রাষ্ট্র | লেনিন

কমরেডগণ, আপনারা যে পরিকল্পনা নিয়েছেন এবং যা আমাকে অবহিত করেছেন, সে অনুযায়ী, আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো রাষ্ট্র। এই বিষয়বস্তুর সাথে ইতিপূর্বে আপনারা কতখানি পরিচিত তা আমি জানি না। যদি আমার ভুল না হয়ে থাকে তাহলে আপনাদের এই পাঠ্যক্রম কেবলমাত্র শুরু হযেছে আর এই প্রথম বারের মতো আপনারা রীতি পদ্ধতিমাফিক এই বিষয়কে আঁকড়ে ধরছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে এটাই যথাযথভাবে ঘটবে যে, এই কঠিন বিষয়ে প্রথম বক্তৃতায়ই আমার শ্রোতাদের অনেকের নিকট আমার বক্তব্য বিশ্লেষণকে যথেষ্টভাবে স্পষ্ট ও সহজবোধ্যবাবে তুলে ধরায় আমি সফলকাম নাও হতে পারি।

আর ব্যাপারটি যদি তাই হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এই বাস্তব ঘটনা দ্বারা বিচলিত না হতে আমি আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি, কারণ, রাষ্ট্রের প্রশ্ন হলো সবচেয়ে জটিল ও দুরূহ প্রশ্ন, সম্ভবত অন্য যেকোন প্রশ্নের চেয়ে এই প্রশ্নটি নিয়েই বুর্জোয়া পন্ডিত, লেখক ও দার্শনিকরা বেশী বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং এটা আশা করা উচিৎ নয় যে, একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা থেকে, প্রথম আলোচনায়ই এই বিষয়ের উপর এক গভীর উপলব্ধি পাওয়া যাবে। এই বিষয়ের উপর বক্তৃতার পর যেগুলো আপনারা বুঝেননি বা যেগুলো আপনাদের নিকট স্পষ্ট নয়, সেসব অংশ টুকে নেয়া উচিৎ, এবং সেগুলোতে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার ফিরে যান, যাতে যেগুলো আপনারা বুঝতে পারেননি সেগুলোকে পরবর্তী পড়াশোনা এবং বিভিন্ন বক্তৃতা ও আলোচনা- এই উভয়টি দ্বারা সম্পূর্ণ করা যায় ও বিশদভাবে বুঝা যায়। আমি আশা করি, আমরা আরেকবার একসাথে বসার ব্যবস্থা করতে পারবো এবং তখন সকল সম্পূরক প্রশ্নে মতামত আদানপ্রদান করতে ও যেগুলো সবচেয়ে বেশী অস্পষ্ট থেকে গিয়েছে সেগুলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে সমর্থ হবো।

আমি আরো আশা করি, আলোচনা ও বক্তৃতার সাথে যুক্ত করে মার্কস ও এঙ্গেলসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনার কমপক্ষে কয়েকটি অধ্যয়ন করার জন্য আপনারা কিছুটা সময় দিবেন। আমার কোন সন্দেহ নাই যে, সোভিয়েত ও পার্টি স্কুলের ছাত্রদের জন্য আপনাদের যে পাঠাগার রয়েছে তার পুস্তক তালিকায় ও গ্রন্থরাজিতে এসব অতিগুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী পাওয়া যাবে; আর যদিও পুনর্বার বলতে গেলে, কঠিন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দ্বারা আপনাদের কেউ কেউ প্রথমেই আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন, তাই আমাকে অবশ্যই পুনরায় আপনাদের সতর্ক করে দিতে হচ্ছে যে, এ দ্বারা আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিৎ নয়; প্রথম অধ্যয়নকালে যা অস্পষ্ট থাকে দ্বিতীয় অধ্যায়কালে, অথবা পরবর্তীতে আপনি যখন কিছুটা ভিন্ন দিক থেকে প্রশ্নটির মুখাপেক্ষি হবেন তখন তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এ বিষয়ে আমি আরেকবার বলেছি যে, প্রশ্নটি হলো এত জটিল আর বুর্জোয়া পন্ডিত ও লেখকদের দ্বারা এত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে যে, যিনি এটা মনোযোগের সাথে অধ্যয়নের আকাংখা পোষণ করেন এবং স্বাধীনভাবে তার ওপর দখল অর্জন করতে চান, তাকেই বেশ কয়েকবার তার ওপর আঘাত হানতে হবে, এতে বারে বারে ফিরে আসতে হবে এবং এ ব্যাপারে এক সুস্পষ্ট, গভীর উপলব্ধি অর্জনের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে একে বিচার বিবেচনা করতে হবে।

যেহেতু সকল রাজনীতির ক্ষেত্রেই এটা এরূপ এক মৌলিক, এরূপ এক বুনিয়াদী প্রশ্ন, আর যেহেতু বর্তমানের মতো এরূপ ঝড়ো ও বিপ্লবী সময়েই নয়, বরং এমনকি সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ সময়েও, যেকোন অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক প্রশ্ন সূত্রে যেকোনা খবরের কাগজে প্রতিদিনই আপনি এ প্রশ্নের মুখোমুখী হবেন, সেহেতু এই প্রশ্নে ফিরে আসাটা আরো অধিক সহজতর হবে। প্রতিদিনই, এক বা অন্য পরিপ্রেক্ষিতে, এই প্রশ্নেই ফিরে আসবেন আপনারা- রাষ্ট্র কি, তার প্রকৃতি কি, এর তাৎপর্য কি, আর পুঁজিবাদের উচ্ছেদের জন্য যে পার্টি লড়াই করছে, আমাদের সেই পার্টির, কমিউনিস্ট পার্টির দৃষ্টিভঙ্গী কি- রাষ্ট্রের প্রতি এর দৃষ্টিভঙ্গী কি? আর মূল বিষয় হচ্ছে এই যে, আপনার পড়াশোনার ফলশ্রুতিতে, আপনার উচিৎ এই প্রশ্নে স্বাধীনভাবে নাড়াচাড়া করার সামর্থ্য অর্জন করা, কারণ আপনি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই থাকবেন সবচেয়ে বৈচিত্র্যমুখী বিভিন্ন ঘটনায়, সবচেয়ে তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রশ্নসূত্রে, সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত পরিপ্রেক্ষিতে এবং প্রতিপক্ষের সাথে আলাপ আলোচনা ও বিবাদ বিতর্কে। এই প্রশ্নে স্বাধীনভাবে নিজের অবস্থান খুঁজে নেয়াটা যখন শিখে নেবেন কেবল তখনই আপনার প্রত্যয়ের ক্ষেত্রে আপনি নিজেকে যথেষ্টভাবে দৃঢ় বলে বিবেচনা করতে পারেন এবং যে কারো বিরুদ্ধে যে কোন সময়ে সেগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করায় যথেষ্ট সাফল্য অর্জনের সক্ষম হবেন।

 

এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যগুলির পর, আমি খোদ এই প্রশ্নটি নিযে আলোচনা করতে অগ্রসর হবো- রাষ্ট্র কি, তা কিভাবে উদ্ভূত হলো এবং পুঁজিবাদের পরিপূর্ণ উচ্ছেদের জন্য শ্রমিকশ্রেণীর যে পার্টি– কমিউনিস্ট পার্টি- লড়াই করছে, সেই পার্টি রাষ্ট্রের প্রশ্নে মৌলিকভাবে কি দৃষ্টিভঙ্গী প্রদর্শন করবে?

আমি পূর্বেই বলেছি, রাষ্ট্র সম্পর্কিত প্রশ্নের মতো অন্য কোন প্রশ্ন আপনি কদাচিৎই খুঁজে পাবেন যা নিয়ে বুর্জোয়া বিজ্ঞান, দর্শন, আইনশাস্ত্র, রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র ও সাংবাদিকতার প্রতিনিধিরা এত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। আজ অবধি প্রায়শই একে ধর্মীয় প্রশ্নের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়; ধর্মীয় তত্ত্বমতের যারা প্রচার করেন তারাই কেবল নয় (তাদের কাছ থেকে এটা আশা করাই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক), বরং যারা ধর্মীয় সংস্কার থেকে নিজেদের মুক্ত মনে করেন এমনকি তারাও প্রায়শই রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নকে ধর্মের প্রশ্নের সাথে গুলিয়ে পেলেন এবং মতার্দশগত, দর্শনগত পদ্ধতি ও যুক্তি-তর্ক সহকারে প্রায়শই জটিল-এমন এক তত্ত্বমত খাড়া করার প্রচেষ্টা নেন যাতে দাবী করা হয় যে, রাষ্ট্র হলো ঐশ্বরিক, অতি প্রাকৃত কোন জিনিস, তা হলো এমন এক বিশেষ শক্তি যার বদৌলতে মানব জাতি বেঁচে আছে, তা এমন এক ঈশ্বর প্রদত্ত শক্তি যা মানুষের উপর আর্শীবাদ বর্ষণ করতে পারে, কিংবা যা নিজের সাথে এমন জিনিস নিয়ে আসে যা মানবীয় নয়, বরং স্বর্গ থেকে বর্ষিত। আর এটা অবশ্যই বলতে হবে যে, এই তত্ত্বমত শোষক শ্রেণীর- জমিদার আর বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থের সাথীত ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত ,তাদের স্বার্থের এত সেবা করে, বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী সেইসব ভদ্দরলোকদের সকল আচার-পদ্ধতি, মতামত ও বিজ্ঞানের মধ্যে এত গভীরভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যে আপনি প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এর অবশেষ সমূহের সাক্ষাৎ লাভ করবেন, এমনকি মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভুল্যুশনারিদের দ্বারা পোষিত রাষ্ট্র সম্পর্কিত মতামতের মধ্যেও, যদিও তাদের এ প্রত্যয় রয়েছে যে তারা সংযত দৃষ্টিতে রাষ্ট্রকে বিবেচনা করে থাকেন এবং এই মতামতকে ঘৃনার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন যে তারা ধর্মীয় কুসংস্কারের বানে ভেসে গেছেন। এই প্রশ্নে এত বিভ্রান্তি আর জটিলতা যে সৃষ্টি করা হয়েছে তার কারণ হলো (এ প্রসঙ্গে অর্থনেতিক বিজ্ঞানের মূল ভিত্তিগুলোর কথা বাদ দিলে)- অন্য যেকোনো প্রশ্নের চেয়ে তা শোষকশ্রেণীর স্বার্থের সাথে অধিক জড়িত। রাষ্ট্র সম্পর্কিত এই তত্ত্বমত সামাজিক বিশেষ-সুবিধা ভোগের সাফাই হিসেবে, শোষণের অস্তিত্বের সাফাই হিসেবে, পুঁজিবাদের অস্তিত্বের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের সাফাই হিসেবে ব্যবহৃত হয়- আর সে কারণে, এই প্রশ্নের ব্যাপারে পক্ষপাতহীনতা আশা করা, যেসব লোক নিজেদের বৈজ্ঞানিক বলে জাহির করে তারা এই বিষয়ের উপর এক বিশুদ্ধ বৈজ্ঞনিক মতামত প্রদান করতে পারে- এই বিশ্বাস থেকে অগ্রসর হওয়া হবে সবচেয়ে বড় ভুল। রাষ্ট্র সম্পর্কিত প্রশ্নের, রাষ্ট্র সম্পর্কিত মতবাদের, রাষ্ট্র সম্পর্কিত তত্ত্বের ক্ষেত্রে আপনি যখন এ প্রশ্নের সাথে পরিচিত হয়ে উঠবেন এবং এর ভেতরে যথেষ্ট গভীরভাবে প্রবেশ করতে পারবেন, তখন আপনি সর্বদাই উপলব্ধি করতে পারবেন বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যেকার সংগ্রামকে, যে সংগ্রাম প্রতিফলিত কিংবা অভিব্যক্ত হয় রাষ্ট্র সম্পর্কিত মতামতসমূহের সংঘাতে, রাষ্ট্রের ভূমিকা ও তাৎপর্যের মূল্য বিচারে।

যথাসম্ভব বিজ্ঞানসম্মতভাবে এই প্রশ্নকে দেখতে গেলে আমদের অবশ্যই একটু পিছন ফিরে রাষ্ট্রের ইতিহাস, তার উদ্ভব ও বিকাশের প্রতি এক ত্বরিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে। সমাজ বিজ্ঞানের একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জিনিস, আর এই প্রশ্নকে সঠিকভাবে দেখার অভ্যাস প্রকৃতই অর্জন করার ও বিশদ বর্ণনার স্তূপে কিংবা পরস্পর-বিরোধী মতামতের বিপুল সংখ্যক রকমভেদের মধ্যে হারিয়ে না যাওয়ার উদ্দেশ্য সবচেয়ে জরুরী- বিজ্ঞানসম্মতভাবে এ প্রশ্নকে দেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল- অন্তর্নিহিত ঐতিহাসিক যোগসূত্র সমূহকে ভুলে না-যাওয়া, ইতিহাসে একিট বিশেষ জিনিস কিভাবে উদ্ভূত হয়েছে ও তার বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধনা প্রধান পর্যায় কি ছিল সেই দৃষ্টিকোন থেকে প্রতিটি প্রশ্নকে বিচার করা, তার বিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে তা আজ কিসে পরিণতি লাভ করেছে তা পরীক্ষা করা।

আমি আশা করি, রাষ্ট্রের এই প্রশ্নসূত্রে আপনারা এঙ্গেলসের “পরিবার, ব্যক্তি-সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি” বইিটর সাথে নিজেদের পরিচিত করবেন। আধুনিক সমাজতন্ত্রের মৌলিক রচনাবলীর অন্যতম হচ্ছে এটি, যার প্রতিটি বাক্যকে আস্থার সাথে গ্রহণ করা যায় এই নিশ্চয়তার সাথে যে, এতে খেয়াল-খুশীমত কথা বলা হয়নি, বরং বিপুল সংখ্যক ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তথ্যের উপরই তা প্রতিষ্ঠিত। সন্দেহাতীতভাবেই, এই রচনার সব অংশ সমভাবে সাধারণের উপযোগী ও সহজবোধ্যভাবে বর্ণিত হয়নি; কিছু কিছু অংশ এমন পাঠককে ধরে নিয়েই লেখা যারা ইতোমধ্যে ইতিহাস ও অর্থনীতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। আমি পুনরায় বলছি, যদি এই রচনা পড়তে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আপনারা তা বুঝতে না পারেন তাহলে আপনাদের বিচলিত হওয়া উচিৎ নয়। খুব কম লোকই তা বুঝতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে আপনাদের উৎসাহ জাগ্রত হলে পরবর্তীতে আপনারা যখন তা পড়বেন তখন তার সমগ্র অংশ না হলেও, তার বৃহদংশই আপনারা বুঝতে সক্ষম হবেন। এই বইয়ের কথা আমি উল্লেখ করছি এ কারণে যে রাষ্ট্রের প্রশ্নে তা এক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গীকেই তুলে ধরছে, যা আমি বিধৃত করেছি।

রাষ্ট্রের প্রশ্নকে, অন্য যেকোন প্রশ্নের মতোই উদাহরণস্বরূপ, পুঁজিবাদের উৎস, মানুষ কর্তৃক মানুষের উপর শোষণ, সমাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র কিভাবে উদ্ভূত হলো, কি অবস্থায় সমাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটলো, ইত্যাকার প্রশ্নকে গভীরভাবে ও নির্ভরযোগ্যভাবে দেখা যেতে পারে একমাত্র যদি আমরা সমগ্রভাবে রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বিকাশ ধারার ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করি। এই সমস্যা সূত্রে প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্র সব সময় বিদ্যমান ছিল না। এমন একটা সময় ছিল যখন কোন রাষ্ট্র ছিল না। যখনও যেখানেই বিভিন্ন শ্রেণীতে সমাজের বিভক্তি দেখা দেয়, যখন শোষক ও শোষিতের আবির্ভাব ঘটে, তখন ও সেখানেই রাষ্ট্রেরও আবির্ভাব ঘটে।

মানুষ কর্তৃক মানুষকে শোষণের প্রথম রূপ দেখা দেয়ার পূর্বে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিভক্তির প্রথম রূপ -দাস-মালিক ও দাস-দেখা দেয়ার পূর্বে বিদ্যামান ছিল পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, কিংবা, কোন কোন সময় বলা হয় ক্ল্যান পরিবার (ক্ল্যান- গোত্র বা পারিবারেক গোষ্ঠী, যখন মানুষ আত্মীয়তা বা কুল অনুসারে একত্রে বসবাস করতো)। বহু আদিম জাতির জীবনে এসব আদিম যুগের বেশ পরিমাণ নির্দিষ্ট ছাপ এখনও টিকে আছে; এবং আদিম সভ্যতা সম্পর্কে কোন রচনার যেকোনটিই আপনারা দেখুন না কেন, সব সময়ই আপনারা এই বাস্তব তথ্যের কমবেশী সুনির্দিষ্ট বর্ণনা, উল্লেখ ও স্মৃতি-বিবরণ পাবেন যে, এমন এক সময় ছিল যখন দাস ও দাস-মালিকে সমাজের বিভক্তি বিদ্যমান ছিল না, যা ছিল কমবেশী আদিম সাম্যবাদের অনুরূপ। আর সে যুগে কোন রাষ্ট্র ছিল না, নিায়মানুগ বলপ্রয়োগের ও বলপ্রয়োগের মারফৎ জনগণকে অধীন করে রাখার কোন বিশেষ যন্ত্র ছিল না। এরূপ এক যন্ত্রকেই বলা হয় রাষ্ট্র।

আদিম সমাজে, মানুষ যখন ছোট ছোট পারিবারিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে বসবাস করত এবং তখনও ছিল ক্রমবিকাশের নিম্নতম পর্যায়ে, এমন এক অবস্থায় যা বর্বরতার সমতুল্য-এমন এক কাল যার সাথে আধুনিক সভ্য মানব সমাজের রয়েছে কয়েক হাজার বছরের ব্যবধান- তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের কোন চিহ্নই ছিল না। সেখানে আমরা দেখতে পাই রীতি-প্রথা, গোত্রের প্রবীণদের দ্বারা ভোগকৃত কর্তৃত্ব, শ্রদ্ধা ও ক্ষমতার প্রাধান্য; দেখতে পাই মাঝে মাঝে মেয়েদের কাছে সে ক্ষমতা প্রদত্ত হয়েছে -সে সময়ে মেয়েদের অবস্থান আজকের মেয়েদের পদানত ও উৎপীড়িত অবস্থার মত ছিল না- কিন্তু কোথাও আমরা দেখতে পাই না এমন বিশেষ বর্গের লোক যাদেরকে অন্যদের উপর শাসন চালাবার জন্য পৃথক করে রাখা হয়েছে এবং শাসনের খাতিরে ও উদ্দেশ্যে যাদের হাতে রযেছে নিয়মানুগ ও স্থায়ীভাবে বলপ্রয়োগের নির্দিষ্ট যন্ত্র, হিংসা প্রয়োগের যন্ত্র, যা বর্তমান কালে, আপনারা সবাই বুঝতে পারেন, প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে ওঠে সশস্ত্র সেনাবাহিনী, জেল ও বলপ্রয়োগের দ্বারা অন্যের ইচ্ছাকে দাবিয়ে রাখার অন্যান্য পন্থা দ্বারা-এদের সবগুলোই গঠন করছে রাষ্ট্রের অন্তর্বস্তু।

তথাকথিত ধর্মীয় জ্ঞান-শিক্ষা, বুর্জোয়া পন্ডিতদের দ্বারা তুলে ধরা সূক্ষ্ম বাক-চাতুরী, দার্শনিক যুক্তিতর্ক ও বিভিন্ন মতামত থেকে যদি আমরা নিজেদেরকে দূরে রাখি, যদি এগুলো থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রেখে বিষয়টির প্রকৃত অন্তর্বস্তুতে প্রবেশ করার প্রচেষ্টা নিই, তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষেই হচ্ছে এমন এক শাসন-যন্ত্রের সমতুল্য যা সমগ্রভাবে মানব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। যখন এমন এক বিশেষ ধরণের লোক দেখা দেয় যাদের একমাত্র কাজ হলো শাসন-কর্মে নিয়োজিত থাকা, অন্য কোন কিছু নয়, আর শাসন করার জন্য যাদের দরকার দমন-পীড়নের এবং বলপ্রয়োগের দ্বারা অন্যদের ইচ্ছাকে আয়ত্তে রাখার বিশেষ যন্ত্র- কারাগার, বিশেষ বাহিনী, সৈন্য দল ইত্যাদি- তখনই দেখা দেয় রাষ্ট্র।

কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন কোন রাষ্ট্র ছিল না, যখন সাধারণ বন্ধন, সমাজ নিজে, তার শৃংখলা ও কর্মবিন্যাস বজায় থাকতো রীতিনীতি ও ঐতিহ্য-প্রথার শক্তি দ্বারা; কিংবা সেই কর্তৃত্ব ও মর্যাদা দ্বারা যা গোষ্ঠীর প্রবীণরা কিংবা মেয়েরা ভোগ করতো- সেসব যুগে মেয়েরা যে প্রায়শই পুরুষের সমান মর্যাদা লাভ করতো তাই নয়, বরং অনেক সময় তারা এমনকি অধিকতর মর্যাদাও ভোগ করতো- এবং যখন ছিল না শাসন কার্যে বিশেষজ্ঞ কোন বিশেষ ধরনের লোক। ইতিহাস দেখিয়ে দেয় যে, যখন ও যেখানেই সমাজে শ্রেণী বিভাগ দেখা দিয়েছে, অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এমন একটা বিভক্তি দেখা দিয়েছে যেখানে তাদের কেউ কেউ অন্যের শ্রম আত্মসাৎ করার মতো অবস্থান স্থায়ীভাবে লাভ করেছে, যেখানে কিছু লোক অন্যদের শোষণ করছে, সেখানেই মানুষের উপর দমন-পীড়নের এক বিশেষ যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে।

আর বিভিন্ন শ্রেণীতে সমাজের এই শ্রেণী-বিভক্তিকে সব সময় অবশ্যই পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে ইতিহাসের এক মৌলিক বাস্তব ঘটনা হিসেবে। হাজার হাজার বছর ধরে, ব্যতিক্রমহীনভাবে সকল দেশেই, সকল মানব সমাজের ক্রমবিকাশ একটি সাধারন সামজ্ঞস্যপূর্ণ নিয়ম, এই ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিকতা ও সুসঙ্গতিকে তুলে ধরে; যাতে দেখা যায় প্রথমে ছিল শ্রেণীহীন সমাজ-আদি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, আদিম সমাজ, যেখানে ছিল না কোন অভিজাত; তারপর আমরা পাই দাস-প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত এক সমাজ-দাস-মালিকানার সমাজ। গোটা আধুনিক সভ্য ইউরোপই এই স্তরে মধ্য দিয়ে পার হয়েছে- দুহাজার বছর আগে দাস-প্রথারই ছিল একক আধিপত্য। পৃথিবীর অন্যান্য অংশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিও এই স্তরের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। কম উন্নত জাতিসমূহের মধ্যে আজও দাস-প্রথার চিহ্ন টিকে আছে; উদাহরণস্বরূপ, বর্তমান সময়েও আপনারা আফ্রিকায় দাস-প্রথার বিধান দেখতে পাবেন। দাস-মালিক ও দাস-এটাই হলো প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী-বিভক্তি। প্রথমোক্তরা কেবল যে সমস্ত ধরনের উৎপাদন-যন্ত্রের-জমি আর হাতয়ারের, তখনকার দিনে যতই আদিম সেগুলো হোক না কেন- মালিক ছিল তা নয়, বরং তারা ছিল মানুষেরও মালিক। এই দলকে বলা হত দাস-মালিক, অন্যদিকে যারা মেহনত করত এবং অন্যদের জন্য শ্রম যোগান দিত তাদেরকে বলা হতো দাস।

এই রূপের পর ইতিহাসে দেখা যায় শ্রেণী-বিভক্তির আরেক রূপ- সামন্ততন্ত্র। বেশীর ভাগ দেশেই দাস-প্রথা তার বিকাশের গতিপথে ভূমিদাস-প্রথায় বিবর্তিত হয়। এখন সমাজের মৌলিক বিভক্তি হয়ে দাঁড়ায় সামন্ত জমিদার ও কৃষক ভূমিদাস। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ধরন বদলে যায়। দাস-মালিকরা দাসদের মনে করতো তাদের সম্পত্তি; আইনও এই মতকে পুরোপুরি নিশ্চয়তা প্রদান করতো এবং দাসদের বিবেচনা করতো দাস-মালিকদের পুরোপুরি মালিকানাভুক্ত এক অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে। কৃষক ভূমিদাসদের সম্পর্কে বলতে গেলে, শ্রেণী-নিপীড়ন ও অধীনতা বহাল থেকে গেল বটে, কিন্তু এ কথা মনে করা হতো না যে, কৃষকরা অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে। কৃষক ভূমিদদাসদের সম্পর্কে বলতে গেলে, শ্রেণী-নিপীড়ন ও অধীনতা বহাল থেকে গেল বটে, কিন্তু এ কথা মনে করা হতো না যে, কৃষকরা অস্থাবর সম্পত্তির মতো সামন্ত-জমিদারদের মালিকানাধীন, বরং জমিদার কেবলমাত্র তাদের শ্রমের মালিক এবং নির্দিষ্ট কিছু কাজ করতে জমিদার তাদের বাধ্য করতে পারে। বাস্তবত আপনারা যেমন জানেন, বিশেষ করে রাশিয়ায় ভূমিদাসত্ব কোনক্রমেই দাসত্ব থেকে ভিন্ন ছিল না, যেখানে ভূমিদাসত্ব সবচেয়ে বেশী দিন স্থায়ী ছিল এবং সবচেয়ে স্থূল রূপ ধারণ করে।

তারপরেও, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি বিশ্ব বাজারের অভ্যূদয় এবং মুদ্রা সঞ্চালনের বিকাশ ঘটার সাথে সাথে, সামন্ততান্ত্রিক সমাজের অভ্যন্তরে এক নতুন শ্রেণীর- পুঁজিপতি শ্রেণীর- উদ্ভব ঘটে। পণ্য, পণ্যের বিনিময় এবং টাকার ক্ষমতার উত্থান থেকে উত্থিত হলো পুঁজির ক্ষমতা। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে- বরং বলা উচিৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও ঊনবিংশ শতাব্দী ধরে সমস্ত বিশ্ব জুড়ে ঘটলো বিপ্লব। পশ্চিম ইউরোপের সকল দেশেই সামন্ততন্ত্রের ঘটলো উচ্ছেদ। রাশিয়ায় তা সবচেয়ে দেরিতে ঘটলো। ১৮৬১ সালে রাশিয়াতেও এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটলো, যার ফলশ্রুতিতে এক রূপের সমাজের বদলে আরেক রূপের সমাজ আসলো-সামন্ততন্ত্রের স্থলাভিষিক্ত হলো পুঁজিবাদ, যে ব্যবস্থাধীনে শ্রেণী বিভক্তি বজায়ই থাকলো, সাথে সাথে থেকে গেল ভূমিদাসত্বের নানা চিহ্ন ও ধ্বংসাবশেষ, কিèতু যেখানে শ্রেণী-বিভক্তি মৌলিকভাবেই নতুন রূপ পরিগ্রহ করলো।

সমস্ত পুঁজিবাদী দেশেই, পুঁজির মালিক, জমির মালিক, মিল ও ফ্যাক্টরীর মালিক জনসংখ্যার এক নগণ্য অংশই কেবল গঠন করে, যাদের রয়েছে সমগ্র জনসাধারণের শ্রমের উপর পরিপূর্ণ দখল, আর, ফলশ্রুতিতে, সমস্ত শ্রমজীবী মানুষের উপর তারা প্রভুত্ব করে, নিপীড়ন ও শোষণ চালায়, যে শ্রমজীবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে সর্বহারাশ্রেণী, মজুরী-শ্রমিক, যারা কেবলমাত্র তাদের দু’খানি হাতের শক্তিকে, তাদের শ্রমশক্তিকে বিক্রী করেই উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। পুঁজিবাদের উত্তরণ ঘটার সাথে সাথে, যে কৃষকরা সামন্ত যুগে ইতিপূর্বেই ছিল বিচ্ছিন্ন ও পদানত, সেই কৃষকদের একাংশ (সংখ্যাগরিষ্ঠ) সর্বহারায় রূপান্তরিত হয়, এবং আর একাংশ (সংখ্যালঘিষ্ঠ) বিত্তবান কৃষকে পরিণত হয় ,যারা নিজেরাই শ্রমিক খাটাত এবং যারা গঠন করলো গ্রাম্য বুর্জোয়াশ্রেণী ।

এই মৌলিক বাস্তব সত্যকে- দাস-প্রথার আদিম রূপ থেকে ভূমিদাসত্বে আর শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদে সমাজের উত্তরণকে- আপনাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, কারণ একমাত্র এই মৌলিক বাস্তব সত্যকে মনে রেখেই, একমাত্র এই মৌলিক রূপরেখার মধ্যে সকল রাজনৈতিক তত্ত্বমতকে ফেলেই আপনারা এসব তত্ত্বমতগুলো যথার্থভাবে যাচাই করতে এবং এগুলো কি বুঝাতে চাচ্ছে তা উপলব্ধি করতে সমর্থ হবেন; কারণ মানব জাতির ইতিহাসের এসব বিরাট আমলগুলোর প্রত্যেকটিই- দাসতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিবাদ- শত শত হাজার হাজার বছর ধরে টিকে রয়েছে এবং সেগুলোর মধ্যে এত সমস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা-রূপ, এত বিচিত্র ধরনের রাজনৈতিক তত্ত্বমত, মতামত ও বিপ্লব পরিদৃষ্ট হয়েছে যে- বিশেষ করে বুর্জোয়া পন্ডিত ও রাজনীতিাবিদদের রাজনৈতিক, দার্শনিক ও অন্যান্য তত্ত্বমতের সূত্রে- এসব বিপুল বৈচিত্র্য ও ব্যাপক বিভিন্নমুখীনতাকে হুদয়ঙ্গম করা যেতে পারে একমাত্র বিভিন্ন শ্রেণীতে সমাজের এ বিভক্তিকে, শ্রেণী-শাসনের রূপের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনগুলোকে পথ-নির্দেশক সূত্র হিসেবে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সমস্ত সামাজিক প্রশ্ন- অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় ইত্যাদি প্রশ্নকে বিচার-বিবেচনা করে।

এই মৌলিক বিভক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আপনারা রাষ্ট্রকে বিচার করেন, তাহলে আপনারা দেখতে পাবেন যে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে সমাজের বিভক্তির পূর্বে রাষ্ট্রের কোন অস্তিত্বই ছিল না, যা আমি পূর্বেই বলেছি। কিন্তু যখন সামাজিক শ্রেণী-বিভাগ দেখা দিল এবং শক্ত শিকড় গেড়ে বসলো, যখন শ্রেণী-বিভক্ত সমাজের উদ্ভব ঘটলো, তখন রাষ্ট্রও উদ্ভূত হলো এবং শক্ত ভিত্তি অর্জন করলো। মানব জাতির ইতিহাসে এমন শত শত দেশ দেখা যায় যা দাসতন্ত্র, সামন্ত্রতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে বা এখনও করছে। এসব দেশের প্রত্যেকটিতেই বিপুল ঐতিহাসিক পরিবর্তন সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও, মানব জাতির এই ক্রমবিকাশ অর্থাৎ দাসতন্ত্র থেকে সামন্ততন্ত্রের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদে উত্তরণ এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বর্তমান বিশ্বব্যাপী সংগ্রামের সাথে জড়িত সকল রাজনৈতিক উত্থান-পতন আর সকল বিপ্লব সত্ত্বেও, আপনারা সব সময়ই রাষ্ট্রের উদ্ভবকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। এটা সব সময়ই হলো এমন এক যন্ত্র যা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং যা গঠিত হলো এমন এক দল লোক নিয়ে যারা পুরোপুরি মাত্রায় বা প্রায় পুরোপুরি মাত্রায়, কিংবা মূলত শাসনকর্মে নিয়োজিত। মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত- শাসিত, আর শাসনকর্মে বিশেষজ্ঞ, যারা সমাজের ঊর্ধ্বে উঠে যায় এবং শাসক বলে, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলে অভিহিত হয়। এই যে যন্ত্র, এই যে এক দল লোক যারা শাসন করে অন্যদের, তাদের অধিকারে সব সময় থাকে দমন-পীড়নের, দৈহিক বলপ্রয়োগের এক নির্দিষ্ট যন্ত্র, মানুষের উপর এই বলপ্রয়োগ আদিম মুগুরের দ্বারা, কিংবা, দাসতন্ত্রের যুগে আরো উন্নত ধরনের অস্ত্র দ্বারা, কিংবা মধ্য যুগে আবির্ভূত আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা, অথবা বিংশ শতাব্দীতে বিস্ময়কর কলা-কৌশল আর আধুনিক প্রযুক্তির সর্বশেষ সাফল্যের উপর সমগ্রভাবে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দ্বারাই তা অভিব্যক্ত হোক না কেন। বলপ্রয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু যেখানেই রাষ্ট্র ছিল সেখানেই প্রতিটি সমাজে অস্তিত্বশীল ছিল এমন এক দল লোক যারা শাসন করেছে, হুকুম জারি করেছে, প্রভুত্ব করেছে এবং যারা তাদের ক্ষমতাকে বজায় রাখার জন্য অধিকারী ছিল, ঐ নির্দিষ্ট যুগের কারিগরী মনের সাথে সঙ্গতিশীল অস্ত্রশস্ত্র সহকারে, দৈহিক দমন-পীড়নের বলপ্রয়োগের এক যন্ত্রের। আর এই সব সাধারণ বিষয়াবলীকে বিচার-বিবেচনা করে, যখন কোন শ্রেণী-বিভাগ ছিল না, যখন কোন শোষক ও শোষিত ছিল না তখন কেন কোন রাষ্ট্র অস্তিত্বশীল ছিল না আর যখন শ্রেণী-বিভক্তির উদ্ভব হলো তখন কেনই-বা রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটলো- নিজেদের এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, একমাত্র এভাবেই আমরা রাষ্ট্রের মর্মবস্তু ও তার তাৎপর্য সম্পর্কিত প্রশ্নের একটা সুনির্দিষ্ট জবাব লাভ করবো।

রাষ্ট্র হলো এক শ্রেণীর উপর অন্য শ্রেণীর শাসন বজায় রাখার যন্ত্র। যখন সমাজে কোনও শ্রেণী ছিল না, যখন দাসতান্ত্রিক যুগের আগে অধিকতর সমতার আদিম অবস্থায় মানুষ শ্রম করতো, এমন এক অবস্থায় যখন শ্রমের উৎপাদনী ক্ষমতা ছিল তখনও তার নিম্নতম স্তরে, যখন আদিম মানুষ সবচেয়ে আদিম অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নিছক কোনক্রমেই ব্যবস্থা করতে পারতো, তখন গোটা সমাজের উপর শাসন ও প্রভুত্ব করার জন্য বিশেষভাবে বিচ্ছিন্ন এক বিশেষ ধরনের লোকেরও উদ্ভব ঘটেনি, আর তার উদ্ভবও ঘটতে পারতো না। শুধুমাত্র যখন সমাজে শ্রেণী-বিভক্তির প্রথম রূপ দেখা দিল, যখন দাসতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটলো, যখন সবচেয়ে আদি ধরনের কৃষি-শ্রমের উপর সম্সত প্রচেষ্টা কেন্দ্রীভুত করে, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর লোক এক নির্দিষ্ট পরিমাণ উদ্বৃত্ত উৎপাদন করতে পারলো, যখন দাসদের অত্যন্ত হীন জীবন যাপনের জণ্যে এই উদ্বৃত্ত আর একান্তই অপরিহার্য ছিল না এবং তা দাস-মালিকদের হাতেই গেল,. যখন এভাবে এই দাস-মালিক শ্রেণীর অস্তিত্ব শক্ত শেকড় গাড়লো- কেবলমাত্র তখনই তাদের পাকাপোক্ত অস্তিত্ব কায়েমের জন্য রাষ্ট্রের উদ্ভব নিতান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়লো।

আর সত্যিই রাষ্ট্রের উদ্ভব হলো- দাস-মালিক রাষ্ট্র, এমন এক যন্ত্র যা দাস-মালিকদের দিল ক্ষমতা এবং দাসদের উপর শাসন চালাতে তাদের করে তুললো সমর্থ। তখনকার দিনে রাষ্ট্র ও সমাজ- উভয়টিই ছিল আজকের তুলনায় অনেক ছোট, তাদের যোগযোগ ব্যবস্থাও ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক দুর্বল- যোগাযোগের আধুনিক উপায়গুলো তখন ছিলো অস্তিত্বহীন। পাহাড়-পর্বত, নদী ও সাগর ছিল আজকের দিনের তুলনায় অপরিমেয় রূপে বৃহৎ বাধা, এবং রাষ্ট্রের গঠন সীমাবদ্ধ ছিল অনেক সংকীর্ণ ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে। অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ভুখন্ড আর সংকীর্ণ কর্মতৎপরতার গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাষ্ট্রের সেবায় নিযুক্ত ছিল কারিগরী দিক থেকে দুর্বল রাষ্ট্রযন্ত্র। তা সত্ত্বেও, নিশ্চিতই এমন এক যন্ত্র অস্তিত্বশীল ছিল, যা দাসদের বাধ্য করতো দাস-প্রথায় বসবাস করতে, যে দাস-প্রথা সমাজের এক অংশকে অন্য অংশের অধীনতা ও নিপীড়নে আবদ্ধ রাখতো। বলপ্রয়োগের এক স্থায়ী যন্ত্র ছাড়া সমাজের বৃহত্তর অংশকে অন্য অংশের জন্য নিয়মমাফিক কাজ করতে বাধ্য করা অসম্ভব। যতদিন কোন শ্রেণী ছিল না, ততদিন এরকম কোন যন্ত্রও ছিল না। যখন শ্রেণীর উদ্ভব ঘটলো, সর্বত্র ও সব সময় এই শ্রেণী-বিভক্তি যতই বাড়তে ও শক্ত ভিত অর্জন করতে লাগলো, ততই উদ্ভব হলো এক বিশেষণ প্রতিষ্ঠান- রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের রূপ ছিল চূড়ান্তভাবেই বহু রকমের। দাসত্রন্ত্রের যুগে তৎকালীন সময়ের মানদন্ড- অনুযায়ী সবচেয়ে অগ্রবর্তী, সংস্কৃতিবান ও সভ্য দেশ সমূহে-উদাহরণস্বরূপ, গ্রীস ও রোমে, যেখানে সমগ্রভাবেই রাষ্ট্র ছিল দাসতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানেও আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্রের বিচিত্র সব রূপ। সে যুগেও রাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের মধ্যে, অভিজাতততন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে ইতোমধ্যেই পার্থক্য দেখা দিচ্ছিল। রাজতন্ত্র হঅেল এক একক ব্যক্তির ক্ষমতা, প্রজাতন্ত্র হলো নির্বাচিত প্রতিনিধির ক্ষমতার উপস্থিতি; অভিজাততন্ত্র হলো অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র সংখ্যালঘুর ক্ষমতা, গণতন্ত্র হলো জনগণের ক্ষমতা (গ্রীক ভাষায় গণতন্ত্র কথাটির আক্ষরিক অর্থই হলো জনগণের ক্ষমতা।) এসব সকল পার্থক্যই দাসতন্ত্রের যুগে দেখা দেয়। এসব পার্থক্য সত্ত্বেও, দাসতান্ত্রিক যুগের রাষ্ট্র হলো দাস-মালিক রাষ্ট্র, তা সে রাষ্ট্র রাজতন্ত্রই হোক বা প্রজাতন্ত্রই হোক, অভিজাতন্ত্রই হোক বা গণতন্ত্রই হোক।

প্রাচীন কালের ইতিহাসের উপর প্রতিটি পাঠ্যসূচীর ক্ষেত্রে, এই বিষয়ের উপর যেকোনো বক্তৃতায়, আপনারা রাজতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে পরিচালিত সংগ্রামের কথাই শুনবেন। কিন্তু মৌলিক ঘটনা হলো এই যে, দাসদের মানুষ বলেই গণ্য করা হতো না- তাদেরকে কেবল যে নাগরিক হিসেবেই বিবেচনা করা হতো না তাই নয়, তাদেরকে মানুষের মধ্যেই ধরা হতো না। রোমান আইন তাদের অস্থাবর সম্পত্তি বলেই মনে করতো। ব্যক্তির নিরাপত্তা রক্ষার অন্য সমস্ত আইন-কানুনের কথা না হয় বাদই দিলাম, নরহত্যার আইনও দাসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হত না। আইন কেবলমাত্র দাস-মালিকদেরই রক্ষা করতো, তারাই কেবল পূর্ণ অধিকার প্রাপ্ত নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি রাভ করতো। কিন্তু রাজতন্ত্রই প্রতিষ্ঠা লাভ করুক কিংবা প্রজাতন্ত্রই প্রতিষ্ঠা লাভ করুক- তা ছিল দাস-মালিকদের রাজতন্ত্র কিংবা দাস-মালিকদের প্রজাতন্ত্র। যেসব রাষ্ট্রে সমস্ত অধিকারই ভোগ করতো দাস-মালিকরা, অন্যদিকে আইনের চোখে দাস ছিল অস্থাবর সম্পত্তি- দাসের উপর যেকোনো ধরনের হিংস্রতাই কেবল যে প্রয়োগ করা যেতো তাই নয়, এমনকি দাসকে খুন করাটাও অপরাধ বলে গণ্য করা হতো না। দাস-মালিক প্রজাতন্ত্রগুলো তাদের অব্যন্তরীণ সংগঠনের দিক দিয়ে বিভিন্ন রকম হতোঃ অভিজাততান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রও ছিল, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রও ছিল। অভিজাততান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে স্বল্প-সংখ্যক বিশেষ সুবিধাভোগী লোক নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতো; গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে প্রত্যেকেই নির্বাচনে অংশ নিত- কিন্তু সবাই মানে কেবল দাস-মালিকরা, অর্থাৎ দাস ছাড়া সবাই। এই মৌলিক তথ্যটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কারণ এই তথ্যটিই অন্য যেকোন প্রশ্নের চেয়ে রাষ্ট্র সম্পর্কিত প্রশ্নে অধিক আলোকপাত করে এবং সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রের প্রকৃতিটি প্রদর্শন করে।

রাষ্ট্র হল এক শ্রেণী কর্তৃক অন্য শ্রেণীর উপর নিপীড়নের যন্ত্র, অন্য শ্রেণীগুলোকে অর্থাৎ পদানত শ্রেণীগুলোকে একটি শ্রেণীর আনুগত্যাধীন রাখার যন্ত্র। এই যন্ত্রের রয়েছে বিভিন্ন রূপ। দাস-মালিক রাষ্ট্র আমরা দেখেছি রাজতন্ত্র বা অভিজাততান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, কিংবা এমনকি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রও। প্রকৃতপক্ষে, সরকারের ধরণ চূড়ান্তভাবেই বহু রূপের ছিল, কিন্তু তাদের অন্তর্বস্তু সব সময় ছিল একইঃ দাসরা কোনরূপ অধিকার ভোগ করত না, তারা ছিল নিপীড়িত শ্রেণী; তাদের মানুষ বলে গণ্য করা হতো না। সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রেও আমরা একই জিনিস দেখতে পাই।

শোষণের রূপের ক্ষেত্রে পরিবর্তন দাস-মালিক রাষ্ট্রকে সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করে। এটা ছিল সুবিপুল গুরুত্বের বিষয়। দাস-মালিক সমাজে দাসরা কোন অধিকারই ভোগ করতো না এবং মানুষ হিসেবে গণ্য হতো না; সামন্ততান্ত্রিক সমাজে কৃষক জমির সাথে বাঁধা। ভূমিদাসত্বের মূল বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন ছিল এই যে, কৃষকদের (আর সে যুগে কৃষকরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ; শহরের লোকসংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম) জমির সাথে বাঁধা বলে মনে করা হতো- এ থেকেই ভূমিদাসত্ব ধারণাটি এসেছে। জমিদারদের দ্বারা বরাদ্দকৃত নির্দিষ্ট জমিতে নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন কৃষকরা নিজেদের জন্য কাজ করতে পারতো; বাকি দিনগুলোতে কৃষক ভূমিদাসকে তার প্রভুর জন্য খাটতে হতো। শ্রেণী-সমাজের সারবস্তুটি থেকে গেল; শ্রেণী শোষণের উপরই সমাজ প্রতিষ্ঠিত থাকলো। কেবলমাত্র জমিদাররাই সকল অদিকার ভোগ করতো; কৃষকদের কোন অধিকারই ছিল না। বাস্তবে দাসমালিক রাষ্ট্রে দাসদের অবস্থা থেকে তাদের অবস্থার খুব কমই পার্থক্য ছিল। তথাপি তাদের মুক্তির জন্য, কৃষকদের মুক্তি অর্জনের জন্য আরো প্রশস্ত পথ উন্মুক্ত হলো, কৃষক ভূমিদাসকে জমিদারদের সরাসরি সম্পত্তি বলে মনে করা হতো না। সে তার কিছুটা সময় তার নিজের জমিতে কাজ করতে পারতো, বলা যায়, নির্দিষ্ট পরিমাণে তার নিজের কিছুটা সত্তা ছিল; বিনিময় ও বাণিজ্য সম্পর্কের বিকাশের বৃহত্তর সুযোগ সৃষ্টির সাথে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়তে থাকলো এবং কৃষকদের মুক্তির পরিধি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকলো। সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজ সব সময়ই দাসতান্ত্রিক সমাজের চেয়ে অধিকতর জটিল। ব্যবসা ও শিল্পের বেশ পরিমাণ বিকাশ হয়েছিল, যা এমনকি সে যুগেই ঘটিয়েছিল পুঁজিবাদের সূচনা। মধ্যযুগে সামন্ততন্ত্রেরই ছিল প্রাধান্য। আর এখানেও আমরা পাই রাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র, যদিও শেষেরটির প্রকাশ ছিল খুবই দুর্বল। কিন্তু সব সময়ই সামন্ত জমিদারকে একমাত্র শাসক বলে মনে করা হতো। কৃষক-ভূমিদাসরা চূড়ান্তভাবেই সমস্ত রাজনৈতিক অধিকার থেকে ছিল বঞ্চিত।

দাসপ্রথা ও সামন্তপ্রথা- উভয় ব্যবস্থাধীনেই বলপ্রয়োগ ছাড়া একটি নগণ্য সংখ্যালঘু অংশ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের উপর প্রভুত্ব করতে পারতো না। ইতিহাসে বহুলভাবেই দেখা যায় নিপীড়নের জোয়াল ছুড়ে ফেলার জন্য নিপীড়িত শ্রেণীসমূহের অবিরাম প্রয়াস-প্রচেষ্টা। দাসপ্রথার ইতিহাসে দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য এমন সমস্ত যুদ্ধের বিবরণ রয়েছে যেগুলো অনেক দশক ধরে অব্যাহত ছিল। প্রসঙ্গত জার্মানীতে একমাত্র যে পার্টি পুঁজিবাদী জোয়ালের বিরুদ্ধে প্রকৃতই লড়াই করছে, সেই জার্মান কমিউনিস্টদের দ্বারা এখন যে নাম ‘স্পার্টাকাসপন্থী’ গৃহীত হয়েছে তার কারণ হলো, স্পার্টাকাস ছিলেন প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে সংঘটিত মহান দাস-বিদ্রোহ সমূহের অন্যতম একটির সবচেয়ে প্রখ্যাত বীরদের একজন। সম্পূর্ণভাবে দাস-প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত আপাত শক্তিমান রোমান সাম্রাজ্য সুবিশাল দাস-অভ্যূত্থানের আঘাতে বহু বছর ধরেই বার বার নাড়া খেয়েছিল ও কেঁপে উঠেছিল, যে দাসরা স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে সশস্ত্র ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে এক বিশাল বাহিনী গঠন করেছিল। সবশেষে দাস-মালিকদের হাতে তারা পরাজিত, বন্দী ও নির্যাতিত হয়েছিল। শ্রেণী-বিভক্ত সমাজের গোটা ইতিহাসই এ ধরনের গৃহযুদ্ধ দ্বারা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। আমি এইমাত্র দাস-প্রথার যুগে গৃহযুদ্ধের বৃহত্তমটির কথা উল্লেখ করলাম। অনুরূপভাবে সমগ্র সামন্ত যুগও বিরামহীন কৃষক অভ্যূত্থানের দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। উদাহরণস্বরূপ, ম্যধযুগে জার্মানীতে দুটি শ্রেণী -জমিদার ও ভূমিদাসদের মধ্যেকার সংগ্রাম ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়। রাশিয়াতেও সামন্ত জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের পৌনঃপুনিক অভ্যূত্থানের অনুরূপ উদাহরণের সাথে আপনারা সকলেই পরিচিত আছেন।

নিজেদের শাসন বজায় রাখা ও নিজেদের ক্ষমতা রক্ষা করার জন্য, জমিদারদের এমন একটা যন্ত্রের দরকার ছিল, যার দ্বারা তারা বিপুল সংখ্যক লোককে তাদের অধীনে একত্রবদ্ধ রাখতে পারবে এবং তাদেরকে কতকগুলি আইন-বিধানের অধীনস্থ করতে পারবে; আর এ সমস্ত সকল আইনের মৌলিক মর্মবস্তু ছিল একই- কৃষক-ভূমিদাসদের ওপর জমিদারদের ক্ষমতা বজায় রাখা। আর এটাই ছিল সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র, উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়াতে কিংবা সম্পূর্ণ পশ্চাদপদ এশীয় দেশগুলোতে, যেখানে সামন্ততন্ত্র আজও টিকে আছে, যে রাষ্ট্র হতো হয় প্রজাতান্ত্রিক, না হয় রাজতান্ত্রিক- যদিও রূপের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকতো। যেখানে রাষ্ট্রও ছিল রাজতান্ত্রিক, সেখানে এক ব্যক্তির শাসনকেই স্বীকার করে নেয়া হতো; যেখানে তা ছিল প্রজাতান্ত্রিক, সেখানে জমিদার সমাজের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অংশ গ্রহণ এক বা অন্য মাত্রায় স্বীকার করে নেয়া হতো- সামন্ত সমাজে রাষ্ট্র এরূপই ছিল। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ এমন শ্রেণী-বিভক্তিকে তুলে ধরতো যার অধীনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক- ভূমিদাসরা পরিপূর্ণভাবেই ছিল নগণ্য সংখ্যালঘু জমিদারদের অধীন, যারা হলো জমির মালিক।

ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ, পণ্যবিনিময়ের বিকাশ সাধন এক নতুন শ্রেণী- পুঁজিপতি শ্রেণীর আর্বিভাবের দিকে চালিত করলো। মধ্যযুগের সমাপ্তির দিকে পুঁজির উদ্ভব ঘটলো, যখন আমেরিকা আবিষ্কারের পর বিশ্ব বাণিজ্য বিপুলভাবে বেড়ে গেল, যখন মহামূল্যবান ধাতুর পরিমাণ বেড়ে গেল, যখন রূপা ও সোনা হয়ে দাঁড়াল বিনিময়ের মাধ্যমে, যখন মুদ্রা-সঞ্চালন বিশেষ ব্যক্তিদের পক্ষে বিপুল সম্পদ ধারণ করাটা সম্ভব করে তুললো। সমগ্র বিশ্ব জুড়েই রুপা ও সোনাকে সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলো। জমিদার শ্রেণীর অর্থনৈতিক ক্ষমতা কমে যাচ্ছিল আর নতুন শ্রেণী- পুঁজির প্রতিনিধিদের- ক্ষমতা বাড়তে থাকলো। সমাজের পুনগর্ঠন এরূপ হয়ে দাঁড়ালো যেন সকল নাগরিক সমান বলে মনে হলো, দাস-মালিক ও দাসের পুরনো শ্রেণী-বিভাগ তিরোহিত হয়ে গেল, প্রত্যেকের পুঁজির মালিকানা নির্বিশেষে সকলেই আইনের চোখে সমান বলে বিবেচিত হলো; ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে একজন জমির মালিকই হোক, কিংবা নিজের শ্রম করার ক্ষমতা ছাড়া নিঃস্ব ভিখারীই হোক- আইনের চোখে সবাই সমান হয়ে দাঁড়ালো। আইন প্রত্যেককে সমানভাবেই রক্ষা করে; যে জনগণের কোন সম্পত্তি নেই, শ্রমশক্তি ছাড়া যারা আর কিছুর অধিকারী নয়, যারা ক্রমান্বয়েই দরিদ্র ও ধ্বংস হয়ে পড়ে এবং সর্বহারায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ে তাদের আক্রমণের হাত থেকে সম্পত্তিবানদের সম্পত্তিকে আইন রক্ষা করে। এই হলো পুঁজিবাদী সমাজ।

এ ব্যাপারে আমি বিস্তরিতভাবে এখন আলোচনা করছি না। পার্টির কর্মসূচী নিয়ে যখন আলোচনা করবেন তখন এ প্রশ্নে আপনারা ফিরে আসবেন- তখন আপনার পুঁজিবাদী সমাজের বর্ণনা শুনবেন। স্বাধীনতার শ্লোগান তুলে ভূমিদাসত্বের বিরুদ্ধে, পুরনো সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এগিয়ে এল এই সমাজ। কিন্তু এই স্বাধীনতা ছিল তাদেরই জন্য যারা হলো সম্পত্তির মালিক। আর সামন্ততন্ত্র যখন ধ্বংস হয়ে গেলো, যা ঘটলো অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে- রাশিয়ায় ঘটলো অন্যান্য দেশের চেয়ে আরে দেরিতে, ১৮৬১ সালে- তখন সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্থান দখল করলো পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র তার শ্লোগান হিসেবে ঘোষণা করলো সমগ্র জনগণের স্বাধীনতা, ঘোষণা করলো যে সমগ্র জনগণের ইচ্ছা-আকাংখারই সে প্রকাশ ঘটাচ্ছে এবং অস্বীকার করলো যে তা হচ্ছে এক শ্রেণী-রাষ্ট্র। যে সমাজতন্ত্রীরা সমগ্র জনগণের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে সেই সমাজতন্ত্রীদের সাথে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সংগ্রাম শুরু হলো ঠিক এখানেই, যে সংগ্রাম এখন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠনের দিকেই চালিত করেছে এবং যা সমগ্র বিশ্বকে পরিব্যাপ্ত করেছে।

বিশ্ব পুঁজির বিরুদ্ধে এই যে সংগ্রাম শুরু হয়েছে তাকে বুঝতে হলে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সারবস্তুকে বুঝতে হলে, আমদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র যখন সংগ্রামে এগিয়ে গিয়েছিল তখন সে তাতে লিপ্ত হয়েছিল স্বাধীনতার শ্লোগান হাতে নিয়ে। সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তির অর্থ ছিল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের জন্য স্বাধীনতা এবং তা তাদেরই স্বার্থের সেবা করে, কারণ ভূমিদাস-প্রথা ভেঙ্গে পড়ছিল এবং জমিদারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে যে জমি কৃষকরা ক্রয় করেছিল, বা জমিদারকে টাকা দিয়ে বিশেষ খাজনায় বেগার খাটার হাত থেকে মুক্তি লাভের ফলে যে জমি তারা পেয়েছিল- যা নিয়ে রাষ্ট্র মাথা ঘামাত না- সেই জমিকে তাদের পূর্ণ সম্পত্তি হিসেবে মালিকানা লাভের সুযোগ কৃষকরা অর্জন করেছিলঃ সম্পত্তি যেভাবেই অর্জিত হোক না কেন, রাষ্ট্র তা রক্ষা করতো, কারণ রাষ্ট্র ছিল ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমস্ত আধুনিক সভ্য রাষ্ট্রেই কৃষকরা হয়ে দাঁড়াল ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক। এমনকি যখন জমিদাররা অধিকার ত্যাগ করে তাদের জমির একাংশ কৃষকদের ছেড়ে দিল, তখনও ক্ষতিপূরণ, বিক্রির টাকা দ্বারা জমিদারদের পুরস্কৃত করে রাষ্ট্র ব্যক্তিগত সম্পত্তিকেই রক্ষা করলো। রাষ্ট্র যেন ঘোষণা করলো যে, সে পুরোপুরিভাবেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষা করবে এবং সব উপায়ে তা রক্ষা ও সমর্থনও করলো। প্রত্যেক ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও কারখানা- মালিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে রাষ্ট্র স্বীকার করে নিল। আর ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর, পুঁজির ক্ষমতার ওপর, বিত্তহীন শ্রমিক ও মেহনতি কৃষক জনতার পরিপূর্ণ অধীনতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই সমাজ ঘোষণা করলো যে, স্বাধীনতাই তার শাসনের ভিত্তি। সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে এই সমাজ ঘোষণা করলো সম্পত্তির স্বাধীনতা, আর রাষ্ট্র যেন আর শ্রেণী-রাষ্ট্র নয়- এ হলো তার বিশেষ আত্মপ্রসাদ।

তথাপি রাষ্ট্র এমন এক যন্ত্রই হয়ে রইলো যা গরীব কৃষক আর শ্রমিকশ্রেণীকে অধীনতাপাশে আবদ্ধ রাখায় পুঁজিপতিদের সাহায্য করলো। কিন্তু বাইরের খোলস দেখে মনে হতো এ রাষ্ট্রে স্বাধীনতা আছে। সর্বজনীন ভোটের অধিকার সে ঘোষণা করলো, এবং তার সমর্থক, প্রচারক, পন্ডিত আর দার্শনিকদের দিয়ে সে ঘোষণা করলো যে, এ রাষ্ট্র শ্রেণী-রাষ্ট্র নয়। এমনকি এখনও, যখন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রগুলো তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে শুর করেছে, তখনও তারা আমদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা লংঘন করার, বলপ্রয়োগের ভিত্তিতে, এক দল লোকের ওপর অন্য দলের নিপীড়নের ভিত্তিতে এক রাষ্ট্র গড়ে তোলার অভিযোগ আনয়ন করছে, অথচ তারা যেন এক জনপ্রিয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। আর এখন যখন বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হয়েছে, এবং ঠিক যখন কয়েকটি দেশে বিপ্লব সাফল্য লাভ করেছে, যখন বিশ্ব- পুঁজির বিরুদ্ধে লাড়াই বিশেষভাবে তীব্র হয়ে উঠেছে, তখন রাষ্ট্রের এই প্রশ্নটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব অর্জন করেছে এবং বলা চলে, সবচেয়ে জ্বলন্ত প্রশ্ন, সকল রাজনৈতিক প্রশ্নের ও আজকের দিনের সকল রাজনৈতিক বিবাদ-বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

রাশিয়া বা অন্য যেকোনো অধিক সভ্য দেশের যেকোন পার্টির কথাই ধরা যাক না কেন, আমরা দেখতে পাব যে, প্রায় সকল রাজনৈতিক বিবাদ-বিতর্ক, মতভেদ ও মতামত এখন আবর্তিত হচ্ছে রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে। কোন পুঁজিবাদী দেশে, কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে- বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড বা আমেরিকার মতো সবচেয়ে স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্র কি জনপ্রিয় ইচ্ছা- আকাংখা, জনসাধারণের সমগ্রের সাধারণ সিদ্ধান্তের অভিব্যক্তি, জাতীয় আশা-আকাংখা ইত্যাদির প্রতীক, না-কি রাষ্ট্র হলো এমন এক যন্ত্র যা শ্রমিক শ্রেণী ও কৃষকদের উপর ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য সে দেশের পুঁজিপতিদের সমর্থ করে তোলে? এটাই হলো সেই মৌলিক প্রশ্ন যাকে কেন্দ্র করে সারা বিম্ব জুড়ে সকল রাজনৈতিক বিতর্ক আবর্তিত হচ্ছে। বলশোভিক মতবাদ সম্পর্কে কি বলা হয়? বুর্জোয়া সংবাদপত্রে বলশেভিকদের নিন্দাবাদ করা হয়। বলশেভিকরা গণতান্ত্রিক শাসনকে লংঘন করছে- এই বস্তাপচা অভিযোগ বার বার উত্থাপন করেনি এমন একটি পত্রিকাও আপনি খুঁজে পাবেন না। হৃদয়ের সারল্যবশত (সম্ভবত তা সারল্য নয়, কিংবা সম্ভবত তা হচ্ছে এমন এক সারল্য প্রবাদে যাকে বলা হয় ডাকাতির চেয়েও হীন) যদি আমাদের মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট-রিভলিউশনারীরা মনে করে যে বলশেভিকরা স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক শাসনকে লংঘন করেছে তাহলে তারা হাস্যকরভাবেই ভুল করছে। আজকের দিনে সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর সবচেয়ে ধনী যে কাগজগুলো তাদের প্রচারের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এবং কোটি কোটি সংখ্যা কাগজ ছেপে বুর্জোয়া মিথ্যা ভাষণ ও সাম্রাজ্যবাদী কর্মনীতির প্রচার করে তাদের মধ্যে এমন একটি কাগজও নেই যা বলশেভিক মতবাদের বিরুদ্ধে এসব মৌলিক যুক্তি ও অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেনি যে, উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড হলো গণতান্ত্রিক শাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত উন্নত রাষ্ট্র, অন্যদিকে বলশেভিক প্রজাতন্ত্র হলো দস্যুদের রাষ্ট্র যেখানে স্বাধীনতা এক অজানা বিষয় আর বলশেভিকরা গণতান্ত্রিক শাসনকে লংঘন করেছে এবং এমনকি সংবিধান পরিষদকেও সারা পৃথিবী জুড়েই বলশেভিকদের বিরুদ্ধে এসব মারাত্মক অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি করা হয়। এসব অভিযোগনামা সরাসরিভাবেই আমাদের দাড় করায় এই প্রশ্নের মুখোমুখি- রাষ্ট্র কি? এসব অভিযোগকে বুঝতে হলে, এগুলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে ও সেগুলোর প্রতি পুরোপুরি বুদ্ধি-বিবেচনাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করতে হলে আর শোনা কথায় নয়, আমাদের নিজেদের দৃঢ় মতামতের সাহায্যে সেগুলোকে যাচাই করতে হলে, আমাদের অবশ্যই থাকতে হবে রাষ্ট্র কি সে সম্পর্কে এক সুস্পষ্ট ধারণা। আমাদের সামনে রয়েছে সব ধরনের পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আর সেগুলোর সমর্থনে তুলে ধরা বিশ্বযুদ্ধের আগে সৃষ্ট সকল মতবাদ। প্রশ্নটির যথাযথ উত্তর দিতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই এসব সকল মতবাদ ও মতামতকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে।

আমি ইতিপূর্বেই এঙ্গেলসের ‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ বইটির সাহায্য নেয়ার জন্য আপনাদের পরামর্শ দিয়েছি। এই বইতে বলা হয়েছে, যেসব প্রতিটি রাষ্ট্রে জমি ও উৎপাদন-যন্ত্রের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা রয়েছে, যেখানে রয়েছে পুঁজির প্রভুত্ব, সেসব রাষ্ট্র যতই গণতান্ত্রিক হোক না কেন, তা হল এক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, শ্রমিক শ্রেণী ও কৃষকদের অধীনতা পাশে আবদ্ধ রাখার জন্য পুঁজিবাদীদের দ্বারা ব্যবহৃত এক যন্ত্র; অন্যদিকে সর্বজনীন ভোটাধিকার, সাংবিধানিক পরিষদ, পার্লামেন্ট হলো নিছক এক নিয়ম-রীতি, এক ধরনের অঙ্গীকারপত্র, যা বিষয়টির সারবস্তুকে মোটেই বদলে দেয় না।

রাষ্ট্রের প্রভুত্বের রূপ বিভিন্ন রকম হতে পারেঃ এক বিশেষ ধরনের রূপ যেখানে বিরাজমান সেখান পুঁজির ক্ষমতার প্রকাশ একভাবে, আবার অন্য বিশেষ ধরনের রূপ যেখানে বিদ্যমান সেখানে তার প্রকাশ অন্যভাবে- কিন্তু অপরিহার্যরূপে ক্ষমতা পুঁজির হাতেই থাকে, তা সে নিয়ন্ত্রিত ভোটাধিকারই থাকুক আর না থাকুক, কিংবা প্রজাতন্ত্রটি গণতান্ত্রিকই হোক আর না হোক, প্রকৃতপক্ষে প্রজাতন্ত্র যত বেশী গণতন্ত্রিক হয় পুঁজিবাদের শাসন ততই বেশী স্থুল ও নিন্দার্হ। দুনিয়াতে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রগুলোর একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তথাপি পুঁজির ক্ষমতা, সমগ্র সমাজের ওপর মুষ্টিমেয় কয়েকজন কোটিপতির ক্ষমতা আমেরিকার মতো আর কোথাও এত স্থূল এবং এত খোলাখুলি ভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে ওঠেনি (১৯০৫ সালের পর যারা সেখানে থেকেছেন তাঁরা সম্ভবত এ কথা জানেন)। পুঁজি একবার অস্তিত্বশীল হয়ে উঠলে সমগ্র সমাজের ওপর তা প্রভুত্ব কায়েম করে, আর কোন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বা কোন রূপের ভোটাধিকারই বিষয়টির সারবস্তুকে বদলাতে পারে না।

সামন্ততন্ত্রের তুলনায় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও সর্বজনীন ভোটাধিকার ছিল এক বিপুল প্রগতিশীল অগ্রগতিঃ সেগুলো সর্বহারাশ্রেণীকে সক্ষম করে তুলেছে তার বর্তমান ঐক্য ও সংহতি অর্জন করায়, পুঁজির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম পরিচালনাকারী দৃঢ়বদ্ধ ও সুশৃংখল সারি গড়ে তোলায়।দাসদের কথা ছেড়ে দিলেও কৃষক ভুমিদাসদের এমনকি এর প্রায় সদৃশ কিছু ছিল না। বিদ্রোহ করেছে, দাঙ্গা করেছে, গৃহযুদ্ধ শুরু করেছে, তা আমরা জানি, কিন্তু কখনও এক শ্রেণী-সচেতন সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংগ্রাম পরিচালনা করার মতো পর্টি গড়ে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, কি তাদের লক্ষ্য তা তারা উপলব্ধি করতে পারনি, আর এমনকি ইতিহাসের সবচেয়ে বিপ্লবী মুহূর্তেও তারা সব সময় শাসক শ্রেণীর হাতে বোড়ে হয়ে থেকেছে। বিশ্ব সমাজ বিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র, পার্লামেন্ট, সর্বজনীন ভোটাধিকার, এ সবই বিরাট অগ্রগতির পরিচায়ক। মানবজাতি পুঁজিবাদের দিকে অগ্রবর্তী হলো, আর একমাত্র পুঁজিবাদই কেবল, শহুরে সংস্কৃতির কারণে, সক্ষম করে তুললো নিপীড়িত সর্বহারা শ্রেণীকে নিজেকে চিনতে শিখতে ও বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোল গড়ে তুলতে, সমস্ত পৃথিবী জুড়েই লক্ষকোটি শ্রুমিক সংগঠিত হলো পার্টিতে- সমাজতান্ত্রিক পার্টিতে, যে পার্টিগুলো সচেতনভাবে জনগণের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে। পার্লামেন্টবাদ ছাড়া, নির্বাচনী ব্যবস্থা ছাড়া, শ্রমিকশ্রেণীর এই অগ্রগতি হয়ে দাঁড়াতো অসম্বব। সে কারণেই এসব সকল জিনিস ব্যাপক জনগণের দৃষ্টিতে এত বিপুল গুরুত্ব অর্জন করেছে। সে কারণেই মৌলিক পরিবর্তন এত কঠিন বলে মনে হয়। রাষ্ট্রে আছে স্বাধীনতা এবং সকলের স্বার্থকে রক্ষা করাই তার পবিত্র উদ্দেশ্য -এই বুর্জোয়া মিথ্যাচারটি কেবল যে জ্ঞানপাপী, বিজ্ঞানী ও পুরোহিতরাই তুলে ধরে ও সর্মথন করে তা নয়, বরং যারা পুরনো কুসংস্কারকে মনেপ্রাণে আঁকড়ে থাকে ও যারা পুঁজিবাদী সমাজ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণকে বুঝতে পারে না, সেই সব বহু লোকও তা করে থাকে। বুর্জোয়া শ্রেণীর উপর সরাসরিভাবে নির্ভরশীল লোকেরাই কেবল নয়, পুঁজির জোয়ালে নিপীড়িত কিংবা পুঁজির কাছ থেকে উৎকোচ লাভকারীরাই কেবল নয় (নানা ধরনের বিজ্ঞানী, শিল্পী, পুরোহিত ইত্যাদি বহু সংখ্যক লোকই পুঁজির সেবায় রয়েছে), বরং এমনকি বুর্জোয়া স্বাধীনতার কুসংস্কারে নিছক আচ্ছন্ন লোকজনও সমগ্র বিশ্ব জুড়ে বলশেভিক মতবাদের বিরুদ্ধে খড়গ ধারণ করেছে এই কারণে যে, সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই সে এসব বুর্জোয়া মিথ্যাচারকে প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেঃ তোমরা বলছ তোমদের রাষ্ট্রে স্বাধীনতা আছে, কিন্তু বাস্তবে, যে পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে সে পর্যন্ত, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হলেও. তোমাদের রাষ্ট্র শ্রমিক দের দমন করার জন্য পুঁজিবাদীদের হাতের যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।আর যে রাষ্ট্র যত বেশী স্বাধীন, ততই তা সুস্পষ্টরূপে অভিব্যক্ত হবে। এর উদাহরণ হলো ইউরোপে সুইজারল্যান্ড এবং আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশে দুটি যদিও গণতন্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, এদের চেহারা যতই পরিপাটি করে দেখানো হোক না কেন, আর শ্রমিক গণতন্ত্র ও সকল নাগরিকের সমতার বড় বড় বুলি যতই উচ্চারিত হোক না কেন ,পুঁজির শাসন এসব দেশের মতো আর কোথাও এত ঘৃণ্য ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেনি এবং আর কোথাও তা এত স্পষ্টভাবে বাহ্যত প্রতীয়মান হয়নি। বাস্তব ঘটনা হলো, সুইজারল্যান্ডও আমেরিকায় পুঁজিরই রয়েছে প্রাধান্য, আর নিজেদের অবস্থার সামান্যতম প্রকৃত উন্নতি সাধনের জন্য শ্রমিকদের প্রতিটি প্রচেষ্টাকেই অবিলম্বে গৃহযুদ্ধের দ্বারা মোকাবিলা করা হয়েছে। এই দুটি দেশে সৈন্য সংখ্যা হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম, স্থায়ী সেনাবাহিনী ছোট- সুইজারল্যান্ডের আছে মিলিশিয়া এবং প্রত্যেক সুইজারল্যান্ডবাসীর বাড়ীতে আছে বন্দুক, অন্যদিকে অতি সম্প্রতিও আমেরিকায় কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল না- আর সে কারণে যখন কোন ধর্মঘট দেখা দেয় তখন বুর্জোয়া শ্রেণী নিজেদের অস্ত্রসজ্জিত করে, ভাড়াটে সৈন্য যোগাড় করে এবং ধর্মঘট দমন করে; এবং সুইজারল্যান্ড ও আমেরিকার মতো এরূপ নির্মম কঠোরতার সাথে আর কোথাও শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করা হয় না এবং পার্লামেন্টে পুঁজির প্রভাব এ দুটি দেশের মতো এতো প্রবলভাবে আর কোথাও নিজেকে অভিব্যক্ত করে না। পুঁজির জোরই সব, স্টক এক্সেচেঞ্জই সব, আর পার্লামেন্ট ও নির্বাচন হলো পতুল নাচের পুতুল, কাঠের পুতুল।… কিন্তু দিনে দিনে শ্রমিকদের চোখ ফুটছে, আর বিশেষ করে সাম্প্রতিক যে রক্তাক্ত হত্যালীলার মধ্য দিয়ে আমরা পার হয়ে এসেছি, তারপর সোভিয়েত সরকারের ধারণা ক্রমশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে বিরামহীন যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা শ্রমিকশ্রেণীর সামনে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে।

প্রজাতন্ত্র যে আবরণই ধারণ করুক না কেন, এমনকি তা সবচেয়ে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হলেও, যদি তা হয় এক বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র, যদি তা জমি, মিল ও ফ্যাক্টরীর উপর ব্যক্তিমালিকানা বজায় রাখে, আর ব্যক্তিগত পুঁজি যদি গোটা সমাজকে মজুরী দাসত্বে আবদ্ধ রাখে, অর্থাৎ, যদি আমাদের পার্টির কর্মসূচী ও সংবিধানে যা ঘোষণা করা হয়েছে তা যদি পালন না করে, তাহলে এই রাষ্ট্র হলো এক দল লোককে দমন করার জন্য অন্য দলের হাতের যন্ত্র। পুঁজির ক্ষমতা উচ্ছেদ করবে যে শ্রেণী আমরা তারই হাতে এই যন্ত্র তুলে দেব। রাষ্ট্র সম্পর্কে সর্বজনীন সমতা বিষয়ক সকল পুরনো কুসংস্কারকে আমরা ছুড়ে ফেলে দেব- কারণ তা হলো এক ভাওতা! যতদিন শোষণ বজায় থাকবে ততদিন কোন সমতা আসতে পারে না। জমিদার আর শ্রমিক সমান হতে পারে না, ভুখা মানুষ আর পেট ভরা মানুষ সমান হতে পারে না। রাষ্ট্র নামক যে যন্ত্রটির সামনে মানুষ কুসংস্কারমূলক সশ্রদ্ধ ভয়ে মাথা নীচু করে, সেই আষাঢ়ে গল্প বিশ্বাস করে যে, এ যন্ত্রের অর্থ হলো গণতান্ত্রিক শাসন- সেই যন্ত্রটিকে সর্বহারাশ্রেণী খারিজ করে দিয়ে ঘোষণা করে যে, এ হলো এক বুর্জোয়া মিথ্যাচার, সর্বহারাশ্রেণী এ যন্ত্রকে ধ্বংস করে দেবে। আমরা পুঁজিপতিদের এ যন্ত্র থেকে অধিকারহারা করেছি এবং নিজেদের হাতে তা তুলে নিয়েছি। এই যন্ত্র বা মুগুর দিয়ে আমরা সকল শোষণকে খতম করে দেব। এবং দুনিয়ার কোথাও শোষণের কোন সম্ভাবনা যখন আর থাকবে না, যখন জমির মালিক ও কারখানার মালিক আর থাকবে না, কেউ আকণ্ঠ খাবে আর কেউ উপোস করবে- এই পরিস্থিতি যখন আর থাকবে না, যখন এসবের সম্ভাবনা আর থাকবে না, একমাত্র তখনই আমরা এই যন্ত্রটিকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবো। তখন কোন রাষ্ট্র থাকবে না, থাকবে না কোন শোষণ। এই হলো আমাদের কমিউনিস্ট পার্টির দৃষ্টিভঙ্গী। আমি আশা করি পরবর্তী বক্তৃতাগুলোতে আমরা এই বিষয়বস্তুতে ফিরে আসবো, ফিরে আসবো বারে বারে।

[১১ জুলাই, ১৯১৯ তারিখে লেনিন সভের্দলভ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বক্তৃতাটি রাখেন। প্রথম প্রকাশ, ১৮ জানুয়ারী, ১৯২৯ ‘প্রাভদা’, সংখ্যা ১৫]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “রাষ্ট্র | লেনিন

  1. মার্কসবাদী দর্শন বুঝতে হলে
    মার্কসবাদী দর্শন বুঝতে হলে সর্বাগ্রে রাষ্ট্র সম্পর্কে এই ধারার দার্শনিকদের মতামতগুলো জানা সবচেয়ে জরুরী। মার্কস ও এঙ্গেলসের এ বিষয়ক আবিষ্কারকে আমাদের সামনে সবচেয়ে সহজ ও প্রাঞ্জলরূপে উপস্থাপন করেছেন কমরেড লেনিন তার ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে। রাষ্ট্র বিষয়ক লেনিনের এই বক্তৃতাটা পড়লে যে কেউ সহজে রাষ্ট্র সংক্রান্ত মার্কসবাদি ধারণার সঙ্গে সহজে পরিচিত হতে পারবেন। সবাইকে লেখাটা পড়ার অনুরোধ করছি।

    1. আসলে লেখাটা হচ্ছে মার্কস এর
      আসলে লেখাটা হচ্ছে মার্কস এর লেখার অনুবাদ। তাই পরিবর্তন বা সম্পদনা করার সুযোগ তেমনটা নেই। এই ধরনের তাত্ত্বিক লেখা একটু ধৈর্য্য ধরে পড়তে হয়। আমি তিনবার পড়ার পর বুঝলাম। তারপরও মনে হচ্ছে আবার পড়লে আরো বেশি বুঝতে পারব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 5