৪৩,২০০ বার ধর্ষণের শিকার কার্লা জ্যাসিনটোর আত্মকথা

 

‘দিনে কুড়ি বার। সপ্তাহে মোট কতবার হয়, নিজেরাই হিসেব করুন!’ প্রায় ভাবলেশহীন মুখে বলল মেয়েটি। দিনে কুড়ি বার ধর্ষণ! অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। মেয়েটি মেক্সিকোর এক বছর তেইশের যুবতী। মাত্র ১২ বছর বয়সে নারী পাচার চক্রের হাতে পড়ে সে। আর তখন থেকেই শুরু তাঁর জীবনের ভয়াবহ অধ্যায়ের।

কৈশোর থেকে যৌবনে পৌঁছে মেয়েটি শিখে নিয়েছে কষ্ট এড়িয়ে বেঁচে থাকার উপায়। সকাল দশটা থেকে মধ্যরাত, এক শহর থকে আর এক শহরে গিয়ে জুটেছে সেই একই লাঞ্ছনা, একই যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় কেঁদে উঠলেও তাঁর কাছে আসা মানুষগুলোর থেকে সহানুভূতি জোটেনি। কেনই বা জুটবে সহানুভূতি! তারা তো নগদ খরচ করে ফুর্তি করতে এসেছে। তাই নিজের যন্ত্রণা এড়িয়ে যাওয়ার অন্য উপায় বেছে নিয়েছিল সে। “আমি আমার দু’চোখ বুজে নিতাম, যাতে আমি আমার শরীর-মনের যন্ত্রণা আর অনুভব না করতে পারি।” “আমি ৪৩,২০০ বার ধর্ষিত হয়েছি।” খুব সহজে তাঁর জীবনের এই নির্মম সত্যটা জানালো মেয়েটি।

এখন মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে বসবাস কার্লা জ্যাসিনটোর। নিজ বাড়ির দেয়ালঘেরা বাগানে বসে আছেন তিনি। বাগানের সাধারণ ফুল দেখতে পাচ্ছেন। দেয়ালের অপর পাশের মানুষের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। হাঁটছেন ও কথা বলছেন। বার্তা সংস্থা সিএনএনের প্রতিবেদকের একটি প্রশ্ন শুনে চোখে চোখ রাখলেন তিনি। তার কণ্ঠ কিছুটা ফেটে যাচ্ছিল।

কার্লা গল্প বলে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, মাত্র ৫ বছর বয়সেই যৌন নিগ্রহের শিকার হন তিনি। বলেন, আমি ভেঙ্গে যাওয়া পরিবারের সন্তান। মাত্র ৫ বছর বয়সেই এক আত্মীয়ের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয়েছি। মাত্র ১২ বছর বয়েসে মানুষ পাচারকারীদের নজরে পড়ল কার্লা। তার নিজের ভাষ্যমতে, সে একদিন মেক্সিকো শহরের একটি সাবওয়ে স্টেশনে তার বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছিল ঠিক এমন সময় একটা বাচ্চা ছেলে মিষ্টি বিক্রি করতে করতে তার দিকে এগিয়ে আসে এবং তাকে একটা মিষ্টি দিয়ে বলে একজন কেউ তাকে মিষ্টিটি দিয়েছে উপহার হিসেবে।

তার পাঁচ মিনিট পরে এক লোক তার সাথে এসে কথা বলতে শুরু করে। লোকটা তাকে পরিচয় দেয় পুরনো গাড়ির ব্যাবসায়ি বলে। প্রথম দিকে কথা বলতে কার্লা একটু ইতস্তত বোধ করেছিল কিন্তু লোকটি যখন তাকে বলল যে সেও নাকি ছোটবেলায় কার্লার মত এমন নির্যাতিত হয়েছিল তখন কার্লা তার প্রতি সহানুভূতি বোধ করে। কার্লা এমনকি তাকে তার ফোন নম্বর পর্যন্ত দিয়ে দেয়।

এক সপ্তাহ পরে যখন লোকটি তাকে ফোন করে একজায়গায় ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে তখন স্বাভাবিকভাবেই সে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে। লোকটি তাকে তুলে নিতে আসে খুব দামি গাড়ি নিয়ে। এতে সে এতই অভিভুত হয়ে পড়েছিল যে কল্পনাও করতে পারেনি কি ভয়ানক বিপদে সে পড়তে যাচ্ছে। নিজের বাড়িতে কার্লা ছিল বহিরাগত একজন। তার মা সবসময় তার সাথে খারাপ ব্যবহার করত, এমনকি অনেক সময় তাকে ঘর থেকে বের করে দিতে চাইত। এই অবস্থায় কার্লাকে ঘর থেকে পালানোর জন্য রাজি করাতে একটুও বেগ পেতে হয়নি লোকটাকে।

একদিন সে ঠিকই লোকটার সাথে বেরিয়ে পড়লো। লোকটা তাকে নিয়ে তুললো এক বাড়িতে, সেখানে দুইজনের একসাথে কাটলো প্রায় তিন মাস। এই সময়ে লোকটা কখনোই তার সাথে খারাপ আচরন করেনি। তাকে জামা, জুতো, কাপরচোপড় সব কিনে দিত। শুধু তাইনা লোকটা তাকে মাঝে মাঝে ফুল কিনে দিত। অভিজ্ঞতাটা কার্লা জ্যাসিনটোর জন্য ছিল আনন্দের। কিন্তু একইসাথে লোকটার অনেক সন্দেহজনক জিনিসও তার চোখে পড়েছে। যেমন লোকটা মাঝে মাঝেই তাকে ফেলে এক সপ্তাহের জন্য বাইরে চলে যেত। তখন বিভিন্ন মেয়েদেরকে নিয়ে তার ঘরে আসতো লোকটার পরিচিত বন্ধুরা।

এক পর্যায়ে কারলা যখন লোকটাকে সাহস করে ঘটনা জানতে চাইলো তখন লোকটা তাকে তার আসল পরিচয় দিল। লোকটা হচ্ছে বেশ্যাদের দালাল। আস্তে আস্তে কেরালা বুঝতে পারলো তাকে ঠিক কি করতে হবে। কিভাবে তাকে খদ্দেরদের সন্তুষ্ট করতে হবে, কত টাঁকা নিতে হবে, কতক্ষন সময় দিতে হবে ইত্যাদি সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল এইবার কার্লার কাছে।

মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মানবপাচার বহুদিন থেকেই চলে আসছে কিন্তু কার্লা জ্যাসিনটোর এই নির্মম কাহিনি যেন নতুন করে মানুষ পাচারের ভয়াবহ বাস্তবতা মনে করিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। দুই দেশের মধ্যবর্তী সীমান্তে এটা এখন এতই লাভজনক এবং প্রভাবশালী ব্যাবসা যে সহজে এটাকে বন্ধ করা যাচ্ছে না। আমেরিকা এবং মেক্সিকোর কর্তাব্যক্তিরা একমত হয়ে বলেছেন যে, মেক্সিকোর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি ছোট শহর তেনানচিং হচ্ছে এই সেক্স ট্র্যাফিকিং ব্যাবসার মূল কেন্দ্র।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের অ্যাম্বাসেডর সুসান কপেজ জানিয়েছেন, যদিও শহরটির লোকসংখ্যা মাত্র ১৩ হাজার কিন্তু যৌন ব্যাবসা এবং মানব পাচারে জায়গাটি প্রসিদ্ধ। ওই শহরে এটাই মূলত ব্যবসা কিন্তু কাজটা করা হয় নিপুনভাবে নিরবে। দালালেরা কৌশলে একটু গ্রামাঞ্চল থেকে অল্পবয়সি মেয়েদের ধরে নিয়ে আসে, গ্রামের মেয়েরা বুঝতেও পারে না যে তারা কত বড় ফাঁদে পা দিয়েছে। কার্লা ছিল ঠিক এইরকমই একটা ফাঁদে পড়া মফস্বলের মেয়ে।

কার্লার ভাষ্যমতে, এটা ছিল চার বছরের নরক যন্ত্রণার শুরুমাত্র। প্রথম কাজের জন্য আমাকে নিয়ে যাওয়া হল মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় শহর গুয়াদালাহারাতে। আমি সকাল দশটায় শুরু করতাম, শেষ করতাম মধ্যরাতে। প্রতিদিন ৩০ বার করে। এই অত্যাচারের একপর্যায়ে আমি কাঁদতে শুরু করতাম এবং এটা দেখে অনেক পুরুষই মজা পেয়ে হাসত। শেষদিকে আমার কোন অনুভূতি থাকতো না। এইভাবে চলতো দিনের পর দিন।

এইভাবে চার বছর কাটিয়েছে কার্লা। তাকে এক শহরে বেশিদিন রাখতোনা দালালেরা। অনেকগুলো শহর ঘুরে ঘুরে তাকে দিয়ে জোর করে করানো হতো এই কাজ। এইসব কাজে অনেক ঝামেলা হতো অনেকসময়ই, কোনো ভুল করলে তখন তার উপর চড়াও হত দালাল। লোহার চেইন দিয়ে মারা হত আর কিল-ঘুষি-লাথির কথাতো এখানে মামুলি ব্যাপার।

এরপর একদিন ঘটলো এক চমকপ্রদ ঘটনা। কার্লা এবং আরও অনেক মেয়েরা যখন একটা হোটেলে কাজ করছিল তখন সেখানে অতর্কিত হামলা করলো পুলিশ। কার্লা ভেবেছিল এবার হয়তো সে মুক্তি পাবে কিন্তু তার কপাল বরাবরই খারাপ। পুলিশরা তাদেরকে মুক্তিতো দিলোই না বরং নিজেরাই তাদেরকে রুমে আটকে বিভিন্ন কুৎসিত ভঙ্গিতে তাদের ভিডিওচিত্র ধারণ করল। কার্লা বলেন, সেখানে প্রায় ৩০ জন পুলিশ ছিল এবং তারা তাদেরকে দিয়ে কাজ হাসিলের জন্য অনেক হুমকি ধামকি দিয়েছে।

এই চার বছরে বিপদের উপর বিপদ তাড়া করে বেড়িয়েছে কার্লাকে, কারণ এর মধ্যে সে আবার গর্ভবতীও হয়ে পড়েছিল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে সে একটা কন্যা সন্তান প্রসব করে। সেই সন্তানের বাবা ছিল এক দালাল। কিন্তু জন্মের পরপরই তাকে কেড়ে নেয়া হয় কার্লার কাছ থেকে, কারণ মেয়ে সাথে থাকলে ব্যবসা বন্ধ। মেয়ের বয়স এক বৎসর হওয়ার আগ পর্যন্ত কার্লা তার মেয়েকে দেখতে পায়নি।

অবশেষে ২০০৬ সালে মেক্সিকোতে মানুষ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে এক অভিযান চলাকালে মুক্তি পায় কার্লা জ্যাসিনটো। তার বয়স এখন ২৩ বছর। আর দশটা সাধারণ মেক্সিকান নির্যাতিত মেয়েদের মত জীবন কাঁটিয়ে কার্লাও থেকে যেতে পারতো মানুষের অগোচরে। কিন্তু না, জীবন থেকে যে কষ্ট পেয়েছে সেটা যাতে আর কোন নারী না পায় তার জন্য মুখ খুলেছেন কার্লা। তার কণ্ঠ এখন মানুষ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার। সে সারা বিশ্বের মানুষকে বলতে চায় কি নির্মম জীবন তাকে যাপন করতে হয়েছে কিছু নিষ্ঠুর মানুষের পাল্লায় পড়ে। তিনি তার এই নির্যাতিত গল্পের কথা বলতে একটুও ভয় পান না, একটুও লজ্জাও পান না।

আরও জানতে পড়ুন ডেইলি মেইলের এই প্রবন্ধটি

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 3