মুক্তচিন্তার বই প্রকাশ বন্ধ করতেই এই হামলা!

জঙ্গি হামলায় রক্তাক্ত বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল প্রকাশক ও ব্লগাররা। রাজধানীতে পৃথক দুটি ঘটনায় জাগৃতি প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। অপর ঘটনায় ‘শুদ্ধস্বর’র স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ ৩জন ব্লগার দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর প্রকাশক টুটুলসহ তিন ব্লগারের উপর হামলার ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে।

নিহত ও আহতরা সবাই জঙ্গিদের হামলায় নিহত মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশনার সাথে সম্পৃক্ত। আর তাই এদেরকে টার্গেট করা হয়েছে। এ কথা বলছেন গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরাই। তবে মুক্তমনা লেখকরা বলছেন। আর কিছুদিন পরেই আসছে বইমেলা। এখন থেকেই লেখকরা বই প্রকাশের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাই এই সময়টিকে টার্গেট করেছে জঙ্গিরা। তারা প্রকাশকদের ওপর হামলার মাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছে। আর তা হলো- বিজ্ঞান লেখক ও মুক্তমনাদের বই প্রকাশ করা যাবে না। যদি কেউ এ ধরণের বই প্রকাশ করে তাহলে তার কী পরিণাম হতে পারে তার নজির হিসেবেই এই হামলা।

এর ফলে মুক্তচিন্তার বইপত্র প্রকাশ কমে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন সবাই। কেউ ব্লগার শুনলে তার বই আর প্রকাশ করতে চাইবে না কোনো প্রকাশক। ফলে মুক্তচিন্তা সম্পর্কিত লেখালেখি পাঠকদের হাতে কম পৌঁছুবে। এভাবেই জঙ্গিরা মুখ বন্ধ করতে চায়। তারা লক্ষ্য করেছে, ইতোপূর্বে পাঁচ ব্লগারকে হত্যা করেও ব্লগারদের মুখ বন্ধ রাখা যায়নি। তাছাড়া অনেক ব্লগারই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। সেখান থেকে তারা অব্যাহতভাবে লিখে চলেছেন। দেশে যাতে এসব লেখা না ছড়াতে পারে, তার অংশ হিসেবেই এই হামলা।

আগে বই পুড়িয়ে দেয়া হতো, লেখককে জেলে পোরা হতো। এখন দেখা যাচ্ছে প্রকাশককে হত্যা করে বইয়ের প্রকাশ বন্ধ করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটা অভিনব এক মৌলবাদী তৎপরতা। এ এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা অনুযায়ী নেয়া পদক্ষেপ। এটা প্রমাণ করে, এর সঙ্গে যে শুধু ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের সম্পর্ক রয়েছে তা নয়, বরং ব্লগার হত্যার সঙ্গে মাস্টার থিঙ্ক ট্যাঙ্কদের যোগসাজশ আছে। যারা বাংলাদেশে মৌলবাদী তৎপরতার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে চায়। মুক্তচিন্তার যে বীজ দেশের মাটিতে রয়ে গেছে, তার মূলোৎপাটনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এ চক্রটি।

দীপন হত্যা ও শুদ্ধ্বস্বরে হামলার দায় স্বীকার করে পাঠানো বিবৃতিতে ‘কে হবে আমাদের পরবর্তী টার্গেট’ এ শিরোনামে আট ধরনের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী সময়ে ‘টার্গেট’ হিসেবে উল্লেখ করেছে আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ। তাদের মধ্যে রয়েছে— আল্লাহ, রাসুল ও দ্বীন ইসলামকে হেয়কারী ও কটূক্তিকারী ব্যক্তি, কটূক্তিকারীদের বুদ্ধি-পরামর্শ ও অর্থ দিয়ে সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী ব্যক্তি, ইসলামী শরীয়তের নিয়ম-কানুনে বাধা প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। কারো নাম উল্লেখ না করে তারা বলেছে হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা; কোনো এলাকার মেয়র, মোড়ল ও মাতব্বর; কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান; কোনো বিচারক, আইনজীবী ও চিকিৎসক; কোনো গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি, বুদ্ধিজীবী, কোনো পত্রিকার সাংবাদিক ও সম্পাদক; নাট্যকার, প্রযোজক ও অভিনয়শিল্পী ইত্যাদি।

তবে সরকার এখনো এ নিয়ে রাজনীতি করছে। তারা বলছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতেই এই হত্যাকান্ড। মূল কারণটা যে মুক্তমনাদের বিনাশ ঘটানো, এটাকে তারা এড়িয়ে যাচ্ছে। এভাবে ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করছে সরকার। যাতে করে মূল অপরাধীরা আড়াল হয়ে যাচ্ছে। তবে সরকার পক্ষ জানিয়েছে, আগামী দু’মাস এ ধরণের ঘটনা আরও ঘটতে পারে। এটাকে আমলে নেয়া দরকার।

আজ প্রথম আলোয় ‘সরকার হতভম্ব’ শিরোনামের এক খবরে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্রে জানা যায়, লালমাটিয়া এলাকায় অঘটনের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করেছিল। কিন্তু এত সতর্কতার মধ্যেও এসব ঘটনা’ ঘটে চলেছে। দেখা যাচ্ছে, সরকার সবই জানে, কিন্তু ব্লগাররা নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এটা কি তাদের ব্যর্থতা নাকি অনিচ্ছা তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ইমরান এইচ সরকার তো বলেই দিয়েছেন, সরকারের ভেতর থেকে মদদ না থাকলে এভাবে ধারাবাহিক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে অপরাধীরা নিরাপদে থাকতে পারত না। এসব বিষয়ই আজ ব্লগারদের আমলে নিতে হবে।

যেহেতু মৌলবাদীরা চায় মুখ বন্ধ করতে, লেখা প্রকাশ বন্ধ করতে, সেহেতু আশঙ্কা করা যায়, কিছু ব্লগের মডারেশন প্যানেলের লোকজনও টার্গেটেড হতে পারেন। ব্লগের সঙ্গে যুক্তরা তাই সাবধানতা অবলম্বন করুন। যারা বই প্রকাশ করতে চান, তাদের উচিত পরবর্তী পরিকল্পনা আগামাথা ভেবে নিয়ে কাজ করা। কথা বলা বন্ধ করা যাবে না, তাতে মৌলবাদীদেরই জয় হবে। কিন্তু কিভাবে কথা বলবেন, তা আগে পরিকল্পনা করুন। টার্গেটেড শীর্ষ ব্লগারদের উচিত নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা বাড়ানো এবং অনলাইন ও অফলাইনে একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। যাতে কেউ কখনো বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়েন, সবাই যেন সব সময় টাচে থাকেন।

তবে ব্লগারদের মধ্যে যেহেতু পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অনৈক্য আছে, তাই এ রকম কোনো কিছু করা প্রায় অসম্ভব। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই নিরাপত্তার বিধান করতে হবে। তবে এটা ঠিক যে, মৌলবাদীরা বেশ খানিকটা সফল, কথা বলা ও লেখা- দুটোই কমেছে। এখন মুক্তমনারা ভেবে দেখুন, সঙ্ঘবদ্ধ কোনো পরিকল্পনার দিকে গিয়ে মুক্তচিন্তার পথচলা অব্যাহত রাখবেন নাকি বিচ্ছিন্ন থেকে থেকে সব এভাবে শেষ হয়ে যেতে দেখবেন!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “মুক্তচিন্তার বই প্রকাশ বন্ধ করতেই এই হামলা!

  1. এই মুহুর্তে ব্লগারদের উচিত
    এই মুহুর্তে ব্লগারদের উচিত পরিকল্পিতভাবে কথা বলা। সবার মধ্য প্রয়োজন ঐক্য। ঐক্য না থাকলে মৌলবাদীরা সফল হবেই। কথা বলা বন্ধ করা যাবে না। মুক্তচিন্তার চর্চা কোনভাবেই থামানো যাবে না। আপনার আশংকাগুলো সত্য। ওদের টার্গেটই হচ্ছে মৌলবাদ বিকাশে একমাত্র বাঁধা মুক্তচিন্তার পথকে রুদ্ধ করা। মৌলবাদীরা একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে তরুন প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চার হার বেড়েছে। মৌলবাদীরা আতংকিত। ধর্ম বিষয়ে তরুণরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ধর্মের গোড়ামী নিয়ে বর্তমানে অনলাইনে অনেক লেখক দাঁড়িয়ে গেছে। যারা মেইনস্ট্রিমে লেখালিখি করছে, প্রতিবছর বই বের করছে। এদের থামিয়ে দিতে না পারলে মৌলবাদ হুমকিতে পড়বে।

    1. এই মুহুর্তে ব্লগারদের উচিত

      এই মুহুর্তে ব্লগারদের উচিত পরিকল্পিতভাবে কথা বলা। সবার মধ্য প্রয়োজন ঐক্য। ঐক্য না থাকলে মৌলবাদীরা সফল হবেই।

      আওয়ামী লীগ তো এটি চায়না। তারা কারও সাথে ঐক্যে যাবেনা দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে। জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে মূল বাধা আওয়ামী লীগ। জাতীয় ঐক্য আওয়ামী লীগের লক্ষ্য নয়; তাদের লক্ষ্য মোসাহেব পুলিশ ও র‍্যাব বাহিনী দিয়ে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকা। আওয়ামী লীগ আর তাদের বাম মোসাহেবরা ছাড়া আর কেউ রাজনীতি করুক, তারা সেটা চায়না। ঐক্য হইলে হাম্বালীগ পুলিশ আর র‍্যাবের মাধ্যমে কাকে দমন করবে। পুলিশ তো তখন না খেয়ে মারা যাবে। আর ‘নাস্তিক’দের হত্যাকারীদের ধরার সময় তাদের আছে নাকি? মৃতদেহের পাহারাদার তখন কে হবে?

  2. মুক্তমনা লেখকদের যেমন লেখার
    মুক্তমনা লেখকদের যেমন লেখার মাত্রা বাড়িযে দিতে হবে তেমনি পাড়ায় মহল্লায় তরুনদের সংগঠিত করে মৌলবাদের হুমকি ও ধর্মীয় গোড়ামি সম্পর্কে অবগত করতে হবে সেই সাথে নিজস্ব শক্তির উথান গঠাতে হবে।

  3. লেখকরা লেখাজোকা বন্ধ করে দিয়ে
    লেখকরা লেখাজোকা বন্ধ করে দিয়ে বিটি বেগুন চাষ করেন। উৎকৃষ্টমানের আলু চাষেও মন দিতে পারেন। লেখালিখি করে আর্থিক কোন লাভ নেই; উল্টো জীবনটাকে কেন সংকটে ফেলবেন? আসুন আমরা সবাই প্যাটে-চ্যাটে বাঙালী হই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 − = 77