তিব্বতীদের প্রশ্নে মাও সেতুঙ

তিব্বতীদের প্রশ্নে অনেকেই বর্তমান চীনের নীতিকে কমিউনিস্ট তৎপরতা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। তারা তিব্বতীদের অধিকার হরণের জন্য কমিউনিস্টদের দায়ী করেন। ইতিহাসের গভীর পর্যবেক্ষণ না থাকায় এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য বিচারে মনোযোগী না হওয়ায় তারা বর্তমান ধনবাদী চীন রাষ্ট্রের ছদ্মবেশধারী প্রতিক্রিয়াশীল শাসকদেরই কমিউনিস্ট জ্ঞান করেন। কিন্তু এটা ভুল। ধনবাদীদের ইতিহাস চর্চ্চার একযোখা দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বেরিয়ে এসে যদি সামগ্রিকতাকে আমলে নিতে পারেন, তাহলে সত্যানুসন্ধানে এ লেখাটি আপনাকে সাহায্য করবে। চীনদেশের বিপুল জনগণের নেতা কমরেড মাও সেতুঙের দুটি লেখা থেকে এখানে চুম্বক অংশ তুলে ধরা হয়েছে। পাঠক এ থেকে তিব্বত সম্পর্কে সত্যিকারের কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে জানতে পারবেন।

তিব্বতী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা (কিছু অংশ)। মাও সে-তুঙ
[৮ অক্টোবর ১৯৫২ বেইজিঙে গণতান্ত্রিক চীনা প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে তিব্বতের শাঙদু (শামদো) অঞ্চলের যে প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁদের অভ্যর্থনা জানানোর সময় মাও সে-তুঙ আলাপচারিতায় মগ্ন হন। ২২ নভেম্বর ‘পিপল্‌স ডেলি’ পত্রিকায় প্রকাশিত তার বিবরণ পরে যুক্ত হয় Selected Works of Mao Tse-Tung, Volume VII-এ। পশ্চিমবঙ্গের ‘মন্থন’ সাময়িকীর জন্য এখান থেকে চুম্বক অংশ অনুবাদ করেছেন অমিতাভ সেন।]

১। কম্যুনিস্ট পার্টি ধর্মগুলোকে রক্ষা করার একটা কার্যনীতি গ্রহণ করেছে। বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের, এক ধর্মের বা অন্যধর্মের বিশ্বাসীদের, একইভাবে রক্ষা করা হবে এবং তাদের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা হবে। আজ আমরা ধর্মরক্ষা করার এই কার্যনীতি গ্রহণ করেছি এবং ভবিষ্যতেও আমরা এটা চালিয়ে যাব।

২। ধর্মের থেকে ভূমি পুনর্বণ্টনের সমস্যাটা আলাদা। যে সব অঞ্চলে হান-জনগণ বাস করে সেখানে ভুমি পুনর্বন্টন করা হয়ে গেছে এবং সেসব অঞ্চলে ধর্মও সুরক্ষিত। যেসব এলাকায় সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর বসবাস সে সব জায়গায় ভূমি বন্টন করা হবে কি হবে না তা তারাই ঠিক করবে। এই মুহূর্তে তিব্বতে ভূমি পুনর্বণ্টন করার কোনো প্রশ্নই আসে না। ভবিষ্যতে সেখানে ভূমিপুনর্বণ্টন হবে কিনা তা আপনারাই ঠিক করবেন, তাছাড়া আপনাদের নিজেদেরই ওই পুনর্বণ্টনের কাজটা করা উচিত। আমরা আপনাদের হয়ে ভূমি পুনর্বণ্টন করে দেব না।

৩। চুক্তি* অনুসারে একটা সামরিক ও প্রশাসনিক কমিটি গড়ে তোলার এবং তিব্বতি সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠিত করার কথা হয়েছিল। যে কারণেই হোক না কেন আপনারা ভয় পাচ্ছেন বলে আমি তিব্বতে কর্মরত কমরেডদের বলেছি ওই চুক্তি লাগু করা থেকে বিরত থাকতে। চুক্তি অবশ্যই কার্যকারী করতে হবে। কিন্তু যেহেতু আপনারা ভয় পাচ্ছেন, এটাকে পিছিয়ে দিতেই হবে। আপনারা যদি এবছর ভয় পান আমরা পরের বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করব। যদি আপনারা পরের বছরও সন্ত্রস্ত থাকেন তাহলে আমাদের এই চুক্তি লাগু করার জন্য তার পরের বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

৪। তিব্বত একটা কম জনসংখ্যার বেশ বড়ো একটা এলাকা। এখানকার বর্তমান জনসংখ্যা ২০-৩০ লক্ষ থেকে বেড়ে ৫০-৬০ লক্ষ হওয়া দরকার। পরে এই জনসংখ্যা বেড়ে এককোটির বেশি হলে ভালো হয়। সাথে সাথে এখানকার অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও বিকাশ হওয়া প্রয়োজন। সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে স্কুল, সংবাদপত্র, সিনেমা, ইত্যাদি। এর মধ্যে ধর্মও পড়ে। অতীতের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকরা, সে ওয়িং বংশের রাজারাই হোক বা চিয়াং কাইশেক হোক, সবাই আপনাদের ওপর অত্যাচার ও শোষণ চালিয়েছে। তারা আপনাদের জনসংখ্যাকে বাড়তে দেয়নি, আপনাদের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে, আপনাদের সংস্কৃতির বিকাশে বাধা দিয়েছে।

কম্যুনিস্ট পার্টি জাতিসত্তাগুলির সমতার নীতিকে কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে : পার্টি আপানাদের ওপর অত্যাচার বা শোষণ চালাতে চায় না, আপনাদের সাহায্য করতে চায়- আপনাদের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে চায়। যখন গণমুক্তি ফৌজ তিব্বতে ঢুকেছিল তখনও আপনাদের সাহায্য করার নীতিকে কার্যকর করার জন্য ঢুকেছিল। প্রথমদিকে এর উপস্থিতি হয়তো তেমন সাহায্য দিতে পারেনি এবং পরবর্তী তিন চার বছরেও তেমন কোন বড়ো সাহায্য হয়তো দিতে পারেনি।

যাই হোক না কেন, পরবর্তীকালে তারা সহায়তা করতে পারবে- এটা নিশ্চিত। যদি কম্যুনিস্ট পার্টি আপনাদের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিকাশে কোন সহায়তা না দিতে পারে তাহলে কম্যুনিস্ট পার্টির আদৌ কোনও দরকার নেই… আমি খুশি যে আপনারা এসেছেন। আগামী কয়দিন আপনারা নানজিং, সাংহাই, তিয়ানজিন, গুয়াংদং ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল ঘুরে দেখতে পারেন। এখন থেকে যদি তিব্বতের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন রকমের মানুষ, সে ধর্মযাজক বা সাধারণ যে কোন মানুষ হোক না কেন, আরও বেশি বেশি করে এখানে এসে একদম ভিতরের অঞ্চলগুলো ঘুরে দেখে, তাহলে চীনের বিভিন্ন জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে ঐক্য ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও দৃঢ় ভাবে গড়ে উঠতে পারে।

টিকা : * তিব্বতের শান্তিপূর্ণ মুক্তির জন্য যা যা পদক্ষেপ নেওয়া হবে সেই বিষয়ে কেন্দ্রীয় গণ-সরকার এবং তিব্বতের স্থানীয় সরকারের মধ্যে ২৩ মে, ১৯৫১ সালে এক চুক্তি হয়। এখানে সেই চুক্তির কথা বলা হয়েছে।

সংখ্যালঘু জাতিসত্তার প্রশ্ন। মাও সে-তুঙ
(সংখ্যালঘু জাতিসত্তার প্রশ্নটি মাও সেতুঙ ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭ তে লিখিত On the correct handling of contradictions among the people প্রবন্ধের The question of the minority nationalitities অংশে আলোচনা করেছেন। Selected Readings from the Works of Mao Tse-Tung, 1971 থেকে একই অনুবাদক এর চুম্বক অংশটা তুলে ধরেছেন।)

আমাদের দেশে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর জনসংখ্যা তিন কোটিরও বেশি। মোট জনসংখ্যার মাত্র ছয় শতাংশ হলেও, কিন্তু যতটা অঞ্চল জুড়ে এরা বসবাস করে তার আয়তন সমস্ত চীনের প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট শতাংশ। এদের সঙ্গে হান জনগণের ভালো সম্পর্ক রাখা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। হানদের বড়ো জাতিসুলভ জাত্যাভিমান দূর করার মধ্যেই এই সমস্যার চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে।

একই সাথে, যেখানে যেখানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ রয়ে গেছে সেগুলোকেও দূর করতে হবে। হান জাত্যাভিমান ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ- এই দুইই জাতিসত্তাগুলোর ঐক্যের পক্ষে ক্ষতিকর, জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের এই বিশেষ দুই রূপকে অবশ্যই পরিহার করা দরকার। এই ব্যাপারে আমরা ইতিমধ্যেই কিছু কিছু কাজ করেছি।

সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলি যেসব এলাকায় বাস করে তার বেশিরভাগ জায়গাতেই আমরা এদের মধ্যেকার সম্পর্কগুলোকে উন্নত করতে পেরেছি, যদিও অনেক সমস্যাই অসমাধিত থেকে গেছে। কিছু কিছু অঞ্চলে হান জাত্যাভিমান ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ- দুইই বেশ ভালো পরিমাণে রয়ে গেছে যা আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। গত কয়েক বছর ধরে, সব জাতিসত্তাগুলোর সাধারণ মানুষের চেষ্টার ফলে সংখ্যালঘু জাতিদের এলাকাগুলোর বেশিরভাগ জায়গায় গণতান্ত্রিক সংস্কার ও সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের কাজ সম্পূর্ণ করা গেছে।

তিব্বতে এখনও গণতান্ত্রিক সংস্কারের কাজ করা হয়নি, কারণ সেখানকার অবস্থা এখনও তার জন্য পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি। কেন্দ্রীয় গণসরকারের সাথে তিব্বতের স্থানীয় সরকারের যে ১৭ দফা চুক্তি হয়েছে সেই অনুযায়ী সমাজ ব্যবস্থার সংস্কার অবশ্যই করা হবে। কিন্তু কখন করা হবে তার উপযুক্ত সময় ঠিক করবে তিব্বতের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এবং তাদের নেতৃত্বদায়ী সর্বজনবিদিত ব্যক্তিরা এবং এই ব্যাপারে কারও ধৈর্য্য হারানো উচিত নয়।

এটা ঠিক করা হয়েছে যে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চলাকালীন তিব্বতে গণতান্ত্রিক সংস্কারের কোনো কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে না। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়েও ঐ কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে কিনা তা তখনকার অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করে দেখতে হবে।*

টিকা : * যে সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার আগেই তিব্বতে গণতান্ত্রিক সংস্কারের কর্মসূচী শুরু করা হয়েছিল। ১৯৫৯-এর ১৯ শে মার্চ স্থানীয় সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ও তিব্বতী সমাজের ওপরের অংশ, সাম্রাজ্যবাদী ও বিদেশী হস্তক্ষেপকারীদের সংযোগে দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে, এক সামগ্রিক সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। লামা থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ সহ দেশপ্রেমী তিব্বতিদের সক্রিয় সহায়তায় গণমুক্তি ফৌজ দ্রুত এই বিদ্রোহকে দমন করে। তখন তিব্বতের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে গণতান্ত্রিক সংস্কার শুরু হয়, যার ফলে সেখানকার জনগণ অন্ধকারতম ও বর্বরতম ভূমিদাসপ্রথা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

68 − = 63