সাদা মনের মানুষ, তুমিও!!

এখন বাংলাদেশে বাচতে হলে আপনাকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। বাংলাদেশের ঘাড়ে এখন নিঃশ্বাস ফেলছে মধ্যযুগীয় আরবের বর্বর ধর্মের হায়েনা। এখন বাংলার ঘরে ঘরে এখন আরবের হাওয়া। মুসলমান পরিবারের সকলেই এখন নিজেকে মুসলমান প্রমানে ব্যস্ত। যারা প্রাত্যাহিক সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্থ, যারা যান্ত্রিকতায় আচ্ছন্ন, সকলেই নিদেনপক্ষে সপ্তাহে একবার জুম্মার নামাযে অংশ নিয়েও নিজের মুসলমান নামের সত্যতা প্রমানে চেষ্টায় রত। আর যারা সমাজের সচেতন অংশ, সমাজ নিয়ে দু চার কথা বলেন, দু চার লাইন কলাম লিখেন, যাদেরকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমরা চিনি, তারাও এখন নিজেদেরকে মুসলমান; নিদেনপক্ষে আস্তিক প্রমানে ব্যস্ত।

নাস্তিকের জন্য বাংলাদেশ সম্পুর্নভাবে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে মুসলমান ব্যতিত অন্য ধর্মের লোক নির্যাতিত হয়ে বেচে থাকলেও, নাস্তিক কোনভাবেই বেচে থাকার অধিকার সংরক্ষণ করে না। নাস্তিকদেরকে প্রকাশ্য রাস্তা, বাসা-বাড়ি কিংবা অফিস যে কোন জায়গায় মেরে ফেলাটা জায়েজ ( বৈধ শব্দটা ব্যবহার না করে জায়েজ ব্যবহার করলাম কারণ, বর্তমান মুসলমানেরা আবার বৈধ শব্দের মানে নাও বুঝতে পারে) একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে অভিজিৎ রায়, রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয়, নীলয় নীল পর্যন্ত সকলের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য তার পরিচয়কে হাইলাইট করা হয়েছে। প্রকাশক দীপেনের মৃত্যুকে বৈধতা দেয়ার জন্যও একদল সে নাস্তিক ছিলো কিনা আস্তিক ছিলো সেই বিতর্ককে চাঙ্গা করে দিচ্ছে। বাংলাদেশে ব্যপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, একজন নাস্তিককে মেরে ফেলাটা স্বাভাবিক একটা কাজ, একজন নাস্তিক ছিলো, তাকে কেউ চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলতেই পারে। নাস্তিক হত্যার কোন বিচার বাংলাদেশে হয় না। হুমায়ুন আজাদের উপর হামলার এগারো বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এর বিচার হয়নি। কোন সরকারই এই হামলার বিচার করে নিজেদেরকে নাস্তিক ট্যাগ লাগাতে ইচ্ছুক না। এতে ভোট নষ্ট হয়ে যেতে পারে, আরবের বর্বর ধর্মান্ধ মুসলমানেরা খেপে যেতে পারে। খেপে গিয়ে দেশের সমস্ত রাস্তাঘাট দখল করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ফেলতে পারে। এই ভয়ের কাছে সরকার মাথানত, রাষ্ট্র আজ পরাজিত।

শিল্প সাহিত্যের সাথে কম বেশি যুক্ত সকলেই এই আতংকের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন। চিত্র-শিল্পি, ভাস্কর, নাট্যকর্মী, সাহিত্যিক, প্রকাশক, সকলেই চাপাতির কোপে মস্তক ছিন্ন হবার ভয়ে আতংকগ্রস্থ হয়ে আছেন। কম বেশি সকলেই জীবন বাচানোর স্বার্থে নিজেকে মুসলমান, কমপক্ষে আস্তিক অর্থাৎ সৃষ্টি কর্তায় বিশ্বাস করেন কথাটা প্রমান করতে চেষ্টা করছেন। কেউ বলছেন, অমুক নাস্তিক ছিলো, সে ধর্ম নিয়ে লিখতো, ধর্ম নিয়ে লিখার ফলে উগ্রবাদীরা তাকে মেরে ফেলেছে। কেউ বলছেন, যাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সে নাস্তিক ছিলো বলে আমার জানা নেই, তবে সে খুব ভাল মানুষ ছিলো, এমন একটা মানুষকে মেরে ফেলা ঠিক হয়নি। আবার কেউ কেউ এই হত্যাগুলোর ব্যপারে লিখতে গিয়ে বলছেন, অমুক নামায রোযা করতো, তাকে মেরে ফেলা ঠিক হয়নি। তারা চাপাতির আতংকে এতটাই আতংকিত যে, প্ররোক্ষভাবে বলতে চাচ্ছেন কেউ নামায রোযা না করলে তাকে মেরে ফেলা যায়।

যে সকল বুদ্ধিজীবীগণ নাস্তিক হত্যায় প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছেন তাদের না হয় সুবিধাবাদ বলে হিসেবের বাইরে রাখা গেলো। কিন্তু যারা আপোষহীন বলে স্বীকৃত, যাদেরকে আমরা নাম দিয়েছি সাদা মনের মানুষ, যারা আমাদের আস্থার স্থল, তারাই যদি এই হত্যাকাণ্ডগুলোর ব্যপারে বলতে গিয়ে নিজেকেও সুক্ষভাবে আস্তিক প্রমাণের জন্য সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনার বানী জুড়ে দেন। তখন সত্যি সত্যি ভয় এসে ভর করে। তখন সত্যিকারের বাংলাদেশের চিত্র সামনে ভেসে উঠে, তখন বাতিহীন অমাবস্যার রাতের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন আলোহীন বাংলাদেশটি প্রত্যক্ষ হয়ে উঠে।
অবশ্য দেশ যে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে, তা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর বন্যাদির কথা উঠলে যখন সাধারণ মুসলমানেরা বলতো, মেয়েটা মুসলমান হয়েও একটা হিন্দুকে বিয়ে করেছে কেন? তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, দেশে মধ্যযুগের আরবের অন্ধকার এসে প্রবেশ করেছে। কিন্তু তখনও আশার কিছু আলো দেখতাম। মনকে স্বান্ত্বনা দিতাম, দেশে আলো ছড়ানোর মত কিছু বাতি এখনও অবশিষ্ট আছে। কিন্তু একে একে সকল আশার আলো নিভতে নিভতে দীপেন হত্যার পর যখন দেখলাম অবশিষ্ট আলোগুলোও নিজেদেরকে আলোহীন অন্ধকারের ভূতেদের থেকে বাচার জন্য তথাকথিত স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করে, তখন প্রচণ্ড একটা চপেটাঘাত এসে গালে লাগে। কানে কথাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠে, বাংলাদেশ নাস্তিকদের জন্য নয়, এখানে নাস্তিকেরা নিষিদ্ধ, এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধ্যযুগীয় আরবের লা ইলাহা ইল্লাহর ঘোরসওয়ারীদের অভয়ারণ্য, এখানে কেউ আর নাস্তিকদের জন্য কিছু বলার সাহস রাখে না।

আলোক বর্তিকা গুলোর স্রষ্টার প্রতি প্রার্থনা দেখে একজন নাস্তিক হিসেব মৃত্যু পথযাত্রী জুলিয়াস মত একটা কথাই এখন অবশিষ্ট আছে, “ব্রুটাস তুমিও!” ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সাদা মনের মানুষ, তুমিও!!

  1. আমি আপনার সাথে গলা মিলিয়ে
    আমি আপনার সাথে গলা মিলিয়ে বললাম- “ব্রুটাস তুমিও!”

    মুক্তচিন্তার পক্ষে কথা বলা কণ্ঠগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্যই এই তাণ্ডব। সেই তাণ্ডবে ভরসার জায়গাগুলো যখন মিউমিউ করে, তখন বুঝে নিই- রাজনীতির কাছে নিজের আত্মা বন্ধক রাখার খেসারত দিচ্ছে ভরসাগুলো।

    আবারও বলি- “ব্রুটাস তুমিও!”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 + = 45