আরব থেকে দেওবন্দ হয়ে হাটহাজারীঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক বোঝাপড়া: পর্ব – ৪

আগের পর্বের লিংক এখানে

মুঘল শাসনামলে ভিন্নধর্মী ভারতীয়রা

গত পর্বে আমরা খুব সংক্ষেপে লিখেছিলাম, মুঘল আমলের সম্রাট আকবরের সময় মাদ্রাসা শিক্ষার উজ্জ্বল পর্বের কথা। খানিকটা ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিলো, সেই উজ্জ্বল সময়ের পতনের কথাও, অর্থাৎ মুঘল আমলে আকবরের সময়ের মাদ্রাসা শিক্ষার আপাত মানবিক ও পার্থিব চরিত্রটির পরিবর্তন ঘটে, মুঘল দরবারের ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথেই। মুঘল আমলের মধ্য দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার গতি প্রকৃতি বুঝতে হলে, মুঘল আমলের বিভিন্ন সম্রাটের সময়ে ইসলাম ও ভিন্ন ধর্মের মানুষের অবস্থা বোঝাটা জরুরী। ইতিহাস বলে, ভারতে ইসলাম নানান ধরনে, ঢঙে, মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। ইসলাম প্রচারিত হয়েছে রক্তাক্ত আক্রমন, দখল আর গণহত্যার মধ্য দিয়ে্,‌ কখনও বা আরবী ব্যবসায়ীদের হাত দিয়ে আবার কখনও বা নিরেট ভারতবর্ষে পরিব্রাজক হিসাবে আসা সূফী সাধকদের মাধ্যমে। অনেক ইসলামী সাধক ভারতবর্ষে এসে এখানকার নানান ধর্ম, গোত্রের মানুষদের সংস্কৃতি থেকে নানান উপাদান গ্রহন করেছেন আবার অনেক বিশদ্ধতাবাদী ইসলামী উলামা, ইসলামের বিশুদ্ধতা বজায় রাখবার জন্যে কঠিন ভাবে ভিন্ন ধর্মের মানুষ ও সংস্কৃতিকে দমন করেছেন। এসব আলোচনা এই লেখায় খুব প্রাসঙ্গিক নয়, আমরা হয়ত খুব সামান্য দুই একটা উদাহরণ ইতিহাস থেকে উল্লেখ করবো। তবে আমরা দেখবো মুঘল পরিবারের উদারনীতিবাদী শাসক ও বিশুদ্ধ ইসলামপন্থী শাসকদের সময়কালের মধ্যে একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিলো। সেই পার্থক্যটির মূল বৈশিস্ট্য ছিলো ভিন্ন ধর্মের ও সংস্কৃতির মানুষদের প্রতি এক ধরনের বিমাতা সুলভ, বিদ্বেষপ্রসূত আচরণ। বিশুদ্ধ ইসলামী চর্চা বারবার ভারতের ভিন্ন ধর্মের সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্যোগের খড়গ হয়ে নেমে এসেছিলো। বিশুদ্ধতাবাদী সুন্নী ইসলামের প্রথা ও নীতি প্রতিষ্ঠা করবার প্রভাব পড়েছে পরবর্তী কালে মাদ্রাসা শিক্ষানীতি ও তার কারিকুলাম এর উপরে। আকবর ও জাহাঙ্গীরের সময়কার আপাত উদারনীতিবাদী মাদ্রাসা শিক্ষা ক্রমশই অর্থোডক্স ইসলামী ব্যবস্থার কাছে বন্দী হয়ে পড়ে। মাদ্রাসা শিক্ষার এই ওঠানামা বোঝার জন্যে তাই মুঘল শাসকদের সেই সময়টিতে ধর্ম ও ধর্মীয় জীবনের প্রসঙ্গটিকেও বোঝা দরকার।

উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের সময় অমুসলিমদের অবস্থা কেমন ছিলো? এই প্রশ্নটি খানিকটা অস্বস্তিকর এবং বেশ কয়েকধরনের বয়ান আছে এ বিষয়ে। পাঠককে অনেক সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হয় প্রতিটি বিশ্লেষণের যুক্তি গুলোকে।একাডেমিক পুস্তকগুলোতেও দিধাবিভক্ত মতামত আছে। বাংলার রেনেসার প্রধান ব্যক্তি, রাজা রামমোহন রায় এই নয়শো বছরের সময় অর্থাৎ ভারতবর্ষে ইসলামী শাসন কে ভারতীয় জনগনের জন্যে চরম লজ্জার, অপমানের ও পরাজয়ের কাল বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি এই সময় কে বলেছিলেন “দুঃশাসন”।

আকবরঃ সুন্নী ইসলামের কাছে হেরে যাওয়া এক সম্রাট

আগের পর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে হিন্দুদের উপরে থেকে তীর্থে যাবার জন্যে যে আলাদা কর আদায় করা হতো এবং মুসলমান ভূমিতে বসবাসের জন্যে আলাদা খাজনা বা “যিযিয়া” দিতে হতো, অর্থাৎ ভারতের মানুষদের তাদের বাপ দাদার ভূমিতে বসবাসের জন্যে আলাদা করে কর দিতে হতো। এই অপমানজনক “যিযিয়া”, ১৫৭৯ সালে সম্রাট আকবরের সময়ে তুলে নেয়া হয়। আকবরের ধর্ম সংক্রান্ত ভাবনা গুলো শুরুর দিকে প্রায়শই বাধাগ্রস্থ হয়েছে, চ্যালেঞ্জড হয়েছে তৎকালীন সময়ের ইসলামী উলামাদের দ্বারা। ইসলামী উলামাদের তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রচারনা ছিলো আকবরের বিরুদ্ধে। এর ফলে আকবর কে জনসাধারনের সামনে একজন প্রথাগত মুসলমা্নের ইমেজ তৈরী করতে হয়, মুসলমানদের দৈনন্দিন প্রথা গুলো পালন করতে হয়, হজ্জ এর জন্যে অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য ইসলামী কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে হয়। আকবর তার দরবারে অনেক মুসলিম পণ্ডিত ও উলামাদের আমন্ত্রন জানাতেন ইসলামী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা, সভা করবার জন্যে। এমন কি ১৫৭৫ সালে আকবর “ইবাদত খানা” নামে একটি বিশেষ আলোচনা চক্রেরও প্রচলন করেন।কিন্তু ইবাদত খানায় মুসলিম পণ্ডিতদের আলোচনায়, ব্যাক্ষ্যা শুনতে শুনতে আক্ষরিক অর্থে মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন আকবর এবং পরবর্তীতে “ইবাদতখানা” কে ইসলামী আলোচনা চক্র থেকে একটি আন্ত ধর্মীয় আলোচনার প্ল্যাটফর্মে পরিনত করেন যেখানে তিনি নিমন্ত্রন করতেন – হিন্দু, জৈন, পারসি এবং খ্রিস্টান ধর্মের পন্ডিতদের। গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন তাদের আলোচনা। ইসলামের বাইরে অন্যান্য ধর্ম তাকে এতোটাই আকৃষ্ট করে যে, তিনি হিন্দু ধর্মের বেশ কিছু প্রথা নিজের দরবারে অন্তরভুক্ত করেন। জৈন ধর্মের প্রথার প্রতি সন্মান দেখাতে গিয়ে কিছু কিছু নির্দিষ্ট দিন পশু হত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পর্তুগীজ পাদ্রীদের দ্বারা এতোটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন আকবর যে সেই সময়ের গোঁড়া মুসলিম উলামাগন প্রায় ঘোষনাই দিয়ে ফেলেছিলেন যে আকবর সম্ভবত খ্রিস্টান হতে চলেছেন। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি বরং আকবর ধর্ম হিসাবে ইসলামের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হন এবং ব্রতী হন একটি নতুন সত্যিকারের মানবধর্মের প্রচলনের দিকে, যা সকল মানুষ কে একত্রিত করতে পারে। ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি আকবরের আগ্রহ ছিলো খুবই আলাদা ধরনের। মুঘল সম্রাটদের মাঝে তিনিই একমাত্র উদ্যোগ নিয়েছিলেন রামায়ন ও মহাভারতের ফারসী অনুবাদের। এমন কি মহাভারত ও রামায়নের বিভিন্ন চরিত্রের মিনিয়েচার পেইন্টিংস তৈরির উদ্যোগও নিয়েছিলেন। গোঁড়া ইসলামিক প্রথার প্রতি বীতশ্রদ্ধ আকবর ইসলাম কে নিষিদ্ধ করেন নি, কিন্তু ১৫৭০ সালের পর থেকেই ইসলামের প্রতি আকবর এক ধরনের শীতল আচরণ প্রকাশ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আকবর গোঁড়া ইসলাম পন্থীদের প্রতি এতোটাই বিরক্ত হয়ে ওঠেন যে ধর্ম প্রসঙ্গে আকবরের মতবাদ কে চ্যালেঞ্জ জানানো বেশ কিছু মুসলিম উলামা কে তিনি নানান মেয়াদে শাস্তিও দিয়েছিলেন। ফলে ১৬০৫ সালে আকবরের মৃত্যুর পরে গোঁড়া মুসলিম উলামাগন আবারো সক্রিয় হয়ে ওঠেন যার ফলে আকবর পুত্র জাহাঙ্গির কে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়।

মাদ্রাসা শিক্ষা প্রসঙ্গে সম্রাট আকবর এর শাসন আমল কে এভাবে আলাদা করে বর্ণনা করবার মূল কারণটি হচ্ছে, ভারতবর্ষের নয়শো বছরের মুসলিম শাসনের মধ্যে সম্রাট আকবরের ৪৩ বছরের সময়কালটিই ছিলো সবচাইতে মুক্ত ও মানবিক চর্চার সময়কাল। এই সময়টিতেই মাদ্রাসা শিক্ষা অনেকটা সার্বজনীনতা পেয়েছিলো, যা মুলত ধর্ম প্রসঙ্গে সম্রাট আকবরের ব্যক্তিগত বোধ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারনেই সম্ভব হয়েছিলো। আকবরের মৃত্যুর পরে জাহাঙ্গির চেষ্টা করেছিলেন পিতার নীতি অনুসরনের কিন্তু গোঁড়া মুসলিম উলামাদের ক্রমাগত চাপের মুখে তিনিও কোণঠাসা হয়ে পড়েন তার চিন্তার জগতে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পরে তার পুত্র শাহজাহান হাজির হন একজন বিশুদ্ধতাবাদী মুসলমান হিসাবে। অমুসলিম ও হিন্দুদের প্রতি শাহজাহানের প্রতিক্রিয়াশীল ভুমিকার কথা ইতিহাসে লেখা আছে।তিনি ধর্মত্যাগ ও নাস্তিকতা কে চরম অপরাধ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্দেশ দিয়েছিলেন বেনারসে মন্দির ধংসের আর আগ্রায় খ্রিস্টান চার্চ ভেঙ্গে ফেলার। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি শাহজাহানের প্রতিক্রিয়াশীলতা খানিকটা প্রশমিত ছিলো তার বড়ো পুত্র দারাশিকো’র প্রভাবের কারনে। সংস্কৃত ভাষার বিশিষ্ট পন্ডিত মেধাবী দারাশিকো’র সুস্পষ্ট বিরোধিতা ছিলো সেই সময়কার গোঁড়া উলামাদের নানান ধরনের ফতোয়াবাজীর বিরুদ্ধে।

আউরঙ্গজেবঃ সূফী ইসলামের একনিষ্ঠ সেবক

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে শাহজাহান পুত্র দারাশিকো ক্ষমতার লড়াইয়ে হেরে যান ছোট ভাই আউরঙ্গজেব এর কাছে। ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে দারুন ভাবে পরিচিত ও উচ্চ-শিক্ষিত দারাশিকোহ হেরে জান ছোটভাই আউরঙ্গজেব এর ধর্মনিষ্ঠা ও ইসলামী ব্যক্তিত্বের কাছে। ফলে, ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি সবচাইতে হিংসাত্মক – প্রতিক্রিয়া পরায়ন সম্রাট হিসাবে আউরঙ্গজেব আবির্ভূত হন মুঘল সাম্রাজ্যের নতুন অধিপতি হিসাবে। অন্যান্য ধর্মের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ থাকলেও, আউরঙ্গজেব নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন বিশুদ্ধতাবাদী সুন্নী মুসলমান হিসাবে। ফলে একজন আদর্শ সুন্নী মুসলমান হিসাবে তিনি ফিরে যান ইসলামের গোঁড়া প্রথাবাদীতার দিকে অর্থাৎ শরিয়া আইনভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে। মুঘল রাজ দরবারে যে সকল ভারতীয় তথা হিন্দুয়ানী সাংস্কৃতিক প্রথা সংযুক্ত হয়েছিলো তার পূর্ব পুরুষদের আমলে, তার প্রায় সকল কিছুই কেটে ছেঁটে বাদ দিয়ে দেন তিনি। পরদাদা আকবর ভারতীয় ভিন্ন ধর্মের মানুষদের জন্যে অসন্মান জনক ইসলামী প্রথা “যিযিয়া” তুলে নেন ১৫৭৯ সালে আর ঠিক একশো বছর পরে সম্রাট আউরঙ্গজেব ১৬৭৯ সালে আবার পুনপ্রবরতন করেন “যিযিয়া” কর, যা একটি ইসলামী ভূমিতে বসবাসের জন্যে ভিন্ন ধর্মের মানুষের উপরে এক ধরনের অর্থনৈতিক দন্ড। শুধু “যিযিয়া” ই নয়, খাজনার বেলাতেও হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে হিসাবের পার্থক্য ছিলো। ভারতীয় হিন্দু ও অমুসলিম মানুষদের খাজনা দিতে হতো মুসলমানদের চাইতে অনেক বেশী। “ঝরোকা দর্শন” বলে একটি প্রথা প্রচলিত ছিলো তার পূর্বপুরুষদের আমলে, এই প্রাত্যহিক প্রথাটি ছিলো, সম্রাটগণ প্রতিদিন রাজবাড়ীর ব্যালকনি থেকে সাধারণ জনগনের উদ্দেশ্যে তাদের চিন্তা ভাবনা পেশ করতেন, সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগের এই প্রথাটি বাতিল করা হয় কেবল মাত্র এই কারনে যে এই একই প্রথা আদি হিন্দু রাজা ও শাসকেরাও চর্চা করতেন। হিন্দু গণক দের দ্বারা বছরের হিসাব করা ও শুভ দিনের তালিকা করার প্রথাটিও বাতিল করা হয় এই সময়েই, হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন উৎসবের উল্লাস ও আয়োজন কে নিয়ন্ত্রিত করা হয়, শিয়া মুসলিমদের মুহাররম পালনও নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু তাইই নয়, সাধারণ মানুষের দাড়ি – গোঁফ কেমন হবে সেই বিষয়েও রাজ দরবারের সান্ত্রী- সেপাইদের তদারকি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। ইসলামিক ভারত প্রতিষ্ঠাই ছিলো তার লক্ষ্য আর সেই লক্ষ্য পুরনের প্রথম খড়গ নেমে আসে ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে। এমন কি তার বিশুদ্ধ ইসলামিক বিধি বিধানের খড়গের হাত থেকে রেহাই পাননি কিছু উদারনিতিবাদী – সুফিবাদী মুসলিম মানুষেরাও।


মুঘল পরিবারের সবচাইতে বিশুদ্ধতাবাদী শরীয়া প্রেমিক সম্রাট আউরঙ্গজেব

আউরঙ্গজেব এই সকল কিছুই যে তার হিন্দু বিদ্বেষ থেকেই করেছেন তা নাও হতে পারে, তিনি নেহায়েতই একজন একনিষ্ঠ সুন্নী মুসলমান হিসাবেও করে থাকতে পারেন বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন। একজন নিষ্ঠাবান সুন্নী মুসলমান যিনি ভারতীয় সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করেন না তার পক্ষে কেবল পরদাদা মেনেছেন বলেই দরবারের হিন্দুয়ানী প্রথা বা সাংস্কৃতিক চর্চাগুলোকে রক্ষা করে চলাটা কঠিন ছিলো। বিশুদ্ধ সুন্নী ইসলামী রীতিতে তা কাম্যও ছিলোনা। অনেকেই মনে করেন, আউরঙ্গজেব এর হিন্দু মন্দির ভাঙ্গার ঘটনা গুলো কোনও ধর্ম বিদ্বেষ থেকে ছিলোনা, বরং কিছু ব্যক্তি বিশেষ কে শায়েস্তা করবার নমুনা ছিলো মাত্র। কেউ কেউ মনে করেন, আউরঙ্গজেব নির্বিচারে সকল মন্দির ধ্বংস করেন নি বরং শুধুমাত্র যে সকল মন্দীরগুলো ছিলো হিন্দু রাজত্ব ও ক্ষমতার প্রতীক সেই ধরনের কিছু মন্দিরই ধ্বংস করেছিলেন। কোনও কোনও বয়ান বলে থাকে, আউরঙ্গজেব মন্দির ধ্বংস করেছেন বটে, কিন্তু কিছু মন্দির সংস্কারের জন্যে তার অর্থদানের ইতিহাসও আছে। তবুও মথুরা কিম্বা বেনারসের মন্দির ধ্বংস করা ছিলো সেই সময়ের ভারতীয় হিন্দুদের জন্যে এক হৃদয় বিদারক ঘটনা। আউরঙ্গজেব এর ইসলামী উচ্চাভিলাষের কারনে শিখ সম্প্রদায়ের সাথেও তার ছিলো সাঙ্ঘরষিক সম্পর্ক। ইসলাম ধর্ম গ্রহনে অস্বীকৃতি জানানোয় ১৬৭৫ সালে শিখ ধর্ম গুরু তেজ বাহাদুরকে নিহত হতে হয় আউরঙ্গজেব এর অনুগতদের হাতে।

(ছবিতে “ঝরোকা দর্শন” ঠিক এই ধরনের ব্যালকনিতে মুঘল সম্রাটগণ প্রায়শই সাধারণ জনগনের সাথে মত বিনিময় করতেন, যে প্রথাটির নাম ছিলো “ঝরোকা দর্শন”, শ্রেফ হিন্দুয়ানী প্রথা বলে সম্রাট আউরঙ্গজেব ঝরোকা দর্শন এর চর্চাটি বাতিল করে দেন। ইসলামী সংস্কৃতির সাথে ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধ কমিয়ে আনার চেস্টায় ব্রতী হয়েছিলেন সম্রাট আকবর আর তাঁর বিপরীত পথেই হেটেছেন আউরঙ্গজেব)

সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীর এর আমলের মোট ৭২ বছর যদি হয়ে থাকে উপমহাদেশে ইসলামের সবচাইতে উদারপন্থী সময় তাহলে সম্ভবত শাহজাহান ও আউরঙ্গজেব এর প্রায় আশি বছরের শাসনকাল হচ্ছে ভারতীয় আদিনিবাসী হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের মানুষদের জন্যে এক দীর্ঘ বন্দিত্ব, অপমান ও অমানবিক জীবনের কাল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শাহজাহান ও আউরঙ্গজেব এর আমলের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার উপরে।

মাদ্রাসা শিক্ষার উল্টোযাত্রা

শাহজাহান এর আমল থেকে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা উল্টো পথে যাত্রা শুরু করে আর শরিয়া প্রেমিক আউরঙ্গজেব এর আমলে তা পৌছে যায় ইসলামের নবী মুহাম্মদের আমলে, যখন নও – মুসলিমদের ইসলামের আদব লেহাজ শেখানোই ছিলো এই ‘ইসলামী শিক্ষা’ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ ইসলামে শিক্ষা দীক্ষা বলে যা কিছু ছিলো তা আসলে শুরু হয়েছিলো মুহাম্মদ ও তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে এক ধরনের ইসলামী রীতিনীতি শেখানোর ব্যবস্থা হিসাবে। খুব সংগঠিত কোনও কাঠামো বিহীন মাদ্রাসা শিক্ষা যখন এক ধরনের কাঠামো লাভ করছিলো, আকবর ও জাহাঙ্গির এর আমলে যখন এই শিক্ষা ব্যবস্থা টি এক ধরনের সেকুলার বা পার্থিব চরিত্র লাভ করছিলো, ঠিক সেই সময়ে সুন্নী ইসলাম প্রেমিক শাহজাহান এবং তার চাইতেও বেশী নিবেদিত প্রাণ শরিয়া প্রেমিক আউরঙ্গজেব এর প্রবেশ ঘটে মুঘল পরিবারের মঞ্চে। আউরঙ্গজেব মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার কে পুনরায় ইসলামী গন্ডির মধ্যে নিয়ে আসেন এবং দেশ বিদেশের নানান বিষয়ের উপরে পড়াশোনার চাইতে বরং ইসলামী রীতিনীতি শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা নিশ্চিত করেন। আউরঙ্গজেব এর আমলে হিন্দু মন্দির ধংসের হুকুম ছাড়াও, হিন্দু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধংসের কথাও লিখেছেন কোনও কোনও ঐতিহাসিক (রিয়াজ, পৃষ্ঠা ৬৩)। আউরঙ্গজেব শিক্ষাকে অনেকটাই মুসলিম তরুনদের মাঝে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন, মুসলিম তরুণদের জন্যে প্রচুর বৃত্তি ও জাইগীর ব্যবস্থার নজির দেখা যায় তাঁর আমলে। ইসলামী শিক্ষার প্রসার নিয়ে তাঁর অসন্তোষ ছিলো, তাই আউরঙ্গজেব তাঁর আমলে প্রচুর সংখ্যক নতুন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। আগের পর্বে আমরা জেনেছিলাম, মাদ্রাসা শিক্ষার সবচাইতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ছিলো দুইটিঃ প্রথমত – পড়াশোনার পদ্ধতি হিসাবে মুখস্থ করার বদলে বুঝে বুঝে পড়া, চিন্তা করা এবং আলোচনা – সমালোচনার মাধ্যমে কোনও বিষয় কে আত্মস্থ করার পদ্ধতির প্রচলন এবং দ্বিতীয়ত – মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলামের আমুল পরিবর্তন করে এতে অন্তরভুক্ত করা হয় দেশ-বিদেশের নানান বিষয়, অন্তরভুক্ত করা হয় ভারতীয় ধর্ম ও ভাষা বিষয়ে শিক্ষার সুযোগ। এই দুটি পরিবর্তনই আসে সম্রাট আকবরের নিজস্ব প্রচেস্টায়। দুর্ভাগ্যজনক সত্যি হচ্ছে, এই দুটি পরিবর্তনকেই বাতিল করে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া হয় আউরঙ্গজেব এর আমলে। সকল র্যা শনাল বিষয় কে সরিয়ে নেয়া হয় পাঠ্যক্রম থেকে। তাই মাদ্রাসা, বিদ্যাপীঠ হয়ে উঠবার বদলে হয়ে ওঠে কেবল “ইসলামী” রীতিনীতি শেখার স্থান। মাদ্রাসা বলতেই আজ এক ধরনের পসচাদপদ অনগ্রসর শিক্ষা ব্যবস্থার কথা ভেসে ওঠে আমাদের সকলের মনে, কে জানে, হয়তো সম্রাট আকবর বা জাহাঙ্গীর এর ধারায় বিকশিত হলে মাদ্রাসা শিক্ষার অবস্থা আজ ভিন্নরকমের হতে পারতো। আউরঙ্গজেব এর আমলের একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটনা ছিলো লখনৌর “ফারাঙ্গী মহল” এর প্রতি তাঁর সমর্থন ও সাহায্য। ফারাঙ্গী মহল প্রথাগত মাদ্রাসা শিক্ষার চাইতে ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করে বিখ্যাত হয়ে আছে ইতিহাসে। ফারাঙ্গী মহল এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় এর অবদান নিয়ে একটি আলাদা পর্ব লেখার ইচ্ছা রইলো।

(চলবে)

তথ্যসুত্রঃ

1. Faithful Education: Madrassahs in South Asia, Ali Riaz, Rutgers University Press, 2013

2. The Deoband Madrassah Movement: Counter cultural trends and tendencies, Muhammad Moj, Anthem Press, 2015

3. Islamic Civilization in south Asia: A history of Muslim power and presence in the Indian sub-continent, Burjor Avari, Routledge, 2013

4. A concise history of India, Barbara D Metcalfe, Cambridge University press, 2002

5.Raja Rammohun Roy, An encounter with Islam and Christianity and the articulation of Hindu self-conciousness, Abidullah Al Ansari Ghazi, Xlibris corporation, 2010

6. Islamic revival in British India: Deoband, 1860 – 1900, Barbara Daly Metcalf, Princeton University press, 1980

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “আরব থেকে দেওবন্দ হয়ে হাটহাজারীঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু সাম্প্রতিক বোঝাপড়া: পর্ব – ৪

  1. আগের পর্বগুলোর মত ভাল লাগল।
    আগের পর্বগুলোর মত ভাল লাগল। সম্রাট শাহাজাহান ও তার ছেলে আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ ৮০ বছরের শাসনামলে সমগ্র ভারতে অমুসলিমদের উপর নির্যাতন ও হিন্দুদেরকে অশিক্ষিত রাখার প্রকল্প অনেক ইতিহাসবিদের ইতিহাসে স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। সেই প্রকল্পের অংশ হিসাবে সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে মুসলিম জঙ্গি তৈরির কারখানা হিসাবে মাদ্রাসাকে পূর্ণগঠন করেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে।

  2. সম্রাট আকবর আওয়ামীলীগের চেয়েও
    সম্রাট আকবর আওয়ামীলীগের চেয়েও অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। মোগল সাম্রাজ্য আওরঙ্গজেবের কাছে এসে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মকে চুড়ান্ত আকারে প্রমোট করা শুরু হয়। ঠিক এখন যেমনটা হচ্ছে বর্তমান আওয়ামীলীগের মাধ্যমে।

    এই উপমহাদেশে আওরঙ্গজেবের হাত ধরেই সুন্নী ইসলামের গোড়াপত্তন হয় বলে শুনেছি। আপনার এই পোস্টটা পড়ে তেমনটাই মনে হল। যথেষ্ঠ তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। সিরিজ চলুক।

  3. সিরিজ চলুক। চূড়ান্ত মন্তব্য
    সিরিজ চলুক। চূড়ান্ত মন্তব্য এখন করা উচিৎ হবেনা। আর আপনার ফেসবুক বন্ধ কেন? ##যুক্তির আকাশে উড়ুক মুক্তির বারতা#

    #

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

35 − 33 =