খেলনা গাড়ি

কোন প্ল্যান ছিলনা, সারাদিন ঘুমিয়েই কাটালাম, মনে হল সন্ধ্যায় খবরেই দেখে নিব পহেলা বৈশাখ টা কেমন হল। তারপরও কি মনে করে যেন নিচে একটু হাঁটতে বের হলাম, দেখি বাইকে তেল নেই, ভাবলাম তাহলে তেলও আনি টিএসসি থেকেও একটু ঘুরে আসা যাক। পকেটে ১০০ টাকার একটাই নোট ছিল আর কিছু খুচরো পয়সা, সেটা নিয়েই বের হলাম ।

ফুয়েলের কাটা লাল এর ঘরে থাকলেও কিভাবে যেন টিএসসি পৌছে গেলাম, সেখানে সন্ধানীর স্টল এ অনেক জুনিওর কেও দেখলাম, একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম, কখন যে কোন জুনিওর বলে বসে “ভাই … খামু” । তাহলেই হইসে। পকেট ছিল গড়ের মাঠ, খাওয়ানোর কোন উপায় নাই।

যাই হোক, একটু পর ঘনিষ্ঠ বড় ছোট ভাই চলে এল, তাদের সাথে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম, হটাত এক পিচ্চি এসে হাজির, একদম পিচ্চি, সে এসে কাছে দাঁড়িয়ে হাত পাতল আর পাশের একটা খেলনার দোকানের দিকে ইঙ্গিত করছিল, প্রথমে তাকে একটি ২ টাকার কয়েন দিলাম, সে নিলনা, তারপর ২ টাকার একটা নোট দিলাম, সেইটা নিলো। নিয়ে সেই খেলনার দোকানের কাছে গিয়ে দোকানি কে ২ টাকার নোট টা দিয়ে ছোট্ট একটা খেলনা গাড়ির দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাচ্ছিল আর চাইছিল। দোকানি পিচ্চি টাকে ধমক দিয়ে সরিয়ে দিল। আমি দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, মামা, এই খেলনা গাড়িটার দাম কত ? মামা বলল ৬০ টাকা। আমি যেখানে আড্ডা দিচ্ছিলাম সেখানে ফিরে এসে হাসতে হাসতে বললাম, ওকে খেলনা কিনে দিলে আজকে আমাকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতে হবে। তারপর দেখলাম পিচ্চি টা একটা মেয়ের কাছে গেল এবং একই ভঙ্গিতে মেয়েটার কাছেও খেলনাটা চাইল, মেয়েটা এড়িয়ে গেল, এরপর আরও একজনের কাছে গেল, সেখানেও একই অবস্থা, সবাই তাড়িয়ে দিচ্ছে, ব্যাপারটা তখন কেন জানি খুব একটা গায়ে লাগেনি, কিন্তু বাসায় আসার পর থেকে পিচ্চিটাকে খুব মনে পড়ছে, যতবার একা থাকছি ততবারই মনে পড়ছে, যখন মনে পরছে তখন অজান্তেই চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি এসে জমা হচ্ছে, বুঝতে পারছি ব্যাপারটা মনের গভীরে বেশ দাগ কেটেছে এবং সন্দেহ নেই ব্যাপার টা আমাকে অনেকদিন মানসিক যন্ত্রনায় রাখবে বোঝাই যাচ্ছে।

আমি কিন্তু ইচ্ছে করলেই কারও কাছে ৫০ টাকা ধার নিয়ে খেলনা টা কিনে দিতে পারতাম, কিন্তু করিনি কেন ? সম্ভবত যান্ত্রিক জীবনে আমরা দয়া মায়াহীন হয়ে যাচ্ছি, এখন কারও খারাপ খবর শুনলে আমরা বলি “ও আচ্ছা” তারপর পাশ কাটিয়ে চলে যাই, আমরা মনে হয় আর মানুষ নামের কোন প্রাণী নই।

আমার একটা স্বপ্ন আছে আর সেটা হল একটা স্কুল দেয়া সেখানে প্রতি ব্যাচে কিছু গরিব মেধাবী ছাত্র কে বিনা বেতনে পড়াশুনার ব্যাবস্থা করা। বর্তমানে যতটুকু পারছি করছি, আমার এলাকার দরিদ্র কিছু ছাত্র এবং ছাত্রিকে প্রতি মাসে সামান্য শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সাহায্য করছি। জানিনা কোন দিন অনেক টাকার মালিক হতে পারব কি না, তবে যদি কোনদিন হতে পারি তাহলে অবশ্যই শিক্ষার জন্য অনেক কিছুই করতে চাই। উত্তরবঙ্গ এমনিতেই দরিদ্র প্রবন এলাকা হিসেবে পরিচিত, এখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা গুলোর ভীষণ অভাব, সেখানে শিক্ষার জন্য সময় বা অর্থ খরচ করাটা অনেকের কাছেই অসম্ভব, যে সময় তারা স্কুলে পরবে সেই সময় তারা এক বেলা মজুরি দেবে, তাতে এক বেলার খাবার জুটবে।

আমরা যতই ফেসবুকে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দেই না কেন, আমাদের ভুলে গেলে হবেনা যে আমাদের দেশের ৭০% মানুষ এখনো প্রযুক্তির বাইরেই বাস করে। তাদের কাছে ফেসবুক পৌছায় না, ব্লগ তো আরও বহু দূরের জিনিস, জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস এ তাদের খুধার জ্বালা মেটেনা, তাদের কাছে শাহবাগের আলোর রেশ পৌছায় না, গনজাগরনের আলো তেদের থেকে কয়েক আলোক বর্ষ দূরে থাকে, যতদিন তাদেরকে শিক্ষা এবং প্রযুক্তির আওতায় না আনা যাবে ততদিন সোনার বাংলা শুধুই একটি স্বপ্ন। পুরো দেশে তো আর পারবনা, নিজের গন্ডির ভেতরের মানুষ গুলিকে অন্তত সাহায্য করতেই পারি। সেই স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলছি।

বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

96 − = 89