পুঁজিবাদ এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরির আন্দোলন

‘কখন যে শ্রমিকের নিজেকে বিক্রি করে দেয়ার সময়সীমা শেষ হবে এবং শুরু হবে তার নিজস্ব সময়।’১

গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলন এবং ন্যূনতম মজুরি সম্পর্কে নানা মত
অবশেষে সরকারী মজুরি বোর্ড গামেন্টস শ্রমিকদের বেতন নূন্যতম ৫৩০০ টাকা ধার্য করেছে। দেশের প্রায় পয়তাল্লিশ লক্ষ শ্রমিক এই ঘোষণায় সন্তুষ্ট নন। তারা খোলামেলাই বলছেন, গত কয়েক বছরে জিনিষপত্রের মূল্য, বাসাভাড়া ও অন্যান্য ব্যয়বৃদ্ধির অনুপাতে, তাঁদের প্রকৃতমজুরি মোটেই বাড়লো না, বরং কমলো। গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ এই মজুরি-বৃদ্ধিকে না মানার ঘোষণা দিয়েছে। তাঁরা হুমকি দিয়েছে, কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ শ্রমিকদের সামনে একটাই পথ- হয় নতি স্বীকার কর, নতুবা না খেয়ে মর।

মাত্র কয়েকদিন পূর্বে বিজিএমইএ মাত্র ৫০০ টাকা মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিল। তার বিনিময়ে তাঁরা সরকারের কাছে সাতটি বিশেষ আর্থিক সুবিধা দাবী করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা শ্রমিকের বেতন মাত্র ৫০০ টাকা বাড়ানোর বিনিময়ে শতগুন বেশী সুবিধা আদায় করে নিতে চাইছেন। গার্মেন্ট শিল্পটি শুরু থেকেই রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল সুযোগসুবিধা পেয়ে আসছে। ফলে পত্রিকার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শূণ্য থেকে অনেকে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিকে পরিণত হয়েছেন, একাধিক শিল্প গড়ে তুলেছেন, ত অর্জিত আয়ের মোটা অংশ জমা রেখেছেন বিদেশী ব্যাঙ্কে এবং বিদেশে দ্বিতীয় আবাসও গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তাঁরা এদেশের শাসন ক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ।

ড. ইউনুস বলেছেন, “শ্রমিক সুখী না হলে বিশ্বে শীর্ষস্থানে যেতে পারবে না পোশাক শিল্প।” তিনি পোশাক শ্রমিকদের মজুরি ঘণ্টাপ্রতি ৫০ সেন্ট বা আধা ডলার দেয়ার প্রস্তাব করেছেন। এই হিসেবে, আটঘণ্টা শ্রমদিবসের জন্য দৈনিক মজুরি হয় ৪ ডলার বা প্রায় ৩২০ টাকা। একজন শ্রমিক মাসে ২৬/২৭ দিন কাজ করে থাকেন। সুতরাং একমাসে তার মজুরি দাঁড়ায় প্রায় আট হাজার টাকা। এদেশের পুঁজিতন্ত্রের আরেক চিন্তাশীল প্রতিনিধি সিপিডি’র কর্তাব্যক্তিবর্গও মাসিক আট হাজার টাকা মজুরিকেই যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করেছেন। তবে তারা বর্তমানে ছয় হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব দিয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে গার্মেন্ট সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক পোষাক কোম্পানী ও দেশীয় পুঁজিতন্ত্রের জন্য স্বর্ণডিম্ব প্রসবকারী এক সেক্টর। অথচ এই সেক্টরের অর্ধভুক্ত-জীর্ণশীর্ণ শ্রমিককে নিজেদের সামান্য অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করতে হচ্ছে, দমননীতির বলি হতে হচ্ছে। তাঁরা একাই তাঁদের অকুতোভয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, প্রায় পয়তাল্লিশ লক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিক এক সুবিশাল শক্তি, যাঁদের অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় নেই। এই শ্রমিকদের বিপুল সংখ্যাধিক অংশই গ্রাম থেকে আসা কিশোরী ও তরুণী। এদের সাথে নানা সম্পর্কের গভীর বন্ধনে জড়িয়ে আছেন গ্রামের কয়েক কোটি দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ। তাজরীন গার্মেন্ট ও রানা প্লাজার মত ঘটনায় আগুনে পুড়ে ও ভবন ধ্বসে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের মৃত্যু এবং তাঁদের অনিরাপদ পশুসুলভ জীবন ইতিমধ্যেই গ্রামপর্যন্ত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে গার্মেন্ট পুঁজিতন্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট অনাস্থা, ঘৃণা ও বিক্ষোভের সঞ্চার করেছে। গার্মেন্ট এদেশের শ্রমজীবীদের মাংস-মজ্জা-রক্ত চুষে খাওয়ার এক নির্মম ব্যবস্থা- সেটা আজ এদেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণায় পরিণত হয়েছে। ক্ষুধা ও অভাবের যন্ত্রণা সত্ত্বেও এরা তাদের সন্তানদের আর গার্মেন্ট নামক মৃত্যুকূপে পাঠাতে চান না। প্রায় এই অর্ধকোটি শ্রমিকের করুণ জীবন ও সাহসী লড়াই দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে গণমানুষের বিপুল সমর্থন ও সহানুভূতি অর্জন করেছে, অন্যান্য দেশের শ্রমজীবীর মানুষের মধ্যে সংগ্রামী প্রভাব বিস্তার একেবারেই করেনি, নিশ্চিতভাবে এমনটা বলা যাবে না। ড. ইউনুস বা সিপিডি’র কর্তাব্যক্তিবর্গ নিঃসন্দেহেই এই সামগ্রিক বাস্তবতাকে তাঁদের বিবেচনায় নিয়েছেন। তাঁরা চাইছেন শ্রমিক অসন্তোষের সমাপ্তি, এ প্রশ্নে একটা আপসরফা, এভাবে শ্রমশক্তি লুণ্ঠন-প্রক্রিয়ায় নতুনতর গতিবেগ। পুঁজিবাদের এইসব চিন্তাশীল প্রতিনিধিরা অন্তত এই সত্যটি বুঝেছেন যে, শ্রমিকদের কিছুটা মজুরি-বৃদ্ধি মোটেই এই সোনার ডিম পাড়া শিল্পটিকে বিপদে ফেলবে না, বরং তার বিকাশে সহায়ক হবে। এছাড়াও যথেষ্ট কমে রফা- এ বিষয়টাকেও নিশ্চয় তাঁরা মাথায় রেখেছেন।

এদেশে প্রগতিশীল-বামপন্থী এবং শ্রমিকশ্রেণীর সপক্ষের শক্তি হিসেবে যাঁরা পরিচিত, তাদেরও একাংশ শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি মাসিক আট হাজার টাকা দাবী করেছেন। এদের কারো কারো মতে, আট হাজার টাকা মূল বা বেসিক মজুরি। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ জাতিসংঘ নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমাকে চিহ্নিত করেছেন। জাতিসংঘের দারিদ্র্যসীমার মানদণ্ডে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি হতে হয় কমবেশী ১৮ হাজার টাকা, যা কোনো কোনো সংগঠনের দাবী। কোনো কোনো বাম-নেতৃত্ব বলেছেন, শ্রমিক ও তার স্ত্রী উভয়েই কাজ করে; তাই আট হাজার টাকাই গ্রহণযোগ্য কেননা দুজন মিলে ১৬ হাজার টাকা আয় করতে পারে। অনেকে বলছেন, আট হাজার টাকা দাবী এদেশে শ্রমের উৎপাদনশীলতা, শ্রমিকের জীবন, বেকারত্ব ইত্যাদির বিবেচনায় যুক্তিযুক্ত। কেউ কেউ আবার পাঁচ মণ বা ২০০ কেজি চালের মূল্যের সমতূল্য হিসেবে আট হাজার টাকা মজুরি দাবী করেছেন। কিন্তু অধিকাংশই তাদের অবস্থানের বিপরীতে সিপিডি কর্তৃপক্ষ ও ইউনুস প্রমূখের অভিন্ন অবস্থানকে পর্যালোচনায় আনেননি।

১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া সামরিক জান্তার শ্রমমন্ত্রী নুর খানের কমিশন, আট ঘণ্টা শ্রমদিবসের জন্য একজন শ্রমিকের নিম্নতম মূল মাসিক মজুরি ১২৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল, যা ছিল সমসাময়িক বাজারদরে প্রায় পাঁচ মণ চালের মূল্যের সমান। আয়ুব স্বৈরতন্ত্রবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকশ্রেণীর বিপুল উত্থান, আপসহীন জঙ্গী সংগ্রাম এবং ঘেরাও আন্দোলনের প্রচণ্ডতা সামরিক সরকারকে বাধ্য করেছিল এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে। অথচ আজ বাংলাদেশে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি মাত্র তিন হাজার টাকা, যা দিয়ে মাত্র ৭৫ কেজি চাল পাওয়া যায়। ১৯৬৯-এ দুনিয়া কাঁপানো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক যা অর্জন করেছিল, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিগত ৪৩ বছরে তাঁদেরই স্বদেশী বাঙালী পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণী তার প্রায় সবটুকুই কেড়ে নিয়েছে। বাধ্যতামূলক ওভারটাইমের নামে শ্রমিকের প্রকৃত শ্রমঘণ্টাও বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নেই, নেই টয়লেটের সুব্যবস্থা। শ্রমিকদের পক্ষে কোনো আইন বা রাষ্ট্রীয় রক্ষাকবচ নেই, বরং রয়েছে ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পুলিশ। মালিকদের স্বেচ্ছাচারের উপর শ্রমিকদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে গার্মেন্টে লক্ষ লক্ষ অসহায় শিশু-কিশোর মেয়েদের ১২/১৪ ঘণ্টা খাটিয়ে সমস্ত শক্তিসামর্থ্য নিংড়ে নিয়ে রাতের আঁধারে চরম অনিরাপত্তায় রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। কাজ শেষে রাতের আঁধারে ক্ষুধা ও আতঙ্কে কাতর হাজার হাজার মেয়ে পথ বেয়ে উর্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে- এ এক অতিপরিচিত দৃশ্য। তারা যে গভীর রাতে গুণ্ডা ও পুরুষতন্ত্রের আক্রমণের শিকার হতে পারে এবং বাস্তবে প্রতিনিয়ত হয়ও- পুঁজিপতিরা এ সম্পর্কে নির্বিকার। বাঁচার দাবীতে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে আন্দোলনকারী এইসব অপুষ্টি-আক্রান্ত শীর্ণকায় মেয়েদের পুলিশ দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়, তাদেরকে লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস-রাবার বুলেট ছোঁড়া হয়, যা রাস্তায় বেওয়ারিশ কুকুর পেটানোর কথাই মনে করিয়ে দেয়। অথচ পুঁজিপতিদের দেয়া হিসাব অনুসারে এই গার্মেন্ট শ্রমিকরাই বছরে দুই হাজার কোটি ডলার, প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার কোটি টাকার বিদেশী মুদ্রা আয় করে থাকে। এমনই এক অবস্থায় বুভুক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিকদের আরো একদফা মজুরির দাবীতে পথে নামতে হয়েছে।

গার্মেন্ট শিল্প সাম্রাজ্যবাদের পলিসির বাস্তবায়ন
১৯৮০ দশক থেকে মার্কিনের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো গোটা বিশ্বের উপর চাপিয়ে দেয় এক নতুন ধরণের শ্রমবিভাগ- নিপীড়িত দেশসমূহের দরিদ্র জনগণ সস্তায় শ্রম করে মূল্য উৎপাদন করবে এবং তা থেকে সরাসরি মুনাফা লুটবে বহুজাতিক একচেটিয়া কোম্পানীগুলো। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটসহ প্রযুক্তির নতুনতর বিকাশ এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক সস্তা শ্রমশক্তি লুণ্ঠন-পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হিসেবে আমাদের দেশসহ বিশ্বের বহু দেশে শুরু হয় পোশাক কারখানা বা গার্মেন্ট। সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলো পোশাক সেলাইয়ের ফরমায়েস দেয়, গার্মেন্ট মালিকরা এদেশী শ্রমিকদের সস্তা শ্রমশক্তি ব্যবহার করে ফরমায়েস মতো পোশাক সেলাই করিয়ে তা উপরওয়ালাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে এদেশের শ্রমিকদের শ্রমে উৎপন্ন লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ চালান হয়ে যায় সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে। গার্মেন্ট মালিকদের ভূমিকা ঠিকাদারসুলভ। কিন্তু এর বিনিময়ে তাঁরা লাভ করেন বিপুল মুনাফা, পরিণত হন টাকার কুমীরে।

অতিমুনাফার উন্মাদনায় গত দুই-আড়াই দশকে গার্মেন্ট সেক্টরে জমায়েত হয়েছে সমাজের প্রধানতঃ মধ্যশ্রেণী থেকে আসা ভাগ্যান্বেষীর দল। রাষ্ট্র তাঁদেরকে সর্বাত্মক সুবিধা নিশ্চিত করেছে। রাষ্ট্র-রাজনীতি-ক্ষমতা-লুটপাট-শোষণ-পুঁজি সবকিছু মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে এবং এ সমস্ত কিছুর অসহনীয় ভার চেপে বসেছে শ্রমিকশ্রেণীর উপর।

ধনী, আরো ধনী হওয়ার দানবীয় লালসায় গার্মেন্ট শিল্পে প্রথম থেকেই শুরু হয় জীবনমরণ প্রতিযোগিতা, পাল্লা দিয়ে দৌড়। আবাসিক এলাকায়, বাসগৃহে, পাড়ায়-মহল্লায়, পুকুর-বিল-খাল ভর্তি করে, বনবিভাগের জমি দখল করে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, পরিবেশ ধ্বংস করে, তড়িঘড়ি বিল্ডিং খাড়া করে, দূর্বল বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে যে যেখানে যেভাবে সম্ভব দ্রুতগতিতে চালু করে গার্মেন্ট। রাজউক, পরিবেশ দপ্তর, বিদ্যুৎবিভাগ, প্রশাসন মওকা বুঝে বাছ-বিচার ছাড়াই দেদার ঘুষ-দূর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ভুঁইফোঁড় পুঁজিপতিরা যা চায় সেটাই অনুমোদন করে। এভাবে যে চরম পুঁজিবাদী অব্যবস্থা, নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচার, তারই ফল হচ্ছে, তাজরীন গার্মেন্ট-এর মতো একের পর এক আগুন লাগা, রানা প্লাজার মতো বিল্ডিং ধ্বসে পড়া এবং হাজার হাজার শ্রমিকের জীবননাশ।

বিগত কয়েক দশকে একদল অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী গড়ে উঠেছে, যাঁরা নিজেদের স্বার্থ থেকে বিরামহীনভাবে গার্মেন্ট শিল্পের মহিমা কীর্তন করে বেড়াচ্ছেন। ইউনুস বলছেন, গার্মেন্ট শিল্পে পৃথিবীর শিখর দখলের কথা। বর্তমানে শিখরে রয়েছে চীন, পোশাক উৎপাদন বছরে কমপক্ষে বাংলাদেশের আটগুণ। সুতরাং শীর্ষস্থান দখল করার অর্থ গার্মেন্ট শ্রমিক সংখ্যার আজকের তুলনায় কমপক্ষে আটগুণ বৃদ্ধি। বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি মানুষকে গার্মেন্ট শ্রমিকে পরিণত হতে হবে। গোটা বাংলাদেশ পরিণত হবে সাম্রাজ্যবাদীদের সস্তা শ্রমশক্তি লুণ্ঠনের কারখানায় ও কারাগারে।

সত্যিকার জাতীয় অর্থনীতিকে হতে হবে সাম্রাজ্যবাদের পুরোপুরী নিয়ন্ত্রণমুক্ত। এর উদ্দেশ্য হতে হবে, দেশ ও জনগণের যা প্রয়োজন তা উৎপাদনের জন্য পরিকল্পিতভাবে জনগণের শ্রমকে নিয়োগ করা, জনগণের শ্রমউদ্ভুত সম্পদকে দেশের মধ্যে রাখা, দেশ ও জনগণের অগ্রগতির স্বার্থে তা ব্যয় করা। রপ্তানী-আমদানী নির্ভর অর্থনীতি কখনোই স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি নয়। এই অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে ও তাদের প্ররোচনায়। দেশের জনগণের চাহিদা পূরণের লক্ষ্য দ্বারা চালিত একটি প্রকৃত পরিকল্পিত জাতীয় অর্থনীতিই পারে মুদ্রাস্ফীতি-মূল্যস্ফীতি-বেকারত্ব থেকে জনগণকে রক্ষা করতে এবং ধাপে ধাপে জনগণের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করতে। ১৯৪৯-পরবর্তী চীন এবং ১৯২০-৩০ দশকের সোভিয়েত ইউনিয়নে এমনটিই হয়েছিল, যে কারণে সেই ১৯৩০-দশকে রবীন্দ্রনাথও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমৃদ্ধিকে প্রশংসায় অভিষিক্ত না করে পারেননি। বাস্তবে গার্মেন্ট কোনো জাতীয় উদ্যম নয়। গার্মেন্টে উৎপাদন হয় সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনায় ও প্রয়োজনে। গার্মেন্ট মালিকরা প্রায়শই দাবী করেন, এই শিল্প নাকি দেশে বেকারত্ব কমাচ্ছে। বাস্তবে, এই শিল্প দেশের মানুষের দারিদ্র্য ও অভাবের সুযোগ নিয়ে তাদের সস্তা শ্রমশক্তিকে মির্মমভাবে লুণ্ঠন করছে। শ্রমিকের শ্রমসৃষ্ট বিপুল মূল্যকে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে চালান করার মধ্য দিয়ে গার্মেন্ট জনগণের প্রয়োজনের পরিপূরক একটি আত্মনির্ভরশীল দেশীয় অর্থনীতির বিকাশের চাকাটাকে গতিরুদ্ধ করে রেখেছে। এর ফলে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে জনগণের মুক্তির যে প্রকৃত পথ, তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই শিল্প।

পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত সত্য
শ্রমিক যখন মজুরি-বৃদ্ধির দাবীতে আন্দোলনে নামে, তখন পুঁজিপতির দয়া-মানবতা সে চায় না। তার নিজের শ্রমে উৎপন্ন যে সম্পদ পুঁজিপতি আত্মসাত করেছে, তার সামান্য অংশ ফেরত চায় মাত্র। পুঁজিপতি বলে, সে শ্রমিককে তার ‘শ্রমের মূল্য’ দিয়ে দিয়েছে, এর বেশী দিলে সে নিজেই পথে বসবে, কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে- যেমন এখন গার্মেন্ট মালিকরা বলছেন।

আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর পূর্বেই মার্কস পুঁজিবাদের এই মিথ্যাচারকে ফাঁস করে দিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, পুঁজিপতি শ্রমিকের কাছ থেকে যা কেনে তা শ্রমিকের শ্রমশক্তি, শ্রম নয়। পুঁজিপতি শ্রমিককে শ্রমশক্তির মূল্য দেয়। শ্রমের কোনো মূল্য হয় না, কিন্তু শ্রম নতুন মূল্য সৃষ্টি করে।

মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে, বিশ্রাম নেয়, এর মধ্য দিয়ে তার মধ্যে দৈহিক ও মানসিক শ্রমশক্তি সৃষ্টি হয়। “মানুষের শ্রমশক্তি হচ্ছে তার দৈহিক ও মানসিক সামর্থ্যের সমষ্টি, যাকে ব্যবহার করেই সে সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উৎপাদন করে।”২ এই শ্রমশক্তি এমনই যে, ব্যবহার না করলে তা নিজে থেকেই নিঃশেষ হয়ে যায়। এই শ্রমশক্তির উপর ভর করেই গ্রাম থেকে দলে দলে গরীব মানুষ, তাদের ছেলে-মেয়ে-বউ শহরে আসে কাজের খোঁজে। এদের অধিকাংশ নতুন শ্রমিক, কোনো বিশেষ শ্রমদক্ষতা তাদের নেই। এরাই গার্মেন্টে কাজ নেয়।

গার্মেন্ট মালিকরা শিশু, কিশোরী, তরুণী, অল্পবয়স্ক মেয়েদের শ্রমিক হিসেবে পছন্দ করে। তার কারণ, এদের শ্রম করার সামর্থ্য বেশী, এরা তরতাজা, এদের দেহ নমনীয়, দীর্ঘক্ষন একটানা কাজ করতে পারে, না ঘুমিয়ে রাতের পর রাত ওভারটাইম করতে পারে। মেয়ে হওয়ার কারণে তারা অনেককিছু নীরবে সহ্য করতে বাধ্য হয়। পুরুষের তুলনায় নারীদের মজুরিও কম দেওয়া হয়। কারখানার কষ্টকর ও দীর্ঘস্থায়ী শ্রম এবং অব্যাহত অপুষ্টি, কষ্টকর জীবনযাপন তুলনামূলক কম বয়সেই একজন শ্রমিককে অসুস্থ-অক্ষম করে ফেলে। পুঁজিবাদ তার দিকে আর ফিরেও তাকায় না।

প্রকৃতপক্ষে, পুঁজিপতি শ্রমিকের দেহের শ্রমশক্তিকে দিনে আট, দশ, বারো, চৌদ্দ ঘণ্টা ব্যবহারের জন্য সাময়িকভাবে কিনে নেয়, দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক চুক্তিতে।

সাধারণত অন্য যে কোনো পণ্যের বেচাকেনায় ক্রেতা বিক্রেতাকে প্রথমে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করে, পরে তা ভোগের অধিকার লাভ করে। যেমন, একজোড়া জুতার মূল্য দোকানদারকে পরিশোধ করার পরই তা ব্যবহারের অধিকার পায় ক্রেতা। শ্রমিকের শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে তা হয় না। পুঁজিপতি শ্রমিকের শ্রমশক্তিকে পরিপূর্ণভাবে ভোগ করার পর, অর্থাৎ শ্রমিককে দিয়ে তার কারখানায় কাজ করিয়ে নেয়ার পর সপ্তাহ বা মাস শেষে তাকে বেতন দেয়। বাস্তবে পুঁজিপতি সর্বদাই বাকীতে শ্রমিকের শ্রমশক্তি ক্রয় করে। ফলে, পুঁজিপতি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত শ্রমিককে তার অধীনে বাধ্যবাধকতায় ও চাপে আটকে ফেলতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ মজুরি-শ্রম প্রথায় পুঁজিপতি শ্রমিকের শ্রমশক্তি ক্রয় করে এতটুকুই নয়, দাসত্বও আরোপ করে। শ্রমিক তাই স্বাধীন নয়, আধুনিক দাস।

গার্মেন্টে এই দাসত্বের আরোপ বেশী। শ্রমিকের চাকরীর কোনো নিশ্চয়তা নেই, সে সদাসর্বদা ছাঁটাই এবং প্রাপ্য মজুরি-বোনাস থেকে জরিমানা কাটার বা বঞ্চিত হওয়ার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটায়। মাস শেষ হওয়ার পরও মাসের দশ বা পনের তারিখে শ্রমিককে বেতন দেওয়া হয়। ওভারটাইমের পরিশোধও আটকে রাখা হয়। ফলে, যদিও মালিক যখন তখন শ্রমিককে ছাঁটাই করতে পারেন, শ্রমিক ইচ্ছামতো চাকরী ছেড়ে যেতে পারে না।

গার্মেন্ট শিল্পে শ্রমিকরাই সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানীর চাপিয়ে দেয়া সমস্ত বাধ্যবাধকতা ও চাপকে কার্যত বহন করে থাকে। তাঁদেরকেই দিনরাত একনাগাড়ে গাধার খাটুনি খেটে ফরমায়েস বাস্তবায়িত করতে হয়। এভাবে তারা শুধু দেশীয় পুঁজিতন্ত্রই নয়, সাম্রাজ্যবাদেরও মজুরি-দাসে পরিণত হয়েছে।

অন্যান্য সমস্ত পণ্যের মতোই শ্রমিকের শ্রমশক্তির নামক পণ্যটিরও দু ধরণের মূল্য রয়েছে- ১) বিনিময়-মূল্য বা মূল্য, দুই) ব্যবহার-মূল্য বা উপযোগিতা। বিক্রেতা তার পণ্য বিক্রয় করে বিনিময়-মূল্যে বা মূল্যে, কিন্তু ক্রেতা ক্রয় করে পণ্যের ব্যবহার মূল্য বা উপযোগিতা। একজন জুতা বিক্রেতা তার জুতা বিক্রয় করে ধরা যাক, সঠিক মূল্য দুইশ’ টাকায়। এখানে দুইশ’ টাকা জুতার বিনিময়-মূল্য বা মূল্য। কিন্তু ক্রেতা জুতা ক্রয় করে তা ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের পা সুরক্ষিত করা এবং আরাম পাওয়ার জন্য। জুতার এই যে ব্যবহারিক উপযোগিতা, সেটা তার ব্যবহার-মূল্য। একই পণ্য, বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে দুই ভিন্ন ধরণের মূল্যের বিনিময় ঘটায়, দুজনের কাছে দুই ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়।

শ্রমশক্তির ক্ষেত্রেও, শ্রমিক পুঁজিপতির কাছ থেকে নেয় শ্রমশক্তির বিনিময়-মূল্য, কিন্তু পুঁজিপতি ক্রয় করে শ্রমশক্তির ব্যবহার মূল্য, শ্রমশক্তিকে তার কারখানায় ব্যবহারের কর্তৃত্ব সে লাভ করে। পুঁজিবাদের সাধারণ নিয়মে, গার্মেন্ট মালিক শ্রমিকের এই শ্রমশক্তিকে দৈনিক দশ-বার-চৌদ্দ ঘণ্টা নিজ কারখানায় ব্যবহার করার মাধ্যমে পোশাক উৎপাদন করে। পুঁজিপতি কর্তৃক শ্রমশক্তির এই যে ব্যবহার তথা শ্রমশক্তির উপযোগিতা বা ব্যবহার-মূল্য- সেটাই হচ্ছে শ্রম, পুঁজিবাদে যার একচ্ছত্র মালিক পুঁজিপতি। অর্থাৎ শ্রমশক্তি যখন ব্যবহৃত হয়, তখনই শ্রমের উদ্ভব ঘটে। ব্যবহারের মাধ্যমেই শ্রমশক্তি ফলপ্রদ হয়ে ওঠে, অন্যথায় তা নিজে থেকে নিঃশেষিত হয়। পুঁজিবাদে পুঁজিপতি কারখানা, যন্ত্রপাতি, উৎপাদন-উপকরণ- এককথায় উৎপাদন উপায়সমূহের মালিক। মালিকানার এই অধিকার-বলেই সে শ্রমিকের শ্রমেরও মালিক, শ্রমিককে শ্রম করতে হয় পুঁজিপতির জন্য। শ্রমশক্তি বিক্রির চুক্তির পর তার ব্যবহারের উপর তথা শ্রমের উপর শ্রমিকের আর কোনো কর্তৃত্ব থাকে না। শ্রমিকের শ্রমে যে পণ্য বা পোশাক উৎপন্ন হয়, তার মধ্যেই শ্রমিকের শ্রম নতুন উৎপন্ন মূল্য হিসেবে ঘনীভূত থাকে। পুঁজিপতি এই পণ্য ও তার মধ্যে ঘনীভূত শ্রমিকের শ্রমের মালিকে পরিণত হয়। পুঁজিবাদ এভাবেই শ্রমিকের কাছ থেকে তার শ্রমকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং পুঁজিপতির নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানায় নিয়ে আসে। পুঁজিবাদে শ্রমিকের সাথে শ্রমের এই যে বিচ্ছিন্নতা, তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শোষণের চাবিকাঠি। পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রানাধীন রাষ্ট্রের সংবিধানের সারবস্তু হচ্ছে পুঁজিপতিগোষ্ঠীর এই বুর্জোয়া অধিকারকেই বলপূর্বক কার্যকরী করা। ব্যক্তিমালিকানার মতাদর্শের কারণে সাধারণ মানুষও এই বুর্জোয়া অধিকারকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়।

প্রকৃতপক্ষে, শ্রমিকও উৎপাদন উপায়ের অন্তর্ভূক্ত, কেননা শ্রমিকের শ্রম ছাড়া উৎপাদন অসম্ভব। পুঁজিবাদে এই শ্রমিক অর্থাৎ যে মানুষের মাধ্যমে উৎপাদন হয় এবং যে উৎপাদন-উপায়ের নির্ধারক উপাদান, সেই একমাত্র উপেক্ষিত- যন্ত্র, কারখানা, উৎপাদন উপকরণ কোনোটাই নয়।

সমস্ত মূল্যের উৎস শ্রম। তাই পণ্যের মূল্য- ঐ পণ্য উৎপাদনে সামাজিক মাপকাঠিতে যতটুকু গড়পড়তা শ্রম ব্যয় হয়েছে- তা দিয়ে নির্ধারিত হয় এবং তা পরিমাপ করা হয় ঐ পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গড়পড়তা শ্রমঘণ্টা দিয়ে। পণ্যের উৎপাদনে ব্যয়িত মোট গড়পড়তা শ্রমঘণ্টাকে যখন টাকায় প্রকাশ করা হয়, তখন তা পণ্যের বাজারদর বা দাম। সাধারণভাবে, বাজারে যোগান ও চাহিদার উপর নির্ভর করে পণ্যের দাম তার প্রকৃত মূল্যের উপরে বা নীচে ওঠানামা করে। আমাদের আলোচনায় ধরে নেয়া হয়েছে, পণ্যের দাম তার প্রকৃত মূল্যকে প্রকাশ করে।

ধরা যাক, একজন পোশাক শ্রমিক মেশিনে দৈনিক ১০ ঘণ্টা শ্রমের মাধ্যমে যে পোশাক উৎপাদন করল সেই পোশাকের মোট মূল্য ১৩০০ টাকা। এখানে এই সমস্ত সংখ্যা ব্যাখ্যার সুবিধার্থে ধরা হয়েছে মাত্র। উপরোক্ত পোশাক তৈরীতে কাপড়-বোতাম-সুতা-বকরমসহ যাবতীয় উৎপাদন-উপকরণ, যন্ত্রপাতি ও কারখানার ক্ষয়সাধন এবং অন্যান্য কর্মচারীদের বেতন বাবদ মালিকের মোট যে খরচ, তা ৩০০ টাকা। এই টাকা পোশাকের মূল্যের সাথে যোগ করে পুঁজিপতি তার বিক্রয়মূল্য ঠিক করে। সুতরাং, এখানে কেবলমাত্র শ্রমিকের ১০ ঘণ্টা শ্রমের ফলে নতুন উৎপাদিত মূল্য = ১৩০০-৩০০ = ১০০০ টাকা। ১০০০ টাকা = ১০ শ্রমঘণ্টায় উৎপন্ন মূল্য = ‘শ্রমের মূল্য’। পুজিপতি যদি শ্রমিককে তাঁর ১০ ঘণ্টা ‘শ্রমের মূল্য’ দিয়ে দেয়, তাহলে ১০০০ টাকাই দিয়ে দিতে হয়। পুঁজিপতির কোনো মুনাফা থাকে না। কিন্তু পুঁজিপতি শ্রমিককে ‘শ্রমের মূল্য’ দেয় না। শ্রমিককে দেয় তার শ্রমশক্তির মূল্য, যা শ্রম দ্বারা উৎপন্ন মূল্যের একটা ভগ্নাংশ মাত্র।

অন্যান্য সমস্ত পণ্যের মতোই শ্রমিকের শ্রমশক্তির মূল্যও পুঁজিবাদ নির্ধারণ করে তা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের পরিমাণ বা শ্রমঘণ্টা দিয়ে। ১০ ঘণ্টা কাজ করার পর শ্রমিকের শ্রমশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। সে ঘরে ফেরে, খাওয়া দাওয়া করে, ঘুমায়, বিশ্রাম নেয়, এভাবে তার দেহে আবার শ্রম-সক্ষমতা বা শ্রমশক্তি সঞ্চিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত এক দিনের বাসাভাড়া, স্ত্রী-সন্তানদের খাদ্য, আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিসপত্র ইত্যাদি। সবকিছু মিলিয়ে ধরা যাক মোট খরচ ২০০ টাকা, যা শ্রমিকের শ্রমশক্তি উৎপাদনের ব্যয় তথা শ্রমশক্তির মূল্য। এই ২০০ টাকা উৎপাদন করতে শ্রমিক ব্যয় করেছে ২ ঘণ্টার শ্রম। পুঁজিপতি শ্রমিককে শ্রমশক্তির মূল্য হিসেবে ২০০ টাকা দিয়ে দেয়। বাকী ৮ ঘণ্টার শ্রমে উৎপন্ন মূল্য, যা ৮০০ টাকার সমান, তা পুঁজিপতি শ্রমিককে দেয় না। এটাই শ্রমিকের অপরিশোধিত শ্রম বা আত্মসাতকৃত শ্রম বা উদ্বৃত্ত শ্রম, যা থেকে সৃষ্টি হয় উদ্বৃত্ত মূল্য বা মোট মুনাফা, যা পুঁজিপতি আত্মসাত করে। কিন্তু এর সবটুকু মালিকের পকেটে যায় না। যেমন একজন গার্মেন্ট মালিককে ব্যাংক থেকে ঋণ করা টাকার সুদ দিতে হয়; রাজনৈতিক নেতা-আমলা-মাস্তান-গবেষক-বুদ্ধিজীবী এইসব পরজীবীদের পুষতে হয়; পুলিশ, রাজউক, বিদ্যুৎ অফিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুষ দিতে হয়, রাষ্ট্রকে কর দিতে হয় ইত্যাদি। এই সুদ-ঘুষ-কর-পোষার টাকা পুরোটাই আসে শ্রমিকের শ্রমের আত্মসাতকৃত অংশ বা উদ্বৃত্ত মূল্য থেকে। এছাড়া অন্য কোনো উৎস নেই। ধরা যাক, এই সুদ-ঘুষ-কর-পোষার খরচ মোট ১০০ টাকা, যা শ্রমিকের ১ ঘণ্টার শ্রমে সৃষ্ট মূল্য। সুতরাং মালিকের নীট মুনাফা = ৮০০-১০০ = ৭০০ টাকা। সাধারণভাবে গার্মেন্ট মালিকের এই ৭০০ টাকাই নীট মুনাফা হিসেবে পকেটে ভরার কথা। কিন্তু এই শিল্প পুরোপুরি রপ্তানীমুখী, গার্মেন্ট মালিক এখানে সাম্রাজ্যবাদের আজ্ঞাবহ ঠিকাদার, অর্ডার-সরবরাহকারী। তাই সাম্রাজ্যবাদও এখানে মুনাফার ভাগীদার। তাদের পকেটেই মুনাফার বড় অংশটা যায়।

গার্মেন্ট উৎপাদিত পোশাকের পুরোটাই পাঠানো হয় ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন পোশাক কোম্পানীগুলোর কাছে। এরাই তথাকথিত Buyer বা মূল ক্রেতা। এদের হাত হয়ে বড় বড় একচেটিয়া খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে উৎপাদিত পোশাক উন্নত দেশগুলোর মানুষের কাছে বিক্রি হয়। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোও তাদের দেশে প্রবেশের জন্য এই পোশাক থেকে বিপুল শুল্ক আদায় করে।

উৎপন্ন পোশাক দেশের বাইরে যাওয়ার পর সেগুলোর কোনো পরিবর্তন হয় না। খোদ পোশাকে কোনো নতুন শ্রম বা কোনো নতুন মূল্য যুক্ত হয় না। অর্থাৎ গার্মেন্ট শ্রমিক যে ৮০০ টাকার উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন করেছিল, বিদেশী শোষকদের মুনাফা তা থেকেই যোগানো হয়। এভাবে বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিক, এজেন্ট, বিভিন্ন দুর্নীতিবাজ পরজীবী, বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানী, একচেটিয়া খুচরা বিক্রেতা, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র- এই তাবৎ শোষকচক্র এদেশের শ্রমিকের শ্রমের ফসল আত্মসাত করে, শ্রমিককে খুবলে খুবলে খায়। এভাবেই এদেশের শ্রমিকশ্রেণীকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে, তাদের উপর চেপে বসে থাকা দেশী-বিদেশী শোষকচক্রের বিশাল সব পাহাড়কে। সুতরাং গার্মেন্ট শিল্পের মাধ্যমে প্রায় অর্ধকোটি শ্রমিকের শ্রমসৃষ্ট মূল্য বা সম্পদ অনবরত অন্য দেশে চলে যাচ্ছে, দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সাম্রাজ্যবাদের বেদীমূলে জলাঞ্জলী দেয়া হচ্ছে।

উদ্বৃত্ত মূল্য বা মুনাফার ভাগবাটোয়ারা
দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, একটি পোলো শার্ট কানাডায় ১৪ মার্কিন ডলারে বিক্রি হলে বাংলাদেশ থেকে তার ক্রয়মূল্য পড়ে ৫.৬৭ ডলার। অর্থাৎ কানাডার বাজারে সার্টটির বর্ধিত মূল্য = ১৪.০০-৫.৬৭ = ৮.৩৩ ডলার (৫৯.৫% বা প্রায় ৬০%)। এই ৬০ শতাংশে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে বিদেশে যাওয়ার পরবর্তী আরো কিছু আনুষঙ্গিক ব্যয়, পরিবহন, সংস্থাপন ব্যয় ইত্যাদি। এগুলোকে পুরো বিবেচনায় নিয়েই ধারণা করা যেতে পারে, এদেশে শ্রমিকের শ্রমে উৎপন্ন মোট মূল্যের কত বড় অংশ আত্মসাত করে বহুজাতিক কোম্পানী, সেখানকার একচেটিয়া খুচরা বিক্রেতা ও সেই দেশের রাষ্ট্র প্রভৃতি। পত্রিকায় প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, এদেশের শ্রমিক মজুরি হিসেবে পায় মাত্র ১২ সেন্ট, যা পণ্যের মোট মূল্যের মাত্র ০.৮৫ শতাংশ, শতকড়া ১ ভাগেরও কম। বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিক পায় শ্রমিকের তুলনায় বহুগুন, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের তুলনায় অনেক কম। মুনাফার এই কম অংশটাই এদেশী গার্মেন্ট মালিকদের অতি অল্প সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকার অধিপতিতে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশ থেকে মোট প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার কোটি টাকা মূল্যের পোশাক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে রপ্তানী হয়। এর ৬০ শতাংশ = ৯৬০০০ (ছিয়ানব্বই হাজার) কোটি টাকা। এই বিপুল অংকের টাকার বড় অংশটাই এদেশী শ্রমিক-সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্য থেকে আসে। আমরা শুধুমাত্র কল্পনা করতে পারি, এদেশের শ্রমিকের উৎপন্ন কী বিশাল পরিমাণ মূল্য বা সম্পদ পোশাকশিল্পের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর বিদেশে চলে যায়। এর সাথে, গার্মেন্টের ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ হিসেবে ফেব্রিকস, সুতা, এক্সেসরিজ ইত্যাদি যা কিছু এদেশে উৎপন্ন হয়, তা বিবেচনায় নিলে উপরোক্ত পরিমাণটা আরো বেশ কিছুটা স্ফীত হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের শ্রমিকের শ্রমশক্তি যে কত সস্তা, তা আমরা একটা জিন্স শার্টের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং বাংলাদেশে, এই দুই দেশের উৎপাদন ব্যয়ের তুলনা থেকে অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারি।
ধরণ ——————— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ——— বাংলাদেশ
পোশাকের রং ও ধোলাই খরচ —— ০.৭৫ ডলার —— ০.২০ ডলার
উপকরণ ব্যয় ————— ৫ ডলার ————– ৩.৩০ ডলার
শ্রমিকের মজুরি ———— ৭.৪৭ ডলার ———– ০.২২ ডলার
মোট ব্যয় ——————- ১৩.২২ ডলার ——— ৩.৭২ ডলার
সুত্র : ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান রাইটস। দৈনিক প্রথম আলো : ৪ মে, ২০১৩

এখানে লক্ষ্যণীয়- শ্রমিকের মজুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকের মজুরি যেখানে ৭.৪৭ ডলার, সেখানে বাংলাদেশে একই কাজের জন্য শ্রমিকের মজুরি মাত্র ২২ সেন্ট। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকের মজুরি এদেশের ৩৪ গুণ। এই মজুরির পার্থক্য থেকেই সৃষ্টি হয় পোশাকের রং-ধোলাই খরচ এবং উপকরণের খরচের মধ্যকার পার্থক্য, কারণ পোশাকের রং-ধোলাই করা বা উপকরণ উৎপাদন সবকিছুই শ্রমের ফসল। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের শ্রমিকের এত সস্তা শ্রমশক্তি সাম্রাজ্যবাদীদের এদেশে গার্মেন্ট শিল্প গড়ে তুলতে প্রলুব্ধ করেছে এবং একই কারণে ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’স্বরূপ কাপড়-এক্সেসরিজ প্রভৃতি সহায়ক শিল্প গড়ে তোলা হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজার সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া বহুজাতিক পোশাক কোম্পানীগুলোর দখলে। মহাশক্তিধর সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের শাসকও এরাই। একচেটিয়া ক্ষমতা ও অর্থের জোরে এরাই আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম, মুনাফা, মুনাফার বন্টন সবকিছু নির্ধারণ করে এবং নিজেদের অতিমুনাফা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর সর্বদাই চেষ্টা থাকে এদেশে উৎপন্ন পোশাকের দাম কমানোর। কিন্তু এ সত্ত্বেও এদেশের গার্মেন্ট মালিকদের মুনাফা কমে না। যদি কমতো, তাহলে গত আট-দশ বছরে গার্মেন্ট শিল্পের কলেবর এত ফুলে ফেঁপে উঠতো না, এর ব্যপ্তি কমে যেত বা বন্ধ হয়ে যেত। ফুলে ফেঁপে উঠেছে, কারণ এদেশের গার্মেন্ট পুঁজিপতিদেরও মুনাফা বেড়েছে। বাস্তবে, সমস্ত বর্ধিত শোষণ-লুণ্ঠনের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এদেশের শ্রমিকশ্রেণীর উপর। সবমিলিয়ে, শ্রমিক নিঃস্ব হচ্ছে, তার জীবনযাত্রা নীচে নেমে যাচ্ছে অথচ দুধের সরটুকু ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছে দেশী-বিদেশী শোষকচক্র- নিজেদের আয়তন, একচেটিয়াত্ব ও ক্ষমতা অনুসারে।

পুঁজিপতির সর্বোচ্চ মুনাফা এবং শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি
মুনাফার অন্তহীন ক্ষুধা- পুঁজিবাদের নিয়ম। মুনাফা সর্বোচ্চ করার তাড়নায় পুঁজিবাদ দুটো পথ অবলম্বন করে- শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমিয়ে দেয়া এবং শ্রমঘণ্টা বাড়িয়ে দেয়া।

গার্মেন্টে ওভারটাইম বাধ্যতামূলক, যা দাসশ্রমতূল্য। পোপ পর্যন্ত গার্মেন্ট শ্রমিকের জীবনকে ক্রীতদাসতুল্য হিসেবে অভিহিত করতে বাধ্য হয়েছেন। একদিকে রাষ্ট্র আইন করে শ্রমদিবস আট ঘণ্টা করেছে, অন্যদিকে শ্রমিককে এই আট ঘণ্টার জন্য নামমাত্র মজুরি দিয়ে বাধ্যতামূলক ওভারটাইমের মাধ্যমে প্রকৃত শ্রমদিবস ১২/১৪ ঘণ্টায় প্রলম্বিত করা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে এই দীর্ঘ শ্রমদিবসের বিরুদ্ধে সচেতনতা বা প্রতিবাদ অনুপস্থিত। এই দীর্ঘ খাটুনিকে শ্রমিকের বিধিলিপি হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে যেন!

ধরা যাক, পুঁজিপতি শ্রমিকের দৈনিক শ্রমঘণ্টা ১০ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ১৫ ঘণ্টা করেছে বাধ্যতামূলক ওভারটাইম চাপিয়ে দিয়ে। শ্রমিকের শ্রমঘণ্টা দেড়গুণ বেড়েছে। আগে শ্রমিকের মজুরি ছিল ২০০ টাকা, যা তার দুই ঘণ্টা শ্রমসৃষ্ট মূল্যের সমান। সেই হিসেবে শ্রমিকের বর্ধিত মজুরি হতে হবে ৩০০ টাকা, যা ৩ ঘণ্টার শ্রমসৃষ্ট মূল্যের সমান। অপরিশোধিত শ্রমঘণ্টা = ১৫-৩ = ১২ ঘণ্টা। সুতরাং মালিকের উদ্বৃত্ত মূল্য দাঁড়ায় শ্রমিকের ৮ ঘণ্টার শ্রমসৃষ্ট মূল্যের বদলে ১২ ঘণ্টার শ্রমসৃষ্ট মূল্য। পুঁজিপতির মুনাফা দেড়গুণ বেড়ে যায়। পুঁজিপতি যদি শ্রমিককে ওভারটাইমের জন্য সামান্য কিছুটা বেশী হারে মজুরি দেয়ও, যা গার্মেন্টে দেয়া হয়ে থাকে, তা হলেও তার বর্ধিত মুনাফার তেমন কোনো হেরফের হয় না। একারণেই পুঁজিতন্ত্রের পছন্দ হচ্ছে শ্রমিকের বাধ্যতামূলক ওভারটাইম।

অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি পুঁজিবাদে অনিবার্য ঘটনা। গত তিন-চার বছরে বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দাম বহু বেড়ে গেছে, প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। কিন্তু গার্মেন্ট শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি তিনহাজার টাকায় স্থির রয়েছে। অর্থাৎ তিনহাজার টাকায় পূর্বে বাজার থেকে যতটুকু জিনিষপত্র কেনা যেত, এখন তা দিয়ে কেনা যায় তার অর্ধেক। সুতরাং শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমে গেছে, অর্ধেকে নেমে এসেছে। এখন তার মজুরি ৩/৪ বছর আগের ১০০ টাকার সমান। কিন্তু শ্রমিকের খাটুনির হার কমেনি বরং বেড়েছে। যদি তার খাটুনির হার ৩/৪ বছর পূর্বের স্তরেও ধরা হয় তবে তার মজুরি ১ ঘণ্টা শ্রমসৃষ্ট মূল্যের সমান। সুতরাং মালিক কর্তৃক শ্রমিকের আত্মসাতকৃত শ্রমঘণ্টা = ১০-১ = ৯ ঘণ্টা, যা পূর্বে ছিল ৮ ঘণ্টা। মালিকের মুনাফা বেড়ে যায়। এভাবেই পুঁজিবাদের সাধারণ নিয়মে নিজে থেকেই শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমতে থাকে।

গার্মেন্ট শিল্পে শ্রমিক দেশী ও বিদেশী- যৌথ শোষণের শিকার। ফলে শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান শুধু নীচেই নামছে। শ্রমিক সবচেয়ে নীচু মানের অপুষ্টিকর খাবার খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে, জানোয়ারের খোয়াড়ের মতো ছোট এক কামরায় একদল শ্রমিক গাদাগাদি করে ঘুমায়, দরিদ্র পিতামাতার দিকে সে ফিরেও তাকাতে পারে না, রোগে চিকিৎসা পায় না, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা তথা পরিবারের অধিকাংশকে শ্রমে নিয়োজিত হতে হয়, সন্তানদের জন্য একই খারাপ ভবিষ্যত অপেক্ষা করে, কারো কোনো ফুরসত থাকে না, কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললে কোনো উপায় থাকে না। বাস্তবে কারখানায় দীর্ঘ সময়ব্যপী শ্রম, যাওয়া-আসা, কোনোমতে খাওয়া এবং কয়েক ঘণ্টা সামান্য ঘুম- এ ছাড়া শ্রমিকের কোনো জীবন নেই। তার নিজস্ব কোনো সময় অবশিষ্ট থাকে না।

গার্মেন্টের একজন মেয়ে-শ্রমিক অন্ধকার থাকতেই ঘুম থেকে ওঠে, ঠেলাঠেলি করে কোনোমতে রান্না করে দু’মুঠো খেয়ে কারখানার উদ্দেশ্যে দৌড় দেয়, বেশীর ভাগ মেয়ে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে সকাল আটটার আগেই কারখানায় হাজির হয়, বাধ্যতামূলক ওভারটাইমসহ রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত খাটে, তারপর কয়েক কিলোমিটার হেঁটে আবাসস্থলে ফেরার পর রান্না করে খেয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত বারোটা/একটা বেজে যায়। মাত্র সাড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানোর পর ভোররাত থেকে শুরু হয় পরের দিনের ক্রীতদাসীর জীবন। কখনো কখনো বাধ্যতামূলক নাইটডিউটিও যুক্ত হয়, এমনকি বিরতিহীনভাবে রাতদিন খাটতে হয়। “বস্তুতই, ‘শেষ মাংসপেশী, স্নায়ু ও রক্তবিন্দু চুষে না নেওয়া পর্যন্ত’ রক্তশোষক তাকে ছাড়ে না।”৩

ঢাকা শহরে এমন অনেক গার্মেন্ট শ্রমিকদের মেস আছে, যেখানে ছোট কামরায় ছোট এক চৌকির উপর কয়েকজন মেয়ে ঘুমায়, মেঝেতে অচেনা কয়েকজন ছেলে শ্রমিক, চৌকির নীচেও ঘুমে অচেতন শ্রমিক। বিবাহিত শ্রমিকরা যারা পরিবারসহ ঢাকায় থাকে, তারা একটা ছোট কামরায় স্বামী স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, কখনো আরো দু’একজনসহ থাকতে বাধ্য হয়। শ্রমিকদের স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবন থাকে না বললেই চলে।

এভাবেই সর্বোচ্চ মুনাফা এবং নিম্নতম মজুরির বদৌলতে শ্রমিকের জীবন অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়।

শ্রমিকের দাবী মানুষ হয়ে বাঁচার অধিকার এবং মানুষ হয়ে বাঁচার মতো মজুরি
মুনাফাকে চরমে উন্নীত করার সহজাত তাড়না থেকে পুঁজিবাদ প্রতিনিয়ত শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কমানো ও শ্রমঘণ্টা বাড়ানোয় সচেষ্ট থাকে, আর সেটাই শ্রমিককে বাধ্য করে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাঁচার সংগ্রামে লিপ্ত হতে। এ এক ইচ্ছামুক্ত বাস্তবতা। বাংলাদেশে প্রতিটি গার্মেন্ট শ্রমিকের সকাল-বিকাল-রাতের হাহাকার ও ক্ষোভ প্রধানভাবে একটা প্রশ্নকে কেন্দ্র করে- এত সামান্য মজুরিতে কি বাঁচা সম্ভব!

কারখানায় একটা যন্ত্র ব্যবহারের জন্য পুঁজিপতিকে তা মূল্য দিয়ে কিনতে হয়। অথচ একজন শ্রমিককে ১৫/১৬/১৮ বছর ধরে তাঁর দরিদ্র বাপ মা নিজেদের মেহনতে বড় করেন। কিন্তু তৈরী এ মানুষটাকে ব্যবহারের পূর্বে পুঁজিপতিকে কিছু দিতে হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও হতদরিদ্র্য শ্রমিক বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব বোধ না করেই পারে না। যন্ত্রের ক্ষয়সাধনের যে ক্ষতি তা পুঁজিপতি তার পণ্যের বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়। কিন্তু একজন শ্রমিক কারখানায় দুর্বিষহ পরিবেশে কাজ করতে করতে অবিরাম ক্ষয় হতেই থাকে, একসময় অকালে নিঃশেষ হয়ে যায়। কিন্তু তার জীবনের ক্ষয়পূরণের জন্য, ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য পুঁজিবাদে কোনো বরাদ্দ থাকে না। একটা যন্ত্রকেও নিয়মিত সেবাযত্ন-পরিচর্যা করতে হয়। কিন্তু শ্রমিককে রক্ষার ও তার যত্নের কোনো দায়িত্ব পুঁজিপতির নেই। শ্রমিক কী খায়, কোথায় ঘুমায়, কতক্ষণ ঘুমায়, কীভাবে জীবনযাপন করে, এ নিয়ে পুঁজিপতির কোনো মাথাব্যথা নেই। সে চায় শ্রম, সর্বোচ্চ যতটুকু নিংড়ে নেওয়া সম্ভব। গার্মেন্ট শিল্পে শ্রমিকের প্রতি এই ধরণের হৃদয়হীনতা প্রবলভাবেই প্রকট।

পুঁজিতন্ত্র শ্রমিককে ক্রীতদাসতূল্য জীবনযাপনে বাধ্য করে, এতটুকুই নয়। তা শ্রমিকের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ভূলূণ্ঠিত করে। শোষন-দমন-অবজ্ঞার ও একঘেঁয়ে খাটুনি শ্রমিককে ভুলিয়ে দেয়, সেও মানুষ। শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণও তাদের এই জীবনকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। শ্রমিক ও শ্রমজীবীদের সম্পর্কে এই বোধ দারুণভাবে সংক্রমিত করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেও।

বহুদিন পূর্বে লেনিন বলেছিলেন, “যে মূহুর্তে শ্রমিকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের দাবীগুলোকে তুলে ধরে, তারা আর দাস থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষ, বিত্তশালীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। তারা এই দাবী তুলে ধরা শুরু করে যে, তাদের শ্রম গুটিকয়েক অলসের সম্পদ বাড়ানোর জন্যই কেবলমাত্র ব্যবহৃত হওয়া চলবে না, তা ব্যবহৃত হতে হবে তাদের জন্যও, যারা কাজ করে, তাদের মানুষ হয়ে বাঁচতে সমর্থ্য করার জন্য।”৪ লেনিনের কথার অনুসরণে বলতে হয়, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও দাবীদাওয়ার সংগ্রাম নিছক অর্থনৈতিক সংগ্রাম নয়, একই সাথে দাস থেকে স্বাধীন মানুষ হয়ে ওঠার সংগ্রাম। তাই মজুরির দাবীর পাশাপাশি তাঁর মানুষের অধিকার নিয়ে বাঁচার আওয়াজও থাকতে হবে। মজুরি হতে হবে মানুষের অধিকার নিয়ে বাঁচার মত মজুরি।

পুঁজিবাদ কোনোক্রমেই শ্রমিককে ন্যায্য মজুরি দিতে পারে না। ন্যায্য মজুরির অর্থ- শ্রমিকশ্রেণী সামাজিকভাবে নিজেরাই নিজেদের শ্রমের পরিপূর্ণ মালিক, পুঁজিপতির কোনো ভাগ তাতে নেই। এর অর্থ পুঁজিবাদের অবসান, নতুন ধরণের মালিকানাব্যবস্থা। পুঁজিবাদে ন্যায্য মজুরির দাবী শ্রমিককে বিভ্রান্ত করে। শ্রমিকশ্রেণী তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মজুরি ও দাবীদাওয়ার লড়াইয়ে পুঁজিবাদী শোষণের অবসান দাবী করে না, দাবী করে মানুষ হিসেব বাঁচার অধিকার দাবী। তারা জোরের সাথে ঘোষণা করে, পুঁজিপতিরা তাদের জন্য যে দাসত্বের শর্ত বেঁধে দিয়েছে, তাঁরা সেই শর্ত মানতে রাজী নয়। তারা আর পুঁজিতন্ত্রের দাস হিসাবে শ্রম করতে রাজী নয়। স্বাধীন মানুষ হিসেবে তারা শ্রমে নিয়োজিত হতে চায়। এই যে মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার দাবী, তা সারমর্মে বুর্জোয়া দাবী, বুর্জোয়া শ্রেণী তাদের শাসনে-সংবিধানে এই অধিকারের ঘোষণা দেয়। কিন্তু শ্রমিক যখন এই দাবী তোলে তখনই পুঁজিতন্ত্র তাদের রুখে দেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে, শক্তির আশ্রয় নেয়। তারা নিজেরাই নিজেদের সংবিধানকে লংঘন করে।

শ্রমিক মানুষের মতো বাঁচা বলতে অবশ্যই বুর্জোয়া বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানুষের মতো বাঁচা বুঝায় না। উপরের দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাসও ফেলে না। শ্রমিক তার বাস্তব জীবনের অনুপাতেই মানুষের মতো বাঁচতে চায়, যেখানে সে কিছুটা ভাল বাসস্থানে মানুষের মতো পারিবারিক জীবন যাপন করে বাস করতে পারবে, সন্তানসন্ততিদের শ্রমজীবীর সন্তান হিসাবে লেখাপড়া করাতে পারবে, অসুখে চিকিৎসা পাবে, বুড়ো বাপ-মাকে সাহায্য করতে পারবে, ভবিষ্যত জীবনের যথাসম্ভব নিরাপত্তা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে ইত্যাদি। দিনের একটা সময় ৮ ঘণ্টা সে পুঁজিপতির জন্য কাজ করবে, আর একটা সময় ৮ ঘণ্টা হবে তার নিজস্ব সময় যখন সে নৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত করবে। শ্রমিক পরিবার কর্মবিমুখও নয়, শ্রম তার জীবন। সুতরাং সুযোগ থাকলে সাধারণত শ্রমিক পরিবারে একাধিক ব্যক্তি কাজ করে, এটা সত্য। তবে সন্তান লালনপালন, চাকুরীর সুযোগের অভাব, চিন্তার পশ্চাৎপদতা ইত্যাদি নানা কারণে সমস্ত শ্রমিক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ব্যতিক্রমহীনভাবে চাকরী করে এটা মোটেই সাধারণ ঘটনা নয়। এই অবস্থায় সচেতন শ্রমিকদের সাথে ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতেই তাদের মানুষের মতো বাঁচতে পারার উপযুক্ত মজুরি কত হওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করাটা প্রয়োজন। মানুষের মতো বাঁচার উপযুক্ত মজুরি হতে হবে সাধারণ এক মানদণ্ড, যাকে কেন্দ্র করে শ্রমিক তার দাবীদাওয়ার আন্দোলনের করণীয় গড়ে তুলবে।

আজ আট হাজার টাকা মজুরির একটি দাবী উত্থাপিত হয়েছে। এটি মানুষের মতো বাঁচার উপযুক্ত মজুরি অবশ্যই নয়। তবুও এটাই যদি শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে আপাত গ্রহণযোগ্যতা পায়, তবে মজুরির এই সংগ্রামে তাদের পাশে থাকতে হবে। গার্মেন্ট মালিকরা যেহেতু সরকার নির্ধারিত ৫৩০০ টাকা মজুরি প্রত্যাখ্যান করেছে, শ্রমিক তাই এটা কার্যকরী করার জন্য বিক্ষিপ্ত স্বতঃস্ফূত সংগ্রামে নেমেছে। তাদের এই সংগ্রাম ন্যায়সঙ্গত। তবে মালিক শ্রেণী চাইছে শ্রমিকদের চেতনাকে এই মজুরিতেই আটকে রাখতে। তারা সম্ভবত এই ফাঁকে রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রচুর সুযোগ সুবিধা আদায় করে নিতে চাইছে। তারপরই হয়তো তারা এই মজুরিকে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেবে, কেননা তাঁদের স্বার্থেই এই মজুরি নির্ধারণ করেছে সরকার।

মনে রাখতে হবে, মানুষের মতো বাঁচার উপযুক্ত মজুরির সাথে আট ঘণ্টা শ্রমদিবসের দাবীও যুক্ত। গার্মেন্ট শ্রমিকরা দেশী পুঁজিতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক পুঁজিপতিগোষ্ঠী উভয়ের শোষণ-নিপীড়ণের শিকার। তাই মজুরির সংগ্রামে সাম্রাজ্যবাদকে উন্মোচন ও বিরোধিতার বিষয়টি না এসেই পারে না।

উপসংহার
দেশী-বিদেশী পুঁজিতন্ত্রের কবল থেকে শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক মুক্তি প্রয়োজন। প্রয়োজন মজুরি-শ্রম তথা মজুরি দাসত্ব থেকে মুক্তি। কিন্তু এ মুক্তি দেশের বৃহত্তর জনসাধারণের মুক্তির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। মজুরিবৃদ্ধি ও দাবীদাওয়ার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শাসকশ্রেণী ও রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে, রাষ্ট্র ও সমাজকে চিনতে শেখে। জনগণের অন্যান্য অংশও শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে স্বীকার করা শুরু করে। বলা যায়, রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করাটা সহজ হয়ে ওঠে। এখানেই নিহিত রয়েছে অর্থনৈতিক ও দাবীদাওয়ার সংগ্রামের বিশেষ তাৎপর্য।

তথ্যসূত্র
১। Karl Marx, Capital, vol-1, 1984, p-286
২। ঐ, p-164
৩। ঐ, p-285, এঙ্গেলসকে উদ্ধৃত করে।
৪। Lenin, On Strike, Collected Works, vol-4

নোট : অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাটি লিখেছেন, সাইদ মাহমুদ। লেখাটি ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ এর অক্টোবর-ডিসেম্বর-২০১৩ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। লেখক লেখাটির তারিখ দিয়েছেন, ১৩ নভেম্বর, ২০১৩।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “পুঁজিবাদ এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরির আন্দোলন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − 5 =