বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ

আমাদের সমাজ তথা বাংলাদেশ বিজ্ঞান বিমুখ এক অন্ধকার জগতে বসবাস করছে। অথচ মানুষ বিজ্ঞানের ব্যবহার যে করছেনা তা নয়। মানুষ ঔষধ খায়, আবার তাবিজও ব্যবহার করে, পানি পড়া খায়, মন্দিরে- মাজারে মানতও করে। এহেন দ্বৈত মানষিকতার পেছনে বিজ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহই একমাত্র কারন।

বিশাল জনগোষ্ঠী মোবাইলে ভিডিও কল করে আবার চাঁদে সাইদীর মত যুদ্ধাপরাধীদেরও দেখতে পায়। গুজবে কান দিয়ে ধংসযজ্ঞে অংশগ্রহন করতে তাদের বিবেকে বাধেনা। ধর্মীয় উন্মাদনায় উন্মত্ত হয়ে পশুর ন্যায় মানুষ হত্যা করাকে মনে করে পুন্যের কাজ। যা কখনোই মানবিক হতে পারেনা। আজ বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এমন উন্মত্ত ধার্মিকের সংখ্যা অগনিত। এরা না জানে কোরান, না জানে পূরান। এদের কাছে মিয়াসাব, হুজুর কিংবা মৌলানা সাহেবের কথাই ঈশ্বর প্রদত্ত অমোঘ বানী বলে মনে হয়।

এর জন্য মূলতঃ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই দায়ী। শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান যেন কাজীর গরু, কাগজে আছে, গোয়ালে নেই। লোকে বিজ্ঞান পড়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য, বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য না। আবার ডাক্তারেরাও এমনসব ডাক্তার হচ্ছেন যারা টাকার জন্য ডাক্তারী করেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি চেষ্টা তো দূরে থাক রোগীর রোগটা সম্পর্কে সম্যক ধারনা নিতেই নারাজ। কিছু মুখস্ত ঔষধপত্র আর টেস্ট দিয়েই ডাক্তার খালাস। ঔষধ দেন আবার উপরওয়ালার কাছে ভরসা রাখতেও বলেন। এমন অদ্ভুত স্ববিরুধীতা হয়ত বাংলাদেশেই দৃশ্যমান হওয়া সম্ভব। আর যারা ইঞ্জিনিয়ার তারা শুধু মুখস্ত কোন কিছু বানাতেই বেশি পারঙ্গম। তাদের কাছে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে নতুন কিছু করাটা একটা ফালতু কাজে পরিনত হয়েছে। এমনও হতে পারে তারা পরিবেশ বিষয়ক কোন জ্ঞানই রাখেন না।

এতো গেল ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ারদের কথা, কিন্তু যারা সমাজের আলোকবর্তৃকা অর্থাৎ শিক্ষক সমাজ, তাদের অবস্থাটা কি? শিক্ষক সমাজ আলোকের সন্ধান তো দূরে থাক, তারা নিজেরাই একেকজন নিমজ্জিত সেই প্রাচীনের গহীন অন্ধকারে। সাইদীকে চাঁদে দেখার ঘটনা নাকি কিছু কিছু কলেজের অধ্যক্ষরাও বিশ্বাস করেছেন বলে শুনা যায়। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে কি? শিক্ষকেরা দর্শন পড়ান, আবার ধর্মীয় উপাসনার নির্দেশও দেন। তারা সমাজকে মানবিক হবার উপদেশ না দিয়ে ধার্মিক হওয়ার তাগিদ দেন। তারা ছাত্রদেরকে নিজে নিজের মত বেছে নেবার স্বাধীনতার শিক্ষা না দিয়ে শিক্ষা দেন সমাজে কিভাবে নিজেকে আরো গ্রহনযোগ্য করা যায়। সমাজে গ্রহনযোগ্যতার মাপকাঠি কে কত বড় উপাসক। ঘূষ, দুর্নীতি, চুরি ছিন্তাই করে হোক বা যা কিছু করেই হোক মসজিদে বা মন্দিরে গেলেই সাত খুন মাফ। আর এমন গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ছাত্ররা যতই অন্ধকারের দিকে ধাবিত হোক তাতে শিক্ষক ও সমাজের কিছু যায় আসেনা।

এই শিক্ষকই পড়াচ্ছেন বিজ্ঞান। বিজ্ঞানে পড়ান বৃষ্টির কারন হলো প্রাকৃতিক পানি চক্র, আবার এও অস্বীকার করেন না যে বৃষ্টির পেছনে মিকাঈল নামক ফেরেস্তার অবদান আছে। বিদ্যুৎ বা বজ্রের কারন ব্যাখ্যা করেন মেঘে আয়নিত জলীয় বাষ্পের কথা বলে, আবার বজ্রের দেবতা ইন্দ্রকেও অস্বীকার করেননা। কিংবা বজ্রপাত থেকে বাচার পদ্ধতি শিখিয়ে সাথে সাথে দোয়া পড়ার শিক্ষা দিতেও ভুলেন না। সমাজবিজ্ঞানের পড়ান আদিমযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস, সাথে সাথে মনু কিংবা আদমের গল্পকেও সত্য বলে জ্ঞান করেন। দর্শন পড়ান অথচ যুক্তিকে করেন হাস্যকরভাবে উপেক্ষিত।

ফলে আমাদের দেশে বিজ্ঞানই হয়ে গেছে সন্দিহান এক বিষয়ের নাম। অথচ বিজ্ঞানই হচ্ছে প্রমানিত সত্যের একমাত্র একটি শাস্ত্র। যেখানে প্রশ্ন করার কথা অলীক কল্পনার মিথ কিংবা ঐশ্বরিক বানী নামক কথাগুলোকে, সেখানে বিজ্ঞানের চন্দ্র কিংবা মংগল অভিযানই হয় আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এমন অবস্থায় ধর্মীয় উন্মাদনা খুব অস্বাভাবিক কোন বিষয় নয়। তাই আমাদেরকে আবার গোড়া থেকেই ভাবতে হবে।

স্কুল-কলেজগুলোতে বিজ্ঞান পড়ানোর পাশাপাশি বিজ্ঞানের চর্চা করারও অভ্যাস করতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ

  1. ফলে আমাদের দেশে বিজ্ঞানই হয়ে

    ফলে আমাদের দেশে বিজ্ঞানই হয়ে গেছে সন্দিহান এক বিষয়ের নাম

    ঠিক বলেছে। এদেশে স্কুল কলেজে ছেলেমেয়েরা বিজ্ঞান পড়ে, জানে না। পড়ে, মুখস্ত করে পরীক্ষায় পাস করার জন্য। মুখস্ত করে আর বিজ্ঞানকে অবিশ্বাস করে

  2. আমাদের দেশে বিজ্ঞানই হয়ে গেছে

    আমাদের দেশে বিজ্ঞানই হয়ে গেছে সন্দিহান এক বিষয়ের নাম। অথচ বিজ্ঞানই হচ্ছে প্রমানিত সত্যের একমাত্র একটি শাস্ত্র

    একটা মাত্র উদাহরনে বলতে গেলে …
    যে দেশের মানুষ বিজ্ঞানের অনন্যা সৃষ্টি এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে ফটোশপে চাঁদে সাঈদীর এডিট করা ছবি দেখিয়ে, সেই ছবি দেখে বিভ্রান্ত হয়ে হাজার হাজার নারী পুরুষ রাস্তায় নেমে ভাঙচুর-তান্ডব চালায় । তার মধ্যে সবাই যে একেবারে অশিক্ষিত ছিল তা কিন্তু নয়, অনেক শিক্ষিত মানুষ’কেও সেদিন বিভ্রান্ত হতে দেখা গিয়েছিলো। সুতরাং শুধুমাত্র মুখস্থ বিদ্যার নামে শিক্ষিত ও অন্ধকারগামীদের বিভ্রান্ত থেকে আরো বিভ্রান্ত করে রেখে সুবিধাবাধী’রা ঠিকই বারবার নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার চেস্টায় মগ্ন থাকে । তাতে করে, আমাদের দেশে বিজ্ঞান যে, অন্ধকার থেকে আলোর পথে নাকি আরো অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায় !!! — আর সেখানে এর চেয়ে ভাল উক্তি আর কি হতে পারে !!!

    তবে এই দায় কার ??
    এই দায় অবশ্যই রাস্ট্রের …
    আমাদের রাস্ট্র তার শিক্ষা ব্যবস্থায় পারেনি ওদের’কে বিজ্ঞান-মনস্ক করে আধুনিক ও শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে ।

  3. // তবে এই দায় কার ??
    এই দায়

    // তবে এই দায় কার ??
    এই দায় অবশ্যই রাস্ট্রের …//

    হ্যা, রাষ্ট্র এই দায় এড়াতে পারেনা কোন মতেই।

    তবে বিজ্ঞানমনষ্ক যে গুটিকয়েক মানুষ আছেন তাদের কি কোন দায় নেই?
    আমি মনে করি আমাদেরো কিছু করার আছে। আমরা বিজ্ঞান বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি মানুষকে বিজ্ঞানমুখী করার জন্য।

  4. আমাদের দেশে বিজ্ঞান চর্চা
    আমাদের দেশে বিজ্ঞান চর্চা হারুন ইয়াহিয়া,জাকির নায়েক,রাশেদ খালিফাদের কাছে বন্দি। আমার এক বন্ধু প্রায় এদের ভিডিও আমাকে সেন্ড করে অলৌকিকতা জাহির করতে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 + = 94