শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আমাদের স্বপ্নের সম্ভার

আমি ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন দেখিনি, ভাষা সৈনিকদের কাছ শুনেছি, ইতিহাস পড়ে জেনেছি। আমি ‘৬৯-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান শুধু দেখিনি, পাকিস্তানের লৌহমানব ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার কারফিউ ভেঙে মিছিল করেছি। সেই মিছিলের শ্লোগান ছিল ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙ্গালি,’ আর ‘জয় বাংলা’। একেকটি মিছিলে তরুণ ছাত্র আসাদ, কিশোর ছাত্র মতিউর গুলী খেয়ে লাশ হয়ে যাচ্ছে। আসাদের রক্তামাখা শার্ট পতাকা বানিয়ে সহযোদ্ধা তরু দীপ্ত পায়ে মিছিলের সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই থেকে মিছিলে আছি, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি, দেশে ফিরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আবার মিছিল করেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজপথের প্রথম মিছিলটি সংগঠিত করেছিলাম আমরা–মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের পরিবারের সদস্যরা। ১৯৭২-এর ১৭ মার্চ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সহ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে মিছিল করে বঙ্গভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্মারকপত্র দিয়েছিলাম।

এরপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সূচিত হয়েছে এক অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলন। ১৯৯২-এর ২৬ মার্চ গণআদালতে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচার হয়। সেদিন ১৪৪ ধারা এবং রাস্তায় সকল কাঁটাতারের বেরিকেড ভেঙে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে পাঁচ লক্ষাদিক মানুষ সমবেত হয়েছিল। সেই জনসমুদ্রের শতকরা ৯০ ভাগ ছিল তরুণ।

‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ২১ বছর পর মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে ১৯৭১-এ। এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের ৯০ ভাগ ছিল তরুণ। মুক্তিযুদ্ধের ২১ বছর পর জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে আন্দলনের আরম্ভ হয়েছে, তারও ৯০ ভাগ অংশগ্রহনকারী তরুণ। গণআদালতের ২১ বছর পর শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে যুদ্ধাপরাধীদের জন্য মৃত্যুদন্ড এবং ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের দাবিতে ছাত্র জনতার চলমান মহাসমাবেশ মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যে বিশাল ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তারও নায়ক তরুনরা।

৫ ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যাকারী জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিচারের রায়ে প্রত্যাশিত মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে যখন যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়, তখন মুক্তিযোদ্ধারা, মুক্তিযদ্ধে শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বাঙালি অত্যন্ত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সারা দেশের মানুষের এই ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটেছে পরদিন শাহবাগ চত্বরে। প্রথমে ছিল কয়েকশ তরুণ ব্লগারের মানবন্ধন। এই মানববন্ধন অচিরেই মানবসমুদ্রে রুপান্তরিত হয়েছে। দলীয় পরিচয়হীন মানুষের স্বত:স্ফূর্ত এই জনজোয়ারের উত্তাল তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেদিন কাদের মোল্লার মামলার রায় প্রদান করা হয় সেদিন আমি ভারতে। কলকাতা ও মুর্শিদাবাদে পূর্বনির্ধারিত দশটি অনুষ্ঠান ও আলোচনায় অংশগ্রহনের জন্য আমি ৩ ফেব্রুয়ারি দেশ ছেড়েছি। পশ্চিমবঙ্গে এখন বাংলাদেশের দুটি টিভি চ্যানেল দেখা যায়, ইন্টারনেটে সব কটি প্রধান দৈনিক পড়া যায়। রায় ঘোষনার এক ঘন্টার ভেতরেই নির্মূল কমিটির সাধারন সম্পাদক কাজী মুকুলের টেলিফোন পেলাম ঢাকার নেতারা আমার মন্তব্য জানতে চাইছেন। ঢাকার সবাই প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। আমিও আমার ক্ষোভ ব্যক্ত করেছি। বলেছি কেন্দ্রীয় কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকতে। আমার অবর্তমানে অধ্যাপক মুনতাসির মামুন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরদিন ডেইলি স্টারে দেখলাম মামুনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। একদিন পর মুনতাসির মামুন ও শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সহ নির্মূল কমিটির শীর্ষ নেতারা শাহবাগ গিয়ে তরুণদের মহাজাগরণের সঙ্গে সংহতি জ্ঞাপন করেছেন। টেলিভিশনে শাহবাগের বিরামহীন জনস্রোত ও মহাসমাবেশ দেখে মনে পড়েছিল ২১ বছর আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত গণআদালতে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দৃশ্য। গণআদালতের মহাসমাবেশ স্বত:স্ফূর্ত ছিল না। বিএনপি সরকারের যাবতীয় বাধা, হুমকি অগ্রাহ্য করে গণআদালতের সফল করার জন্য সেদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী, ছাত্র-যুব-নারী মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন তাদের সাংগঠনিক শক্তি উজার করে দিয়েছিল। সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে আকাশ থেকে যে ছবি তুলেছিল সেখানে দেখা গেছে মতসভবন থেকে আরম্ভ করে গোটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শাহবাগ থেকে আরম্ভ করে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত শুধু মানুষ আর মানুষ। তবে এই জনসমুদ্রের প্রস্তুতি দু মাসের হলেও মেয়াদকাল ছিল চার ঘন্টার কম।

৬ ফেব্রুয়ারী শাহবাগ চত্বরে যদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে যে জনসমুদ্র তৈরি হয়েছে এটি কোনও রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের উদ্যোগ হয়নি। এর কোনও পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। যে তরুণ ব্লগাররা এর সূচনা করেছেন তারা জাতীয়ভাবে পরিচিত কোনও মুখ নয়। তারা বেড়ে উঠেছেন জাহানারা ইমামের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় ইতিহাস পড়েছেন, ‘৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের কথা জেনেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত হয়েছেন এবং সময়ের ডাকে এ সময়ের সাহসী সন্তানরা রাস্তায় এসে অবস্থান নিয়েছেন।

৬ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ছয়দিনে কম করে হলেও ১৫ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়েছে শাহবাগে। প্রতিদিন নতুনরা এসে পূর্বে অবস্থানকারীদের সঙ্গে একাত্নতা প্রকাশ করেছেন। জনসমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়েছে দেশের প্রধান জনপদে এবং দেশের বাইরে বাঙালি অধ্যুষিত বিভিন্ন মহানগরে। লন্ডনে জামায়াতের গুন্ডাদের হামলঅ মোকাবেলা করে সমাবেশ হয়েছে, নিউইয়র্কে প্রবল তুষারপাত উপেক্ষা করে সমাবেশ হয়েছ। সারা বিশ্বের বাঙালিরা একাত্নতা ঘোষণা করেছেন শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের তরুণদের মহাজাগরণের দাবির সঙ্গে। এই গণজাগরণের দ্বিতীয় কোনও নজির নেই। যে বাঙালি মাতৃভাষার মযঙাদার জন্য রাজপথে বকের রক্ত ঢেলে দিতে পারে, সে বাঙালি স্বাধীনতার জন্য ৩০ লক্ষ জীবন দিতে পারে, সে বাঙালিই পারে এ ধরনের শান্তিপূর্নভাবে স্বত:স্ফূর্ত জনসমুদ্র সৃষ্টি করতে এবং দিনের পর দিন অব্যাহত রাখতে।

১০ ফেব্রুয়ারী বিকেলে দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে সোজা শাহবাগ গিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত তারুন্যের এই অভূতপূর্ব মহাজাগরণ প্রত্যক্ষ করার জন্য। তখন বিকেল পাঁচটা। গাড়ি থামাতে হয়েছে রুপসী বাংলা হোটেলের সামনে। একা পায়ে হেঁটে বিস্টনির ভেতর ঢুকতেই দেখি সব বয়সী মানুষ রাস্তায় বসে আছে। কোথাও গান হচ্ছে মাইক ছাড়া, বুকে পিঠে পোস্টার ঝুলিয়ে শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা ঘরছে। ফেরিওয়ালাও আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের শ্লাগানওয়ালা মাথায় বাঁধার ব্যান্ড বিক্রি হচ্ছে, কেউ তুলি দিয়ে গ্লালে শ্লাগান লিখছে।

আমাকে দেখে ছাত্রদের একটি দল ‘জয় বাংলা’ বলে ঘিরে ধরলো। কেউ আলিঙ্গন করছে, কেউ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছে–আমি অভিভূত। আমি নির্মূল কমিটির বহু তরুণ কর্মীকে চিনি না। জানি না ওরা নির্মূল কমিটির, নাকি কোনও ছাত্র সংগঠনের– আমাকে ধরে নিয়ে গেল মহাসমাবেশের প্রাণকেন্দ্রে। মাইকে তখন স্বাধীন বাংলা বেতারের বন্ধু রবীন্দ্রনাথ রায় গান গাইছে ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্তলাল রক্তলাল রক্তলাল, জোয়ার এসেছে জনসমুদ্রে……’

রথীনকে ক্লান্ত মনে হল। অনেক্ষন গাইতে গাইতে গলা বসে গেছে, তেতে কোনও ক্ষতি নেই– হাজারও তরুণ কোরাসে গান ধরেছে, রথীনের গলা তরুণদের সম্মিলিত কন্ঠে ডুবে গেছে। দূরে আমার কৈশোরকালের বন্ধু নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু দাঁড়িয়েছিল। আমাকে দেখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল। বলল, আমি প্রথম দিন থেকে আছি। একটু আগে মামুন বলল তুমি এসে গেছ।

আমার চারপাশে যে তরুণরাছিল, গত কদিন টেলিভিশনে ওদের দেখেচি। চেহারায় ক্লান্তি অথচ সূর্যের মতো উদ্দীপ্ত, ওরা জাহানারা ইমামের সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আন্দোলনের আলোকবর্তিকা।

রথীনের গান শেষ হওয়ার পর কেউ মাইকে আমার নাম ঘোষনা করল অনেক বিশেষন যুক্ত করে। চারপাশে শ্লোগানের পর শ্লোগান, যে শ্লোগান শুনেছি, ‘৬৯-এ, ৭১-এ, জাহানারা ইমামের মিছিরে, ২১ বছরের আন্দোলনে। আমি আমার অনির্বচনীয় কথা বললাম, বার বার শ্লোগান আমার কন্ঠ হারিয়ে যাচ্ছিল। চারপাশ থেকে সবাই হাত তুলে বিজয়চিহ্ন দেখাচ্ছিল।

একজন আমাকে ধরে একটা কাঠের বাক্সের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। একজন পাশ থেকে বলল, আপনি রায় সম্পর্কে বলুন।

আমি বলালাম, এ রায় আমরা মানি না। জনসমুদ্রে গর্জে উঠল– ‘মানি না মানি না, বলে।’

আমি বললাম, যে বিশেষ আইনে একাত্তরের ঘাতকদের বিচার হচ্ছে কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনাল তার মর্ম বুঝতে পারেননি। তারা খুনের বিচার করেছেন, গণহত্যার বিচার করেননি। তারা ফৌজদারি আইনের অভ্যাস অনুযায়ী সাক্ষী খুঁজেছেন। ‘৭১-এ কোন বিচ্ছিন্ন খুনের ঘটনা ঘটেনি। ‘৭১-এ বাংলাদেশে ঘটেছে স্মরণকালের ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা। ‘৭১-এর প্রতিটি হত্যা ৩০ লক্ষ মানুষের গণহত্যার অংশ, যার জন্য দায়ী জামায়াতের সকল নেতা, রাজাকার আলবদর, আলশমসরা। জামায়াতনেতা কাদের মোল্লা ‘৭১-এ আলবদর নেতা ছিলেন। ট্রাইব্যুনাল আলবদরের নেতার বিচার করেনি। আমরা আলবদরের নেতা হিসেবে গণহত্যার জন্য কাদের মোল্রার বিচার চাই। গণহত্যাকারীদের সর্বনিম্ন শাস্তি মৃত্যুদন্ড। গোলাম আযম থেকে আরম্ভ করে যে কোন গণহত্যাকারী মৃত্যুদন্ডের কম শাস্তি পেতে পারে না। আমাকে বলতে হচ্ছিল থেমে থেমে। প্রতিটি বাক্য উচ্চারনের পর শ্লাগান ও হাততালি। আমি বললাম, একুশ বছর ধরে আমরা জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধকরা কথা বলছি। যে, মন্ত্রীরা বলেনা আমরা ব্যক্তির বিচার করছি, সংগঠনের বিচার করব না– তারা এসে দেখুন প্রজন্ম চত্বরের লাখো মানুষের দাবি–‘৭১ এর গণহত্যার জন্য জামায়াতের বিচার করতে হবে। গণহত্যাকারীদের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। জামায়াতের সকল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান সরকারের মালিকানায় নিতে হবে। ‘৭১-এর ঘাতক দালালদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। বাংলাদেশের মাটের থেকে ওদের চিরতরে নির্মূল করতে হবে।

তরুণদের বললাম, তোমরা জাহানারা ইমামের সন্তান, তিরিশ লক্ষ শহীদের সন্তান, ‘৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান। একুশ বছর আমরা তোমাদের অপেক্ষায় ছিলাম। যুদ্ধাপরাধীরা বিচারএবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আন্দোলনে তোমরাই নেতৃত্ব দেবে। মৃত্যুর আগে জাহানারা ইমাম এই আন্দোলনের দায়িত্ব ভার কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের উপর নয় জনগণের উপর অর্পণ করেছেন। তার অন্তিম উচ্চারণ ছিল–

সহযোদ্ধা দেশবাসীগণ
আপনারা গত তিন বছর ধরে একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। এই লড়াইয়ে আপনারা দেশবাসী অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আন্দোলনের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম। আমাদের অঙ্গীকার ছিল লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছেড়ে যাবো না। মরণব্যধি ক্যান্সার আমাকে শেষ মরণ কামড় দিয়েছে। আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি। রাজপথ ছেড়ে যাইনি। মৃত্যুর পথে বাধা দেবার ক্ষমতা কারো নেই। তাই আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি এবং অঙ্গীকার পালনের কথা আরেকবার আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। আপনারা আপনাদের অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণ করবেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকবেন। আমি না থাকলেও আপনারাআমার সন্তান-সন্ততিরা– আপনাদের উত্তরসূরিরা সোনার বাংলায় থাকবেন।
এই আন্দোলনকে এখনো অনেক দুস্তর পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র ও যুব শক্তি, নারী সমাজসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই লড়াইয়ে আছে। তবু আমি জানি জনগণের মতো বিশ্বস্ত আর কেউ নয়। জনগণই সকল শক্তির উতস। তাই নির্মূল সমন্বয় আন্দোলনের দায়িত্বভার আমি আপনাদের বাংলাদেশের হনগণের হাতে অর্পণ করলাম। জয় আমাদেরই হবে।

২০১৩ সারে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেররায় ঘোষণা আরম্ভ হয়েছে– রাজধানীর শাহবাগ থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার মহাজাগরণের ভেতর আমাদের স্বপ্নের মুকুল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সৌরভ ছড়াচ্ছে। জাহানারা ইমামের মতো আমিও বিশ্বাস করি আমাদের আরও অনেক দূস্তর পথ পাড়ি দিতে হবে। ২১ বছরে বহু বাধা, ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাত, হামলা মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমাদের সন্তানরা আমাদের চেয়ে সাহসী। পথ যত দুর্গম হোক, যত বাধা আসুক আমরা জয়ী হব। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারী থেকে ২১ বছর পরপর বাংলাদেশের তরুণরা বাঙালির ইতিহাসের এক একটি সোনালি অধ্যায় রচনা করেছে। সত্য ও ন্যায়ের পথে তারুণ্যের এই জয়যাত্রা কোনও অপশক্তি প্রতিহত করতে পারবে না।

১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৩

– নির্বাহী সভাপতি,
একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিমিট

[মতামত বিভাগের কোন লেখায় লেখক আলোচনায় অংশগ্রহন করবেন না]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আমাদের স্বপ্নের সম্ভার

  1. জননী জাহানারা ইমামের বুনে
    জননী জাহানারা ইমামের বুনে যাওয়া বীজ আজ লক্ষ মহিরুহু হয়ে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে শহীদ জননীর বাংলায়, রাজাকারের ঠাই নাই। শাহরিয়ার কবির স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা চমৎকার এই লেখাটির জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

92 − = 88