উচ্চ শিক্ষায় বিশ্বব্যাংকের আগ্রাসন এবং আজকের ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে একটি গোটা পরিবার, একটি বর্গ, একটি শক্তি-এটা প্রথমে বড় ধরনের পরিচয় করিয়ে দিলেন।

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে একটি গোটা পরিবার, একটি বর্গ, একটি শক্তি-এটা প্রথমে বড় ধরনের পরিচয় করিয়ে দিলেন।


সেই শক্তি যখন সারা দেশে গর্জে উঠলো তখন রাষ্ট্রের সব শক্তি, যন্ত্র তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য উঠে পড়ে লাগলো। শেষ পর্যন্ত যে খবর আসছে তা হোল রাতে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাজপথ থেকে তুলে দেয়া।

শ্লোগানটি আন্দোলনের তাৎপর্যকে তুলে ধরেছে!

রাষ্ট্র বল প্রয়োগ করে যে কোন চাওয়াকে মুখ বন্ধ করতে চায়। প্রথমে চেষ্টা করে চাওয়া দাবিটির মধ্যে কোন যুক্তি নেই, ভিত্তি নেই এমন সব কুযুক্তি তুলে ধরতে। এরপর তাতে ব্যর্থ হয়ে দমন নিপিড়ন চালায় প্রয়োজন হত্যার মত বিষয়ও বেছে নেয়। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বীরদর্পে ঘোষণা করেছেন, কুচ পরোয়া নেহি। কি করতে পারেন? সর্বোচ্চ গুলিতো? করেন। তবুও ভ্যাট দিবো না। এই প্রত্যায় জানা দিচ্ছে আন্দোলনের তাৎপর্য কত গভীর। প্রশ্ন হোল সরকারের কি কান আছে তা শোনার?
আর মধ্যবিত্তদের গালি দেয়া বন্ধ করুন মার্কসবাদী বন্ধু-কমরেডস। কারণ এই মধ্যবিত্তরা একদিন বিপুল সমর্থন জুগিয়েছিলো জাসদকে ও ওয়ার্কাস পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রীকে। কিন্তু সেই মধ্যবিত্তের চরম বেঈমানি করে আজ ইনু ভাই নৌকার গলুইতে বসে পান চিবান আর মেনন ভাই মুক্তি খোজেন জাতীয়তাবাদে।
মার্কসবাদী বন্ধুরা আয়নায় আসুন নিজেদেরকে দেখি। পর্যালোচনা করি। আত্মসমালোচনা করি। জেগে উঠা তরুন-তরুনীদের শ্লোগানের মর্মবানী বোঝার চেষ্টা করি। নেতা যেনো না হই। বরং এ সময় কর্মী হওয়াটাই বেশি দরকার।

 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মানে দেশের অন্যতম বৃহৎ এক ছাত্র সমাজ এই প্রথম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে, গুলির মুখে দাড়িয়ে তারা নিজেদেরকে একটি শক্তি হিসেবে জানান দিলো। এর তাৎপর্য অনেক গভীর। আজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ যে ঐতিহাসিক কর্মযজ্ঞে নেমেছেন, তারা সস্মরণ করুন তাদের পূর্বসূরীদের। যারা একটি একই ধারার বৈষম্যহীণ গণতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য পাকিস্তান আমল থেকে লড়াই করছেন।
নিচের লেখাটি ২০১০ সালে লেখা। কিন্তু তাৎপর্য পাল্টায়নি। কিছু বিষয় হয়তো আমার উপলব্দি পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু যেহেতু একবার প্রকাশ হয়ে গেছে এ কারণে পুরানো লেখাটি পরিবর্তন করলাম না। কিন্তু যারা আন্দোলন করছেন তারা যদি শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের রাজনীতি ও অর্থনীতিটা ভালো না করে আয়ত্ব করেন, তাহলে আপনি লড়ছেন, কিছুদিন বন্ধ রাখতে পারবেন আবার আপনার ছোট ভাইকে এই একই দাবিতে লড়তে হবে। কারণ সরকার ২০১০ সালেও ভ্যাট চালু করতে গিয়ে সেটা বন্ধ রেখে আবার এখন চালু করেছে।
এইসব জলকামান বলেন আর সাজোয়া যান বলেন পাবলিকের টাকায় কিনে তা পাবলিক বধে ব্যবহার হয়।

তবে লাঠি কিম্বা গুলি অথবা টিয়ার গ্যাস বা গুণ্ডা ছাত্রলীগ-কখনোই কোন গণআন্দোলনে এসব দিয়ে দাবিয়ে রাখা যায়নি। বরং আন্দোলন আরো মহান হয়, গতি পায়, তীব্র ঢেউয়ে শাসকশ্রেণি স্রেফ খড় কুটোর মত ভেসে যায়। বিশ্বাস করুন, আমি যা বলছি ইতিহাস তা সাক্ষি দিচ্ছে।

শিক্ষার অধিকার থেকে দরিদ্রদের ছেঁটে ফেলার কৌশলপত্র
উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ

শিক্ষায় ভ্যাট প্রবর্তনের প্রতিবাদে সমপ্রতি ঢাকার রাস্তায় বিক্ষোভ করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই বেতন ও ফি বাড়িয়ে দেওয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের রক্ত দিয়ে প্রতিবাদ লিখেছেন অগুনতি ছাত্রছাত্রী। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের জনবহুল দেশে যখন শিক্ষাই জনসমস্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার একমাত্র উপায়, তখন এই খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধিই কাঙ্ক্ষিত সমাধান। অথচ সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ ইঙ্গিত দিচ্ছে, শিক্ষায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ নয়, বরং পুঁজি সংগ্রহে ছাত্রদের ওপরই নির্ভরশীলতা বাড়তে যাচ্ছে অদূর-ভবিষ্যতে। বিশ্বব্যাংকের অর্থ ও পরামর্শক্রমে ২০ বছরব্যাপী যে উচ্চশিক্ষার কৌশলপত্র উত্থাপন করা হয়েছে, তা আদতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের উচ্চশিক্ষালাভের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। উচ্চশিক্ষা হয়ে পড়বে উচ্চবিত্তের পণ্য, দারিদ্র্যের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে যে তরুণরা আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় পা রাখার সাহস পুষে রাখে, তাদের ছুড়ে ফেলা হবে দূরে। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছিলো ২০১০ সালের ১১ আগস্ট দৈনিক কালের কন্ঠের রাজকূটে। নতুন আঙ্গিকে পরিস্থিতির সাথে কিছু বিষয় বিবেচনা করে লেখাটি আবার ব্লগে দেয়া হোল।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সব থেকে বড় প্রাপ্তি ও গৌরবের নাম ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে ছাত্র আর ছাত্র আন্দোলনের নাম জড়িয়ে আছে গভীরভাবে। ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ দফা, ‘৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ‘৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এই পটভূমিকায় বিকশিত হওয়া বাংলাদেশের চিন্তায় শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল রাজনীতিবিদদের থেকেও বেশি। এ সময় শিক্ষার্থীরা একটি একই ধারার বৈষম্যহীন অবৈতনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার জন্য লড়াই করেছেন, জীবন দিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সরকারগুলো শিক্ষার্থীদের ২২ দফা কার্যকর করেনি। তবে তারা কেউই শিক্ষাকে আজকের মতো বাণিজ্যিকীকরণ করে ছাত্রদের ঐতিহাসিক ২২ দফার সঙ্গে বেঈমানি করেনি। মূলত ‘৯০ পরবর্তী অবাধ মুক্ত বাজার অর্থনীতির হাত ধরে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের পথ প্রশস্ত হয়।

তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে একটি কৌশলপত্র তৈরি করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। এই কৌশলপত্রের সুপারিশ অনুযায়ী আগামী ২০ বছরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের অতীত গৌরবের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, সুলভ শিক্ষার অঙ্গীকারের সঙ্গে আমাদের দেশের সংবিধান ও স্বাধীনতা জড়িত। কোনো সরকার ইচ্ছে করলেই তা বাণিজ্যিকীকরণ করতে পারে না। বাংলাদেশে শিক্ষা কোনো সুযোগ নয়, এটা অধিকার।


কৌশলী কৌশলপত্র বাস্তবায়ন হবে চার ধাপে

২০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্রে চার পর্বভিত্তিক মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কৌশলপত্রে চার পর্বে উচ্চশিক্ষায় এ সংস্কার বাস্তবায়নের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ছাত্র আন্দোলন। কৌশলপত্রের নির্মাতারা একটি তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখোমুখি হতে পারেন_এই ভেবে একসঙ্গে সব ভর্তুকি উঠিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলে কৌশলপত্রে মন্তব্য করেছেন। পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, এক সঙ্গে কৌশলপত্র বাস্তবায়ন হলে তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে পড়ার ভয় থেকে ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণের পথ বেছে নিয়েছে ইউজিসি ও বিশ্বব্যাংক।
চার পর্বের প্রথম ধাপগুলো হলো প্রাথমিক পর্ব ২০০৬-২০০৭, স্বল্পমেয়াদি ২০০৮-২০১৩, মধ্যমেয়াদি ২০১৪-২০১৯ এবং দীর্ঘমেয়াদি ২০২০-২০২৬। কৌশলপত্রের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার পুরোটাই অধিক দামে ক্রয় করতে হবে। উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে পড়বে নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ঘরের লাখ লাখ শিক্ষার্থী।

সব সরকারি ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সুপারিশ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকারি ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছে মঞ্জুরি কমিশন। ভর্তুকি তুলে নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। নিজস্ব অর্থায়নের খাতগুলোও বাতলে দিয়েছে কৌশলপত্র। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আয়ের খাত হিসেবে প্রথম টার্গেট করা হয়েছে বেতন-ফি বৃদ্ধি। তবে এখানেও কৌশলপত্রে কৌশলী হয়ে তিন ধাপে শিক্ষার্থীর বেতন ফি বৃদ্ধির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট তিন ধাপে পর্যায়ক্রমে বেতন-ফি বৃদ্ধি করা হবে। বেতন-ফি বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে কৌশলপত্রে।
শিক্ষার্থীদের ঋণ নিয়ে উচ্চশিক্ষায় সমাপ্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন কৌশলপত্রের নির্মাতারা। সে ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, একজন শিক্ষার্থীকে ব্যাংক ঋণের ভার তাঁর শিক্ষাজীবন শেষেও বয়ে বেড়াতে হবে।
মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ব্যয়ের ৫০ শতাংশ অর্থ আসতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। তবে এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ খাতে আয় বাড়ানোর দিকটা জোর দিতে হবে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি কমিয়ে নেওয়ার যে কথা ইউজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের সংবিধান বর্ণিত শিক্ষা অধিকার পরিপন্থী। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সরাসরি গণবিরোধী। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ সব স্তরেই রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি বাড়ানো দরকার। উচ্চশিক্ষাকে কোনোভাবেই বাজারের পণ্য হতে দেওয়া যাবে না। এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। দেশের মানবপুঁজি গঠনে শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি অপরিহার্য।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মানবেন্দ্রনাথ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ শিক্ষার বিরুদ্ধে সব যড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে। অতীতের সব শিক্ষানীতির স্থান হয়েছে ডাস্টবিনে। ইউজিসি নামক একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ও ঋণে উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের যে অপতৎপরতা চালাচ্ছে তা এখানকার ছাত্র সমাজ রুখে দেবে। বাংলাদেশের গরিব, মধ্যবিত্ত ও মেহনতী মানুষের ঘরের সন্তানরা পড়তে পারবে না, আর সেখানে পড়বে ধনিকশ্রেণীর ছেলেমেয়েরা; এই বৈষম্য কখনোই মেনে নেওয়া হবে না।

 

উচ্চ শিক্ষা কি কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে??


বাজারনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর
উপেক্ষিত বিজ্ঞান ও মৌলিক শিক্ষা

কৌশলপত্রের সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষার পুরোটাই হবে বাজারনির্ভর একটি লাভজনক বাণিজ্যিক বিষয়। মৌলিক জ্ঞান আহরণ কিংবা বিজ্ঞান শিক্ষার পুরোটাই থাকবে উপেক্ষিত। কোন কোন বিষয়ে গবেষণা হবে তা নির্ধারণ করে দেবে বিশ্বব্যাংক, অন্যান্য ব্যাংকসহ অর্থায়নকারী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। মৌলিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্য, দর্শন বা ইতিহাসের মতো মৌলিক জ্ঞানচর্চার বিষয়গুলো ক্রমশ বন্ধ করে দেওয়া হবে। মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগ সম্পর্কে কৌশলপত্রের ১৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মানবিক ও বিজ্ঞান শাখা থেকে বের হওয়া স্নাতকের বর্তমান চাকরির বাজারে ও বাস্তব জীবনে তেমন কোনো মূল্য নেই।’ এই সব বিষয় থেকে পাস করা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতদের যেহেতু চাকরি নেই, তাই উক্ত বিষয়গুলোর প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন কৌশলপত্র নির্মাতারা। বিজ্ঞান ও মানবিক শিক্ষার কোনো বাজারমূল্য নেই, তাই বাজারমুখী উচ্চশিক্ষার বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে কৌশলপত্রে। কৌশলপত্রের সুপারিশকৃত বিষয় সম্পর্কে ১৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘তথ্য ও প্রযুক্তি বিদ্যা, ব্যবসা ও শিল্প বিষয়ে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে গেছে। কিন্তু এই নতুন শিক্ষা খাতের তুলনায় মানবিক শাখার কোনো ভবিষ্যৎই নেই।’ মানবিক ও বিজ্ঞান শিক্ষার ভবিষ্যৎ না থাকায় কৌশলপত্রের অন্যত্র বলা হয়েছে মৌলিক বিজ্ঞান, সাহিত্য (বাংলা ও ইংরেজি), দর্শন, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্বের মতো মৌলিক বিষয়গুলো উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ পড়ে যাবে।
বাংলাদেশের মূলনীতির সঙ্গে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণবিষয়টি সাংঘর্ষিক। তবু দিন দিন বাড়ছে উচ্চশিক্ষার ব্যয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে শিক্ষার ব্যয় ও শিক্ষা উপকরণ। ক্রমশ শিক্ষা হয়ে উঠছে ব্যবসা ও বিনিয়োগের অন্যতম ক্ষেত্র। শিক্ষা খাতে সব থেকে বড় বিনিয়োগকারী ও পরামর্শদাতার নাম বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের অর্থ ও পরামর্শে তৈরি করা হয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষার রূপরেখা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কৌশলপত্র তৈরি করেছেন আমাদের দেশেরই বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যে ইউজিসি চুপিসারে এ কৌশলপত্রটি পেশ করেছে সরকারের কাছে। অতি নীরবে দেওয়া এ কৌশলপত্রের সুপারিশ অনুযায়ী ইতিমধ্যে চলতে শুরু করেছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

আবাসিক হল নির্মাণ করা হবে না

আবাসিক হলগুলোকে ছাত্র আন্দোলনের কারণ হিসেবে কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ছাত্র আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন করে আবাসিক হল নির্মাণ না করার সুপারিশ করা হয়েছে এ কৌশলপত্রে। কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ‘অধিকসংখ্যক আবাসিক হল সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করে।’
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হলে মাত্র ৪৩ দশমিক ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পায়। এর বাইরে সব শিক্ষার্থীকে শহরে উচ্চমূল্যে বাড়ি ভাড়া অথবা পরিবারের সঙ্গে থাকতে হয়। ফলে একাডেমিক সময়ের বাইরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়।
এ সম্পর্কে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ফখরুদ্দিন কবির আতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আবাসিক হলগুলোতে কম খরচে থাকা-খাওয়ার যে ব্যবস্থা, তা না থাকলে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কঠিন হবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন উরংপরঢ়ষরহব-এর শিক্ষার্থীদের একত্র অবস্থান ও পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে চিন্তার প্রবাহ ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ হবে। সন্ত্রাসীরা অবস্থান করে এ জন্য যদি হল বন্ধ করে দিতে হয়, তাহলে চুরির জন্য চোরকে দায়ী না করে গৃহস্থকে শাস্তি দিতে হবে। শাসকগোষ্ঠীর জন্য এই প্রস্তাব অত্যন্ত সুবিধাজনক, কারণ তারা চায় শিক্ষার্থীরা যেন বিচ্ছিন্ন থাকে, সংগঠিত হতে না পারে।’
নিয়ন্ত্রণে থাকবে ক্যাম্পাস পুলিশ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যাম্পাস পুলিশ রাখার বিধান করার সুপারিশ করা হয়েছে। কৌশলপত্রের সুপারিশ মতে, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করা উচিত। ক্যাম্পাস পুলিশ প্রক্টর অফিসের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। এই ক্যাম্পাস পুলিশের নেতৃত্বে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ছাত্র ও সংস্কৃতির নয়া সেতুর কর্মী নিত্যানন্দ পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাকিস্তানের আইয়ুব শাসনামলে এনএসএফ নামের সরকারি মাস্তান বাহিনী ছিল। তারা শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচার করত। বর্তমানে যে সন্ত্রাস কায়েম করে রেখেছে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন। ক্যাম্পাস পুলিশের সঙ্গে এদের পার্থক্য হলো এরা মাস্তানি করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগদ অর্থ পাবে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আসলে তার সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের কতৃত্ব হারাবে।

বিনিয়োগকারীর নাম বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সব ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়ে থাকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ নষ্ট হয়। নব্বই পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংক সেবা খাতকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নানাভাবে অব্যাহত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংক-বীমার মতো সেবা খাতগুলো একের পর বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এত কিছুর পরও বিশ্বব্যাংকের চাপ কমেনি। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য দেশের সরকারগুলোর ওপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্রের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের এত দিনের লক্ষ্য পূরণ হতে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্র বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক গত বছরের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৬৭ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা চুক্তি করেছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ নেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে তবু সরকারি অনুদান

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থের অভাবে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসন সমাস্যা তীব্র, পরিবহন নেই বললেই চলে, গবেষণা বন্ধ হয়ে আছে মাসের পর মাস। সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ বলছে, শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে পারছে না সরকার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান দিন দিন নিম্নগামী হচ্ছে। এই সুযোগে অধিক অর্থ নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে যা গড়ে উঠছে তার সঙ্গে প্রকৃত উচ্চ শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা কোটি কোটি লাভের টাকা ঘরে তোলেন প্রতিবছর। সেই লাভের ওপর সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট আরোপ করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এসেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা ভ্যাটের বাড়তি অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করার ঘোষণা দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত করে। সরকারও বাধ্য হয় ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের বাধ্য করা হয়নি যে ভ্যাট বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়তি কোনো অর্থ আদায় করা যাবে না। উল্টো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঋণ করে আনা শত শত কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে সরকার। একদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অর্থের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম, অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তুকিকে কোনো অর্থেই ভালোভাবে দেখছেন না শিক্ষার্থীরা। জনগণের করের টাকায় চলবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অংশ_এমনই অভিযোগ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্র সংগঠনগুলোর। মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশেও রয়েছে এ ধরনেরই ইঙ্গিত, সরকার সফলতার ভিত্তিতে বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে পারে। ২৩ অক্টোবর ২০০৮, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে একনেকের এক বৈঠকে হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (এইচইকিউইপি) নামের একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ৬৮১ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্পের অর্থ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মান উন্নয়নের জন্যও ব্যয় করা হবে। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটির ৮৮ শতাংশ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রকল্প অনুযায়ী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্যিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিশ্বব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে আনা অর্থ ভর্তুকি পাবে। এদিকে অর্থের অভাবে যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিক হল নির্মাণ, পরিবহন সংকট ও প্রয়োজনীয় গবেষণার যন্ত্রপাতির অভাবে শিক্ষার মান নিম্নগামী, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তুকি দেওয়াটা কতটা যুক্তিসঙ্গত_তা নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে এটা সত্য যে, সরকার চেষ্টা করলেও ভ্যাট কখনোই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায় করতে পারবে না। কারণ ভ্যাট সব সময় ক্রেতারাই দিয়ে থাকেন। যখনই ভ্যাটের কথা আসবে তখন কোন না কোনভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা শিক্ষার্থীর উপর চাপিয়ে দিবেন। এ বছর না দিলেও তা সামনের বছর দিবেন। তখন আর আজকের মত আন্দোলনও জমানো যাবে না। ফলে ছাত্রদের শেষ পর্যন্ত ভ্যাটই দিতে হবে।
অকার্যকর হবে ‘৭৩ অধ্যাদেশ
বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনের বিলুপ্তি ঘটবে

মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্র প্রণয়ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন পুরোপুরি খর্ব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। ভিসি নিয়োগ করবে সার্চর্ কমিটি। সাবেক ভিসি, শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক নিয়ে তৈরি হবে সার্চ কমিটি। কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে সার্চর্ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগ হলে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা যাবে।
মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম, রিসার্চের বিষয় ঠিক করে দেবে ব্যবসায়ী, আমলা, এনজিওবিদরা। শিক্ষাবিদদের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি চলে যাবে আমলা, ব্যবসায়ী, এনজিওবিদদের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বলে আর কিছু থাকবে না। শিক্ষার্থী তৈরি হবে এনজিওবিদ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হলে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ লঙ্ঘিত হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নষ্ট হবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সুপারিশ

মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্রে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। মঞ্জুরি কমিশনের রিপোর্ট মতে, ‘ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক থাকায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট করে।’ তবে মঞ্জুরি কমিশনের ছাত্ররাজনীতি বন্ধের আসল কারণ জানা গেছে কৌশলপত্রের অন্য একটি বক্তব্যের মাধ্যমে। ওই বক্তব্যে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলের ছাত্র নেতৃবৃন্দের জোরালো প্রতিবাদের কারণে বেতন-ফি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ছাত্ররাজনীতি থাকলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনোভাবেই বেতন-ফি বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কৌশলপত্রের নির্মাতারা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির

দেশের উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্র প্রণেতাদের অধিকাংশ এনজিও কর্মী, সাবেক আমলা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এম শমসের আলী, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের চেয়ারম্যান এম সবুর খান ও ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম হায়দারের মতো ব্যক্তিরা। যারা অধিকাংশই ব্যবসায়ী। তার চেয়ে অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ওই বিশ্ববিদ্যায়গুলোর অনুমোদন বাতিল করতে সুপারিশ করেছে দুদক। শুধু দুদকই নয়, মঞ্জুরি কমিশনও সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষকের অভাব, লাইব্রেরি, গবেষণা, নিজস্ব ক্যাম্পাসসহ অন্যান্য অবকাঠামোর অভাবে এসব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। তবে উচ্চ আদালতের সাময়িক আদেশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে চালাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। এমনকি কৌশলপত্র প্রণয়নে এমন কয়েকজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে রাখা হয়েছে, যাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইউজিসি সমপ্রতি কালো তালিকাভুক্ত করেছে এবং সেখানে উচ্চ শিক্ষাদানের কোনো পরিবেশ নেই বলে মন্তব্য করেছেন।

কৌশলপত্রের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের এ পর্যন্ত সব শিক্ষানীতি মানুষের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করায় তা বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ মেনে নেয়নি। সে কারণেই শিক্ষানীতিগুলো ব্যর্থ হয়েছে, কার্যকর হতে পারেনি। মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্র আগামীতে শিক্ষাক্ষেত্রে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেবে তা অতীত দেখে সহজেই বলা যায়। মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্র পুরোপুরি বাস্তবায়িত হোক বা না হোক, শিক্ষার ব্যয়ভার দিন দিন যে হারে বাড়ছে তাতে এমনিতেই গরিব মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা যেকোনো সময়ের থেকে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর এর মাঝে যদি মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্র বাস্তবায়িত হয়, তবে মধ্যবিত্তের ওপরে নেমে আসবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ বৃহস্পতিবার রাতে ধানমণ্ডিতে ছাত্রলীগের গুণ্ডারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালিয়েছে।

দুনীতিবাজদের রক্ষক অসফল অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব এবার থামেন

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভ্যাট ছাত্ররা দিবে। অর্থমন্ত্রীর দরকার টাকা। তিনি টাকা ছাড়া কিছুই চেনেন না। কিন্তু তিনি দেশের ৩০ হাজার কোটি টাকা গত মাত্র ৬ বছরে লোপাট হতে দিয়েছেন। তাতে তার মনে হয় নি দেশের ক্ষতি হচ্ছে। তো এতো টাকা যদি সরকারি দলের লোকেরা লোপাট করে তাহলে শিক্ষার্থীদের উপরতো কিছু চাপ যাবেই।

আসুন হিসেবটা একটু মিলিয়ে নেই। দেশে বর্তমােন খেলাপি ঋণের পরিমান ৫৪ হাজার ৬৫৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অথচ ২০০৯ সােল যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতা তখন এর পরিমান ছিলো ২২ হাজার ৪৮১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। মাত্র ছয় বছরে খেলাপি ঋণের সংখ্যা দ্বিগুন হয়েছে। সূত্র দৈনিক প্রথম আলো, ২৯ জুন ২০১৫
এর সোজা অর্থ হোল স্বাধীনতার ৪৪ বছরে যত লুটপাট হয়েছে গত ছয় বছরেই তার তুলনায় বেশি আত্মস্মাৎ হয়েছে দেশের টাকা।

আর কে না জানে, সরকারী রাজনীতির প্রভাব না থাকলে ব্যাংক থেকে কোটি টাকা ঋণ নেয়া সম্ভব নয়। এসব অর্থ ব্যাংক থেকে সরিয়ে নিয়েছে দেশের সরকারি দলের লোক ও সরকার সমর্থীত ব্যবসায়ীরা। হলমার্ক বা বিসমিল্লাহ গ্রুপ তার অন্যতম উদাহরণ।
আর একটু জেনে নিন। মোট ঋণের ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ খেলাপি মানে ১০০ টাকা যদি ঋণ থাকে ব্যাংকের তাহলে ব্যাংক ১০ টাকা কোনদিনই বাজার থেকে তুলতে পারছে না। এর সবই প্রায় সরকার নিয়ন্ত্রীত ব্যাংক যার আবার কর্ণধর হলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
এর বাইরে আরেকটা গোপন হিসাব আছে। এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো নিজেদের হিসাবের খাতা পরিষ্কার রাখতে ৩৬ হাজার ৯৭০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা রাইট-অফ বা অবলোপন করেছে। অর্থাৎ এই পরিমাণ অর্থ আর খেলাপি ঋণ হিসাবে দেখানো হচ্ছে না। এর মধ্যে কেবল ২০১১ সাল পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার ৮৪৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সুতরাং এই অর্থ যোগ করলে খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
তার মানে স্রেফ রাষ্ট্রের টাকা জনগণের টাকা এরা ঝেড়ে দিয়েছেন।
শিক্ষা কোন পণ্য নয় এটা আমি বলছি না, দেশের সংবিধান বলছে। কেবল পন্যের উপরই ভ্যাট বসাতে পারেন।
আগে চুরি বন্ধ করুন। ৩০ হাজার কোটি টাকা যে ব্যাংক সাবাড় করে নিয়েছে তা ফেরত আনুন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এক অসাধারণ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন। আপনারা এগিয়ে যান। এ দেশে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বিরোধী আন্দোলনের বিশাল ঐতিহ্য আছে। পাকিস্তান আমল থেকে আমরা লড়ছি একটি বৈষম্যহীণ গণতান্ত্রিক একমুখী শিক্ষার জন্য। এ জন্য এ দেশের ছাত্ররা রক্তও দিয়েছে। আশা করি ইতিহাস আপনাদের পক্ষে যাবে। আপনাদের সাথে শুধু আমি নই, আমার মত কোটি মানুষ সাথে আছে। এবার দয়া করে আবুল সাহেব আপনি অফ যান। স্বৈরাচার এরশাদের মন্ত্রী ছিলেন আপনি, আপনাকে আমাদের চেনা আছে।
সরকার ছাত্র আন্দোলনকে কতখানি ভয় পায় তা এনবিআরের তড়িঘড়ি করে দেয়া প্রেস রিলিজটাই বড় প্রমান। তারা বলছে, এটা দিবে বিশ্ববিদ্যালয় আর এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ কোন ব্যয় বাড়াতে পারবে না। কী হাস্যকর কথা। এ যেনো মামা বাড়ির আবদার। প্রতি বছরইই যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যয় বাড়ায় আপনারা দেখেন না? চোখে কি সিমেন্টের চশমা দেন?
যেখানে ৩০ টাকার সিএনজিতে ৫ টাকা বাড়ে তখন সিএনিজ ভাড়া বেড়ে যায় ঠিক দুই গুন। দেশের সরকারগুলোকে আমাদের চেনা আছে। মুখ বন্ধ রাখুন। কথা বের হলেই দুগন্ধ বের হচ্ছে। কিন্তু আপনি সেটা টের পাচ্ছেন না।
এনবিআর কি দেশের সব মানুষকে গাড়ল মনে করে? ঐতএব যে আগুন জ্বলেছে তা হাঠাৎ নিবভে না। যতক্ষণ না সরকার সুবোধ বালকের মত এসে বলে, বাবা মায়েরা আমাদের ভুল হয়েছে। আপনারা আমাদের চরম শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা ভ্যাট নিবো না । শিক্ষায় কোন ভ্যাট দেয়ার দরকার হবে না।’ ততোক্ষণ এ আন্দোলনের আগুন থামাও উচিত না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “উচ্চ শিক্ষায় বিশ্বব্যাংকের আগ্রাসন এবং আজকের ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন

  1. শিক্ষা ক্ষেত্রে বাণিজ্য বন্ধ
    শিক্ষা ক্ষেত্রে বাণিজ্য বন্ধ করুণ,,,,
    রক্তের গঙ্গা বইবে আবার,,,,
    আর হে বিঙ্গান আর মানবিক বিভাগ অপ্রয়োজন,,, হি হি সব গাঞ্জা খোর,,,, হীরক রাজার দেশ পরিণত করতে চাও বাংলাকে??? কোনদিনও সম্ভাম নয়।। আমরা বিএনপি নই, আমরা জামাত নই, শিবির নই, আ’লীগ নই, আমরা অন্য কোনো দল নই, আমরা ছাত্র, আমরা ছাত্র, আমাদের দমানোর মত অস্র পৃথিবীতে সৃষ্টি হয় নাই।

  2. তুহিন ভাইয়ের এই লেখাটি আমি
    তুহিন ভাইয়ের এই লেখাটি আমি আগেও পড়েছিলাম 🙂 ধন্যবাদ সঠিক সময়ে আবারও পোষ্ট করার জন্য :থাম্বসআপ:
    যে আন্দোলন চলছে তাতে এর ফলাফল কী হবে বুঝতে পারছি না!
    কারণ–
    (১) এর মধ্যেই বিভক্তি চলে এসেছে।
    (২) ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে আন্দোলন করবে। এতে সরকারের টনক নড়বে কিনা এ নিয়ে সন্দিহান।
    (৩) আন্দোলনের প্রধান যারা সৈনিক তাদের পূব‍র্ আন্দোলনের অভিজ্ঞতার অভাব।
    (৪) কোন সংসঠনিক অভিজ্ঞতা নেই।

    এসব ব্যপার চিন্তা করে ভবিষ্যত খুজে পাচ্ছি না :চিন্তায়আছি:
    সরকারের কুট কৌশেলর সামনে টিকতে পারবেতো ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলনরত এই অনভিজ্ঞ ছাত্ররা?? :কনফিউজড:

  3. এই আন্দোলও সরকার ঘিলে ফেলছে।
    এই আন্দোলও সরকার ঘিলে ফেলছে। ঠান্ডা হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। সঠিক নেতা ও নেতৃত্বের অভাবে এভাবেই ক্ষমতাসীনরা একের পর এক ফ্যাসিস্ট আচরণ করে যাবে। আমরা নির্বিকার হয়ে শুধু দেখব।

  4. েইতি মধ্যেই দুই ভাগে ভাগ করা
    েইতি মধ্যেই দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে গেছে….েআর বেশিক্ষন চলবেনা……..আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি এই আন্দোলনের কোন রিজাল্ট হবে না……….

    http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/629386/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

11 + = 19