একাত্তরের পরে

রাজুর যখন ঘুম ভাঙল তখন বেলা প্রায় দশটা । ইদানিং সকাল সকাল ঘুম আর ভাঙতে চায় না । জুন মাস, কড়া রোদ । কোথায় যেন একটা কাক কা কা করেই যাচ্ছে। রাজু কিছুক্ষণ ছাদের সিলিং ফ্যান টার দিকে তাকিয়ে থাকল , কিছুটা বিমুড় ভাবে । মাথায় একটা ভোঁতা ঝিম মারা ভাব । ব্যথা নেই কিন্তু অসাড় একটা অনুভূতি । হটাৎ পেট থেকে বুক ঠেলে কি যেন বের হয়ে আসতে চাইল । পড়ি মরি করে রাজু বাথরুম এর দিকে দৌড় দিল । হড় হড় করে বমি করলো কমোডে ,বমির শব্দ চাপানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারল না ।বাথরুম এর দরজা লাগানো যায় নাই । বমি হতেই থাকল শব্দও বাড়তে থাকল । মা ছুটে এলেন “ কি রে , কি হয়েছে? এ কি ?।।বমি করছিস কেন?”। মা’র গলায় উৎকণ্ঠা। “ সারাদিন কোথায় থাকিস?,কি করিস?, কি খাস?… কে জানে?। গরম ও পড়েছে। গোসল করে আয় ,লেবুর শরবৎ দেই, খেয়ে নে”। মা চলে যেতেই রাজু ফ্রেশ হয়ে বের হোল বাথরুম থেকে । নিজের রুমে এসে ফ্যানের নীচে বসলো। ঝিম মেরে চিন্তা করলো কবে শেষ বমি করেছিলো। মনে পড়ল গত নভেম্বর মাসে । কুমিল্লাতে একটা অপারেশন করেছিল রাজুরা , খুব সফল একটা অপারেশন , হানাদারবাহিনির একটা ক্যাম্প দখল করে নিয়েছিল রাজুরা। তারপর ছোট ছোট দল বেঁধে বের হয়েছিল গ্রাম এর অবস্থা দেখার জন্য । গ্রাম এর চেয়ারম্যান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সপক্ষের , যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন মুক্তিদের সাহায্য করতে। হানাদার বাহিনীর প্রথম টার্গেট হন চেয়ারম্যান । বেয়ানট দিয়ে খুঁচিয়ে মারে সবাই কে । তখন পর্যন্ত লাশগুলো সব বাড়ীর উঠানে পড়েছিল , ফুলে উঠেছিল , তখন রাজুদের মোটামুটি অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল এসবে। কিন্তু হটাৎ চোখে পড়ল এক নারীর গোপনাঙ্গে বাংলাদেশের একটি পতাকা ধারণকৃত কাঠিসহ গেঁথে দেয়া হয়েছে ।কি বীভৎস দৃশ্য । হড় হড় করে বমি করে দিয়েছিল রাজু । সেই স্বপ্নটা আহ । ঝিম মারাটা দীঘ’স্থায়ী হল না , মা নাস্তা খেতে ডাক দিল । টেবিল এর উপরে লেবুর শরবত ঢাকা দেয়া, প্লেট এ নাস্তা । শরবত খেয়ে নাস্তা সারল রাজু । ভার্সিটিতে যাবে কিনা ভাবছে । কিন্তু মন টানছে না । মা জিজ্ঞেস করল “ ভার্সিটিতে যাবি আজ?”, রাজু অন্যমনস্ক ভাবে উত্তর দিল ,” মনে হয় না , শরীর টা ভাল লাগছে না।“ “ তাইলে একটু পরে বাজারে যা , আবুল কে রেশন তুলতে পাঠিয়েছি , ওকে দুই কাজ একসাথে দিলে দিন পার করে দেয় “। রাজু কিছু না বলে বারান্দার দিকে গেল । একটা সিগারেট ধরালো, কেপাস্টান অল্প দামের ভাল সিগারেট । শরীরটা একটু হাল্কা লাগছে এখন । সিগারেট এ লম্বা টান দিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিল চেয়াের । আজ আর ভার্সিটির চিন্তা বাদ দিল মাথা থেকে । মুড়ির টিন বাসে করে আজ আর যাওয়া সম্ভব না । কোথায় যাওয়া যায় ?, বাজারে যাবে নাকি?। মা মাঝে মাঝে বলে বাজারে যাবার কথা , বলার জন্যই বলা , জানে রাজু যাবে না । কতদিন বাজারে যাওয়া হয় না?। মনে নেই । যুদ্ধ থেকে ফেরার পর রাজুর অনেক পরিবর্তন হয়েছে । প্রায় ছয় মাস । ছয় মাসে মানুষ কতটা পরিবর্তন হয়? । রাজু জানে না, বাসায় মা ছাড়া রাজুকে কেউ তেমন একটা ঘাটায় না । সিগারেট এ শেষ টান দিয়ে রাজু উঠল । মা রান্না ঘরে বসে কি যেন করছেন । সাজুর রুমের দরজা ভেজানো । ভাবি বাপের বাড়ি গেলে আর সহজে ফিরতে চায় না । তাতে কিছু না , টুকুর জন্য মনটা আনচান করে । মা’র পরে টুকুর সাথে ই কথা হয় এ বাসায় রাজুর । ছোট চাচু বলতে অজ্ঞান ছেলেটা । এখনো স্কুল এ যায় না । তিন বছর বয়স । আর কারো জন্য না হলেও টুকুর জন্য কিছু আনতেই হবে বাইরে গেলে । ভাইয়ার ব্যাপারে মা কয়েকদিন ধরে ঘ্যান ঘ্যান করছে , সাজুর পোস্টিং নারায়ণগঞ্জ থানায় , সেকেন্ড অফিসার । প্রমোশন হওয়ার কথা । হচ্ছে না , যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল তাদের প্রমোশন বেশি দেয়া হচ্ছে ।সাজুকে মুক্তিযোদ্ধার একাটা সার্টিফিকেট এনে দেবার জন্য মা আবদার ধরেছে। আসলে মা না , সাজুই মাকে বলেছে একটা সার্টিফিকেট হলে প্রমোশনটা হয়ে যাবে ,এও বলেছে ও নিজেই যোগাড় করতে পারে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের কাছে বলতে লজ্জা হয় । হাজার হলেও যুদ্ধে ত আর সাজু যায় নাই । তা ছাড়া সাজুর মতে এটা কোন ব্যাপার না সবাই সার্টিফিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে । রাজু কোন কথা ই বলে নাই মা’র সাথে এ ব্যাপারে। মা একটু টেনশনে আছে বলে মনে হয় রাজুর কাছে। কারণ সাজু যে সংসারে একটা মোটা টাকা দেয় সেটা জানে রাজু।কিন্তু সার্টিফিকেট এর ব্যাপারটা রাজুর মাথায় স্থান ই পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের ক’টা মাস খুব কঠিন নিয়ম কানুন এর মাঝে ছিল রাজুরা । ডিসিপ্লিন এর বাইরে যাওয়াটা কল্পনা ই করা যেত না । অনিয়ম, মিথ্যা বলার কথা কেউ চিন্তাও করতে পারত না । এখন হটাৎ এরকম অন্যায় আবদার এ রাজুর মাথা গরম হয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়েছিলো। মা’ কে কোন উত্তর ই দেয় নাই ।অথচ এই সাজু পুলিশে চাকরী করে যুদ্ধের সময়, যুদ্ধে গেলে কত ভাল হত,নিজে অস্র চালাতে পারে ট্রেনিং ই লাগত না। অথচ গেল না । টুকুর ২ বছর বয়স ছিল ।এটাও কোন যুক্তি না,কারন ভাবি আর টুকু কে মার্চ এর প্রথমেই কলকাতা পাঠিয়ে দিয়েছিল সাজু । ভাবির নানার বাড়ী কোলকাতাতে। এপ্রিল এ সাজু বাবা মা কে নিয়ে গ্রাম এ রেখে নিজেও কোলকাতা চলে গিয়েছিল।এতটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার পরেও যুদ্ধে না গিয়ে আরাম করেছে,এখন সার্টিফিকেট চায়! মা’র কাছে গিয়ে বাজার এর টাকা চাইলো রাজু । মা একটু অবাক হলেও বুঝতে দিলেন না । বারবার করে বলে দিলেন, দামাদামি করে জিনিস কিনতে। বাজারে আগুন লেগেছে।সবকিছুর দাম বেশি।স্বাধীন হয়ে কোন লাভ ই হয় নাই।কপালে যে আরও কি আছে কে জানে?… ইত্যাদি। ভাবখানা এমন যে রাজুর ই সব দোষ, রাজু যুদ্ধ করেছে।কিছুটা অপরাধী যে নিজেকে লাগে না তা নয়।কিন্তু যেকোনো বড় যুদ্ধের পরে এমন টা হওয়া ত অস্বাভাবিক না । যুদ্ধের সুবিধার জন্য পুল/কাল্ভার্ট নিজেরাই ত অনেক গুলো উড়িয়ে দিয়েছে।পাক বাহিনীর কথা ত না বললেও চলে সবাই জানে কি ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ওরা করেছে।তারপরেও মানুষের পেটে ভাত না থাকলে মন ত বিদ্রোহ করবেই।

মালিবাগ বাজারটা অনেক পুরনো।রাজু অনেক আগে বাবার সাথে মাঝে মাঝে যেত।প্রাইমারি স্কুল এ পড়ার সময়। বহুদিন পর আবার আসলো । ঢাকা শহরের আর দশটা বাজার এর মতই মালিবাগ বাজার। শব্জিওয়ালা গুলো রাজুকে একটু সমীহ করে কথা বলল, দড়ির মত পাকানো শরীর রাজুর,মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ,পরনে দুই পকেট ওয়ালা শার্ট। দেখলে কি বুঝা যায় নাকি সদ্য যুদ্ধ ফেরৎ ?।কি জানি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কেউ একটু সম্মান করলে খারাপ লাগে না।কিন্তু অন্য দিকও আছে । মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হাতে অস্র। ভয়ও পায় মনে হয় অনেকে।কাল্লু কসাই ত রীতিমত চিৎকার দিয়ে সহকারী কে বলল “ স্যার রে ফ্রেশটা দে”। এবার রাজু একটু লজ্জাই পেল,কারন মা টাকা যা দিয়েছে দুই সের এর বেশি নেয়া যাবে না।তাও খুব যত্ন করে কেটে-কুটে দিল। বাজারের দুই একজন জানতেও পারে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল রাজু অনেকে সালামও দিল। বেশিক্ষণ ঘুরলো না রাজু বাজারে।বাসায় বাজার দিয়ে কাশেম সুইটস এ গিয়ে বসলো। এখানে এস,এস,সি পাশ করার পর থেকে আড্ডা দেয়া হয়।এখনও অনেককেই পেল । সেলিম ,বাদশা,মনির আড্ডা মারছে। যুদ্ধ থেকে ফিরে এই তিনজনের কেউ ই আর পড়াশুনাতে ফিরে নাই। এদের আপাতত কারো কোন উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয় না।ভবিষ্যৎ এ কি করবে কিছুই জানে না ।সবাই একসাথে যুদ্ধে গিয়েছিল,এক ই দিনে রওনা হয়েছিল ভারতের উদ্দেশ্যে । একসাথে যুদ্ধ করেছে।সেলিম আর বাদশা এমনিতেই এস,এস,সি র পরে কলেজে গেলেও এইচ,এস,সি আর দেয় নাই । মনির আবুজর গিফারি কলেজে নামমাত্র পড়ে ।ক্লাস এ যায় বলে মনে হয় না।রাজু যুদ্ধ শুরুর আগেই ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি হয়েছিল । ছাত্র খারাপ ছিল না । পাড়ায় ভাল ছেলে এবং ছাত্র হিসেবেই পরিচিত । এদের নিয়ে ইদানীং অর্থাৎ সহযোদ্ধা বাদশা,সেলিম,মনির কে নিয়ে একটু চিন্তিত রাজু। সবাই যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে । বাদশা একটু বেশী বেপরোয়া সেই আগে থেকে ই। গোঁয়ার খুব,একবার শুধু হাতে কয়েকটা গ্রেনেড নিয়ে তাড়া করেছিল হানাদারদের।কিন্তু গ্রেনেড গুলো বার্স্ট হচ্ছিল না । দমবন্ধ করা অবস্থা । শেষে রাজু এল,এম,জি নিয়ে সামনে দাড়িয়ে গিয়েছিল।সবাই এক প্রাণ হয়ে গিয়েছিল । সবার আত্মাই যেন এক হয়ে গিয়েছিল।এখন সবাই এমন ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে কেন?। বাদশা এর মধ্যে মদ ধরেছে । কিছুই বলে না । তবে আজ তিনজনকেই একটু অন্যরকম লাগছে।রাজুকে দেখেও না দেখার ভান করল সবাই।প্রথমে খেয়াল না করলেও রাজু একটু পরেই টের পেল , ওদের তিনজনের অবস্থাই একটু উদ্ভ্রান্ত , চোখ লাল। দেখেও না দেখার ভান করলো রাজু।

পরদিন ভার্সিটিতে গিয়ে সিরাজ ভাই কে ধরল। সিরাজ ভাই দুই বছরের সিনিয়র ,দুই নম্বর সেক্টর এ যুদ্ধ করেছেন।অনেক জ্ঞান রাখেন ,প্রচুর পড়াশোনা করেন । “ সিরাজ ভাই, বলেন ত কি করা যায়?, সব সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধারা নেশার কবলে পড়ছে কেন?”। সিরাজ ভাই বললেন “ দেখ রাজু, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর প্রচুর যুদ্ধ ফেরত সৈন্য মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল । এরা যে নেশার কবলে পড়ছে এর কারণ মানসিক যন্ত্রণা ।যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা”। রাজু থম মেরে গেল।“বলেন কি সিরাজ ভাই?।তারমানে সবাইকে নেশা করতে হবে?”। “ সবার কথা ত বলছি না রে ভাই”। কেও কেও” । আর কোন কথা ই বলল না রাজু সিরাজ ভাই এর সাথে,গুম মেরে বসে রইল । যুদ্ধের সৃতি রাজুর স্বপ্নেও যে হানা দেয় না তা না , কিন্তু বাঁচতে ত হবে। নেশা কি বাঁচাতে পারবে?। মধুর ক্যান্টিন এর দিকে গেল রাজু। ক্লাস শুরু হবার পর মধুর ক্যান্টিন এ কম যেত রাজু।কারন মধু’দার কথা মনে পরে। খুব স্নেহ করত ছাত্রদের মধু’দা।কিন্তু সিরাজ ভাই ই বললেন একদিন ,আমরা যদি ক্যান্টিন এ না যাই চলবে কিভাবে?।মধু’দার ছেলে এখন ক্যান্টিন এর হাল ধরেছে। ওকেও ত বাচাতে হবে। ক্যান্টিনে সোহেল এর সাথে দেখা । গুলতানি মারছে চা এর কাপ হাতে নিয়ে। বলে যুদ্ধে নাকি গিয়েছিল।কিন্তু নভেম্বর পর্যন্ত ওকে ঢাকা শহরে ই নাকি দেখা গেছে। রাজুকে দেখে হৈ হৈ করে উঠল “ আরে এই যে মুক্তিসেনা কোথায় থাকা হয় । আসেন আসেন বসেন”। রাজু গা করল না তেমন, কেউ নেই দেখে বসলো। চা এর অর্ডার দিল সোহেল। রাজুর দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিল। দামী সিগারেট ,কিছু না বলে রাজু ধরাল । সোহেল কিছু সস্তা মজা করল যা ওর স্বভাব । ছাত্রলীগ এর বিভিন্ন সমস্যার কথা বলা শুরু কর্‌ল , হলে কিছু ছেলে বামপন্থি রাজনীতি আমদানি করার চেষ্টা করছে । রাজুর এসবে কোন আগ্রহ নেই । শুনেও না শোনার ভান করে আনমনা হয়ে সিগারেট টানতে থাকল। এবার আসল কথাটা পাড়ল যা শোনার জন্য রাজু প্রস্তুত ছিল না। হলে কিছু একশন নিতে হবে। বামপন্থিদের নির্মূল না করতে পারলে দেশ রসাতলে যাবে। চমকে উঠলো রাজু। বলে কি এই ছেলে?।পাগল নাকি?।কিন্তু মনে হল ছেলেটা জেনে শুনেই বলছে। পেছনে কোন বড় শক্তি আছে।বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সাথে বামপন্থিদের অপকর্মের ফিরিস্তি দেয়া শুরু করলে এসব ব্যাপারে কন আগ্রহ নেই জানিয়ে দিয়ে রাজু উঠে গেলো।বিশ্ববিদ্যালয় এর পরিস্থিতি টা কেমন যেন গুমোট ইদানিং । কোথায় যেন একটা অস্থিরতা,কিন্তু চট করে ধরা যায় না । তবে খুব একটা অস্বস্তি ও বোধ হয় না।ছাত্রসমাজ সচেতন,যারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে ,স্বাধীনতা কিভাবে রাখতে হয় তা তারা জানে ,এটা রাজুর সবসময়ই মনে হয় । তারপরেও মনের মধ্যে কি যেন খচ খচ করে,সবার হাতে অস্র,একটু এদিক থেকে সেদিক হলেই সর্বনাশ হবে।বঙ্গবন্ধুর ওপর অনেককিছুই নির্ভর করছে।উনি শেষ ভরসা ,বঙ্গবন্ধুর ওপর ভরসা করা ছাড়া এখন কিই বা আর করার আছে? । ক্যান্টিন থেকে বের হবার মুখে মুসার সাথে দেখা হয়ে গেলো। এক ই ডিপার্টমেন্টে পড়ে রাজুর সাথে ইকনমিক্স এ। রাজুকে দেখেই রাজুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল , চল আমাদের খেলা আছে সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট এর সাথে ।মুসা ফার্স্ট ডিভিশন এ খেলে ওয়ান্ডারস ক্লাব এ । স্বাধীন বাংলা ফুটবল ক্লাব এর পক্ষ হয়ে খেলেছে কোলকাতায় । দারুণ খেলে ছেলেটা । না করা গেল না, রাজু রওনা দিল ওর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের দিকে । খুব জমজমাট খেলা ই হলো । মুসারা জিতল দুই এক গোলে । খেলা শেষে মুসা জোর করে ওর বাসায় নিয়ে গেল । বড়লোকের ছেলে মুসা।ধানমন্ডি তে থাকে ,বাবা বড় ব্যবসায়ী । রাজুকে খুব পছন্দ করে ছেলেটা ।বিটলস এর গান এর এল পি চালিয়ে দিয়ে রাজুকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেল একসাথে। মুসার বাসা খালি, কেও নেই । বাবা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ,মা সাংস্কৃতিক জগত এরে মানুষ।সারাদিন গান বাজনার অনুষ্ঠান নিয়ে ই থাকেন । খাবার শেষে রাজুকে নিয়ে ছাদে গিয়ে বসল মুসা,সিগারেট ধরিয়ে ধীরে সুস্থে বলল ,রাজু আমার মাথায় একটা প্লান আছে ।সেটা তোর সাথে একটু আলাপ করতে চাই। রাজু কিছু না বলে মুসার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। “ দেখ তুই ত জানিস আমি একটু অন্য টাইপ এর । চাকরি ত আমাকে দিয়ে হবেই না , ব্যবসাও না । আমার আসলে মা”র মত কিছুটা সাংস্কৃতিক পোকা আছে মাথায় । আমি ছবি বানাব” । “কি বানাবি?” রাজু একটু চিৎকার ই দিয়ে উঠলো” । “ ছবি , মানে ফিলম’। এরপর হাত দিয়ে রাজুকে থামিয়ে দিয়ে বলল “ আরে অবাক হচ্ছিস কেন?,মানুষ ই ত ছবি বানায়, না কি?”। সিগারেট এ শেষ টান দিয়ে বলল “ আমার ছবিটা হবে মুক্তিযুদ্ধের ওপর” । এবার রাজু একটু নড়েচড়ে বসল । “ এমন চিন্তা মাথায় আসল কেন হটাৎ?” , রাজু বেশ সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করলো এবার । কারণ ফালতু কথা বলার ছেলে না মুসা। “ আর তা ছাড়া যুদ্ধ শেষ হল ত মাত্র ,এখন ই কি যুদ্ধের ওপর ছবি করার সময় এসেছে?” রাজু সিগারেট এর শেষ টান দিয়ে ফেলে দিল। “ এটা আপেক্ষিক বেপার, একেক জনের একেক মত , কারো মতে সাথে সাথে বানালে সঠিক চিত্র আসবে আবার কারো কারো মতে এটা অনেক পরের ব্যপার, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য । আমি বানাব আমার জন্য তারপর দেখা যাক কি হয়” । এবার কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে হটাৎ করেই মুসা বলে উঠল “ আর আমার এ ছবির মূল চরিত্রে বা নায়ক এর ভূমিকায় অভিনয় করবি তুই” । এবার হা হা করে হেসে দিল রাজু । “ তোর মাথা টা আসলে ই গেছে। আমি করব অভিনয় ?” “কেন? তুই ত দেখতে ভাল, তাছাড়া তুই যুদ্ধ করেছিস ,তোর চেয়ে ভাল আর কে পারবে?”। “ কেন তুই নিজে?” “ দেখ আমি সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করি নাই,ফুটবল খেলেছি।আমি রিয়েলিটি টা ধরতে চাচ্ছি”। “ দেখ আমাকে দিয়ে এসব হবে বলে মনে হয় না , অনেক হ্যান্ড সাম মুক্তিযোদ্ধা আছে ,তাদের কাউকে ধর”। “তোকে নিয়ে এই এক সমস্যা , কোন কিছুই পাত্তা দিস না”। বেশ হতাশার সুরে বলল মুসা। ব্যপারটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে তাই রাজু তাড়াতাড়ি বলে উঠল “ আরে না ত করি নাই। দেখা যাক । এখন ত আর না। যখন করবি তখন দেখা যাবে”। এবার মুসা বেশ খুশী হয়ে উঠে গেল । একটা হুইস্কির বোতল আর গ্লাস নিয়ে এসে বসল “ হবে নাকি একটু?”। “না রে… আমার এসব চলে না ।সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘড়ের ছেলে আমি জানিস ত , আমাদের জন্য এসব বিলাসিতা”। “হুম” করে একটা শব্দ করে মুসা আর কিছু বলল না, গ্লাস এ নিজের জন্য ঢালতে থাকল। এই বিদঘুটে গন্ধ টা রাজুর একদম এ সহ্য হয় না । উঠে পড়ে বলল “ আজ যাই রে , বাসায় কিছু কাজ আছে”। “ আরে যাবি কি বস । আর একটা বিড়ি খা”। “নাহ রে আসলেই কাজ আছে” । রাজু বেড়িয়ে পরল , বড়লোক এর ছেলেদের ভাত কাপড়ের চিন্তা নেই । মাথায় কত রকম এর আজগুবি চিন্তা যে ঘুরে । ভাবতে ভাবতে বাস ধরল রাজু । গুলিস্তান হয়ে মালিবাগ এ যেতে হয়। গুলিস্তান থেকে যে বাসগুলো মালিবাগ এর দিকে যায় সেগুলোকে সবাই মুড়ির টিন বলে । একটা মুড়ির টিনে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল রাজু ।

মৌচাক এর মোড়ে নেমে গলিতে ঢুকতেই দেখল রেশন দোকানের সামনে অনেক মানুষ এর জটলা । খুব হৈ চৈ করছে কিছু মানুষ । ভিড় টাকে উপেক্ষা করেই চলে যেতে চাচ্ছিল রাজু , কিন্তু দেখা গেল বাদশা রেশন দোকানের ভেতর থেকে একটা লোককে চুল ধরে পেটাতে পেটাতে বের করে নিয়ে আসছে । আর পাশ কাটানো গেল না। রাজু তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে লোকটাকে বাদশার হাত থেকে ছাড়ালো। “কি রে কি হয়েছে একে মারছিস কেন?” । রাজু দেখল লোকটা আর কেউ না হাশেম, যে রেশনের মালপত্র মেপে দেয় । “ বেটা ব্ল্যাক মেইল করতেছিল ।ধরেছি হাতে নাতে “ । হিস হিস করে উত্তর দিল বাদশা , আবার মারতে গেল । হাত দিয়ে ঠেকাল রাজু । “ব্ল্যাক মেইল করে থাকলে পুলিশে দিবি । তুই মারছিস কেন?”। রাজু রেগে গিয়ে জবাব দিল । “পুলিশ কি করবে? ওই বেটারা ত ঘুষখোর । ঘুস খেয়ে ছেড়ে দিবে”। বাদশার দু চোখ দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে । রাজু বাদশাকে টেনে নিয়ে গেল একপাশে ।সিগারেট দিয়ে কিছুটা শান্ত করল । চারিদিকে কি যে হচ্ছে , মানুষ গুলো যেন কেমন সব অদ্ভুত আচরণ করছে । বাসায় ঢুকে দেখল ভাবি এসেছে । টুকু দৌড় দিয়ে এসে কোলে চড়লো । “ কাকু তুমি কোথায় ছিলে?”। “ আমি ত ছিলাম কাকু বাসাতেই তুমি কোথায় ছিলে কাকু?”। গালে একটা চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করলো রাজু । “ আমি নানার বাসায় ছিলাম,তুমি আমাকে একদিনও দেখতে যাও নাই কেন?”, গাল ফুলাল টুকু। হেসে দিল রাজু , “ ভুল হয়ে গেছে কাকু, এরপর থেকে তুমি যখন নানুর বাড়ি যাবে আমি তোমাকে রোজ রোজ দেখতে যাব কাকু”। এবার খুশী হোল টুকু । টুকুকে নামিয়ে দিয়ে নিজের ঘড়ের দিকে গেল রাজু । খুব ক্লান্ত লাগছে । কাপড় ছেড়ে ফ্যান এর নীচে বসতেই মা ঢুকল , “ কি রে কোথায় ছিলি সারাদিন?”, কিছু খাবি? ভাত দেবো?”। “ নাহ ,ক্ষিধে নেই” । সত্যি কথাই বলল রাজু। “চা দেই?” মা”র একথায় না করল না রাজু , বলল “দাও”। মা চলে গেলেন,কিছুক্ষণ পর চা নিয়ে ঢুকলেন মা কিছু একটা বলতে চায় , বুঝতে পারল রাজু,এও বুঝল সম্ভবত সাজুর সার্টিফিকেট এর ব্যাপারে । মনটা এমনিতেই এলোমেলো হয়ে আছে ,রাজু চাচ্ছে মা যেন কিছু না বলে । কিন্তু কিছুক্ষণ উসখুস করে মা ম শুরু করল , ‘ তোর বাবার প্রমোশনটা ত অনেকদিন ধরে আটকে আছে”। এরপরে চুপ মেরে গেল। “হুম” শব্দ করে রাজু বলল “ এখন আর প্রমোশন হলেও কি না হলেও কি? , বাবা ত টাইম স্কেল পেয়েছেন। রিটায়ার্ড করতেও ত বেশী বাকি নেই”। মা একটু চুপ করে থেকে বললেন “ নাহ মানে তোর বাবা বলছিল , প্রমোশন হলে মানে রিটয়ারড করার আগে একটা প্রমোশন পেলে পেনসন এ কিছু বেশী পেতেন”। রাজু মা”র মুখের দিকে এবার তাকিয়ে বলল “ তা প্রমোশন না হলে কি ই বা করা যাবে?’। মা আমতা আমতা করে বলল “ না মানে মুক্তিযুদ্ধের একটা সার্টিফিকেট হলে কিন্তু হত”। এবার রাজুর মাথায় যেন সত্যি সত্যি কে জোরে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিল। এবার সুধু সাজু না বাবার ও মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট দরকার! রাজু কিছু না বলে বাথরুমের দিকে গেলো। মা পেছন থেকে জিজ্ঞেস করলেন “ কি রে তোর বাবাকে কি বলব?”। রাজু কোন উত্তর না দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো। অনেকক্ষণ পানিতে ভিজল রাজু। শরীর মন যেন ঠাণ্ডা হতে চায় না। এখন মনে হচ্ছে কেন যে যুদ্ধে গিয়েছিলো?। শুধু সার্টিফিকেট বিলানোর জন্য ?,তাও যারা যুদ্ধে যায়নি তাদের?। এ কোন আজাব শুরু হোল ?। গোসল সেরে রাজু আর দেরী করল না , কাশেম এর দোকান এর দিকে রওনা দিল । সবাই এসেছে। ধুম আড্ডা চলছে। রাজু কারো দিকে না তাকিয়ে চেয়ার টেনে বসল । মাথাটা সত্যি গরম হয়ে গেছে। বাদল টিপ্পনী কাটল , কি রে ভাল ছাত্রের খবর কি?। রাজু ধুম মেরে ই রইল । চা এ চুমুক দিয়ে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করল। মনির বর্তমান অস্থিরতা নিয়ে গরম ভাষণ দেয়া শুরু করল। রাজনীতির ব্যাপারে মনিেরর খুব আগ্রহ। এ ব্যাপারটাতে কেন যেন রাজু কোন আগ্রহ পায় না। সময় খারাপ যাচ্ছে , কোন সন্দেহ নেই। মানুষ বুঝে এত বড় একটা যুদ্ধের পর সময় ভাল না যাওয়াটা অস্বাভাবিক না, কিন্তু প্রশ্ন অন্য জায়গায় , সরকারের লোকজন খুব লুটপাট শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধুকে মনে হচ্ছে যেন নিরুপায় । বলে ই দিয়েছেন, সব পা চাটার দল। তাও না হয় মানা যায় । কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ঘর নিয়ে কথা উঠছে, ভাগ্নে , ছেলে ভাই এরা চরম ভাবে প্রশাসন এ নাক গলাচ্ছে । এরকম চলতে থাকলে সময় যে খুব ভাল আসছে না বুঝতে কষ্ট হয় না । হাত তুলে সবাইকে থামাল রাজু। কিছু বলার আছে আজ তার। কারো দিকে সরাসরি না তাকিয়ে শুরু করল , দেখ আমরা সরাসরি যুদ্ধ করেছি। আমদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় নাই, এটাও যেমন ঠিক আবার আমরা কি করতে পারি তাও ঠিক করা আমাদের পক্ষে একটু কঠিন । “ কঠিন কেন?” বাদল রীতিমত চিৎকার দিয়ে উঠলো । হাত তুলে ওকে মনির থামিয়ে দিল। রাজু আবার শুরু করল ,আমদের কোন প্লাটফর্ম এ যেতে হবে । বঙ্গবন্ধু ত আমাদের ডাকল না । আমাদের নিয়ে দেশ গড়ার কাজ শুরু করা উচিৎ ছিল । উনি আওয়ামীলীগকে নিয়েই হাটা শুরু করেছেন । আমরা ত আওয়ামীলীগ করি নাই কোনদিন ,আমরা কোথায় যাব?। রাজু একটু থেমে সবার মুখের দিকে তাকাল । মনির এর চোখে খুব উৎসাহ দেখা গেল । বাদল মুখ কাল করে বলল , আমাদের রাজনীতির দরকার কি?, আমাদের দরকার টাকা । রাজু শান্ত ভাবে বলল , টাকা কেউ এমনিতে দিবে নাকি তোকে? । বাদল উত্তর না দিয়ে দাঁত খোঁচানো শুরু করলো । এটা অর বদভ্যাস । রাজু আবার শুরু করলো, দেখ আমরা খুব কঠিন একটা সময় পার করছি , কিন্তু আমদেরও আগে ঠিক করতে হবে আমরা আসলে কি চাই । বাদল এবার রীতিমত চিৎকার করে উঠলো , “যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম কি ভিক্ষা চাইবার জন্য?”। রাজু ওর দিকে এবার কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল, যেন ভস্ম করে দেবে। বাদল এবার মিয়িয়ে গেল। রাজু অন্য সবার দিকে তাকাল। মনির,হাসান,মাহবুব সবাই চুপ। মনির মুখ খুলল,কি করতে চাস তুই?। এবার রাজু নড়ে চড়ে বসলো । “তেমন বড় কিছু না ,কিন্তু শুরু ত করতে হবে। সিরাজ ভাই বলছেন একটা নতুন দল করতে যাচ্ছেন , সমাজতান্ত্রিক দল”। “কি দল?” বেশ জোরের সাথে জিজ্ঞেস করলো মানিক। রাজু বিস্তারিত সব বলল যা যা সিরাজ ভাই বলেছেন। সব শুনে মানিক বলল “ তা ত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ,আমরা কি করব?”। রাজু বোঝাল, এলাকা ভিত্তিক সংগঠন ও থাকবে ,শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক কোন রাজনৈতিক দল হয় না। মানিক সাথে সাথে ই রাজি । মনির ত রাজি ই । বাদল নীরস বদনে বলল, “ আমাকে টু-পাইস না দিলে আমি নেই বাবা”। সবাই এর ওর মুখের দিকে তাকাল । বাদল এর দরকার কাজ । টাকা ওর আসলেই দরকার । বাবা পঙ্গু , সংসার ওর দিকে তাকিয়ে আছে। রাজু বলল , “ তোর জন্য আমি রোজগারের চেষ্টাও করবো”। এবার আবার চিৎকার দিয়ে উঠলো বাদল “ তুই কেন?।তুই কে?। তোর কথায় কি আমি যুদ্ধ করেছি, বেটা তুই আমার রোজগারের ব্যবস্থা করার কে?” মনির থামাল বাদল কে। রাজু অন্য সবার দিকে তাকিয়ে বলল “ আমি উঠলাম ,তোরা যদি রাজি থাকিস আমি তোদের নিয়ে সিরাজ ভাই এর সাথে বসবো”। সবাই মৌন সম্মতি দিল। রাজু এবার কাশেম এর দোকান থেকে বের হোল। মাথাটা মনে হচ্ছে অনেকটা ঠাণ্ডা । হটাৎ ্যে কি হোল এমনভাবে রাজনীতির কথা বলতে গেলো কেন সবাইকে?। কিছু একটা করা উচিৎ এটা ঠিক , তবে তা ্যে রাজনীতিই হবে তা ত রাজুর মাথায় ছিল না । কিভাবে রাজনীতির কথা বলল সবাইকে?। কি জানি।।কে জানে?। সিরাজ ভাই এর কথাই হয়ত ঠিক, ্যা কিছু ভালো করতে চাও রাজনীতি ছাড়া পারবে না ।

এরপর ঘটনা একটু দ্রুত এগুলো , মেজর জ্বলিল, আ স ম রব এদের কিছু মিটিং এ হাজির হোল রাজু । ঠিক ই আছে মনে হোল। সমাজতন্ত্রের কথাই বলছে সবাই । সমাজতন্ত্রে ধোঁকা দেয়া যায় না। মানুষ বুঝে ফেলে। এ ব্যাপারে রাজুর একটা দৃঢ় বিশ্বাস আছে। যতটুকু সমাজতন্ত্র রাজুর পড়া আছে তাতে তাই মনে হয় তার কাছে। মালিবাগে জাসদ এর আঞ্চলিক অফিস খোলা হোল। যদিও রাজু সাদেক ভায়ের সাথে আগেই কথা বলেছিল। সাদেক মুক্তিযুদ্ধে কমান্ডার ছিল । যুদ্ধের আগে থেকেই আওয়ামীলীগ এর মালিবাগ শাখার সাধারণ সম্পাদক । সব শুনে বলেছিলেন, নতুন দল কেন?,কাজ করতে চাও আমাদের সাথে আসো না কেন?। রাজু বিনয়ের সাথে বুঝিয়েছে,সবাই ত আর একপথে হাঁটবে না সাদেক ভাই । বহু পথ বহু মত এর নাম ই গণতন্ত্র। সাদেক ভাই কিছুই বলেন নাই । বুঝা যায় নাই কি আছে তার মনে । সিরাজ ভাই এর কথা , ওসব বাদ দাও , সবাইকে খুশী করে কিছুই করা যায় না , দরকারও নেই। ছোট একটা অফিস নেয়া হল দলের জন্য । সবাই বেশ উৎসাহের সাথেই কাজ শুরু করলো । শুধু বাদল প্রথম একদিন এসে আর আসল না । রাজু বুঝতে পারছিল না বাদল কে কিসে লাগানো যায় । সিরাজ ভাই বললেন , চিন্তা করোনা , বাদলদের মত রাগী ছেলেদের জন্যও কাজ আছে,সময় হলে বলব।আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়নি । এর মাঝে এলাকাতে কিছু সমস্যা দেখা দিল । দুটি বাসায় ডাকাতি হোল । অস্থিরতা যেন পেয়ে বসেছে পুরো দেশটাকে । বিভিন্ন জেলায় পাটের গুদামে আগুন লাগছে । মেজর জলিল এর মতে এগুলো ভারতীয় দের কাজ । বাংলাদেশের পাটের বাজার ধ্বংস করে দিতে চায় ওরা । বিশ্বাস অবিশ্বাস এর মাঝে রাজু গেল না । চে গুয়ে-ভারার ভক্ত রাজু ,তাই সমাজতন্ত্রের কথায় জাসদে যোগ দিয়েছে । স্বপ্ন যদি চে র মত করে বাংলায় বিপ্লব করা যায় । চে ত আর্জেন্টিনা থেকে এসে কিউবা মুক্ত করেছিল । বঙ্গবন্ধু আমাদের নেতা কিন্তু বিপ্লবী না । আমাদের এখন একজন বাঙালি চে চাই। ডাকাতির ব্যাপারটা নিয়ে রাজুরা মিটিং করলো কি করা যায় ?। সিদ্ধান্ত হোল রাতে নিজেরা পালা করে পাহারা দেবে এলাকাতে । মালিবাগে আর ডাকাতি হোল না । কিন্তু শান্তিবাগে ডাকাত পড়লো ,টের পেয়ে রাজুরা ধাওয়া করলো। ডাকাতদের দল থেকে স্টেনগান দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করলো । মাহবুব এর পায়ে লাগলো, লুটিয়ে পড়লো রাজুর হাতের উপরে। একেবারে থ মেরে গেল রাজু । এ কি হচ্ছে ?। যুদ্ধে যে গুলি খেল না স্বাধীন দেশে ডাকাতের গুলি খেল। মাহবুব এর বা পা টা কেটে বাদই দিতে হোল । কিন্তু ভয়ানক খবরটা রাজুকে দিল মনির । ব্রাশ ফায়ার করেছিল বাদল। ডাকাতিগুলো বাদল এর নেতৃত্বেই হয়েছে। বাদল কেয়ার করছে না কেউ জানল কি জানল না। বেপরোয়া । এর মাঝে নির্বাচন ও হয়ে গেল । আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখল । সিরাজ ভাই বললেন , দেখ এভাবে হবে না । বিপ্লব এর জন্য লাগে বন্দুক । বন্দুক এর নল ই ক্ষমতার উৎস । ক্ষমতা আমাদের কেড়ে নিতে হবে । বাদল কে খবর দাও । ওর কাজ এখন তৈরি। রাজু বলে নাই আগে সিরাজ ভাইকে বাদল এর ডাকাত হবার কাহিনী । এখনও বলল না । কিন্তু রাজু ছাড়া সবাই মনির,আলমরা গণবাহিনীতে যোগ দিল । রাজু প্রচণ্ড সিদ্ধান্তহীনতায় পরল । পড়াশুনাটা শেষ করা দরকার । অথচ ডিপার্টমেন্ট এর অনেক ছাত্র সব সার্টিফিকেট পুড়িয়ে ফেলল । সমাজতন্ত্রে নাকি এসবের কোন মূল্য নেই । এভাবেই ৭৩ সালটা পার হয়ে গেল । বাসার খবর এখন রাজু তেমন রাখে না । বাসায় দমটা কেন যেন বন্ধ হয়ে আসে। এর মাঝে সাজু এবং বাবা দুজনেরই প্রমোশন হয়ে গেছে । সার্টিফিকেট ছাড়াই কিভাবে প্রমোশন হোল তা আর জিজ্ঞেস করার রুচি রাজুর হোল না । কিন্তু রাজুর কদর যেন একটু বেড়ে গেছে বাসায় । রাজু ত কাউকে সার্টিফিকেট জোগাড় করে দেয় নাই, তারপরেও খাতির বেড়েছে । বাড়ুক, ক্ষতি কি?। কিন্তু রাজুর গালে চড় মারল আবার সেই বাদল। বাদল ধরা পড়ল দলের ছেলেদের হাতে । বাসায় গিয়েছিল ,কাউকে কেয়ার করে না এমন ভাব । যখন রাজুর সামনে এনে দাড় করিয়ে দিল ওকে রাজু শুধু জিজ্ঞেস করল,ডাকাত হবার জন্য যুদ্ধ করেছিলি হারামজাদা?। বাদল হা হা করে হেসে দিয়ে বলেছিল, “আমার টাকা দরকার । আমি টাকা যোগার করেছি । তোর সার্টিফিকেট দরকার তোদের তা যোগার করে দিয়েছি। যার যা দরকার তা পাবার অধিকার আমাদের আছে । আমরা যোদ্ধা তেলাপোকা না”। রাজু কিছু না বুঝেই জিজ্ঞেস করেছিল , “কার সার্টিফিকেট?।কিসের সার্টিফিকেট?”। বাদল শুধু বলেছিল “ খালাম্মাকে জিজ্ঞেস কর গিয়ে”। এবার রাজুর মাথাটা সত্যি সত্যি শূন্য হয়ে গিয়েছিল। বাদল কে পুলিশ এর হাতে দিয়ে ,মা কে গিয়ে ধরেছিল। অনেক গাঁই গুই করার পর মা যা বলেছিল তার সারমর্ম হচ্ছে বাদলকে মা অনুরোধ করেছিল দুটি সার্টিফিকেট এর জন্য । বাদল জোগাড় করে দিয়েছিল। মনিরকে পাঠিয়ে বাদল এর জামিন করিয়েছে , বাদল দেখা করতে আসার সাথে সাথে গালে প্রচণ্ড জোরে চড় কষালো । কোন কথাই বলল না বাদল । রাজুকে ধরে হাউ মাউ করে কাদা শুরু অরে দিল। রাজু শুধু জিজ্ঞেস করলো , “মাহবুব এর পা?”। বাদল জবাব দিল, “আমার দুটো পা কেটে ফেল” । “নাহ তোর পা না, তোকে সারাজীবনের জন্য মাহবুবের দায়িত্ব নিতে হবে।পারবি?”।

বাদলকে সিরাজ ভাই এর কাছে হাওলা করে দিল রাজু । গণবাহিনীর দুর্ধর্ষ ক্যাডার এ পরিণত হোল বাদল। অনার্স পরীক্ষা টা হয়ে গেল । এবার ঠাণ্ডা মাথায় রাজু ভাবল কি করবে?। রাজনীতি ত রাজুর রক্তে নেই । এর মাঝেই সন্দেহ ঢুকে গেছে মনে। সমাজতন্ত্রের নামে যা শুরু হয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। যত্র তত্র খুন খারাবী র নাম কি কি সমাজতন্ত্র?। অনেক ক্যাডার ও প্রশ্ন তুলছে । মাস্টার্স এর ফর্ম পূরণ এর জন্য আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার জন্য রওনা দিয়েছে রাজু । মুড়ির টিনে উঠে সিটে বসার আগে লক্ষ করলো একটা মেয়ে মহিলা সিটের পাশে দাড়িয়ে আছে । অথচ মহিলা সিটে একজন পুরুষ দিব্বি বসে আছে । রাজু এগিয়ে গিয়ে কন্ডাক্টর কে মৃদু ধমক দিল, কন্ডাক্টর সীট টা খালি করে মেয়েটি কে বসিয়ে দিল। মেয়েটি ঘাড় ঘুরিয়ে রাজুর দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। ইউনিভার্সিটি তে ডিপার্টমেন্ট এর সামনে আবার মেয়েটির সামনে পড়ে গেল রাজু। একটু থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলো “আপনি ভার্সিটিতে পড়েন?”। মুচকি হেসে মেয়েটি উত্তর দিল “তাই ত জানি,এবং আপনার এলাকাতে থাকি”। নিজেকে সামলে নিয়ে রাজু জবাব দিল “ অথচ আপনাকে চিনিই না,অদ্ভুত না?”। “না মোটেও অদ্ভুত না ,আপনি আমাকে চিনেন”। রাজু অবাক হয়ে বলল “ মানে ।।আপনি কোন পাড়ায় থাকেন?”। “উত্তর পাড়ায়”। এবার রাজু চিনে ফেলল, শাহানা। উত্তর পাড়ার মেয়ে । শাহানার সাথে অনেক কথাই হোল। বাংলায় ফার্স্ট ইয়ার এ পরছে। মাত্র ভর্তি হয়েছে। শাহানা নীচের ক্লাস এ এক ই স্কুল এ পড়ত । রাজু ওকে দেখেছে অনেক। হটাৎ চিনতে পারেনি। বড় হয়ে গেছে অনেক মেয়েটা। ভার্সিটিতে বেশ কিছু অঘটন ঘটলো ,জাসদ এর সভায় বাধা দিল ছাত্রলীগ। এখন সবার হাতে অস্র। এর মাঝেই ভয়াবহ ঘটনা টা ঘটলো,সিরাজ ভাই জহিরুল হক হলে থাকেন। রাজু সিরাজ ভাই এর সাথে কথা বলছিল রুমে বসে । কিছুটা দলের কাজের বেপারে তর্ক। হটাৎ মঈন এসে সিরাজ ভাইকে ডাক দিল, মঈন দলের ক্যাডার। কিছুক্ষণ পরেই প্রচণ্ড গুলির শব্দ । রাজু কিছু না বুঝেই রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল। সিঁড়ির নীচে চারজন ছেলে পড়ে কাতরাচ্ছে সারা সিড়িঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে । কাউকে দেখতে পেল না কোথাও ,মনে হোল আসমান থেকে কেউ এসে এমন একটা ঘটনা ঘটিয় চলে গেছে। আস্তে আস্তে অনেকে আসতে শুরু করলো। রাজু অনেকের সাহায্যে সবগুলোকে হাসপাতালে পাঠাল। কিন্তু চারজনের কেউই ভার্সিটির ছাত্র না । আজব ব্যাপার, এরা কেনই বা এখানে এসেছিলো কেনই বা এদের কে এমন নৃশংস ভাবে খুব করা হোল বোঝা গেল না। তবে রাজু পরে যা শুনল তাতে বোঝা গেল ভার্সিটির টেন্ডার নিয়ে দুই দলের কোন্দল চলছিলো । এবার রাজুর মনটা সত্যি সত্যি তেতো হতে থাকল । চারিদিকে শুধু দখল এর তাণ্ডব। হল দখল,টেন্ডার দখল । এমনকি এলাকাতে তেলের পারমিট , চিনির পারমিট নিয়ে দখল বাজি । সবাই এখন বঙ্গবন্ধু কে দুষছে , একা একজন মানুষ আর কি ই বা করতে পারে?। বিত্তহীন বাঙ্গালি ধনী হবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। আওয়ামীলীগ বা ছাত্রলীগ এ যোগ দেবার কথা মাথায় কখনো আসেনি কারণ ওখানে অনেক মানুষ । কিন্তু বিকল্প ত বিকল্পের কাজ করছে না । সবাই নিজের ধান্দায় ব্যস্ত । রাজুর এখন অনেক অবসর ,ক্লাস নেই কিন্তু পকেট খরচ এর টাকা এতদিন মা মাসের এক তারিখে দিয়ে দিত। অনার্সের পর থেকে রাজুর অস্বস্তি শুরু হয়েছে টাকা নিতে। মনে হচ্ছে কিছু একটা করা দরকার। এছাড়া বাবার একটা উন্নাসিকতা আছে রাজুর সব কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে । রাজুর দাদার বাড়ি মুর্শিদাবাদ ,বাবারা দু ভাই দেশ ভাগের পর চলে এসেছিলেন ,একজন ওপারেই আছেন। রাজু একবার ই গিয়েছিল দাদার বাড়ী ছোটবেলায় । দাদার বাড়ী তেমন আহামরি কিছু না হলেও সুন্দর এটুকুই মনে আছে । বাবা পাকিস্তান এর ভক্ত ,বাবার কথা হোল পাকিস্তান হয়েছিলো বলে নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে চলে এসেছি ,এখন আবার ভারতের সাথে কেন?। বাবার ধারনা বাংলাদেশ ভারতের চক্রান্তের ফসল। রাজুর সাথে বাবার এসব নিয়ে কখনো কথা হয়নি,তবে বাবার এধরনের মনোভাব এর প্রভাব সাজুর ওপর আছে, রাজু বুঝতে পারে। অসহায় বোধ করে মাঝে মাঝে রাজু, মনটা বিদ্রোহ করে এখন । আর কত ?, বাবার হোটেল কে বিদায় জানাতে চায় । মনে হয় যত নেয়া হবে ততই ঋণ বাড়বে। স্বার্থপরের মত কি মনে হয় ?, কে জানে? । মাথাটাকে একটু রেস্ট দেয়া দরকার।

শাহানার সাথে ভাব আস্তে আস্তে বাড়ল। ওদের পাড়ায় খুব একটা যাওয়া হত না আগে । এবার নিজের অজান্তেই যাওয়া শুরু হোল। বিকেলের দিকে শাহানাদের বাসার আশে পাশে টুকটাক আড্ডা,শাহানাও বারান্দায় আসা যাওয়া করে। মনির ধরে ফেলল । মনির টিপ্পনী কাটল “ কি রে ভাল ছাত্র শেষ পর্যন্ত প্রেম এ পড়লি মনে হয়”। একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বোকার মত হাসল রাজু। শাহানার সাথে সম্পর্কটা রাজুর শেষ পর্যন্ত প্রেমেই গড়াল । এটা রাজুর নিজের ও অবাক লাগছে, প্রেম কোনদিন করবে এমন মনে হয় নাই কখনো। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত রাজুর কাছে। বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই প্রেম করছে , তবে প্রেম করতেই হবে এমন একটা মনোভাব রাজুর ছিল না। হয়ে যখন গেছে রাজু একটু বিপদেই যেন পড়লো। মেয়েদের তোষামোদ করাটা রাজুর ধাত এ নেই, এক্ষেত্রে রাজু পার পেয়ে গেলো। শাহানা তোষামোদের ধার ধারে না বলেই মনে হোল, বরং বেশ রাজনৈতিক সচেতন মেয়ে । রাজুর সাথে রীতিমত তর্কে নেমে যায় শাহানা । রাজুদের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি তেমন কোন আস্থা নেই ওর । সমাজতন্ত্রের নামে খুন-খারাবি একদম পছন্দ না শাহানার। রাজু রীতিমত তর্ক শুরু করে দিল , আরে মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য সমাজতন্ত্র ছাড়া আর কি হতে পারে?। শাহানা ঠিক ই উত্তর দিল, চারু মজুমদারের নকশাল-বাড়ি আন্দোলন ত খুন-খারাবি তে ই শেষ হয়েছে। এগুলো সঠিক পথ না,তা ছাড়া যে দেশের শতকরা আশি-ভাগ মানুষ শিক্ষার আলো পায় না তাদর কে সমাজতন্ত্র বুঝাতে অনেক সময় লাগবে, জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া এসব আন্দোলন মাঝপথে মারা যেতে বাধ্য। রাজু হাল ছাড়ে না , তাই বলে কি আমরা চেষ্টা করবো না?। শাহানার উত্তর সোজাসাপ্টা, তোমরা আলাদা দল করতে গেলে কেন এই মুহূর্তে?, এখন দলাদলির সময় নয় , দেশ গড়ার সময় একটা দেশ স্বাধীন হলেই কি সব শেষ নাকি ?। দেশটাকে গড়বে কারা?। রাজুর উত্তর ত রেডি, আমাদের ত বঙ্গবন্ধু ডাকলেন না । আমদের নিজের পথেই হাটতে হবে , না কি?। শাহানা বেশ দৃড়তার সাথেই বলল , বঙ্গবন্ধু ডাকেন নাই এটা তোমাদের একটা বাহানা। মানে? রাজু অবাক হয়। কখন আমাদের ডাকল?। তোমরা আসলে কি চাও নিজেরাই জানো না। হুম করে শব্দ করলো রাজু । আসলে কি তাই?,নতুন চিন্তা ঢুকল মাথায় । ব্যাপারটা গভীর ভাবে ভাবল রাজু কিছুদিন। নিজের সাথে আর কত যুদ্ধ করা যায়?। রাজু এবার কেমন যেন গুটিয়ে যেতে শুরু করলো। মাথায় একটা চাকরীর চিন্তা ঢুকল ভালভাবে। এখন আর নিজেকে একা ভাবা যায় না,শাহানার ভাবনাটাও মাথায় ঘুরে। সংসারের চিন্তা তেমন একটা করতে হয় না,কিন্তু কেন জানি সংসারের কেউ মনেও হয় না নিজেকে। শাহানার বাবা একজন ব্যবসায়ী এতটুকুই জানত রাজু । এখন আস্তে আস্তে জানল উনি বিভিন্ন পারমিট নিয়ে তেল,চাল এর ব্যবসাও শুরু করেছেন। শাহানার বড় ভাইকে রাজু চিনে, কথা তেমন একটা কখনো হয়নি। একটু গম্ভীর টাইপ এর মানুষ , রাজুর চেয়ে বছর দুয়েক এর বড় হবে। শানা ভাই, উনিও ব্যবসার সাথে জড়িত,বাবার সাথেই ব্যবসা করেন। হটাৎ মনির এসে হাজির বাসায়। রাজু একটু অবাক ই হোল। মুনির বাসায় কখনো তেমন আসে না। মুনির একটু গম্ভীর ভাবে বলল , একটু বাইরে চল ,কথা আছে। রাজু কিছু না ভেবেই বের হয়ে আসল । কোন প্রকার ভূমিকা না করেই মনির বলল , শানা ভাই আমাকে ডেকেছিলেন। রাজু ভ্রু কুচকে তাকাল। মনির যা বলল তার অর্থ, শাহানার বাসায় সবাই রাজু আর শাহানার ব্যাপারটা জেনে গেছে। শাহানার বাবা এটা পছন্দ করছেন না। মনির ও ছাড়েনি, কেন পছন্দ নয় জিজ্ঞেস করেছে,তার জবাব ও দিয়েছে শানা, রাজুরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এটা শাহানার বাবার পছন্দ নয়। আর তাছাড়া মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের এখন কেউ বিশ্বাস করে না,তারা ডাকাতি ,রাহাজানিতে লিপ্ত হয়েছে,যেমন বাদল। মনির এবার নিজের মত দিল, এসব আসলে ভণ্ডামি, শাহানার বাবা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, এখন ধরা কে সরা জ্ঞান করছেন। মনির আর যোগ করল,এসব পাত্তা দেবার দরকার নেই। রাজু শাহানা যা ঠিক করবে তাই ফাইনাল । রাজু কিছুই বলল না। মুক্তিযুদ্ধে যাবার এই পুরস্কার । ঘড়ে বাইরে সবজায়গায় এমন পুরস্কার মিলছে, রাজু এবার সত্যি সত্যি যেন ভেঙ্গে পড়ল। এতটুকু আত্মবিশ্বাস ছিল যে নিজের পায়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা তার আছে। তাকে সে সুযোগটাও ত এসমাজ দিতে চাইছে না। মনিরকে বিদায় দিয়ে রাজু সরাসরি মুসার বাসায় গিয়ে হাজির হোল। রাজুকে দেখে যেন মুসা হাতে চাঁদ পেল । আরে রাজু তুই, দোস্ত হৈ হৈ করে উঠলো । রাজু গোমড়া মুখে মুসার রুমে গিয়ে বসলো। রাজুর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে। মুসা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,কি রে কি হয়েছে?। সে কথার জবাব না দিয়ে রাজু জিজ্ঞেস করলো, ঘরে কিছু আছে?। মুসা কিছু না বুঝে জবাব দিল ,কি থাকবে?। রাজু বেশ জোরের সাথে জিজ্ঞেস করলো , পানি কিছু আছে?। এবার মুসা বুঝল। আরে বস থাকবে না কেন? । বিলিতি হুইস্কি খুলল মুসা। বেশ কিছুক্ষণ রাজু কিছু না বলে শুধু খেলো। যখন মাথাটা একটু হাল্কা হোল বলা শুরু করলো। সব শুনে নেশার ঘোরে মুসা হা হা করে হাসল,হাসি থামিয়ে বলল , আরে দোস্ত মিয়া বিবি রাজি ত কেয়া করেগা কাজী। মুসা রাজুকে শুধু সান্ত্বনাই দিল না , একটানা কয়েকদিন সঙ্গ দিল। রাজু একটা ব্যাপার উপলদ্ধি করলো সব বন্ধুকে সবকিছু বলা যায় না। মুসার সাথে যতটা সহজে সবকিছু খোলামেলা আলাপ করলো কই মনির এর সাথে ত পারল না।

কয়েকদিন শাহানাকে এড়িয়ে চলল রাজু। কিন্তু ঠিকই শাহানা রাজুকে পাকড়াও করলো টী,এস,সি তে । টুকটাক কথার পর শাহানা জিজ্ঞেস করল,কি হয়েছে তোমার বল ত?। কিছু না,কি হবে আবার?। রাজুর এ উত্তর পাত্তা না দিয়ে শাহানা আক্রমণ করলো, ড্রিংক করা শুরু করেছ কেন?। রাজু চমকে উঠলো । শাহানা জানল কিভাবে,মুসা ছাড়া ত কেউ জানে না। এবার রাজু আমতা আমতা শুরু করতেই শাহানা রীতিমত ধমকে উঠলো , কি হয়েছে তাই বল। রাজু এবার লুকোতে পারল না। শানা ভাই এর ব্যাপারটা বলল। শাহানা গম্ভীর হয়ে গেলো, ছল ছল চোখে শুধু বলল , তুমি আমার সাথে কোন আলাপ না করেই নিজের উপর অত্যাচার শুরু করে দিয়েছ? রীতিমত ডুকরে উঠলো। রাজু ব্যস্ত হয়ে উঠলেও কি বলবে ভেবে পেল না।চুপ ই করে থাকল। শাহানা শুধু বলল , আমাদের ভালবাসা কি এতটাই ঠুনকো নাকি যে শানা ভাই এর কথায় ভেঙ্গে যাবে?। এবার রাজু আস্তে করে বলল,আসলে তা না, তোমাকে হয়ত তোমাদের পরিবারের সবার বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে এটা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। শাহানা চাপা স্বরে শুধু বলল, প্রয়োজন হলে পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াব। এবার চট করে রাজুর মনটা একেবারে শান্ত হয়ে গেলো। শাহানার সেকেন্ড ইয়ার এর ক্লাস শুরু হতে হতে রাজুরও মাস্টার্স এর ক্লাস শুরু হয়ে গেলো। রাজু আস্তে আস্তে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে পড়াশুনায় মন দিল। সিভিল সার্ভিস শুরু হবে বলে শোনা যাচ্ছে, শুরু ত হবেই, এখন দেশের অনেক কিছুই দরকার। সিরাজ ভাই কয়েকবার রাজুর খোঁজ করে না পেয়ে ডিপার্টমেন্টে এসে ধরে নিয়ে গেলেন। কি ব্যাপার কোন খবর নেই তোমার?। রাজুকে অনুযোগ এর সুরে জিজ্ঞেস করলেন। রাজু ভণিতা না করে জানিয়ে দিল এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে। সিরাজ ভাই তেমন কিছু বললেন না, শুধু বললেন, দেখ রাজু সিংহের গুহায় ঢোকা যত সহজ বের হওয়া কিন্তু তত সহজ না। রাজু চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাতেই সিরাজ ভাই হেসে দিলেন, আরে ঠাট্টা করলাম,বেস্ট অফ লাক রাজু,বলে রাজুকে ছেড়ে দিলেন। দুর্ভিক্ষ শুরু হোল রীতিমত। মানুষকে এই প্রথম রাজু ভাতের মাড় খেতে দেখল। ডি,আই,টি বিল্ডিং এর সামনে একদিন দেখল একজন মানুষ মড়ে পরে আছে। এর মাঝেই শোনা গেলো মন্ত্রীরা লুটপাট করছে। চিনি চোর , গম চোর । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাড়ী আক্রমণ করতে গিয়ে বাদল মারা গেলো। আরও বারো জনের মত মারা গেলো।বাকশাল এর ঘোষণা দিলেন বঙ্গবন্ধু। রাজু নীরবে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলো। যেন এ দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেছে। মাস্টার্স পরীক্ষা যখন দোড় গোরায় তখন ই সব উলট পালট হয়ে গেলো। বাবা এল,পি,আর এ গিয়েছেন। এখন তেমন কিছু করার নেই,কিন্তু ভোরে জোরে রেডিও ছেড়ে খবর শুনেন । হটাৎ রাজুর ঘড়ের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে বাবা ডাকা শুরু করলেন। ধড়মড় করে উঠে রাজু দরজা খুলতেই বাবার প্রথম কথাই , শেখ সাহেব কে খুন করেছে। চিৎকার মত শুনল বাবার কথাটা । রাজু কিছু বুঝল না। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। বাবা ইশারা করে নিজের ঘরের দিকে গেলেন, খবর ত না কোন এক মেজর ঘোষণা করছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। গুলি খেলে প্রথমে যেমন অনুভূতি ভোতা হয়ে যায় ,রাজুর অনুভূতিও প্রথমে কাজ করলো না। বাবা শুধু বললেন,শেখ সাহেব এর অনেক কিছুই আমার পছন্দ ছিল না। কিন্তু ওনাকে খুন করার মাধ্যমে আমরা পঙ্গু জাতিতে পরিণত হলাম রে রাজু। রাজুর কানে বাবার কথা গেলো না। মনির রা আসলো , ওরা কিছুটা বিচলিত। সবার চোখে একই প্রশ্ন ,কেন? । বেলা দশটার দিকে শহীদ বাগের দিক থেকে কিছু অল্প বয়সী ছেলে মিছিল করে আসতে দেখা গেল,তারা মিষ্টি খাচ্ছে এবং বিতরণ করছে,কারন শেখ মুজিব নিহত!। রাজু এবার মুনিরকে বলল, তোর সব অস্র জমা দিয়েছিলি,বাদশার মত কিছু রাখিস নাই?।মুনির মাথা নিচু করে বলল , রাখি নাই ত। রাজু হিস হিস করে বলল ,যুদ্ধ আরেকটা কিন্তু সামনে আসছে। একটা চেলা কাঠ নিয়ে রাজু আর মুনির মিছিল টাকে তাড়া করলো। ছেলেগুলো সব পালিয়ে গেল,সম্ভবত ওদের চিনতে পেড়েছে। অবস্হা দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকল। জেনারেল সাহেব ক্ষমতা নিলেন। জহিরুল হক হলের চার খুনের মামলায় রাজুকে জড়ানো হোল। সমাজতান্ত্রিক দলের সব নেতাই জেলে । হুলিয়া মাথায় নিয়ে বাড়ী ছাড়তে হোল রাজুকে। প্রথমেই যার কথা মনে পড়লো সে মুসা। মুসার বাসায় যেতেই মুসা রাজুকে নিজের ঘড়ে নিয়ে গিয়ে বলল , আমার এখানে থাক তুই । কেউ জানবে না । রাজু বলল কিন্তু সবাই ত জানে তুই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মুসা পাত্তা দিল না বলল , আমি দেখব , তুই নিশ্চিন্তে থাক । রাজু সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না কি করবে। শাহানাকে মুসা লোক পাঠিয়ে নিয়ে আসলো। মুসা রাজু আর শাহানাকে নিয়ে বসলো, মুসা বলল , রাজু কিছুদিন আমার এখানেই থাকুক,তারপর দেখা যাক অন্য কোথাও শেলটার এর প্রয়োজন পরে কিনা?। তবে আমাদের দূরদর্শী চিন্তাই করতে হবে, তোমার দুজনেই যেহেতু এখানে আছো তাই একসাথেই বলি , আমি একটা স্কলারশিপ এর চেষ্টা করছি জার্মানিতে , মনে হয় হয়ে যাবে । আমি যাবার আগেই রাজু জার্মানিতে যাবে। মানে? রাজু অবাক হয়ে গেলো। দেখ রাজু এখানে আমাদের দিন শেষ আপাতত,যে জাতি তাদের জনক কে হত্যা করতে পারে এবং তারপর আনন্দ উল্লাস করতে পারে সেটা আপাতত জাহান্নাম। আমাদের এ জাহান্নাম থেকে আপাতত বিদায় নেয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু আমি জার্মানি যাব কিভাবে?, কে নিয়ে যাবে?। কেউ নিয়ে যাবে না, তুই নিজে যাবি?। মানে?, মুসা একটু থেমে শাহানার দিকে তাকিয়ে বলল,দেখ আমার বেশ কয়েকজন বন্ধু গিয়েছে, ওখানে গিয়ে পলিটিকাল শেলটার নিয়েছে । এখন দেশের যা অবস্থা তাতে সেটাই সহজ। রাজু অবাক হয়ে মুসার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। কি সব বলছে ছেলেটা,মাথা ঠিক আছে নাকি?। মুসা সিগারেট এ লম্বা টান দিয়ে বলল , বুঝলি রাজু ফিল্ম মেকিং এর ওপর কোর্স করার জন্যই আমি যাবো জার্মানিতে । আর হাঁ ভাল কথা তোমাদের বিয়েটা আমার মনে হয় সেরে ফেলা ই ভাল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। খুব সহজ ভাবে কথা গুলো বলল মুসা। অথচ রাজুর জীবন মরণের প্রশ্ন জড়িত,শুধু রাজুর কেন /,সে সাথে শাহানারও । রাজু আড় চোখে শাহানার দিকে তাকাল।শাহানা মাথা নিচু করে ওড়নার আচল আঙ্গুলে পেঁচানোতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। রাজু একটু বিরতির পর বলল,ঠিক আছে কয়েকটা দিন দেখি না কি হয়?।এত অস্থির হবার কি আছে?।মুসা মুচকি হেসে বলল , দেখ,আমার কোন আপত্তি নেই।কিন্তু অবস্থা আসলেই খারাপ। জেনারেল এর বেশী ক্ষোভ দেখা গেলো সমাজতান্ত্রিকদের উপরেই। অথচ বঙ্গবন্ধুকে সবচেয়ে বেশী বিব্রত করেছে এই সমাজতান্ত্রিকরা ই । আর্মি র ইন্টেলিজেন্স এর লোকরা রাজুর খোঁজে রাজুদের বাসায় রেড দিল। সাজু অনেক কষ্টে সামলাল। এভাবে কতদিন?।মুসা রাজুকে গ্রামে পাঠিয়ে দিল। শাহানাকে জানানো গেলো না। চাপের মুখে ঠিকানা বলে দিলে আম ছালা সব ই যাবে। মুসার বাবার বেশ প্রতিপত্তি আছে উপরের মহলে। ভদ্রলোক ছেলেকে খুব স্নেহ করেন। মুসার অনুরোধ উনি অনেক চেষ্টা তদবির করে রাজুর ওপর থেকে হুলিয়া শিথিল করালেন এই শর্তে যে রাজু দেশ ছেড়ে চলে যাবে ।

এরপর রাজু আবার ফিরলো মুসাদের বাসায়। এবার শাহানাকে বলল,দেখ যেতে যে হবে তাতে এখন আর সন্দেহ নেই , এবার তুমিই বল এখন আমি কি করবো?। শাহানা মাথা নিচু করে বলল,তমার যেটা তে মঙ্গল সেটাই আমি চাই। মুসা রাজুকে চেপে ধরল,বেটা তোর কি মাথায় কিছু আছে না কি?, এমনিতে শাহানাদের বাসায় তোর কোন স্থান নেই,তুই কোন সাহসে মেয়েটাকে এভাবে রেখে চলে যাবি?। ওকে ত জোর করে বিয়ে দিয়ে দিবে। রাজু অসহায়ের মত বলল, তাইলে কি করবো?। দুর ছাগল। তোকে কিছু করতে হবে না,যা করার আমি ই করবো। এরপর ঘটনা খুব দ্রুত ঘটলো। মুসা শাহানার সাথে কি আলাপ করলো কে জানে?।শাহানা ছোট একটা ব্যাগ নিয়ে পরদিন সকালে এসে হাজির হোল। লালবাগ কাজির অফিসে বিয়ে হোল। মুসা বেলিফুলের মালা নিয়ে আসলো,হেসে বলল ,বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন বেলিফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করতে ,নিজের ছেলেদের অবশ্য সোনার মালা দিয়ে ই বিয়ে করিয়েছিলেন।আমরা কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সম্মান টা ঠিকই দিলাম রাজু,কি?,খুশি ত?,বেটা এবার একটু হাসি দে। অনেকদিন আসলে রাজু হাসে না। বিয়ে শেষে মুসাদের বাসায় এসে রাজু আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। মুসার মা, খালাম্মা অনেক কিছু রান্না করে বসে আছেন,মুসার বাবা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসলেন। নিজের বাবা,মা !। রাজুর বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হোল। বাসর ও হোল তবে সন্ধ্যার মধ্যে সবকিছু শেষ করতে হোল। এরপর রাজু নিজের বাসায় যখন গেলো বাসার অনেককিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। মা খুব অসুস্থ, ভাবীর মতে হটাৎ রাজু উধাও হওয়াতে এমন হয়েছে। স্ট্রোক করেছে একটা , বাসা থেকে রাজুর সাথে যোগাযোগ এর কোন চেষ্টা করা হয় নাই,কারণ এতে করে রাজুরই সমস্যা হতে পারে। মা কি রাজুর জন্য এতটা উদ্বিগ্ন ছিল?। রাজুর এই প্রথম মনে হোল সে এই সংসারের একজন। মার দিকে তাকিয়ে বুকের মধ্যেয়ে হু হু করে উঠলো। রাজু কি নিজে খুব কঠিন টাইপ এর মানুষ,তাহলে মার সাথে কেন একবারের জন্যও দেখা করার কথা মনে হোল না ?। কয়েকদিনের মধ্যাই মুসা রাজুর পাসপোর্ট টিকেট দিয়ে গেলো। তখন বাবা/মা র সাথে মুসা কথা বলল । মা যেন তার নতুন শক্তি ফিরে পেলেন । রাজু জার্মানি গেলে তিনি ছেলে হারানোর আতঙ্ক থেকে ত মুক্তি পাবেন। বাবা কেমন যেন গুম মেরে গেলেন। সাজু পরে সব শুনে বলল,খারাপ কি ,অনেকেই যাচ্ছে, ভালই। কিন্তু রাজুর জার্মান যাবার ব্যাপারটা গোপন রাখার অনুরোধ করে গেলো মুসা। সময় হাতে মাত্র আর পনেরো দিন ,এরপরে পাড়ি দিতে হবে । অনেকদিন পর নিজ বাড়িতে ফিরে এলাকাতে আরোও কিছু পরিবর্তন লক্ষ করলো রাজু। এলাকার কিছু চিন্হিত স্বাধীনতা বিরোধী ফিরে এসেছে। মনিদের পাশের বাসায় থাকতেন আমীন সাহেব, যুদ্ধের সময় শান্তিবাহিনীর চেয়ারম্যান হয়েছিলেন,স্বাধীনতার পর বাড়ী ছেড়ে পরিবার নিয়ে পালিয়েছিলেন। ফিরে এসেছেন,দিব্বি ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছেন। মনির বলল ,জেনারেল রা নাকি সবার সাথে মিলে মিশে দেশ গড়ার কথা ভাবছেন। মনির মাথা নিচু করে বলল ,যুদ্ধে শহীদ হওয়াটা অনেক ভাল ছিল। দোষটা কার?,রাজু ধরার চেষ্টা করলো পারল না। কিন্তু কিছু ব্যাপার যখন গায়ের ওপর এসে পড়ে যায় তখন সামলানো মুশকিল। বাবা রিটায়ার্ড করার পর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ই মসজিদে গিয়ে পড়ছেন। এর মাঝেই একদিন জুমার নামাজের সময় কি একটা বিষয় নিয়ে মসজিদে সবার সামনেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বেশ কিছু কটু মন্তব্য করলেন আমিনি সাহেব,বাবার সামনেই। বাবা প্রতিবাদ করায় তাকেও কিছু কটু কথা বলতে ছাড়লেন না। মনির এর কাছে শুনল ব্যাপারটা রাজু। এর মাঝে এমন অনেক কিছুই হয়ে গেছে যে রাজু ব্যাপারটাকে হয়ত তেমন পাত্তাই দিত না কারন এর চেয়েও অনেক ভয়াবহ ঘটনা এর মধ্যে রাজুর জীবনে ঘটে গেছে। আমীন সাহেবের ব্যাপারের মাঝে আরও কিছু আছে। শান্তিবাহিনীর চেয়ারম্যান থাকার সময় এলাকাতে অনেক অপকর্ম এই লোক করেছে যার ভুক্তভুগি রাজুরাও। এলাকাতে মিলিটারিরা ক্যাম্প করেছিল অন্য সব এলাকার মতই।কিন্তু স্থানীয় কিছু বিহারী আর আর্মি অফিসার আমীন সাহেবের বাসায় মিটিং করার পরপরই আর্মি রাজুদের বাসায় হামলা করে ,কোন প্রকার সতর্ক বানী উচ্চারণ না করেই গুলি চালিয়েছিল যে গুলির দাগ এখনো ঘড়ের দেয়ালে আছে। বাসায় সাজু ছিল না,ভাবিদের নিয়ে কোলকাতায়,রাজু যুদ্ধে। ভাগ্য ভাল বাবা মার কিছু হয়নি,হবার ই কথা ছিল। এই লোক যদি এখন মুক্তিযোদ্ধাদের কটাক্ষ করে কথা বলে তাহলে স্বাধীন হবার দরকার টা কি ছিল?। মনির বলল,এদের নাকি ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে?,বঙ্গবন্ধু নাকি এদের ক্ষমা করে দিয়েছেন!। রাজু রাগের সাথে উত্তর দিল ,ক্ষমা এদের করার অধিকার কারো নেই,আমার বাসায় গুলি চালিয়েছে,ক্ষমা আমি যদি না করি অন্য কারো তা করার অধিকার নেই। ব্যাপারটা নিয়ে রাজু হয়ত আর তেমন একটা মাথাই ঘামাত না কিন্তু ঘটনা এবার অন্য দিকে মোড় নিলো। আমীন সাহেব এর বড় ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজতে গিয়ে শাহানার জন্য প্রস্তাব দিয়ে বসলো। আসলে এলাকাতে এখন আমীন সাহেবের একটা ভাল গ্রহণযোগ্যতা চাই। শাহানার বাবা,ভাই ব্যবসায়ি ,যারা যখন সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে তাদেরে সাথে সম্পর্ক করতে তাদের অসুবিধা কি?। প্রস্তাবটা শাহানার বাসায় বিবেচনায় নেয়া হল,যদিও সবার মাঝে যথেষ্ট দ্বিধা দন্ধ আছে। আমীন সাহেব চতুর এবং নির্লজ্জ টাইপ এর মানুষ,শাহানাদের বাসায় ঘন ঘন যাওয়া আসা শুরু করলেন,মিষ্টি নিয়ে। মনিরের কাছে সব শুনে হাসল রাজু, কিছুই বলল না। মনির ও জানে না রাজু শাহানার গোপন বিয়ের খবর। মুসা সবার কাছেই গোপন রাখতে বলেছে। কিন্তু আজ সকালে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়াল রাজু, শাহানাকে দুপুরে টি,এস,সি তে থাকতে বলার জন্য,কথা আছে। গিয়ে দেখে বেটা আমীন সাহেব এর ছেলে রতন শাহানার সাথে কথা বলছে। রাজুকে দেখে তাড়াতাড়ি কেটে পড়লো রতন। রাজু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে শাহানার দিকে তাকাতেই শাহানা বিরক্তির সাথে উত্তর দিল, এরা খুব জ্বালাতন শুরু করেছে। রাজু কিছু না বলে শাহানাকে টি,এস,সি তে দুপুরে থাকার কথা বলে চলে আসলো। দুপুরে টি,এস,সি, তে শাহানার সাথে দেখা হতেই রাজু বিস্তারিত আলাপ করলো শাহানার সাথে, জার্মানি যাবার বছর দুয়েক এর মধ্যে শাহানাকে নিতে পারবে বলে আশা করছে। শানার চোখে মুখে ভয়,শঙ্কা আনন্দ মিলিয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতির ছায়া খেলা করছে ,যা রাজু বুঝতে পারে। রাজু আসার আগে শুধু বলল , আমি রতন কে সাবধান করে দেব। শাহানা কিছু বলল না।

সন্ধ্যায় মনিরকে নিয়ে রাজু রতনদের বাসায় গেল,ভেতরে না, একটা ছেলেকে দিয়ে ডেকে পাঠাল। রতন মনে হোল একটু অবাক হয়েছে আবার একটু ভয়ও পেয়েছে । টুকটাক কথার পর রাজু রতন কে বলল , শাহানার সাথে তার সম্পর্ক আছে,বিয়ের কথা বলল না,বলার প্রয়োজন ই বা কি?। রতন কিছু ই বলল না চলে গেলো। ধাক্কা আসলো অন্য দিক দিয়ে, ঈমান আলি কমান্ডার রাজুর সাথে দেখা করতে আসলো। ঈমান আলি মুক্তিযোদ্ধা , কমান্ডার ছিল। রাজুকে বলল, আরে মিয়া রতন মেয়েটার জন্য পাগল হইছে অরে দিয়া দাও , তুমি কত পাইবা। এবার রাজু আর পারল না ঈমান আলির কলার চেপে ধরে প্রচণ্ড ঘুষি চালাল মুখে দাঁত পড়ে গেলো একটা সাথে সাথে। ঈমান আলি লড়তে আসলো না। ভাবে নাই একটা সামান্য মেয়ে মানুষের জন্য কেউ মারামারি করতে পারে,ক্ষ্যান্ত দিল। মনে হয় বুঝতে পারলো ব্যাপারটা সামান্য না। বাসায় গিয়ে দেখে বাবা রাজুকে খুঁজছে , বাবা রাজুর দিকে তাকিয়ে বললেন, নে তোর জন্য একটা ওভারকোট এনেছি ,জার্মানিতে কিন্তু অনেক ঠাণ্ডা। রাজুর চোখে একটু পানি আসলো। কাউকে বুঝতে না দিয়ে ভেতরে চলে গেলো। সাজু কিছু ডলার গুজে দিল রাজুর পকেটে। রাজু ফ্লাইট এর আগের দিন ভাবি কে নিয়ে শাহানার সাথে বসলো, শাহানার সামনেই ভাবিকে সব বলল। ভাবি রাজুকে সব ধরনের আশ্বাস ই দিলেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এয়ারপোর্টে বাবা আর সাজু গেলো রাজুকে বিদায় জানাবার জন্য। সাজু রাজুর হাত চেপে ধরে শুধু বলল, ভাল থাকিস রাজু। বাবার চোখে পানি, রাজুকে বুকে চেপে ধরে বললেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তোরাই একদিন গড়বি রাজু। এই প্রথম বাবা শেখ সাহেব এর বদলে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করলেন। ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজ এর প্লেন টা যখন রানওয়ে থেকে উঠলো বাংলায় ঘোষণা হোল আমরা এখন বাংলাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করলাম। রাজু জানালার বাইরে ভাসমান মেঘের দিকে তাকাল। জমাট মেঘমালার দিকে তাকিয়ে রাজুর শুধু মনে হোল,দেশ স্বাধীন হোল আর আমি দেশ ত্যাগ করলাম!।যাবজ্জীবন ও হয় নাকি অনেক সময় একযুগ আমার এই নির্বাসন কতদিন? সারাজীবন??

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “একাত্তরের পরে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 − 10 =