নিটশের ঘোড়া ও চিন্তাপঙ্গু আমরা

নিটশের শেষ জীবন নিয়ে একটি বহুল প্রচলত মিথ আছে। তার মৃত্যুর প্রায় দশ বছর আগে ইটালির তুরিন শহরে অবস্থানকালীন তিনি এক দিন সকালে দেখতে পেলেন এক ঘোড়সওয়ার এর ঘোড়া হঠাত চলাফেরা বন্ধ করে দিল। তখনি ঐ মালিক বেধড়ক পেটাতে লাগল তার ঘোড়াটিকে। এই দেখে নিটশে ঐ ঘোড়ার প্রতি মায়াগ্রস্ত হয়ে কাছে গেলেন এবং ঘোড়াটিকে জড়িয়ে ধরলেন। দেখতে পেলেন ঘোড়াটি মাতালের মত আর্তনাদ করছে। এর পর থেকে নিটশের শেষ জীবনে তিনি আর কখনো কোন কথাবার্তা বলতেন না।এক ধরণের ভয়ংকর রোগে প্রায় দশ বছর আসহায় ভাবে কাটানোর পর তিনি মারা গেলেন ১৯০০ সালে।

নিটশের এই ঘটনা হতে পারে একটা মিথ। কিন্তু জগৎ সম্পর্কে নিটশের যে দর্শন তার সাথে এই ঘোড়ার চলা বন্ধ করে দেয়া, এই জগতের বেঁচে থাকার যে দারুণ ভীতিকর গ্লানি, জীবনকে গৎবাঁধা কিছু কারণ দর্শাও এর কাছে অসহায় গাধার মত সমর্পন করা, মুক্তির দর্শন ও যেখানে এক ধরণের বন্দীত্ব কে আমন্ত্রণ করে, প্রভুর ভন্ডত্ব যেখানে প্রতিটি মানুষের মাঝে এইডস এর থেকে আরো প্রকট ভাবে সংক্রমিত হয় সেই জগতে নিটশের এই মিথ বাস্তবের থেকে আরো সৃষ্টিশীল কোন জীবন দর্শনের প্রয়োজনীয়তার ইংগিত দেয়।

এই মিথটি নিয়েই সিনেমা বানিয়েছেন হাংগেরীর বিখ্যাত পরিচালক বেল তেরা। সিনেমার নাম “The Turin Horse”. সিনেমা তে দেখিয়েছেন ঐ ঘোড়ার মালিক ও তার মেয়ে কিভাবে জীবনযাপন করে তার উপর গড়ে উঠা গল্প। সিনেমা’র মূল দর্শন ছিল- বর্তমান জীবন যাপন কিভাবে আমাদের অস্তিত্ব কে এক বোঝার ভারে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। সিনেমাকে ছয়টি দিনে ভাগ করা হয়েছে। শেষমেষ দেখানো হয়, মানুষের তৈরি করা ভূয়া অভ্যস্ততা ও প্রভু,শোষক, দের দাসরূপী প্রভূর ভান করা উটকো দায়িত্ব এই গাধা মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে কিভাবে সবাই ধ্বংসের কিনারায় চলে যেতে থাকে।

আমরা শেষমেষ এই মানুষ রূপী গাধা। নিটশের দর্শন মতে জীবন টা একটা উপভোগ্য খেলা। এখানে আমরা খেলাটা উপভোগ করতে পারিনা কারণ আমরা কিছু আমাদের প্রভুদের মারফতে কিছু বানোয়াট ফলাফল এর আশা করে থাকি।ফলাফল এর পেছনেই পরিশ্রান্তের মত ছুটতে থাকি। নিটশে এদেরকে বলেছেন bad player. Good player তারাই যারা নতুন নতুন ফলাফল,ঝুঁকি কে আমন্ত্রণ জানাতে উৎসুক হয়ে থাকে। নানা ধরণের জীবন যাপন কে যদি আমি উদযাপন ই করতে না পারি তবে আমার অস্তিত্ব কে নিজের ক্ষমতায়নে কই রাখতে পারলাম? অস্তিত্ব কে পাপী বান্দা বানিয়ে ধর্ম,অর্থনীতি,শোষকের কাছে নিজেকে পুতুল বানিয়ে রাখাটা কি যথেষ্ট নৈতিক?? নিজেকে তবে আর কই শ্রদ্ধা করলাম?

সারা বিশ্বে এখন এই অনৈতিক সিদ্ধান্তের মাশুল গুনতে দেখা যাচ্ছে। কোরবানীর আগে নিজের সন্তানকে জবাই করে দেয় তার বাবা কারণ সে নাকি প্রভুর আদেশ পেয়েছে স্বপ্নে। টাঙ্গাইলে, ময়মনসিংহে, ও পার্বত্য জেলায় ক্লাস ওয়ান এর এক শিশু সহ তিন জন কিশোরী ধর্ষিত হয়েছে। তারপরো কোন বিকার নেই গাধা দের মাঝে। তবে তারা/আমি/আমরা অপেক্ষায় আছি আমাদের সিরিয়াল কবে আসবে তার জন্য। এই জীবনকে এভাবে প্রভু,রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আর কতকাল রাখতে হবে? এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কি তুমি নিতে পারনা?এই নিয়ন্ত্রণের মাশুল দিতে গিয়ে তুমি তোমার চিন্তাশক্তি,সৃষ্টিশীলতা র নিয়ন্ত্রণও ঐ প্রভুদের দিয়ে দিলে তা কি টের পাও?? ওপরের যে ছোট দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ইংগিত দিলাম তাতেও যদি টের না পাও তবে তোমার আত্নহুতি র জন্য অপেক্ষা করতে পারো।

জার্মান দার্শনিক Herbert Marcuse তার One Dimensional Man বইয়ে লিখেছেনঃ “তোমার চেতনায় যদি তোমার রাষ্ট্র হিপনোটাইজ করে ব্রেইন ওয়াশ করে বুঝিয়ে দেয়, স্বাধীনতা মানে শুধু শারীরিক পুষ্টি মেটানো, কাপড় পরার অর্থ জোগাড় করা, চিকিৎসার ঔষধ নিতে পারা- তবে এটুক অন্তত বুঝে নিও সেই সাথে তুমি তোমার মহামূল্যবান চিন্তাশক্তি তাদের কাছে বিকিয়ে দিলে। তখন তোমার কোন ক্ষমতা থাকবেনা এটাও বুঝার যে তুমি এক সময় চিন্তা করতে পারতে”।

নিজের অস্তিত্বের স্পন্দন শুনে এখনি নির্ধারণ কর, সিদ্ধান্ত নাও তোমাকে তুমি নিয়ন্ত্রণ করবে নাকি সেই পুরনো প্রভুরা, যারা জীবনটাকে ভাগ করে দিয়েছে ২৪ ঘন্টার রুটিনে। তোমার দেহ একটা মেশিনের মত প্রতিদিন একই কাজ করতে থাকে। জীবন নিয়ে আর উদযাপন করতে পারেনা, প্রশ্নও করতে পারেনা…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “নিটশের ঘোড়া ও চিন্তাপঙ্গু আমরা

  1. যখন আমরা মানব হয়ে এই
    যখন আমরা মানব হয়ে এই পৃথিবীতে আসি তখন থেকেই আমরা প্রভাবিত চিন্তা শক্তি দ্বারা নিজেদের চালিত করি, আমাদের সেভাবেই শিখানো হয়। প্রভাবমুক্ত চিন্তা শক্তির নামই – মুক্তচিন্তা। যেই চিন্তাধারা হচ্ছে যে কন প্রকার বৈপরিত্যের ঊর্ধ্বে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

92 − = 88