দেবী (পর্ব ০১)

বাসটা চলে গেছে তাকে নামিয়ে দিয়েই। রিক্সাওয়ালারা একের পর এক এসে জিজ্ঞেস করছে সাহেব কই যাবেন, কই যাবেন? অনির্বান নিজেই কি জানে কোথায় যাবে? বাবার কাছ থেকে এটুকুই শুনেছে রোড নাম্বার ৯২, হাউস নাম্বার ২, পাড়া বা মহল্লার নাম কিছুই বলেননি বাবা। তিনি নিজেও জানতেন না মহিলার পূর্ণ ঠিকানা শুধু রোড আর বাড়ি নম্বর। বাবা এও জানতেন না, মহিলা এখনও ৯২ নম্বার রোডের ২ নাম্বার বাড়িতে থাকেন কি না। অনির্বান কিংবা বাবা এটাও জানে না যে মহিলা এখনও বেচে আছেন কি না? তবু অনির্বান চলে এসেছে, একবার মহিলাটিকে দেখার জন্য। দেখা করেই বা কি বলবে, কেনই বা দেখা করবে কিছুই কি বুঝে উঠতে পারছে এখনও। তবু চলে এসেছে মহিলাটির শহরে।

ছয় ঘন্টার বাস যার্নিতে ক্লান্ত অনির্বান কিছু খাওয়ার জন্য রাস্তার পাশেই একটা রেস্তোরায় ঢুকে পরে। খাবারের পাশাপাশি ওয়েটারের সাথে কথা বলে যদি ৯২ নম্বর রোডওয়ালা কোন মহল্লার সন্ধান সে পায় তাহলে খুব ভাল হয়। কেন জানি মনে হচ্ছে, এত বেশি রোডওয়ালা মহল্লা এই শহরে আর নেই, থাকার কথা না। এই একটা আশাই তাকে এতটুকু পথ পারি দিতে সাহস দিয়েছে। তার কাছে মহিলার মোবাইল নাম্বারটা আছে, ভিআইপি টাইপ মোবাইল নাম্বার। খুব সহজেই মনে রাখা যায়। ইচ্ছে করলে ফোন করা যায়, তবু সে ফোন করবে না। এমন নয়, যে সরাসরি দেখা করে ভড়কে দেবে, কথা বলার পর যদি মহিলা তাকে দেখা না দেন! এই একটা ভয় কাজ করছে মনের মধ্য। বাবাও নাকি অনেকবার দেখা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মহিলা রাজি হননি।

খেতে খেতে ওয়েটারের সাথে জমিয়ে নিয়েছে অনির্বান। তার ধারনাই ঠিক, এই শহরে ৯২ নম্বর রোডের মহল্লা একটাই। সেখানে সব বড়লোকেদের বাস। মহিলা যে বেশ অবস্থাশালী সেটা বাবার কাছ থেকেই আঁচ করেছিলো সে। দু’দুটি গার্মেন্টস ফ্যাকটরি যাদের থাকে, তারা তো বড়লোকই হবেন।

রিক্সাটা ২ নম্বর বাড়ির সামনে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো প্রায়। সূর্যটা ডুবো ডুবো করছে। বিরাট গেটের দাড়াতেই অনির্বানের চোখে পড়লো ভেতরে বাংলোমত একটা বিরাট বাড়ি। সরকারী কোয়ার্টারের মত দেখতে গেটের সাথে লাগানো একটা একতলা ঘর, হয়ত সেটাতে দাড়োয়ান কিংবা কাজের লোকেরা থাকে। চাকরী থেকে অবসর নিয়ে বাবা এই একতলা ঘরটার মত একটা বাড়ী করেছিলেন অনেকখানি জায়গা নিয়ে। অনির্বাণ এখন সেখানে থাকে।
গেটের পাশে দাঁড়ানো দাড়োয়ানকে মহিলার কথা জিজ্ঞেস করতেই বললো, মা এখন বাগানে পায়চারী করছেন।
– কিন্তু, আপনি কে?
– আমি অনির্বাণ। তাঁকে গিয়ে আমার নামটা বললেই হবে।
সাথে সাথে তার মনে হলো, শুধু নামটা বললেই কি মহিলা তাঁকে চিনবেন? তারপরও, আর কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না অনির্বাণের। দারোয়ান ভেতরে চলে গেলো, কিছুক্ষণ পর এসে তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে বসালো বাংলো বাড়ির ড্রয়িং রুমে। ওয়াশরুম দেখিয়ে বললো, আপনি ফ্রেশ হয়ে একটু অপেক্ষা করুন, মা আসছেন।
ডুপ্লেক্স বাড়ি, হল ঘরের মত বিরাট বসার ঘর। সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টা তাঁকে আকর্ষণ করলো, তা হলো ঘরে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কোন ছবি নেই। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বয়সের শুধু তিনটে ছবি তিনটা দেয়াল থকে অনির্বানেড় দিকে তাকিয়ে আছে। মিনিট দশেক পর ট্রলির শব্দ পেয়ে অনির্বাণ মুখ ঘোরায়।

মহিলার সাথে চোখাচোখি হতেই একটা শব্দই অনির্বাণের মুখ থেকে বের হয়, মা। বেশ অনেকটা সময় হতবিহবল হয়ে আছে অনির্বান, এই কি সেই মহিলা? যিনি অনির্বানের নাম রেখেছিলেন আজ থেকে তিরিশ বছর আগে। তখন অনির্বানের বয়স পাঁচ, নাম ছিলো অমিত। পাঁচ বছরের অমিত এই মহিলাটির জন্য হয়ে গেছে অনির্বান।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “দেবী (পর্ব ০১)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 + = 39