এবার ইলিশের পেছনে আমেরিকা : উদ্বিগ্ন হচ্ছেন?

সম্প্রতি ইলিশ নিয়ে জাতীয় পরিসরে উদ্বেগ বেড়েছে। কিছুদিন আগে ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম ছিল খুবই চড়া! গরিব শ্রমজীবীরা দূরে থাক, শহুরে মধ্যবিত্তরাই এবার ইলিশের গায়ে হাত দিতে পারত না। এক কেজি মাপের ইলিশ ভরা বর্ষায় ঢাকার বাজারগুলোতে কোথাও দুই হাজার টাকার কমে বিক্রি হয়নি। ইলিশের এই হাল দেখে সবাই ভেবেছিলেন, এবার বোধহয় উৎপাদন কম। আবহাওয়া খারাপ, তাছাড়া বদলে যাচ্ছে ঋতু প্রকৃতি! জাটকা ধরা, ইলিশ রপ্তানিসহ আরও অনেক কারণ আমরা ভেবেছিলাম।

কিন্তু সরকারি তথ্য বলছে, ইলিশ উৎপাদন অনেক বেড়েছে আগের তুলনায়! মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও বঙ্গোপসাগর থেকে ২০০৯-১০ মৌসুমে দুই লাখ টন ইলিশ ধরা হয়। ২০১৪ সালে তা বেড়ে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন হয়েছে। চলতি বছর চার লাখ টন ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছে মৎস্য অধিদপ্তর। বিপরীতে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত বাকি যে ১০টি দেশ ইলিশ উৎপাদন করে, তাদের সকলেরই উৎপাদন কমেছে। ফলে ইলিশ রক্ষায় এদের সবার কাছেই বাংলাদেশ এখন ‘রোল মডেল’। সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয় তার মধ্যে বাংলাদেশ একাই করে ৬৫ শতাংশ। মোট জাতীয় আয়ের ১.৫ ভাগ আসে ইলিশ থেকে।

ইলিশ উৎপাদনের এই শনৈঃ শনৈঃ উন্নতির খবর বেশ গুরুত্ব দিয়েই প্রচার করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সবার চেয়ে অগ্রসর ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে প্রথম আলোকে। গত ২০ অক্টোবর পত্রিকাটি তাদের লিড নিউজ ছেপেছে ইলিশের সাফল্য নিয়ে। প্রথম আলোর এত আগ্রহ দেখেই তখন মনে খটকা লেগেছিল। আশঙ্কাটা যে অমূলক ছিল না, প্রমাণ হলো পরদিনই। ২১ অক্টোবর ঢাকার সোনারগাঁ হোটেলের বলরুমে দেখা গেল মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ইলিশ নিয়ে মহাকর্মযজ্ঞ!

?oh=b038c7533be8fd833d4bce3bd41ce344&oe=56CE4472″ width=”400″ />
ইউএসএইডের পক্ষে প্রথম আলোর দালালি!

আগ্রহ নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম, সেখানে কী হয়। গিয়ে দেখলাম, বেশ ভালো করে প্রশিক্ষণ দিয়ে এক জেলে দম্পতিকে নিয়ে আসা হয়েছে। সাদা চামড়াধারীরা তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। দোভাষি আছে। জানতে পারলাম, বাংলাদেশের ইলিশ নিয়ে ইদানীং আমেরিকা খুব উদ্বিগ্ন। গত কয়েক বছর ধরেই তারা ইলিশের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। যে কারণে ইলিশের উৎপাদন ব্যাপক আকারে বেড়েছে। এখন তারা অফিশিয়ালি পাঁচ বছরব্যাপী একটি প্রকল্প নিয়েছে এই খাতে। যার সূচনা হিসেবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন। উপস্থিত আছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বিদেশী সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশ ও দেশী সংস্থা মৎস অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। মৎস ও পশুসম্পদ মন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন সেখানে।

বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। কিছু কথাবার্তা শুনে চলে আসলাম। এর মধ্য থেকেই জানতে পারলাম, ইলিশ রক্ষার্থে সহযোগিতা দিতে এগিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি)। বাংলাদেশ সরকার ও তাদের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ইকো ফিশ বাংলাদেশ প্রকল্প। এর আওতায় ইলিশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ব্যয় করা হবে ১৫ মিলিয়ন ডলার বা ১১৭ কোটি টাকা। যা থেকে ইলিশ চাষ ও এর প্রজনন বিষয়ক গবেষণা, জেলেদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা, জাটকা ও মা ইলিশ নিধন বন্ধ এবং মাছ ধরা বন্ধ থাকা কালে জেলেদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণসহ দেয়া হবে নগদ সহায়তাও।

ফেরার পথে ভাবতে থাকলাম, এত ইলিশ, এত টাকা, তাহলে আমরা কেন বাজারে গিয়ে মাছ পাই না? আর আমেরিকাই বা কেন ইলিশ নিয়ে এত আগ্রহী। খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করলাম এ বিষয়ে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদের কয়েকজনের নাম্বার নিয়ে এসেছিলাম। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম যে, অনুষ্ঠান শেষে যে ব্যুফে লাঞ্চের আয়োজন হয়েছিল, সেখানে ডিমওয়ালা ইলিশই খাওানো হয়েছিল। যা কিনা হাস্যরসের সৃষ্টি করে। বুঝলাম, ইলিশ নিয়ে তাদের আলাদা পরিকল্পনা আছে। তা না হলে এ ধরণের ঘটনা ঘটত না, আর ইলিশের উৎপাদন বাড়ায় বাজারেও সরবরাহ বাড়ত।

?oh=4eb276b2c9110149c5ef6093f2761315&oe=56F9B7BD” width=”400″ />
লুটেরারা সব সময় এরকম কিছু মানুষকে সামনে রেখেই লুটপাট চালায়!

উপস্থিত সাংবাদিকদের বরাতে ও পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানলাম, সেদিন ওই অনুষ্ঠানে মত্তস ও পশুসম্পদ মন্ত্রী ইলিশ রপ্তানির ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। দৈনিক ইত্তেফাক এ সম্পর্কিত খবরের শিরোনাম করে, ‘ইলিশ রফতানি বাড়াতে কারেন্ট জাল ধ্বংস করা হবে’। ওই খবরে তারা লেখে, ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক বলেছেন, সরকার স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর সারা বিশ্বে ইলিশ রফতানি করতে উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য মৎস্য নিধনকারী সকল প্রকার জাল ধ্বংস করতে পদক্ষেপ নিয়েছে।’

এ থেকে বোঝা গেল, সরকার ও আমেরিকা ইলিশ রপ্তানিতে আগ্রহী। খোঁজ নিয়ে কালের কণ্ঠের একটি প্রতিবেদন থেকে জানলাম, ইলিশ খুব তেলতেলে মাছ। সম্প্রতি সেই তেলেরও বিশেষ এক গুণ আবিষ্কার হয়েছে। জানা গেছে, এতে যে ‘ওমেগা-৩’ জাতের তেল আছে, তা দিয়ে ওষুধ তৈরি করা যায়। হৃদরোগসহ বেশ কিছু রোগ উপশমে ভূমিকা রাখতে পারে এই ওষুধ। ইতিমধ্যে ইলিশের তেল থেকে ওষুধ তৈরি শুরু করেছে বেশ কিছু দেশ। এ ছাড়াও ইলিশে রয়েছে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খনিজ- জিঙ্ক ও ভিটামিন এ। তাছাড়া বাঙালী ভোজনরসিকদের বাইরেও ইলিশের কদর বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড ও ইউরোপের কিছু দেশে ইলিশের স্যুপ এখন বেশ জনপ্রিয়। বিদেশের ঝাল খাবারের রেস্তোরাঁগুলোতেও ইলিশ-ডিশ বেশ কদর পাচ্ছে।

?oh=1430500e7f9c90ae153217da11e8075c&oe=56C5B33B” width=”400″ />
এবার ওরা ইলিশ মাছে কালো থাবা বসাতে যাচ্ছে!

ওয়ার্ল্ড ফিশ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় এলাকায় মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে নানামুখী কাজ করছে। ইকো ফিশ প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তদারকিতে মাঠপর্যায়ে এ প্রকল্পের কার্যক্রম চলবে ওয়ার্ল্ড ফিশের হাত ধরেই। প্রতিটি জেলায় ওয়ার্ল্ড ফিশের একজন বিজ্ঞানী ও তিনজন সহযোগী বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে একটি দল প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করবেন। জেলে অধ্যুষিত বিভিন্ন গ্রাম ভাগ করে সেগুলোতে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ইলিশের জীবনপ্রণালি নিয়ে তাই বড় পরিসরে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এমনকি নদীপথ দূষণ বন্ধ করা ও নাব্যতা রক্ষার প্রশ্নেও এ প্রকল্প থেকে আসবে নির্দেশনা।

ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে সাধারণত প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পুরো আট মাস জাটকাসহ অন্য ছোট মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। এই সময়ে সরকার চার মাস পর পর জেলেদের প্রতি পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি চাল সহায়তা দেয়। কিন্তু অর্ধেকেরও কম জেলে এই সহায়তা পান। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় সহায়তা পাওয়া জেলেরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর দিন কাটান। এ প্রকল্পে জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে সংশ্লিষ্ট জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা দেয়া হবে। জেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ২৫ সদস্যের দল গঠন করে তাদের ক্ষুদ্র পেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। খাঁচায় মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু পালন, সবজি চাষ ও কুটিরশিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাও থাকবে প্রকল্পের আওতায়।

এসব খবর থেকে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, আমেরিকার স্বার্থটা আসলে কোথায় :
প্রথমত তারা চাইছে, ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে। যাতে রপ্তানির রাস্তা পরিষ্কার করা যায়।
দ্বিতীয়ত, তারা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে গবেষণা করছে। এর অর্থ হলো, উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্ত ধরণের তথ্য, যেমন সামুদ্রিক সম্পদ, জলজ উপাদান, সংশ্লিষ্ট মানুষ ও ভৌগলিক অবস্থান- এরকম সবকিছুই বিনা ঝামেলায় আমেরিকার হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। যা আগামিতে এ অঞ্চলে সমুদ্র ঘাঁটি করার ক্ষেত্রে তাদের কাজে লাগবে।
তৃতীয়ত, জেলেদের ঋণদান ও ব্র্যাকের মতো কুটিরশিল্পভিত্তিক শোষণের আওতায় আনা হচ্ছে। কারণ বলা হচ্ছে, প্রকল্পের আওতায় এগুলো বিক্রি হবে। যা কিনা আড়ং প্রকল্পে ব্র্যাক করে থাকে। অর্থাৎ জেলেদের নিজস্ব যে ব্যবস্থাপনা ও সংস্কৃতি- তাতে একটা বিরাট আঘাত আসতে যাচ্ছে।
চতুর্থত, এ প্রকল্পের মাধ্যমে ইলিশ বিষয়ক সমস্ত তথ্য যাবে আমেরিকার হাতে। তারা ইলিশের নিজস্ব জাত তৈরীর দিকে এগুতে পারে, যাতে তাদের এলাকাতেও এই মাছ চাষ করা যায়। আর তা হলে এ অঞ্চলে তারা আর ইলিশের চাষ হতে দেবে না।

তাছাড়া আট মাস দীর্ঘ সময়। এতদিন জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত রাখলে ঠিকমতো যাতে তারা সাহায্য পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কে নিশ্চিত করবে? নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ইলিশের ডিম খেয়ে ইলিশ বাঁচাতে চাওয়া এই মহান গবেষকরা জেলেদের টাকাগুলো খেয়ে ফেলবে। তারা এ নিয়ে ঝামেলায় পড়বে। যাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে, তারা যদি কাজ না শিখে বা শিখতে না পারে, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে? অর্থাৎ কর্মসংস্থান প্রকল্প যদি ব্যর্থ হয়, তার পরবর্তী পরিকল্পনা কী হবে? সামগ্রিকভাবে জেলেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে দরকার হচ্ছে, মধ্যস্বত্বভোগীদের জেলেপাড়া থেকে দূরে রাখা। এখন দেখা যাচ্ছে, এই শ্রেণীর লোকেদের ভীড় ক্রমাগত বাড়ছে।

বোঝা যাচ্ছে, মার্কিনিরা জেলে ও ইলিশকে তাদের ব্যবসার উপকরণ বানাচ্ছে। ব্যবসা ছাড়া তারা কোথাও যায় না, এটা কার না জানা কথা। কিন্তু ইলিশ নিয়ে আরও ব্যবসার অর্থ হচ্ছে, আমাদের কপাল থেকে ইলিশ উঠে যাওয়া, আর গরিব জেলেদের দুঃখ-দুর্দশা বৃদ্ধি। এ নিয়ে এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। সময় গেলে সাধন হবে না। এভাবে আমরা সমস্ত জাতীয় ঐতিহ্যকে বিকিয়ে দিতে পারি না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “এবার ইলিশের পেছনে আমেরিকা : উদ্বিগ্ন হচ্ছেন?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 − 68 =