন্দিনীর আসা। ঘন ঘনই আসত নন্দিনী। কিছুদিন পর দেখা গেল নন্দিনীর সাথে তার সম্পর্কটা স্বাভাবিকের থেকেও অনেক সহজ হয়ে গেছে। বন্ধুত্তের থেকেও বেশি নির্ভরতার একটা সম্পর্কের দিকে তাদের সম্পর্কটা মোড় নেওয়া শুরু করল। নওশাদের দীর্ঘ বিপত্নীক জীবন এবং নন্দিনীর প্রতি শামসের ক্রমবর্ধমান নিঃস্পৃহতাই হয়ত এর কারন। কেন জানি নন্দিনীর ছেলেমানুষিগুলো তাকে রোকসানার কথা মনে করিয়ে দিত। রোকসানার সাথে নন্দিনীর অনেক মিল সে খুঁজে পায়। তবে এটা ঠিক যে নন্দিনী শামসকে অসম্ভব ভালবাসে। শামসের সুস্থতার প্রতি আকাঙ্ক্ষাই তার প্রমাণ। যাই হোক, নন্দিনীর সাথে তার সহজ সম্পর্কটা নওশাদ ভালই উপভোগ করত।

নওশাদ ঠিক করল সে যাবে। যদিও চিঠিটা পড়ার পর থেকেই তার কেমন যেন একটা অস্বস্তিবোধ কাজ করছে। কি যেন একটা আছে চিঠিটার মাঝে যা সে ধরতে পারছে না। ধুর ছাই, পাগলের চিকিৎসা করতে করতে নিজেই পাগল হয়ে গেলাম নাকি- ভাবল সে। খালি সবকিছুতে সন্দেহ আর সন্দেহ। আজ রাতের ডিনার সে নন্দিনীর সাথেই করবে। ডিনারের পর বাসার ছাদে উঠে এরোপ্লেনের ল্যান্ডিং দেখবে। গত ১৫ দিনে অনেক পরিশ্রম হয়েছে। এখন একটু রিলাক্স দরকার।

*****
CNG থেকে গলির মাথায় যখন নওশাদ নামল তখন ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষাকালের এই এক সমস্যা। কখন যে বৃষ্টি নামবে আগে থেকে বোঝা যায় না। বাসা থেকে বের হবার সময় কোন বৃষ্টি ছিল না। তাই ছাতা বা রেইনকোট কোনটাই নিয়ে বের হয় নি সে। অবশ্য গাড়ি ব্যবহার করার পর থেকে ছাতা বা রেইনকোট ব্যবহার সে ছেড়েই দিয়েছে। এগুলো বের করার চিন্তা মাথায় আসে নি। এখন বুঝতে পারছে বর্ষাকালে ছাতা বা রেইনকোট না নিয়ে বের হওয়াটাই ঝামেলা। হাতে ব্যাগ থাকলে ঝামেলা তো আরো বেশি। তার ব্যাগে আছে থাইল্যান্ড থেকে আনা আচার আর একগুচ্ছ রজনীগন্ধা।

গাড়ি না নিয়ে এসে ভালই হয়েছে- সরু গলিটা দিয়ে এগুতে এগুতে নওশাদ ভাবল। এই গলিতে গাড়ি ঢুকবে না। আশেপাশে গাড়ি রাখার কোন গ্যারেজও নেই। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে দেখে একটু দ্রুত পা চালাল সে। নন্দিনীর কাছে থেকে তাদের বাসার বর্ণনা এতবার শুনেছে যে ফোন করে নিশ্চিত হবার কোন প্রয়োজনই সে অনুভব করছে না। একদিক দিয়ে ভালই হল। নন্দিনীকে সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে। সে নিশ্চই ভাবতেও পারবে না তাকে ফোন না দিয়েই নওশাদ বাসা খুঁজে বের করতে পারবে। নন্দিনীর বর্ণনার সাথে চারপাশ মিলে যাচ্ছে তাই তাঁর কোন সমস্যাই হচ্ছে না। এই যে ডানপাশে ছোট্ট ডোবা রেখে একটু সামনে এগুলে হাতের বামপাশে পড়বে দুইটা বড় নারিকেল গাছ। আরেকটু সামনে গেলেই ছোট্ট একটা মাঠ। মাঠের শেষ মাথায় শামস এর মুরগীর ফার্ম। হ্যা, এইতো সেই ফার্ম। ফার্মের সামনে একটা আলোকিত সাইনবোর্ড “নন্দিনী পোলট্রি ফার্ম”। নিজের স্ত্রীর নামেই শামস ফার্মের নাম রেখেছে। লোকটা তার স্ত্রীকে ভালোবাসে বোঝা যায়।

ফার্মের ভিতরটা সাদা নিয়ন বাতির আলোয় উদ্ভাসিত। সাদা রঙের মোরগ মুরগীগুলোকে দেখতে দেখতে আচমকা কয়েকটা মুরগীর দিকে নওশাদের চোখ আটকে গেল। এই মুরগীগুলো একটু আলাদা। আকারে বাকিগুলোর থেকেও বড়। বাকি মুরগীগুলো যেখানে খুব ছটফট করছে সেখানে এই মুরগীগুলো একদম স্থির হয়ে আছে। এবং অবাক করা ব্যাপার মুরগীগুলো মনে হচ্ছে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কিছুটা কৌতূহলী হয়েই সে এগিয়ে গিয়ে ফার্মের তারের দেয়ালে হাত রেখে দাঁড়াল মুরগীগুলোকে একটু ভাল করে দেখবে বলে। এবং, কিছু বুঝে উঠার আগেই, একটা মুরগী তার হাতে ঠোকর মারল। নওশাদ পুরাই হতম্ভব। ফার্মের মুরগী ঠোকর দেয় এই ঘটনা এই প্রথম সে দেখল। আগে কখনো শুনেও নি। ঠোকরের জায়গাটা ফুলে উঠেছে। কিছুটা রক্তও বেরুচ্ছে। হাতটা চেপে ধরে নওশাদ এগিয়ে চলল। বৃষ্টির বেগ অনেক বেড়েছে। তার জানা আছে ফার্মটা যেখানে শেষ হবে সেখান থেকে বেশ কিছুটা সামনে নন্দিনীদের দ্বিতল বাসা। এটাও সে জানে তাদের বাসার আশেপাশে শুধু খানাখন্দ আর ডোবা। আর কোন বাসা নেই।

*****
কলিংবেলের শব্দটা যেন দূর থেকে ভেসে আসল। বাসাটা যেমন পুরাতন, কলিংবেলের শব্দটাও অনেক পুরাতন। আজকাল কত সুন্দর শব্দের কলিংবেল পাওয়া যায়। নন্দিনীকে বলতে হবে কলিংবেলটা বদলাতে। নওশাদ কিছুটা উত্তেজিত। কারন অনেকদিন পর সে নন্দিনীকে দেখতে পাবে। আজ শামস না থাকলে ভালই হত। নন্দিনীকে যে তার পছন্দ এটা নিজে সে যেমন জানে, নন্দিনীও জানে। কিছুটা মৌন সম্মতিও নন্দিনী যে দেয় নি তা নয়। আজকের নিমন্ত্রণটা সেটার প্রকাশও হতে পারে। খালি বাসায় একা থাকবে বললে নওশাদ আসবে না জেনেই হয়ত সে শামস থাকবে বলেছে। এমন কি হতে পারে না যে শামস আজ বাসায় নেই? যদি নন্দিনী বাসায় একা থাকে তাহলে কি সে পারবে এমন বর্ষণমুখর রাতে নিজেকে সামলাতে। নন্দিনী কি পারবে? সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের মাঝেই চিন্তাগুলো নওশাদের মাথায় খেলা করে গেল।

দরজা খোলার সাথে সাথেই নওশাদের মনটা খারাপ হয়ে গেল। দরজায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে শামস।

“আসুন, ডাক্তার সাহেব। আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।“
“নন্দিনী নেই?”
“ও মাফ চেয়েছে আপনার কাছে। আমার শাশুড়ি মানে নন্দিনীর আম্মা হঠাত অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিকেলে ফোন আসার পর নন্দিনী তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে গেছে। আপনাকে ফোন দিয়ে যে বলবে সেই সুযোগটা পায় নি।“
“তাহলে আমি আসি।“
“আরে কি বলেন? সে আপনার জন্যে রান্না করে রেখে গেছে। যদি শোনে যে আপনি না খেয়েই চলে গেছেন তাহলে কি আর আমাকে আস্ত রাখবে? আসুন। ভিজে গেছেন। একটু ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি টেবিলে খাবার রেডি করে আপনাকে জানাচ্ছি। খাবার পর আমরা আড্ডা দিব। নন্দিনী নেই, আমার সাথে আড্ডা দিতে খারাপ লাগবে না তো?”

কিছুটা হতাশ নওশাদ। খুব আশা ছিল নন্দিনী থাকবে। আগে জানলে সে আসতই না। এখন তো চলেও যাওয়া যায় না। একে তো বৃষ্টি তার উপর শামস বসে আছে। কি আর করা। সময়টুকু বোরিং কাটবে এই আর কি? শামস নাকি অসুস্থ। কিন্তু তার আচরণে তো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক লাগছে। দেখা যাক, গল্প করতে করতে কিছু হয়ত বের হয়ে আসতে পারে।

*****
স্বীকার করতেই হবে নন্দিনীর রান্নার হাত অসাধারন। এত তৃপ্তির সাথে অনেকদিন সে খায় নি। রোকসানা মারা যাবার পর থেকে বাইরে খাওয়া-দাওয়া করতে করতে রুচিটাই নষ্ট হয়ে গেছে। নাহ, অনেকদিন পর স্ত্রীর অভাব খুব মনে লাগছে।

“কি খাবেন? চা, সিগারেট নাকি ড্রিঙ্কস?”
“ড্রিঙ্কসটা খাই আগে। পরে সিগারেট।“
“আপনার ইচ্ছা।“
“আচ্ছা, আপনার ফার্মের কিছু মুরগী দেখলাম একটু অন্যরকম। অনেক নাদুসনুদুস। অনেক এগ্রেসিভ। আমাকে তো ঠোকরও দিল। কি খাওয়ান এদেরকে?“
“আছে একটা স্পেশাল খাবার। যা কোন মালিকই খাওয়ায় না।“
“সেটা কি বলা যাবে? নাকি বিজনেস সিক্রেট?”
“না না, অবশ্যই বলব। অপেক্ষা করুন। থাইল্যান্ড থেকে কবে এলেন?”
“আজই।“
“বাহ, আজ দেশে ফিরেই দাওয়াত রক্ষা করতে চলে আসলেন? নন্দিনীর প্রতি তো দেখছি আপনার খুব টান।“

আলোচনা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা নওশাদ বুঝতে পারছে না।

“আপনার কথার মানে ঠিক বুঝতে পারছি না।“
“বুঝতে পারছেন না নাকি বুঝতে চাইছেন না?”
“নওশাদ, নন্দিনীকে বিয়ে করবেন? আমি তো মানসিক রোগী। সে হিসাবে নন্দিনীর যত্ন নিতে পারব না। আপনি কি দায়িত্বটা নিতে রাজী আছেন?”
“এইসব কি উল্টাপাল্টা বকছেন? নন্দিনী আপনাকে খুব ভালবাসে সেটা তো আপনি জানেনই।“
“আগে ভালবাসত। আপনার সাথে পরিচিত হবার পর থেকে আরে ভালবাসে না। এর জন্য নন্দিনী যেমন দায়ী, তেমনি আপনার দায়ও কম নয়।“

নওশাদ শঙ্কা অনুভব করল। এতক্ষন যেই মানুষটিকে খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল সে যে আসলেও অসুস্থ সেটা বোঝা যাচ্ছে। মানসিক রোগীদের ক্ষেত্রে এটা কমন। কিভাবে এদেরকে সামলাতে হয় সে ব্যাপারেও তার ধারনা আছে কিন্তু শামসের ব্যাপারটা অন্যরকম। এত নিঃস্পৃহভাবে সে বলে যাচ্ছে যেন খুব সাধারন ব্যাপার এটা। লক্ষণ ভাল না। সাবধান হতে হবে।

“আপনি ভুল বুঝছেন। নন্দিনীর সাথে আমার খুব ভাল একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। এর বেশি কিছু না।“
“তাই? নন্দিনীর কথায় তো সেটা ফুটে উঠে না। সে তো আপনার প্রেমে পাগল। যেই মেয়ে আমার প্রেমে পাগল হয়ে তার প্রেমে আমাকেও পাগল বানিয়েছিল, সেই মেয়েই কি না এখন আপনাকে ছাড়া কিছু বোঝে না। আসলে সব কিছুই সত্যির নিত্যতা সুত্র মেনে চলে। তার ভাষায় আমি অসুস্থ। আমি তার চাহিদা মেটাতে পারছি না। তাই এখন আপনাকে তার দরকার। আপনিও কম যান না। সুযোগ পেয়েই লুফে নিলেন।“

শামস খুব শান্তভাবে কথা বলছে। কোন উত্তেজনার ছিটেফোঁটাও তার মাঝে নেই। নওশাদ বুঝতে পারছে অবস্থা সুবিধের না। এখুনি কিছু একটা করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে।

“শামস, আপনি নন্দিনীকে ডাকুন। একটু ভুল বোঝাবোঝি হচ্ছে। ও আসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।“
“ও তো আসতে পারবে না। কারন, সে তার ভুলের মাশুল গুনছে।“
“আপনি কি বলতে চাইছেন? কি করেছেন আপনি নন্দিনীর?”
“খুন করেছি। ঘুমের মাঝে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করেছি। তারপর লাশ গুম করার ঝামেলায় যাই নি। কেটে টুকরো টুকরো করেছি। বড় টুকরো না, ছোট ছোট টুকরো। আমার পোলট্রি ফার্মের বাইরে একটা ক্রাশিং মেশিন আছে। সেটা দিয়ে নন্দিনীর সারা শরীর ক্রাশ করেছি। যখন হাড় মাংসগুলো গুড়া গুড়া হয়েছে তখন সেটা মুরগীর খাবারের সাথে মিশিয়েছি। গত ১ মাস ধরে নির্দিষ্ট কিছু মুরগীকে সেই খাবার খাইয়েছি। বাকিগুলোকে খাইয়েছি সাধারন খাবার। ফলাফল তো দেখতেই পারছেন। মুরগীগুলো সাধারন মুরগী থেকে ওজনে বড় হয়েছে। মানুষের মাংসের পুষ্টিগুণ ভালই। আজকের খাবারটা কি আর এমনি এমনি এত স্বাদের হয়েছে? কি বলেন নওশাদ সাহেব, ঠিক বলি নি? ওকি, অমন করছেন কেন? খারাপ লাগছে?”

নওশাদ আর সহ্য করতে পারল না। হড়হড় করে বমি করে দিল। ততক্ষণ পর্যন্ত সে বমি করল যতক্ষণ না সমস্ত খাবার পেট থেকে বের হয়ে যায়। খুব দুর্বল লাগছে। নন্দিনীর এই পরিনতির কথা তার কল্পনাতেও আসে নি। শামস আসলেও একটা ম্যানিয়াক। তার পালাতে হবে। তা না হলে সেও বাঁচবে না। কিন্তু পালাবে কিভাবে? বমি করে শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে। চাইলেও সে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। ঠিক তখনি শামস উঠে দাঁড়াল। তার মুখে মৃদু হাসি। নওশাদ এই প্রথম শামসকে হাসতে দেখল। আশ্চর্য সুন্দর আর নিষ্পাপ সে হাসি। কে বলবে এই লোক তার নিজের স্ত্রীকে হত্যা করে কেটে মুরগীকে খাইয়েছে। শামসের হাতে একটা লম্বা রড। সে এগিয়ে আসছে তার দিকে। নওশাদ নড়তে পারছে না। শামসের চোখগুলো তাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে।

“জানেন নওশাদ, নন্দিনীর মাংসগুলো না শেষ হয়ে গেছে। মুরগীগুলোকে তো খাওয়াতে হবে। এখন মাংস জোগাড় করা ছাড়া আর উপায় নেই। কিছু মনে করবেন না। এই সাহায্যটুকু আমাকে আপনার করতেই হবে। সে জন্যেই তো আপনাকে নিমন্ত্রণ করে আনা।“

শামসের মুখের মৃদু হাসি উধাও। সে জায়গায় দখল করে আছে রাজ্যের নিঃস্পৃহতা। নওশাদ দেখল শামস তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতটা যেন স্লোমোশনে উপরে উঠে এখন নেমে আসছে। মাথায় তীব্র একটা ব্যাথা আর তারপরেই শুধু শুন্যতা আর অন্ধকার।

*****
“কই গো? এসো। হাত লাগাতে হবে। আমি একা পারব না।“

উপরতলা থেকে ধীর পায়ে নন্দিনী নিচে নেমে আসল। কলাপাতা রঙের শাড়িতে তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। শামস মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“কি, কাজ শেষ?”
“হুম। এখন লাশটা সরাতে হবে। কাটতে হবে। গুড়া করে মুরগীর খাবারের সাথে মিশাতে হবে। কত কাজ। কিন্তু তুমি যে শরীরে কলাপাতা রঙের আগুন জ্বালিয়েছ সুন্দরী তাতে তো কাজে মন বসবে না। বিছানায় যেতে মন চাইবে। শাড়িটা খুলে অন্য কিছু পড়ে আস। শড়িটা ময়লা হোক তা চাই না।“
“তুমি আসলেও যে একটা কি। এত প্রেশার কিভাবে নাও বলতো? কোথায় কাজ শেষ একটু আদর করবে তা না এখন কাজ করার জন্য ডাকছ। আজ রাতে তোমাকে আমার কাছে ভিড়তেই দিব না।“
“সে দেখা যাবে। আগে কাজ, তারপর সব। লিস্টটা নিয়ে এসেছ?”
“হ্যা, এই নাও।“

নন্দিনী কাগজটা বাড়িয়ে দিল শামসের দিকে। সেখানে ৫ জনের নাম লেখা। ৫ জনই সাইকিয়াট্রিস্ট। প্রথমজন ডাঃ রিপন মজুমদার। তার পাশে ক্রস আঁকা। পরেরজন ডাঃ নওশাদ হক। পকেট থেকে কলম বের করে এই নামের পাশেও একটা ক্রস এঁকে দিল শামস। তারপর লিস্টটা বাড়িয়ে দিল নন্দিনীর দিকে।

“এবার তিন নম্বর। প্রস্তুত হও। তিন মাসের মাঝেই কিন্তু বাসায় নিয়ে আসতে হবে।“

নন্দিনী তিন নম্বর নামটার দিকে তাকাল। ডাঃ নুর নবী দুলাল।

“তিন মাস লাগবে না। দুই মাসের মাথায়ই বাসায় নিয়ে আসব। চ্যালেঞ্জ।”

বিঃদ্রঃ এই গল্পটি আমার লেখা প্রথম সাইকো গল্প যা আগে নাগরিকব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল। এই গল্পটি যখন লিখি তখন এর সিকুয়েল লেখার কোন প্ল্যান ছিল না। কিন্তু, সিকুয়েল লেখা শুরু করেছি। সিকুয়েল প্রকাশ করার আগে মূল গল্পটা দিয়ে দিলাম যেন পরের পর্বটা বুঝতে আপনাদের কোন সমস্যা না হয়। আশা করছি দুইটা পর্বই আপনাদের ভাল লাগবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১২ thoughts on “শেষ নিমন্ত্রণ (মূল গল্প)

  1. পছন্দের গল্পগুলোর মধ্যে এটি
    পছন্দের গল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম প্রিয়, জেনে ভালোই লাগছে যে পরবর্তী আরো সিকোয়েন্স আসছে।
    জমে যাবে আশা করছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 4