প্রিয় মানুষের মৃত্যুকে আপনি কিভাবে মেনে নিবেন

আমার প্রিয় বন্ধুটির মৃত্যুর খবরটি আমি প্রথমে কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সে মারা গিয়েছে, এমন তিনটি শব্দের একটা ম্যাসেজ ফেসবুকে পাই। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। তার বয়স মাত্র উনিশ। এইতো কিছুক্ষণ আগে দেখা হলো, কথা হলো, চ্যাট হলো! তখনও পর্যন্ত আমি নিশ্চিত ছিলাম তাকে ম্যাসেজ দিলে উত্তর দেবে।

হ্যা, যেহেতু এটা ছিলো বিষাদের প্রথম পর্যায়। আমি তার মৃত্যুটা মেনে নিচ্ছিলাম না। আমি পুরোপুরি অবিশ্বাস করছিলাম। বিষাদের আরেকটা পর্যায়ে অন্যান্য বন্ধুদেরও এই অবস্থায় দেখতে পাই, তারাও এটা মেনে নিতে পারছে না। তবে তারা কিছু একটা অনুভব করছে বুঝতে পারলাম। ধার্মিক বন্ধুরা তার এই মৃত্যুকে মেনে না নিলেও , তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী সান্ত্বনা খুঁজতে পারছে।
একজন ধার্মিক ব্যক্তি তার বিশ্বাস অনুযায়ী তার প্রিয় ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর স্বর্গ বা বেহেস্তে দেখতে পছন্দ করে। তাদের মতে মৃত্যু মানেই শেষ নয়, এটি পৃথিবীর অস্থায়ী জীবনে অবসান মাত্র। তারা মনে করে তাদের প্রিয় মানুষগুলো মৃত্যুর পরেও আরেকটা জগতে বেচে আছে, তারা এটা ভেবে হয়ত একটা স্বান্ত্বনা পায় যে, পরলোকে তাদের সাথে দেখা হবে।

কিন্তু একজন নাস্তিকের জন্য? নাস্তিকের জন্য মৃত্যু মানেই একটা জীবনের চুড়ান্ত অবসান। পৃথিবীতে হাজার কিছু করে ফেললেও, একজন মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয় না, কিংবা তার মত হুবহু আরেকটা মানুষ বানানো গেলেও কোনভাবেই তাকে আর বানানো সম্ভব নয়। ধার্মিগণ স্বর্গ কিংবা বেহেস্থে গমনের আশায় মৃত্যকে হয়ত সহজে মেনে নিতে পারে, কিন্তু নাস্তিকগণ প্রিয়জনের মৃত্যুকে কিভাবে নেবে? কিভাবে প্রিয়জনের মৃত্যুকে মোকাবেলা করবে?

মৃত্যু নিয়ে মানুষের ভাবনা কেমন হতে পারে, একটা মৃত্যু সংবাদে তাদের মধ্যে কি কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে, পাঠকদের জন্য এ নিয়ে আলোচনা করা একটু চেষ্টা করা যাক। সাধারণত মৃত্যু সংবাদ পেলে মানুষ তা মেনে নিতে পাঁচটি পর্যায় অতিক্রম করে। এগুলো হলো, ১। অস্বীকার ২। উদ্বিগ্নতা ৩। দ্বিধা ৪। বিষাদ ৫। মেনে নেয়া ।

দেখা যাক, এই পর্যায়গুলো কেমন।
১। অস্বীকারঃ
এই অবস্থাটা নির্ভর করে একজন ব্যক্তি মৃত্যু সম্পর্কে কি জানে তার উপর। কিভাবে মৃত্যুর খবরটা পেলো সেটা বড় বিষয় না, হতে পারে এই খবরটা ফোন কলের মাধ্যমে এসেছে এই খবরটা, কিংবা হতে পারে একটা ছোট্ট ম্যাসেজে। তবে মৃত্যুর খবর সবসময় প্রবলভাবে মানুষকে নাড়া দেয়। মৃত্যুর খরব প্রথমেই মানুষ মেনে নিতে পারে না, এটাকে অবিশ্বাস্য মনে করে। মনের এই অবস্থাটাই হলো মেনে না নেয়া বা অস্বীকার অবস্থা । আমাদের মস্তিষ্ক কোনকিছু হারানোর ট্রাজেডিকে সহজে মেনে নিতে চান না। মনের এই অস্বীকার অবস্থাটা সাধারণত একটা প্রমাণ পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের মনে অবস্থান করে। কারও কারও ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তিকে কফিনে দেখার আগ পর্যন্ত এই অবস্থা স্থায়ী হয়।

২। উদবিগ্নতা বা ক্রোধঃ
এই অবস্থাটা হলো মৃত্যু সংবাদ পাবার পর মনের দ্বিতীয় অবস্থা। কেউ কেউ এই উদবিগ্নতা বা ক্রোধ থেকে লম্বা সময় ধরে চলা মৃত ব্যক্তিটির অন্ত্যষ্টিক্রিয়া অংশ নেন না। কেউ কেউ প্রিয় মানুষটির মৃতমুখ দেখে উলাটাপাল্টা আচরণ করেন। কেউ কেউ হাত পা ছুড়ে প্রতিবাদ জানান, হাতের কাছে কিছু থাকলে তা ছুড়ে মারতে চান, বালিশ থাকলে তা ছিন্নভিন্ন করে ফেলেন। এমনকি, কেউ যদি এমন উদবিগ্ন ব্যক্তিকে তার এই ধরনের কাজগুলোকে বাধা দিতে আসে তবে তিনি রেগে যান। মৃত্যু সংবাদের প্রতি মানুষের মনের এ অবস্থাটাই হলো উদবিগ্নতা বা ক্রোধ।

৩। দ্বিধা কিংবা প্রবোধঃ
নাস্তিকের কাছে এ অবস্থাটা কি রকম তা এখনও নিশ্চিত করে। ধার্মিকরা এই অবস্থায় তার প্রিয় ব্যক্তিটির সাথে অন্তত একবার কথা বলার জন্য হলেও তাদের স্রষ্টার কাছে মৃত ব্যক্তিটিকে অন্তত একবার জীবিত পাওয়ার আশা করেন । অবিশ্বাসীরা এই অবস্থাটাকে দুঃস্বপ্নের মত মনে করে, তারা মৃত ব্যক্তির জীবিত অবস্থার সময়ে ফেরত যেতে চান। নাস্তিকগণের যেহেতু প্রার্থনা করার কিংবা চাওয়ার কোন স্বত্বা নাই, তাই এই অবস্থায় তারা আশা করতে থাকেন যেনো এই ঘটনাটা সত্যি না হয়। মৃত্যু সংবাদ হজমের ক্ষেত্রে মনের এই অবস্থাটাকে দ্বিধা কিংবা প্রবোধ বলা যেতে পারে।

৪। বিষাদঃ
এই অবস্থাটা বেশ অস্বস্থিকর। এই অবস্থাটায় মৃত ব্যক্তির স্মৃতিগুলো বেশ ভাবায়, তার জন্য একান্তে কান্না আসে। এই অবস্থায় একজন মানুষ মৃত ব্যক্তিটির সান্নিধ্যকে অনুভব করতে চান তার নিজের মত করে। প্রিয় ব্যক্তিটির ছবির দিকে ঘন্টার পর ঘন্টার তাকিয়ে থাকেন কেউ কেউ, কেউ কেউ প্রিয় মানুষটির লিখাগুলো বারবার পড়েন, নিজের অজান্তেই প্রিয় ব্যক্তির সাথে কথা বলেন। এই অবস্থায় অনেকে সময়জ্ঞাণ হারিয়ে ফেলেন, পরম বেদনা অনুভব করেন। যে চলে গেছে, হারিয়ে গেছে সে কি আর ফিরে আসে? আসে না। মৃত্যু নিয়ে মানুশের মনের এই অবস্থাটাই হতে বিষাদ। ব্যক্তি ভেদে বিষাদের এই স্টেজটা ভিন্ন হলেও, কম বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

৫। মেনে নেয়াঃ
দীর্ঘ বিষাদের পর মনের মধ্যে মেনে নেয়ার অবস্থাটা আসে। অনেক অনেক কান্নাকাটির পর এঁকো সময় দিনগুলো স্বাভাবিক হয়ে আসতে শুরু করে। এমনকি বিষাদগ্রস্থ মানুষটিও এঁক সময় স্বাভাবিকভাবেই হাসতে পারেন। বিগত ব্যক্তির স্মৃতি মনে পড়লেও চোখের পানির সাথে সাথে মুখে হাসি আটকে থাকে না তখন। সূর্যদোয় অবলোকন, বৃষ্টিস্নান উপভোগ, ইত্যকার উপভোগ্য ব্যপারগুলোও তখন স্বভাবিক হয়ে আসে। দিনে দিনে আনন্দ এসে বিষাদের জায়গাটাকে এসে দখল করে নেয়। এক সময় মৃত ব্যক্তিটিকে মনে পড়লেও আর কান্না আসে না, বরং সহজেই হাসা যায়। প্রিয় মানুষটির বিয়োগ তখন আর দুঃখময় হয়ে উঠে না। মনের এই অবস্থাটা হলো মেনে নেয়া।

প্রিয় মানুষের মৃত্যু সংবাদকে মেনে নেয়ার জটিল এই অবস্থাকে মোকাবেলা করার জন্য নাস্তিকগণ কি কি করতে পারেন তা নিয়ে সামান্য আলকপাত করা যাক এবার,

১। নিজের জন্য সবচেয়ে ভাল কোনটি তা খুঁজে বের করুনঃ
একটা মৃত্যুকে সহজে মেনে নেয়ার জন্য আপনাকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি কি মৃত্য ব্যক্তির অন্ত্যষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেবেন? ধর্মীয় হলেও অংশ নিতে পারেন নির্দ্বিধায় যদি তা আপনাকে স্বান্তনা দিতে সহায়তা করে।

তবে ভেবে চিনতে সিদ্বান্ত নিন, এতে আপনারই ভাল হবে। অনেকের কাছে অন্ত্যুষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেয়াটা মৃত্যুকে মেনে নেয়াকে সহজ করে দেয়। আপনাকে এও ভাবুন যে, প্রিয় মানুষটিকে কফিনে দেখলে কেমন লাগবে। এই দৃশ্যটি কি আপনাকে মৃত্যুকে সহজভাবে নিতে সাহায্য করবে? না কি বরং তা আপনার মনকে আরও বিমর্ষ করে দেবে? আপনার প্রিয় ব্যক্তিটিকে কবরে নামানো হচ্ছে, কিংবা তার দেহাবশেষের ছাই বাতাসে উড়ে যাচ্ছে, এই দৃশ্যগুলো আপনাকে কেমন নাড়া দেবে? এই প্রশ্নগুলো নিজেকে আগে থেকে করে রাখতে পারলে একটা মৃত্যুকে মেনে নিতে অনেক সহজ হবে। হ্যা, ব্যক্তিভেদে ব্যপারগুলো ভিন্নভাবে নাড়া দিতে পারে। যদি মনে হয় উপরের ব্যপারগুলো আপনাকে খুব কষ্টে ফেলে দেবে, তাহলে কে কি মনে করলো তা না ভেবে এগুলো থেকে বিরত থাকাটাই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।

২। ব্যস্ত হয়ে যাবার চেষ্টা করুনঃ
যদি আপনি ক্রোধ পর্যায়ে খুব বেশি আঘাত পেয়ে থাকেন, তাহলে আপনার উচিত হবে কোন কিছুতে মগ্ন হয়ে যাওয়া। নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য কাছের কোন বন্ধুর কাছে বেড়াতে যেতে পারেন, ডাইরী কিংবা ব্লগ লিখতে পারেন কিংবা। তবে সবচেয়ে ভাল উপায় হলো, কোথাও বেড়াতে যাওয়া। মোদ্দাকথা, নিজেকে সার্বক্ষনিক একটা ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে থাকুন, তাহলে প্রিয়জনের বিয়োগটাকে অন্তত ভালভাবে মোকাবেলা করতে পারবেন।

৩। যা ইচ্ছে তাই করুনঃ
যত যাই হোক, সত্যিকার অর্থেই প্রিয় মানুষের বিয়োগ খুব সহজে মেনে নেয়া যায় না। বেড়াতে গিয়েও দেখবেন বিগত মানুষটির কথা বারবার মনে পড়ছে, আপনাকে পীড়া দিচ্ছে। মাঝে মধ্যে নিজের প্রতি রাগও লাগতে পারে। যদি এরকম হয় তাহলে তখন আপনার যা ইচ্ছে হয়, তাই করুন। হাতের কাছের প্লেটটি, ফুলদানিটি কিংবা যেকোন কিছুকে যদি ভেঙে ফেললে আপনার রাগ কমবে বলে মনে করেন, তাহলে কোনকিছু চিন্তা না করে ভেঙে ফেলুন। সারাদিন বিছানায় পড়ে থেকে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হলে, তাই করুন। তবে, যদি কখনো আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে সাথে সাথে অবশ্যই একজন মানসিক ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে ফেলুন দ্রুততার সাথে।

৪। একটা রুটিন করুনঃ
প্রিয়জনের মৃত্যুতে যদি আপনি খুবই বিষাদগ্রস্থ হয় পড়েন তাহলে কোনকিছুতে মনঃসংযোগ করাটাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। আপনার নিত্যদিনের কাজগুলোতে অমনযোগীতা তৈরী হবে খুব সহজেই। কিন্তু আমাদের নিত্যদিনকার কাজগুলো তো করতেই হবে, তাই না! তাই, হতাশা, বিস্বাদ এড়ানোর জন্য নিত্যদিনের কাজগুলোর একটা রুটিন তৈরী করে ফেলুন। রুটিন করতে পারলে, একটা কাজ শেষ করার পর মনের মধ্যে পরবর্তী কাজ করার একটা প্রবনটা খুব সুক্ষভাবে তৈরী হবে। এতে করে একটা রুটিন আপনাকে ধীরে ধীরে নিত্যদিনের কাজগুলোকে সঠিকভাবে করার মধ্য দিয়ে হতাশা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

৫। বলুন, চিরবিদায়ঃ
যা কিছুই করুন না কেন, ভাবেন না কেন, এটা সত্য যে আপনার প্রিয় মানুষটি আর কখনোই ফিরে আসবে না। তাই, তাকে চিরবিদায় জানানোই হচ্ছে সর্বোত্তম। নিজের মনকে শক্তভাবে প্রবোধ দিন; যে চলে গেছে সে আর কখনোই ফিরবে না, তাকে বিদায় দিন। আপনার প্রিয় মানুষটির নামে একটি মোমবাতি জ্বালান, এটাকে নিজের সামনে নিভে যেতে দেখুন মোমবাতিটি ফুরিয়ে গেলে শেষবারের মত বলুন, চিরবিদায়। অথবা প্রিয় মানুষটির কবরের পাশে গিয়ে দাড়ান, সেখানে তাকে শেষবারের মত বিদায় জানিয়ে আসুন। যদি তাকে পোড়ানো হয়, তাহলে শশ্মানে গিয়ে বিদায় জানিয়ে আসুন। বিদায় জানানো হয়েগেলে তার ইমেইল এড্রেস, মোবাইল নাম্বার অর্থাৎ তার সাথে যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে মুছে ফেলুন একে একে। নিজেকে তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলুন। শেষবারের মত বলুন, চির বিদায়।

প্রিয় মানুষগুলোর বিদায় একেকজনের কাছে একেকভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরী করে। হয়ত আমার উপরের কথাগুলো সকলের ক্ষেত্রে সত্যি নাও হতে পারে, হুবহু কাজ নাও করতে পারে। তবে, আশা করি উপরের লিখাগুলো প্রিয় মানুষের বিয়োগকে মেনে নিতে কিছুটা হলে সাহায্য করতে পারে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “প্রিয় মানুষের মৃত্যুকে আপনি কিভাবে মেনে নিবেন

  1. ভাল লেগেছে দাদা…
    বিশ্বাস

    ভাল লেগেছে দাদা…

    বিশ্বাস কিংবা দর্শন যেমনই হোক, প্রিয় মানুষকে শেষ বিদায় দেবার কষ্টটা আসলে একই… তবু এই চিরন্তন নিয়তিকে সবাই যথাসম্ভব সহজভাবে নিতে পারুক এটাই কাম্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

23 + = 31