স্বাস্থ্যসেবা,চিকিৎসক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলো…

চিকিৎসকদের নিয়ে আমাদের সমাজে যে ধারনা প্রচলিত আছে তাকে মোটা দাগে দুইভাগে ভাগ করে ফেলা যায়।খুব ভাল আর খুব খারাপ,কষাই।যদিও বাস্তবতা আলাদা।সব পেশাতেই ভাল-খারাপ মিলিয়েই সবার উপস্থিতি।তবে এটা নিয়ে তর্কের সুযোগ আছে, যে সুযোগ করে দিয়েছে খোদ চিকিৎসকেরাই।একইভাবে ‘চিকিৎসা’ শব্দটার ব্যাবহার ‘পেশা’ হিসেবে না ‘সেবা’ হিসেবে ব্যাবহার হবে এটা নিয়েও বিস্তর মতপার্থক্য দেখা যায়,তর্কও হয়।সমাজের আর দশটা শ্রেণীর মানুষ একে সেবা বললেও প্রকৃত অর্থে এই সেবাটুকুই কিন্তু চিকিৎসকদের একমাত্র রুটি-রুজির উছিলা।তাই একজন চিকিৎসকের চোখে এটা নিঃসন্দেহে পেশা।আর সকল বিপত্তির শুরু উৎসমূল ঠিক এই শব্দের অর্থকে কেন্দ্র করেই।তাই এই শব্দের উছিলায় অনেকেই যখন নিতে চায় অতিরিক্ত সুবিধা,বিপত্তির শুরুটা হয় তখনই।কেননা সেই চিকিৎসকেরও চেষ্টা থাকে তার পেশাগত ক্ষেত্রে ছাড় না দেয়ার মনোভাব (যেখানে অধিকাংশ সময়েই তাকে হারতে হয়।)

আমাদের সমাজে চিকিৎসকদের নিয়ে তাই সমালোচনাটা কম হয় না।সমালোচনা ভাল জিনিস,যদি তা বাস্তবসম্মত হয়।আমি নিশ্চয়ই এখ্ন উর্ধতন কর্মকর্তা হয়ে রিকশাওয়ালার সমালোচনা যদি করি,নিশ্চয়ই তা ধোপে টিকবে না।তেমনি ডাক্তারদের অধিকাংশ সমালোচনাই যারা ছাপেন তারা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না,অন্তত একটা সপ্তাহ তারা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন।হয়ত একদিনের ভিজিটে গেলেন,কাউকে পেলেন,কাউকে পেলেন না।বাট রিপোর্ট তৈরি।অথচ কেউ তাদের প্রকৃত সিনারো খোজার চেষ্টা করি না,তাদের সাথে মিশে গিয়ে ভেতরের একান্ত অনুভূতিগুলো ছাপি না।

তবে আমার এই লেখায় ব্যাবহৃত তথ্যগুলো সরেজমিনে প্রাপ্ত।বলতে চাচ্ছি আমাদের ইনভেস্টিগেশন পারপাসে সরকারী আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অবস্থান প্রসংগে।যদিও এখানেও রোগীদের দুইটা শ্রেণীর প্রকোপ বেশী দেখা যায়।এক পক্ষ যখন বলে ‘ডাক্তার দেখাইলাম অথচ কোন ইনভেস্টিগেশন দিল না’,অপর পক্ষ একই সময়ে বলে ‘আইলেই শুধু পরীক্ষা করায়।’এই ব্যাপারটাকে পাশে রেখে আসুন দেখে নেই আমরা চিকিৎসকরা কিভাবে কাজ করছি।

রোগ নির্ণয়ে যেহেতু ইনভেস্টিগেশনের বিকল্প নেই,তাই রোগীর একটা খরচ আছে।উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের কথা হয়ত ডাঃ আতিক ভাই ভাল বলতে পারবেন,তবে আমি শুধু আমার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটির প্যাথলজি বিভাগের সাথে একটি স্বনামধন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নীরিক্ষার খড়চা পাতির কিছু তুলনা করব।আসুন দেখি নিচেঃ
সিবিসিঃ ১৫০ টাকা বেসরকারী-৩৫৫ টাকা
এসজিপিটিঃ ৭০ টাকা বেসরকারী-২৫০ টাকা
এসজিওটিঃ ৭০ টাকা বেসরকারী-২৫০ টাকা
রুটিন ইউরিন এক্সামঃ ২০ টাকা বেসরকারী-১০০ টাকা
ঈউরিক এসিডঃ ১০০ বেসরকারী-২৫০ টাকা
লিপিড প্রোফাইলঃ৩০০ বেসরকারী-৪০০ টাকা
সিরাম ক্রিয়েটিনিনঃ ৫০ বেসরকারী-২৫০ টাকা
সিরাম ইলেক্ট্ড়োলাইটঃ ২৫০ বেসরকারী-৭৫০ টাকা
আরএ টেষ্টঃ ৭০ বেসরকারী-৩০০ টাকা
সি বিলিরুবিনঃ ৩০ বেসরকারী-২৫০ টাকা

ভাই,এইটা একটা স্যাম্পল দিলাম শুধু দামের পার্থক্যের হারটা বোঝাবার জন্যে।এমন আরো অনেক উদাহরন দেয়া যায়।এমনকি শুধুমাত্র সরকারের সদিচ্ছার অভাবের কারনে এছাড়াও একটি উল্ল্যেখ্যোগ্য পরিমান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয় হাসপাতালের বাইরে(কেননা দুপুরু দুইটার পর প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ হয়ে যায়,যদিও রোগী ভর্তি চলতেই থাকে)।কথা হচ্ছে দুই জায়গায় কেনো এত দামের তারতম্য।আশ্চর্য আর কষ্ট নিয়েই দেখতে হয় এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেয় চিকিৎসকদের।আর আমরা তা নেইও আমাদের প্রাপ্য ভেবে।এর চাইতে লজ্জার আর কিছু হতে পারে কিনা আমার জানা নাই।তাহলে কি এই যে অতিরিক্ত দামের বোঝা এর দায়ভার আমাদের চিকিৎসকদের ঘাড়ে এসেও পড়ে না।এই কি ছিল আমার শিক্ষা?এটাই কি আমাদের মনুষ্যত্ব আর মূল্যবোধ?আমি বরং স্যারদের রোগীপ্রতি ৮০০ টাকা ভিজিট মেনে নিতে পারি,কিন্তু কমিশন?কিছুতেই না,কোনদিনও।আশ্চর্য হয়েই দেখতে হয় এখানে ড্যাব-স্বাচিপের কোন বিরোধিতা নাই।হাজার হোক হালুয়া রুটির ভাগ-বাটোয়ারা।

এই বিষয়টার দিকে নজর দেয়ার কি কেউ নাই?অবিলম্বে আইন করে আমাদের চিকিৎসকদের কমিশনের পথ বন্ধ করা,ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ খরচ কমিয়ে সরকারীভাবে পুনঃনির্ধারনের জন্যে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 − = 74