পোস্টমডার্ন হিপস্টার : পাশ্চাত্য সভ্যতার শেষ দশা

 

‘আমাদের সভ্যতার এমন এক বিন্দুতে আমরা এসে পৌঁছেছি, যেখানে প্রতিসংস্কৃতি (counterculture) পর্যবসিত হয়েছে নান্দনিকতাবোধশূন্য এক আত্মসর্বস্বতার মোহ আবেশে।’ ‘হিপস্টারবাদ যেমন একদিকে আগেকার সব প্রতিসংস্কৃতিগুলির ফসল, অন্যদিকে আবার এতে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বা মৌলিকতার গুণগুলি একেবারেই নেই।’

শহরের হেরোইন ঘাঁটির কেন্দ্রে নাইটক্লাবে রূপান্তরিত হাল ফ্যাশনের এক ডাইভ ইন বারের পেছনে বসে গ্যাঁজলা ওঠা ঘোলাটে এক পাঁইট বিয়ারে চুমুক দিচ্ছি। আমার সামনে একদল হিপিগোছের চ্যাংড়া প্যাংড়ার জটলা। তারা দলবদ্ধভাবে ধূমপান (বিরোধী) আইনের বিষয়ে বিষোদ্গার করছে। তাদের সমবেত গুজুর গুজুর থেকে দমকে দমকে শোনা যাচ্ছে “fuck you”. যা ঘোষণা করছে তাদের বিদ্রোহ বিষয়ক ধ্যান ধারণার নিঃস্ব আর নড়বড়ে অবস্থা। আর এটাও বোঝা যাচ্ছে যে তাতে তাদের কারুরই কিছু যায় আসে না।

ডিজে তার ম্যাকবুকে আঙুল চালিয়ে চালিয়ে এমপিথ্রি সংকলন থেকে একটা মিক্স তৈরি করছে। শুনে মনে হচ্ছে যেন গত বছরের বাজার গানের সংগ্রহ থেকে আঁকশি দিয়ে পেড়ে আনছে ডিএমএক্স থেকে ডলি পারটন, সঙ্গে ভয়াবহ বেতালা যান্ত্রিক ছন্দের খিচুড়ি।

‘এটা তাহলে একটা হিপস্টার পার্টি?’ পাশে বসা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম। সে বড়ো বড়ো ঝোলা দুল আমেরিকান অ্যাপারেলের ভি-গলা টি শার্ট, পাওয়ারহীন চশমা আর বেখাপ্পা রকমের গরম পশমী কোট পরেছিল।
‘হ্যাঁ, তাকিয়ে দেখব এখানে নাইনটি নাইন পারসেন্ট লোকই পুরোপুরি হিপস্টার।’
‘তুমি?’
‘আরে ধুস!’ বলে হেসে গ্লাসের তলানিটুকু গলায় ঢেলে সে নাচের ফ্লোরে নেমে গেল।

মিত্রশক্তি অক্ষশক্তির আত্মসমর্পনে বাধ্য করানোর পর থেকে প্রতি-সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলি স্থিতাবস্থার দিকে একের পর এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। যুদ্ধোত্তর সময়ে দশকে দশকে এই প্রতি সাংস্কৃতিক আন্দোলন সামাজিক মানদণ্ডকে চুরমার করে সঙ্গীত, শিল্প, রাষ্ট্রব্যবস্থা, নাগরিক সমাজ, যুদ্ধ, দাঙ্গা — সবকিছুতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

পাঙ্করা যখন তাঁবে চলে এল আর হিপহপরা তাদের সমাজ পরিবর্তনের ঝোঁকটাকে হারিয়ে ফেলল তখন আগেকার জোরালো প্রতিসংস্কৃতির ধারাগুলো সব মিলেমিশে এক হয়ে গেল। এখন আটলান্টিকের দু’পার জুড়ে রুটি, ধরনধারণ, আচার ব্যবহারের এক সংমিশ্রন তৈরি হয়েছে, যা হিপস্টারের সংজ্ঞাতীত ধারণাকে যেন সংজ্ঞায়িত করছে।

বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন ধরনধারণের নকলনবিশি করা হিপ যেন পাশ্চাত্য সভ্যতার সমাপ্তি। এ এমন এক সংস্কৃতি যা অতীত সংস্কৃতিগুলির উপরিস্তরেই হারিয়ে গেছে। তার কোনও নতুন অর্থ সৃষ্টি করতে পারেনি। নিজের জীবনীশক্তি তো নেইই, বরং আত্মঘাতী। আগেকার যুব আন্দোলনগুলি যেমন পূর্বজদের যত দুষ্কর্ম আর ক্ষয়িষ্ণুতাকে চ্যালেঞ্জ করত, আজকের হিপস্টার নামক যুব উপসংস্কৃতি যেন মুমূর্ষু সমাজের অগভীর মূল স্রোতেরই এক প্রতিফলন।

উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের যে কোনও বড়ো শহরের পথে একবার হাঁটলেই দেখা যাবে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ফ্যাশন দুরস্ত যুবকযুবতী। তাদের বয়স কুড়ির ঘরে। কিছু বাঁধাগতের ফ্যাশন চিহ্ন ধারণ করে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এইসব ফ্যাশনদুরস্ত চিহ্নগুলোর মধ্যে আছে চামড়ায় সেঁটে থাকা জিনস সুতির টাইট লেগিংস, ফিক্সড গেয়ার বিকেস, মান্ধাতা আমলের ফ্লানেল, নকল চশমা আর কেফিয়ে। শুরুতে এই কেফিয়ে পরত শুধু প্যালেস্তানীয়দের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশে কিছু ইহুদি ছাত্র আর পশ্চিমী প্রতিবাদীরা। এখন এই কেফিয়ে হয়ে উঠেছে হিপস্টারদের অর্থহীন একঘেয়ে এক ফ্যাশন।

আমেরিকান অ্যাপারেলের ভি গলা শার্ট, পেল ব্লু রিবন বিয়ার আর পার্লামেন্ট সিগারেট হল হিপস্টারদের আত্মসাৎ করা শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী প্রতীক চিহ্ন যা থেকে মানেগুলো খসে পড়েছে। বছর দশেক আগে কেউ ভি গলা শার্ট পরে ব্লু বিয়ার খেলে তাকে গতানুগতিক বলা যেত না। কিন্তু ২০০৮ সালে এগুলো সুবিধাভোগী শ্রেণীর মানুষের নির্লজ্জ বস্তাপচা বোলচালে পর্যবসিত। এই সুবিধাভোগী শ্রেণী নিজেদের বিত্ত ও সুবিধার চিহ্নগুলোকে চাপা দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর নান্দনিকতায় ডুব দিতে চাইছে।

হিপস্টারদের এই রাস্তার লোক হয়ে ওঠার মোহের চুড়ান্ত নিদর্শন হল ফিক্সড গিয়ার বাইক নিয়ে তাদের পাগলামি। এই ফিক্সড গিয়ার বাইক তাদের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য যানবাহন। এই বাহনে যা থাকার কথা নয়, সেই ব্রেক জুড়ে নিয়েই এই বাইক হিপস্টারদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

ব্যঙ্গ বিদ্রূপ আর বিদ্বেষপ্রিয় হিপস্টাররা পৃথিবীব্যাপী ব্লগ আর কম্পিউটার বিপনীর জালের মাধ্যমেই একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। এই সূত্রেই তাদের কাছে এসে পৌঁছেছে দুনিয়াজোড়া ফ্যাশনরুচি। এক ঢিলেঢালা সৃষ্টিশীলতা নিয়ে তারা আর্ট পার্টিতে যায়। অ্যানালগ ক্যামেরায় নিম্নমানের ছবি তোলে, বাইক চালিয়ে নাইট ক্লাবে গিয়ে হাল ফ্যাশনের ডিসকো কোক পার্টিতে মাতে আর তাদের প্রজন্মের দিকচিহ্নস্বরূপ পত্রিকা, যেমন, ভাইস, অ্যানাদার ম্যাগাজিন, ওয়ালপেপার- এইসবের পাতা ওলটাতে ওলটাতে তাদের দিনের ফসল ইন্টারনেটে ব্লগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এই খেলো শিকড়হীনভাবে ভেসে চলা জীবনযাত্রার ধরন সারা বিশ্বকে তাদের প্রতি বিরক্ত করে তুলেছে।

ক্রিস্টিনা লোরেন্টজেন টাইম আউট নিউইয়র্কে ‘কেন হিপস্টারদের মরতেই হবে’ নামক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, এইসব অসার মৃতবৎ হিপস্টাররা সব হয় স্টাইল পেজের নায়ক নায়িকা নাহলে কীটানুকীট বাজারওয়ালাদের প্রিয়জন অথবা আগ্রাসী জমি বাড়ি দালালের মানুষ। তার মতে, এদের ভালোভাবে কবর দেওয়া উচিত যাতে এরা আবার নতুন ভাবে জন্মাতে না পারে।

কোনো কিছু আগলানো, তুলে ধরা বা বরণ করার কিছুই না থাকায় হিপস্টারদের ধ্যান ধারণাগুলো যেন আক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষাতেই থাকে। কিন্তু একাগ্রতার এই অভাবই হিপস্টার সংস্কৃতিকে বিশ্বজনীন করে তুলেছে। এই ঘটনা পশ্চিমী প্রতিসংস্কৃতির মূলকেই কুরে কুরে খাচ্ছে। হিপস্টারদের নিজস্বতার অভাব সব সমালোচকের আক্রমণের লক্ষ্য। কিন্তু এই একগুঁয়ে দুর্বোধ্য হাবভাব যা পূর্বজদের থেকে হিপস্টারদের আলাদা করেছে তাই আবার তাদের যে কোনও সমাজ আন্দোলন, উপসংস্কৃতি বা জীবনযাত্রায় মিলেমিশে তার দ্রুত সার্বিক পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম করে তুলেছে।

তালামারা একসারি ফিক্সড গিয়ার বাইকের পাশে একটা আর্ট পার্টির বাইরে দাঁড়িয়ে দু’টি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হলো যারা হিপস্টার সমরূপতার উদাহরণস্বরূপ। তাদের একজনকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই আর্টপার্টিতে আসা, নকল চশমা, লেগিংস আর পশমী শার্ট মিলিয়ে তাকে হিপস্টার বলা যায় কি না। সে উত্তর দিল, ‘এই নামটায় আমি বিশেষ স্বচ্ছন্দবোধ করি না।’

তার বন্ধু যোগ করল, ‘হ্যাঁ, আমি ঠিক জানি না। ওই কথাটার ব্যবহার না করাই ভালো। কথাটা …’ তার চোখে ভয়ের একটা ঝলক দেখলাম।
‘আক্রমণাত্মক?’
‘না, … ঠিক তা নয় … যাই হোক … কেন তা ঠিক না জানলেও ওই কথাটা ব্যবহার না করাই ভালো।’
‘ঠিক আছে। তা তোমরা আজ রাতের পার্টির পরে কী করছ?’
‘উমম্ … আমরা যাচ্ছি উদযাপনী পার্টিতে।’

গাভিন ম্যাকিনেস হলেন ‘ভাইস’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন যিনি সম্প্রতি ওই পত্রিকাটি ছেড়ে দিয়েছেন। হিপস্টারবাদের আদি স্থপতিদের একজন। তার ‘কী করার, কী করার নয়’ টীকা এক দশকের ওপর হিপস্টার ফ্যাশনের নিয়মনীতি বেঁধে দিয়ে এসেছে। বেশিরভাগ আগ্রহী সংবাদমাধ্যমের চেয়ে তিনি সমালোচকদের বিষয়ে অনেক বেশি খুঁতখুঁতে।

‘আমি সব সময়েই দেখেছি, হিপস্টার কথাটা খুবই অশ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। স্থূল কমপিউটার ব্লগার যারা আর কোথাও নিজেদের জায়গা খুজে না পেয়ে একঘেয়েমিতে ভুগছে, তারা যেভাবে ব্যবহার করে। এইসব অল্পবয়সীদের ‘ঘুরে বেড়ানো’ ‘বখে যাওয়া’, ‘ফুর্তি করা’ আর ফ্যাশন করার ওপর তারা এমনই খ্যাপা যে তাদের এই সব তত্ত্বের প্রতি আমি চির সন্ধিগ্ধ। এরা সবসময়েই কোনো কার্যক্রমের গন্ধ পায়।’

ছেঁড়া ঝুলির পোশাক আর ধাতুখচিত চামড়ার জ্যাকেট পরে পাঙ্করা সগর্বে সদম্ভে তাদের মস্তিষ্ক প্রসূত আত্মপ্রকাশ আর বিদ্রোহের সস্তা পদ্ধতিগুলো জাহির করে চলে। ব্রেকড্যান্স প্রিয় ছেলেমেয়েরা তাদের ব্যাগী পোশাক আর জোরালো সাউন্ডবক্স নিয়ে কর্ণগোচর হওয়া সম্ভব এমন সবার কাছে নিজেদের ঘোষণা করে চলে। কিন্তু কেউ নিজেকে একজন হিপস্টার হিসেবে ঘোষণা করছে এ ব্যাপারটা একেবারে অসম্ভব না হলেও বিরল ব্যাপার বটে।

নাচ আত্মপরিচয়ের এক আজব খোঁজ। এই নাচ একবগ্‌গাভাবে অস্বীকার করছে নিজের অস্তিত্ব। অথচ বহন করে চলেছে সেই অস্তিত্বের নানা চিহ্ন।

আমি যখন চুপি চুপি একটা দেওয়ালের সামনে এক কোণে নেচে চলা একটা ছেলের ফটো তুলতে যাচ্ছি, তখন একটা মেয়ে আমার কানে কানে ফিশ ফিশ করে বলল, ‘ছেলেটার বয়স সতেরো’। ও এই দৃশ্যটার জন্যই বাঁচে। ছেলেটার খোঁচা খোঁচা চুলে ‘নিজে করো’ ছাঁট, পরনে চামড়ায় লেগে থাকা জিনস। চামড়ার জ্যাকেট, সাত পুরনো পাঙ্ক টি-শার্ট আর ফুলোফুলো টপ।

মুখের সিগারেট থেকে ধোঁয়া বের করতে করতে, ক্যামেরার জন্য পোজ দিতে দিতে, হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটা হেঁকে উঠল, ‘ফটো তোলো’। সে নানা রকম ভঙ্গি করতে লাগল। ফটো তোলার ফলাফল তাকে দেখাতে মনে হল যেন মাথাটা ঘুরে উঠল।

‘থ্যাঙ্কস ব্যাড’ বলে সে আবার গান বাজনায় মন দিল। আবার নিজেকে ডুবিয়ে দিল ঘর্মাক্ত উত্তেজিত সেই ভিড়ের মধ্যে। আবার মেতে উঠল ভয়ঙ্কর ঝাঁকুনি দেওয়া সঙ্গীত ঘুর্ণিতে।

হিপস্টার পার্টির নাচের ফ্লোরগুলো দেখে মনে হয় যেন, উদ্ধৃতি চিহ্ন পরিবৃত। পাঙ্ক, ডিসকো, হিপহপ সবারই নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়া, অন্তরঙ্গ প্রাণপ্রাচুর্য্যে ভরা নৃত্যশৈলী ছিল যা তাদের মানসিক অবস্থা থেকে মুক্তি দিত। তা সে মাথা ঘোরানো ব্রেক ড্যান্সই হোক, অথবা চনমনে পাঙ্ক শো-এর প্রবল চপেটাঘাতই হোক, কিন্তু হিপস্টারদের যেন নাচের নামে ঠাট্টা, ভুলভাল কাঁধ ঝাঁকানি আর পা ঘষটানি যা নাচের ধারণাটাকেই বিদ্রূপ করে অথবা খুব বেশি হলে আত্মপ্রকাশের এক দায়বোধহীন ভয়, অস্বাভাবিক বঙ্কিম ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গী যার লক্ষণ। এই নাচিয়েরা এ বিষয়ে এতই আত্মসচেতন যে তারা মুক্তির কোনও স্বাদই পেতে চায় না। তারা পা ঘষে চলে শরীর ঝাঁকিয়ে চলে। পৌঁছে যায় এক ঘোরের মধ্যে।

এই ইচ্ছাকৃত উদ্যোগহীন হাবভাবের পেছনে আসল চালিকাশক্তি সম্ভবত নিত্যদিন পার্টি ফটোগ্রাফারদের আকর্ষণ করার চেষ্টা। যখনই এমন কাউকে পায় যাকে ক্ষণিকের জন্য হলেও চিরকালীন বলে মনে হয়, তখনই ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে ঘোর তৈরি করে।

ক্লাবের বাথরুম থেকে ফ্ল্যাশের ঝলকানি লক্ষ্য করে উঁকি দিয়ে ওইরকমই একজন ফটোগ্রাফারের সন্ধান পেলাম। সে হালকা পর্ণোগ্রাফির ছবি তুলছে। দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে মিলে পোশাক খুলছে আর নানা রকম ভঙ্গী করছে। নীরস গ্ল্যামার ছবি তোলার জন্য। হাসাহাসির মধ্যে দিয়ে পুরো ব্যাপারটা চলছিল যতক্ষণ না আর একটি মেয়ে এর মধ্যে মাথা গলিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দিল। ‘তোমরা নব্বই দশকের নিউইয়র্ক শহরের ক্লাবের ছোকরা না কি? এটা হিপস্টার!’ এবং আঁচড়া আঁচড়ি কামড়া কামড়ির এক বেড়াল লড়াই শুরু হল, আমি চটপট পিঠটান দিলাম।

হিপস্টারদের জীবনযাত্রা নানাভাবে আচারবদ্ধ। এইসব পার্টিগুলোতে যারা যায় তাদের মধ্যে অনেকেই ফটো ব্লগ করিয়েদের ছবির বিষয়বস্তু। অনেকেই নির্ঘাৎ পরের দিন বিছানা থেকে বেরিয়ে এসেই আবার আগের রাতের লাম্পট্যের অভিজ্ঞতায় ঢুকে পড়ে। লাল চোখো উসকো খুশকো এইসব মানুষগুলো তাদের ল্যাপটপের ওপর গোল হয়ে বসে তাদেরই মতো একইরকম পছন্দসই ক্ষণিকসুখের বৃত্তান্ত ঘাঁটতে থাকে।

এটা তাদের জানা থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে যে এই ‘শিকারী’ বাজারের লোকজনও সেই একই ওয়েবসাইটগুলো ঘেঁটে চলেছে। তাদের পোশাক আর ভোগ্যদ্রব্যের ওপর নজর রাখছে। এই বাজারওয়ালা আর পার্টির উদ্যোক্তারা এই যুবসংস্কৃতি আত্মসাৎ করার জন্যই পয়সা পায়। তারপর আবার সেইগুলোই গিয়ে বেচে মুনাফা করে। হিপস্টাররা যাকে নিজেদের উদ্ভাবন বলে মনে করে, আসলে তা তাদের কাছে বিক্রি করা হয়। তাদের গলাধঃকরণ করানো হয়, তাদেরই ছকে বাঁধা সাংস্কৃতিক জীবনচর্যা। হিপস্টারবাদ হচ্ছে প্রথম প্রতিসংস্কৃতি যা জন্ম নিয়েছে শিল্পমহলে। বিজ্ঞাপনী অনুবীক্ষণের তলায় নিজেকে মেলে রেখেছে ক্রমাগত পরিকল্পিত ভাঙাগড়ার সামনে। সেইসঙ্গে অন্তরালের এই পরিকল্পনা হিপস্টারদের বাধ্য করছে আগ্রহ আর আনুগত্যের ক্ষেত্রগুলো পাল্টে পাল্টে ফেলতে।

উপসংস্কৃতি না বলে হিপস্টারদের বলা যায় এক ভোক্তাগোষ্ঠী যারা নিজেদের পুঁজি খরচ করে বাজার থেকে ‘মৌলিকতা’ আর বিদ্রোহ খরচ করছে। কোনো বিশেষ ধারা, প্রতীক, শব্দ, ধরনধারণ বা অনুভূতি যেই বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে অমনি তাকে নিচু নজরে দেখা শুরু করছে। কোনোরকম সাংস্কৃতিক আনুগত্য হিপস্টারদের পোষায় না পাছে তাতে তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়।

নিজ ইতিহাসের জগাখিচুড়ি সংমিশ্রণে তৈরি পশ্চিমি এই যুব সম্প্রদায় শান্তি ‘ভোগ’ করতে পারে কিন্তু ‘সৃজন’ করতে পারে না।

অতীতের সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শগুলি সবসময়ই প্রান্ত উষ্মা ক্ষোভ আর প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু হিপস্টারদের এই নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ বিচ্ছিন্ন জীবনযাত্রা সাংস্কৃতিক বিবর্তনে কোনোরকম ছাপ ফেলতে অক্ষম। পাশ্চাত্য সভ্যতার ধারাটা শুকিয়ে গেছে। সামাজিক ব্যর্থতার এই শবের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ার যে আশঙ্কা দিগন্তে দেখা দিচ্ছে তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার একমাত্র উপায় হল এই অন্তঃসারশূন্য কৃত্রিম অস্তিত্বের থেকে বেরিয়ে এসে আবার নতুন করে শুরু করা।

তুমি ফুটোকড়ি না ফেললে আমিও কাণাকড়ি ঠেকাব না, এই বুলি আউড়ে উসকানি দিচ্ছিল পার্টির এক হর্তাকর্তা। এমন সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগে আলো জ্বলে উঠল। ভোর হচ্ছে। পার্টি উদযাপনের পার্টিগুলির মধ্যে শেষতমটি রাস্তায় উপচে পড়ছে। হিপস্টাররা ছড়িয়ে পড়ছে। চোখ রগরাতে রগরাতে চারদিকে যে যেখান থেকে এসেছিল সেখানে ফেরার পথ খুঁজে নিচ্ছে। কেউ কেউ লাফিয়ে উঠল তাদের ফিক্সড গিয়ার বাইকে, কেউ ট্যাক্সি ডাকতে ছুটল। আর আমাদের মতো কয়েকজন বেড়া টপকে কারখানার আবর্জনা ফেলার জমির মধ্যে দিয়ে পথ করে চলল।

আধাপ্রস্তুত কনডোর স্তূপ যেন কবরখানার মোনোলিথের মতো উঁচু হয়ে আমাদের এই উঠতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুব সমাজের সর্বনাশা ভবিষ্যৎ ঘোষণা করছে। উজ্জ্বল গোলাপী রঙের কেফিয়ে পরা পোলারয়েড ক্যামেরা হাতে একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মনে হল ‘এর বদলে হাতে একটা পাথর থাকলেই বিপ্লবীদের মতো দেখাত’। কিন্তু আসন্ন পতন সম্পর্কে অচেতন হয়ে আমরা পায়ের কাছে পড়ে থাকা অস্ত্রগুলোকে অগ্রাহ্য করছি।

আমাদের প্রজন্ম হল এক বয়ে যাওয়া প্রজন্ম। যা কিছু খাঁটি বলে মনে হচ্ছে তাকেই মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরছি। কিন্তু নিজেরা সেই খাঁটি হয়ে উঠতে ভীত। আমরা এক পরাজিত প্রজন্ম। আমাদের পূর্বজরা যারা আগে বিদ্রোহের গান গেয়েছে আর এখন আমাদের কাছে সেই গান বিক্রি করে চলেছে, তাদের ভড়ংবাজির কাছে নিজেদের সমর্পন করে বসে আছি।

আমরা হলাম শেষ প্রজন্ম যারা আগেকার সব কিছুর চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছি। চারপাশের স্থূলতা আমাদের ধ্বংস করে ফেলেছে। হিপস্টাররা হল পাশ্চাত্য সভ্যতার ‘শেষ’-এর প্রতিভূ- এক সংস্কৃতি যা এমনই নিঃসম্পর্ক আর বিযুক্ত যে তা নতুন কিছু সৃষ্টি করা স্তব্ধ করে দিয়েছে।

——

নোট
২৯ জুলাই ২০০৮-এ ডগলাস হ্যাডো-র এই লেখাটি কানাডার ‘অ্যাডবাস্টার্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কানাডার অলাভজনক, ভোগবাদ-বিরোধী ও পরিবেশমুখী সংস্থা ‘অ্যাডবাস্টার্স মিডিয়া ফাউন্ডেশন’ ১৯৮৯ সাল থেকে এই দ্বিমাসিক পত্রিকাটি প্রকাশ করতে শুরু করে। এদের পক্ষ থেকেই ১৩ জুলাই ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। সারা পৃথিবীতে এই পত্রিকার এক লক্ষের বেশি গ্রাহক রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মন্থন সাময়িকীর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১১ সংখ্যায় ছাপা হয় এর রূপান্তর। ‘হিপস্টার : পাশ্চাত্য সভ্যতার শেষ দশা’ শিরোনামে অনুবাদটি করেছেন রূপা ভট্টাচার্য।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “পোস্টমডার্ন হিপস্টার : পাশ্চাত্য সভ্যতার শেষ দশা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1