মার্কসবাদ ও জাতি সমস্যা | জে. ভি. স্ট্যালিন

[প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল ১৯১২ সালের শেষ ও ১৯১৩ সালের শুরুতে, ভিয়েনা শহরে। বলশেভিক সাময়িকপত্র প্রোভেশ্চিনিয়ে’র ১৯১৩ সালের ৩য়-৫ম সংখ্যায় “জাতি সমস্যা ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি” শিরোনামে এটি প্রথম মূদ্রিত হয়। লেখক ছিলেন জে. ভি. স্ট্যালিন (যোসেফ ভিসারিওভিচ যুগাশিভিলি)। ধনবাদী দুনিয়া আজ কমরেড স্ট্যালিনকে হিটলারের প্রতিচ্ছবি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত। যদিও কমরেড স্ট্যালিনই হিটলারের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এবং সেই মহাযুদ্ধে জনগণের বীরত্বের ফলে তারা জয়লাভও করেছেন। আজ সমাজতান্ত্রিক শক্তির অনুপস্থিতি এবং সোভিয়েত শোধনবাদীদের অপপ্রচারের ফলে কমরেড স্ট্যালিন সম্পর্কে এমন একটা ধারণা গড়ে তোলা সহজ হয়েছে। যদিও বাস্তবে কমরেড স্ট্যালিন ছিলেন মার্কসবাদী দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম। তার অতীব গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক রচনাগুলোর মধ্যে জাতি সমস্যা বিষয়ক প্রবন্ধগুলো বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বিষয়বস্তুর গভীরে গেলেই পাঠক সে সম্পর্কে ধারণা পাবেন।

কমরেড স্ট্যালিন রচিত জাতি সমস্যা সম্পর্কিত এই প্রবন্ধ সম্পর্কে ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গোর্কির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে কমরেড লেনিন লেখেন, ‘আমরা একজন চমৎকার জর্জীয়কে পেয়েছি যিনি প্রোভেশ্চিনিয়ে’র জন্য একটা বড় প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেছেন এবং অস্ট্রীয় ও অন্যান্য সমস্ত উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন।’ নিবন্ধটি প্রকাশের পর, ১৯১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর সোৎশিয়াল দেমোক্রাৎ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আরএসডিএলপি-এর জাতি সম্পর্কিত কর্মসূচী’ শীর্ষক নিবন্ধে লেনিন এই প্রবন্ধের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ওই সময়ে যেসব কারণে জাতি সমস্যার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল সে প্রসঙ্গের উল্লেখ করে লেনিন মন্তব্য করেন, ‘এই অবস্থা-পরিস্থিতি ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের জাতি সমস্যা সম্পর্কিত কর্মসূচীর নীতিমালা নিয়ে সম্প্রতি মার্কসীয় সাহিত্যে বিভিন্ন লেখালেখি হয়েছে (এখানে অবশ্যই সর্বাগ্রে স্থান দিতে হবে স্ট্যালিনের নিবন্ধকে)’।

১৯১৪ সালে সেন্ট পিটার্সবুর্গে প্রিবয় পাবলিশিং হাউস মার্কসবাদ ও জাতিসমস্যা শিরোনামে আলাদা পুস্তক হিসাবে এটা প্রকাশ করে। যা পরবর্তীতে ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স থেকে প্রকাশ হয় ২০০৭ সালে। ১৯৪৭ সালে মস্কোর বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয় কর্তৃক প্রকাশিত মূল ইংরেজী সংস্করণ থেকে এটি অনুবাদ করেছেন সেরাজুল আনোয়ার। আসুন পাঠক, জাতি সমস্যা সম্পর্কিত মার্কসীয় চিরায়ত সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হই।]

 

ভূমিকা
রুশিয়ায় প্রতিবিপ্লবের আমলটি তার ঘটনাপর্বের মধ্যে শুধুমাত্র ‘বজ্র ও বিদ্যুতের’ সম্পাতই ঘটালো না, বরং নিয়ে এলো আন্দোলনের ব্যাপারে মোহমুক্তি ও সাধারণ শক্তিগুলোর ওপর আস্থার অভাবও। যে পর্যন্ত ‘এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের’ ব্যাপারে জনগণ ছিল আস্থাবান, সে পর্যন্ত জাতিসত্তা নির্বিশেষে তারা পাশাপাশি থেকেই লড়াই করেছিল- অভিন্ন প্রশ্নগুলিই ছিল প্রথমে ও সর্বাগ্রে! কিন্তু জনমানসে যখন চুপিসারে ঢুকে পড়লো সন্দেহ-অবিশ্বাস, তারা যার যার নিজস্ব জাতীয় শিবিরে সরে যেতে শুরু করলো। প্রত্যেক লোক নিজের কথাই ভাবুক! ‘জাতীয় প্রশ্নই প্রথমে ও সর্বাগ্রে!’

একই সমযে দেশের অর্থনৈতিক জীবনে এক সুগভীর আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে চলেছিল। ১৯০৫-এর বছরটি ব্যর্থ প্রতিপন্ন হয়নি- গ্রামাঞ্চলের ভূমিদাস প্রথার অবশেষের ওপর আরেকটি বড় আঘাত হানা হয়েছিল। দুর্ভিক্ষের বছরগুলোর পর যে পর্যায়ক্রমিক ভাল ফসলগুলো উঠলো, আর যে শিল্পসমৃদ্ধির জোয়ার সেটাকে অনুগমন করলো, তা পুঁজিবাদের প্রসারকে আরো এগিয়ে নিল। গ্রামাঞ্চলে শ্রেণীবিভাজন, শহরের বৃদ্ধি, ব্যবসা বাণিজ্যের ও যোগাযোগের উপায়গুলোর বিকাশ -সবকিছুই বিরাট পদক্ষেপে এগিয়ে গেল। এটা বিশেষ করে ঘটলো সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে। আর সেটা রুশিয়ার জাতিসত্তাসমূহের অর্থনৈতিক সংহতকরণের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত না করে পারলো না।

ওই সময়ে ‘সাংবিধানিক সরকারও’ কর্মকাণ্ড চালালো জাতিসত্তাগুলোকে জাগিয়ে তোলার একই অভিমুখে। সাধারণভাবে সংবাদপত্র ও সাহিত্যের বিস্তার, পত্র-পত্রিকা ও সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোর নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতা, জাতীয় নাট্যমঞ্চের সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্ত কিছুই নিঃসন্দেহে ‘জাতীয় ভাবাবেগ’ জোরদার করায় সহায়তা করলো। নির্বাচনী প্রচারাভিযান ও রাজনৈতিক দল-গ্রুপ সহ ‘দুমা’ (রুশ পার্লামেন্ট) নতুন সুযোগ সৃষ্টি করলো জাতিসমূহের বৃহত্তর সক্রিয়তা বৃদ্ধির এবং তাদের সমাবেশ সাধনের জন্যে যোগান দিল নতুন ও প্রশস্ত ক্ষেত্রের।

আর উপরের স্তরে জঙ্গী জাতীয়তাবাদের উত্তাল প্রবাহ এবং নিজেদের ‘স্বাধীনতাপ্রীতির’ জন্যে সীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চলগুলোর উপর প্রতিশোধ স্পৃহায় ‘ক্ষমতাসীনদের’ দ্বারা গৃহীত নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাদি নিচুতলা থেকে জাতীয়তাবাদের এক পাল্টা প্রবাহ জাগিয়ে তুললো। ইহুদীদের মধ্যে ‘জায়নবাদের’ বিস্তার, পোল্যাণ্ডে উগ্র জাত্যাভিমানের বিকাশ, তাতারদের মধ্যে প্যান ইসলামিজম, আর্মেনীয়, জর্জীয় ও ইউক্রেনীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বিস্তার… এই সবকিছুই সাধারণভাবে জানা বাস্তব ঘটনা।

জাতীয়তাবাদের জোয়ার ক্রমবর্ধমান শক্তিমত্তা সহকারে সম্মুখপানে ধেয়ে চললো, সৃষ্টি করলো ব্যাপক শ্রমিক-সাধারণকে গ্রাস করে ফেলার বিপদ। আর শ্রেণীমুক্তির আন্দোলন যত হ্রাস পেতে থাকলো, নানা রূপের জাতীয়তাবাদ তত বেশি তার ডালপালাসহ প্রস্ফূটিত হতে লাগলো।

এই বিপত্তিময় সময়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির সামনে উপস্থিত হলো এক মহান ব্রত- জাতীয়তাবাদকে প্রতিহত করা আর এই সাধারণ ‘মহামারী’ থেকে ব্যাপক জনগণকে রক্ষা করা। কারণ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি, একমাত্র সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসিই তা করতে পারতো- করতে পারতো আন্তর্জাতিকতাবাদের পরীক্ষিত অস্ত্র দ্বারা, শ্রেণীসংগ্রামের ঐক্য ও অখণ্ডনীয়তা দ্বারা জাতীয়তাবাদকে রুখে দাঁড়াতে। আর যতই শক্তিমত্তা সহকারে জাতীয়তাবাদের প্রবাহ এগিয়ে যাচ্ছিল,ততই রাশিয়ার সবগুলো জাতিসত্তার সর্বহারাদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের সপক্ষে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির আহ্বানকে হতে হতো আরো অধিক উচ্চকণ্ঠ। আর এ সম্পর্কে সীমান্ত অঞ্চলগুলোর সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সংযোগ সংস্পর্শেই গিয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু সমস্ত সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরাই এই কর্তব্যের উপযোগী বলে নিজেদের প্রমাণ করতে পারলেন না আর এটা বিশেষভাবেই প্রযুক্ত ছিলো সীমান্ত অঞ্চলের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে।…
কিন্তু এ থেকে এটাই বেরিয়ে আসছে যে, জাতি সমস্যা প্রসঙ্গে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির মতামত সমস্ত সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিদের কাছে এখনও পরিষ্কার নয়।

এটা স্বতঃস্পষ্ট যে, জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও বোধগম্য আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সুসঙ্গত সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদেরকে অতি অবশ্যই জাতীয়তাবাদের ধূম্রজালের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় ও ক্লান্তিহীন লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, সেই জাতীয়তাবাদ যে মহল থেকেই উদ্ভূত হোক না কেন।।

প্রথম অধ্যায় : জাতি*

জাতি কি?
জাতি হচ্ছে প্রথমত: একটি জনসমষ্টি (কমিউনিটি), একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টি (এ ডেফিনিট কমিউনিটি অব পিপল)। এই জনসমষ্টি জনগোষ্ঠী বা জনধারাগত (রেশিয়্যাল) নয়, কিংবা গোত্রগতও (ট্রাইবেল) নয়। আধুনিক ইটালিয়ান জাতি সংগঠিত হয়েছিলো রোমান, টিউটন, এট্রুস্কান, গ্রীক, আরব ও অন্যান্যদের থেকে। গল, রোমান, ব্রিটন, টিউটন প্রভৃতি থেকে হয়েছিলো ফরাসী জাতি। ব্রিটিশ, জার্মান এবং অন্যান্যদের সম্পর্কে বলতে গেলেও একই কথা প্রযোজ্য; তারাও বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও গোত্রের লোক মিলিয়ে এক একটি জাতিতে সংগঠিত হয়েছিলো।
এভাবে, জাতি জনগোষ্ঠী বা গোত্রগত জনসমষ্টি নয়, বরং তা হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে সংগঠিত একটি জনসমষ্টি (হিষ্টরিক্যালী কনস্টিটিউটেড কমিউনিটি অব পিপল)।

পক্ষান্তরে, যদিও সাইরাস ও আলেকজান্ডারের বিরাট সাম্রাজ্যগুলো ঐতিহাসিকভাবে সংগঠিত হয়েছিলো এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও গোত্র থেকেই গড়ে উঠেছিল, তথাপি এটা প্রশ্নাতীত যে সেইসব সাম্রাজ্যগুলোকে জাতি বলা যায় না। সেগুলো জাতি ছিলো না, বরং সেগুলো ছিলো আকস্মিক ও আলগাভাবে সংযুক্ত কতকগুলো একত্রীভূত গ্রুপ, যারা অমুক বা তমুক দিগ্বিজয়ীর জয় বা পরাজয়ের উপর নির্ভরে করে আলাদা হয়ে পড়তো বা একত্রে যুক্ত হতো।
এভাবে আকস্মিক বা ক্ষণস্থায়ী একত্রীভবনে (কঙলোমারেশন) জাতি হয় না, বরং তা হচ্ছে জনগণের একটা স্থায়ী জনসমষ্টি।

কিন্তু প্রত্যেকটি স্থায়ী জনসমষ্টিই যে জাতি গঠন করে তা নয়। অষ্ট্রিয়া এবং রুশিয়াও স্থায়ী জনসমষ্টি, কিন্তু কেউ তাদের জাতি বলে না। জাতীয় জনসমষ্টির সঙ্গে রাজনৈতিক (অর্থাৎ রাষ্ট্র্রীয়) জনসমষ্টির বা রাষ্ট্রের পার্থক্য কিসে নির্ধারিত হয়? অন্যান্য দিক বাদ দিলেও ব্যাপারটি হচ্ছে এই যে, একটি সাধারণ ভাষা ছাড়া জাতীয় জনসমষ্টির কথা চিন্তা করা যায় না, যদিও একই রাষ্ট্রে একই সাধারণ ভাষার আবশ্যকতা খুব একটা জরুরী নয়। অষ্ট্রিয়াতে চেক জাতি ও রুশিয়াতে পোল জাতির প্রত্যেকের যদি এক-একটা সাধারণ ভাষা না থাকতো তবে তাদের জাতি হিসেবে ধরা সম্ভবই হতো না, পক্ষান্তরে তাদের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে কয়েকটি বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত থাকা সত্ত্বেও রুশিয়া এবং অষ্ট্রিয়ার অখণ্ডত্ব ক্ষুণ্ন হয় না। আমরা অবশ্য জনগণের কথ্য ভাষার কথাই বলছি, শাসকবর্গের সরকারি ভাষার কথা বলছি না।
এভাবে, একটি সাধারণ ভাষা হচ্ছে জাতির অন্যতম প্রকৃতি-নির্দেশক বৈশিষ্ট্য।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, সব সময় ও সব জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন জাতি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়ই কথা বলে, কিংবা যারাই এক ভাষায় কথা বলবে, তারাই অবশ্যম্ভাবীরূপে একই জাতি গঠন করবে। প্রত্যেক জাতির জন্যেই একটি সাধারণ ভাষা থাকবে, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জাতির জন্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা থাকা অপরিহার্য নয়। এমন কোনো জাতি নেই যারা একই সময়ে কয়েকটি ভাষায় কথা বলে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একই ভাষায় কথা বলছে এরূপ দুটো জাতি হতে পারবে না। ইংরেজ ও মার্কিনীরা একই ভাষায় কথা বলে, কিন্তু তারা একই জাতি গঠন করছে না। নরওয়েবাসী ও ডেনমার্ক সম্বন্ধে এবং ইংরেজ ও আইরিশদের সম্পর্কে এই কথা একইভাবে সত্য।

কিন্তু তাদের একই সাধারণ ভাষা থাকা সত্ত্বেও, উদাহরণস্বরূপ, কেন ইংরেজ ও মার্কিনীরা একই জাতি গঠন করছে না?
প্রথমত: যেহেতু তারা একত্রে বসবাস করছে না, বরং ভিন্ন ভিন্ন ভূখণ্ডেই তাদের বাস। রীতিবদ্ধ ও দীর্ঘকালব্যাপী সংস্রবের ফলে, পুরুষানুক্রমে জনগণের একত্রবাসের ফলেই শুধুমাত্র জাতি গঠিত হয়। কিন্তু একটি সাধারণ ভূখণ্ড না থাকলে দীর্ঘকাল ধরে জনগণ একত্রবাস করতে পারে না। ইংরেজ ও মার্কিনীরা আদিতে একই ভূখণ্ডে অর্থাৎ ইংল্যান্ডে বসবাস করতো, আর তখন তারা একই জাতি ছিলো। পরবর্তীকালে, ইংরেজদের এক অংশ ইংল্যান্ড থেকে এক নোতুন ভূখণ্ডে, অর্থাৎ আমেরিকায় পরবাসী হলো, আর সেখানে, সেই নোতুন ভূখণ্ডে, কালক্রমে, তারা নোতুন মার্কিন জাতিকে পরিণত হলো। ভূখণ্ডের ভিন্নতা জাতি গঠনের দিকে পরিচালিত করলো।
এভাবে, একটি সাধারণ ভূখণ্ড হচ্ছে জাতির অন্যতম প্রকৃতি-নিদের্শক বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু এটাই সব নয়। সাধারণ ভূখণ্ড থাকলেই জাতি সৃষ্টি হয় না। তার সাথে সাথে জাতির বিভিন্ন অংশগুলোকে একটি একক সমগ্রত্বের (এ সিঙ্গল হোল) মধ্যে গ্রথিত করার জন্যে এক অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বন্ধনের আবশ্যকতা রয়েছে। ইংল্যান্ড ও আমেরিকার মধ্যে এ ধরণের কোন বন্ধন নেই, আর তাই তারা দুটি ভিন্ন জাতি গঠন করছে। মার্কিনীদের মধ্যেকার শ্রমবিভাগ, যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ প্রভৃতির দরুণ আমেরিকার বিভিন্ন অংশ যদি একটি অর্থনৈতিক সমগ্রত্বের মধ্যে একত্রবন্ধনে আবদ্ধ না হতো তাহলে মার্কিনীরা নিজেরাও জাতি হিসাবে অভিহিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতো না।

উদাহরণস্বরূপ, জর্জীয়দের কথাই ধরুন। সংস্কারের পূর্বে জর্জীয়রা একটি সাধারণ ভূখণ্ডে বসবাস করতো, একই ভাষায় কথা বলতো। তৎসত্ত্বেও, যথার্থভাবে বলতে গেলে তারা একটা জাতি গঠন করছিলো না, কারণ, কয়েকটি অসংযুক্ত যুবরাজ শাসিত রাষ্ট্রে বিভক্ত থাকার দরুণ তারা একটি সাধারণ অর্থনৈতিক জীবনের সমভাগী হতে পারেনি; পরস্পরের বিরুদ্ধে পার্সি ও তুর্কদের সাহায্যে ডেকে এনে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং পরস্পর পরস্পরকে লুণ্ঠন করেছে। কোনো কোনো ভাগ্যবান রাজা কোনো কোনো সময় যুবরাজশাসিত এসব খণ্ডরাষ্ট্রগুলোর ক্ষণস্থায়ী ও আকষ্মিক সংযুক্তি সাধন করতে পারলেও তাতে বড়জোর বাহ্যিক প্রশাসনিক ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছিলো এবং যুবরাজদের খামখেয়ালীপনা ও কৃষকদের ঔদাসিন্যের দরুণ দ্রুতবেগে তা আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। অর্থনৈতিকভাবে সংযোগবিহীন জর্জিয়ায় এর অন্যথা হতে পারতো না।… ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে যখন ভূমিদাস ব্যবস্থার পতন ও দেশের অর্থনৈতিক জীবনের জন্ম, যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ ও পুঁজিবাদের উদ্ভবের ঘটনা জর্জিয়ার বিভিন্ন জেলার মধ্যে শ্রমবিভাগের পত্তন করলো, যুবরাজশাসিত রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে যখন তা সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ বিচূর্ণ করলো এবং একটি একক সমগ্রত্বের মধ্যে তাদেরকে আবদ্ধ করলো একমাত্র তখনই জাতি হিসেবে জর্জিয়ার আত্মপ্রকাশ ঘটলো। অন্যান্য যেসব জাতি সামন্ততান্ত্রিক স্তর পার হয়ে এসেছে এবং পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটিয়েছে তাদের সম্বন্ধেও একথা একইভাবে প্রযোজ্য।
এভাবে, একটি সাধারণ অর্থনৈতিক জীবন, অর্থনৈতিক সংযোগ (কোহিশন) জাতির অন্যতম প্রকৃতি-নির্দেশক বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু এটাও সব নয়। পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ ছাড়াও, জাতি গঠনকারী জনগণের নির্দিষ্ট আত্মিক গঠনকেও স্পেসিফিক স্পিরিচুয়াল কমপ্লেক্সন) অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। শুধুমাত্র জীবনযাত্রার অবস্থাতে নয়, বরং আত্মিক গঠনের দিক দিয়েও জাতিসমূহের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, যে পার্থক্য জাতীয় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যবোধক বিশেষত্বের মধ্যে প্রকাশিত হয়। ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও আয়ারল্যান্ড, যারা একই ভাষায় কথা বলে, তা সত্ত্বেও তারা যে পরিষ্কার তিনটি আলাদা জাতি তার জন্য- অস্তিত্বের অসম অবস্থার ফলে পুরুষানুক্রমে স্বাতন্ত্র্যবোধক যে বিশেষ মানসিক গড়ন (সাইকোলজিকেল মেকআপ) তারা বিকশিত করে তুলেছে- তাও কম দায়ী নয়।

অবশ্য, এই মানসিক গড়নকে, যাকে আবার ‘জাতীয় চরিত্র’ও বলা হয়ে থাকে, নিজস্ব দিক দিয়ে আলাদা করে দেখতে গেলে তার কোন সংজ্ঞা সামনে তুলে ধরা যায় না, কিন্তু যে পর্যন্ত জাতির মধ্যে সর্বব্যাপ্ত একটি বৈশিষ্ট্যমূলক সংস্কৃতির মধ্যে এটা রূপ লাভ করে সে পর্যন্ত এর সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব এবং এটাকে অস্বীকার করা যায় না। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, ‘জাতীয় চরিত্র’ চির নির্দিষ্ট কোন বিষয় নয়, বরং জীবনধারণের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এরও রূপান্তর ঘটে থাকে; কিন্তু যেহেতু প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট সময়ে এর অস্তিত্ব রয়েছে, তাই জাতির সাধারণ আকৃতির (ফিজিয়গনমি) উপর এর ছাপ বসে যায়।
এভাবে, একটি সাধারণ মানসিক গড়ন, যার নিজস্ব প্রকাশ একটা সাধারণ সংস্কৃতির ম্েযধ হয়ে থাকে, তাও জাতির অন্যতম প্রকৃতি-নির্দেশক বৈশিষ্ট্য।

আমরা এবার জাতির প্রকৃতি-নির্দেশক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আলোচনা শেষ করলাম। জাতি হচ্ছে একটি সাধারণ ভাষা, সাধারণ ভূখণ্ড, সাধারণ অর্থনৈতিক জীবন, আর একটি সাধারণ সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত মানসিক গড়নের ভিত্তিতে গঠিত, ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত জনগণের স্থায়ী জনসমষ্টি।

এটা বলাই বাহুল্য যে অন্যান্য প্রত্যেকটি ঐতিহাসিক ব্যাপারে মতো জাতিও পরিবর্তনের নিয়মের অধীন; জাতিরও ইতিহাস আছে, আরম্ভ আছে এবং শেষ আছে। জোর দিয়ে এটা অবশ্যই বলতে হবে যে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহের কোন একটিই আলাদাভাবে জাতির সংজ্ঞা নিরূপণের পক্ষে যথেষ্ট নয়। অপরপক্ষে, এইসব বৈশিষ্ট্য সমূহের কোন একটিরই অনুপস্থিতি কোন জাতিকে জাতি হিসাবে না ধরার পক্ষে যথেষ্ট।

সাধারণ ‘জাতীয় চরিত্রে’র অধিকারী লোক পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু যদি তারা অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়, ভিন্ন ভিন্ন ভূখণ্ডের অধিবাসী হয়, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে কিংবা ওইরকম আরো কিছু করে, তবে তারা একটি একক জাতি গঠন করছে- এটা বলা যায় না। উদারণস্বরূপ, রুশীয়, গ্যালিসীয়, মার্কিন, জর্জীয় এবং ককেশীয় ইহুদীরা হচ্ছে এরূপই, যারা আমাদের মতে, একটি একক জাতি গঠন করছে না। এমন লোকও পাওয়া যেতে পারে যাদের একই সাধারণ ভূখণ্ড ও সাধারণ অর্থনৈতিক জীবন রয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের কোন সাধারণ ভাষা এবং সাধারণ ‘জাতীয় চরিত্র’ না থাকার দরুণ তারা জাতি গঠন করছে- একথা বলা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, বাল্টিক অঞ্চলের জার্মান ও লেটরা এ ধরনেরই।

উপসংহারে বলা যায়, নরওয়েবাসী ও ডেনমার্কবাসীরা একই ভাষায় কথা বলে, কিন্তু অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসমূহের অনুস্থিতির দরুণ তারা এক জাতি গঠন করছে না। শুধুমাত্র এসব প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য যখন একত্রে বর্তমান থাকে তখনই কোন জনসমষ্টিকে আমরা জাতি বলতে পারি।…

দ্বিতীয় অধ্যায় : জাতীয় আন্দোলন

জাতি শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক বর্গ নয়, বরং তা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট যুগের অর্থাৎ উদীয়মান পুঁজিবাদের যুগের অন্তর্ভূক্ত ঐতিহাসিক বর্গ (এ হিস্টরিক্যাল ক্যাটিগরি বিলঙ্গিং টু এ ডেফিনিট ইপক্‌, দি ইপক্‌ অব রাইজিং ক্যাপিটালিজম)। সামন্তবাদের বিলুপ্তির প্রক্রিয়া এবং পুঁজিবাদের বিকাশের প্রক্রিয়াটি ছিল একই সঙ্গে জনগণের জাতিতে জাতিতে সম্মিলিত হওয়ারও প্রক্রিয়া। উদারণস্বরূপ বলতে গেলে, পশ্চিম ইউরোপের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ছিল এরূপই। পুঁজিবাদের বিজয়সূচক অগ্রগতির এবং সামন্ততান্ত্রিক অনৈক্যের ওপর পুঁজিবাদের বিজয় অর্জনের সময়েই ব্রিটিশ, ফরাসী, জার্মান, ইটালীয় ও অন্যরা নিজেদের জাতি হিসেবে সংগঠিত করে।

কিন্তু এসব উদাহরণের ক্ষেত্রে জাতিতে জাতিতে সংগঠিত হওয়ার কাজটি একই সঙ্গে স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্রে এদের রূপান্তরকেই সূচিত করে। ব্রিটিশ, ফরাসী এবং অন্যান্য জাতি একই সঙ্গে আবার ব্রিটিশ, ফরাসী ইত্যাদি রাষ্ট্রও বটে। আয়ারল্যান্ড এই প্রক্রিয়ায় সামিল হয়নি, কিন্তু তাতে সাধারণভাবে চিত্রটি বদলায়নি।

পূর্ব ইউরোপের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি কিয়ৎ পরিমাণে অন্যভাবে অগ্রসর হলো। পশ্চিম ইউরোপের জাতিসমূহ বিকশিত হলো রাষ্ট্রের দিকে, কিন্তু পূর্ব ইউরোপে গঠিত হলো বহুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র, বেশ কয়েকটি জাতিসত্তা নিয়ে গঠিত রাষ্ট্র। অষ্ট্রিয়া, হাঙ্গেরী ও রুশিয়া হচ্ছে এমন ধরণের রাষ্ট্র। অষ্ট্রিয়াতে দেখা গেল রাজনৈতিকভাবে জার্মানরাই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি অগ্রসর, আর তারাই সকল অষ্ট্রীয় জাতিসত্তাকে একটি রাষ্ট্রে সম্মিলিত করার ভার কাঁধে নিল। হাঙ্গেরীতে রাষ্ট্রীয় সংগঠনের জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল হাঙ্গেরীয় জাতিসত্তাগুলোর অন্তর্বস্তু ম্যাগিয়াররা আর তারাই হাঙ্গেরীকে ঐক্যবদ্ধ করলো। রুশিয়াতে জাতিসত্তাগুলোকে সংযুক্ত করার ভূমিকা পালন করলো বড় রুশরা, যাদের নেতা ছিল ঐতিহাসিকভাবে সংগঠিত, শক্তিশালী ও সুসংবদ্ধ অভিজাত সামরিক আমলাতন্ত্র।
পূর্ব ইউরোপের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এভাবেই অগ্রসর হলো। যেখানে সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তি তখনও সাধিত হয়নি, যেখানে পুঁজিবাদের বিকাশ ছিল দুর্বল, যেখানে পেছনে ঠেলে দেওয়া জাতিসত্তাগুলো তখনও অর্থনৈতিকভাবে নিজেদের অখণ্ড জাতিতে সংহত করতে সক্ষম হয়নি সেখানেই রাষ্ট্র গঠনের এই বিশেষ পদ্ধতি সংঘটিত হলো।

কিন্তু পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতেও পুঁজিবাদ বিকাশ লাভ করতে শুরু করলো। ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে লাগলো। বড় বড় শহর গজিয়ে উঠতে লাগলো। জাতিসমূহ অর্থনৈতিকভাবে সংহত হয়ে উঠছিল। পেছনে ঠেলে দেওয়া জাতিসত্তাগুলোর শান্ত জীবনে পুঁজিবাদ সবলে উৎক্ষিপ্ত হয়ে তাদের ঘুম ভাঙ্গাচ্ছিল এবং কর্মচঞ্চলতায় তৎপর করে তুলছিল। মুদ্রাযন্ত্র ও থিয়েটারের বিস্তার, রাইখশ্রাট (অষ্ট্রিযার পার্লামেন্ট) ও দুমা’র (রুশিয়ার পার্লামেন্ট) কর্মতৎপরতা ‘জাতীয় ভাবাবেগ’কে জোরদার করায় সাহায্য করছিল। নবোত্থিত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ‘জাতীয় ভাবধারায়’ অনুপ্রাণিত হয়ে উঠছিল এবং একই পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিল।…

কিন্তু পেছনে ঠেলে দেওয়া জাতিসমূহ এখন স্বাধীন জীবনে জাগরিত হলেও স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্রে নিজেদেরকে আর গড়ে তুলতে পারলো না; প্রভূত্বশীল যেসব জাতি বহুদিন আগেই কর্তৃত্ব জোর করে দখল করেছিলো সেসব জাতির শাসকস্তরের প্রচণ্ড প্রতিরোধ তাদের মোকাবেলা করতে হলো। তাদের ঘুম ভেঙ্গেছিলো বড় দেরীতে!…

এভাবে অষ্ট্রিয়াতে চেক, পোল ইত্যাদিরা নিজেদেরকে জাতি হিসেবে গঠন করলো; ক্রোয়াট ইত্যাদিরা করলো হাঙ্গেরীতে; রুশিয়াতে করলো লেট, লিথুয়ানীয়, ইউক্রেনীয়, জর্জীয়, আর্মেনীয় ইত্যাদিরা। পশ্চিম ইউরোপে যা ছিলো শুধু ব্যতিক্রম (আয়ারল্যান্ড) পূর্ব ইউরোপে সেটাই হলো নিয়ম। পশ্চিম ইউরোপে, নিজের ব্যতিক্রমমূলক অবস্থানের প্রতি আয়ারল্যান্ড জাতীয় আন্দোলন মারফতই প্রতিবাদ জানালো। পূর্ব ইউরোপে, নব জাগ্রত জাতি সমূহও একই ধারায় সাড়া দিতে বাধ্য হল। পশ্চিম ইউরোপের তরুণ জাতিগুলোকে যেসব ঘটনাবলী সংগ্রামের পতে ঠেলে দিলো সেগুলোর উৎপত্তি এভাবেই।

সংগ্রাম শুরু হলো এবং বাড়তে লাগলো- নিশ্চিতভাবেই, গোটা জাতির বিরুদ্ধে গোটা জাতির সংগ্রাম নয়, বরং প্রভূত্বশীল জাতি ও নিপীড়িত জাতির শাসকশ্রেণীসমূহের মধ্যেকার সংগ্রাম। সাধারণত প্রভূত্বশীল জাতির বড় বুর্জোয়াশ্রেণীর বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতির শহুরে পেটি-বুর্জোয়াশ্রেণীর দ্বারাই এই সংগ্রাম পরিচালিত হয়ে থাকে (যেমন, চেক ও জার্মান), কিংবা প্রভূত্বশীল জাতির জমিদারদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতির গ্রাম্য বুর্জোয়াশ্রেণীর দ্বারাই এই সংগ্রাম চলেছে (যেমন, পোল্যান্ডের ইউক্রেনীয়রা), অথবা প্রভূত্বশীল জাতির অভিজাত শাসকবর্গের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতির সমগ্র ‘জাতীয়’ বুর্জোয়াশ্রেণীর দ্বারাই এই সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে (যেমন, রুশিয়াতে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও ইউক্রেনে)।
বুর্জোয়াশ্রেণীই নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে।

তরুণ বুর্জোয়াশ্রেণীর জন্য প্রধান সমস্যা হচ্ছে বাজারের সমস্যা। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে নিজেদের মাল বিক্রি করা এবং অন্য জাতিসত্তার বুর্জোয়াশ্রেণীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে আসা। এই জন্যেই তাদের ‘স্বীয়’ বাজার অর্থাৎ নিজেদের ‘দেশীয়’ (হোম) বাজার দখল করার ইচ্ছা তাদের মধ্যে জাগ্রত হয়। বাজারই হচ্ছে প্রথম স্কুল যেখানে বুর্জোয়াশ্রেণী তাদের জাতীয়তাবাদের শিক্ষা লাভ করে (দি মার্কেট ইজ দি ফার্স্ট স্কুল ইন হুইচ দি বুর্জোয়াসি লার্নস ইটস ন্যাশনালিজম)।

কিন্তু ব্যাপারটা সাধারণত বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রভূত্বশীল জাতির আধাসামন্তবাদী, আধাবুর্জোয়া আমলাতন্ত্র তাদের ‘গ্রেপ্তার করা ও বাধা দান করার#’ নিজস্ব কর্মপন্থা সহকারে সংগ্রামে হস্তক্ষেপ করে। সংখ্যায় বেশীই হোক আর কমই হোক প্রভূত্বশীল জাতির বুর্জোয়ারা তাদের প্রতিযোগীদের সম্পর্কে অধিকতর ‘দ্রুততার সঙ্গে’ ও ‘স্থিরনিশ্চিতভাবে’ (সুইফটলি অ্যান্ড ডিসিসিভলি) ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম। ‘শক্তিসমূহ’ ঐক্যবদ্ধ করে ‘বিদেশী’ বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমিক নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, আর এই সব ব্যবস্থাই ক্রমে ক্রমে দমনমূলক কার্যকলাপে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্র থেকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়ে। যাতায়াতের স্বাধীনতায় বাধা আরোপ, ভাষার ওপর দমননীতি, ভোটের অধিকার হানি, স্কুল ইত্যাদি বন্ধ করা, ধর্মপালনে বাধানিষেধ এবং এমনি ধারা বহুকিছু ‘প্রতিযোগীদের’ ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য, এ ধরণের ব্যবস্থা শুধু যে প্রভূত্বশীল জাতির বুর্জোয়াশ্রেণী সমূহের স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই নেওয়া হয় তা নয়, বরং বলতে গেলে ক্ষমতাসীন আমলাতন্ত্রের সুনির্দিষ্ট কুলক্ষ্যকে আরও বাড়িয়ে তোলার জন্যেও। কিন্তু অর্জিত ফলাফলের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে গেলে এটা সম্পূর্ণই মূল্যহীন- এ ব্যাপারে বুর্জোয়াশ্রেণী ও আমলাতন্ত্র উভয়েই এক সঙ্গে চলে- তা সে অষ্ট্রিয়া, হাঙ্গেরীতেই হোক বা রুশিয়াতেই হোক।

চারিদিক দিয়ে উৎপীড়িত হয়ে নিপীড়িত জাতির বুর্জোয়াশ্রেণী স্বভাবতই আন্দোলনে চঞ্চল হয়ে ওঠে। তারা তাদের ‘স্বদেশী ভাইদের’ ব্যাপক অংশকে ডাক দেয়, ‘মাতৃভূমি, মাতৃভূমি’ বলে চীৎকার শুরু করে, দাবি করে যে তাদের নিজেদের উদ্দেশ্যই (কজ) সমগ্র জাতির উদ্দেশ্য। ‘মাতৃভূমির’ স্বার্থে ‘স্বদেশবাসীর’ মধ্য থেকে তারা নিজেরাই এক বাহিনী সংগ্রহ করে। ‘স্বদেশবাসী’ যে সবসময় সাড়া দেয় না তা নয়, তারা বুর্জোয়াশ্রেণীর পতাকার নীচে সমবেত হয়- ওপর থেকে আসা দমননীতির আঘাত তাদের ওপরও পড়ে এবং তাদের অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
এইভাবেই শুরু হয় জাতীয় আন্দোলন। জাতীয় আন্দোলনে জাতির ব্যাপক অংশ অর্থাৎ সর্বহারাশ্রেণী ও কৃষক সম্প্রদায় কি পরিমাণে যোগদান করছে তার দ্বারাই জাতীয় আন্দোলনের শক্তি নির্ধারিত হয়।

শ্রেণী বৈরিতার (ক্লাস এন্টাগোনিজম) বিকাশের পরিমাণ, সর্বহারাশ্রেণীর শ্রেণীসচেতনতা এবং সংগঠন-শক্তির পরিমাণের ওপরই নির্ভর করছে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে সর্বহারাশ্রেণী সমবেত হবে কি হবে না। শ্রেণীসচেতন সর্বহারাশ্রেণীর কাছে রয়েছে তাদের নিজস্ব পরীক্ষিত পতাকা, আর তাই বুর্জোয়া শ্রেণীর পতাকার নীচে থেকে যাত্রা শুরু করার কোন কারণ তাদের থাকতে পারে না।

কৃষকদের সম্পর্কে বলতে গেলে, জাতীয় আন্দোলনে তারা কতটুকু যোগ দেবে তা নির্ভর করছে নিপীড়নের চরিত্রের উপর। আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি যেমন ছিলো তেমনিভাবেই নিপীড়নমূলক কর্মনীতি যদি ‘জমি’কেও আঘাত করে তাহলে কৃষকদের ব্যাপক অংশ তৎক্ষণাৎই জাতীয় আন্দোলনের পতাকাতলে সমবেত হয়।

পক্ষান্তরে, উদারহরণস্বরূপ বলা যায়, জর্জিয়াতে রুশ-বিরোধী কোন মারাত্মক জাতীয়তাবাদ যে নেই তার কারণ প্রধানত এই যে, সেখানে কোন রুশ জমিদারশ্রেণী নেই বা কোন রুশীয় বড় বুর্জোয়া শ্রেণীও নেই যারা জনগণের মধ্যে এ ধরনের জাতীয়তাবাদের ইন্ধন যোগাবে। জর্জিয়াতে আর্মেনীয়-বিরোধী জাতীয়তাবাদ রয়েছে; তা কেবল এই কারণে যে সেখানে এখনও এক দল আর্মেনীয় বড় বুর্জোয়াশ্রেণী রয়েছে, যারা ক্ষুদ্র এবং এখনও অসংঘবদ্ধ জর্জীয় বুর্জোয়াদের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিয়ে শেষোক্তদেরকে আর্মেনীয়-বিরোধী জাতীয়তাবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এসব কারণের ওপর নির্ভর করে জাতীয় আন্দোলন হয় গণচরিত্র অর্জন করে এবং ক্রমশ বাড়তে থাকে (যেমন আয়ারল্যান্ড ও গ্যালিসিয়াতে), না হয় কয়েকটি ছোটখাটো সংঘর্ষে পরিবর্তিত হয় কলহ-বিবাদ আর সাইনবোর্ডের ‘লড়াইয়ে’ অধঃপতিত হয় (যেমন ঘটেছে বেহেমিয়ার ছোট ছোট কয়েকটি শহরে)।

অবশ্য, জাতীয় আন্দোলনের প্রকৃতি সব স্থানেই একই ধরণের হবে না- আন্দোলনের যেসব বিভিন্নমুখী দাবি-দাওয়া উঠছে তার দ্বারাই এটা সামগ্রিকভাবে নির্ধারিত হয়। আয়ারল্যান্ডে আন্দোলনটি ভূমি সংক্রান্ত চরিত্র ধারণ করছে। বোহেমিয়াতে ধারণ করছে ‘ভাষাগত’ চরিত্র, কোন জায়গায় দাবি হচ্ছে নাগরিক সমমর্যাদা (সিভিল ইকোয়েলিটি) এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার, অন্য জায়গায় জাতির ‘নিজস্ব’ সরকারী কর্মচারী, কিংবা নিজস্ব আইন পরিষদের দাবি। দাবি-দাওয়ার বিভিন্নতা প্রায়শই বিভিন্নমুখী বৈশিষ্ট্য উদঘাটিত করে দেয় যা সাধারণভাবে জাতিকে চিহ্নিত করে (যেমন ভাষা, ভূখন্ড ইত্যাদি)। এটা উল্লেখ করার মতো বিষয় যে বাউয়ারের সবদিক মেলানো ‘জাতীয় চরিত্রের’ সঙ্গে সম্পর্কীভূত কোন দাবির দেখা আমরা পাচ্ছি না। আর তা-ই স্বাভাবিক- কারণ আলাদা করে ধরলে ‘জাতীয় চরিত্র’ হচ্ছে একটা অস্পষ্ট বিষয়, আর জে. স্ট্রেসার সঠিকভাবে যেমন বলেছেন, ‘এর দ্বারা (অর্থাৎ জাতীয় চরিত্রের দ্বারা) কোন রাজনীতিকের করার কিছু নেই।’
সাধারণভাবে জাতীয় আন্দোলনের রূপ ও চরিত্র হচ্ছে এই রকমই।

যা বলা হলো তা থেকে বোঝা যাবে যে, উদীয়মান পুঁজিবাদের অবস্থায় জাতীয় সংগ্রামটি হচ্ছে বুর্জোয়াশ্রেণীগুলোর নিজেদের মধ্যকার সংগ্রাম। কোন কোন সময় বুর্জোয়াশ্রেণী সর্বহারাশ্রেণীকে জাতীয় আন্দোলনে টেনে আনতে সফলকাম হতে পারে, আর তখন বহিঃস্থ দিক দিয়ে জাতীয় সংগ্রাম একটা ‘জাতি-ব্যাপ্ত’ চরিত্র ধারণ করে। কিন্তু তা শুধু বাইরের দিক থেকেই। নিজস্ব অন্তর্বস্তুর দিক দিয়ে এটা সব সময়ই হচ্ছে বুর্জোয়াশ্রেণীর সংগ্রাম, যে সংগ্রাম প্রধানত বুর্জোয়াশ্রেণীর পক্ষেই সুবিধাজনক ও লাভজনক।
কিন্তু এ থেকে একথা বের হয়ে আসছে না যে, জাতিগত নিপীড়নের কর্মনীতির বিরুদ্ধে সর্বহারাশ্রেণীর লড়াই চালানো উচিত নয়।

যাতায়াতের স্বাধীনতায় বাধা আরোপ, ভোটাধিকার লোপ, ভাষার উপর দমননীতি, শিক্ষালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া, প্রভৃতি ধরনের নিপীড়ন শ্রমিকদেরকে বুর্জোয়াদের চেয়ে বেশি না হোক, অন্তত তাদের চেয়ে কোন অংশে কম আঘাত করে না। অধীনস্ত জাতির সর্বহারাশ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিগত শক্তির (ইন্টেলেকচুয়াল ফোর্সেস) স্বাধীন বিকাশে এ রকমের অবস্থা শুধুমাত্র বাধাই আরোপ করতে পারে। তাতার বা ইহুদী শ্রমিককে যদি সভা-সমিতি ও বক্তৃতায় তার দেশীয় ভাষ্য ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া না হয় কিংবা তাদের বিদ্যালয়গুলো যদি বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিগত কার্যক্ষমতার পূর্ণ বিকাশের কোন সম্ভাবনাই থাকতে পারে না।

কিন্তু জাতিগত উৎপীড়নের কর্মনীতি আরো একটি কারণেও সর্বহারাশ্রেণীর উদ্দেশ্য সাধনের পক্ষে বিপজ্জনক। সামাজিক সমস্যা অর্থাৎ শ্রেণী-সংগ্রামের সমস্যা থেকে জাতীয় সমস্যার অর্থাৎ বুর্জোয়া ও সর্বহারাশ্রেণী উভয়ের পক্ষে ‘সাধারণ’ সমস্যার দিকেই তা জনসংখ্যার বিপুল অংশের দৃষ্টিকে ফিরিয়ে দেয়। আর তাতে ‘স্বার্থের ঐক্য’ সম্পর্কিত মিথ্যা প্রচার-প্রোপাগান্ডার সুবিধাজনক ভিত্তিভূমি সৃষ্টি হয়, সর্বহারাশ্রেণীর শ্রেণীস্বার্থ চাপা দেওয়ার জন্য এবং মনের দিক দিয়ে শ্রমিকদের দাসে পরিণত করার সুবিধাজনক ভিত্তিভূমি সৃষ্টি হয়। সকল জাতিসত্তার শ্রমিককে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে তাতে গুরুতর বাধার সৃষ্টি হয়। পোলিশ শ্রমিকদের একটা বড় অংশ যে এখনও বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীদের কাছে মানসিক দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ রয়েছে, এখনও যে তারা আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন থেকে দূরে দাঁড়িয়ে আছে তা প্রধানত এই কারণে যে ‘ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের’ (পাওয়ারস দ্যাট বি) যুগ যুগব্যাপী বিদ্যমান পোলিশ-বিরোধী কর্মনীতিই এই দাসত্ব বন্ধনের ভিত্তিভূমি সৃষ্টি করেছে এবং এই দাসত্ব বন্ধন থেকে শ্রমিকদের মুক্তি অর্জনে বাধা দিচ্ছে।

কিন্তু উৎপীড়নের কর্মনীতির এখানেই শেষ নয়। প্রায়শই এটা নিপীড়নের ‘ব্যবস্থা’ (সিস্টেম) থেকে জাতিসমূহকে পরস্পরের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার ‘ব্যবস্থা’, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও হত্যাকাণ্ডের ‘ব্যবস্থায়’ পরিণত হয়। অবশ্য, শেষোক্তটি সব স্থানে এবং সব সময় সম্ভব নয়, কিন্তু মৌলিক নাগরিক (সিভিল) অধিকারের অনুপস্থিতিতে, যেখানে তা সম্ভব হয়ে ওঠে, সেখানে তা প্রায়ই ভয়ানক রূপ ধারণ করে আর রক্ত ও অশ্রুর বন্যায় শ্রমিকদের ঐক্যের কর্তব্যকর্মটির ভেসে যাওয়ার বিপদ সৃষ্টি করে। ককেশাস আর দক্ষিণ রুশিয়ায় এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ‘ভাগ করো ও শাসন করো’- এটাই হচ্ছে (জাতির বিরুদ্ধে জাতিকে) উত্তেজিত করার কর্মনীতির উদ্দেশ্য। আর যেখানে এরূপ কর্মনীতি সফলকাম হয় সেখানে সর্বহারাশ্রেণীর জন্য তা বড়ই দুর্ভাগ্যের এবং রাষ্ট্রের সকল জাতিসত্তার শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে তা প্রচণ্ড বাধাস্বরূপ।

কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থ হচ্ছে তাদের স্বশ্রেণীর ভাইদের একটিমাত্র আন্তর্জাতিক বাহিনীতে পরিপূর্ণভাবে সম্মিলিত করা, বুর্জোয়াদের মানসিক দাসত্ব থেকে তাদের সবাইকে দ্রুত ও চূড়ান্তভাবে মুক্ত করা, আর যে জাতিরই হোক না কেন সেসব সকল জাতির তাদের ভাইদের বুদ্ধিবৃত্তিগত শক্তিসমূহকে পূর্ণ ও স্বাধীনভাবে বিকশিত করে তোলা।

সেজন্যেই জাতিগত নিপীড়নের কর্মনীতির- তা সেটা যত সূক্ষ্ম ধরণেরই হোক বা যত স্থূল ধরণেরই হোক না কেন- প্রত্যেকটি ধরণকে শ্রমিকরা মোকাবিলা করে এবং অব্যাহতভাবে মোকাবিলা করে যাবে, তার সঙ্গে সঙ্গে জাতির বিরুদ্ধে জাতিকে উত্তেজিত করার প্রত্যেকটি ধরণের বিরুদ্ধেও সে লড়ে এবং লড়তে থাকবে। তাই সকল দেশের সোশ্যাল ডোমোক্র্যাটিক পার্টি ঘোষণা করছে যে, প্রত্যেক জাতিরই রয়েছে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।

আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের অর্থ হচ্ছে এই যে, নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার শুধুমাত্র জাতির নিজেরই রয়েছে, ওই জাতির জীবনে জবরদস্তিমূলকভাবে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই, তার স্কুল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার কোন অধিকার কারোর নেই, তার অভ্যাস ও আচাররীতি লঙ্ঘন করার, কোন অধিকার কারোর নেই, আর ভাষার উপর দমননীতি চালানো বা তার অধিকার সঙ্কুচিত করার অধিকারও কারোর নেই।

এর অর্থ অবশ্য এ নয় যে, জাতির প্রত্যেকটি আচার-নীতি ও প্রতিষ্ঠানকেই সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসী সমর্থন করবে। যে কোন জাতির বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করার বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা শুধুমাত্র এটাই উর্ধ্বে তুলে ধরে যে, নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার সেই জাতির হাতেই থাকবে, সাথে সাথে ওই জাতির অনিষ্টকর আচার-নীতি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তারা আন্দোলন করবে, যাতে করে সেই জাতির শ্রমজীবী স্তর এগুলো থেকে নিজেদের মুক্ত করায় সক্ষম হয়ে ওঠে।

আত্ময়িন্ত্রণের অধিকারের অর্থ হচ্ছে এই যে, যেভাবে নিজেরা ইচ্ছা করবে সেভাবেই একটি জাতি নিজের জীবন রচনা করতে পারবে। স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে নিজের জীবন রচনা করার অধিকার জাতির রয়েছে। অন্যান্য জাতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার জাতির রয়েছে। সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অধিকারও জাতির রয়েছে। জাতি হচ্ছে সার্বভৌম, আর সকল জাতিই সমান।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি জাতির প্রত্যেকটি দাবিই সমর্থন করবে। পুরানো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার অধিকার পর্যন্ত জাতির রয়েছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বর্ণিত জাতির কোন প্রতিষ্ঠান যদি এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাহলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করবে। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি, যা সর্বহারাশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে তাদের বাধ্যবাধকতা, আর জাতি যা বিভিন্ন শ্রেণী নিয়েই গঠিত, তার অধিকার হচ্ছে দুটো ভিন্ন জিনিস।

জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের জন্যে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির লক্ষ্য হচ্ছে জাতিগত নিপীড়নের কর্মনীতির সমাপ্তি ঘটানো, এই কর্মনীতিকে অসম্ভব করে তোলা, আর তার দ্বারা জাতিসমূহের মধ্যেকার কলহ-বিবাদের ভিত্তি বিদূরিত করা, এই কলহবিবাদের তীক্ষ্ণতাকে ভোঁতা করা এবং তাকে হ্রাস করে ন্যূনতম পরিমাণে নিয়ে আসা।

অপরিহার্যরূপে এটাই বুর্জোয়াশ্রেণী, যারা জাতীয় সংগ্রামকে বাড়িয়ে তোলা ও উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায় এবং জাতীয় আন্দোলনকে দীর্ঘায়িত ও তীব্রতর করার চেষ্টা চালায়, তাদের কর্মনীতি থেকে শ্রেণীসচেতন সর্বহারাশ্রেণীর কর্মনীতির পার্থক্য নিরূপণ করছে। আর সে কারণেই শ্রেণীসচেতন সর্বহারাশ্রেণী বুর্জোয়া শ্রেণীর ‘জাতীয়’ পতাকার নীচে সমবেত হতে পারে না।

সে কারণেই বাউয়ারের পোষিত তথাকথিত ‘ক্রমবিকাশমান জাতীয়’ কর্মনীতি সর্বহারাশ্রেণীর কর্মনীতিতে পরিণত হতে পারে না। ‘আধুনিক শ্রমিক শ্রেণীর**’ কর্মনীতির সঙ্গে নিজের ‘ক্রমবিকাশমান জাতীয়’ কর্মনীতিকে এক করে সমঝাবার যে প্রচেষ্টা বাউয়ার নিয়েছেন তা হচ্ছে জাতীয় সংগ্রামের সাথে শ্রমিকদের শ্র্রেণীসংগ্রামকে খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা।

জাতীয় আন্দোলন, যা হচ্ছে অপরিহার্যরূপে একটি বুর্জোয়া আন্দোলন, তার ভাগ্য স্বাভাবিকভাবেই বুর্জোয়াশ্রেণীর ভাগ্যের সাথেই জড়িত। কেবল বুর্জোয়াশ্রেণীর পতন ঘটলেই জাতীয আন্দোলনের চূড়ান্ত পতন সম্ভব। একমাত্র সমাজতন্ত্রের আমলেই এ প্রশ্নটি শান্তিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাদের কাঠামোর মধ্যেও জাতীয় সংগ্রামকে সর্বনিম্ন পরিমাণে হ্রাস করা সম্ভব, তার মূল উৎপাটন করা সম্ভব, সর্বহারাশ্রেণীর জন্য তাকে যথাসম্ভব কম অনিষ্টকারী বানানো যায়। সুইজারল্যান্ড ও আমেরিকার উদারহণই এ ধারণার জন্ম দিচ্ছে। এর জন্য প্রয়োজন হলো দেশটিকে গণতান্ত্রিক হতে হবে এবং জাতিসমূহকে স্বাধীন বিকাশের সুযোগ দিতে হবে।

তৃতীয় অধ্যায় : সমস্যাটির উপস্থাপনা*

স্বাধীনভাবে নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার জাতির রয়েছে। নিজে যেমন উপযুক্ত মনে করে তেমনি নিজের জীবন রচনা করার অধিকার জাতির রয়েছে, অবশ্য, অন্যান্য জাতির অধিকার পদদলিত না করেই। এটা বিতর্কের উর্ধ্বে। কিন্তু, জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বার্থ আর, সর্বোপরি সর্বহারাশ্রেণীর স্বার্থের কথা যদি মনে রাখতে হয়, তাহলে যথার্থত কিভাবে জাতি তার নিজের জীবন রচনা করবে, তার ভবিষ্যৎ সংবিধান কি কি রূপ ধারণ করবে?

স্বাধিকারের ধারায় (অটোনোমাস লাইনস) নিজের জীবন রচনা করার অধিকার জাতির রয়েছে। এমনকি বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, সকল পরিস্থিতিতেই সে তা করবে; জাতির পক্ষে, অর্থাৎ তার সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে, অর্থাৎ তার শ্রমজীবী স্তরের পক্ষে, স্বায়ত্তশাসন (অটোনমি) কিংবা আলাদা হওয়া সর্বত্র এবং সব সময় সুবিধানজক নাও হতে পারে। ধরুন, ট্রান্সককেশিয়ার তাতাররা জাতি হিসাবে ‘ডায়েটে’ (আইনসভা) সমবেত হলো এবং তাদের প্রাদেশিক শাসক ও মোল্লাদের পাল্লায় পড়ে পুরানো ব্যবস্থা পুনঃপ্রষ্ঠিত করা ও রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট বিধানের মর্মার্থ অনুযায়ী এরূপ করার পূর্ণ এখতিয়ার তাদের রয়েছে। কিন্তু তাতার জাতির শ্রমজীবী স্তরের স্বার্থকে কি তা তুলে ধরবে? জাতি সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে প্রাদেশিক শাসক ও মোল্লারা যখন জনগণের নেতৃত্ব গ্রহণ করছে তখন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা (অর্থাৎ কমিউনিষ্টরা) কি উদাসীন থাকতে পারে? বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করা এবং জাতির আকাঙ্খাকে একটি নির্দিষ্ট পথে প্রভাবিত করাই কি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের উচিত নয়? সমস্যাটির সমাধানের জন্যে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েই কি তাদের এগিয়ে আসা উচিৎ নয়, যে পরিকল্পনা হবে তাতার জনগণের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক?

কিন্তু শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থের সাথে কোন সমাধানটি সবচেয়ে উপযোগী হবে? স্বায়ত্তশাসন, যুক্তরাষ্ট্র, না বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র গঠন? এ সবই হলো সমস্যা যার সমাধান নির্ভর করবে, যে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অবস্থায় ওই নির্দিষ্ট জাতি নিজে অবস্থান করছে তার উপর। অধিকন্তু অন্য সব কিছুর মতোই, অবস্থারও পরিবর্তন ঘটে, আর এক নির্দিষ্ট সময়ে যে সিদ্ধান্ত হলো যথার্থ অন্য এক সময়ে সে সিদ্ধান্তই সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত বলে প্রমাণিত হতে পারে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি মার্কস ছিলেন রুশ পোল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতার পক্ষে; এবং তিনি ছিলেন সঠিক, কারণ তখন তা ছিল একটা উচ্চতর সংস্কৃতিকে এক নিম্নতর সংস্কৃতির হাত থেকে মুক্ত করার প্রশ্ন, যে নিম্নতর সংস্কৃতি উচ্চতর সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। আর সে সময়ে এ প্রশ্নটি কেবল এক তত্ত্বগত প্রশ্ন, এক কেতাবী প্রশ্ন ছিল না, বরং তা ছিল এক ব্যবহারিক প্রশ্ন, প্রকৃত বাস্তবতার প্রশ্ন।…

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে পোলিশ মার্কসবাদীরা ইতোমধ্যেই পোল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে বলছিলেন, এবং তারাও ছিলেন সঠিক, কারণ পঞ্চাশ বছর ধরে অতিবাহিত সময়কালে এমন সব সুগভীর পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল যা রুশিয়া ও পোল্যান্ডকে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ঘনিষ্ঠ করে তোলে। অধিকন্তু, ওই সময়কালে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্নটি ব্যবহারিক বিষয় থেকে এক কেতাবী বিতর্কের বিষয়ে রূপান্তরিত হয়ে যায়, যা সম্ভবত বিদেশবাসী বুদ্ধিজীবীদের ছাড়া অন্য কারো কাছে সাড়া জাগাতো না! অবশ্য, এর দ্বারা এ সম্ভাবনা বাতিল করে দেয়া হচ্ছে না যে, কিছু কিছু অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ অবস্থা দেখা দিতে পারে যেখানে পোল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নটি পুনরায় বাস্তব হয়ে উঠবে।
ঐতিহাসিক অবস্থাগুলিকে তাদের বিকাশের দিক থেকে বিচার করলেই কেবল সেসব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জাতি-সমস্যার সমাধান সম্ভব।…

সর্বশেষ, রুশিয়া ও অষ্ট্রিয়া যে আশু করণীয়ের সম্মুখীন তা পুরোপুরিভাবেই ভিন্ন এবং ফলত তা জাতি সমস্যার সমাধানের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিই নির্দেশ করছে। অষ্ট্রিয়ায় পার্লামেন্টবাদ বহাল রয়েছে, এবং বর্তমান অবস্থাধীন পার্লামেন্ট ব্যতিরেকে অষ্ট্রিয়ার কোন বিকাশই সম্ভব নয়। কিন্তু অষ্ট্রিয়ায় পার্লামেন্টারী জীবন ও বিধিবিধান জাতিভিত্তিক পার্টিগুলির মধ্যেকার তীব্র বিবাদ-বিসম্বাদের ফলে প্রায়শই পরিপূর্ণ অচলাবস্থার মধ্যে চলে আসে। দীর্ঘ দিন ধরেই অষ্ট্রিয়ায় যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকট বিরাজ করছে তার কারণ হচ্ছে এটাই। সেহেতু, অষ্ট্রিয়ায় জাতি সমস্যাই হলো রাজনৈতিক জীবনের খোদ নাভিকেন্দ্র। এটাই হলো সবচেয়ে জরুরী প্রশ্ন। সুতরাং এটা মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, অষ্ট্রিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিবিদদের উচিত সর্বপ্রথম এক বা অন্য পন্থায় জাতীয় বিবাদ-বিসম্বাদের সমাধান খুঁজে বের করা- অবশ্য বিদ্যমান পার্লামেন্টারী ব্যবস্থার ভিত্তিতেই, পার্লামেন্টারী পদ্ধতিতেই।…

কিন্তু রুশিয়ার ক্ষেত্রে ঘটনা তা নয়। প্রথমত রুশিয়ায় ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, কোন পার্লামেন্ট নেই’। দ্বিতীয়ত- আর এটাই হলো মূল বিষয়- রুশিয়ার রাজনৈতিক জীবনের নাভিকেন্দ্র জাতীয় প্রশ্ন নয়, বরং তা হলো কৃষি প্রশ্ন। ফলত, রুশিয়ার ক্ষেত্রে রুশ সমস্যার নিয়তি, আর তদনুযায়ী, জাতিসমূহের ‘মুক্তি’ও, কৃষি-প্রশ্নের সমাধানের সাথে, অর্থাৎ দেশের গণতন্ত্রায়নের সাথে জড়িত। রুশিয়ার জাতি সমস্যাটি কেন স্বতন্ত্র ও নির্ধারক নয়, বরং দেশের মুক্তির সাধারণ ও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অংশ তার কারণটা হচ্ছে এটাই।…

এই সব কিছুই স্পষ্ট। কিন্তু এটা কোন ক্রমেই কম স্পষ্ট নয় যে, রুশিয়ায় জাতি সমস্যাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরে রয়েছে। জাতি সমস্যা নয়, কৃষি-প্রশ্নই রুশিয়ার প্রগতি ভাগ্য নির্ধারণ করছে। জাতি সমস্যা হলো এর অধীনস্ত একটি সমস্যা।
অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি জাতি সমস্যার বিভিন্ন উপস্থাপনা, সংগ্রামের বিভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও পদ্ধতি, বিভিন্ন আশু করণীয়।

পুনরায় বলতে গেলে- যাত্রাবিন্দু হিসেবে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অবস্থা, আর উপস্থাপনার একমাত্র সঠিক পথ হিসেবে সমস্যাটির দ্বান্দ্বিক উপস্থাপনা- এটাই হলো জাতি সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি।…

নোট ও টিকা

* প্রথম ও তৃতীয়, এই দুটি অধ্যায় অনেক বড় ও এর কিছু বিষয় একান্তই সেই সময়কার বলে নির্বাচিত অংশটুকুই এখানে দেয়া হয়েছে।

# গ্রেফতার করা ও বাধাদান করা-রুশ লেখক গ্লেব উস্পেপন্‌স্কী কর্তৃক পুলিশী ব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যঙ্গাত্মক বর্ণনার একটি সরাসরি অনুবাদ হচ্ছে এটা। উস্পেপন্‌স্কী ‘পুলিশ স্টেশন’ নামক তার একটি গল্পে অতি উৎসাহী এক পুলিশ অফিসারের চিত্র এঁকেছেন। অফিসারটি অতি তুচ্ছ কারনে যে কাউকেই থানায় ধরে নিয়ে যেত।

** ভিয়েনা থেকে প্রকাশিত অটো বাউয়ারের ‘জাতীয় সমস্যা ও সোস্যাল ডেমোক্র্যাসী’ বইয়ের ১৬১ পৃষ্টা দ্রষ্টব্য।

জায়নবাদ : প্রতিক্রিয়াশীল জাতীযতাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন যা তার সদস্য সংগ্রহ করতো ইহুদী ক্ষুদে ও মাঝারী বুর্জোয়া, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী কর্মচারী, কারিকর এবং ইহুদী শ্রমিকদের অধিক পশ্চাদপদ অংশ থেকে। এর লক্ষ্য ছিল প্যালেস্টাইনে একটি ইহুদী বুর্জোয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আর এই মতবাদ সর্বহারাশ্রেণীর সাধারণ সংগ্রাম থেকে ইহুদী জনগণকে বিছিন্ন করে রাখার প্রচেষ্টাও চালিয়ে আসছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “মার্কসবাদ ও জাতি সমস্যা | জে. ভি. স্ট্যালিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 89 = 95