ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- শিক্ষার্থীবৃন্দের সংবাদ সম্মেলন, তারিখঃ১১ এপ্রিল, ২০১৩

সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা জানেন, ১ এপ্রিল ২০১৩ তারিখ মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসন ও নিয়মনীতিকে ভূলুন্ঠিত করে জগন্নাথ হল থেকে ডিবি পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে যায় বাংলা বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী সুব্রত অধিকারী শুভকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাহসী এই তরুণ অনলাইন পরিসরে যুদ্ধাপরাধী, ঘাতক-দালাল-রাজাকারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার কণ্ঠ। তিনি ছিলেন সকলের মাঝে মুক্তবুদ্ধি চর্চার একজন অগ্রগণ্য উদাহরণ। শুধু লেখালেখির ‘অপরাধে’ হাতকড়া পড়িয়ে, দাগী আসামীর মতো মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করে সরকারের ডিবি পুলিশ। শুধু তাই নয় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় শুভসহ আরো দুইজন অনলাইন লেখককে। আমরা মনে করি,কোন বিশেষ মহলকে খুশি করার জন্য সরকারের এই ঘৃণ্য তৎপরতা।

পথেঘাটে, বিদ্যালয়ে-বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমাবাজি না করে, কারো রগ না কেটে, কাউকে চাপাতি দিয়ে না কুপিয়ে, কাউকে খুন না করে, জনতার সম্পদ ধ্বংস এবং শহীদ মিনার ভাঙচুর ও জাতীয় পতাকার অবমাননা না করে নিজস্ব পরিসরে মুক্তবুদ্ধি চর্চার জন্য গ্রেফতার করে ন্যাক্কারজনকভাবে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে মুক্তমনা তরুণদের। আমরা হতবাক এবং ক্ষুব্ধ; ধিক্কার জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এর প্রতিবাদে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ২/৪/২০১৩ তারিখে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দের অংশগ্রহণে মানব বন্ধন করি এবং মাননীয় উপাচার্যের সাথে দেখা করি। সাক্ষাৎ শেষে জানতে পারি শুভসহ বাকি দুজকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এই অন্যায় রিমান্ডের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এরই অংশ হিসেবে পরদিন বিক্ষোভ মিছিল ও অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিলসহ উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিই। কিছুক্ষণ পর পুরাতন সিনেট ভবনে মাননীয় উপাচার্য ও প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলে অবিলম্বে তাদের মুক্তির বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাই এবং ৪ এপ্রিল রাজু ভাস্কর্যের সামনে শুভসহ গ্রেপ্তারকৃত অনলাইন লেখককে মুক্তি ও জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে মানববন্ধন ও সন্ধ্যায় আলোর মিছিল করি।এবং একই দাবিতে আমরা ৭ এপ্রিল রবিবার বিকেল ৪-০০টায় রাজু ভাস্কর্যে সংহতি সমাবেশ করি।

এ ছাড়া গত ৭ই এপ্রিল রবিবার, দেশের ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিকের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট িিডভিশনে আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া একটি রিট আবেদন করেন। উক্ত তিন অনলাইন লেখককে “গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং সংবিধানের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি অনুচ্ছেদ ও হাইকোর্টের দেওয়া একটি আদেশের লঙ্ঘন বলে গণ্য করা হবে না” এই মর্মে রুল চাওয়া হয় ঐ রিটে।

আমরা স্পষ্ট বলে দিতে চাই, কতকগুলো শব্দ-বাক্যের জন্য কারো গ্রেফতার-রিমান্ড কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। লেখার জবাব হবে লেখা, যুক্তির জবাব হবে যুক্তি এমনটাই সকলের প্রত্যাশা। ডিবি পুলিশ অপরাধের আলামত হিসেবে যখন কম্পিউটার,মডেম জব্দ করতে পারেন তখন আপনার,আমার বুকপকেটের কলম,মস্তিষ্ক জব্দ করতে পারেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী। মুক্তবুদ্ধির চর্চায় পুলিশি নিপীড়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কখনো মেনে নেয় নি। মেনে নেবেও না। অতিসত্বর শুভসহ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মুক্তি দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নাদিয়া শারমিন গত ৬ এপ্রিল আক্রান্ত হন ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর দ্বারা।
ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী চক্র যখন উন্মত্ত আস্ফালন চালাচ্ছে, আক্রান্ত করছে গণতান্ত্রিক বোধকে, রোধ করার চেষ্টা করছে নারীর স্বাভাবিক বিকাশ,তখন রাষ্ট্রের দ্বায়িত্ব এদেরকে দমন করা। সেটা না করে বরং আক্রমণ করা হচ্ছে মুক্তচিন্তার ধারক-বাহকদের।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবুদ্ধির চর্চা, জাতীয় চেতনায় প্রগতিশীলতা, শুভ ও কল্যাণবোধ জাগ্রত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা আন্দোলন, সামরিক শাসন বিরোধী ১৯৬২’র ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৮০’র দশকের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ৯০-এর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামসহ জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জাতিকে সঠিক ও কার্যকর দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
আমাদের চলমান সংগ্রামে আটক অ্যাক্টিভিস্টদের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ-আল্টিমেটামের পরেও সরকার নিশ্চুপ বসে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি। বরং বরাবরের মতোই নির্বিকার থেকেছে।
গত ১০ এপ্রিল, ২০১৩ তারিখে সুব্রত অধিকারী শুভসহ ৪ জন অনলাইন লেখককে আদালতে হাজির করা হয়। ৫৪ ধারায় কাউকে গ্রেফতার করে রিম্যান্ড দেওয়া যায় না। তার ওপর পুলিশ কোনো অভিযোগও গঠন করতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে আগামী ১৫ এপ্রিল, ২০১৩ মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে তিন অনলাইন লেখককে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেয় আদালত। আমরা মনে করি, নির্দোষ অনলাইন লেখকদের জামিন না-দিয়ে জেল হাজতে প্রেরণ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা এবং মানুষের মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির নামান্তর। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
এই পরিস্থিতিতে আমরা নিশ্চুপ থাকতে পারি না।
সুব্রত অধিকারী শুভসহ সকল অনলাইন লেখকের মুক্তি, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ, চিহ্নিত ঘাতক-দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামাত-শিবিরসহ সকল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে আমরা কঠোর থেকে কঠোরতর আন্দোলন করতে বাধ্য হবো।
এই লক্ষ্যে আমরা নিম্নোক্ত কর্মসূচি ঘোষণা করছি।
১। আগামী ১২ এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭-০০টায় রাজু ভাস্কর্য থেকে প্রতিবাদী মশাল মিছিল;
২। ১৩ এপ্রিল শনিবার, ২০১৩ সকাল ১০টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে প্রতিবাদ সমাবেশ;
৩। ১৩ এপ্রিল শনিবার, ২০১৩ ১২-০০ টায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল ও উপাচার্যের অফিস ঘেরাও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ
১১ এপ্রিল, ২০১৩

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- শিক্ষার্থীবৃন্দের সংবাদ সম্মেলন, তারিখঃ১১ এপ্রিল, ২০১৩

  1. ৩ নম্বর কর্মসূচী পছন্দ হয়েছে।
    ৩ নম্বর কর্মসূচী পছন্দ হয়েছে। মিছিল-মিটিং করে লাভ হবে না। এসবের ধার কমে গেছে। এখন লাগাতার অবরুদ্ধ করে রাখা উচিৎ ভিসিকে। একটা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোন আইনে পুলিশ এভাবে রাতের আঁধারে ধরে নিয়ে যায়? ঢাবির শিক্ষার্থীরা এই ঘটনায় আন্দোলনে সোচ্চার না হলে ইতিহাস লজ্জা পাবে।

  2. ভিসিকে বলে লাভ আছে? ভিসি তো
    ভিসিকে বলে লাভ আছে? ভিসি তো সরকারের লোক! তিনি তো ভূলে গেছেন তিনি একজন স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান! তার চেয়ারের বড়ই প্রয়োজন!
    এ প্রসঙ্গে আমার একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করি শুনুন, আমি একটি ইনস্টিটিউটের ছাত্র থাকার সময়ের ঘটনা। একদিন আমাদের হোস্টেলের একজন ছাত্রকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ এসে হাজির। খবর পেয়ে আমাদের অধ্যক্ষ মহোদয় উপস্থিত হলেন, হোস্টেলের সামনে। এসে উনি প্রথমেই পুলিশকে চার্জ করে বলেন, তার অনুমতি না নিয়ে কেন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন ? পুলিশ কোন উত্তর দিতে পারলেন না। অধ্যক্ষ মহোদয় বললেন, আমার অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে অন্যায় করেছেন। সুতরাং এই মুহুর্তে আপনারা ক্যাম্পাস ত্যাগ করুন। তখন পুলিশ দল কোন কথা না বলে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। এটি একটি জেলা পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠান। অথচ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে ভিসির অনুমতি ছাড়া কিভাবে তাঁর ছাত্রকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ… সত্যিই অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছু বলার নাই…

  3. আমারও কিছু বলার নেই।
    আমরা

    আমারও কিছু বলার নেই।
    আমরা ভিসি অফিস ঘেরাও করে ততক্ষণ রাখব যতক্ষণ ভিসি বাইরে না এসে তার অবস্থান স্পষ্ট না করে। ভিসি সুব্রত শুভর ব্যাপারে কোন পদক্ষেপই তিনি নেন নি। একে তো ৫৪ ধারায় কাউকে রিমান্ডে নেওয়া যায় না। তার উপর পুলিশ চার্জ গঠন করতে পারেনি।তারপরও তাকে জেলে প্রেরণ করে ১৫ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণকে আমরা মেনে নিতে পারিনা। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের গাফিলতি ছাড়া আর কিছু নয়। প্রশাসনের ঘুম ভাঙ্গাতেই আমাদের এই ঘেরাও। ভিসির মুখ খোলাবোই।
    জয় বাংলা।জয় মুক্তচিন্তা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 83 = 86