কারবালাঃ বিচার ও নাজাত

নাজাত অথবা বিচার
‘মানুষ ঈসা’ সম্বন্ধে ঐতিহাসিক তথ্য কম। তবে ‘ঈসা মসিহা’ সম্বন্ধে খ্রিস্টানদের নিউ টেস্টামেন্টে লেখা হয়েছে যে তিনি ইহুদীদের হাতে নির্যাতিত হয়ে এবং জেরুজালেমের রোমান প্রশাসক পাইলেতের বিচারে দোষি সাব্যস্ত হয়ে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছিলেন। এই বছর ইতালিয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন ‘পাইলেত ও ঈসা’ নামে একটি বই লিখে দাবি করেছেন যে ঈসা না কি কোন বিচার ছাড়াই নিহত হয়েছেন। নিউ টেস্টামেন্ট, খ্রিস্টানদের আরো কিছু ধর্ম পুস্তক ও তারমধ্যকার ধর্মতত্ত্ব বিচার করে তিনি এই দাবি তুলেছেন যে, ঈসার বিচারে কোন রায়ই ঘোষনা করা হয় নাই। কোন রায় না দিয়েই পাইলেত তাক ক্রুশবিদ্ধ করার জন্যে জমায়েত ইহুদীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মাত্র। বলা যায় বিনা বিচারে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে।

বিনা বিচারে অথবা বিচার করে যেভাবেই ঈসাকে হত্যা করা হয়ে থাক না কেনো, তিনি যে খ্রিস্ট ধর্ম নামের একটি নতুন ধর্ম প্রচারে বড় ধরণের কোন ভুমিকা রাখার আগেই নিহত হয়েছিলেন এবং নিহত হওয়ার সময় হাতে গোনা কয়েকজন শিষ্যকে বিপদের মধ্যে রেখে গিয়েছিলেন তা মোটামুটি নিশ্চিত। তার এই শিষ্যরাও নির্যাতিত হয়েছে। অনেকে সংখ্যাগুরু ইহুদীদের হাতে নির্যাতিত হয়ে নিহত হয়েছেন, অনেকে দেশ ছেড়েছেন, অনেকে বিদেশ বিভুঁইয়ে রোমান সাম্রাজ্যের হাতে নির্যাতিত হয়ে নিহত হয়েছেন। এই দুর্যোগের মধ্যে তারা প্রচার করা শুরু করলেন ঈসা আসলে মারা যান নাই, মৃত্যুর তিনদিন পরে তিনি আবার কবর থেকে বের হয়ে এসে কয়েকজন শিষ্যের সাথে দেখা করেছেন এবং তারপরে তিনি আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। ঈসা তখন থেকেই মসিহা। চুরান্ত অপমান, নির্যাতনের মধ্যে বসবাস করে তাকে মসিহা হিসাবে বিশ্বাস করেই তার অনুসারিরা ‘নাজাতে’র সন্ধান করা শুরু করলো। ঈসার সবচাইতে তরুন শিষ্য ছিলেন সাধু ইউহান্না। বৃদ্ধ বয়সে রোমান সম্রাট নিরোর আমলে তিনি দ্বীপান্তরিত হয়ে একা একা বেঁচেছিলেন। তিনি তখন লিখলেন নিউ টেস্টামেন্টের অন্যতম কিতাব ‘প্রত্যাদেশ’। দাবি করলেন যে ঈসা তাকে দেখা দিয়েছেন, ঈসার মাধ্যমে তিনি দেখতে পেয়েছেন শেষ জমানার বিভিন্ন চিহ্ন। শেষ জমানা আসন্য, ঈসাও আবার ফেরত আসবেন দুনিয়ায়। তিনি আসবেন নাজাত দিতে। কিন্তু এইবার তিনি বিচারও করবেন। হরমাগিদোনের ময়দানে ভালোর পক্ষ হয়ে খারাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন, নিজ হাতে দাজ্জাল (দা বিস্ট, প্রকৃতপক্ষে রোমান সম্রাট নিরো)-কে হত্যা করবেন। শুধু ‘নাজাতে’র উপর ভরশা করেও যখন বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পরে তখন ‘বিচার’ পাওয়ার আশাও নানান ভাষায় প্রকাশিত হয়। বাস্তবে যখন বিচার মেলা কঠিন, তখন মনে হয় শেষ জমানায় অন্তত বিচার মিলবে। ‘শেষ বিচার’ নামক একটা কিছুতে বিশ্বাস মানুষ কোন পরিস্থিতিতে করতে পারে? কার্ল মার্ক্স যথার্থই বলেছেন যে, ধর্ম হলো শোষিতের দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু নাজাত আর বিচার না কি এক দেহে বিরাজ করতে পারে না, এই দুই ধারণা একসাথে যায় না। নাজাত যদি পানি হয়, বিচার তাইলে তেল, অন্তত আগামবেন তাই দাবি করেছেন।

খোদা,ক্ষমতা ও শেষ বিচার
ঈসা মসিহ নিহত হওয়ার প্রায় ছয়শ বছর পর মুহাম্মদ যখন আরব ভুখন্ডে একটি ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তার বহু আগেই খ্রিস্টানদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছিল। রোমানদের রাজধর্ম হিসাবে খ্রিস্টান ধর্ম ততোদিনে নাজাতের পাশাপাশি সাম্রাজ্যের ধর্মেও পরিণত হয়েছে। ঈসা তখন আর শুধু মসিহা নন, খোদাও বটে। দুনিয়ার সকল মানুষের উপর রাজত্বের দাবিদার রোম সাম্রাজ্যের দেয়া বিচার মাথায় নিয়ে খোদায়ি রাজত্বের অধিকারী ঈসা মসিহ ক্রুশবিদ্ধ হয়ে দুনিয়ার মানুষকে পাপ থেকে নাজাত দিয়ে গেছেন। রোম সাম্রাজ্যই তখন খ্রিস্টানধর্মের রক্ষাকর্তা, রোমের সম্রাট তখন দুনিয়ায় খোদার হয়েই বাদশাহী করে থাকেন। আর্থার মরিস হোকার্ট যথার্থই বলেছেন – “আমাদের বর্তমান জ্ঞান দিয়ে আমরা কোনভাবেই দাবি করতে পারি না যে, রাজার ইবাদতের আগে জগতে খোদার ইবাদতের কোন অস্তিত্ব ছিল… হয়তো জগতে কোনকালেই রাজা ছাড়া খোদা অথবা খোদা ছাড়া রাজার অস্তিত্ব ছিল না”।। খোদা তাই রাজাদের রাজা, সকল সম্রাটের সম্রাট এবং সকল সার্বভৌমের উপর সার্বভৌম। ধর্ম যেমন শোষিতের দীর্ঘশ্বাস, তেমনি শোষকের হাতিয়ারও বটে।

নাজাত ও সাম্রাজ্যের ধর্ম খ্রিস্ট ধর্মে বিচারের কথা শোনা যেতো শুধু যখন রোম আক্রান্ত হতো হুন অথবা গথদের হাতে, কিংবা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য পারস্যের সাসানিদদের হামলায় অস্তিত্ব সংকটে পরতো। সম্রাটদের যুদ্ধ তখন হয়ে যেতো শেষ জমানার যুদ্ধ, সম্রাট নিজেই ঈসা মসিহা আসার পূর্বেকার একজন রাজকিয় রোমান মসিহা। ঈসার মৃত্যুর কিছুকাল পরেই জেরুজালেম থেকে ইহুদীরা বিতারিত হয়েছিল। আর দাউদ নবীর বংশধরদের মধ্যে থেকে একদিন ত্রানকর্তা ও বিচারকর্তা মসিহার আবির্ভাব হবে, তাদের নাজাত মিলবে, বিচার মিলবে, দেশও মিলবে এই আশায় থাকতো। খ্রিস্টান ধর্ম ও রোমান সাম্রাজ্যের হাতে নির্যাতিত হয়ে প্রায়ই তারা বিদ্রোহ করতো, জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতো। তারা দাবি করতো তারা শেষ জমানার যুদ্ধ করছে। শেষ বিচার আসন্য। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের ঠিক পূর্বে এই ধরণের পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। মুহাম্মদ যেই সময়ে মক্কা ও মদিনায় তার ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন চালাচ্ছিলেন ঠিক সেই সময়ে ইরাক ও সিরিয়া জুরে চলছিল খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং জোরাস্ট্রিয়ান সাসানিদ সাম্রাজ্যের মধ্যে এক মহাযুদ্ধ। এই যুদ্ধ প্রায় ছাব্বিশ বছর স্থায়ি হয়েছিল। পারস্যের সাসানিদ সাম্রাজ্যকে সমর্থন দিয়ে সিরিয়ার ইহুদীরা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, স্বল্প সময়ের জন্যে জেরুজালেমের দখলও নিয়েছিল। তাদের নেতা প্রচার করছিলেন এই যুদ্ধ শেষ জমানার যুদ্ধ, তিনি আসল মসিহা আসার আগের মসিহা। ঈসা যেই ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে তার বিশ্বাসীদের নাজাত দিয়েছিলেন সেই ক্রুশটি রক্ষিত ছিল জেরুজালেমে। পারস্য সম্রাট খসরু ক্রুশটি নিয়ে গেলেন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের এই পরাজয় আর খ্রিস্টান ধর্মের অবমাননা এক দেহ হয়ে গেলো। খ্রিস্টানরা ভাবলো নিশ্চয় তারা ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়েছে বলেই আল্লাহ তাদেরকে এই অবস্থায় ফেলেছেন। তাদের পাপের কারনেই এই দূর্দশা হয়েছে, বিশেষ করে সম্রাট হেরাক্লিয়াস নিজ ভাগনিকে বিয়ে করে যেই পাপ করেছেন তার প্রায়শ্চিত্য তো করতেই হবে। খ্রিস্টানরাও তখন এই যুদ্ধকে শেষ জমানার যুদ্ধ হিসাবে প্রচার করা শুরু করলো। রোমানদের পরাজয়ের এই কাহিনী কোরান শরিফে পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, আল্লাহ অভয় দিচ্ছেন যে রোমানরা আবার বিজয়ী হবে। রোমানরা বিজয়ী হয়েছিল। সম্রাট হেরাক্লিয়াস নিজে সম্মুখ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে সিরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেছিলেন, পবিত্র ক্রুশটি ফিরিয়ে এনেছিলেন। দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিল বহু প্রাণের বিনিময়ে। বিশেষ করে জেরুজালেমে কতো ইহুদীর হাতে কতো খ্রিস্টান আর কতো খ্রিস্টানের হাতে কতো ইহুদী নিহত হয়েছিল তা গননা করা যায় নাই, লোকে ধারণা করেছে মাত্র। জাহেলিয়া তখন শুধু আরবের মরুভুমিতেই ছিল না, ইরাক সিরিয়ার নগরগুলাতেও হাজির ছিল।

জাহেলিয়ার সেই দুনিয়ায় মুহাম্মদ নাজাত নিয়া হাজির হন নাই। তিনি হাজির হইছিলেন বিচার নিয়া। আরবের স্টেট অফ নেচারের মাঝে তিনি আইনের শাসন জারি করেছিলেন। যুদ্ধ বিদ্ধস্ত ইরাক ও সিরিয়ায় পুরোপুরি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলমান বিজয়ের পর। উমর যখন জেরুজালেম দখল করে নিলেন, খ্রিস্টানদের সাথে দেন দরবার করে সত্তরটি ইহুদী পরিবারকে জেরুজালেমে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আদী ইসলামের সাথে খ্রিস্টান ধর্মের পার্থক্য বোধহয় নাজাত এবং বিচারে। ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল বিচারের ধর্ম হিসাবে, নাজাতের ধর্ম হিসাবে নয়।

.pagespeed.ic.jzUzJYzFPv.jpg” />

 

কারবালাঃ বিচার ও নাজাত
ইমাম হোসেইন যখন কারবালার ময়দানে নিহত হন তখন তার সাথে নিহত হয়েছিলেন নবী মুহাম্মদের হাশেমি বংশের মোট বাহাত্তর জন সদস্য। এর মধ্যে সবাই ছিলেন মহানবীর নাতি, পুতি থেকে শুরু করে অন্যান্য রক্ত সম্পর্কের আত্মিয়। ইমাম হোসেইনের ছয় মাস বয়সি একজন পুত্রও ছিলেন। বলতে গেলে এই এক যুদ্ধেই নবীর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। এই হত্যাকান্ডের বিচার দাবি করেই শিয়া সম্প্রদায় বিকাশ লাভ করেছিল। কিন্তু বিচার আদৌ হয়েছে কি? মোখতারের বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে কিছুটা প্রতিশোধ গ্রহন হয়েছিল বটে, তবে তাতে অবিচার দীর্ঘজীবী হয়েছে। ইমাম হোসেইন কেনো এমন নির্মম ভাবে নিহত হলেন? এবং কেনো এই হত্যাকান্ডের কোন বিচার হলো না। কারন তিনি উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ছিলেন, নিজেই সার্বভৌমত্বের দাবিদার ছিলেন।

ইসলামের প্রাথমিক যুগের তাবৎ অবিচারের সাক্ষি হিসাবে হাজির শিয়া ইসলাম। মুহাম্মদ তার উত্তরসুরি হিসাবে আলীকে পছন্দ করেছিলেন, কিন্তু উমর ও আবু বকরের তৎপরতায় তা সম্ভব হয় নাই। শিয়া ধর্মতত্ত্ব অনুসারে এই হইল প্রথম অবিচার। এই অবিচার উল্লেখ করে শিয়ারা শুরুতে উমাইয়া ও পরে আব্বাসিয় খেলাফতের বিরুদ্ধে মহানবীর বংশধরদের ইমামতের বৈধতা দাবি করতো। আর কারবালার অবিচারকে সাক্ষি করে তারা প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতো। প্রথম এইরকম বিদ্রোহ ছিল কুফায় আল মোখতারের বিদ্রোহ। কারবালার যুদ্ধের পর হোসেইনের একমাত্র জীবিত পুত্র আলী ইবনে হোসেইন সব ধরণের রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন। মোখতার তাই আলীর অপর পুত্র মুহাম্মদ বিন হানাফিয়া, যিনি ফাতিমার সন্তান ছিলেন না এবং সেই সময়ে হাশেমি বংশের নেতা ছিলেন, তাকে ইমাম মেনে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন। মোখতার তখন প্রচার করলেন যে তারা শেষ জমানার যুদ্ধ লড়ছেন, এবং মুহাম্মদ হানাফিয়া যেনো তেনো ইমাম নয়, তিনি ইমাম মাহদীও বটে। তিনি সেই ইমাম যিনি বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু প্রাথমিক সাফল্য লাভ করলেও মোখতার কিছুদিন পরে নিহত হলেন। মুহাম্মদ হানাফিয়া মদিনায় মৃত্যুবরণ করলেন। মোখতারের অনুসারিরা তখন প্রচার করা শুরু করলো যে, মুহাম্মদ হানাফিয়া আসলে মারা যান নাই। আল্লাহ তাকে গায়েব করে দিয়েছেন। শেষ জমানায় তিনি আবার ফেরত আসবেন। তখন বিচার, ধর্ম ও মুহাম্মদের বংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে। নিজেদের নাজাত, নিজেদের বিরুদ্ধে অন্যায়ের বিচার, ক্ষমতা কেন্দ্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে মুহাম্মদের বংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তার বংশধরদের হত্যাকান্ডের বিচারের সাথে এক জোট করে উমাইয়াদের হাতে বঞ্চিত, নির্যাতিত আরব বেদুইন আর অনারব মাওয়ালিরা একের পর এক বিদ্রোহ করে গেছে এরপর থেকে। প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের বিরুদ্ধে মহানবীর বংশধরদের অনুসারিদের এই সব আন্দোলন সংগ্রামকেই শিয়া সম্প্রদায়ের ফরমেটিভ পিরিয়ড ধরা হয়ে থাকে। তাদের ইমামরা প্রায়ই প্রতিষ্ঠিত খলিফাদের বিরুদ্ধে হয় যুদ্ধ করে নিহত হয়েছেন, অথবা যারা শান্তিতে থাকতে চেয়েছেন খলিফারা চ্যালেঞ্জের শিকার হওয়ার ভয়ে তাদেরকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেছে। এইভাবে আলী থেকে শুরু করে ইমাম হোসেইনের বংশধর হয়ে এগারোতম ইমাম যখন মৃত্যুবরণ করলেন, তখন আদৌ তার কোন বংশধররের অস্তিত্ব ছিল কি না সেই বিষয়ে ঐতিহাসিকদের সন্দেহ আছে। কিন্তু বারোপন্থী শিয়াদের মতে বারোতম ইমাম একজন ছিলেন। জন্মের পর থেকেই তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন এবং নিজের চারজন ডিপুটির মাধ্যমে অনুসারিদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন, এবং এক পর্যায়ে তিনি পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেছেন। তিনিই ইমাম মাহদী। কেয়ামতের পূর্বে তিনি আবার ফেরত আসবেন, তখন আবার ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। এই বারোতম ইমামের ফেরত আসার আশাতেই শিয়ারা হাজার বছর অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সময় থেকে শিয়াদের এই ধর্মতত্ত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ইমামের অনুপস্থিতিতে ইরানের শিয়া উলামারা নিজেরাই ইমামতের দাবিদার হয়ে উঠেছেন। অর্থাৎ সুন্নি উলামারা প্রায় হাজার বছর আগেই আহলে সুন্নাতের সার্বভৌমত্বের যে ধর্মতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, শিয়া উলামারাও এখন সেই পথেই হাটছেন। অবশ্য মোখতারের বিদ্রোহে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তারও আগে যারা উসমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পরে আলীর পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন, তারাও কিন্তু কুরান এবং সুন্নাহর শাসন প্রতিষ্ঠার কথাই বলেছিলেন। আহলে সুন্নাহ আর আহলে বায়াত সেই সময়ে এক দেহে বিরাজ করেছে। শিয়া ধর্মতত্ত্ব যদি ইসলামের ফরমেটিভ পিরিয়ডের তাবৎ অবিচারের সাক্ষি হয়ে থাকে, তাহলে সুন্নি ধর্মতত্ত্ব হলো অবিচারের দুনিয়ায় নাজাতের ধর্মতন্ত্রের ধারক ও বাহক। সুন্নি ধর্মতন্ত্র গড়ে উঠেছে শুরুতে প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের (উমাইয়া ও আব্বাসিয়) সমর্থনদাতা পৌরহিত্ব হিসাবে এবং তারপরে শিয়া, খারেজিসহ প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের বিরোধী বিভিন্ন ধর্মতত্ত্বকে নিজ দেহে আত্মস্থ করে। (চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “কারবালাঃ বিচার ও নাজাত

  1. তরুণ ইসলামি ঐতিহাসিক পদবির
    তরুণ ইসলামি ঐতিহাসিক পদবির ন্যায্য দাবিদার এই বাংলায় একমাত্র আপনিই আছেন। ইসলামি সেক্যুলারদের জন্য আপনার চেয়ে উপকারী বন্ধু আর কেউ নেই। অনেক থ্যাংকস আপনাকে।

  2. বাংলাদেশে এই মুহুর্তের তরুন
    বাংলাদেশে এই মুহুর্তের তরুন ইতিহাসবিদ হিসাবে আপনার ভুমিকা সত্যিই প্রসংশনীয়। চমৎকার আরো একটা সিরিজ শুরু করলেন পারভেজ ভাই। সিরিজ চলুক……।

  3. পারভেজ ভাতিজা হচ্ছেন এ যুগের
    পারভেজ ভাতিজা হচ্ছেন এ যুগের সেকুলার ধার্মিক। আগামীর সলিমুল্লা খান। লেখা ছুনফুন হইছে ভাতিজা।

  4. পারভেজ, আপনার লেখাটি
    পারভেজ, আপনার লেখাটি পড়লাম।

    “জাহেলিয়ার সেই দুনিয়ায় মুহাম্মদ নাজাত নিয়া হাজির হন নাই। তিনি হাজির হইছিলেন বিচার নিয়া। আরবের স্টেট অফ নেচারের মাঝে তিনি আইনের শাসন জারি করেছিলেন। যুদ্ধ বিদ্ধস্ত ইরাক ও সিরিয়ায় পুরোপুরি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলমান বিজয়ের পর।”

    এই ধরনের স্টেটমেন্ট এর গ্রহণযোগ্যতা আসলে কতটুকু? মানে যদি আমি ইসলামের ইতিহাস না জানি, একজন সাধারণ পাঠক হই, তাহলে এই ধরনের স্টেটমেন্ট কিভাবে বিশ্বাস করবো? আপনার লেখায় কোনও ব্যাখ্যা আছে? উপাত্ত আছে? এইটা যদি আপনার নিজের মূল্যায়ন হয় তাইলেও আপনার উচিৎ এর স্বপক্ষে ঐতিহাসিক উপাত্ত হাজির করা। যদি অন্যের বয়ান হয়, তাইলে তাদের বয়ান থেকে আরো বিস্তারিত ব্যাক্ষ্যা হাজির করা উচিৎ।

    আশা করি আগামী পর্বে ব্যাক্ষ্যা করবেন সুযোগ কইরা।

    লেখাটা ফলো করবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

43 − = 36