‘ইসলামি রাষ্ট্রে’র সিলসিলা

ইসলামি রাষ্ট্র (Islamic State) জিনিসটা কি? এই ধারণার উৎপত্তি কোথা থেকে হয়েছে? কোরান-হাদিসে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বলে কিছু পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম দুনিয়ায় যেসব সালতানাত ও খেলাফতের অস্তিত্ব ছিল সেগুলোকে রাজ্য অথবা সাম্রাজ্য বলা যায়, রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্র (state) একটি আধুনিক ধারণা। সতের শতক থেকে আধুনিক ইউরোপের রাজ্যগুলো বড় ধরণের কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নতুন ধরণের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে। সমাজ বিজ্ঞানের পরিভাষা হিসাবে ইউরোপের নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাষ্ট্র শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছে নেহায়েত উনিশ শতক থেকে। সাত শতকে মুহাম্মদ ও তার সাহাবিরা মদিনায় যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছিলেন তাকে আর যাই হউক রাষ্ট্র বলা যায় না। তালাল আসাদ যথার্থই বলেছেন – রাষ্ট্রের মতো একটি আধুনিক ধারণা সাত শতকের আরব সমাজের উপর চাপিয়ে দেয়াটা বিভ্রান্তিকর । কিন্তু আইসিসের ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই মিডিয়া, রাজনীতি এবং পশ্চিমের অনেক বিখ্যাত ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখায় ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণাটির যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যায়। ইদানিং ইসলাম নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তাতে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ কথাটি প্রাত্যহিক ও যথেচ্ছ ব্যবহারের একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ ইরফান আহমাদ নামক একজন নৃতাত্ত্বিক ২০০৯ সালে ‘ইসলামি রাষ্ট্রের সিলসিলাঃ মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তা ও ইসলামবাদের প্রতিচ্ছবি’ (Genealogy of the Islamic state: reflections on Maududi’s political thought and Islamism) নামে একটি লেখায় দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র ধারণাটি নেহায়েতই একটি আধুনিক ধারণা, আর এর সিলসিলা খুঁজে পাওয়া যাবে জামায়াতে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা ‘আবুল আলা মওদুদী’র রাজনৈতিক চিন্তায়। সাত শতকের কোন রাজনৈতিক চিন্তা অথবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নয়। ইসলাম ও রাষ্ট্র বিষয়ে আধুনিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল গত শতকের শুরুর দিকে ইরানের সাংবিধানিক বিপ্লব (১৯০৫-১১ খ্রিঃ) এবং তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের বিপ্লব (১৯১৯-২৪ খ্রিঃ) কেন্দ্র করে। খেলাফতের শূন্যস্থান পুরণ করতে গিয়ে রাজনৈতিক ইসলামিস্টরা ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণাটির আবিস্কার করেছেন। খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে ও বিপক্ষে এসময় যেসব বিতর্ক সংগঠিত হয়েছে তাতে প্রায় সব পক্ষই শেষ পর্যন্ত মুস্তফা কামালের সাথে অন্তত খেলাফত ফিরিয়ে আনার বাস্তব অসম্ভাব্যতা সম্বন্ধে একমত হয়েছেন। রশিদ রিদ্দা এবং আবুল আলা মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তা থেকে এসময় ইসলামি মডেলের সরকারের ধারণার আবির্ভাব ঘটেছে 2। এইসব মডেল থেকেই ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ ধারণাটির জন্ম হয়েছে।

আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা অনেক। মানুষের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে, তার পোষাক, শিক্ষা, নৈতিকতা, প্রাত্যহিক আচরণ, বিবাহের বয়স, যৌনতা প্রতিটি ক্ষেত্রেই। সাত শতকের আরব ভুখন্ডে ইসলাম কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল, অথবা তারপরে উমাইয়া, আব্বাসি, ফাতেমি, ওসমানি, সাফাভি, মুঘোল ইত্যাদি যেসব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান মুসলিম দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করেছে তাদের কারোই এই পরিমান ক্ষমতা ছিল না। প্রাচীন ও মধ্যযুগিয় সরকার আনুগত্য ও কর নিয়েই খুশি থাকতো, মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, ধর্ম ও আচার আচরণের উপর ততক্ষন পর্যন্ত কোন হস্তক্ষেপ করতো না, যতক্ষন কোন ধর্ম অথবা আচার শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ব্যবহৃত না হয়েছে। ভারতবর্ষে মুঘোল শাসন ব্যবস্থা এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মুঘোল শাসন ব্যবস্থা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে হস্তক্ষেপ করতো না, সেই ক্ষমতাই তার ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার ক্ষমতা ও হস্তক্ষেপের প্রবনতা ছিল তার চাইতে বহুগুনে বেশি। মূলত এই পরিস্থিতিতেই মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ছাতার নিচে বিকশমান কংগ্রেসের সর্বভারতিয় সেকুলার রাষ্ট্র, মুসলিম লীগের মুসলিম রাষ্ট্র, কমিউনিস্টদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্র দাবির ডামাডোলের মধ্যে মওদুদী তার ইসলামি রাষ্ট্রের (hukumat-e-ilahiya, ‘Allah’s Government’ or ‘Islamic State) ধারণা হাজির করেছেন। ইরফান আহমেদ দেখিয়েছেন যে, ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষে যখন প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, যখন মওদুদী কংগ্রেসের রাষ্ট্র প্রকল্প মুসলমানদের শিক্ষা, আচার ও প্রাত্যহিক জীবনে হস্তক্ষেপ করছে বলে আশংকা করা শুরু করেছিলেন, তখনি তিনি ‘ইসলামি রাষ্ট্রে’র ধর্মতত্ত্ব হাজির করেছিলেন 3। রাষ্ট্রই ছিল সেই সময়কার প্রধান রাজনৈতিক ধারণা। মওদুদী ইসলামি রাষ্ট্র বলতে যে মডেলের কল্পনা করেছিলেন তা অনেকাংশেই পাশ্চাত্যে তার সময়কার অন্যতম প্রভাবশালি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের মতো, মওদুদী তার নিজের লেখাতেই এই দাবি করেছেন। কিন্তু সাত শতকেতো ফ্যাসিবাদের মডেলে কোন ইসলামী রাষ্ট্ররের অস্তিত্ব ছিল না। ইসলামের মধ্যে তাহলে ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণার বৈধতা তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন? মওদুদী এর সমাধান করেছেন কোরানের বিভিন্ন শব্দের নতুন ব্যাখ্যা, বিশেষ করে ‘দ্বীন’ শব্দের নতুন অর্থ আবিস্কার করে। মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তায় দ্বীন এবং রাষ্ট্র এক জিনিস হয়ে গেছে, দ্বীন ইসলাম পরিণত হয়েছে এক ধরণের রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। মওদুদীর চিন্তায় ইসলাম তাই শুধু ধর্ম নয়, রাজনীতিও বটে, এবং এই ইসলামি রাজনীতি দেখতে অনেকটা আধুনিক দুনিয়ার ফ্যাসিবাদের মতো। নবী ইউসুফের শাসনকে মওদুদী তুলনা করেছিলেন মুসোলিনির ডিক্টেটরশিপের সাথে। অবশ্য মওদুদীর দাবি ছিল তিনি কোরান থেকে ইসলামের যে ব্যাখ্যা হাজির করেছেন তাই সহি ইসলাম (Asali Islam), এই ব্যাখ্যা মুসলমানরা ভুলে গিয়েছিল এবং মওদুদী তা আবার ফিরিয়ে এনেছেন। মওদুদীর কোরান ও ইসলাম ব্যাখ্যা তার সমসাময়িক মুসলিম পন্ডিতদের চ্যালেঞ্জের মুখে পরেছিল। দেওবন্দের ধর্মতাত্ত্বিক মনজুর নোমানি মওদুদির বিরুদ্ধে কোরানের ‘রাজনৈতিক ব্যাখ্যা’র অভিযোগ এনেছিলেন। তিনি মওদুদীর কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে তার আগের কোন মুসলিম পন্ডিতই কি কোরানের সঠিক অর্থ ধরতে পারে নাই? মওদুদীর জবাব ছিল – শুধু ইবনে তাইমিয়া কিছুটা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু তিনিও পুরোপুরি সক্ষম হন নাই 4। মওদুদীর এই চিন্তা পরবর্তিতে তার শিষ্য মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা সাইয়েদ কুতুবকেও প্রভাবিত করেছে। মিশরে স্বৈরাচার সেকুলার সরকার ও রাজনৈতিক ইসলামিস্ট মুসলিম ব্রাদারহুডের দ্বন্দে সাইয়েদ কুতুব নিহত হয়েছিলেন। নির্যাতনের শিকার হয়ে তার বহু শিষ্য এই সময় সৌদি আরবে পাড়ি জমায়। রাজনৈতিক ইসলামের সালাফিভবন এবং সালফিবাদের রাজনীতিকরণের শুরু তখন থেকেই। আল-কায়েদার বর্তমান নেতা আইমান আল জাওয়াহিরি কম বয়সে ছিলেন কুতুবের অনুসারি, নিজের বিভিন্ন লেখায় তিনি সরাসরি মওদুদীর অনুসরণও করেন। মুসলিম দুনিয়ায় একদিকে যেমন গণতন্ত্র ও আধুনিকতার প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে তেমনি রাজনৈতিক ইসলামিস্টরাও ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণাকে বাস্তবে পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্র ও পুরোহিতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে আধুনিক ইসলামি রাজনীতির বিকাশ ঘটলেও ইসলামি রাজনীতি বলতে পুঁজিবাদী দুনিয়ায় প্রচলিত অন্যসব রাজনীতির চাইতে বিশেষভাবে আলাদা কিছু তা হাজির করতে পারে নাই। আল্লাহর সার্বভৌমত্বের নামে তারা কতিপয় ব্যক্তির স্বৈরতন্ত্র অথবা উলামা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র কায়েম করেছে। আইসিসের ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ তাই রাজনৈতিক ইসলামের অন্তর্গত সীমবদ্ধতা, প্যারাডক্স এবং ইসলামিস্টদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার বহিপ্রকাশও বটে।

ইসলামের ক্ষেত্রে ধর্ম ও রাজনীতির (sacerdotium and regnum) ‘ফিউশন ফ্রেমওয়ার্ক’ শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বার্নার্ড লুইস, গেলনার, ল্যাম্বটন, হান্টিংটন প্রমুখ পাশ্চাত্যের পন্ডিতরাও ভুমিকা রেখেছেন। কিন্তু ইসলাম ও রাজনীতি বিষয়ে ফিউশন ফ্রেমওয়ার্ক বিরোধি মতামতের অভাব নাই। ভারতবর্ষের পন্ডিত সৈয়দ আহমদ খান উনিশ শতকে প্রচার করেন যে মুসলমানরা যে রাষ্ট্রের অংশই হউক না কেনো, ইসলাম তার কাছে সেই রাষ্ট্রের প্রতিই আনুগত্ব দাবি করে। শিবলি নোমানিও একি মতের প্রচার করেছেন। ব্রিটিশ উপনিবেশের অধিনে মুসলমানরা যখন ভারত ত্যাগ করে অন্য সব মুসলিম দেশে হিজরত করা শুরু করেছিল তখন ব্রিটিশদের অনুরোধে মক্কার মুফতিরা ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, ব্রিটিশ ভারত মুসলমানদের জন্যে দারুল হারব নয়, কারন মুসলমানদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ব্রিটিশদের অধিনেও অক্ষুন্ন আছে। ফ্রেঞ্চরাও আলজেরিয়ায় একিধরণের ফতোয়া দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। বর্তমান সময়কার মুসলিম পন্ডিতদের মধ্যে ভারতের মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান এবং মিশরের আল আশমাওয়ি ফিউশন ফ্রেমওয়ার্কের বিরোধিতা করে আসছেন। আশমাওয়ির মতে ইসলাম যদি কোন বিশেষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমর্থন করতো তবে তার আউটলাইন কোরানেই দেয়া থাকতো, কিন্তু তেমন কিছু কোরানে নাই 5। মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, এইসমস্ত মুসলিম পন্ডিতদের বদলে লুইস, গেলনার, হান্টিংটন প্রমুখরা ইসলাম ও রাষ্ট্র বিষয়ক আলোচনায় মওদুদী ও সাইয়েদ কুতুবের সাথেই একমত পোষন করেন। মওদুদী ও সাইয়েদ কুতুবের মতোই তারা দাবি করেন যে, ইসলামে আদি থেকেই রাষ্ট্র ও ধর্ম অবিচ্ছিন্ন বিষয় এবং ইসলামি রাষ্ট্র ধারণাটি ইসলামে আদিকাল থেকেই আছে।

এই ফিউশন ফ্রেমওয়ার্ক অনৈতিহাসিক। ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বলতে যেমন আধুনিক যুগের পূর্বে কোন ধারণার অস্তিত্ব ছিল না, তেমনি ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে বিচ্ছেদ ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন ভাবে ঘটেছে। ইসলামের উপর খলিফার সর্বময় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে আব্বাসিয় আমলে উলামারা এই বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন, এই সময় থেকে খলিফারা রাজনৈতিক এবং উলামারা ধর্মীয় নেতৃত্ব হিসাবে আবির্ভুত হয়েছিল। আবার আব্বাসিয় খেলাফতের দুর্বলতার সময় বুইয়িদরা খলিফার কাছ থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে শুধু ধর্মীয় ফিগারহ্যাডে পরিণত করেছিল। ধর্ম ও রাজনীতির এইরকম বহু বিভাজন ইসলামের ইতিহাসে পাওয়া যায়। মুঘোল ভারতে শরিয়া আইনের পাশাপাশি জাওয়াবিত নামে সেকুলার আইন প্রচলিত ছিল। আর ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ নাম নিয়ে আইসিসের আগে ইতিহাসে আর কোন কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হাজির হয়েছে তার খোঁজ করলে আমরা খুঁজে পাবো ‘ইসলামিক স্টেট অফ আফগানিস্তানে’র নাম, যার জন্ম হয়েছিল আফগানিস্থানে সোভিয়েত পতনের পর মার্কিন সমর্থনে। পুরো নব্বই দশকে তালেবানদের ‘ইসলামি আমিরাতে’র বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো এই ‘ইসলামি রাষ্ট্র’কেই সমর্থন দিয়েছে। ২০০১ সাল পর্যন্ত এই ইসলামি রাষ্ট্র জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্ব করতো।

Notes:
1 Ahmad. Irfan. (2009). Genealogy of the Islamic state: reflections on Maududi’s political thought and Islamism. Journal of the Royal Anthropological Institute. Volume 15. P. 147.
2 El-Affendi. Abdelwahab A. (2010) Umma, state and movement: events that shaped the modern debate. In: Political Islam: context versus ideology. Saqi Books, London, pp. 10-36.
3 Ahmad. Irfan. (2009). Genealogy of the Islamic state: reflections on Maududi’s political thought and Islamism. Journal of the Royal Anthropological Institute. Volume 15. P.152.
4 Ibid. P.156.
5 Ibid. P. 146.

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২৬ thoughts on “‘ইসলামি রাষ্ট্রে’র সিলসিলা

  1. রাষ্ট্রের ধারণা আধুনিক?
    রাষ্ট্রের ধারণা আধুনিক? রাষ্ট্র কাকে বলে? রাষ্ট্রের উৎপত্তি কবে ঘটে? মোহাম্মদের আমলে রাষ্ট্র না হতে পারার কারণ কি? আমরা তো জানি, দাসতান্ত্রিক ব্যবস্থার গোড়াপত্তনের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। লেনিনের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখা ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ বইটিকে তো বাতিল করে দিলে! সমাজব্যবস্থার রাজনৈতিক উপরিকাঠামো রাষ্ট্রের অস্তিত্ত্ব ছাড়া কিভাবে কিসের ওপর দাঁড়াবে?

    তোমার বক্তব্য একেবারেই মনগড়া, কিছু তথাকথিত বিশেষজ্ঞের ওপর আশ্রয়জাত বলে মনে হচ্ছে।

    1. লেনিন কি অনাধুনিক মানুষ ছিলেন
      লেনিন কি অনাধুনিক মানুষ ছিলেন না কি? লেনিন রাষ্ট্র জিনিসটারে কিভাবে থিওরাইজ করেছেন সেটা ভিন্ন বিষয়, এই লেখায় লেলিনের রাষ্ট্র বিষয়ক ধারণা বাতিল অথবা গ্রহণ কোনটা করার ইচ্ছাই আমার নাই। আধুনিক কালের পূর্বে রাষ্ট্রের কনসেপ্ট ছিল কি না সেইটা হইলো প্রশ্ন। তোমার যদি মনে হয় আধুনিক কালের আগেও ছিল, তাইলে কিভাবে এবং কার লেখায় ছিল সেই দিক নির্দেশনা দেয়ার অনুরোধ থাকলো।

  2. ওপরে কিছু প্রশ্ন করছি, তোমার
    ওপরে কিছু প্রশ্ন করছি, তোমার সিদ্ধান্তের সাপেক্ষে। তার উত্তর না দিয়ে আমার কাছে প্রশ্নের উত্তর চাইতেছো। এটা বিতর্কের পদ্ধতি কিনা বুঝতেছি না। তোমার লেখা পড়লাম। পড়ে অসঙ্গতি দেখে প্রশ্ন করলাম। তুমি জবাব না দিয়া উল্টা আমারে প্রশ্ন করতেছো কেন?

    লেনিন আধুনিক মানুষ ছিল কিনা এটা আলোচ্য বিষয় নয়। এদিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছো কেন? লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইটা কি পড়েছো? পড়লে দেখতে যে, সেখানে রাষ্ট্রের উৎপত্তির ইতিহাস বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। ওই বইয়ে দাস সমাজের পরিচালনব্যবস্থাকে রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যে সমাজে কিনা একদলের হতে ছিল বিধি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা, অন্যরা বাধ্য ছিল তা মেনে নিতে।

    যদি রাষ্ট্রের ইতিহাস না জেনে, রাষ্ট্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানো, তাহলে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এবং সেই প্রশ্নের উত্তরও তোমাকে খুঁজতে হবে। লেখক যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেটা সঠিক কিনা তা নিশ্চিত না হয়ে যদি প্রচার করেন, এবং তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেক্ষেত্রে নিজের মতের সঠিকতা প্রতিপণ্ণ করা লেখকেরই দায়িত্ব।

    আমি আবারও জানতে চাচ্ছি, রাষ্ট্রের ধারণা আধুনিক? রাষ্ট্র কাকে বলে? রাষ্ট্রের উৎপত্তি কবে ঘটে? মোহাম্মদের আমলে রাষ্ট্র না হতে পারার কারণ কি? সমাজব্যবস্থার রাজনৈতিক উপরিকাঠামো রাষ্ট্রের অস্তিত্ত্ব ছাড়া কিভাবে কিসের ওপর দাঁড়াবে?

    প্রথমে যে সিদ্ধান্ত টেনেছিলাম, ‘তোমার বক্তব্য একেবারেই মনগড়া, কিছু তথাকথিত বিশেষজ্ঞের ওপর আশ্রয়জাত’, তোমার মন্তব্য দেখে সেই মতটা আরও অটল হলো।

  3. আমিতো বিতর্কের উদ্দেশ্যেই
    আমিতো বিতর্কের উদ্দেশ্যেই পালটা প্রশ্ন করেছি। তোমার প্রশ্নগুলা আর লেনিনকে টেনে আনাটা যুৎসই হইছে কি না তা জানার জন্যেই প্রশ্ন করলাম। তুমি সমাজ ব্যবস্থার রাজনৈতিক উপরিকাঠামোরে রাষ্ট্র নামে ডাকতে পারো, আগের কালের নগর, গ্রাম, রাজ্য অথবা সাম্রাজ্যের কাঠামোরেও রাষ্ট্র বলতে পারো, লেলিন রাষ্ট্রের আবির্ভাব সম্বন্ধে যে থিওরি দিসে তাও মানোট পারো। আমার তো কোন আপত্তি নাই। আমি এইখানে লিখছি যে – “রাষ্ট্র (state) একটি আধুনিক ধারণা। সতের শতক থেকে আধুনিক ইউরোপের রাজ্যগুলো বড় ধরণের কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নতুন ধরণের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তাকেই ‘রাষ্ট্র’ বলা হয়। সমাজ বিজ্ঞানের পরিভাষা হিসাবে ইউরোপের নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাষ্ট্র শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছে নেহায়েত উনিশ শতক থেকে। সাত শতকে মুহাম্মদ ও তার সাহাবিরা মদিনায় যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছিলেন তাকে আর যাই হউক রাষ্ট্র বলা যায় না। তালাল আসাদ যথার্থই বলেছেন – রাষ্ট্রের মতো একটি আধুনিক ধারণা সাত শতকের আরব সমাজের উপর চাপিয়ে দেয়াটা বিভ্রান্তিকর”। এখন তোমার যদি এই কথাগুলি ভুল অথবা মনগড়া মনে হয় তবে কেনো ভুল ও কিভাবে মনগড়া সেইটা আমারে বুঝাইয়া বলো। আমি লেনিনমূর্খ মানুষ, তবে লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইটি না পড়লে রাষ্ট্র ধারণা বিষয়ে কথা বলা যাবে না তা আমি জানতাম না। আশা করি ভবিষ্যতে সময় পেলে পড়বো।

  4. আচ্ছা, তুমি যেহেতু
    আচ্ছা, তুমি যেহেতু লেনিনমূর্খ, তাহলে লেনিন বাদ দিলাম।

    এবার আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেও। তুমি যে বললা রাষ্ট্র আগে ছিল না, এটা আধুনিক ইউরোপের দান, এর প্রেক্ষিতেই প্রশ্ন করছি।

    তুমি যে রাষ্ট্র ছিল না বলছো, সেই ‘রাষ্ট্র’টা আসলে কি, বা রাষ্ট্র কাকে বলে? রাষ্ট্রের উৎপত্তি কবে ঘটে? আগেকার সমাজগুলোতে কোথাও কি আধুনিক ইউরোপে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র ধারণার উপাদানগুলো দেখ গেছে? মোহাম্মদের আমলে রাষ্ট্র না হতে পারার কারণ কি? সমাজব্যবস্থার রাজনৈতিক উপরিকাঠামো রাষ্ট্রের অস্তিত্ত্ব ছাড়া কিভাবে কিসের ওপর দাঁড়াবে? আরও জিজ্ঞেস করা যায়, নগর রাষ্ট্র শব্দবন্ধের দ্বারা কি ওসব দেশে রাষ্ট্রের অস্তিত্ত্বকে বোঝানো হয় নাকি এটা ভিন্ন কিছু। তোমার ব্যাখ্যা পেলে আলাপ এগুনো যায়।

    তবে আমার আশঙ্কা হইতেছে, তুমি প্রথমে লেনিনমূর্খ হইলা ঠিকাছে, তয় পরে আবার রাষ্ট্রমূর্খ না হইয়া যাও। 🙂

    1. তুমি প্রথম থেকেই ভুল তর্ক
      তুমি প্রথম থেকেই ভুল তর্ক করছো। আমার পরবর্তি দুইটা মন্তব্যেও আমার বক্তব্য তোমার কাছে পরিস্কার হয় নাই। রাষ্ট্র কাকে বলে সেই বিষয়ে তো পন্ডিতদের মধ্যে মতের অভাব নাই। তুমি যদি মনে করো সমাজ ব্যবস্থার রাজনৈতিক উপরিকাঠামো যেই জিনিসটার উপরে দাঁড়ায় সেইটাই রাষ্ট্র, তা তুমি ভাবতেই পারো। তোমার এই সংজ্ঞা সঠিক না বেঠিক, গ্রহনযোগ্য না অগ্রহনযোগ্য সেই বিষয়ে অন্তত এই মন্তব্যের ঘরে তর্ক করা সম্ভব না। রাষ্ট্রের কোন সংজ্ঞা সঠিক আর কোন সংজ্ঞা বেঠিক সেই বিষয়েও এইখানে আমি কিছু লেখি নাই। আমি লিখেছি রাষ্ট্র শব্দ ও ধারনাটির ব্যবহার নিয়ে। তুমি যে নগর-রাষ্ট্রের কথা বললা, প্রাচীন গ্রিস বা রোমের নগর-রাষ্ট্রগুলা কি নিজেদেরকে নগর-রাষ্ট্র বলতো? আমার জানা মতে বলতো না, আমার জানা ভুল হয়ে থাকলে ধরাইয়া দিবা। আধুনিক যুগের পুর্বে কোন মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানও নিজেদেরকে ‘রাষ্ট্র’ অথবা ‘স্টেট’ নামে ডাকে নাই। আধুনিক কালে আরবিতে state শব্দের যে অনুবাদ করা হয় তা হলো ‘দৌলা’, যার আদি অর্থ ‘ডাইনেস্টি’। মেকিয়াভেলির ‘প্রিন্স’ বইয়েই প্রথমবার ‘state’ শব্দটিকে মোটামুটি আধুনিককালে প্রচলিত অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। রাষ্ট্র শব্দটা সমাজ বিজ্ঞানের পরিভাষায় ঢুকছে নেহায়েত উনিশ শতকে। তুমি রাষ্ট্রের ইতিহাস নিয়া প্রশ্ন করতাছো, কিন্তু আমি এইখানে আলোচনা করেছি ‘রাষ্ট্র ধারণা’র ইতিহাস নিয়ে। দুইটা এক জিনিস না। তুমি আগের কালের যেসব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিজেদেরকে রাষ্ট্র বলতো না তাদের উপরেও রাষ্ট্র শব্দটা চাপাইয়া দিতে পারো, অনেকেই দেয়। আমি এই বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনে আগ্রহি।

  5. ব্যক্তি মালিকানা আছে এমন
    ব্যক্তি মালিকানা আছে এমন সমাজে উৎপাদনব্যবস্থা স্বতঃস্ফূর্ত হয়। ব্যক্তি মালিক তার ইচ্ছামাফিক উৎপাদনের পথে আগান। কিন্তু সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ও বিকশিত করতে গেলে সেখানে ন্যুনতম পরিকল্পনা দরকার পড়ে। আবার যেহেতু মালিকানা অসম, তাই প্রয়োজন পড়ে মালিকানার দখল সংক্রান্ত বিধি মানতে সকলকে বাধ্য করা। আর প্রধান যে বিষয়টা থাকে, উৎপাদিত দ্রব্য বা পণ্যের বণ্টনব্যবস্থা। এই সমস্ত বিষয়ই নিয়ন্ত্রণ করে সমাজের একটি অংশ। এটা তারা করতে পারে পুঁজি ও বাহিনী প্রধানত তাদের দখলে রাখতে পারার কারণে। সমাজের ওপর চেপে বসা এই নীতি, বিধান, ও বাহিনীসম্বলিত উপরিকাঠামোটাই রাষ্ট্র।

    নামটা কবে দেয়া হলো, আধুনিক যুগে না আগে, তাতে কিছু যায় আসে না। কথাটা হলো, একই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জিনিসটা আগে ছিল কিনা? যেমন পণ্য শব্দটা যদি হয় আধুনিক ইউরোপের আবিষ্কার, তার অর্থ তো এটা হয় না যে, আগে পণ্য ছিল না। আগে পণ্য ছিল, পণ্যের আজকের যা বৈশিষ্ট্য তা আগেও ছিল। শব্দের হেরফেরে তার অস্তিত্ত্ব বাতিল হয় না। রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণা আধুনিক কালেই সূত্রবদ্ধ হয়েছে, তা কিন্তু এটা বলতে পারে না যে, আজকে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে যেসব বিষয়কে আমলে নেয়া হয় তা থাকা সত্বেও আগেরগুলো রাষ্ট্র হবে না।

    1. তোমার সাথে বিতর্কে একটা লাভ
      তোমার সাথে বিতর্কে একটা লাভ হইছে যে একটা লাইন কিঞ্চিত পরিবর্তন করে দিলাম – সতের শতক থেকে আধুনিক ইউরোপের রাজ্যগুলো বড় ধরণের কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নতুন ধরণের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে। আশা করি এতে রাষ্ট্র কাকে বলে সেই বিষয়ে কোন স্টেটমেন্ট অন্তত কেউ পাবে না এই লাইনে।

  6. হ, এইটা বললে বিতর্ক এড়ানো
    হ, এইটা বললে বিতর্ক এড়ানো যায়! কিন্তু মোহাম্মদের আমলে রাষ্ট্র ছিল না বললে, সেই ঝামেলা থেকেই যায়! এটা কি বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত হবে, নাকি শব্দারোপ দিয়ে?

  7. রাস্ট্র বিজ্ঞান নিয়ে আবার
    রাস্ট্র বিজ্ঞান নিয়ে আবার পড়াশোনা করতে হবে। ইসলামী শাসন ব্যবস্থার পক্ষে আপনার ভুমিকা প্রসংশনীয়। আপনি ভবিষ্যতের ফরহাদ মজহার হয়ে উঠছেন। জয় সুফি ইসলামের, জয় শান্তির ধর্মের।

  8. //লেনিনের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা
    //লেনিনের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখা ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ বইটিকে তো বাতিল করে দিলে! সমাজব্যবস্থার রাজনৈতিক উপরিকাঠামো রাষ্ট্রের অস্তিত্ত্ব ছাড়া কিভাবে কিসের ওপর দাঁড়াবে?//

    // লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইটা কি পড়েছো? পড়লে দেখতে যে, সেখানে রাষ্ট্রের উৎপত্তির ইতিহাস বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে//

    ==>> কি ভয়ানক ব্যাপার …
    পারভেজ আলম তো লেনিনের “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” বইটা না পড়ে (এবং এঙ্গেলসের “পরিবার, ব্যক্তি-সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি” বইটিও না পড়েই) এই লেখাটি লিখে মহা অপরাধ করে ফেলেছেন …

    পারভেজ আলমরে তীব্র নিন্দা জানাই …

  9. এবারে- পারভেজের মূল আলোচনার
    এবারে- পারভেজের মূল আলোচনার দিকে এগুনো যাক …

    যতটুকু বুঝতে পারছি- পারভেজ আলম এই পোস্টে যা বলতে চেয়েছেন সেটা হচ্ছে- ইসলামে তথা কোরআন-হাদীসে “ইসলামি রাষ্ট্র” বলে কিছু নাই, ইসলামের ক্ষেত্রে ধর্ম ও রাজনীতির (sacerdotium and regnum) ‘ফিউশন ফ্রেমওয়ার্ক’ অনৈতিহাসিক- ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বলতে যেমন আধুনিক যুগের পূর্বে কোন ধারণার অস্তিত্ব ছিল না, তেমনি ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে বিচ্ছেদ ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন ভাবে ঘটেছে …

    “ইসলাম ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে বিচ্ছেদ” ইতিহাসের কোন কোন পর্বে কি কিভাবে ঘটেছে ও কতখানি ঘটেছে- সেই আলোচনাকে ভবিষ্যতের জন্যে তুলে রেখে আপাতত এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি যে- এই কথিত “বিচ্ছেদ” ঘটার আগের অবস্থা বা দশা কি ছিল? একত্রীভূত না থাকলে বা “ফিউশন” না ঘটলে- বিচ্ছেদের প্রশ্নই বা আসে কি করে? আরো স্পেসিফিকভাবে যদি বলি- আরবের ইতিহাসে মুহম্মদ সা এর আবির্ভাব ও উত্থানের ইতিহাসকে কি বলবেন? কতখানি ধর্ম আর কতখানি রাজনীতি? কুরআন বা হাদীসে (তথা মুহম্মদ প্রচারিত) নিয়ম-কানুনগুলো আসলে কি? এবং মদীনায় হিজরতের পর থেকে মদীনায় ও আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে যুদ্ধজয়ের পর থেকে এবং মক্কা বিজয়ের পর থেকে মুহম্মদের হাতে যে অঞ্চলের শাসনভার এলো- সেটাকে কি বলবেন? কিংবা পরবর্তীকালে খলিফাদের শাসনামলে? আপনি বলেছেন- সেটাকে রাজ্য বা সাম্রাজ্য বলা যায়- রাষ্ট্র নয়। আচ্ছা ধরলাম- রাষ্ট্র নয়, সেসব কেবলই রাজ্য বা সাম্রাজ্য … আপনি কি বলবেন- রাজ্য বা সাম্রাজ্যগুলো “রাজনীতি”র বাইরে ছিল কিংবা “রাজনীতি”ও অতিশয় আধুনিক ব্যাপার-স্যাপার?

  10. //তোমার বক্তব্য একেবারেই
    //তোমার বক্তব্য একেবারেই মনগড়া, কিছু তথাকথিত বিশেষজ্ঞের ওপর আশ্রয়জাত বলে মনে হচ্ছে//
    ==>> পারভেজের লেখাটাকে “কিছু তথাকথিত বিশেষজ্ঞের ওপর আশ্রয়জাত” মনে হতেই পারে, কিন্তু আনিসের কমেন্ট পড়ে আরো ভালো করে বুঝতে পারি- তার মধ্যে এই “আশ্রয়জীবিতা”র সমস্যা আরো প্রকটভাবে আছে …

    লেনিন/ এঙ্গেলস- ভালো করে পাঠ থাকলে (বুলি আওড়ানোর মত করে মুখস্থ টাইপ পাঠ না) এবং সেই সাথে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে পাঠ থাকলে- পারভেজের লেখায় “রাষ্ট্র” বলতে কি বুঝাতে চেয়েছে- সেটা বুঝতে সমস্যা হতো না … এবং জোর করে লেনিনকেও টেনে আনতে হতো না বলে বোধ করি …

    সবচেয়ে হাস্যকর যেটা লেগেছে সেটা হচ্ছে, লেনিনের বক্তব্যের শুদ্ধতা প্রমানের মরিয়া চেস্টায় … যেহেতু লেনিন জানিয়েছেন (আসলে এঙ্গেলস জানিয়েছেন, লেনিন এঙ্গেলসকে কোট ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন) যে, শ্রেণীর উদ্ভবের সাথে সাথে রাষ্ট্রের উদ্ভব তথা “দাসতান্ত্রিক ব্যবস্থার গোড়াপত্তনের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে”- সেহেতু পারভেজ আলমের বলা “রাষ্ট্র (state) একটি আধুনিক ধারণা। সতের শতক থেকে আধুনিক ইউরোপের রাজ্যগুলো বড় ধরণের কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নতুন ধরণের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে”-এর মানে আনিস রায়হানের কাছে গিয়ে দাড়িয়েছেঃ “লেনিনের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখা ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ বইটিকে তো বাতিল” করার সমার্থক …

    অথচ, পারভেজ আলমের লেখার ত্রুটি লেনিন বা তার “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” বইটির প্রসঙ্গ না টেনেই ধরিয়ে দেয়া যেত বলে মনে হয় …! প্রসঙ্গক্রমে লেনিনকে কোট করা যেতেই পারে- কিন্তু পারভেজ আলমের লেখার মধ্য দিয়ে লেনিনের তত্ত্বরে ভুল প্রমান করার চেস্টা হয়েছে বিধায় আঁতকে উঠতে হবে – এমন আচরণ খুব দৃষ্টিকটু? এমন আচরণও একই রকম “আশ্রয়জীবিতা” বলেই মনে হয় …

  11. শুরুর এই প্রশ্নটি জরুরি,
    শুরুর এই প্রশ্নটি জরুরি, কেননা মুহম্মদ সা কেবল ধর্ম প্রবর্তকই ছিলেন না, তিনি ও তার সঙ্গীসাথী বা সাহাবিরা ছিলেন ততকালীন- শাসক, যোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ। তার/ তাদের পরিচালিত শাসনরাজ্য (“রাষ্ট্র” না হলে না হোক, “রাজ্য” এবং পরবর্তীকালেরগুলো “সাম্রাজ্য” নাহয় হলো) এবং শাসনরাজ্যের ভেতরে থাকা জনগণ (নাকি প্রজা?)-কে নিয়ন্ত্রণ, পরিচালন, তথা শাসনের নিমিত্তে মুহম্মদ সা ও তার সাহাবীরা যা যা বলেছেন কিংবা যেভাবে শাসন কার্য চালিয়েছেন- সেগুলোরই লিখিত রূপই তো কোরআন ও হাদীস। যা বাস্তবে মুহম্মদের মৃত্যুর পরে পরবর্তী শাসকদের শাসনরাজ্য ও কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার নিমিত্তে সংকলিত হয়েছে …

    ফলে- ইসলামের উদ্ভবের সাথে রাজনীতির যোগ কেবল ষোলআনাই নয়, ইসলাম নামক ধর্মের উতপত্তি ও পরবর্তীকালে এর প্রসার বা সাম্রাজ্যবিস্তার- সম্পূর্ণই রাজনৈতিক ঘটনা। (আদতে কেবল ইসলাম নয়- যাবতীয় ধর্মসমূহের উদ্ভব- বিস্তার ও প্রসারের সাথে রাজনীতির যোগাযোগ আছে- সামন্তীয় কালে- রাজার আইন-কানুন বা নিয়ম-নীতিকেই ধর্ম হিসাবে প্রচারের চল ছিল, মুহম্মদ সা ব্যতিক্রম নন) …

    এবারে, তাহলে আসা যাক- ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা বলতে আধুনিক যুগের আগে কোন কিছু ছিল কি না সেই প্রসঙ্গে যাওয়া যাক …
    পারভেজ আলমের প্রথম ও প্রধান যুক্তিটি হচ্ছে- কোরআন ও হাদীসে “ইসলামি রাষ্ট্র” বলে কিছু নেই। তালাল আসাদ থেকেও তিনি কোট করে জানাচ্ছেন – “রাষ্ট্রের মতো একটি আধুনিক ধারণা সাত শতকের আরব সমাজের উপর চাপিয়ে দেয়াটা বিভ্রান্তিকর”! আমার বরং- পারভেজ আলমের (এবং তালাল আসাদেরও কি?- আমি এখনো মূল লেখাটি পড়িনি) “রাষ্ট্র” শব্দটির উপরে অতি-গুরুত্বারোপকেই বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে … ।

    ফলে, আমি পারভেজ আলমের একটি লাইনের দিকে দৃষ্টি দেই- “ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম দুনিয়ায় যেসব সালতানাত ও খেলাফতের অস্তিত্ব ছিল সেগুলোকে রাজ্য অথবা সাম্রাজ্য বলা যায়, রাষ্ট্র নয়” … ধরে নিচ্ছি- রাষ্ট্র নয় … রাজ্য বা সাম্রাজ্য, কিংবা খেলাফত কিংবা সালতানাত। “ইসলামি রাজ্য” কিংবা “ইসলামি সাম্রাজ্য” কিংবা “ইসলামি খেলাফত” যদি বলি? তাহলে কি দাঁড়ায়? আইএস – এর নাম ইসলামিক স্টেট- কিন্তু তাদের যাবতীয় ডকুমেন্ট ঘাটলে দেখবেন- তারা বারেবারে খেলাফত প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। তারা আধুনিক রাষ্ট্রের চিন্তাধারার ধারে কাছে কি আছে? এর মাঝে জাতিরাষ্ট্র গঠনের, বুর্জোয়া আধুনিক রাষ্ট্র, প্রজাতন্ত্র গঠনের কোন কিছু কি পাওয়া যায় বা যাবে? যে কায়দায় তারা সাম্রাজ্য বা খেলাফত ঘোষণা করছে এবং বাড়ানোর “খায়েশ” পোষণ করছে- তার সাথে আধুনিক “রাষ্ট্র” ধারণার মিলই বা কতখানি?

    দ্বিতীয়ত, কোরআনে বা হাদীসে “ইসলামি রাষ্ট্র”- শব্দগুলো না থাকতে পারে, কিন্তু ইসলামের উদ্ভবের ইতিহাসে কি আপনার ভাষায় রাজ্য বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘটনা নাই? মুহম্মদ সা যে অঞ্চলে তার নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন- সেটাকে আপনি রাষ্ট্র না বলতে পারেন- কিছু একটা নিশ্চয়ই তো বলবেন, নাকি? সেটা কি তিনি ভিন্ন ধর্মালম্বী এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন নি? মদীনায় হিজরতের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কি তিনি তার সেই নিয়ন্ত্রনাধীন টেরিটরি বিস্তারের চেস্টা করেননি? তার মৃত্যুর পরেও কি তার পরবর্তী শাসকেরা একই কাজ অব্যাহত রাখেননি?

    তৃতীয়ত, কোরআনে বা হাদীসে থাকা না থাকা দিয়ে “সহী” বা “অ-সহী” বিচারের কট্টর সমালোচনাকারী হিসাবে আমি জানতাম ও চিনতাম! সেই আপনাকেই এই প্রবন্ধে দুটো লাইন লেখতে দেখে অবাক হলাম ও মজা পেলামঃ
    //কোরান-হাদিসে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বলে কিছু পাওয়া যায় না//, //ইসলাম যদি কোন বিশেষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমর্থন করতো তবে তার আউটলাইন কোরানেই দেয়া থাকতো, কিন্তু তেমন কিছু কোরানে নাই// …

    এই যে কোরআনে আউটলাইন নাই (আসলে কিন্তু আছে) বা কোরআনে “ইসলামী রাষ্ট” বলে কিছু নাই- বলার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত টানা যে- “ইসলামী রাষ্ট্র” ইসলাম বহির্ভূত ধারণা- এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি- ধর্মীয় ফতোয়াবাজির সাথে মেলে! বস্তুত আইসিস তথা আপনার কথিত সালাফি-রাও একই পদ্ধতিতেই কোরআনিক ব্যাখ্যার দাবির মধ্য দিয়ে তাদের “ইসলাম”কেই”সহী” ইসলাম বলে ঘোষণা করে …

  12. এবারে আসি সবচেয়ে কঠিন জায়গা
    এবারে আসি সবচেয়ে কঠিন জায়গা …

    মওদুদ ও ব্রাদারহুড নেতা সাইয়েদ কুতুবের ধারণাঃ “ইসলামে আদি থেকেই রাষ্ট্র ও ধর্ম অবিচ্ছিন্ন বিষয় এবং ইসলামি রাষ্ট্র ধারণাটি ইসলামে আদিকাল থেকেই আছে” এবং তারা এমনটা প্রচারও করেছেন, সেই জায়গায় ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করে যদি আমিও দেখি- ঘটনাটা আসলে ঠিক এটাই, অর্থাৎ মওদুদ ও কুতুব আসলে ভুল কিছু বলেন নি- ভুল বলা না বলার চেয়েও বড় ব্যাপার- আমি খুজে পেলাম যে- বাস্তবে ইসলামের মধ্যে বাস্তবে এমন উপাদান থাকার কারণেই মওদুদী- কুতুব বা হালের আইএসরা এমন ইসলামী খেলাফতের খায়েশ দেখে … তাহলে কি যেহেতু মওদুদীর মত কুখ্যাত ব্যক্তি এমন ধারণা পোষণ কুরতেন বিধায়- আমার সেটা চেপে যেতে হবে? চেপে যাওয়ার প্রয়োজন কোনদিন ফিল করিনি, কিন্তু পারভেজ আলমের প্রেজেন্টেশন এরকম ফিলিং তৈরি করে বৈকি …

    পারভেজ আলম বলেছেনঃ //লুইস, গেলনার, হান্টিংটন প্রমুখরা ইসলাম ও রাষ্ট্র বিষয়ক আলোচনায় মওদুদী ও সাইয়েদ কুতুবের সাথেই একমত পোষন করেন। মওদুদী ও সাইয়েদ কুতুবের মতোই তারা দাবি করেন যে, ইসলামে আদি থেকেই রাষ্ট্র ও ধর্ম অবিচ্ছিন্ন বিষয় এবং ইসলামি রাষ্ট্র ধারণাটি ইসলামে আদিকাল থেকেই আছে//-
    লুইস, গেলনার, হান্টিংটন সাহেবদের ভাগ্য যে- তাদেরকে পারভেজ আলম মওদুদী কিংবা কুতুবী বলে আখ্যা দেননি- যেমনটা অভিজিৎ রায়কে তিনি সালাফী সেক্যুলার নাম দিয়ে ফেলেছিলেন … এই যে- প্রমুখরা মওদুদী ও কুতুবের সাথে একমত- এভাবে বলা দেখে আমি নিজেও ভয়ে ভয়ে লেখছিলাম- যখন আমি বলতে যাচ্ছিলাম যে- মুহম্মদ সা এর রাজ্য ইসলামিক রাজ্য কিংবা মুহম্মদ সা রাজনীতির বাইরের মানুষ তো নন, বরং তিনি একজন ঐ আমলের প্রধানতম রাজনৈতিক! ভয়টা এমন যে, আমাকেও না পারভেজ আলম মওদুদী সেক্যুলার বা কুতুবী নাস্তিক বলে আখ্যা দেয় …

    এবং যেভাবে প্রমুখ পন্ডিতদের ইসলামের ক্ষেত্রে ধর্ম ও রাজনীতির (sacerdotium and regnum) ‘ফিউশন ফ্রেমওয়ার্ক’ শক্তিশালী করার ভুমিকা রাখার দায় দিয়েছেন- তেমনি করে আমাকেও কখন যে, পারভেজ আলম “ইসলামিক রাষ্ট্রের” প্রচারক কিংবা “ধর্ম-রাজনীতির ফিউশনের ফ্রেমওয়ার্ক” শক্তিশালী করার মাধ্যমে আইএসের চিন্তাভাবনা ধারণ, লালন ও প্রসার করা দায়ে অভিযুক্ত করে … ভীষণ ভয়ে কাপতে কাপতে এসব লিখেই ফেললাম …

    ভরসা একটাই যে- পাঠক হয়তো লজিক আর ফ্যালাসির মধ্যে পার্থক্য বুঝে; ছাগলের দাড়ি আছে, অমুকেরও দাড়ি আছে- ফলে অমুক ছাগল- তথা অভিজিৎ কোরয়ান-হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে বলেছে মুহম্মদ বিধর্মীদের কচুকাটা করে করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছে, সালাফিরাও কোরআন-হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে বলে- মুহম্মদ বিধর্মীদের কচুকাটা করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছে- ফলে অভিজিৎ একজন সালাফি … এই মার্কা যুক্তি পাঠকদের কাছে হয়তো রসিকতার অধিক কিছু নয় … এই ভরসাতেই অকপটে মনের কথা বলে গেলাম …

  13. আনিস রায়হানের প্রথম কমেন্টেই
    আনিস রায়হানের প্রথম কমেন্টেই এরকম খাপছাড়া আলাপ সালাপ দেখে – দুই চাইরটা কথা বলে নিতে হলো …
    যাহোক, পারভেজ আলমের লেখাটায় আসা যাক …

    আমি ধরে নিচ্ছি- পারভেজ আলম যখন বলেছেন- “রাষ্ট্র (state) একটি আধুনিক ধারণা”- তখন পারভেজ আলমের “রাষ্ট্র”কে ধরে নিচ্ছি “আধুনিক রাষ্ট্র”, “আধুনিক জাতি রাষ্ট্র” বা মার্কস এঙ্গেলসের ভাষায় “বুর্জোয়া রাষ্ট্র” বুঝিয়েছেন। (@আনিস রায়হানঃ আজকে এই চল কিন্তু নতুন না- আজকের বিভিন্ন আলাপ আলোচনায় পাবেন- অনেকেই “রাষ্ট্র” বলতে ‘বুর্জোয়া রাষ্ট্র’ বা “আধুনিক রাষ্ট্র” বুঝান … এমনকি কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতেও বলা হচ্ছেঃ the state is nothing more than a committee for managing the common affairs of the bourgeoisie. এখানে state বলতে modern state-ই বুঝাতে চেয়েছেন, দাস আমলের state নিশ্চয়ই নয়!)

    সেই অর্থে পারভেজ আলমের “সতের শতক থেকে আধুনিক ইউরোপের রাজ্যগুলো বড় ধরণের কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নতুন ধরণের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে”- কথাটা ঠিক ধরে নিতে পারি- সতের শতকের দিকে ইউরোপজুড়ে বুর্জোয়া বিপ্লবের হাত ধরে এই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পত্তন হয় … কিন্তু, তার আগে কোন রাষ্ট্রই ছিল না- এমনটা যদি তার দাবি হয়, সেইটা ভুল … সেইটা মার্কসবাদ অনুযায়ী কেবল না- প্রচলিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষাতেও ভুল …

    রাষ্ট্র শব্দটার ব্যাপক প্রচলন ১৬ শতকের দিকে হলেও- ১৬ শতকের আগে রাষ্ট্র ছিল না- এমনটা কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানই দাবী করে না … কিংবা, রাষ্ট্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী আগের আমলের ডেফিনিট টেরিটরির সেন্ট্রালাইজড রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র বলা না যাওয়ার কোন কারণ দেখি না …

    প্রাচীনকালের রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সামন্তীয় আমলের রাষ্ট্র ব্যবস্থা, মধ্যযুগের রাষ্ট্রব্যবস্থা- কিংবা ইতিহাসের গ্রীক রোমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা আরবের রাষ্ট্র ব্যবস্থা- এসবও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ পঠিত বিষয় …

  14. আসলে বিভিন্ন ক্লাসিক দর্শন,
    আসলে বিভিন্ন ক্লাসিক দর্শন, মতবাদ, ইজম কাল্টে পরিণত হয় তার অন্ধ অনুসারীদের দ্বারা। এরপর তার দাসত্ব করে এই সব ‘জ্ঞানীরা’ যুগের হাজারও বিচিত্র সব সমস্যার অব্যর্থ সমাধান বা ব্যাখ্যা খুজে ঐ সব দর্শন, মতবাদের মধ্যে। দ্রুত বর্ধনশীল পুজিবাদ,সাম্রাজ্যবাদ ঐ সব নিষ্ফল ব্যখ্যাকে পাশে ফেলে আরও শক্তিশালী হয়ে যুগোপযোগী হয়ে উঠে।

  15. আরেকটা বিষয়ে একটু করে বলে যাই
    আরেকটা বিষয়ে একটু করে বলে যাই …
    রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা রাষ্ট্র কর্তৃক ক্ষমতা চর্চা প্রসঙ্গ … পারভেজ আলমের আলোচনা পড়লে মনে হয়- আজকের আধুনিক রাষ্ট্র যে পরিমাণ ক্ষমতার চর্চা করে, মানুষের জীবনের যতখানি পরিধিতে ক্ষমতা চর্চা করে- সাত শতকের আরব ভূখন্ডের (কিংবা সতের শতকের আগের কালের রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো) রাজ্য, সাম্রাজ্যগুলো ক্ষমতা চর্চা করতো না বা ক্ষমতা চর্চার ক্ষমতাই তাদের ছিল না …

    পারভেজ আলমের ভাষায়ঃ ///আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা অনেক। মানুষের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে, তার পোষাক, শিক্ষা, নৈতিকতা, প্রাত্যহিক আচরণ, বিবাহের বয়স, যৌনতা প্রতিটি ক্ষেত্রেই। সাত শতকের আরব ভুখন্ডে ইসলাম কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল, অথবা তারপরে উমাইয়া, আব্বাসি, ফাতেমি, ওসমানি, সাফাভি, মুঘোল ইত্যাদি যেসব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান মুসলিম দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করেছে তাদের কারোই এই পরিমান ক্ষমতা ছিল না। প্রাচীন ও মধ্যযুগিয় সরকার আনুগত্য ও কর নিয়েই খুশি থাকতো, মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, ধর্ম ও আচার আচরণের উপর ততক্ষন পর্যন্ত কোন হস্তক্ষেপ করতো না, যতক্ষন কোন ধর্ম অথবা আচার শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ব্যবহৃত না হয়েছে// …

    ব্যাপারটা আদতে কেমন, বা কেমন ছিল? রাষ্ট্র- তা আধুনিক আর প্রাচীণ-মধ্যযুগীয় হোক তথা রাজ্য- সাম্রাজ্য- খেলাফত- সালতানাত হোক, কোনটিই ক্ষমতা ও ক্ষমতা চর্চার সাথে সম্পর্ক-হীন বা সম্পর্ক-বহির্ভূত ছিল না… বাস্তবে উদ্ভবের সময়কাল থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতার চর্চাকেন্দ্র হিসাবে আবির্ভূত হয়। রাষ্ট্রের (বা রাজ্য, সাম্রাজ্য) সাথে সকল সময়েই ক্ষমতার সহাবস্থান ছিল আছে। এই ক্ষমতা দুর্বলের উপরে সবলের, তথা ক্ষমতাকেন্দ্রের বাইরে থাকা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উপরে কেন্দ্রের ভেতরে থাকা কিছু মানুষের- কিংবা মার্কসীয় কায়দায় বললে- এক শ্রেণীর উপরে আরেক শ্রেণীর ক্ষমতা চর্চার বিষয় হয়ে ছিল।

    ক্ষমতার চর্চার সামর্থ্য বা ক্ষমতা আধুনিক রাষ্ট্রে অনেক বেড়েছে, মানে এখন জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণের হরেক “উন্নত” ও “টেকনিক্যাল” উপায় তাদের জানা- সেই অর্থে প্রতিটা জনগণকে আধুনিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখতে- প্রতিজনকে কাউন্ট করতে, সরাসরি চোখে চোখে রাখতে- অসংখ্য ব্যবস্থা তার হাতে বিদ্যমান … কিন্তু তার মানে এই না যে- ক্ষমতাচর্চার “ইন্টেনশন” বা “খায়েশ” এর দিক থেকে- বর্তমান আমল থেকে আগের আমল বা যুগের রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে ছিল। আদতে একটা জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষে যখন আদিম গোত্রে গোত্রপ্রধান বা রাজ্যে রাজা- এসব তৈরি হয় তখন থেকেই জনগোষ্ঠীর উপরে নিয়ন্ত্রণ, শাসন প্রভৃতির ক্ষমতাপ্রাপ্তিও ঘটে। এবং এই ক্ষমতা চর্চার উদ্দেশ্যে পাইক পেয়াদা পুলিশ আর্মি তাই সবসময়ই প্রয়োজন ছিল- আজকের মত পারমানবিক সমরসাজ ঐ কালে না থাকতে পারে, কিন্তু পাইক-পেয়াদার বাশের লাঠি ও বল্লমও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে যথেষ্ট ছিল বিধায় রাজত্ব- খেলাফত- সাম্রাজ্য এসব টিকে ছিল।

    এবার যদি ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণের বা ব্যক্তিজীবনকে নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে যাই- তাতে বলতে পারি, সেই নিয়ন্ত্রণ কোনকালেই কোন রাষ্ট্রযন্ত্র ছাড় দেয়নি … দাস ব্যবস্থায় দাসদের বা সামন্তীয় যুগে ভূমিদাসদের কতখানি স্বাধীনতা ছিল- সেটি বিবেচনায় আনলে- বলা যায়, ক্ষমতাবলয়ের বাইরের জনগোষ্ঠীর ক্ষমতার তুলনায় ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা আধুনিক রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশিই ছিল বৈকি! (গাণিতিক ভাবে বুঝাই- ছোট সংখ্যাকেও শুন্য দিয়ে ভাগ করলে সেটা হয় অসীম; ফলে ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা আজকের তুলনায় আগে কম হতে পারে- কিন্তু ক্ষমতাবলয়ের বাইরের মানুষদের ক্ষমতা একেবারে শুন্য ছিল) …

    অর্থাৎ- যে যুগে মানুষের উৎপাদন যন্ত্র হওয়া ছাড়া আর কোন কর্মকান্ড ছিল না বা সীমিত ছিল, বিচরণও ছিল সীমিত- সেই কালে- সেই মানুষকে নিয়ন্ত্রণের আয়োজনও তো বেশি হওয়ার দরকার নেই … দাসদের আটকে রেখে, কেনাবেচা করে – কোনরকমে বাচিয়ে রেখেই যেখানে কর্মসিদ্ধ হয়- সেখানে তার যাবতীয় ব্যাপার নিয়ে “নাক”-গলানো ক্ষমতার অপচয়ই মাত্র, একইভাবে সামন্তীয় যুগে- জমিদারির অন্তগর্ত আটকে থাকা মানুষের কাজের ফল তুলে ও শুষে নেয়াটা যখন সহজসাধ্য- তখন নিয়মিত কর আদায়ই তো একমাত্র আগ্রহ ও উদ্দেশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক … ফলে, জনগণের থেকে নিয়মিত কর আদায় আর বিদ্রোহ দমন ছাড়া রাষ্ট্রের/ রাজ্যের কোন কর্মকান্ড ছিল না- এটা বলে কেউ যদি বুঝাতে চায় ক্ষমতার চর্চা সেখানে মিনিমাম ছিল- সেটা পুরোটাই ভুল … আজকের যুগের উদাহরণ দিয়ে একটু বুঝানোর চেস্টা করি- আমার বাসায় যে এতিম বাচ্চা কাজের মেয়েটাকে তার ভাই একেবারে দিয়েছে- তার উপর ক্ষমতা চর্চায় আমার যে ইফোর্ট, রাস্তায় বের হওয়া একজন রিকশাচালক- যে ভাড়া নিয়ে দরদাম করে এবং চাইলে আমার প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করে তার প্রয়োজন মাফিক আমার ভাড়া না খাটার স্বাধীনতা রাখে- তার সাথে ক্ষমতা চর্চার ইফোর্ট এক নয়, আবার আমার অফিসে আমার অধস্তন যে কর্মকর্তা আছে- তার সাথে ক্ষমতার চর্চা আর একজন পিয়ন বা একজন ড্রাইভারের সাথে ক্ষমতা চর্চার ইফোর্ট এক নয় … এই উদাহরণগুলো এই কারণে দরকারি যে- এর মাধ্যমে এটা বুঝা যেতে পারে যে- কতখানি ইফোর্ট বা কতখানি ক্ষমতার অধিকারী আমি – তা দ্বারা প্রমাণ হয় না যে- ক্ষমতাহীনদের উপরে ইফোর্টলেস ও ইজি ক্ষমতার চর্চায়- ক্ষমতার বহিপ্রকাশ ঘটেনা! এমনকি ক্ষমতা বলয়ের একেবারে বাইরের প্রান্তে অবস্থানকারী একজন দিনমজুর-শ্রমিক বা একজন বর্গাচাষীও যখন তার উপরে নির্ভরশীল ওয়াইফের উপরে ক্ষমতার চর্চা করতে পারে- অনেক সময়ে একজন মাঝারি ব্যবসায়ি, মুদে দোকানদার তার কর্মক্ষম ওয়াইফ- ধরলাম যে গার্মেন্টসে চাকুরি করে এবং স্বামীর উপরে ভরণ-পোষণে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়- এর উপরে কি একই রকম ক্ষমতার চর্চা করতে পারে? যাহোক- এবারে উদাহরণ বাদ দিয়ে আরব সমাজে ক্ষমতার চর্চা প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়া যাক …

    মুহম্মদের জীবদ্দশায় “ইসলাম” প্রচারের পর থেকে- যাবতীয় কর্মকান্ড, মদীনায় পলায়ন, নানা যুদ্ধ, মক্কা বিজয়- এগুলো আসলে কি? সমস্তই কি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়? প্রাক ইসলাম যুগে যখন মুহম্মদ সা ছিলেন ক্ষমতাশুন্য- তখন কিন্তু তাকে মদীনায় প্রাণ নিয়ে পালিয়েই যেতে হয়েছিল! তারপরে মদীনায় থেকে আস্তে আস্তে প্রভাব বিস্তার করে করে- যখন প্রভুত ক্ষমতার অধিকারী হলেন- তখন মক্কা বিজয় করলেন… এবং ঐ অঞ্চলের শাসনভার নিজ কাধে তুলে নিলেন! এসবের জন্যে যুদ্ধ-বিগ্রহও কম করতে হয়নি। তার চাইতেও বড় কথা- তাকে শাসক হিসাবে মানার আগে- সেই ক্ষমতা অর্জন করতে হয়েছিল! অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি যে, প্রাক ইসলাম যুগে মক্কায় তাকে শাসনকর্তা হিসাবে মানা তো দূরের কথা- তার আল্লার বানী প্রচারেও প্রচন্ড বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। আদতে- কোনটাই ধর্মীয় বিষয় নয়, অনেক বেশি রাজনৈতিক বিষয়, মুহম্মদ তথা ইসলামের উত্থান যেমন রাজনৈতিক- তেমনি মক্কার ধনীক কুরাইশ- দাসমালিকদের মুহম্মদকে বাধা দেয়াটাও ছিল রাজনৈতিক … (এই ব্যাপারে নাহয় বিস্তারিত পরে আলাপ করা যাবে খন …) … ফলে- আরব ভূখন্ডে মুহম্মদের ইতিহাস পাওয়ার-পলিটিকসেরই ইতিহাস, পরবর্তী খেলাফতি যুগ- আব্বাসীয়-উমাইয়া শাসন ও সাম্রাজ্য বিস্তার – সবই রাজনীতির বিষয় ও “ক্ষমতা” দখল, “ক্ষমতা” সংরক্ষণ ও “ক্ষমতা” চর্চার বিষয় …

    আর, আজকের সাথে তুলনা না করে যদি সমসাময়িক যুগগুলোর সাথে তুলনা করি- তাহলে, আমি মুহম্মদ সা ও তার সাহাবীরা মিলে যে সংঘটি ইসলামের নামে আরব ভূখন্ডে নতুন ধরণের রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতার অধিকারী হলো- তাদের প্রতি আমি মুগ্ধ … এই ক্ষমতার চর্চায়- সমসাময়িক যুগের যেকোন রাজা-বাদশার তুলনায় মুহম্মদ সা গোষ্ঠী- অনেক বেশি আরব জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার চেস্টা করেছেন … আজকের মোল্লারা ইসলামকে বা কোরআনকে “পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান” যে বলে- এমনি এমনি বলে না … কেননা- এতে ব্যক্তি মানুষের- জীবনের নানা খুটিনাটি দিক নিয়ে দিক নির্দেশনা আছে, এর মানেই হচ্ছে যে- ঐ সব খুটিনাটিও নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আরব শাসকরা যত্নবান ছিলেন। ইসলামের নিষেধের তালিকা তথা হারাম এর তালিকার দিকে তাকাতে বলবো … একটা রাষ্ট্রে এই নিষেধাজ্ঞার তালিকা দেখে বুঝা যায় – তার নিয়ন্ত্রণের পরিধি …

    কোরআনে ও হাদীসে ব্যক্তির খাদ্যাভাস, নর-নারীর সম্পর্ক তথা যৌনতা, খেলাধুলা, জোরে কথা বলা- আস্তে কথা বলা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা বা গোসল-অযু থেকে শুরু করে এমনকি বায়ু নির্গমন- মলমূত্র ত্যাগ নিয়েও যত নির্দেশনা আছে, সেইটা আর কোন শাসন ব্যবস্থায় পাওয়া ভার … ফলে ইসলামিক শাসন ব্যবস্থার ক্ষমতার হাত ব্যক্তিজীবনের খুটিনাটিও নিয়ন্ত্রণে উদ্যত ছিল- এমনটা অস্বীকার করার উপায় নেই …

  16. চমৎকার বিশ্লেষন করেছেন
    চমৎকার বিশ্লেষন করেছেন নাস্তিকের ধর্মকথা। গতকাল লেখা পড়েই মনে হয়েছিল পারভেজ আলম যে পয়েন্টগুলোর ভিত্তিতে রাষ্ট এবং রাজ্যের তফাত করছেন সেই পয়েন্টগুলো কি স্বতঃসিদ্ধ ? সামন্তীয় যুগে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যাক্তিরা কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত জনগণের উপর শাসন ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাতো না কারন নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করতে এর চেয়ে বেশি কিছুর তাদের দরকার হত না ।

  17. আমার পাতি মাথার মূর্খ আর
    আমার পাতি মাথার মূর্খ আর ভোঁতা এ্যান্টেনায় যা ধরে, তাতে প্রথম কিস্তির বিতর্ক, মানে আনিস রায়হান আর পারভেজ আলমের তর্কের মধ্যে যেই অলঙ্ঘ্য দূরত্ব, সেইটা মনে হয় হয় বুঝতে পারছি। বিষয়টা মনে হয় রাষ্ট্র সংক্রান্ত ধারণার পারস্পেক্টিভ থেকে উদ্ভুত। মার্কসবাদী দৃষ্টিতে রাষ্ট্রকে মুলত তার চরিত্রগত দিক থেকেই দেখা হয়, এবং রাষ্ট্রের এই চরিত্রটি ধ্রুপদি হবার কারণে, মার্কসবাদী দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের ইতিহাস সুপ্রাচীন। আরও খোলাখুলি আলাপ করলে বিষয়টা দাঁড়ায়- কমরেড এঙ্গেলস রাষ্ট্রের যেই সংজ্ঞা দেন, আর আমরা মার্কসবাদীরা যেই সংজ্ঞাকে সঠিক মনে করি, সেটির বয়ানে রাষ্ট্র হচ্ছে সমাজের বিবাদমান শ্রেণীগুলোর শ্রেণীদ্বন্দ্ব প্রশমনের একটি কৌশল/যন্ত্রবিশেষ, দিনশেষে যা কিনা সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণীর শ্রেণীস্বার্থের পাহাড়াদার। সেই বিবেচনায় রাষ্ট্র সেই দাস/কৃষি/সামন্ত – সকল যূগেই ছিলো, আরও ভালোভাবে বললে যীশুর জন্মেরও বহু আগে থেকেই রাষ্ট্র অস্তিত্বশীল ছিলো। এদিক থেকে আনিস রায়হানের আপত্তি খুব যৌক্তিক কারণেই স্বাভাবিক, যদিও নিজের স্ট্যাণ্ড পয়েন্ট টাকে খোলাসা করেন নি আনিস রায়হান। আর পারভেজ আলমের রাষ্ট্র সংক্রান্ত পারস্পেক্টিভ টা যদি ভূল না করে থাকি, তাহলে ফরাসী বিপ্লব কিংবা এনলাইটেনমেন্টের সময়কালে তাত্ত্বিক ভিত্তি পাওয়া এবং তার পরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগ হওয়া রাষ্ট্রের গঠন ও উপাদানগত সংজ্ঞায়। এইখানে রাষ্ট্র বলতে বুঝান হয় একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে একটি জনসমষ্টি একটি সরকারের দ্বারা সার্বভৌমভাবে শাসিত হবার যেই সংগঠন- তাকে রাষ্ট্র বলি আমরা। সত্যিই, এই যদি রাষ্ট্র হয়, তবে তার ধারণা আসলেই আধুনিক। পারভেজ আলমের অবস্থানকেও তাই ভুল বলার জায়গা নাই।কেননা এরকম নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করা জনতার সরকারের দ্বারা শাসিত হবার রাষ্ট্রের ধারণা আসলেই মধ্য কিংবা প্রাচীন যূগে ছিলোনা, সেটা যতই রোম কিংবা গ্রীসের কথা আপনারা বলেন না কেন। এই দুইজনের অবস্থান যেহেতু দুইটা আলাদা গ্র্যাণ্ড ন্যারেটিভ থেকে, সেহেতু ইনাদের তর্কের কোনও ক্রস কানেকশান আমরা খুজে পাইনা এবং দিনশেষে তর্কটা অর্থহীন।

    এবার আসেন এই আলোচনার অবজেক্টিভিটি নিয়া একটু আলাপ দেই। নাস্তিকের ধর্মকথা যুক্তির পর যুক্তি তুলে মুলত যা প্রমাণ করতে চেয়েছেন, তা হচ্ছে পারভেজ আলমের এই প্রবন্ধটি অবজেক্টিভিটির বিচারে উত্তীর্ণ নয়। কথা আসলেই সত্যি। কিন্তু এই অবজেক্টিভ না হওয়াটা পারভেজ আলমের কোনও পাপ নয় বলে আমার মনে হয়েছে। ধর্মকে সম্পৃক্ত করে পারভেজ আলমের যতগুলো লেখা পড়েছি, তাতে যতটুকু মনে হয়েছে, পারভেজ আলমের উদ্দেশ্যটিকে সাধুবাদ জানানোর দরকার আছে। তিনি মুলত চেষ্টা করছেন ধর্মের রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে হান্টিংটনের ডিজাইন করা পৃথিবীর অচলায়তন ভেঙ্গে দেবার। ইসলাম কে কেন্দ্র করে যেই বৈশ্বিক রাজনীতি এই মুহুর্তে যাবতীয় অনাচারকে বৈধতা দিয়ে নিচ্ছে- সেইটা দিনে দিনে পৃথিবীকে নরকে পরিণত করছে। আইসিস কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের যেই পরিস্থিতি- তাকে ক্রমাগতভাবে আরও জঘন্য পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পারভেজ আলম চেষ্টা করছেন এইসব অপকর্মকে জায়েজ করার যেই তাত্ত্বিক ভিত্তিটি, তাকে দুর্বল করে দিতে। সেটা দুই ধারী ছুরির মত ইসলামিস্ট-এন্টি ইসলামিস্ট বাইনারীকে আক্রমণ করছে বলে আমার মনে হয়েছে। কিরকম?

    ইসলাম ধর্মের রাজনৈতিক চরিত্রটিকে ব্যবহার করেই মুলত মধ্যপ্রাচ্যের কিংবা আজকাল বাঙলাদেশের তরুণদেরকে জঙ্গীপনায় উতসাহিত করা হচ্ছে। কোরান হাদিসের বয়ান যেহেতু মুসলমানের উপেক্ষা করার জায়গা নাই, সেহেতু মুসলমান তরুণ খুব সহজেই জঙ্গী হয়ে উঠছে। সেইটাকে নষ্ট করার একটা চেষ্টা পারভেজ আলম করছেন প্রাণপণে। তিনি তাই এরকমই লিখবেন, ইসলাম ধর্ম আসলে ধর্মই, তাকে ব্যক্তিপর্যায়ে পালনীয় করে রাখাই যৌক্তিক, রাজনীতি থেকে একে আলাদা রাখাই সঙ্গত। এই আকাঙ্খা সাধুবাদের দাবীদার। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে আলোচনার অবজেক্টিভিটি থাকেনা, কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছু জায়গা এড়িয়ে গিয়ে তত্ত্বায়ন করতে হয়, যেহেতু আলোচনা আগে থেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

    আবার, এই ধরণের আলোচনারও দোষ দেবার কিছু দেখিনা একারণেই, যে খোদ ইসলামেই মিথ্যাচারের একটা বৈধতা আছে। সেটা হলো- ইসলামকে জারী-জিন্দা রাখার স্বার্থে যে-কোনও মিথ্যাচার গ্রহণীয়! যেমনটা জাকির নায়েক আজকাল করে চলেছেন দেদারসে। পলিটিক্যাল ইসলামের র‍্যাডিকালাইজেশানে এই জাকির নায়েকের ভুমিকা অসামান্য। ফলে, তাকে কাউন্টার দিতে গিয়ে একজন পারভেজ আলম আলোচনায় ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতাকে আমরা এতটা নির্মমভাবে আক্রমণ করতে পারিনা! অন্তত পারভেজ আলম মিথ্যাচার করছেন না, শান্তনার বিষয় এটাই।

    কিন্তু, একটা সমস্যা আছে। এই তত্ত্বায়ন করতে গিয়ে যদি পারভেজ আলম এমন কিছু দাবী করে বসেন, যা কিনা খোলা চোখেই আমজনতার কাছে ভ্রান্ত মনে হয়, তাহলে পুরা আলোচনাই ভেস্তে যাবে। সেইটা ঘটে চলেছে অহরহ। সঙ্কট টা সেখানেই। এবং এই লেখাতেও সেটার যথেষ্ট উপস্থিতি আছে।

    যেমন ধরেন রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিষয়ে তিনি যা বলেছেন, যে আগের চাইতে এখনকার রাষ্ট্রের ক্ষমতা অনেক বেশী- এমন দাবী আসলেই অদরকারী এবং ভুল দাবী। এরকম জিনিসগুলা চোখে লাগে খুব।

    হ্যাপি ব্লগিং।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 + = 81