প্রধানমন্ত্রী শিয়াল তাড়ালেন, কিন্তু মুরগি সাপ্লায়ারদের কী হবে!

গত ৯ এপ্রিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে অফিস করে কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছেন এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই দিক নির্দেশনায় দেশের স্বার্থ রক্ষার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তিনি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কট্টর লীগার, সকলেই এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ!

প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশে কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে না। এই দেশের মাটি পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে বিবেচনায় রেখে কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। এর জন্য ভবিষ্যৎ টেকনোলোজির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিদেশে কোন কয়লা খনি ইজারা নিয়ে সেখান থেকে কয়লা আমদানি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা হবে।

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের সম্পদ ভক্ষণে উন্মুক্ত হয়ে থাকা বিদেশি শিয়াল এশিয়া এনার্জিকে নেতিবাচক বার্তা পাঠালেন। এতে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছেন দেশের বাম আন্দোলনের নেতাকর্মীরা! সঙ্গত কারণেই প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে বামপন্থিদের বিজয় হিসেবে ধরে নিতে হবে। কারণ বামরা গত ৮ বছর ধরে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের জোর বিরোধীতা করে আসছে। বিশেষ করে দিনাজপুরের ফুলবাড়ি কয়লা প্রকল্প ঘিরে এই আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি পায়। শেষ পর্যন্ত গুলি করে আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা চালায় তৎকালীন বিএনপি জামাত জোট সরকার। ২৬ আগস্ট ২০০৬ সালে তৎকালিন বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) গুলিতে তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হয়।

এরপর তেল গ্যাস কমিটির সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয় খালেদা সরকার। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিলো দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে না। সেই সময় বিরোধী দলের নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে এক জনসভায় তেল গ্যাস কমিটির আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে বলেছিলেন, জাতীয় কমিটির সঙ্গে বিএনপি সরকারের চুক্তি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা উচিত।

শেখ হাসিনা এতো বছর পর হলেও কথা রেখেছেন। তিনি উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর বামদের বশে আনার কৌশলমাত্র! কারণ এমনিতে বামদের দেশে দৃশ্যমান কোন নড়াচড়া নেই, নেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের নেতৃত্বে তেল গ্যাস কমিটি মাঝে মধ্যে কিছু বিষয়ে কথা বলেন। যেমন রামপালে সুন্দরবনে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত কয়লা খনি, সাগরের তেল গ্যাস নিয়ে মাঝে মধ্যে আন্দোলনও হয়। ওই সামান্য নড়াচড়াকেই দেশের মানুষ বামদের আন্দোলন ও নড়াচড়া হিসেবে গণ্য করে। এই আন্দোলনের বাইরে বামদের তেমন কোনো অবস্থান নেই। ফলে বাম আন্দোলনকে আরও গতিহীন করে দিতে ইস্যু কেড়ে নেয়ার কৌশল নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যাই হোক, বামরা প্রধানমন্ত্রীর কৌশলকে কিভাবে মোকাবেলা করবেন, তা যার যার পার্টির লাইনের ব্যাপার। কিন্তু এই যে এশিয়া এনার্জিকে পাঠানো প্রধানমন্ত্রীর বার্তা, এটা নিয়ে তো তারা আনন্দিত হতেই পারেন। কিন্তু সেই সুযোগটাই বা কোথায়! কারণ প্রধানমন্ত্রী শিয়াল তাড়ালেও দেশের ভেতর ওই শিয়ালের যে এজেন্টরা আছে, যে এজেন্টরা দেশের সম্পদ ওই শিয়ালের মুখে তুলে দিতে কাজ করছে, তাদের তো প্রধানমন্ত্রী থামাচ্ছেন না। এদের থামানো না হলে তো শিয়াল দূরে গেলেও ঠিকই আমাদের সম্পদ তার কোলে চলে যাবে।

কিভাবে এসব বলছি? তার খতিয়ান একটু পরেই দিচ্ছি। প্রথমে মুরগি সাপ্লায়ারদের পরিচয় করিয়ে দেই। বিদেশিদের কাছে দেশের সম্পদ তুলে দিতে উন্মুখদের মধ্যে প্রথম সারিতে আছে ডেইলিস্টার, প্রথম আলো ও এনার্জি এন্ড পাওয়ার পত্রিকা এবং এগুলতে কাজ করা এই লাইনের বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। আরও আছে ‘অসাম্প্রদায়িক’দের অন্যতম প্রতিনিধি আলী জাকেরের মালিকানাধীন এশিয়াটিক এর সহযোগী সংস্থা ফোর্থ পোর্ট পিআর। এই পিআর প্রতিষ্ঠানটির সাথে এশিয়া এনার্জি চুক্তি করেছিলো যে, তারা মিডিয়া সামলানোর দায়িত্ব নিবে।

একদা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা বর্তমান প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি অরুণ কর্মকার। এশিয়া এনার্জি নামের এক শেয়ালের কাছে ফুলবাড়ি খনির নামে মুরগি তো প্রায়ই বেচে আসছিলেন, আয় রোজগারও একেবারে খারাপ না। বিদেশ সফর থেকে মিলত বাড়তি কিছু। সর্বশেষ গত মাসে অরুণ কর্মকারের এশিয়া এনার্জির অর্থে অস্ট্রেলিয়া সফরের কথা ছিলো। সফরকারীদের তালিকায় তার নামও ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত অরুণ কর্মকারের অস্ট্রেলিয়া যাওয়া হয়নি।

এরপর আছেন তৌফিক-ই-এলাহী। যিনি প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা। রোড শো করেছেন বিদেশে গিয়ে। একের পর বিদেশি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানির লাভ করিয়ে দিয়েছেন প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্টের বিধিভঙ্গের মাধ্যমে। শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের মন্ত্রী উপদেষ্টারা ২ থেকে ৩ কোটি টাকা নিয়ে থাকেন। শিল্পে গ্যাস সংযোগ কমিটির সভাপতিও এই তৌফিক এলাহী। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ৮৪টি শিল্পে গ্যাস সংযোগ দিয়ে যা কামানোর তা কামিয়ে নিয়েছেন। মখা আলমগীরঅ এই দলের একজন। ২০১৩ সালে তিনি এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়িতে ঢুকতে সহায়তা করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পুলিশকে লিখিত নির্দেশ দেন, যা ছিল অবৈধ। কারণ এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকারের এমন কোনো চুক্তি নেই, যার জন্য তারা এই সুবিধা পেতে পারে।

এখন এইসব মুরগি সাপ্লায়ারদের কী হবে, এটা একটা প্রশ্ন। এরা তো বসে থাকবে না। কারণ প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণা আগেও দিয়েছেন। তার ঘোষণার বিরুদ্ধে গিয়ে মুরগি সাপ্লায়াররা তাদের কাজ চালিয়ে গেছেন। ১৫ জানুয়ারি, ২০১২ আইইবি প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ‘কয়লা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মজুদ থাকুক। ভবিষ্যতে হয়ত এমন প্রযুক্তি আসবে, যখন কয়লা উত্তোলন না করেই সেখান থেকে শক্তি ব্যবহার করা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়লা আমদানি করা যায়। বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা তখন আন্দোলনরত জনগণ, সংগঠন, বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের আশ্বস্ত করে। জনস্বার্থ হানিকর উন্মুক্ত খনন পদ্ধতির দিকে না যাওয়ার প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণায় তারা সাধুবাদ জানান।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার পরেও এর মধ্যে এই প্রতিশ্রুতির বিপরীত কিছু ঘটনা ঘটেছে। সরকারের অনেকে উন্মুক্ত খননের সপক্ষে বক্তব্য রেখেছেন। ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি করতে চাওয়া জনতা কর্তৃক বহিষ্কৃত বিদেশি কোম্পানি এশিয়া এনার্জির পক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে পুলিশ নামিয়েছে। এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকার সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। তারা এখনও নিজেদের ফুলবাড়ীর কয়লা খনির মালিক ঘোষণা দিয়ে এই খনি নিয়ে লন্ডনের শেয়ারবাজারে ব্যবসা করছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নড়াচড়া দেখা যায়নি। যার ফলে সংশয় জেগেছে, প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা শুধু ‘কৌশলগত ভালো ভালো কথা’, কাজের কথা নয়।

যদিও প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেও আগের অবস্থান পরিবর্তন করেননি। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এ মেয়াদের প্রথম দিনে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে অফিস করতে গিয়ে তখনও তিনি একই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। সেদিন ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আগে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে, কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেব কয়লা উত্তোলন করব কি না? তিনি বলেন, কয়লা উত্তোলন ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দিতে চাই। কয়লা উত্তোলনের জন্য নতুন প্রযুক্তির অপেক্ষায় থাকব।’

এই হচ্ছে সরকারপ্রধানের কয়লা উত্তোলন বিষয়ক ঘোষণা। খুবই পরিষ্কার কথা। কিন্তু এর মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই পাশা উল্টে যাওয়ার দশা হলো। খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষিজমির শঙ্কা দূর হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। এখনও কোনো প্রজন্মও পার হয়ে যায়নি। আধুনিক কোনো প্রযুক্তিও আসেনি। কিন্তু এর মধ্যেই উন্মুক্ত খনির লক্ষ্যে তোড়জোড় শুরু করে সরকার।

গত ১০ জুলাই, ২০১৪ বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তরাংশ থেকে অক্টোবর থেকেই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হবে। মন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী ফেব্রুয়ারিতে যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তা তিনি মানছেন না। এখন প্রধানমন্ত্রী আবারো সেই একই ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করলেন। কিন্তু তিনি কোথাও বললেন না যে, বার বার তার নির্দেশনার পরেও সরকারের ভেতরে ও বাইরে থেকে কারা শিয়ালের পক্ষে ওকালতি করে? তাদের না তাড়ালে তো অবস্থার পরিবর্তন কঠিন।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আকুল আবেদন, দেশের কয়লা লুট করতে আসা এশিয়া এনার্জি নামক শিয়ালটিকে তাড়িয়ে আপনি খুবই ভালো কাজ করেছেন। এখন বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে লন্ডনে তাদের ব্যবসা বন্ধ করুন। আর দেশের ভেতর থেকে যারা ওই শিয়ালের পক্ষে কাজ করছে, তাদেরও বিচারের ব্যবস্থা করুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “প্রধানমন্ত্রী শিয়াল তাড়ালেন, কিন্তু মুরগি সাপ্লায়ারদের কী হবে!

  1. অরুণ কর্মকার নামের প্রথমআলোর
    অরুণ কর্মকার নামের প্রথমআলোর এই দালাল জ্বালানীখাত নিয়ে দালালী সরকারের পৃষ্টপোষকতায় করে। এদেরকে সুযোগ না দিলেই হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 1