কবি সরোজ দত্ত ও তার পুরাণ বিনির্মাণ!

তরুণেরা অনেকেই হয়তো তার নাম শোনেনি। তবে ফেলে আসা দিনের কথা বলতে বসলে এই নামটা আড়াল করা যায় না। সেই যে ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে গিয়েছিল নকশালরা, তাদের অন্যতম একজন প্রধান নেতা! কমরেড সরোজ দত্ত নামে পরিচিত তিনি। নকশালরা অবশ্য আজো লড়ছে! এখন তাদের নাম মাওবাদী- শুনলেই কেমন বারুদের গন্ধ মেলে নাকে!

অথচ এই মাওবাদীদের নেতা কার্ল মার্কস, মাও সেতুং, এমনকি এ দেশের নেতা সরোজ দত্ত- সবারই নিদেনপক্ষে একটা করে কাব্যগ্রন্থ আছে! এদেশে অবশ্য আমরা সুকান্তের বরাতে বিপ্লবীদের সাহিত্যপ্রীতির সঙ্গে অল্পবয়স থেকেই পরিচিত! তবে সরোজ দত্ত সুকান্তের মতো নাম নয়! তিনি যেন অন্য কোনো পথের যাত্রী! তার কবিতায় এসংশ্লিষ্ট একটি ছত্র মিলেছে-‘মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যেন রাত্রি দ্বিপ্রহরে, চলেছি নিশির ডাকে অন্ধকারে সাংঘাতিক পথে’!

সুকান্তকে আমরা বিপ্লবের স্বপ্নমন্থন করতে দেখেছি! আর সরোজ দত্ত নিজেই বিপ্লবের ডঙ্কাবাদক! যে আধুনিক ভারত রাষ্ট্র সুকান্ত’র নামে রাস্তা-ঘাট, বিদ্যালয়-শিল্পালয় করে, সেই রাষ্ট্রই সরোজ দত্তকে হত্যা করে তার গলাকাটা লাশ রাস্তায় ফেলে রেখেছিল! যে কবি চাষাকে কেবল কাব্যালঙ্কার দিয়ে মহান করেননি, চিরকালের নিপীড়িত চাষাকে কাব্যালঙ্কারে না ভুলে নিজের অধিকার বুঝে নিতে লড়াইয়ে নামতে বলেছিলেন! তাই জেগে থাকা অশোক মূর্তির ন্যায়রাষ্ট্র স্বদেশের নিরাপত্তার অজুহাতে খুঁড়ে খেয়েছে কবির হৃদপিণ্ড! তা নিয়ে অবশ্য কবির কোনো আক্ষেপ নেই! লিখেছেন, ‘কবরে প্রেতিনী হয়ে কাঁদিবেনা আমার বেদনা, দুঃসাহসী বিন্দু আমি, বুকে বহি সিন্ধুর চেতনা’!

বিপ্লবী কবি সরোজ দত্ত ১৩২১ বঙ্গাব্দের ২১ ফাল্গুন বাংলাদেশের নড়াইল জেলার দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম হৃদয়কৃষ্ণ দত্ত, মা কিরণবালা দত্ত। নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর ১৯৩০ সালে কলকাতায় আসেন স্কটিশ চার্চ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে। ওই একই কলেজ থেকে ১৯৩৬ সালে ইংরেজি বিভাগে স্নাতক হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে ভর্তি হন। তার গোড়ার দিকের ঘটনাবলী আর দশটা লোকের মতোই! জন্মেছেন, পড়েছেন, পাশ দিয়েছেন, চাকরি করেছেন, সংশয়েও ভুগেছেন। কিন্তু আর দশজনের মতো সেই তমসার তামাশায় তিনি জীবনটাকে বিলীন হতে দেননি! ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন সমাজ ও রাষ্ট্র নির্ধারিত বৃত্ত- ‘হেসে ওঠে দস্যু কবি অক্রোধের ক্লীবলজ্জা ছেড়ে, তামসীর তৃপ্তির দিন সাঙ্গ হলো তমসার তীরে’!

কলেজে থাকতেই কমিউনিস্ট পার্টির গণসংগঠনে যুক্ত হন, জেল খাটেন। তবে শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে তার ওঠবসটা নিয়মিতই ছিল। ১৯৩৮ সালে এমএ পাস করার পর যোগদান করেন প্রগতি লেখক সঙ্ঘে। পরের বছর, ১৯৩৯-এ, আশুতোষ কলেজ হলে প্রগতি লেখক সঙ্ঘের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সমর সেন তার ‘In Defense of Decadents’ রচনাটি পাঠ করেন। ‘অগ্রণী’ পত্রিকার পাতায় সরোজ দত্ত এর উত্তর দেন। ‘অতি আধুনিক বাঙলা কবিতা’ এবং ‘ছিন্ন করো ছদ্মবেশ’ শিরোনামে লেখা প্রবন্ধে প্রগতিশীলতার মোড়কে ধেয়ে আসা প্রচ্ছন্ন ফ্যাসিবাদী এলিওটিজমকে চিহ্নিত করেন তিনি। সমর সেনের সাথে এই বাদ-প্রতিবাদ অনেকদূর গড়ায়। এই সময় থেকেই সরোজ দত্তর কবিতা প্রকাশ হতে শুরু করে। ১৯৩৯ সালে সহ-সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন অমৃতবাজার পত্রিকায়। ১৯৪০-এ তাঁর লেখা দুটি গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যার গায়ক ছিলেন সুধীন চট্টোপাধ্যায়।

‘In Defense of Decadents’ বা ‘অবক্ষয়বাদীদের সমর্থনে’ রচনায় সমর সেন দাবি করেছিলেন, যেহেতু অবক্ষয় বিষয়টা বুর্জোয়া সমাজের একটা বাস্তবতা, অতএব একে সমালোচনা বা তিরস্কার না করে শুধুমাত্র চিত্রিত করাটাই প্রগতিশীলতার পরিচয়ক। এই এলিওটিয় মতামতকে সরোজ দত্ত সমর্থন করতে পারেননি। কার্ল রাডেকের মতই এলিওটপন্থীদের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন ফ্যাসিবাদের ছায়া। সরোজ দত্ত আলাপ তুলেছিলেন শিল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ঘিরে। শিল্পের কাজ শুধুমাত্র সমাজের আয়না হয়ে ওঠা নয়! সমাজ গঠনেও তার ভূমিকা থাকে। সেক্ষেত্রে ডেকাডেন্ট বাই-প্রোডাক্টগুলোর স্থান যে প্রগতি আন্দোলনের অন্তরায়, তা বোধ করি উল্লেখ না করলেও চলে।

যাই হোক, সরোজ দত্তের কবিতায় ফিরে যাই। বিনয় ঘোষ তার ‘সাম্প্রতিক বাঙলা কবিতা’ প্রবন্ধে সরোজ দত্তর কবিতার বৈপ্লবিক স্বরূপ, তার ছন্দবদ্ধতা, শব্দের ঋজু ব্যবহার, আবেগের বুদ্ধিদীপ্ত সংমিশ্রণ, ইত্যাদির প্রশংসা করে তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘ভবিষ্যতে মানুষের মহাতীর্থ গঠনের স্বপ্নে মশগুল তরুণ কবি সরোজ কুমার দত্ত প্রাক্তন সংস্কৃতি এবং সাহিত্য থেকে সাম্যবাদী এমন সব উপাদান শ্রদ্ধার সঙ্গে সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করবেন যাতে ভবিষ্যতের ভিত গঠনের কাজ সুসম্পন্ন হয়। …তার কবিতার সুগভীর ছন্দ শুধু বাঙলার সংস্কৃত-পন্থী কবিদেরই স্মরণ করিয়ে দেয় না, অমিত্রাক্ষর ছন্দেও তিনি মাইকেলি ভঙ্গি বজায় রেখে স্বকীয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। শব্দগুলো তার যেমন কাঠিন্যে উজ্জ্বল, তেমনি নিবিড় আবেগে কম্পমান, তাদের সম্মিলিত সুর দীপ্ত কন্ঠের ঘোষণার মত শোনায়।’

আজকাল কবিতার আলাপ মানে কনটেন্টের আগেই ফর্ম! ফর্মের দিক থেকে সরোজ দত্ত কবিতায় কোনো ভাঙচুর করেননি। কিন্তু তার ক্ষুরধার গদ্যলেখনী নির্দেশ করে, ভাষার ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল ঈর্ষণীয়! চাইলেই ফর্ম ভাঙার খেলায় নামতে পারতেন! প্রয়াত কবি বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত সৃতি থেকে এ বিষয়টা পরিষ্কার করে গেছেন- ‘তখন আমি ছাত্র। বিভিন্ন কাগজে কবিতা বেরোতে শুরু করেছে। আমরা কয়েকজন একদিন অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গ কমিটির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’র অফিসে গেলাম লেখা জমা দিতে। সরোজবাবু বসে ছিলেন। এডিটোরিয়াল বোর্ডের সদস্য ছিলেন তখন। আমার লেখা দেখে বললেন, ‘ভালই তো লেখ, কিন্তু এই ভাষা, এই ধরণের শব্দের ব্যবহার তো এই পত্রিকার পাঠকের জন্যে নয়। সহজ কথাটা সহজভাবে বল। আমাদের পাঠকরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তারা ফর্মের অত প্যাঁচ-পয়জার নিয়ে মাথা ঘামান না।’’

সরোজ দত্ত সহজভাবে মানুষের কথা বলতে চেয়েছিলেন—পৌঁছতে চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের মননে। মাও সেতুঙের মতোই তিনি ট্র্যাডিশনাল ভার্স স্ট্রাকচারকে ভাঙ্গতে চাননি। পুরনো সেতু ধরেই হয়তো ঘরের মানুষ হিসেবে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন লোকালয়ে! এ কারণেই হয়তো তার কবিতায় সংস্কৃত কাব্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। পুরাণ কথার ব্যবহারের পেছনেও সম্ভবত একই চিন্তা কাজ করছে। এতকাল ধরে চলে আসা রাজসাহিত্যের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আঘাত করার জন্য হাত দিয়েছিলেন গোড়া অবধি। সূক্ষ্মভাবে ভারতীয় পুরাণের পুনঃনির্মাণও করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে অবশ্যপাঠ্য তার ‘শকুন্তলা’ কবিতা। কাব্যভাষার দিক থেকে কোনো নতুন সংযোজন না করলেও পুরাণকে নতুন করে দেখার ক্ষেত্রে বাঙলা তথা ভারতীয় সাহিত্যে ‘শকুন্তলা’র জুড়ি মেলা ভার। এ কথা আজ জোর দিয়েই বলা যায়, আঙ্গিকের দিক থেকে না হলেও, বিষয়বস্তুর স্বকীয়তায় সরোজ দত্ত চার্বাকগুরু বৃহস্পতিতুল্য। রবীন্দ্রনাথের মতো উপনিষদীয় ‘মাখন’ মাখিয়ে তিনি গর্ভিণী শকুন্তলাকে দেখেননি, দেখেছেন একজন অরক্ষিতা অরণ্যকুমারীর উপর সুযোগসন্ধানী রাজার সেক্সপ্লয়টেশনের নিদর্শন হিসাবে!

শকুন্তলা

দুর্বাসার অভিশাপ, অভিজ্ঞান অঙ্গুরী কাহিনী
স্বর্গ মিলনের দৃশ্য, মিথ্যাকথা হীন প্রবঞ্চনা
রাজার লালসা-যূপে অসংখ্যের এক নারীমেধ
দৈবের চক্রান্ত বলি রাজকবি করেছে রটনা|
গৃহস্বামী দেশান্তরে, অরক্ষিত দরীদ্রের ঘরে
নারীমাংস লোভে রাজা মৃগমাংস এল পরিহরি
অরুচি হয়েছে যার অবিশ্রাম নাগরীবিহারে
তাহার কথার ফাঁদে ধরা দিল অরণ্য-কিশোরী|
স্তব্ধ আজি নাট্যশালা, নান্দীমুখ আতঙ্কে নির্বাক
বিদীর্ণ কাব্যের মেঘ, সত্যসূর্য উঠেছে অম্বরে
দর্শক শিহরী করে নাটিকার মর্মকথা পাঠ,
“বালিকা গর্ভিণী হল লম্পটের কপট আদরে”
রাজার প্রসাদভোজী রাজকবি রচে নাট্যকলা,
অন্ধকার রঙ্গভূমি, ভূলুণ্ঠিতা কাঁদে শকুন্তলা|
জানুয়ারি, ১৯৪০

১৯৭১ সালের ৫’ই অগাস্ট। ভোরের আলো ফুটতে দেরি আছে তখনো। এরিয়ানস্ ময়দানের এক কোণায় এসে দাঁড়ালো একটা জীপ, আলোটা নেভানো। চাপা তবে হাঁকানো গলায় নকশাল আন্দোলনের প্রাণপুরুষ চারু মজুমদারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ লোকটাকে নামতে বলা হলো। খানিক ধ্বস্তাধ্বস্তি, জোর করে চেপে দেওয়া কিছু অস্ফুট ‘লাল’ স্লোগান। তারপর সব ঠান্ডা–নিথর-নিস্তব্ধ। একটা ক্ষীণকায় মানুষ চেনা জগতের ওপারে চলে গেলো! জনৈক মত্ত পুলিস-পুঙ্গব টলমলে পায়ে এগিয়ে গেলেন। পড়ে থাকা মানুষটার মাথাটা কেটে কালী-করাল পোজ নিয়ে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করলেন, ‘শাল্লা, সরোজ দত্তকে দিয়ে আজ কলকাতার বুদ্ধিজীবী খতম আরম্ভ করলাম। যার যার গায়ে শালা একটু বামপন্থী গন্ধ পাবো, তাকেই এইভাবে খতম করবো!’

যবনিকা!
কিন্তু এভাবে কি যবনিকা টানা যায়! সরোজ দত্তের নাম নিয়ে আজ লড়ছে লক্ষ গেরিলা! ওরা বোঝেনি সরোজ দত্তের ইঙ্গিত- ‘খেলার নেশায় মেতে ওরা কি ভুলিয়া গেল হায়, আমার বিষের থলি পূর্ণ আজ কানায় কানায়’!

” width=”20″ height=”20″>

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “কবি সরোজ দত্ত ও তার পুরাণ বিনির্মাণ!

  1. যারা কবিতায় ছবি আঁকেন, যারা
    যারা কবিতায় ছবি আঁকেন, যারা জীবনের সুষমা অন্বেষণে পাড়ি দিয়েছেন মাঠ-পাহাড়-নদী, যারা সীমা ও অসীমের দ্বন্দ্বের মাঝে গেঁথে দিতে চান রবি, তারা হয়ো এই কবিন নাম শোনেননি, শুনলেও তার কোনো কবিতা পড়েননি!

    কিছুটা সময় ব্যয় করুন! সেই কবি উদিত হবেন! রাষ্ট্র যার হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে কবিতার ঝর্ণা বইয়ে দিয়েছে!

  2. উনার লাশ রাস্তায় ফেলে রাখা
    উনার লাশ রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছিল তথ্যটি ভুল। প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র তার লাশ ফেলে রাখার সাহস পায় নি, মাথাটি কেটে ম্যানহোলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রের নথিতে আজ পর্যন্ত তিনি নিখোজ রয়েছেন ।

  3. সরোজ দত্তের বাড়ি নড়াইলে জানা
    সরোজ দত্তের বাড়ি নড়াইলে জানা ছিলো না। নড়াইল অামার জন্মভূমি। নড়াইলে নকশাল অান্দোলন তীব্র ছিলো।
    ৭১ যখন কমরেড সরোজ দত্তকে ওপারে ক্রসফায়ার করছে ঘাতকের দল তখন ঠিক এপারে পূর্বাংলায় মুজিব বাহনী সরোজ দত্তের নড়াইলের পেড়োলো নকশালদের উপর গণহত্যা চালিয়ে এলাকা দখল করছে।
    সব শয়তানগুলোই একই শুয়োরের বিষ্টা থেকে তৈরী।সেটা ভারত হোক আর বাংলাদেশ হোক।
    সরোজ দত্ত লাল সালাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − = 15