অবরুদ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : অবক্ষয়ের এক উৎসমূল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এ কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। যে কারণে প্রতিদিন এই ক্যাম্পাসের চত্বরগুলোতে অসংখ্য শিক্ষার্থীর কলতানের পাশাপাশি ধ্বনিত হয় সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষজনের কণ্ঠ। জায়গাটা ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে এবং তুলনামূলক পরিপাটি। যানজট নেই, বড় বাস নেই, খোলামেলা, সবুজে ঢাকা। তাছাড়া গণগ্রন্থাগার, জাদুঘর, শিশু একাডেমি, স্বাধীনতা জাদুঘর, বাংলা একাডেমির মতো জাতীয় অনেক প্রতিষ্ঠানও এই এলাকায় অবস্থিত।

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানও এর আশেপাশেই। স্বাভাবিকভাবে তাই ঢাবি এলাকা প্রতিদিনই এ নগরীর অসংখ্য মানুষের গন্তব্য। যাদের অনেকেই বিভিন্ন কাজে এসব এলাকায় গিয়ে ঢাবিতে কিছুক্ষণ অবসর কাটান। পরিচিতজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যদেরও এই এলাকায় ডেকে এনে মিলিত হন, আড্ডা দেন। আর এদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ-তরুণী।

ঢাবি এলাকায় সময় কাটানো ও আড্ডার জনপ্রিয় স্থানগুলো হচ্ছে কার্জন হল, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন, চারুকলা ও ছবির হাট তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। আর পাশাপাশি আড্ডার জায়গাগুলোর মধ্যে আছে জাতীয় গণগ্রন্থাগার, জাদুঘর, শাহবাগ মোড়, আজিজ মার্কেট। এসব এলাকায় প্রতিদিন ঢাবির চলমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকার অন্যান্য বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা জমায়েত হন। দিনের আলো ডুবতে না ডুবতেই এসে যুক্ত হন পেশাজীবীরা। চা পান আর হাল্কা নাস্তার পাশাপাশি চলতে থাকে আড্ডা, তর্ক, বিতর্ক, আলোচনা। পড়ালেখা, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, আন্তর্জাতিক- কোনো কিছুই বাদ যায় না। যারা এ এলাকায় অনেক দিন ধরে আসেন না, তারা পুরনো এই ছবিটাই হয়তো মাথায় রেখেছেন। বাস্তবে এই পরিস্থিতি ভীষণভাবে বদলে গেছে। কার্যত পুরো এলাকাই এখন এক রকম অবরুদ্ধ! যা কিনা বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মধুর ক্যান্টিন ছাত্রলীগের
মধুর ক্যান্টিনই ছিল এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আড্ডাকেন্দ্র। আজকের বাংলাদেশের গোড়াপত্তন, বিকাশ ও অবনমনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই সময় কাটিয়ে গেছেন এখানে। ছাত্র সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের মিলনস্থল ছিল এই ক্যান্টিন। এখান থেকেই সূচিত হয়েছে অসংখ্য আন্দোলন ও সৃষ্টিযাত্রা। ২০০৮ সালের সেনাবিরোধী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল মধুর ক্যান্টিনই। নির্যাতনবিরোধী ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা মধুর ক্যান্টিন থেকেই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়া দেশবাসীকে জানাতে যে সংবাদ সম্মেলন হয়, তাও করা হয় মধুর ক্যান্টিনেই।

তখনও মধুর ক্যান্টিনে গেলে দেখা যেত বিভিন্ন সংগঠনের নির্দিষ্ট টেবিল আছে। তবে চাইলে সেখানে অন্যরাও বসতে পারেন। তুমুল আলোচনা-বিতর্ক, যাকে চায়ের কাপে ঝড় তোলা বলে আবার বিরোধীরা সমালোচনা করেন। মধুর সামনের গোলঘরে দেখা যেত বিভিন্ন সংগঠনের মিটিং হচ্ছে। ছোট নাটকের দলের অনুশীলনও হতো। পোস্টার লেখা, পোস্টার সাঁটানো, মশাল মিছিল ও দেয়াল লিখনের প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো গোলঘরেই করতে দেখা যেত। অনেক পাঠচক্র গ্রুপেরও বসার জায়গা ছিল এটি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।

এখন মধুর ক্যান্টিনে যারা যান, তারা আত্মসম্মান নিয়ে ফিরে আসা যাবে কিনা সে বিষয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান অনেক কর্মী। বামপন্থি সংগঠন ছাত্র গণমঞ্চের সাবেক কর্মী শান্তনু সুমন বলেন, ‘মধুর ক্যান্টিনের অবস্থা এখন ভয়াবহ। আগের সেই সৌহার্দমূলক পরিবেশ এখন আর নেই। সম্প্রতি ছাত্রলীগ মধুতে তাদের সাংগঠনিক নোটিশ বোর্ড টানিয়েছে। সভাপতির ব্যক্তিগত কার্যালয়ের মতো এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। যখন তিনি আসেন, তখন অন্যদের আর সেখানে বসার মতো অবস্থা থাকে না। তারা একত্রে অনেকে হুড়মুড় করে ঢুকেই চেয়ার-টেবিল সরিয়ে নিজেদের বসার জায়গা করতে থাকে। মধুর চেয়ার-টেবিলগুলো স্টিলের। ফলে ভয়ঙ্কর শব্দ হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভয়ে উঠে যায়। অন্য সংগঠনের নেতা-কর্মীরা উঠে যায় আত্মসম্মান রক্ষার্থে।’

সুমন বলেন, ‘আগে কেউ একটা টেবিল থেকে চেয়ার নেয়ার আগে জিজ্ঞেস করত। এখন চেয়ারে ব্যাগ বা অন্য কিছু থাকলে তা টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে নিয়ে যায়। জিজ্ঞেসও করে না। ছাত্রলীগের একটি টেবিল আছে। তারা এখনও সেখানেই বসে। তবে বাদবাকি টেবিলগুলো ওই টেবিলের সঙ্গে যোগ করে ক্যান্টিনকে আগে নিজস্ব অফিস বানিয়ে নেয়। আর সেক্রেটারি বসেন গোলঘরে। ওটা এখন প্রায় তার নিজস্ব সম্পদ। আগে ওখানে আমরা পাঠচক্র ও গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ মিটিংগুলো করতাম। এখন সেখানে অন্যদের ঢুকতে মানা। মোটকথা, পুরো মধুর ক্যান্টিনই এখন ছাত্রলীগের দখলে।’

মধুর ক্যান্টিনকে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়কে এভাবে পেশিশক্তি প্রদর্শনের স্থান বানানো হলে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনীতি সম্পর্কে ঘৃণা বাড়ে। সংগঠনের তরুণ কর্মীরা পারস্পরিক সৌহার্দের শিক্ষা পায় না। গায়ের জোরের সংস্কৃতি বিকশিত হয়। ক্ষমতা প্রদর্শনের মানসিকতা গড়ে ওঠে। নিশ্চিতভাবেই এগুলোকে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ছাত্র নেতারা জানান, অনেকদিন ধরেই ক্যাম্পাসে প্রধান বিরোধী দলের কর্মীদের থাকতে দেয়া হয় না। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রলীগকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রদলকে। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীনদের দখলদারিত্ব চলে আসছে। শিক্ষকরা এর কোনো সমাধান করতে পারেননি। বরং অনেকেই এই তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাচর্চার যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে তা এখন ডালপালা মেলছে। আগে কেবল প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন অপরাপর সংগঠনগুলোও এর শিকার হচ্ছে। যা বিশাল এই ক্যাম্পাসের প্রায় ২৫ হাজার ছাত্রকেও প্রভাবিত করছে। তারা দেখছে, শিক্ষাঙ্গনে অন্যায়কারী ও অপরাধীরাই সম্মানিত। এমনকি অনেক শিক্ষকও তাদের কথায় ওঠে বসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘মধুর ক্যান্টিন শুধু নয়, সারা দেশটাই আজ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কব্জায়। তারা সর্বত্র তাদের দখল কায়েম করেছে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে তারা বিদ্যমান সব সম্পর্ককে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করেছে। রাজনৈতিক সহাবস্থানকে তারা অসম্ভব করে তুলেছে। এর মাধ্যমে দখলদারি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।’

ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সভাপতি আবেদ আল হাসানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত ব্যানার নামিয়ে আমরা নোটিশ বোর্ড টানিয়েছি। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। অন্যরা নোটিশ বোর্ড টানাক। আমরা তো বাধা দিচ্ছি না। এই সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে যেভাবে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো অবস্থান করছে, বিএনপির আমলে তা পারত না। এসব বিষয় আমলে নিলে বুঝবেন যে, ঢাবি এলাকা আগের চেয়ে ভালো আছে। আমরা ছাত্রদের উন্নয়নের জন্য কাজ করছি। প্রত্যেক ছাত্র যাতে একটা করে ল্যাপটপ পায় সেজন্য ডেল কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এই কাজগুলো আমরা করছি। কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আমরা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছি। ’

হারিয়ে গেছে টিএসসির জৌলুস
আগের চিত্র যারা দেখেছেন, তারা এক বাক্যেই বলবেন, টিএসসির সেই চেহারা আর নেই। এটি গড়ে উঠেছিল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে মেলবন্ধন গড়ে তুলতে। এর নকশাই করা হয়েছে এমনভাবে যে, এখানে এলে একজন কিছুটা মুক্ত বোধ করবেন। ঢাকার অন্য যেকোনো এলাকা থেকে টিএসসির ভেতরের পরিবেশটা পৃথক। তাছাড়া প্রধান সড়কের ওপরে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমির মাঝে হওয়ায় এটা হয়ে উঠেছিল শিক্ষার্থীদের প্রিয় আড্ডাস্থল। স্বাভাবিকভাবেই এখানে এসে জুটেছিল ‘ঘরের খেয়ে বনের ধারে মোষ তাড়ানো’ মানুষগুলো। একের পর এক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এখানে এসে তাদের ভিত গেড়েছে। টিএসসি আর সাংস্কৃতিক অঙ্গন যেন একই শব্দে পরিণত হয়েছিল। কবিতা আবৃত্তি, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, গানের দল, নাটকের দল, মানবিক সংগঠন, সাহিত্য সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন, বিতর্ক, পর্যটন, সাইকেল চালনা, পর্বত আরোহীসহ আরও অনেক বর্গের অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মূল কেন্দ্র ছিল এটাই। কিন্তু এখন আর টিএসসির সেই জৌলুস নেই।

অনেক দিন ধরেই কায়দা করে নানা ঘটনার বেড়াজালে ফেলে একে একে বের করা দেয়া হয়েছে অধিকাংশ সংগঠনকে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিংবা রাজনৈতিক উত্তেজনার দোহাই দিয়ে সীমিত করা হয়েছে সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে ছিল এখন এমন অনেক প্রতিষ্ঠানেরই অস্তিত্ব নেই। প্রশাসনের মর্জিমাফিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। শিক্ষার্থীদের বা সংগঠনগুলোর এক্ষেত্রে ভূমিকা খুবই কম।

আগে যেখানে টিএসসিভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো পরমাণু শক্তি কমিশনের সীমানা পর্যন্ত রিহার্সালের জন্য ব্যবহার করতে পারত এখন সেই সীমা অনেক সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। সুইমিং পুলের পাশ পর্যন্ত আগে আমরা রিহার্সাল করেছি। এখন সেদিকে অনেক সংগঠনই ঢুকতে পারে না। টিএসসির আশেপাশেও কর্মসূচি বা অনুষ্ঠান করা মুশকিল হয়ে গেছে। রাজু ভাস্কর্যে বড় রাজনৈতিক দলের না হলে বা ক্যাম্পাসে প্রভাব কম এমন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে বিশেষ দিবস ছাড়া সচরাচর অনুষ্ঠান করতে দেয়া হয় না।

গত সেপ্টেম্বরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হুমায়ুন কবিরের উপস্থিতিতে গভীর রাতে টিএসসির সুইমিংপুল এলাকায় রিমিক্স গান বাজিয়ে অশ্লীল গানের শুটিং হয়। খবর পেয়ে প্রক্টর নিজে সেখানে হাজির হন এবং ঘটনাস্থলে স্বল্পবসনা নারীদের নৃত্যরত দেখে তাদের বের করে দেন। পরে জানা যায়, ছাত্রলীগ সূত্রেই অনুমতি নেয়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গানের শুটিংয়ের কথা বলে। টিএসসিভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, তাদের ঠিকমতো কাজ করতে দেয়া না হলেও সরকারি সংগঠনের সুপারিশে এখানে নিয়মবহির্ভূত যে কোনো কিছু করা যায়।

সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ প্রতিষ্ঠিত গণমুক্তির গানের দলের সংগঠক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ফারহানা শামা বলেন, ‘টিএসসিতে নিয়ন্ত্রণ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। বিভিন্ন সংগঠন তাদের জিনিসপত্র রাখে, সেক্ষেত্রে বাধা আসে। মাঝে মাঝেই সংগঠনগুলোকে নোটিশ করা হয় রুম ছেড়ে দেয়ার জন্য, মালামাল নিয়ে যাওয়ার জন্য। অডিটরিয়াম বা অন্য মঞ্চগুলো পছন্দের দল না হলে বরাদ্দ দেয়া হয় না। প্র্যাকটিসের জায়গাও সীমিত করে ফেলেছে। অনুষ্ঠান বা কর্মসূচিও করা যায় না। তারপর আছে উৎপীড়ন, যদি আপনি সরকারি সংগঠনের বিরুদ্ধে আলোচনা করেন বা অনুষ্ঠান করেন।’

প্রশ্ন করা হলে টিএসসির পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের সম্পদ সীমিত। তাই সব সময় সবাই চাইলেও সব কিছু পান না। তবে এর মধ্যেই সমন্বয় করে আমরা কাজ চালাচ্ছি। তাছাড়া আপনারা জানেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইনস্টিটিউট বা বিভাগ মানেই অনেকের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে। আর টিএসসির জন্য তা সবচেয়ে বেশি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়বহির্ভূত সংগঠনও আসে আমাদের কাছে। ফলে অভিযোগ থেকেই যায়। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হলে টিএসসির পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে, এর বরাদ্দও বাড়াতে হবে। আর যদি নীতিগত বিষয়ে কথা বলতে চান, তার এক্তিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।’

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই এখন নিয়ন্ত্রিত। স্বার্থ অনুযায়ী ক্ষমতাবানরা এর পরিধি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ফলে শিক্ষার উপকরণগুলো সব হয়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যের মাধ্যম। যা কিনা আবার শিক্ষাঙ্গনে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিস্তৃত করেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন ছিল কার্যকর ও বৃহৎ পরিসরের সাংস্কৃতিক চর্চা। অথচ টিএসসি থেকে ফুলার রোড পর্যন্ত এগুলে এখন আমরা কদাচিৎই কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেখতে পাব। নানাভাবে সরকার ও প্রশাসনের চাপে সাংস্কৃতিক চর্চা সীমিত হয়ে আসছে। এর পরিবর্তন না হলে পরিবেশ যে আরও খারাপ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’

অবরুদ্ধ চারুকলা
দীর্ঘদিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় চারুকলা ছিল সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত। এখন চারুকলাই সবচেয়ে বেশি অবরুদ্ধ। সবসময় দরজায় তদারকি ব্যবস্থা, ক্লাস না থাকলে তালা ঝুলতেও দেখা যায়। প্রবেশ তোরণে বড় করে লেখা আছে সংরক্ষিত প্রবেশাধিকারের কথা। অথচ চারুকলা ঢাকা শুধু নয়, সারাদেশের মধ্যেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। এখান থেকেই আয়োজন হয় জাতীয় অনেক উৎসব-অনুষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পানুরাগীরা এখানে আসেন। ঢাকায় ঘুরতে বের হওয়া মানুষেরও গন্তব্য থাকে চারুকলা। তাছাড়া অনেকদিন থেকেই তরুণ রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবীরা চারুকলায় আসেন, আড্ডায় মিলিত হন। এখন সেই পরিবেশ বিনষ্ট করে দেয়া হয়েছে।

চারুকলার সাবেক ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারুকলার মূল নকশায় কোনো সীমানা প্রাচীর নেই। অনেক পরে সীমানা প্রাচীর উঠেছে। এরপর সীমানা প্রাচীরের ওপরে বসেছে তীরের ফলা, তারপর দরজায় খিল পড়েছে, একপর্যায়ে উঠেছে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি, আর এখন মাঝে মাঝে দেখা যায় তালা ঝুলতে। চারুকলার মতো প্রতিষ্ঠানের এই ক্রমবিকাশ এ এলাকার অধোগতির বাস্তবতাকে বুঝতে সাহায্য করে।

কথা বলে জানা গেছে, চারুকলার ছাত্রদের সঙ্গে বহিরাগতদের কিছু সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্রমান্বয়ে আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক স্থাপত্য বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘নাম পর্যন্ত বলতে পারছি না, চিন্তা করে দেখেন অবস্থা কোন পর্যায়ে। হল তো ছাত্রলীগের দখলে। এখন আপনি যদি বিরুদ্ধে কিছু বলেন, তাহলে বলবে জামায়াত। তাই সবাই চুপ। প্রশাসন ও কর্তব্যরত শিক্ষকদের নতজানু মানসিকতাই আজকের এ অবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী।’

প্রশ্ন করা হলে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘চারুকলা মোটেই অবরুদ্ধ নয়। এখনও এখানে সব ধরনের মানুষই আসছেন। তবে ভেতরে ঢুকে যাতে কেউ কোনো অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে না পারেন, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। শিক্ষার্থীরা বা অন্য কারও কাছ থেকে এখনও কোনো আপত্তি পাইনি। পেলে অবশ্যই তা বিবেচনা করা হবে।’

বন্ধ ছবির হাট
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান ছবির হাট। অনেক টাকা দিয়ে গ্যালারি ভাড়া করে যারা নিজের ছবি প্রদর্শনী করতে পারেন না, তাদের জায়গা ছিল এটি। এখানে উন্মুক্ত প্রদর্শনীর আয়োজন হতো। নামমাত্র মূল্যে এটি ব্যবহার করা যেত। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এখানে নাটক মঞ্চস্থ করা থেকে সঙ্গীতানুষ্ঠান পর্যন্ত আয়োজন করত। প্রায়ই আয়োজন হতো উন্মুক্ত শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন। একদল শিল্পী সেখানে বসেই আঁকা ও অন্য কাজকর্ম করতেন। কিন্তু পুলিশ বিনা উস্কানিতে গত বছরের জুনে ছবির হাটের সমস্ত স্থাপনা ভাঙচুর করে। সংস্কৃতিকর্মীরা এর প্রতিবাদ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো প্রশাসনিক সংস্থা এর প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং ক্রমান্বয়ে নানা অভিযোগ তুলে ছবির হাটসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন প্রায়ই পুলিশ তার মর্জিমতো এসে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়।

ছবির হাটের ওপর এহেন আক্রমণের প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ সবসময় একই ভাষায় কথা বলেছে। তাদের অভিযোগ, সেখানে মাদক সেবন চলে। সংশ্লিষ্টরা এর বিপরীতে বরাবরই দাবি করেছেন, মাদক সেবন বন্ধ করার উদ্যোগ না নিয়ে ছবির হাট ভেঙে দেয়া, বন্ধ করে দেয়াটা অযৌক্তিক পদক্ষেপ!
কথা বলে জানা যায়, ২০০৮ সালের শেষ দিকে ভেতরের কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে ছবির হাট ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে ওঠে ঢাবি এলাকার বিকেলের আড্ডার মূল কেন্দ্র। শিল্পী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার লোকেরা এখানে ভিড় করে, আড্ডা জমায়। এসব আড্ডাকে ঘিরে ছবির হাটে গড়ে ওঠে বেশ কিছু অস্থায়ী চায়ের দোকান। মানুষের ভিড় বাড়তে থাকলে বিরাট এই উদ্যানের কোনো কোনো অংশে মাদকসেবীরাও জায়গা করে নেয়। তবে মাদক বলতে গাঁজাই চলে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এই মাদক বিক্রি চললেও এ নিয়ে তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন গড়ে ওঠার পর দেখা যায় এই উদ্যানকে ভারী গ্রিল দিয়ে মুড়ে ফেলতে। পার্কের ভেতরের ময়লা পরিষ্কার না হলেও উন্নয়নের নামে তৈরি হতে থাকে বিরাট বিরাট সব লোহার দরজা। এসব স্থাপনা নির্মাণের কিছুদিন পরই ছবির হাট তালা মেরে এখানে চলাফেরা সীমিত করে দেয়া হয়।

নাট্যকর্মী গাজী মিরান বলেন, ‘আমরা প্র্যাকটিস শেষে এখানে আসি, বসি, আড্ডা দেই। বিভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। এই সুযোগটা থাকা দরকার। নইলে ভিন্নমতের সঙ্গে সহাবস্থান করার সংস্কৃতি কোথা থেকে আসবে। কিন্তু আমরা দেখলাম সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলো আরও বেশি নিয়ন্ত্রণের। ছবির হাটকেন্দ্রিক আড্ডা ও এখান থেকে সরকারবিরোধী কিছু সংগঠনের মিছিল বের হওয়া, ছাত্রলীগের ধাওয়া দেয়া, এরপর গেটে তালা দেয়া, সব মিলিয়ে এটা খুব পরিষ্কার যে, সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। যা কিনা আমাদের ক্ষতি করছে।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান ছিল। যেগুলো সমাজের বিভিন্ন বর্গ থেকে আসা প্রত্যেককেই স্থান দিত। এই পরিবেশের ফলে একে অপরকে বুঝতে সাহায্য করত। একটা গ্রাম থেকে আসা ছেলে যে কিনা কখনো ক্যাম্পাসে ছেলে ও মেয়েকে একত্রে বসে আড্ডা দিতে দেখেনি, তার জন্য এ পরিবেশ দরকার। এ পরিবেশ বিভিন্ন মত-পথের জন্যও দরকার। যাতে তারা কোনোক্রমেই এই ধারণা দ্বারা চালিত না হন যে, আমার মতই ঠিক, অন্যরা সব বর্জনীয়। বহু মত-পথের মিলনমেলা হিসেবে ক্যাম্পাসের এই চেহারাটা ধরে রাখা দরকার ছিল। কিন্তু ক্রমে ক্রমে এই এলাকা হয়ে উঠছে ব্যারাকের মতো নিয়মকানুন আর বিধিনিষেধে ভরপুর। যা গোটা বিশ্বের আজকের চেহারা থেকে ভিন্নরূপ। উন্নত সমাজগুলোর সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানো এবং সাংস্কৃতিক চর্চার আদান-প্রদানের মতো আর কোনো এলাকা দেশে অবশিষ্ট রইল না। যা নিঃসন্দেহে বদ্ধ মানসিকতার বিস্তৃতি ঘটাবে, ঘটাচ্ছে।

ছবির হাট বন্ধের মাধ্যমে ওই এলাকা সামগ্রিকভাবে অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে সন্ধ্যার পর হাজার হাজার মানুষের ভিড় থাকত, এখন সেখানে সুনসান পরিস্থিতি ও অন্ধকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য দিকগুলোতেও এই একই অবস্থা। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনের সড়কে বিকেল পাঁচটার পর থেকে প্রক্টরিয়াল বডির প্রেরিত গাড়ি মাইক নিয়ে ঘোরে এবং সবাইকে উঠে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। কার্জন হল থেকে চানখাঁরপুলের রাস্তারও একই অবস্থা। ফলে সন্ধ্যার পর এসব এলাকা দিয়ে চলতে এখন সবাই ভয় পান। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত জীবনের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। বহিরাগতদের কথা বলে বলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের চলাফেরাও সীমিত করা হয়েছে।

ডাকসু নেই পুরনো কথা!
ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতের মূল শর্ত মনে করেন। সেখানে আজ কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। ফলে এক দলের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ছাত্রদেরও এখানে ঐক্যবদ্ধ কোনো আওয়াজ নেই। যা কিনা অবক্ষয়ের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

ডাকসুর সাবেক জিএস মোশতাক হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ছাত্ররা যখন নিজেরা নিজেদের দেখাশোনা করবে না, তখন সমস্যা হবেই। আমরা তাই দেখছি, চরম বিশৃঙ্খলা। এখন চলছে শক্তিমানের রাজত্ব। আর শক্তিমানের রাজত্ব থেকে কখনোই ভালো কিছু বের হয় না। মাৎস্যন্যায় হয়, বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খেয়ে ফেলে। অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণার বিকাশ ঘটে। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অবশ্যই প্রথম শর্ত, তবে এটাই একমাত্র নয়। নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র আসবে না, যদি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না করা যায়। এখন যদি সব সংগঠন হলে হলে সভা করতে না পারে, প্রচার চালাতে না পারে, তাহলে তো নির্বাচনটাই হয়ে যাবে অগণতান্ত্রিক, শক্তিমানের মর্জিনির্ভর। এরকম নয়, দরকার সবার মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা। তবে এক্ষেত্রে প্রধান কাজটা শিক্ষার্থীদেরই করতে হবে। এটা তাদের আদায় করে নিতে হবে। এস্টাবলিশমেন্টের ধর্মই হলো অধীনস্তদের মধ্যে অনৈক্য তৈরি করা, বিভেদ-বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়া। সুতরাং তারা এটা করে দিবে না। ছাত্রদেরই নিজেদের ভাগ্য গড়ে নিতে হবে। আর আমি বিশ্বাস করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি এগিয়ে আসতে পারে, তাহলে জাতীয় অনেক সংকট সমাধানের পথও সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে। এটা ইতিহাসে বহুবারই ঘটেছে। সর্বশেষ আমরা দেখেছি সেনাবিরোধী বিদ্রোহ।’

এ প্রসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি লাকি আক্তারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ছাত্র সংগঠন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আমরা বলে আসছি, শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। গণতান্ত্রিক পরিবেশ এখন জাতীয় পর্যায়েও নেই। ক্যাম্পাসের স্বৈরতান্ত্রিক চেহারা আসলে রাষ্ট্রীয় স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন। ক্যাম্পাসের জবাবদিহিতার জায়গা হচ্ছে ছাত্র সংসদ। কিন্তু ঢাবিতে ছাত্র সংসদ বন্ধ রাখা হয়েছে। ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই ছাত্র সংসদ খুলে দিতে হবে। গণতন্ত্রের কথা তারাও বলে, একই সঙ্গে আবার ৫৭ ধারাও জারি রাখে। ক্যাম্পাসগুলোতে আজ এ ধরনের গণতন্ত্রই চলছে। এ অবস্থার অবসান জরুরি এবং আমরা এ লক্ষ্যে কাজ করছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলীকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আমরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে খুব কমই নেই। বরং শিক্ষক ও ছাত্রদের অভিযোগের ভিত্তিতেই সাধারণত এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত ছিল, আছে। আমরা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে নই। কিন্তু নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। সমগ্র সমাজই আজ এ নিয়ে সমস্যায়। ফলে আমরাও কিছু সমস্যার মধ্যে আছি। নিরাপত্তা সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করব, তা এখনও আমরা বের করতে পারিনি। আবার পুলিশ দিয়েও ক্যাম্পাস ঘিরে রাখা যায় না। এজন্য কিছু রাস্তায় ও স্থানে সন্ধ্যাকালীন নিয়ন্ত্রণারোপ করা হয়েছে বটে! তবে তা সাময়িক।’ আরও আলাপ থাকলেও ব্লগার-প্রকাশক হত্যার প্রেক্ষিতে ব্যস্ততার দরুন তিনি পরে দেখা করতে বলেন।

শেষ কথা
বিশ্ববিদ্যালয়ে সারাবিশ্বের বৈচিত্র্যের সমাহার ঘটবে। বিশ্ববিদ্যালয় হবে সারাদেশের বিভিন্ন পেশা-বর্গের মানুষের তীর্থ। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাইরে থেকে মানুষ শিক্ষা সফরে যায়। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ নিষেধ, বা এর প্রতিষ্ঠানগুলো জবরদখল করে তাতে তালা এঁটে দিলে মুক্তচিন্তা, সাংস্কৃতিক চর্চা, জ্ঞানচর্চা, দর্শন চর্চা, শিল্প চর্চা, সাহিত্য চর্চা, মতাদর্শ চর্চার রাস্তা সীমিত হয়। আর তা অবশ্যই অবক্ষয়ের রাস্তাই খুলে দিচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাকে মোকাবিলা করতে হলে পরমতসহিষ্ণুতার পরিবেশ দরকার। যাতে ভিন্নমত পোষণকারীরা একে অপরের কাছে আসতে পারেন, তাদের মধ্যে মতের বিরোধ যেন শত্রুতার দিকে না গড়ায়।

এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, যদি বিশ্ববিদ্যালয়কে এভাবে আরও অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়, তাহলে এ অবক্ষয়ের বিষ আরও ছড়াবে। এখনই সময় সতর্ক হওয়ার। নিয়ন্ত্রণ, অবরোধ আরোপ করে ক্ষমতাবানদের পেশিচর্চার সুযোগ না করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত হবে মুক্তচিন্তার অর্গল খুলে দেয়া যাতে এই এলাকায় একটা গণতান্ত্রিক চরিত্র গড়ে ওঠে। আর এই গণচরিত্রটা গড়ে তোলা গেলে ক্ষমতাবানরা চাইলেই এখানে তাদের ক্ষমতা দেখাতে পারবে না। নয়া মূল্যবোধের মানুষই তাদের প্রতিহত করবে। অবরুদ্ধ করে, নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে সমাধান আনা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই এ কাজটি করতে হবে।

[এটি সংবাদ প্রতিবেদন হিসেবে লিখিত। যা গত সপ্তাহে সাপ্তাহিকে প্রকাশিত হয়েছে। ছবিগুলো আগের এবং অনলাইন থেকে সংগৃহীত।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “অবরুদ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : অবক্ষয়ের এক উৎসমূল

  1. প্রকৃত পক্ষে সমগ্র
    প্রকৃত পক্ষে সমগ্র বাঙলাদেশটাই আজ অবরুদ্ধ। যেখানে সাধারণ মানুষের অবাধ বিচরণ সীমাবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। ঢাকা শহরে ইদানিং পুলিশের বেশ তত্‌পরতা লক্ষ্যকরা যাচ্ছে। চেক করার নামে চলছে হয়রানি আর বাণিজ্য!!
    অদ্ভুত, অসহনীয় একটা সময় পার করছি আমরা।

    সময়োপযগী এই লেখাটা স্টিকির জন্য অনুরোধ করছি।

  2. যদি ভালবাসা চিবিয়ে খাওয়া
    যদি ভালবাসা চিবিয়ে খাওয়া যেত
    কেও দিবি অামাকে এক মুঠো ভালবাসা
    আমি খাব। আমার অনেক ক্ষুধা, কতদিন খাইনা।
    যদি ভালবাসা না থাকে তো দিসনা।
    একটু মানবতা দে খাই। তাও দিবি না?
    আমি যে বহু কাল অনাহারে অাছি,
    কিচ্ছু খাবার মত তো পাই না।
    দে না অমায় একটু মমতা, সহানুভূতি কথাদিলাম
    খুব বেশি খাব না, অল্প কিছু হলেই চলবে।
    কি হল দিবিনাতো? দিবি কোথা থেকে তোর কাছে তো নেই। থাকবেই বা কি করে,?
    আজ পৃথিবির এই বিশাল বুক থেকে ভালবাসা, মানবতা, মায়া মমতা সব হারিয়ে গ্যাছে সব। যা একটু বাকি ছিলো তা আর পাওয়া যাবেনা খুজে, জানি অামিও পাব না বৃথা চেষ্টা আমার, কি করবো তবুও মন তো মানে না, আমার যে অনেক ক্ষুধা আমি খাব…………………… .

    1. লেখার সঙ্গে এ মন্তব্যের
      লেখার সঙ্গে এ মন্তব্যের সম্পর্ক কি? এ ধরণের মন্তব্য আপনাকে ‘ফাত্‌রা’ প্রমাণ করা ছাড়া আর কোনো কাজে লাগবে বলে মনে হয় না।

  3. অনেক গুরুত্বপূর্ন একটি
    অনেক গুরুত্বপূর্ন একটি লেখা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান যে চিত্র তুলে এনেছেন তাতেই অনুমান করা যায় যে গোটা দেশটাই আজ নষ্টদের দখলে।

    1. ধন্যবাদ। রাষ্ট্রীয় এই অবরোধের
      ধন্যবাদ। রাষ্ট্রীয় এই অবরোধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। মানুষকে বাস্তব অবস্থা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা উচিত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

59 − = 55