৬০ লাখ মরিয়া হাতের সামনে হেফাজতকে হেফাজত করবে কে!

একটা কথা খুব সাধারন মানুষরাও এখন বুঝে। সেটা হল বাংলাদেশ বেঁচে আছে মুলত তিনটা বড় অর্থনৈতিক খুঁটির উপর। কৃষি, রেমিটেন্স আর গার্মেন্টস। এর মধ্যে কোন একটি খুঁটি নড়বড়ে হলে দেশ যে গর্তে পড়বে তা থেকে আর উঠতে পারবেনা। গত কয়েকমাসে দেশে যে পরিমান হরতাল আর রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছে তাতে নানান ভাবে এই তিনটই ক্ষতিগ্রস্ত। খুব বাস্তব কারনে গার্মেন্টস সেক্টর সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত খাত। এক অবিচ্ছেদ্য শেকলে আটকা পুরা মালিক শ্রমিক এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্য আরও শত শত ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান।

সহজ ভাবে যেকোন একটি চালু গার্মেন্টসের কথাই ভাবা যাক। মালিকপক্ষ এমনিতেই শ্রমিককে কম মজুরি দেয়। গার্মেন্টসের শ্রমিকরা প্রয়োজনের অর্ধেকের চেয়েও কম বেতন পায়। অনেকটা লাইফ লাইন দিয়ে রোগী বাচিয়ে রাখার মত তারা নিজেদের বাচিয়ে রেখে দেশের ধমনিতে তাজা রক্ত সরবরাহ করে যাচ্ছে বিরতিহীন ভাবে। অনেকেরই হিসেবে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি মালিক পক্ষের জন্য অসম্ভব না। কিন্তু এটাতে কম মূল্যে পোশাক তৈরি করতে পারে, প্রতিযোগী দেশের সাথে অর্ডার পাওয়ার যুদ্ধে টিকে থাকে আর শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দিলে যা লাভ থাকতো এক্ষেত্রে লাভ থাকে তার চেয়ে বেশী। লাভ বেশী থাকলেও এই মালিকপক্ষ বড় নাছোড়বান্দা।

পাশাপাশি হরতাল, অবরোধ, রাজনৈতিক সহিংসতার কারনে বিদেশিরা অর্ডার কমিয়ে দেয়নি মোটেই। প্রধানত তিনটি কারনে অর্ডার বেড়েছে। প্রথমত চীন ভারী শিল্পের বিনিয়োগ বাড়িয়ে তার দেশ থেকে পোশাক উৎপাদন, রফতানি সবই প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে সারা বিশ্বের তৈরি পোশাকের মোট বাজারের ৩৭.৩৫% দখলে থাকা সেই সব অর্ডার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্থান, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনামে চলে আসছে। দ্বিতীয়ত চিনের রপ্তানি বাজারের ভাগ বাংলাদেশে আসা ছাড়াও ১ বিলিয়নের বেশী মানুষের দেশ চীন নিজেই বাংলাদেশের জন্য বিশাল ডিউটি ফ্রি বাজারে পরিনত হয়েছে। তৃতীয় কারণটিও বাজারের সাথে সম্পৃক্ত। আমেরিকা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বৃহৎ বাজার। ফলে ২০০৯ সালে যখন আমেরিকায় চরম আকারে মন্দা শুরু হল আর গণ্ডায় গণ্ডায় অর্ডার কমে যাওয়া বা বাতিল হওয়া শুরু করল তখন অনেকেই ভেবেছিলেন বাংলাদেশের অর্থনীতির বারটা বাজল বলে। কিন্তু তা হয়নি, কারন ২০০৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত আমেরিকায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমান ২৯% থেকে কমে ২৩% অর্থাৎ ৬% কমে গেলেও এই সময়ে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নতুন বাজার ৬% থেকে বেড়ে হয় ১২%। ফলে প্রকৃত রপ্তানির পরিমান আগের মতই আছে যা বর্তমানে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

এখন কথা হল দেশে তৈরি পোশাকের অর্ডার আসলে মালিকের লাভ হয়, দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা পায় আর লাইফ লাইনে বেঁচে থাকা সেই সব শ্রমিকরা কোনরকমে বেচেও থাকতে পারে। কিন্তু যদি অর্ডার মত এসব পোশাক তৈরি করা না যায় তাহলে!
হরতাল অবরোধ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারনে তিন ভাবে তৈরি পোশাকের উৎপাদন ব্যাহত হয়।

এক- যেসব কাচামাল ব্যবহৃত হয় সেগুলি কিছু স্থানীয় সরবরাহকারীরা যোগান দেয় আর বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে যা সরবরাহ করা হয় তার কাঁচামালও বিদেশ থেকেই আসে। ফলে দেখা যায় হরতাল, অবরোধ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারনে দেশী-বিদেশী কোন সরবরাহকারীই ফ্যাক্টরিতে সময় মত এবং পরিমান মত কাঁচামাল যোগান দিতে পারছে না।
দুই- যদিওবা কষ্টে শিষ্টে কাঁচামাল জোগাড় করে ফ্যাক্টরিতে পোশাক তৈরি করা শুরু হল, তখন বিভিন্ন রকমের কমার্শিয়াল কাজ সম্পাদন করতে হয় ব্যাংক সহ নানান ধরনের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। অত্যন্ত জরুরী কমার্শিয়ালের এই কাজগুলো হরতাল, অবরোধ, রাজনৈতিক সহিংসতার কারনে চরমভাবে ব্যাহত হয়।
তিন- তারপরও এই শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার কর্মীর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় অবশেষে পোশাকের উৎপাদন শেষ হলেও সেটা সেই একই কারনে ফ্যাক্টরিতে পড়ে থাকে। পোশাকগুলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানোর জন্য বিমান বন্দর অথবা সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত সেগুলো পৌছাতে হয়, তা আর সম্ভব হয়না।

ফলাফলঃ ফলাফল অনেক অনেক। কিন্তু প্রান্তিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা হল দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করা সেই শ্রমিকরা। মালিক পক্ষের যেকোনো কারন বা অকারন আর্থিক লাভ-লোকসানের মূল্য দিতে হয় যাদের। তাদের চাকরি যায়, বেতন বন্ধ থাকে। প্রায়ই তারা মালিকের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠে। তখন নানান প্রচার চালানো হয় তাদের দিয়ে কেউ করাচ্ছে বা বিদেশী চক্রান্ত এরকম অনেক কিছু, নিশ্চিত ভাবে সাধারন মানুষ এমনকি শ্রমিকদের অনেকেও কিছু বলতে পারেনা; কিন্তু হেফাজতে জামপি (হেফাজতের জামাত এবং বি এন পি) গত বেশ কয়েকমাস ধরে দেশজুড়ে যে হরতাল, অবরোধ রাজনৈতিক সহিংসতা এবং তাণ্ডব চালাচ্ছে এবং তার কারনে যে গার্মেন্টস শিল্প চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর এর ফলে তার আধখাওয়া পেটে খাবারের পরিমান আরও কমে যাচ্ছে, অপুষ্টির শরীর আরও রোগা হয়ে যাচ্ছে এটা কিন্তু দেশের সাধারন মানুষ তথা গার্মেন্টসের সবচেয়ে অসচেতন শ্রমিকটিও স্পষ্ট বুঝে। এর উপর আছে হেফাজতে জামপির ১৩ দফা। সেই ১৩ দফার প্রতি তারা সবাই জোর সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ফলে সাধারন মানুষের কথা বাদ। ৬০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিকের সরাসরি প্রতিপক্ষে পরিনত হয়েছে এই হেফাজতে জামপি। এখন যদি জান বাঁচানোর জন্য এরা মাঠে নেমে আসে তাহলে জামপি বাদ হেফাজতকে হেফাজত করবে কে? হেফাজতের জনসভায় লোক সমাগম ২ লাখ না, ৫ লাখ না, ৫০ লাখ বা তিন কোটি হোক – সমস্যাটা তাদের বেঁচে থাকার না। এই ৬০ লাখ লোকের সমস্যাটা জীবন মরনের। ৬০ লাখ মরিয়া হাতের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কি হেফাজতের আছে? জামাত-বিএনপির আছে!!!!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “৬০ লাখ মরিয়া হাতের সামনে হেফাজতকে হেফাজত করবে কে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 16 = 20