আমার বন্ধু সোমা দাশ ও ধর্ম ক্লাস

সোমা দাশ আর আমি একই এলাকায় থাকতাম। এক সাথে স্কুলে যেতাম আবার আসতাম। যাবার ভাড়া একজন দিতাম, আসার ভাড়া আরেকজন। স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়তেও এক সাথে যেতাম। এভাবেই বন্ধুত্ব মজবুত হতে লাগলো, আড্ডা, টিফিনের ফাঁকে সময় কাটানো ইত্যাদি। আর আমি নারকেলের নাড়ু খুব পছন্দ করতাম, ও প্রায়ই আমার জন্য কাগজে মুড়ে নাড়ু নিয়ে আসতো। প্রতি পুজোতে ওর বাসায় গিয়ে হই হুল্লোড় করতাম।
মাঝে মাঝেই সেইসব মজার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। কিন্তু রয়েছে ভিন্নরকম কিছু স্মৃতিও। এখনো মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে সোমা দাশের একা ক্লাসের সামনে দাড়িয়ে থাকা। ক্লাস ভর্তি শিক্ষার্থী। আর সোমা দাশ ক্লাসের বাহিরে, একা দাড়িয়ে! একটা অসহায় মুখের অবয়ব এখনো আমাকে পীড়া দেয়।

বাংলা, ইংরেজী, অংক, সমাজ, বিজ্ঞানের মত ছিলো ধর্ম বইও(এখনো আছে এবং নিশচয়ই হাজার বছর থাকবে)। কিন্তু ধর্ম ক্লাসটা অন্যান্য ক্লাসের মত ছিলো না। ধর্ম ক্লাসের সময় আসলেই আমার বিরক্ত লাগতো, কারন আমার বন্ধুরা চলে যেতো অন্য ক্লাসে, হিন্দু ধর্মের ক্লাসে। কিন্তু প্রায়ই হিন্দুধর্মের ক্লাস হতো না। কিন্তু এতে তৈরি হতো আরো নির্মম দৃশ্য। শিক্ষক এসে হিন্দুধর্মালম্বীদের বের করে দিতো, ওরা ক্লাসের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে থাকতো।
এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, গোলাপী রং এর কামিজ, সাদা সেলোয়ার, সাদা ক্রস বেল্ট, কোমড় পর্যন্ত মোটা ছড়িয়ে আছে দীর্ঘ একটি বেনি, শ্যাম বর্নের একটি মেয়ে অসহায় হয়ে দাড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমার যে কি অস্বস্তি লাগতো, তা এত বছর পরেও লিখে বোঝাতে পারবো না। না সোমার মুখে কোনদিন অভিযোগ শুনিনি। এটাই যেনো স্বাভাবিক!

এক শ্রেনি থেকে অন্য শ্রেনিতে উঠলাম। কিন্তু সেই ধর্ম ক্লাস, আর মানসিক নির্যাতন পিছু ছাড়লো না, তা আরো ভয়াবহ আকার ধারন করলো। এবারের ধর্ম শিক্ষক ব্যতিক্রম। যারা অন্যান্য ধর্মের তাদের ক্লাস যদি না হয়, তাহলে এই ক্লাসেই বসে থাকতে পারবে। কিন্তু প্রথমে শুনে যতটা স্বস্তিকর লেগেছিলো, পরবর্তিতে ততটাই ভয়ংকর রুপ ধারন করলো।
ধর্ম ক্লাসে মাথায় স্কার্ফ দিতে হবে। সুতরাং অন্য ধর্মের যারা আছে তাদেরও এটা করতে হবে। এরপরে শুরু হতো মগজ ধোলাই। শিক্ষক এমনভাবে লেকচার দিতো, এবং এমন সব গল্প বলতো তাতে করে এটাই স্পষ্ট হতো যে, এক্ষুনি অন্যান্য ধর্মালম্বীদের ইসলাম ধর্ম গ্রহন করা উচিত। প্রতিদিনের ক্লাসে একটা কমন বিষয়ের আলাপ হতো, মুর্তি পুজা নিয়ে। যতরকম স্যাটায়ার আছে, সেইভাবে বর্ননা করতো মুর্তি পুজার। বরাবরের মতই আমার অস্বস্তি লাগতো, আমি সোমার দিকে আড়চোখে তাকাতাম, আমার কেমন কেমন জানি লাগতো। একদিনের ঘটনা এখনো মনে পড়লে আমার শরীরের লোপ কূপ দাড়িয়ে যায়।
সেদিন ক্লাসে সবাইকে একটি সূরা মুখস্ত বলতে হবে। একটু এদিক সেদিক হলেই, কাঠের স্কেলের সাই সাই বারি। ক্লাসে যারা উপস্থিত থাকবে সবাইকে সূরা মুখস্ত বলতে হবে। আমি সোমাকে সেই সূরা মুখস্ত করিয়েছিলাম। কিন্তু খুব স্বাভাবিকভাবেই ও ঠিকমতো মুখস্ত বলতে পারেনি। এখনো কান পাতলে সোমার হাতের ওপর কাঠের স্কেলের বারিগুলোর আওয়াজ শুনতে পাই। সোমার লাল দুচোখ যেনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি একটি বিভাগীয় শহরে বেরে উঠেছি, সেখানকার এই ধর্ম ক্লাস সংক্রান্ত পরিস্থীতি এমন ছিলো, এখনো নিশ্চয়ই আছে। শহরে যদি এমন হয়, তাহলে গ্রামের স্কুল, কলেজে অমুসলিমদের কিরকম প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা স্পষ্ট।

সোমা দাশরা এইসকল স্মৃতি নিয়ে বেড়ে ওঠে। আর আস্তে আস্তে কমে যেতে থাকে এদের সংখ্যা। এরা নিজের দেশকে আর নিজের ভাবতে পারেনা, ছোটবেলা থেকেই এদের ভাবতে দেয়া হয় না। একসময় চলে যায় দেশ ছেড়ে। খুব বেশিদিন নেই, আর কষ্ট করে ইসলাম ধর্ম ব্যাতিত অন্য ধর্মের বই বের করতে হবে না। একটাই ধর্ম ক্লাস থাকবে ‘ইসলাম ধর্ম’। আর কাউকে বের হয়ে যেতে হবে না ক্লাস থেকে, মার খাবার ভয়ে দূর্বোধ্য সূরা মুখস্ত করতে হবে না। নিশ্চয়ই আমার মত সোমা দাশের বন্ধুত্বে বেড়ে ওঠাও কেউ থাকবে না তখন, আর লিখতে বসতে হবে না তার কাছের বন্ধুর সেইসব অসহায়ত্বের গল্প। এদেশে থাকবে একটাই ধর্ম, একটাই ধর্ম অনুসারী মানুষ। সেদিন খুব দূরে নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 42 = 47