শোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব | চারু মজুমদার

১৯৬৪ সালের শেষের দিকে কমরেড চারু মজুমদার শুরু করেন তাঁর ঐতিহাসিক আট দলিল রচনা। এই আট দলিলই ছিল পরবর্তী বিপ্লবী রাজনীতির লাইনগত পটভূমি। এই আট দলিলের ওপর ভিত্তি করেই ভারতে বুর্জোয়াদের সঙ্গে সহাবস্থানের শোধনবাদী রাজনীতির সঙ্গে ডিমার্কেশন টানেন বিপ্লবীরা। গড়ে ওঠে বুর্জোয়াদের হঠানোর সত্যিকারের বিপ্লবী আন্দোলন। যে লড়াই এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন মাওবাদীরা। এ অঞ্চলের বিপ্লবী রাজনীতিতে তাই আট দলিল সব সময়ই প্রাসঙ্গিক। এই লেখাটির মূল শিরোনাম ছিল, ‘শোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করে তুলুন’। শিরোনামটি সংক্ষেপ করার জন্য একটু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটি ঐতিহাসিক আট দলিলের দ্বিতীয় দলিল নামে পরিচিত। আসুন পাঠক, বিপ্লবী চিন্তা ও পথের সঙ্গে পরিচিত হই।

 

শোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করে তুলুন

ভারতবর্ষের পার্টিতে দীর্ঘদিন যাবৎ শোধনবাদী চিন্তা বাসা বাধার ফলে সঠিক বিপ্লবী পার্টি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এই শোধনবাধী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম করে সঠিক বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলাই আজ প্রাথমিক কাজ।

(১) শোধনবাধী চিন্তাধারর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে কৃষকসভা ও ট্রেড ইউনিয়নকে পার্টির একমাত্র কাজ হিসাবে চিন্তা করা। পার্টির কমরেডরা প্রায়ই কৃষকসভা ও ট্রেড ইউনিয়নের কাজের সঙ্গে পার্টির রাজনৈতিক কাজকে গুলিয়ে ফেলেন। তাঁরা ভাবেন না যে, পার্টির রাজনৈতি কর্তব্য কৃষকসভা ও ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে করা যায় না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে যে, ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষকসভা আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের অনেকগুলি হাতিয়ারের মধ্যে একটি। পক্ষান্তরে ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষকসভাকে পার্টির একমাত্র কাজ হিসাবে কল্পনা করার অর্থই হলো পার্টিকে অর্থনীতিবাদের পক্ষে নিমজ্জিত করা। এই অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম করা ছাড়া সর্বহারা বিপ্লবকে সফল করা যায় না, কমরেড লেনিন এই শিক্ষাই দিয়েছেন।

(২) অনেক কমরেড ভাবেন এবং আজও ভাবছেন যে, কিছু দাবি-দাওয়ার আন্দোলন করলেই পার্টির রাজনৈতিক কর্তব্য পালন হযে গেল। এই আন্দোলনের মাধ্যমে একটি জয়কে তাঁরা পার্টির রাজনৈতিক জয় হিসাবে চিন্তা করেন। শুধু তাই নয়, এইসব কমরেডরা পার্টির রাজনৈতিক কর্তব্য পালনের দায়িত্বকে এই আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করতে চান। কিন্তু আমরা মার্কসবাদীরা জানি যে, পার্টির রাজনৈতিক কর্তব্য পালনের অর্থ হলো আমাদের সমস্ত প্রচার, সমস্ত আন্দোলন ও সংগঠনের শেষ লক্ষ্য হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা। এ কথা সব সময়েই মনে রাখতে হবে যে, ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল’ কথাটিকে বাদ দিলে পার্টি আর বিপ্লবী পার্টি থাকে না। তখন নামে সেটা বিপ্লবী পার্টি থাকলেও আসলে তা ধনিকশ্রেণীর সংস্কারবাদী পার্টিতে পরিণত হয়।

রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল বলতে অনেকেই কেন্দ্রকে বুঝে থাকেন। অর্থাৎ তাঁরা ভাবেন যে, আন্দোলনের পরিধি ক্রমশ বাড়তে বাড়তে কেন্দ্রীয়ভাবে ক্ষমতা দখলই হবে একমাত্র লক্ষ্য। এই চিন্তাধারা শুধু যে ভুল তাই নয়- এই চিন্তাধারা পার্টির মধ্যে সঠিক বিপ্লবী চিন্তাধারাকে নষ্ট করে দেয় এবং তাকে একটা সংস্কারবাদী পার্টিতে পরিণত করে। ১৯৫০ সালে বিশ্ব ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসে চীনের প্রতিনিধি দৃপ্তভাবে ঘোষণা করেন যে, আগামীতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় অর্ধ সমাপ্ত বিপ্লবের কৌশল ও নীতি চীনের পশ্চাদঅনুসরণ করে চলবে। অর্থাৎ ‘এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখল’ই হবে সেইসব সংগ্রামগুলোর নীতি ও কৌশল। শুধু চীনের প্রতিনিধিই নন কমরেড লেনিনও তাঁর লেখায় এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের কথা উল্লেখ করেছেন। সর্বোপরি রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণী তিনদিনের জন্য ক্রনষ্টান্ড শহর দখল করে রেখে লেনিনের সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রমাণ রেখে গেছেন।

সমাজতান্ত্রিক যুগে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের সমস্ত উপাদানই আমাদের কাঠামোর মধ্যে বর্তমান। এটা যে সম্ভব, নাগা বিদ্রোহ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এই এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের প্রধান শর্ত হচ্ছে বিপ্লবী শক্তির হাতে অস্ত্র। অস্ত্রহীনভাবে ক্ষমতা দখলের কথা চিন্তা করা স্বপ্ন বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের পার্টির সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। উত্তরবঙ্গের বিশাল গ্রামাঞ্চলে কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব আমরা দিয়েছি। স্বাভাবতই অতীত আন্দোলনের বিচার ও বিশ্লেষণ করে তার শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমান বিপ্লবী যুগে নতুন করে এগুতে হবে।

অতীত আন্দোলনের বাস্তব ঘটনা ও অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ
১৯৪৬-৪৭ সালের তেভাগা আন্দোলন

এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা কৃষকের সংখ্যা ছিল ৬০ লক্ষ। মনে রাখতে হবে সমগ্র কৃষক আন্দোলনের এটা ছিল সুবর্ণ সুযোগ। আন্দোলনের বিশালতায়, আবেগের তীব্রতায়, শ্রেণীগত ঘৃণার প্রকাশভঙ্গিতে এই সংগ্রাম ছিল শ্রেণীসংগ্রামের চূড়ান্ত স্তর। সেই স্তরকে বোঝাবার জন্য ওই আন্দোলনের গুটিকয়েক মর্মস্পর্শী উদাহরণ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। একদিনের ঘটনা। আন্দোলনের স্বার্থে আমি তখন গোপনে আছি। বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার আমি প্রত্যক্ষ দেখেছি। আমি দেখেছি যে, সামান্য একটা চিরকুটে ১০ মাইল দুরের লোককে পাগলের মতো ছুটে আসতে। অপরদিকে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে এও আমি দেখেছি যে, নববিবাহিতা মুসলমান যুবতীর ওপর শ্রেণীশত্রুর পৈশাচিক বর্বর অত্যাচার। আমি দেখেছি সেই নিরস্ত্র স্বামীর কাতর মিনতি, ‘কমরেড বদলা নিতে পারবি না?’ পর মুহূর্তে দেখেছি শোষকের প্রতি শোষিতের তীব্র ঘৃণা। দেখেছি নির্বিকার চিত্তে জীবন্ত মানুষের ঘাড় মটকে মেরে ফেলার সেই ভয়াবহ দৃশ্য। কমরেড ওপরের দৃশ্যগুলো আমাদের কাছে কতগুলো বিশ্লেষণ দাবি করে।
এক. কোনো ঐতিহাসিক কারণ থাকার ফলে সেদিন সেই আন্দোলনের বিশাল রূপ ও শ্রেণীশত্রুর প্রতি তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করতে পেরেছিল?
দুই. কিইবা সেই কারণগুলো যা সেদিনকার সেই বিশাল আন্দোলনকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছিল?

প্রথমত : রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আওয়াজই সেদিনকার সেই আন্দোলনের বিশাল রূপ ও শ্রেণীশত্রুর প্রতি তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করতে পেরেছিল। বিপরীত দিকে সেই আওয়াজই শ্রেণীশত্রুকে তার শ্রেণীগত ভূমিকায় দাঁড় করিয়েছিল। তারই প্রকাশ দেখি কৃষক যুবতীর ওপর পাশবিক বলাৎকার ও আন্দোলনকে নিষ্পেসিত করার জন্য জানোয়ারের মতো হিংসাত্মক কার্যকলাপের মাধ্যমে। অপরদিকে শ্রেণীশত্রুর বিরুদ্ধ আক্রমণ করতে কৃষকরাও পিছপা হয়নি। এখানে প্রশ্ন আসে তবুও কেন ক্ষমতা দখল হলো না? হলো না একটি মাত্র কারণে তা হচ্ছে, সেদিনের সেই সংগ্রামী জনতা অস্ত্রের জন্য তাকিয়েছিল কেন্দ্রের দিকে। লেনিন নির্দেশিত পথের দিকে সেদিন আমরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম। স্থানীয়ভাবে অস্ত্র দখল করে বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাবার একমাত্র রাস্তা- লেনিনের সেই দৃপ্ত ঘোষণাকে মেনে নিতে আমরা সেদিন দ্বিধাবোধ করেছিলাম। ফলে অস্ত্রের সামনে নিরস্ত্র কৃষক রুখে দাঁড়াতে পারলো না। মৃত্যু দেখেও যারা লড়েছিল শেষ পর্যন্ত তারাও পিছিয়ে আসতে বাধ্য হলো। সেদিনকার সেই ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে যে, অস্ত্র সংগ্রহের দায়িত্ব স্থানীয় সংগঠনের, কেন্দ্রের নয়। তাই এখন থেকেই তুলে ধরতে হবে অস্ত্র সংগ্রহের কথা- প্রত্যেকটি সক্রিয় গ্রুপের সামনে দা, ছুরি লাঠি এসব হচ্ছে অস্ত্র, তাই দিয়েই সুযোগ মতো আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিতে হবে।

ওপরের ঘটনাগুলো তত্ত্বগত দিক দিয়ে শোধনবাদী চিন্তাধারা বহিঃপ্রকাশ। এবার সাংগঠনিক দিক দিয়ে এ গুলোকে খুঁজে বার করতে হবে। যা সেদিনকার বিশাল বিশাল আন্দোলনগুলোর সঠিক নেতৃত্বের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পার্টির ভেতরকার সেই সমস্ত ভুল-ত্রুটিগুলোকে আজ চূর্ণবিচূর্ণ করতে হবে। যাতে এগুলো পার্টিতে আর নতুন করে বাসা বাধতে না পারে।

ভুলগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে হলে পার্টিকে আজ সর্বপ্রথম গণসংগঠনের ওপর তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারণ দীর্ঘদিনের পার্টির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষকসভার নেতাদের জনগনের প্রকৃত প্রতিনিধি ভাবার শোধনবাদী চিন্তার ফলে পার্টি কতগুলো ব্যাক্তি বিশেষের পার্টি হিসাবে পরিণত হয়েছিল। এই চিন্তাধারার ফলেই পার্টির রজনৈতিক কার্যকলাপ নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। সমস্ত আন্দোলনটি দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ফলে পার্টির সভ্যরা একটি জয়ে উৎসাহিত ও একটি পরাজয়ে নিরুৎসাহ হয়ে পড়েন।

দ্বিতীয়ত : এই গণসংগ্রামের গুরুত্বকে বেশি করে দেখার ফলে আরেক প্রকার এলাকাবাদের সৃষ্টি হয়। কমরেডরা ভাবেন তার এলাকা থেকে অন্য কমরেডকে সরিয়ে নিয়ে গেলে পার্টির গুরুতর ক্ষতি হবে। এবং এটাকে তারা ব্যক্তিগত ক্ষতি হিসাবে চিন্তা করেন। এই এলাকাবাদ থেকে আরেক প্রকার সুবিধাবাদ জন্ম নেয়। কমরেডরা ভাবেন যে, তার এলাকা সবচাইতে বেশি বিপ্লবী। স্বভাবতই এখানে এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে পুলিশী হামলা হয়। এই দৃষ্টিকোণের ফলে তার সমগ্র দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন না। ফলে হুকুমদারি মনোভাবের জন্ম হয়। এতে যখন কোনো সংগ্রামের আহ্বান আসে তখন তাঁরা কোনো ছোট কাজ করেন না বলে হঠকারিতা করে বসেন। প্রশ্ন আসে কিইবা সেই উপায়গুলো যার সাহায্যে এই সমস্ত বিচ্যুতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়? কিইবা সেই মার্কসবাদী নির্দেশ যা বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথমত, আগামী দিনের গণসংগঠনের সমস্ত কাজ পার্টির পরিপূরক হিসাবে করতে হবে। অর্থাৎ পার্টির একটা মুখ্য উদ্দেশ্য সাধনের একটা অংশ হিসাবে গণসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করতে হবে। স্বভাবতই এর জন্য গণসংগঠনগুলোর ওপর পার্টির নেতৃত্ব কায়েম করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এখন থেকেই সমস্ত শক্তি ব্যয় করতে হবে নতুন নতুন কর্মী সংগ্রহের দিকে এবং তাদের দিয়ে সংযোজিত সক্রিয় গ্রুপ গড়ে তোলার দিকে। মনে রাখতে হবে আগামী সংগ্রামের যুগে বেআইনি অস্ত্রের সাহায্যে জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাই প্রতিটি পার্টি সভ্যকে এখন থেকেই বেআইনি কাজে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। বেআইনি কাজে অভ্যস্ত হতে গেলে বেআইনি পোস্টার মারা প্রতিটি সক্রিয় গ্রুপের অবশ্য কর্তব্য। একমাত্র এই প্রক্রিয়ার দ্বারাই এরা সংগ্রামের যুগে সংগ্রাম পরিচালনার বলিষ্ঠ খুঁটি হিসাবে কাজ করতে পারবে। অন্যথায় বিপ্লবটা মধ্যবিত্তসুলভ স্বপ্নবিলাসিতায় পরিণত হবে।

তৃতীয়ত, এই সক্রিয় সংগঠনের ম্যাধমেই পার্টি গণসংগঠনগুলোর ওপর তার নেতৃত্ব কায়েম করতে পারবে। এজন্য সক্রিয় গ্রুপের কর্মীরা তাদের নেতাদের এবং তাদের কাজের সমালোচনা করার জন্য এখন থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে এবং নেতাদের কাজের সমালোচনা নির্ভীকভাবে করার এখন থেকে তাদেরকে আমাদের সাহায্য করতে হবে।

চতুর্থত, গণসংঠনগুলোর কার্যক্রম পার্টিতে আলোচিত ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পর তবে তা গণসংঠনগুলোতে কার্যকরী হবে। এখানে মনে রাখতে হবে যে, গণসংগঠনগুলোর নীতি এতদিন ভুলভাবে পার্টিতে পরিচালিত হয়ে এসেছে। পার্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনাকে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বলে না। এই চিন্তাধারা মার্কসবাদ সম্মত নয়। এবং এই সমস্ত চিন্তাধারা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসতে হয় যে, পার্টির কর্মসূচি নিচের থেকে গৃহীত হবে। কিন্তু নিচের থেকে গৃহীত হলে তা সঠিক মার্কসবাদী পদ্ধতিতে কার্যকরী করা সম্ভব নয়। এই সমস্ত কার্যাবলীর মধ্যে অনিবার্যভাবে বুর্জোয়া বিচ্যুতি থাকে। গণতন্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মার্কসবাদী সত্য হচ্ছে এই যে, পার্টির উর্ধ্বতন নেতার নির্দেশ অবশ্য পালনীয়। কারণ পার্টির উর্ধ্বতন নেতা তিনিই, যিনি সুদীর্ঘকাল আন্দোলন ও তাত্ত্বিক বিতর্কের মাধ্যমে নিজেকে মার্কসবাদী হিসাবে সুপ্রিষ্ঠিত করেছেন।

পার্টির সিদ্ধান্ত সমালোচনা করার অধিকার আমাদের আছে। কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পর তা কার্যকরী না করে কেউ যদি তার সমালোচনা করেন, অথবা কাজে বাধা দেন অথবা কার্যকরী করতে দ্বিধাবোধ করেন তবে তিনি পার্টির শৃঙ্খলা ভঙ্গের গুরুত্বর অপরাধে অপরাধী হবেন। পার্টির গণতন্ত্র সম্পর্কে এই বিতর্ক সভার ধারণা থাকার ফলে পার্টির মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তির পথ উন্মুক্ত হয়। স্বভাবতই পার্টির নেতৃত্ব তখন দেউলিয়া হয়ে যায় এবং শ্রমিকশ্রেণী সঠিক নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে, পার্টির মধ্যে এই মধ্যবিত্তসুলভ চিন্তাধারা পার্টিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যায়। এবং এটা হচ্ছে পার্টির মধ্যেকার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ। তাদের আয়েশি জীবন আর বিশৃঙ্খলা সমালোচনার মনোভাব পার্টিকে নিছক বিতর্ক সভায় পরিণত করে। এই চিন্তাধারা সর্বহারা শ্রেণীর লৌহ-কঠিন পার্টি গড়ে তোলার পক্ষে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

পঞ্চমত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিশৃঙ্খল জীবন তাকে বিশৃঙ্খল সমালোচনার পথে টেনে নিয়ে যায়। অর্থাৎ সাংগঠনিক চৌহদ্দির ভিতরে তারা সমালোচনা করতে চায় না। এই বিচ্যুতি থেকে উদ্ধার পেতে হলে সমালোচনা সম্বন্ধে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে আমাদের সতর্ক হতে হবে। মার্কসবাদী সমালোচনার বৈশিষ্ট্য হলো- ১) সংগঠনের মধ্যে অর্থাৎ পাটি মিটিং-এ সমালোচনা করতে হবে। ২) সমালোচনার লক্ষ্য হতে হবে গঠনমূলক অর্থাৎ সামলোচনার লক্ষ্য নীতিগতভাবে, সংগঠনগতভাবে পার্টিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে পার্টির মধ্যে যেন নীতিহীনভাবে কোনো সমালোচনা না হয়।

আসুন কমরেড, বর্তমান বৈপ্লবিক যুগে শোধনবাদের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম করে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে আমরা শেষ করি।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “শোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব | চারু মজুমদার

  1. খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখা।
    খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখা। অসংখ্যবার পড়েছি। এই লেখাতেই চারু মজুমদারের সঠিকতা ও বেঠিকতা দুটোই ধরা পড়েছে। সংগ্রামের লাইন তিনি সঠিকভাবেই নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু পার্টির লাইন তলা থেকে আসবে না, তার এই লাইন আমার কাছে সঠিক মনে হয় না। কারণ কমরেড মাও সেতুঙের লেখায় আমরা এই শিক্ষা পেয়েছি যে, জনগণের কর্তৃত্বই প্রধান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3