আমরাই মানুষ

কি জন্যে যেন সেদিন টিভিতে সি.এন.এন খুলেছিলাম। সম্ভবত খাওয়ার সময় টিভি দেখতে গিয়ে। দেখি একটা প্লেন ধুরুম করে একটা টাওয়ারের ভেতরে ঢুকে গেল, আর বিরাট আগুনের হল্কা! ভাবলাম ভাল মুভি শুরু হলো। পরে দেখি, সত্যি এবং সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ এর সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনার। এর সব ঘটনাই এখন সবার জানা। আজ বোস্টনে ২৭,০০০ প্রতিযোগির সমাগমে বোমা ফেটেছে। দুজন নিহত (শেষ খবর পর্যন্ত) এবং আহত শতাধিক। কিছুদিন আগে ফটিকছড়িতে ভয়াবহ-নোংরা হত্যাযজ্ঞ ঘটে গেল। এসব দেখে মনে হয়, মানবতার চরম অধপতন ঘটেছে।

এখনও জানি না, বোস্টনের এই ঘটনার পেছনে কারা দায়ী। একজন ব্যক্তি না একাধিক দূর্বত্ত নাকি কোনও সন্ত্রাসীবাহিনী। সর্বশেষ জানলাম, যে দুটি বোমা ফেটেছে সেগুলি খুব অত্যাধুনিক কিছু নয়। আমেরিকায় এই ধরনের বোমার ব্যবহার এর আগে না হলেও, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে এই ধরনের বোমার ব্যবহার। বোমার স্প্লীন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এয়ারগানের গুলি এবং সাইকেলের বিয়ারিং বল। পাঠককুল, যারা বাংলাদেশের, তারা খুব সহজেই বুঝে যাবেন, সে এধরনের বোমা কোন এলাকায় বহুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ঘটনাটি আমাকে অবাক করেছে। বছরের এই দিনে, ম্যারাথনকে ঘিরে আসে প্রচুর মানুষ। এবার শুধু প্রতিযোগিই ছিল ২৭,০০০ জন। ভেবেছিলাম নাহ, মানুষ চরম অধোঃপতনে গেছে। কিন্তু গত কিছুক্ষনে দেখা ও জানা কিছু সংবাদে আমার ধারনা পাল্টাচ্ছে একটু একটু করে।

হ্যাঁ, কিছু আছে যারা খুব নোংরা-শয়তান। কিন্তু এই বিশাল পৃথিবীতে আমরা সবাই কিন্তু খারাপ নই। এত এত মানুষের মধ্যে ওইসব নোংরা, নীচ মানুষের সংখ্যা, খুব খুব নগন্য। এইসব অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোয় থাকা মানুষগুলি প্রতিবার উঠে দাঁড়ায়, যেনবা রক্তের মধ্যে মিশে থাকা সাদা কনিকাগুলি যারা এক হয়ে ধ্বংস করে দেয় ক্ষতিকর ভাইরাসগুলো।

বোস্টনের বোমাহামলার পর-পর যারা প্রতিযোগি ছিলেন, তারা ফিনিষ লাইন পার হয়েও থামেননি। বহুসংখ্যক মানুষ দৌঁড়ে গেছেন হাসপাতালে রক্ত দেবার জন্যে। এতএত মানুষ গেছেন, যে হাসপাতাল থেকে নোটিশ দেয়া হয়েছে “আমাদের আর ডোনারের প্রয়োজন নেই। আপনাদের সবার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।” সাধারন মানুষ যারা আশেপাশের এলাকায় থাকেন, সবাই নিজের বাড়ি-বেডরুম খুলে দিয়েছেন যেন ক্ষতিগ্রস্থরা, কিম্বা তাদের পরিবারের লোকজনে থাকতে অসুবিধা না হয়। “আমি গাড়ি দিয়ে সাহায্য করবো, কল করুন --” কিম্বা “আমার ছেলেদের রুম খালি করে দিয়েছি। আমার দুটি বেডরুমে এসে বিশ্রাম করুন। যোগাযোগ —- ।” আরও দেখলাম “আমার বিছানা নেই, সোফায় ঘুমাই।ওটাই ছেড়ে দিচ্ছি। যার প্রয়োজন এসে বিশ্রাম নিন,” দেখছি “আমার ঘরে যায়গা কম। গ্যারেজে বিছানা করে রেখেছি। কষ্ট করে যোগাযোগ করুন শুধু, আমি গাড়ি করে নিয়ে আসবো।” এমন হাজারো বিজ্ঞাপন রয়েছে ওখানে।

তৎসংলগ্ন এলাকার সব রেস্টুরেন্ট বলে দিয়েছে “খেয়ে যদি পারেন, শুধু তাহলেই বিল মেটাতে হবে।” মানে পয়সা না থাকলেও তারা আপনাকে খাওয়াবে। যারা ঘটনাস্থলে ছিল, তারা এবং পুলিশ জীবনের মায়া না করেও হামলাস্থলে ছুটে গিয়ে উদ্ধার করেছে আহতদের, সরিয়ে এনেছে শিশু-বৃদ্ধদের কোলে করে। এইযে মানবতা এতো ধর্ম-গোত্র কিম্বা কোনও কিছু পাবার বিনিময়ে নয়। আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই খারাপ, শয়তান হতাম তাহলে তো এতদিনে একে অপরকে খেয়ে শেষ করে ফেলতাম।

চারপাশের ধ্বংস্বযজ্ঞ দেখে আশাহত হবেন না। যখনই দেখবেন কারও চোখে ধর্মান্ধতার অন্ধ বিকৃত উল্লাস, ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করুন – “আমরা মানুষ, তোমাদের মত বিকৃতদের থেকে আমরা অনেক….অনেক বেশি। আমরাই তোমাদের শেষ করেছি, ……. এবং করবো ………………….সবসময়।”

We are the good, outnumbering you…….always.

?t=FQQVBhg9aHR0cDovL2ltZy5nYXdrZXJhc3NldHMuY29tL2ltZy8xOGtyNzN1b3NsOWdranBnL2stYmlncGljLmpwZxQCFgASAA&s=i2xOJrUfvIWj_5NmvQH6MlGnAh2m2A2mG_l8LFPerjw” width=”400″ />
ছবি: উদ্ধারকারী একজন সাধারন অংশগ্রহনকারী।

:large” width=”400″ />
ছবি: বোমার আঘাতে মাটিতে পড়ে গেছেন একজন প্রবীন, আর পুলিশ (ফার্স্ট রেসপন্ডার্স) সাথে সাথে দৌঁড়ে এসেছে সাহায্যের জন্যে। খেয়াল করে দেখুন, বামের পুলিশ একজন গবির্ত নারীও বটে।


ছবি: রক্তে রাঙা হামলাস্থল

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “আমরাই মানুষ

  1. ভুপেণ হাজারীকার লিরিক্স
    ভুপেণ হাজারীকার লিরিক্স দিয়েই শুরু করলাম –
    ” মানুষ যদি সে না হয় মানুষ লজ্জা কি তুমি পাবেনা, ও বন্ধু মানুষ মানুষের জন্যে”

  2. হেফাজতিদের ভাষায় নাস্তিক
    হেফাজতিদের ভাষায় নাস্তিক দেশের মানুষের মানবতা দেখেও কি আমাদের আস্তিক দেশের মানুষেরা শিক্ষা নেব না ?

  3. এখানে ঘরে তালা দিতে ভুলে
    এখানে ঘরে তালা দিতে ভুলে গেলেও সমস্যা হয় না অথচ দেশে ঘরে তালা না লাগালে আত্মারাম খাচা ছাড়া হয়ে যায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

44 − 42 =