বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীর প্রতিকৃতি এবং ‘প্রথম আলো’র ব্যকরণ

চেনা ঘটনা, জানা গল্প, অনেকবার জাবর কাটা তত্ত্ব কথা, তবু বলতে হয়, উদাহরন হিসেবে তুলে ধরতে হয়, কারন সময়ের চাকায় ক্রম পরিবর্তণশীল বাস্তবতায় কিংবা যুগ-যুগান্তরের দৃশ্যপটে পুরনো চেনা অনেক কিছু নতুন অচেনা কে সহজেই চেনার জগতে নিয়ে আসে। যেমন ধরুন ‘তথ্য সন্ত্রাসের’র একটা উদাহরণ সবাই জানেন, না জানার কোন সুযোগই নেই। তারপরও উদাহরণটা বলি মার্কিন তথ্য সন্ত্রাসের চেয়েও ভয়ংকর ‘বুদ্ধিবৃত্তিক’সন্ত্রাসের বাংলাদেশী সংস্করণটি বোঝার জন্য।

মার্কিন সরকার এবং পুরো পশ্চিমা গণমাধ্যম দুনিয়া জুড়ে তথ্য দিল ইরাকে সাদ্দাম হোসেন জীবানু অস্ত্রের মজুদ করেছেন। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে ইরাকে অভিযান চালিয়ে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ হত্যা করল মার্কিন সেনাবাহিনী। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ধরা পড়লেন, তার ফাঁসী হল এবং ইরাকের সবগুলো তেল ক্ষেত্র দখল করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এত কিছুর পরও সেই ভয়াবহ জীবাণু অস্ত্রের মজুদ পাওয়া গেল না। এবার মার্কিন কর্তা-ব্যক্তিরা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির! কোন ভান-ভনিতা নেই, গলাও বেশ দরাজ। বলে দিলেন, “ইরাকে জীবাণু অস্ত্র থাকার তথ্যটি ভুল ছিল।”একটা ভুল তথ্য থেকে আড়াই লাখ মানুষ হত্যা করা হল? এই ভুল তথ্য নিছকই ভুল তথ্য? না, এই ভুল পরিকল্পিত ‘তথ্য সন্ত্রাস’ যার মাধ্যমে ইরাকের তেল সম্পদ দখলের জন্য গণহত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল।

দৈনিক প্রথম আলোর নববর্ষ সংখ্যায় দৈনিকে হাসনাত আব্দুল হাই এর ‘টিভি ক্যামেরার সামনে মেয়েটি’ গল্প প্রকাশ শুধু তথ্য সন্ত্রাস নয়, সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ইরাকে তথ্য সন্ত্রাসের উপলক্ষ ছিল জীবাণু অস্ত্র, কারন এই অস্ত্র সম্পর্কে আরও আগে থেকেই ভীতি ছড়ানো হয়, কিন্তু এর ব্যবহার কিংবা ক্ষতি সম্পর্কে আতংক ছাড়া আর কিছুই জানা ছিল না বিশ্ববাসীর। দেশে তরুন সমাজের ঐতিহাসিক গণজাগরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসের বিপরীতে প্রথম আলো বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মনে জীবাণু অস্ত্রের মতই ভীতি ছড়ানো যৌনতা সম্পর্কিত প্রচলিত ‘সামাজিক কৌতুহল’ কে। এই ‘সামাজিক কৌতুহল’ সাধারনভাবে ধোঁয়াটে, শেষ বিচারে আতংক। আমাদের আশে পাশের বেশীরভাগ মপানুষ সামাজিক বিবেচনায় যৌন কেলেঙ্কারীর ঘটনাগুলো শুনতে খুব পছন্দ করে, গোপনে এর চর্চাতেও আপত্তি নেই, কিন্তু কেউ যদি বলে ওই পাড়ায় একটা মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে, তাহলে ধর্ষকের শাস্তি চাওয়ার আগে ধর্ষিতার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। হয়ত দেখা গেল মেয়েটি আদৌ কোন ঘটনার শিকার হয়নি, কেউ শত্রুতাবশত গুজব ছড়িয়েছে কিন্তু সেসব আমলে আসবে না কারও মাথায়। বরং সে গুজবের ডালপালা ছড়াবে অনেক দূর, এমন হতে পারে মেয়েটি অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করবে, তারপরও আমাদের সমাজ মেয়েটিকেই নষ্টা বলবে। ধর্ষক, কিংবা গুজব রটণাকারীদের শাস্তি নিয়ে কোন মাথাব্যাথাই থাকবে না!।

সিমির আত্মহত্যা এবং এরপর পুলিশ প্রশাসন থেকে সমাজ রাষ্ট্রের জঘন্য আচরণের কথা
নিশ্চয় কেউ ভুলে যাননি। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, যৌনতাকে ঘিরে সমাজে বহমান নষ্টামি’র (যাকে ভদ্র ভাষায় ‘সামাজিক কৌতুহল’ বলা যায়) মানসিকতাকেই গণজাগরণের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে প্রথম আলো।বিচ্ছিন্নভাবে,তাড়াহুড়োর কারনে পরিকল্পিত, পরিশীলিত প্রথম আলোতে ‘টিভি ক্যামেরার সামনে মেয়েটি’ ছাপা হয়েছে এটা ভাবার কোন কারন নেই, উচিতও নয়। প্রথম আলোর চলার এবং চাওয়ার একটি নিজস্ব ব্যকরণ আছে। প্রথম আলো শুধু বদলে যাওয়ার কথাই বলে না, বদল করার ক্ষেত্রও তৈরি করতে চায়। সেটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক বিবেচ্য নয়, প্রথম আলোর নিজস্ব স্বার্থই মুখ্য। কিছুদিন ধরেই প্রথম আলো সামনের নির্বাচনে ক্ষমতায় একটি পরিবর্তণের পক্ষে প্রচ্ছন্ন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তণের চুড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে গণজাগরণ মঞ্চকে প্রতিকূল শক্তি বিবেচনাতেই হয়ত প্রথম আলোর এই প্রয়াস। ইরাকে হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন ক্ষতি হয়নি, বরং লাভ হয়েছে। ঠিক তেমনি গণজাগরণের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস চালিয়ে প্রথম আলোরও ক্ষতি হয়নি, দু:খ প্রকাশ-ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা ঘটলেও প্রথম আলো লাভেই আছে। তবে প্রথম আলো মার্কিন কর্তৃপক্ষের চেয়ে অনেক মানবিক এবং উদার।

কারন মার্কিন প্রশাসন ইরাকে জীবাণু অস্ত্রের ভুল তথ্যের জন্য শুধু স্বীকারোক্তি দিয়েছিল। প্রথম আলো দায়বদ্ধ গণমাধ্যম বলেই ভুল স্বীকার এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেছে, এমনকি গল্প লেখককে দিয়েই ভুল স্বীকার, ক্ষমা চাওয়ার কাজটিও সম্পন্ন করতে পেরেছে! কিন্তু তারপর? একটি গল্পের মাধ্যমে ইতিহাসের অভূতপূর্ব এক গণ আন্দোলন সম্পর্কে দোদুল্যমান মধ্যবিত্ত মনে যে সন্দেহের বেীজ বুনে দিল, সময়ের সবচেয়ে অগ্রসর তরুনদের পথ চলায় যে কলঙ্কের কালি লেপ্টে দিল প্রথম আলো, তা কি মুছে যাবে এত সহজে? আড়াই লাখ মানুষের রক্ত¯্রােতে ইরাকের দজলা- ফোরাতের জলের রঙ কি এখনও লালচে নয়! গণজাগরণের বিরুদ্ধে বহু পুরনো মৌলবাদী প্রপঞ্চকে আশ্রয় করে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের তালিকায় হাসনাত আব্দুল হাই একেবারে সর্বশেষ এবং ব্যতিক্রমী সংযোজন। এর আগে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসী হিসেবে আসিফ নজরুল, ফরহাদ মজহার,পিয়াস করিমরা নিজেদের জাহির করেছিলেন প্রবন্ধ রচণা আর টেলিভিশন টকশো’র মাধ্যমে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার বিশুদ্ধ সৃজনশীল অঙ্গন কথা সাহিত্য কিংবা কবিতাকে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসের হাতিয়ার হিসেবে তখনও ব্যবহার করা হয়নি। হাসনাত আব্দুল হাইকে দিয়ে সেই ষোলকলা পূর্ণ করা হল। এমনকি একই দিনে গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় সহমর্মী যিনি প্রজন্ম চত্বরের প্রায় সব কর্মসূচীতে ছিলেন সেই অদিতি ফাল্গুনীকেও এই বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস পরিচালনার অংশ করা হয়েছে। তার ‘উন্মাদিনী কাল’ গল্পের নামকরণ, আঙ্গিক এবং চরিত্র চিত্রণ কোন কিছুই সময়ের দাবি এবং প্রেক্ষপটে লেখকের দায়িত্বশীলতার পরিচয় তুলে ধরে না, বরং লেখকের চেতনার সহমর্মী গণজাগরণ মঞ্চকেই আহত করে।

প্রথম আলোতে এর আগে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসী আসিফ নজরুল গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে ইনিয়ে-বিনিয়ে কয়েটি কলাম লিখেছেন। মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তিনি জোর গলায় বলে বেড়াচ্ছেন গণজাগরণ মঞ্চ থেকে আগে আমার দেশ এবং মাহমুদুর রহমানকে আক্রমণ করা হয়েছে, এ কারনে পরে আমার দেশ ওভার রিঅ্যাক্ট করেছে। একেবারে নির্জলা মিথ্যা কথা। এ ধরনের একজন মিথ্যবাদী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ভাবতেও লজ্জা লাগে। চলুন দেখি ৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর পর থেকে এক সপ্তাহ আসিফ নজরুলের প্রিয় দৈনিক আমার দেশ কোন চোখে দেখেছিল গণজাগরণ মঞ্চকে। ৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর প্রথ দিনেই প্রথম দিনেই, দৈনিক আমার দেশ শিরোনাম করেছিল, “ কাদের মোল্লার ফাঁসীর দাবি:শাহবাগে ছাত্রলীগ ও বাম সংগঠনের যৌথ অবরোধ:এ রায় মানি না-ইনু।’ অথচ গণজাগরণের সূচণা করেছিল ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক। সে কথা দৈনিক আমার দেশের রিপোর্টে কোথাও লেখা হয়নি। অর্থাৎ প্রথম দিনেই ভুল তথ্য দিয়ে শুরু করেছিল মাহমুদুর রহমানের আমার দেশ। ৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আমারদেশের শিরোনাম,“ কাদরে মোল্লার ফাঁসরি দাবতিে শাহবাগে আওয়ামী বাম অবস্থান : সাজদোকে বোতল নক্ষিপে : তত্পর সশস্ত্র ছাত্রলীগ’। আর কিছু ব্যাখা করার দরকার হয় না, আমার দেশে’র অবস্থান বুঝতে। ৮ ফেব্রুয়ারি আমার দেশের শিরোনাম বেশ বদলে গেল, “ শাহবাগে জনসমাগম বাড়ছে : কাদরে মোল্লার ফাঁসি না হওয়া র্পযন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা”। কিন্তু এর সঙ্গে ছবির ক্যাপসনে বলা হল, সাজেদা চৌধুরীকে বোতল ছুঁড়ে মারল বামপন্থীরা। বাস্তব অবস্থা স্বীকার করে খবর পরিবেশণ করলেও শ্লেষ থেমে থাকেনি দৈনিক আমার দেশের। এক দিন পরেই ৯ ফেব্রুয়ারি শিরোনামে সরাসরি আক্রমণ করা হল গণজাগরণ মঞ্চকে।শিরোনাম হল: শাহবাগে ফ্যাসবিাদরে পদধ্বনি : গৃহযুদ্ধরে উসকানি বক্তাদরে গণমাধ্যমরে বরিুদ্ধে বষিোদ্গার : আওয়ামী বুদ্ধজিীবীদরে রণহুঙ্কার।’ ১০ ফেব্রুয়ারি খবর থেকে সম্পাদকীয় পাতায় আক্রমণ শুরু হল গণজাগরণের বিরুদ্ধে। আব্দুল হাই শিকদার নামে একজন কলাম লিখলেন, ‘শাহবাগ নাটক’। আর পিয়াস করিমের(বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের একজন, নীচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে) একটা ইন্টারভিউ ভিত্তিক খবর ছাপা হল নিউজ মিডিয়া বিডি ডট কম নামে একটি অখ্যাত অনলাইনের বরাত দিয়ে, শিরোনাম‘ জনপ্রিয় আন্দোলন থেকেও ফ্যাসিবাদের জন্ম হতে পারে, শাহবাগের বিক্ষোভ প্রসঙ্গে ড.পিয়াস করিম।’ ১১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আমার দেশে “ শাহবাগে এক দাবি বচিার নয় ফাঁসি চাই :

বাম-ছাত্রলীগ সমন্বয়ে নতুন কমিটি হচ্ছে শিরোনামে যে খবর ছাপা হয় সেখানে গণজাগরণ মঞ্চে নেশা চলছে, পথ নাটকের পোশাকে সৌদি পোশাককে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে এ জাতীয় জঘন্য মিথ্যা তথ্য পরিবেশন খরা হয়। এরপর থেকে এই তথ্য সন্ত্রাস চলে ভয়াবহভাবে। ফটোশপে ছবি জোড়া দিয়ে শাহবাগে বেলেল্লাপণা চলছে এমন একশ’ভাগ মিথ্যা খবর ছাপা হয় দৈনিক আমার দেশে। পরে ছবি বিকৃত করার বিষয়টি ধরা পড়ে যায়, আমার দেশের বিকৃত ছবি ও ভুল সংবাদ পরিবেশণ নিয়ে দেশের প্রধান জাতীয় দৈনিকে খবর আসলে এবং ছুবি বিকৃত করার প্রমাণ সমাজিক সাইটগুলোতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলে দৈনিক আমার দেশের প্রথম টার্গেট প্রচলিত ‘নারীঘটিত’ কেলেঙ্কারী এবং মদ-গাঁজার আসরের মিথ্যা তথ্য প্রচার করে গণজাগরণ মঞ্চকে ঘায়েলের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে শাহবাগে ‘হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি’ ‘গাণ-বাদ্য’ ‘মূর্তি-প্রতিকৃতি’ তৈরি হচ্ছে এভাবে হাস্যকর মিথ্যা খবর ছাপা হতে থাকে। ১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত-শিবির চক্রের পরিকল্পনায়(হত্যাকারীদের ধরার পর পুলিশের প্রকাশিত তথ্য) ব্লগার রাজীব হায়দার নির্মমভাবে খুন হওয়ার পর দৈনিক আমার দেশ নতুন উদ্যমে তথ্য সন্ত্রাস শুরু করে ‘নাস্তিকতার ধুয়া তুলে। জামায়াত-শিবিরের ব্লগ ও পেজগুলোতে নিহত রাজীবের নামে ভুয়া আইডি খুলে ধর্ম সম্পর্কে নানা কটুক্তি লেখে শিবিরের কর্মীরাই। সেই সব লেখা প্রকাশ করে আমার দেশ। এভাবে গণজাগরণ মঞ্চের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবির বিপরীতে প্রবল করে তোলা হয় ‘আস্তিক-নাস্তিক’ দ্বন্দের বিষয়টি।

সর্বশেষ পবিত্র কা’বা শরীফে গিলাফ পরিবর্তণের খবরকে যুদ্ধাপরাদের দায়ে বিচারের মুখোমুখি জামায়াত নেতাদের মুক্তির দাবির মানবন্ধন বলেও একশ’ ভাগ হলুদ সাংবাদিকতা করে আমার দেশ। একটি স্বাধীন দেশের একটি সংবাদপত্র এভাবে তথ্য সন্ত্রাস চালিয়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতির চেষ্টা করতে পারে, আমার দেশ ছাড়া বিশ্বে এর দ্বিতীয় নজির আছে কি’না আমার জানা নেই। দৈনিক আমার দেশ এটা করতে পারে, কারন এই পত্রিকা চলছে মাহমুদুর রহমানের হাত ধরে। মাহমুদুর রহমান কখনও কোন পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন না। তিনি প্রথম আলোচিত হন বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে জ্বালানী উপদেষ্টা থাকার সময়ে তার উদ্ভট কিছু মন্তব্যের সমালোচনা করায় ড.দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সহ দেশের কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করায়। সে সময তিনি ফুলবাড়িয়ার কয়লা সম্পদ দখলে নেওয়ার চেষ্টায় থাকা এশিয়া এনার্জী কোম্পানীর গোপন এজেন্ট হিসেবে পরিচিত হন। এরপর তিনি সবচেয়ে বেশী আলোচিত হন ২০০৬ সালের শেষের দিকে উত্তরা ষড়যন্ত্রের ঘটনায়। উত্তরায় তার ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান আর্টিসানে বসে কিছু আমলা-পুলিশকে নিয়ে নির্বাচন বানচাল করে জামায়াত-শিবিরের পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিএনপিকে আরও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রাখার কৌশল করছিলেন। পরে গণমাধ্যমের ততপরাতায় হাতে-নাতে ধরা পড়েন মাহমুদুর রহমান আর তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা। এরপর বেশ কিছুদিন মাহমুদুর রহমানকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এরপর তার নতুন মিশন দৈনিক আমার দেশ। এই পত্রিকাটি ২০০৫ সালে প্রবীণ, শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক আতাউস সামাদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল,তার সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবির। অর্থায়ন করেছিলেন বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালু। সে সময় দেশের অন্যতম মর্যাদা সম্পন্ন পত্রিকা হিসেবে দৈনিক আমার দেশ পরিচিতি লাভ করে। আর্থিক সংকটে পড়ার সুযোগ নিয়ে মাহমুদুর রহমান আর এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দখল করেন দৈনিক আমার দেশ। এ সময় প্রগতিশীল পেশাদার সাংবাদিকদের প্রায় সবাই পত্রিকাটি ছেড়ে চলে যায়। মাহমুদুর রহমান পুরনো কিছু কর্মীর পাশপাশি দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডারদের সাংবাদিক হিসেবে নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পর থেকেই আমার দেশ গ্রহনযোগ্যতা হারাতে থাকে মননশীল পাঠকের। সর্বশেষ নাস্তিকতার গুজব ভিত্তিক রিপোর্টের মাধ্যমে এর প্রচার সংখ্যা বেড়েছে বলেও গুজব শোণা গেছে। যেভাবে মানুষ সাঈদীকে চাঁদে দেখার গুজবে ঘর ছেড়ে ছুটে আসে, ঠিক সেভাবেই ‘নাস্তিকতার’ গুজব ছড়ানো রিপোর্টে পাঠক বাড়ে আমার দেশের! মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার হয়েছেন। তার গ্রেফতারে জামায়াত-শিবির,এবং জামায়াত-শিবিরের সমার্থক কিছু মানুষ আহত হয়েছেন। সাংবাদিক পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তিরাও তার মুক্তির দাবি তুলে গলা ফাটাচ্ছেন। তারা বুঝতে পারছেন না, মাহমুদুর রহমানের মত ভন্ড, অসৎ,তথ্য সন্ত্রাসীরা একটি জাতির বড় ক্ষতি করতে পারে যে কোন সময়, যার শিকার তারা নিজেরাও হতে পারেন, যে কোন নাগরিক হতে পারে।

যিনি একটি মর্যাদসম্পন্ন জাতীয় দৈনিককে গুজবের পত্রিকা বানিয়ে এর সুনাম ক্ষুন্ন করেছেন, তাকে যারা মহান সাংবাদিক কিংবা কলম সৈনিক বলেন, তখন পুরো সাংবাদিকতা পেশাকেই অপমান করা হয়। উচিত ছিল দৈনিক আমার দেশ আবারও মাহমুদুর রহমানের দখলের আগের রুচিশীল অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের আন্দোলণ হওয়া। সেখানে দৈনিক আমার দেশকে ধ্বংস করা, জামায়াত-শিবির-হেফাজতের খুন-সন্ত্রাসের মদদদাতা, পবিত্র কা’বা শরীফের গিলাফ অবমানা করে মিথ্যা খর পরিবেশনকারী ফৌজদারি আইনে গ্রেফতার হওয়া মাহমুদুর রহমানরে মুক্তি দাবি করা হচ্ছে? ভাবাই যায় না। মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকতার ক্যান্সার হতে পারে, সাংবাদিক নয়। যে সময় মাহমুদুর রহমান তথ্য সন্ত্রাস চালাচ্ছেন, সে সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির নানা গুজব ছড়িয়ে মানুষ হত্য্ াকরছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করছে অব্যাহতভাবে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গুজ ছড়িয়ে কয়েকদিন আগেও ফটিকছড়িতে বর্বরভাবে কুপিয়ে শিবির হত্যা করা হল আওয়ামীলীগ কর্মীদের। আর এই আপদমস্তক হলদু সাংবাদিকতার আমার দেশ কে বিপ্লবী দৈনিক, আমার দেশ জবর দখল করে রাখা অসাংবাদিক মাহমুদুর রহমানকে বিশাল ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিরামহীন প্রচার চালাচ্ছেন আসিফ নজরুল।এই ভয়ংকর জ্ঞানপাপীকে কিন্তু প্রথম আলোও লালন করে।

জামায়াত-শিবিরের অস্ত্রের সন্ত্রাস এবং দৈনিক আমার দেশের তথ্য সন্ত্রাসকে জায়েজ করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস শুরু করেন ফরহাদ মজহার, যিনি নব্বই এর দশকে ধর্ম বিদ্বেষী ‘এবাদত নামা’ কাব্যগ্রন্থ লিখে আলোচিত হয়েছিলেন। তার বইটি এখনও বাজারে বিদ্যমান। ফরহাদ মজহার রঙ বদলানোর জন্য অনেক আগে থেকেই বুদ্ধিজীবী মহলে কুখ্যাত। এবারও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করলেন। এবার রঙ বদলে একই সঙ্গে মার্কসীয় ও ধর্মীয় নেতা সেজে জামায়াত-শিবিরের সংখ্যালঘু নির্যাতন, সন্ত্রাসকে বাহবা দিয়ে একে গরীব মানুষের শ্রেণী সংগ্রাম হিসেবে ব্যাখা দিলেন। মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর ফরহাদ মজহার তাকেও গরীব মানুষ হিসেবে বর্ণনা করলেন। মার্কসীয় তত্ত্বের’ এমন উদ্ভট এবং বিকৃত ব্যাখা সম্ভবত দুনিয়ার আর কোন বুদ্ধিজীবী কেন, মার্কসবাদের অ,আ ক,খ পড়া ছাত্রটিও করেননি। ফরহাদ মজহার যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম-নিজামীকে দেশপ্রেমিক আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজাকার বলেও সংবাদ সম্মেলনে হাস্যকর বক্তব্য দিয়েছেন। এ ধরনের বক্তব্যের পর তার মানসিক সুস্থতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, পাবনায় মানসিক হাসপাতালে তাকে ভর্তি করে চিকিৎসা না হোক একটা চেকআপ অন্তত: করা হোক। ফরহাদ মহজার একবার একটি খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গিয়েছিলেন বলে ‘কুলদা রায়’ তার একটি লেখায় লিখেছেন। এর অর্থ এক সময়ের সন্ত্রাসী ফরহাদ মজহার এখন বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীতে রূপান্তরিত হয়েছেন! ফরহাদ মজহার গং এর পিয়াস করিম মিন মিন করে গণজাগরণ মঞ্চকে অতি আবগী, খামখেয়ালিপনা, ফ্যাসিবাদী আচরণ নানা নামে অভিহিত করছেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীটি রাজাকারপুত্র এটা আগে জানা ছিলনা, পরে জানা গেল তার বাবা আব্দুল করিম কুমিল্লার এলাকার কুখ্যাত রাজকার ছিলেন একাত্তরে। বাবা ছিলেন অস্ত্রের সন্ত্রাসী, পুত্র হয়েছেন বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসী। দুর্দান্ত উত্তরাধিকার!

ইরাকে জীবাণু অস্ত্র থাকার ভুল তথ্যের মতই জামায়াত-শিবির কখনও চাঁদে সাঈদীকে দেখার কিংবা ফটিক ছড়িতে বড় হুজুরকে তুলে নেওয়ার গুজব ছড়িয়ে নিমর্মভাবে মানুষ হত্যা করছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। জামায়াত-শিবির তাদের ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লায় আফগানিস্তানে পুলিশের হাতে শেকল পড়া বন্দীর ছবিতে বাংলাদেশী পুলিশের হাতে আলেম বলে প্রচার করা হয়েছে। এরকম আরও অসংখ্য বিকৃত ছবি প্রতিদিন আপলোড করে ইতিহাসের জঘন্যতম মিথ্যাচার আর তথ্য সন্ত্রাস চলছে জামায়াত-শিবিরের বাঁশের কেল্লায়। তথ্য সন্ত্রাস চলেছে দৈনিক আমার দেশের পাতায়, এখনও চলছে ইনকিলাব, সংগ্রাম, নয়া দিগন্তে, শিবিরের বাঁশের কেল্লায়, ফ্রি জামায়াত লিডার্স, শিবিরের সাংগঠনিক ওয়েব সাইট সহ জামায়াত-শিবিরের অনলাইন, ব্লগ এবং ফেসবুক পেজগুলোতে। আর জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস, খুন, মিথ্যাচারকে জায়েজ করার জন্যই বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস। হেফাজতের তের দফার পর ফরহাদ মজহার বললেন, এই তের দফার বাস্তবায়ন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দেশের রাজনীতিতে ইসলাম প্রশ্নের আবির্ভাব! দেশের রাজনীতিতে তো আগে থেকেই ইসলাম প্রশ্ন ছিল, ধর্মের ব্যবহারও ছিল। এ কারনেই তো বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তাহলে ফরহাদ মজহার নতুন করে ইসলাম প্রশ্নের উন্মেষ দেখলেন কেন? এর উত্তর সোজা। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের সেই শ্লোগান, “ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’। এই শ্লোগানটি ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য

বড় ধরনের মাথা-ব্যাথার কারন হয়। ধর্মব্যবসায়ীদের গুরু বনে যাওয়া সাবেক ধর্মবিদ্বেষী ফরহাদ মজহার গং শংকিত হয়ে পড়ে ধর্ম ব্যবসা হাতছড়া হওয়ার আশংকায়। এ কারনে তারা বেশ ভীত ছিল। জামায়াত-শিবির কে দিয়ে ধর্ম ব্যবসার রাজনীতিটা জমছিল না অনেক দিন ধরেই। এ কারনে হেফাজতের উত্থানে ফরহাদ মজহারও প্রায় লুঙ্গি খুলে লাফিয়ে উঠলেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন,‘ দেশের রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবসার পুনরায় আবির্ভাব!’কিন্তু ফরহাদ মজহারের স্টাইলটাই ভন্ডামি। অতএব তার ভন্ডামির লাইনগুলো হল ‘ইসলাম প্রশ্নের আবির্ভাব!’ ফরহাদ মজহার, আসিফ নজরুল, পিয়াস করিমরা হেফজতের তের দফা, জামায়াত-শিবিরের হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসযজ্ঞ কোনটাই সমর্থন কিংবা গ্রহনযোগ্য বলছেন না, কিন্তু এসব কিছুর গ্রহনযোগ্যতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন, গ্রহনযোগ্যতার মানদন্ড তৈরি করছেন নিজেদের মনগড়া ভুল ব্যাখা আর জঘন্যতম মিথ্যাচারের মধ্য দিয়ে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জামায়াত-শিবির-হেফাজতের ভয়ংকর খুনী কিংবা সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনের উপর হামলাকারী হেফাজতি সন্ত্রাসীদের কোন পার্থক্য নেই। একজন অস্ত্র হাতে মানুষ হত্যা করছে, আর বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীরা মগজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে হত্যা, অরাজকতার ক্ষেত্র তৈরি করছেন! অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এই বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীদেরও প্রতিরোধ খুবই জরুরী, সেটা সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দু’ভাবেই।
রাশেদ মেহেদী, সাংবাদিক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসীর প্রতিকৃতি এবং ‘প্রথম আলো’র ব্যকরণ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 + = 22