খসে পড়ছে হেফাজতের মুখোশ

৬ এপ্রিল হেফাজতের মতিঝিল সম্মেলনের দিন দুয়েক পর ঢাকায় এসেছিলাম। আরামবাগ থেকে রিক্সাযোগে টিএসসি চত্বর যাওয়ার পথে নটরডেম থেকে মতিঝিল পর্যন্ত সারা রাস্তা জুড়ে নাস্তিকদের ফাঁসির দাবিতে অনেকগুলো চিকা দেখেছিলাম, কিন্তু তখন অতটা গুরুত্বসহকারে দেখি নাই যতটা আজ দেখেছি।

আজ খুব খেয়াল করে করে লেখাগুলো দেখছিলাম আর পড়ছিলাম। সুন্দর করেই লেখাগুলো লেখা হয়েছিল। শ্লোগানগুলোর ধরন অনেকটাই গণজাগরনের কপি পেস্ট। সব থেকে যে লেখাটি কমন ছিল সেটি হলো “নাস্তিকদের ফাঁসি চাই” আর তাদের তালিকাভুক্ত “নাস্তিক” হলো “শাহরিয়ার কবির”, “হাসানুল হক ইনু”, “ইমরান এইচ সরকার”, আর নিচে সংগঠন বা দল বলতে দুটো নাম এসেছে “হেফাজতে ইসলাম” এবং “বাঁশেরকেল্লা”।

খুব খেয়াল করে নামগুলো দেখুন। এই নামগুলো কিন্তু চিনতে খুব একটা কষ্ট হবার কথা নয়। ইমরান এইচ সরকারকে দিয়েই শুরু করি। ইমরান ভাইয়ের সাথে পরিচয় খুব একটা বেশিদিনের নয়, গতবছরের অক্টোবরের দিকে উনার সাথে ফেসবুকে পরিচয়। এরপর ডিসেম্বরের ৭ তারিখ বিকালে উনার সাথে দেখা হয় প্রথম। সেদিনই প্রথম দেখা হয় আরো বেশ কয়েকজন অনলাইন এক্টিভিস্টদের সাথে। পরে রাতে ইমরান ভাইয়ের বাসাতে চলে যাই। ছিমছাম একটি ঘর, তেমন কোনই জৌলুশতা নেই। তবে একটা ব্যাপার নজরে এলো মোটামুটি পর্দানশীল পরিবার। পরদিন সকালে বাঁধন স্বপ্নকথক ভাই এলে নানান কথায় মেতে উঠি আমরা এরই মাঝে নাস্তিকতা প্রসঙ্গ এসে যায়। আলোচনার সময় খেয়াল করে দেখলাম ইমরান ভাইয়ের নাস্তিকতার প্রতি কোনই আকর্ষন নেই, উনার কাছে ধর্মই শ্রেয়। উনার সাথে অনলাইন এবং অফলাইন উভয় ভাবেই পরিচিত হবার খাতিরে এ কথা মোটামুটি নিশ্চয়তার সাথেই বলতে পারি কোনভাবেই উনি নাস্তিকতাকে প্রশ্রয় দিতে রাজি নন। আবার এই বলে উনি নাস্তিকদের ঘৃণা কিনবা প্রত্যাখান এও করেন না।
এতো কিছুর পরেও যখন বলা হয় নাস্তিক ইমরানের ফাঁসি চাই তখন ব্যাপারটা কি অদ্ভুত লাগে না!!!

এরপর আসি শাহরিয়ার কবিরের ব্যাপারে। এই নামটি যখনই নেওয়া হয় তখনই “একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি” কথাটি আপনা আপনিই এসে যায়। এই ব্যক্তির ব্যাপারে যতবারই শুনেছি শুধু একটিই কথা মিল পেয়েছি সবার সাথে সেটি হলো এই লোক খেয়ে না খেয়ে জামায়াত-শিবির বিরোধী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে এই লোক জেল খেটেছেন, অত্যাচার সয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন। এতো কিছুর পরেও এই লোক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী চাওয়া থেকে সরে আসেন নাই। তবে তার নামে কখনো নাস্তিক্যবাদের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন এমন কথা শুনি নাই কিনবা উনি নাস্তিকতা প্রচার এবং প্রসারে সহায়তা করেছেন এরকমও শোনা যায় নাই। উনার বিভিন্ন লেখা থেকেও তা বোঝা যায়। এরপরেও উনার নাম দিয়ে নাস্তিক হিসেবে ফাঁসির দাবী করাটা বেশ “অদ্ভুত” শোনায়।

এবার আসি হাসানুল হক ইনু’র কথাতে, জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ইনু) এর প্রধান তিনি। ১৯৭১ সালে আওয়ামী ছাত্রলীগের হয়েই তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এমনকি আমাদের যেই লাল সবুজের পতাকা এই পতাকা তৈরীর নেপথ্যেও তিনি যুক্ত ছিলেন সক্রিয়ভাবেই। এই ব্যক্তিকে আমার জ্ঞান-বুদ্ধির বয়সকালে দেখি নাই প্রকাশ্যে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলতে। তিনি সর্বদা ছিলেন এবং এখনো আছেন অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে। তার আরো সুদৃঢ় অবস্থান রয়েছে জামায়াত-শিবির সহ যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে। অথচ এই লোকের বিরুদ্ধে নাস্তিকতার কথা বলে ফাঁসি দাবী করেছে “হেফাজতে ইসলাম” এবং “বাঁশেরকেল্লা”।

উপরের তিনজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু জানি যেই আলোকেই লিখেছি এবং তিনজনের মধ্যে যে বিষয়টি মিলে সেটি হলো তারা “জামায়াত-শিবির” এবং “যুদ্ধাপরাধীদের” বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট করেছেন সবসময়। কিন্তু নাস্তিকতা প্রসারে অথবা নাস্তিকতার পক্ষে তাদের জোরালো কিনবা সুস্পষ্ট অবস্থান নেই। অথচ তাদেরকে “নাস্তিক” ট্যাগ দিয়ে ফাঁসির দাবী করা হয়েছে। এই যখন অবস্থা তখন কি সন্দেহ বা প্রশ্ন জাগে না; তাহলে কেন এদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে ফাঁসির দাবী করেছে তারা?

এর একদম সহজ উত্তর উপরেই তাদের তিনজনের অবস্থানের মিল থেকেই পাওয়া যায়। তারা জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে এবং তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের স্বপক্ষে লড়াই করে যাচ্ছেন। এখন “জামায়াত-শিবিরের” বিপক্ষে এবং “যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে” কথা বললেই যদি নাস্তিক হতে হয় তাহলে এদেশের না হলেও অর্ধেকেরও বেশি জনগনকে নাস্তিক হতে হবে এবং ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে। সবচাইতে বড় কথা হলো তাদের এই দাবী পরিপূর্ণ ভাবেই স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। এমনকি হেফাজতীরা যেই ১৩ দফা দাবী করেছে সেগুলোও।
এরমধ্যে মজার ব্যাপার হলো “বাঁশেরকেল্লা” পেইজটি সম্পূর্ণ জামায়াতী অর্থায়নে পরিচালিত এবং এটি প্রমানিত। আর এই পেইজে কয়েকদিন ধরেই মওদুদীর পক্ষে সাফাই দিয়ে অর্থাৎ মওদুদীর যেসকল কথা (মিঃ আলা মওদুদী দ্য বেরাদর অফ শয়তান এন্ড ফাদার অব জামায়াত-ইসলাম , জামায়াত শিবিরের অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান ) নিয়ে আমরা দাবী করছি যে সে ব্লগারদের চাইতেও অনেক বেশীই ইসলাম অবমাননা করেছে সেটিকে জায়েজ করতেই প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এমনকি চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে বাঁশেরকেল্লার অবস্থান এবং তাদের মুক্তির দাবীতে পোস্ট ও হেফাজতীদের সভা-সমাবেশে প্রচারণাও নতুন কিছু না।

উপরের এতো ব্যাখ্যা দেওয়ার পরেও কি প্রমান করতে হবে যে হেফাজতীরা নাস্তিকদের ফাঁসির দাবীতে কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে? তাদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যটা কি আরো পরিষ্কার করতে হবে যেখানে মওদুদী পন্থীরা অনলাইন এবং অফলাইনে তাদের সমর্থন ও সহযোগীতা দিয়ে যাচ্ছে? তারা যতোই কথা বলছে ততোই উন্মোচিত হচ্ছে তাদের মুখোশ।

সরকারকেও বলতে চাই তাদের সাথে তাল না মিলিয়ে বরং তাদের মূল চরিত্র প্রকাশ করে প্রচারণা চালালেই ভালো হয়। তাদের চাপে রাখলেই শ্রেয় হয়। নিজেদের কর্মী সমর্থকদের চাপে না রেখে বরং সহযোগিতা করুন।

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৪ thoughts on “খসে পড়ছে হেফাজতের মুখোশ

    1. শতভাগ সহমত। নিজের উপর নিজেরই
      শতভাগ সহমত। নিজের উপর নিজেরই কি পরিমান ক্ষোভ জন্মাচ্ছে তা বলে বুঝাতে পারবো না। এখন মনে হচ্ছে আমাদের মতোই পাঠার বলি হওয়াতেই সম্ভবত বঙ্গবীর কিনবা এবিএম মুসা আওয়ামীলীগের ঘোর বিরোধী হয়ে উঠেছে।
      তবে বঙ্গবীর বা মুসা ভোল পাল্টানোর সাথে সাথে নিজেদের বিকিয়ে দিয়েছেন সেটা অন্তত আমি করব না।

  1. দারুণ বিশ্লেষণ। এটা আসলেই
    দারুণ বিশ্লেষণ। এটা আসলেই পরিস্কার তারা আসলে কি চায়। আপনার একটা ছোট্ট তথ্য বিভ্রাট হয়েছে লেখাটায়। আপনি বলেছেন “এবার আসি হাসানুল হক ইনু’র কথাতে, জাসদ (জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক দল ইনু) এর প্রধান তিনি।” ……… এখানে জাতীয়তাবাদীর জায়গায় জাতীয় হবে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। ধন্যবাদ।

  2. হ, ঠিকই কইছেন
    ডাঃ আতিক

    হ, ঠিকই কইছেন
    ডাঃ আতিক সাহেবের সাথে পুরোপুরি একমত . . .

    তয় বাঁশেরকেল্লারে লইয়া চিন্তাইতেছি — :ভাবতেছি:
    এইডা তো অনলাইনে ছাগু’গো ফেইসবুক প্রোফাইলের ওয়ালে ঝুলে,
    অহন দেখি অফলাইনে হেপাঝথিরা মতিঝিলের ওয়ালে ওয়ালে টাঙ্গাইয়া দিয়া আইছে

  3. আমাদের এলাকায় একটি প্রবাদ
    আমাদের এলাকায় একটি প্রবাদ আছে, গুড় অন্ধকারেও মিঠা লাগে। হেফাজতিরা নিজেকে যত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রচার করার চেষ্টাই করুক না কেন, তারা যে হেফাজতে জামাতি এতে কারও সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। হেফাজতিরা যে হেফাজতে জামাতি তার প্রমাণ তারা নিজেদের অজান্তেই দিয়ে ফেলেছেন সেটি তারা নিজেরা বুঝতেই পারেননি বোধ হয়?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 67 = 68