ভু-খন্ডের সংগ্রামঃ সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৪-৫৬)

সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৪-৫৬)

ভারত উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের আদিবাসী হিসেবে যাদের আখ্যায়িত করা হয় তাদের মধ্যে সাঁওতাল সম্প্রদায় হল সবচাইতে সরল জীবন-যাপনকারী অল্পেই সন্তুষ্ট গোষ্ঠী। আদিকাল থেকেই হিংস্র জীবজন্তুর সাথে যুদ্ধ করে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে তারাই জমিকে চাষ এবং বাসযোগ্য করে তুলেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে সাঁওতালরা ভারতবর্ষের বঙ্গ-বিহার-আসাম-মিজোরাম-নাগাল্যান্ড প্রভৃতি অঞ্চলের বন-জঙ্গল এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করে। নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে এই সাঁওতালরাই নাকি ভারতবর্ষে প্রথম বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে নিজেদের অস্থায়ী বসতি স্থাপন করে কৃষি কাজ ও ফসল উৎপাদনের উদ্ভব করে।
আজকের দিনের আমাদের যেই কৃষি ব্যবস্থা এটি তাদের থেকেই শিখেছিল আমাদের পূর্বপুরুষেরা। পরবর্তীতে এই সাঁওতালদের গড়ে তোলা বাসভুমিতে ক্রমেই আসতে থাকে আর্যরা। বসতি গড়তে থাকে তারা। আর্যরা যেহেতু যুদ্ধ এবং হঠকারী মনোভাব সম্পন্ন তাই এটি তারা সাঁওতালিদের উপর প্রয়োগ করতে থাকে। বিভিন্ন ছলছুতোয় তারা সাঁওতালিদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে তাদের উপর অত্যাচার, উৎপীড়ন, লাঞ্চনা শুরু করে দেয় আর স্বনির্ভর এই জাতি নিজেদের বাঁচার তাগিদে তথা অধিকার আদায়ে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠে শুরু হয় তাদের বিদ্রোহ।

সাঁওতালরা অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অস্ট্রেলীয় (প্রোটো-অস্ট্রালয়েড) জনগোষ্ঠীর বংশধর। এদের গায়ের রঙ কালো, উচ্চতা মাঝারি, চুল কালো ও কোকড়ানো, ঠোঁট পুরু।

সাঁওতালদের প্রধান উপাস্য দেবতা যদিও সূর্য (সিং বোঙ্গা) তবু পর্বত দেবতাও (মারাং বুরু) তাদের যথেষ্ট মর্যাদা পেয়েছে। তারা “আবে বোঙ্গা” নামে নৈসর্গিক আত্মাকে তারা “গৃহদেবতা” হিসেবে পূজা করে। এছাড়া তারা হিন্দু দেব-দেবীর পূজা অর্চ্চনাও করে থাকে।

সাঁওতালরা খুব উৎসব প্রিয় জাতি, তাদের বছর শুরু হয় ফাল্গুন মাসে। প্রায় প্রতি মাসে বা ঋতুতে তাদের কোন না কোন উৎসব রয়েছে এবং গীত-বাদ্য-নৃত্য সহযোগে তারা এসব উদযাপন করে থাকে। তারা বছরের শুরুর হিসেবে ফাল্গুনে “স্যালসাই”, চৈত্রে “বোঙ্গাবোঙ্গি”, বৈশাখে “হোম”, আশ্বিনে “দিবি”, পৌষে “সোহরাই” ইত্যাদি। সোহরাই তারা জাতীয় উৎসব হিসেবে পালন করে থাকে এবং বসন্তের শুরুতে “বাহা” ফুল ফোটার উৎসব পালন করে। এই “বাহা”তে তারা “আখড়া” নামক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যাতে তরুণ-তরুণীরা নিজেদের জীবন সঙ্গী বেছে নেয়।

সাঁওতাল বিদ্রোহে যে সকল কারণগুলো মূখ্য ভুমিকা হিসেবে গণ্য করা হয় সেগুলো হলোঃ-

  • ভুমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে সাঁওতালরা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে যে জমি ফসল উৎপাদনের উপযোগী করে তোলে, সে জমি সমতল ভূমিতে বসবাসকারী জমিদার-জোতদার-তালুকদাররা জোরপূর্বক দখল করে এবং সাওতালদেরকে ঐ জমিতে ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করে;
  • বৃটিশরাজ কর্তৃক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রচলনের সুযোগ ব্যাপারী-মহাজনরা নিরক্ষর-অজ্ঞ ও সহজ-সরল সাঁওতালদের ছল-চাতুরির মাধ্যমে প্রতারিত করে;
  • সাঁওতালদের অঞ্চলে ব্যবসা করতে গিয়ে ব্যাপারী ও সুদখোর মহাজনদের অতি লোভ ও লুন্ঠনের প্রবৃত্তির ফলে জোরজবর দখল করে সাঁওতালদের সম্পদ ও উৎপাদিত আত্মসাৎ করা;
  • ঋণদায়গ্রস্ত সাঁওতালদের ব্যক্তিগত বংশগত ক্রীতদাসত্বের মতো বর্বর প্রথা প্রচলনের মাধ্যমে তাদের আজীবন পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা;
  • আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের সীমাহীন অত্যাচার, দূর্নীতি, উৎপীড়ন এবং জমিদার-জোতদার-ব্যাপারী-মহাজনদের দুষ্কর্ম ও অত্যাচারে সহায়তা দান;
  • সরকারি বিচার-ব্যবস্থা কিংবা আদালতে সুবিধা না পাওয়া।

এরকম বিভিন্ন কারণে সাঁওতালিদের মনে ক্ষোভ জমতে থাকে, তারা প্রতিবাদী হতে থাকে। কিন্তু তারা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কারণে তারা বিদ্রোহ করতে পারে না। এরই মাঝে সিদু (সিধো), কানু (কানহোর) এই দুই ভাইকে তাদের কথিত এক দেবতা দেখা দেন। সেই দেবতা তাদের কিছু কাগজের টুকরোতে এইসকল অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার নির্দেশ দেন। পরে দেবতা দেখা দিয়েছে এই কথা সাঁওতালিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্নস্থান থেকে তারা দলে দলে এসে সিদু এবং কানুদের বাড়িতে জড়ো হতে থাকে। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সকলের সামনে দুই ভাই দেবতার বাণী প্রচার করে। সাঁওতালীরা এবার এক হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়। এরপর তারা ইংরেজ সরকার, ভাগলপুরের কমিশনার, কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেটের, বীরভুমের কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট, দীঘি ও টিকড়ি থানার দারোগা এবং কতিপয় জমিদারের কাছে ১৫ দিনের উত্তর দেবার সময়সুচি বেঁধে দিয়ে চরমপত্রস্বরুপ পত্র প্রেরণ করে। এরপর তারা সমতলের চারিদিকে তাদের স্বাধীনতার কথা ছড়িয়ে দেয় এবং সমতল মাধ্যম দিয়ে কলকাতাভিমুখে বিপুল সংখ্যক জনবল নিয়ে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাপূর্বে তারা যেসকল রসদপত্র নিয়ে রওয়ানা হয়েছিল ক্রমেই তা ফুরিয়ে আসাতে ক্ষিপ্র হয়ে উঠে তারা এবং হামলে পড়ে অত্যাচারীদের উপর। সেসময় তারা পাঁচজন সুদী মহাজনকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেয়। এসময় সিদু,কানুকে ইংরেজ সরকারের প্রশাসন বাহিনী গ্রেফতার করলে কানু চিৎকার করে ঘোষণা করে, “হুল (বিদ্রোহ আরম্ভ করো)। চারিদিকে শালের ডাল পাঠিয়ে দাও। দারোগা নাই, হাকিম নাই, সরকার নাই। রাজা-মহারাজাদের খতম করো। দিকুদের (বাঙালি তথা মহাজন) গঙ্গা পার করে দাও! আমাদের নিজেদের হস্তে শাসন চাই।”
বিদ্রোহের সুত্রপাত নিয়ে হান্টার বলেন,

“যখন সাঁওতালগণ কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করেছিল, তখন তারা সশস্ত্র বিদ্রোহের কথা ভেবেছিল বলে মনে হয় না। যাত্রাকালে তারা ঘোষণা করেছিল যে, তাদের যে আবেদন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অগ্রাহ্য করেছে সেই আবেদনই তারা কলিকাতার যেয়ে বড়লাটের নিকট পেশ করবে। সেই অভিযানে তারা তাদের জাতীয় শোভাযাত্রার মতই মাদল ও করতাল বাজাইতে বাজাইতে চলেছিল। অভাবের তাড়নায় তারা মহাজনদের গৃহ লুন্ঠন করতে বাধ্য হলেও দারোগা হত্যার ঘটনাটিই তাদের অভিযানের চরিত্র ও রুপ বদলিয়ে দেয়। নিরীহ সাঁওতাল এবার প্রতিহিংসার জ্বালায় উন্মাদ হয়ে উঠে এবং তাদের বিস্মৃতপ্রায় অতীত বন্য চরিত্র নতুনভাবে দেখা দেয়। কিন্তু তথাপি আচরণ রূঢ় হলেও তাদের ন্যায়পরায়নতাবোধ কখনই লোপ পায় নি। তাদের ভগবান যেমন হিন্দু মহাজনদিগকে অবিলম্বে হত্যা করবার নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনই আবার অন্য সকল শ্রেণীকে রক্ষা করবারও নির্দেশ দিয়েছেন।”

আরেকজন লেখক থেকে জানা যায়,

“অবশেষে যখন বিদ্রোহ আরম্ভ হয়, তখন এই অঞ্চলে নিযুক্ত বারোশত সৈন্যকে আশি মাইলব্যাপী কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। একপক্ষ কাল ধরে সাঁওতাল বিদ্রোহীরা পশ্চিমের জেলাগুলি ধ্বংস ও হত্যার বন্যায় প্লাবিত করে। জুলাই মাস শেষ হওয়ার আগেই শত শত গ্রাম অগ্নিযোগে ভস্মিভুত করা হয়, কয়েক সহস্র গরু-মহিষকে সাঁওতালগণ তাড়িয়ে নিয়ে যায়, আমাদের সৈন্যবাহিনী বিভিন্ন স্থানে পরাজিত হয় এবং দুইজন ইংরেজ মহিলাসহ কতিপয় ইংরেজ কর্মচারী নিহত হয়। ইংরেজদের বহু ঘাঁটি ও ফ্যাক্টরি(নীলকুঠি) লুন্ঠিত ও ভস্মীভূত হয়।…….”

বিদ্রোহের প্রারম্ভেই সাঁওতালরা কুখ্যাত উৎপীড়কদের একে একে হত্যা করে দীর্ঘকালের পুঞ্জীভুত অপরাধের শাস্তি দেয়। বিদ্রোহীদের ভয়ে সমস্ত ইংরেজ সরকারের কর্মচারীগণ চাকরি ছেড়ে পালাতে থাকে। বিদ্রোহীরা চারিদিকে ঘোষণা করতে থাকে, “কোম্পানীর রাজত্ব শেষ হয়েছে এবং এখন তাদের স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”

সাঁওতাল বিদ্রোহের সংবাদ ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত মনে হয়। তারা দ্রুতই মেজর বারোজকে নির্দেশ দেন উক্ত অঞ্চলে গিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে। মেজর বারোজ দ্রুতই তার সেনাবাহিনী গঠন করে ১৮৫৫ সালের ১৬ই জুলাই ভাগলপুর জেলার পিয়ালাপুরের নিকটবর্তী পীরপাইতির ময়দানে উভয় পক্ষের পাঁচ ঘন্টাব্যাপী প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। কিন্তু তাদের এতো সৈন্য বাহিনী, অস্ত্রশস্ত্রসহ হস্তী বাহিনী থাকলেও তারা পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইংরেক শাসকগোষ্ঠী উক্ত এলাকায় “মার্শাল ল” ঘোষণার পাশাপাশি সাঁওতালিদের নেতাদের ধরিয়ে দিতে পারলে সেইসময়ের এক হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরষ্কার ঘোষণা করে।

এদিকে পরাস্ত হয়েই ক্ষান্ত থাকেনি মেজর বারোজ। তিনি ক্যাপ্টেন শেরওয়েলকে সাথে করে প্রকান্ড সৈন্যবাহিনী নিয়ে আবারো হামলে পড়ে সাঁওতালিদের উপর। এদিকে ইংরেজ সরকার সাঁওতালিদের দখলকৃত এলাকাগুলোতে সামরিক আইন জারি করে সেটির নিয়ন্ত্রনভার সেনাবাহিনীর হাতে ন্যস্ত করে। উপূর্যপুরি হামলার ফলে ধ্বসে পড়ে সাঁওতালিদের দূর্গ। এভাবে দীর্ঘ ছয়মাসাধিক যুদ্ধের পর ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে সিধু ধরা পড়ে সাঁওতালিদের দেয়া তথ্যেই এবং ধরা মাত্রই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে বীরভুমের জেলার একটি বাধের ওপর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে কানুকে তারা গুলি করে হত্যা করে।

এভাবেই সাঁওতালিদের বিদ্রোহ “সাঁওতাল বিদ্রোহ” সমাপ্ত হয়ে যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ভু-খন্ডের সংগ্রামঃ সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৪-৫৬)

  1. সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে করা
    সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে করা আরণ্যক নাট্যদলের “ঢ়ারাঙ” মঞ্চ নাটকটি দেখেছিলাম। সুন্দর তথ্যসমৃদ্ধ পোস্টের জন্য সুমিত ভাইকে ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 5