পার্টির বাইরের নিরীশ্বরবাদীদের বিষয়ে লেনিন কি মনে করতেন?

আমাদের কমিউনিস্ট এবং বামপন্থি বন্ধুদের মাঝে নাস্তিকতা নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি আছে এটা এখন প্রায় স্পষ্ট। বিশেষত নন-পারটিজান বা অ-কমিউনিস্ট নাস্তিকদের নিয়ে আমাদের এই সকল বন্ধুদের কেউ কেউ এক ধরনের উন্নাসিক আচরণ দেখান প্রায়শই। আসুন লেনিনের কিছু লেখা থেকে দেখি, পার্টির বাইরে বস্তুবাদী দের সাথে কাজের সম্পর্কের বিষয়ে লেনিন কি মনে করতেন।

“সংগ্রামী বস্তুবাদের তাতপরয্য” প্রবন্ধে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছিলেন, পার্টির বাইরে যে সকল বস্তুবাদী আছেন তাদের সাথে যৌথ ভাবে কাজ করবার কথা। দেখুন লেনিন একজ্যাক্টলি ঠিক কি বলেছিলেন –

“ অন্তত রাশিয়ায় অকমিউনিস্টদের শিবিরে এখনো বস্তুবাদীরা আছেন ও নিঃসন্দেহে আরও দীর্ঘদিন থাকবেন। দার্শনিক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে, তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের দার্শনিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সুসঙ্গত ও সংগ্রামী বস্তুবাদের সমস্ত অনুগামীদের সম্মিলিত কাজের মধ্যে টেনে আনা আমাদের অবশ্য কর্তব্য।”

উপরের কোটেশনের অংশটুকু লেনিনের লেখা থেকে নেয়া। বলুন তো এখানে পার্টির বাইরের এবং অ-কমিউনিস্ট বস্তুবাদীদের প্রতি কমিউনিস্ট পার্টির দৃষ্টিভঙ্গিটা কি শত্রুতামূলক? নাকি সহযোগিতামূলক? শুধুমাত্র সমাজতন্ত্রের সমর্থক নয় বলে, লেনিন কি এদেরকে খারিজ করে দিয়েছিলেন?

রুশ বিপ্লবের পরে লেখা বেশ কিছু প্রবন্ধে লেনিন সারা রাশিয়াতে নিরীশ্বরবাদ প্রচারের উপরে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি খুব সরাসরি উল্লেখ করেছেন, প্রয়োজনে পশ্চিমের বিভিন্ন লেখক যারা কমিউনিস্ট নন কিন্তু ধর্মের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানসম্মত সমালোচনা, প্রচারণা মূলক লেখা লিখেছেন, তাদের পুস্তক রাশান ভাষায় অনুবাদের কথা। শুধু অনুবাদ ও নাস্তিকতা প্রচারের গুরুত্বের কথাই বলেন নি লেনিন, বরং তিনি নিজেদের আত্ম সমালোচনাও করেছিলেন এই ভাবেঃ

” এঙ্গেলস অনেক আগেই জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রচারের জন্য আঠারো শতকের শেষের সংগ্রামী নিরীশ্বরবাদী সাহিত্য অনুবাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন আধুনিক প্রলেতারিয়েতের নেতাদের। আমাদের পক্ষে লজ্জার কথা, এতদিন পর্যন্তও আমরা সেটা করিনি”।

যে সকল লেখকের পুস্তক এখনো অনুবাদ করা হয়নি বলে নিজেদের আত্মসমালোচনা করছেন লেনিন, তাঁরা কি কমিউনিস্ট লেখক ছিলেন? না তা ছিলেন না, কিন্তু সেই সকল লেখা ছিলো সেই সময়ের জন্য নিরীশ্বরবাদীতা বিষয়ে ধ্রুপদী লেখালেখি। ধর্মের কবল থেকে রুশ জনগণ কে বের করে আনার সংগ্রামে সেই সকল লেখার প্রয়োজনীয়তা কে অস্বীকার করেন নি স্বয়ং লেনিন।

আরেকটি দীর্ঘ কোটেশন দিয়ে শেষ করতে চাই। লেনিন লিখেছেন এভাবেঃ

” লক্ষ লক্ষ যে জনগণ কে (বিশেষ করে কৃষক ও কারুজীবী) আধুনিক সমাজ যে তমসা, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে নিপতিত করেছে তাঁরা কেবল বিশুদ্ধ মার্ক্সবাদী জ্ঞানের সোজাসুজি পথে এ তমসা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, একথা ভাবা হবে মার্ক্সবাদীর পক্ষে সম্ভবত সবচাইতে বড় ভুল এবং জঘন্য ভুল। এই জনগণ কে দেয়া উচিত নিরীশ্বরবাদী সকল মাল – মসলা, পরিচয় করিয়ে দেয়া উচিত জীবনের নানা ক্ষেত্রের তথ্যের সঙ্গে, নানা ভাবে এগুতে হবে তাদের দিকে যাতে তাদের আকৃষ্ট করা যায়, জাগিয়ে তোলা যায় ধর্মের ঘুম থেকে, নানা দিক দিয়ে বিচিত্রতম উপায়াদি মারফত ঝাঁকুনি দিতে হবে তাদের”।

যারা বলেন লেনিন নিরীশ্বরবাদীতা প্রচারের কথা বলেননি, তাঁরা কি একটু অনুগ্রহ করে এই প্রবন্ধটি পড়ে দেখবেন? যারা বলেন কেবল মার্ক্সবাদী জ্ঞানের মধ্য দিয়েই ধর্মের অন্ধহকার দুর করা সম্ভব তাঁরা কি লেনিনের উপরের কথাটুকু পড়ে দেখবেন?

রেফারেন্সঃ
লেনিনের ধর্ম প্রসঙ্গে পুস্তক টি এখানে পাওয়া যাবে https://lalshongbad.files.wordpress.com/2015/03/lenin-religion.pdf

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “পার্টির বাইরের নিরীশ্বরবাদীদের বিষয়ে লেনিন কি মনে করতেন?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

60 − = 54