জীবন জয়ের বাধা ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশ রাষ্ট্র মহাসমারোহে পালন করছে বিজয়ের ৪৪তম বর্ষপূর্তি। স্বাভাবিকভাবেই এ উপলক্ষ্যে অতীত মূল্যায়নের প্রশ্নটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর পার হলো, দেশ কতটুকু এগুলো! কোথায় আমাদের শক্তি, আর কোথায় দুর্বলতা, আমরা কি সঠিক পথে এগুচ্ছি, স্বাধীনতার সময় যেমন রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় ছিল, তা হতে কত বাকি, এসব প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই আলোচিত হচ্ছে। নানা খাতে চলছে চুলচেরা হিসাব নিকাশ।

এরই অংশ হিসেবে আমরাও অনুসন্ধান চালিয়েছি। কথা বলেছি স্বল্প আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে পেশাজীবী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ি, উদ্যোক্তা, শ্রমিকসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শোনা গেছে, মানুষ এমন সব সমস্যার কথা বলছে, যা আদতে নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ এ ধরণের সমস্যার মধ্যে আছে। কিন্তু রাষ্ট্র এসব ক্ষেত্রে আজ অবধি কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দাঁড় করাতে পারেনি। এর ফলে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষদেরই।

১.
আব্দুর রহমান একজন গার্মেন্ট শ্রমিক। বয়স তার ৩২। বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন ম্যাডোনা ফ্যাশন গার্মেন্টে কাটিং বিভাগে কাজ করেন তিনি। আয়-রোজগারের প্রশ্ন উঠতেই বললেন, ‘এই আয়ে কোনোভাবেই চলতেছে না। অতিরিক্ত কোনো আয় নাই, কুলাইতে পারতেছি না। কষ্টে আছি।’
জানা গেল, রহমান মাস শেষে বেতন পান পাঁচ হাজার ৯৫০ টাকা। কারখানায় বাড়তি কাজ থাকলে ওভারটাইম করানো হয়। তা থেকে আরও কিছু যোগ হয়ে এটা সর্বোচ্চ সাত হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। ওভারটাইম কম হলে আয়ও কমে যায়।

মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় পরিবার নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকেন রহমান। একটি কণ্যা সন্তানের জনক তিনি। বললেন, ‘ঢাকা শহরে থাকতে গেলে ভাড়া, খাওয়া, সংসারের খরচ মিলায়ে অনেক খরচ হয়। যা আয় করি, তা থেকে বাসা ভাড়া দিয়ে, বাজার করে আর কিছু থাকে না। দুইজন মিলে আয় করলে চলা যায়, তাও কঠিন। আমাদের কারখানায় তো দেখি, শ্রমিকরা যে দুপুরে লাঞ্চ করে, সেই খাবারটা তো সবাই বাসা থেকেই নিয়া আসে। কিন্তু অধিকাংশ দিনই দেখি তারা ডাল আর সব্জি দিয়া ভাত খায়। কিন্তু এই লোকগুলাই দেখেন, সকাল সাতটায় যে রওনা দেয়, সেই থেকে রাত পর্যন্ত কঠিন পরিশ্রম করে। অথচ সে ভালো খাইতে পারতেছে না।’

রহমান আরও জানান, সব কারখানাতেই নানা ধরণের সমস্যা আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হলো শ্রমিকদের মানুষ মনে করা হয় না। যাচ্ছে তাই গালাগালি করা হয় যে কোনো ভুলের জন্য, জরিমানাও করা হয়। শ্রমিকরা একজোট হয়ে যে কোনো দাবি করবেন, এই সুবিধাও নেই। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নেই। মালিকদের সঙ্গে আলাপ করার একটা কমিটি থাকে, কিন্তু তাতে সব মালিকের লোকই থাকে। ফলে শ্রমিকরা তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের কোনো রাস্তা খুঁজে পান না।

সমস্যাগুলো কি রকম এমন প্রশ্নের জবাবে রহমান বলেন, ‘ধরেন একজন শ্রমিকের সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসছে। কিন্তু তাকে বাহির হইতে দিবে না। হয়তো পাঁচ মিনিটের ব্যাপার। কিন্তু এই সাধারণ অধিকারটাও শ্রমিকের থাকে না। তারপর দেখা গেল যে, একজন হয়তো চাকরি ছেড়ে চলে যেতে চায়, কিন্তু মালিকপক্ষ তার যেইসব ভাতা পাওনা থাকে, তা নানা কৌশলে বাতিল কইরা দেয়। কিন্তু সেই শ্রমিক কি করব, আইন আদালত কইরা সে মালিকদের সঙ্গে পারব না, তার এত টাকাও নাই, এইটা সে জানে। শেষে কিছুই হয় না, তার পরিশ্রমের টাকাটা মাইর যায়। মাঝে মাঝে কেউ যদি মালিকপক্ষের এইসব কাজের বিরোধিতা করে, তাইলে তারে শায়েস্তা করে বাইর করা হয়। এগুলো দেখার কেউ নাই।’

শুধু রহমান না, একই ভাষ্য অধিকাংশ গার্মেন্ট শ্রমিকের। কর্মক্ষেত্রে তারা মানবিক ও নাগরিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত, তাদের আয় অপর্যাপ্ত। অথচ তাদের শ্রমের ফলেই দেশি বিদেশি মালিকরা করছে বিপুল মুনাফা। শ্রমিকরা কতটা বঞ্চিত হচ্ছেন তা আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশে একটা জিন্স শার্টের উৎপাদন ব্যয়ের তুলনা থেকে স্পষ্ট হতে পারি।

ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান রাইটসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পোশাকের রং ও ধোলাই খরচ যুক্তরাষ্ট্রে ০.৭৫ ডলার, এখানে ০.২০ ডলার। উপকরণ ব্যয় সেখানে ৫ ডলার, এখানে ৩.৩০ ডলার। শ্রমিকের মজুরি যুক্তরাষ্ট্রে ৭.৪৭ ডলার, বাংলাদেশে ০.২২ ডলার। মোট ব্যয় সে দেশে ১৩.২২ ডলার, এ দেশে ৩.৭২ ডলার। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো : ৪ মে, ২০১৩)

হিসাবটা একটু পুরনো হলেও এখনও অকার্যকরী নয়।তখন ন্যুনতম মজুরি ছিল তিন হাজার টাকা, এখন তা পাঁচ হাজার ৩০০টাকা। শ্রমিকদের সে সময়কার আয়ের তুলনায় এখনকার আয় দ্বিগুণ, অর্থাৎ ০.৪৪ ডলারের কাছাকাছি হবে। এই হিসাবটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একটি জিন্স শার্টে মার্কিন একজন শ্রমিক যেখানে ৭.৪৭ ডলার আয় করেন, বাংলাদেশি একজন পোশাক শ্রমিক সেখানে সর্বোচ্চ ০.৪৪ ডলার আয় করেন। ধোলাই খরচও যে এখানে কম, তার কারণও স্বল্প দামের শ্রম। শ্রমিকের এই বঞ্চনাই দেশি বিদেশি পুঁজিপতিদের পকেটে ঢুকছে মুনাফা হয়ে। শ্রমিকরা তাদের কাছে কোনো দয়া ভিক্ষা করেন না। তারা নিজ কাজের যথাযোগ্য মজুরি চান, মানুষের মতো বাঁচতে চান।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখনও শিল্প খাতসহ অন্য খতের শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। কোনো ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র মালিক ও শ্রমিকের প্রতি সমান আচরণ করে না। শ্রমিকরা বেতন না পেলে রাষ্ট্র মালিককে চুক্তিভঙ্গের জন্য অভিযুক্ত করে না। কিন্তু শ্রমিক বেতনের দাবিতে মিছিল বের করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। শ্রম আইনেও শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণ হয় না। বাধ্যতামূলক ওভারটাইম, কর্মক্ষেত্রে মারধর, গালি, উপর্যুপরি জরিমানার মতো বিষয়গুলোতে আইন তাদের কোনো সুরক্ষা দিতে পারে না। এ পরিস্থিতি অনেক দিন ধরেই চলে আসছে।

২.
দুলাল মোল্লার বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়। টিএসসির সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গেটে একটি চায়ের দোকান চালান তিনি। পরিবার নিয়ে বাস করেন পুরান ঢাকায়। জীবনের বড় একটা অংশই পার করে ফেলেছেন দুলাল। কিন্তু এখনও ভবিষ্যতের জন্য কিছু করে উঠতে পারেননি। সামনের দিকে তাকালে অন্ধকার দেখেন। বর্তমান পেশার বয়স প্রায় আট বছর হতে চলল। অথচ দাঁড়াতে পারছেন না। বললেন, ‘আমগো সাহাইয্য করার কেউ নাই, সরকার তো আরও ঝামেলা বাড়ায়।’

দুলাল জানালেন, ২০০৮ সাল থেকে তিনি সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে চায়ের দোকান করছেন। তখন দৈনিক আয় প্রায় ৫০০ টাকার মতো হলেও এখন তা ৩০০ টাকায় নেমে এসেছে। কারণ সম্প্রতি এ এলাকার চায়ের দোকানগুলো উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে লোক সমাগম ও ব্যবসা, দুটোই কমে গেছে।
দুলাল বলেন, ‘আগে এই উদ্যানে কয়েকশ’ দোকান ছেল। মেলা মাইনষে কইরা কুলাইয়া খাইতে পারত। এহন হেরা রাস্তায় ঘোরতাছে। এই রকম অনেক মাইনষেরে আমি চিনি, যারা আগে এইখানে দোকান কইরা ভালোই আয় করত। এহন তারা না খাইয়া দিন কাটাইতাছে।’ নিজে যা আয় করছেন, তাও অপর্যাপ্ত জানিয়ে দুলাল বলেন, ‘পোলাপান আছে, তাগো খরচা আছে। খালি তো আর খাওয়া, বাসা ভাড়া না। পোলাপানের পড়ালেখা, ওষুধ, মেয়ের জামাই বাড়ির খরচা এইগুলা করার পর আর পারি না। দোকান চালাইতেও নানান খরচা আছে। কিছু যে জমামু, তার উপায় নাই।’

ওই এলাকার অন্যান্য ব্যবসায়িদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্য কিছুতে সুবিধা করতে না পেরে ফুটপাতের দোকানদারি তারা করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু পুলিশের নির্ধারিত লাইনম্যান থেকে শুরু করে সব পক্ষকে টাকা দেয়া হলেও ব্যবসা যে করতে পারবেন, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। একজন ব্যবসায়ি বলেন, উদ্যানে লোকজন আড্ডা দিতে আসে। আড্ডার এলাকায় চা দোকান খুবই দরকারি। সরকার চাইলে এখানে যারা দোকান করছে, তাদের তালিকা করে একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করে দিতে পারত। চাইলে ছোট ছোট অস্থায়ী পজিশনও তৈরি করে দিতে পারত। তা না করে তারা উল্টো এসে বন্ধ করে দিয়ে যায়।

এ ধরনের ব্যবসায়িদের নিজস্ব কোনো কার্যকরি সংগঠনও নেই যে, তার মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে তারা একটা সমঝোতায় আসবেন। দোকান চালাতে হলে দৈনিক ভাড়া তো দিতেই হয়, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দলের মিছিল করাটাও বাধ্যতামূলক। এত কিছু করার পরও কোনো নিশ্চয়তা নেই যে, আগামীকাল ব্যবসা করা যাবে। এমনও য় যে, একদল এসে টাকা নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে আরেক দল এসে উচ্ছেদ চালায়।

দুলাল বলেন, ‘সরকার তো আমগো কিচু দেয় না। আমরা নিজেরা যা পারি করতাছি। সরকারের তো উচিত আমগো মতো গরিবগো সাহাইয্য করা। কিন্তু আমরা কোনো সাহাইয্য তো পাই না, উল্টা মাইরও খাওয়া লাগে। এই রকম হকার তো কম না। আর এরা তো দুই একদিন ধইরা ব্যবসা করে, তাও না। এই মাহবাগে এমন লোকও আছে, যে তিনা ৩০ বছর ধইরা হকারি করতেছে বা দোকান করতেছে। তাইলে সরকারের কি উচিত না, এইসব লোকের জন্য সুবিধা হয়, এই রকম একটা ব্যবস্থা করা?’

দুলাল মোল্লার প্রশ্নটা খুবই যৌক্তিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০ অনুযায়ী, ঢাকাসহ সারাদেশে হকারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। নিঃসন্দেহে পাঁচ বছরে এ সংখ্যা আরও বেড়েছে। তালিকার বাইরেও রয়েছেন অনেকে। এসব মানুষের এই যে স্বনিয়োজিত ব্যবস্থাপনা, এটাকে উন্নত করার বা একটা ব্যবস্থার মধ্যে আনার কোনো ব্যবস্থা এতদিনেও রাষ্ট্র করতে পারেনি। বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সরকারে ক্ষমতাসীনরা এদের ওপর চাঁদাবাজি ও নিপীড়ন চালায়। এর কোনো প্রতিকারও রাষ্ট্র করছে না।

৩.
প্রকৌশলী আহমেদ রোদসী আলমগীর একজন তরুণ উদ্যোক্তা। বয়স ৩২। ২০১১ সালে বুয়েট থেকে নেভাল আর্কিটেকচার অ্যন্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন। এখন চার বন্ধু মিলে ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছেন। স্টেশনারি নানা পণ্য ও যন্ত্রপাতি আমদানি, রপ্তানি ও সরবরাহের কাজ করেন তারা। পাশাপাশি গৃহসজ্জা সেবাও দেয় তাদের প্রতিষ্ঠান রেড ব্রিকস।

প্রকৌশলী হয়ে ভালো চাকুরি না খুঁজে ব্যবসায় কেন এমন প্রশ্নের জবাবে আলমগীর বলেন, ‘আমাদের সেক্টরটা এমনিতেই খুব সংকীর্ণ। যত প্রকৌশলী প্রতি বছর পাশ করে বের হয়, সেই তুলনায় তত পদ কালি হয় না। বড় শিপইয়ার্ডের সখ্যা খুবই কম। তারাও অধিকাংশ নকশার কাজ বাইরের দেশ থেকে করিয়ে আনে। নিজেরা প্রকৌশলী কম নিয়োগ দেয়। এছাড়া দেশীয় যেসব ক্ষুদ্র কারখানা ধরনের শিপইয়ার্ড আছে সেগুলো একপ্রকার অবৈধ। রাজমিস্ত্রিরা যেমন বাড়ি বানায়, তারাও তেমনি অভিজ্ঞতা থেকে ছোট ছোট জাহাজ বানায়। এতে প্রকৌশলীর দরকার পড়ে না। ফলে এই খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। অধিকাংশই পাশ করে বাইরের দেশে চলে যায়। আমরা দেশে থেকে কিছু করতে চাই বলেই বিকল্প হিসেবে এই ব্যবসায় আসা।’

অনেক আগ্রহ নিয়ে ব্যবসায় এলেও আলমগীর ও তার বন্ধুরা সুবিধা করে উঠতে পারছেন না। তাদের মতে, যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে কিছু করার সুযোগ কম। কোনো সুস্থ প্রতিযোগিতাও নেই। আছে সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি। রাষ্ট্র যে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু সুযোগ বা পৃষ্ঠপোষকতা দেবে, তাও নেই। উল্টো পুরনো সব অব্যবস্থাপনা জারি আছে অদ্যাবধি।

আলমগীর জানান, ‘কোনো একটা কাজ পেতে আমাদের দরপত্রে অংশ নিতে হয়। কিন্তু সেখানে সব সময় সিন্ডিকেট থাকে। নতুনদের কাজ দিতে চায় না। আমরা কম দর দিরেও আমাদের কাজ দেয় না। কোনো না কোনে বুল দরে দরপত্র বাতিল করে দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সর্বনিম্ন কত দর দিলে কাজ পাওয়া যাবে তা বলে দেয় দরপত্র আহবানকারীরা। এ কারণে কাজ চলে যায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে।’

তিনি বলেন, ‘আরও অনেক সমস্যা আছে। যেমন কোনো কাজ করতে গেলে অতিরিক্ত অভিজ্ঞতা চায়। নতুনরা কাজটা করার সামর্থ্য থাকলেও সুযোগ পায় না। এক্ষেত্রেও ফাঁকি আছে। অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজটা নিতে হয়। এতে পরিশ্রম না কমলেও লাবের ভাগটা ঠিকই কমে। এত কিছু করে যে কাজ পাওয়া যায়, তা করতে গেলে এরপর আবার আসবে স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের চাঁদা দেয়ার ব্যাপার। এগুলো করে পারা যায় না। প্রতিষ্ঠান বড় হলে সমস্যা কম হয়। কিন্তু আমাদের মতো তরুণ উদ্যোক্তারা অধিকাংশই এসব মোকাবেলা করতে না পেরে এক পর্যায়ে ঝরে পড়ে।’

তার মতে, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তরুণ উদ্যোক্তারা অনেক ভালো করতে পারতো। সাধারণত দেখা যায়, কাজ করতে গেলে বড় অঙ্কের টাকা আটকে থাকে। সিকিউরিটি মানি হিসেবেও দরপত্রের সঙ্গে অনেক টাকা জমা দিতে হয়। এক কোটি টাকার কাজ হলে আড়াই লাখ। কাজ না পেলেও এ টাকা পেতে মাসখানেক বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। আবার স্বল্প সুদের ঋণ বা জরুরী ভিত্তিতে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা কম। এখানেও দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি ব্যাপক। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তা দেশের জন্যই মঙ্গলকর হতো।’

আলমগীর বলেন, ‘দরপত্রে সিন্ডিকেটই বড় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। বাস্তবে কিছুটা রূপ বদলালেও আগের অবস্থাই জারি আছে। এই সিন্ডিকেট ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করার পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করাটাও খুব জরুরী। আমদানি, রপ্তানির সঙ্গে জড়িত তরুণ উদ্যোক্তাদের অনেকেরই সর্বনাশ ঘটেছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে।’
রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংক খাতে অব্যবস্থাপনা, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সমন্বয়হীনতা, এ সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে জারি আছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এখনও কোনো সমাধানের দিকে এগুতে পারেনি। যে কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তরুণদের।

৪.
আশিকুজ্জামান একজন তরুণ আইনজীবী। আগ্রহ নিয়ে আইন পেশায় এলেও এখানে এসে তিনি দেখতে পাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে প্র্যাকটিস করা আইনজীবীরা অনেকেই ভালো নেই। এ পেশায় যারা আসছেন, তাদের অনেকেরই আয়ের নিশ্চয়তা নেই। হাসতে হাসতে তিনি জানান, ‘অবস্থার ভয়াবহতা বোঝাতে আমরা বলি যে, মামলার চেয়ে আইনজীবী বেশি!’

আইন এমন একটি বিষয়, যে কোনো বিভাগের শিক্ষার্থীরাই এটা পড়তে পারেন। এ পেশার সঙ্গে অর্থ, ক্ষমতা, নিরাপত্তার বিষয় জড়িত। তাছাড়া ব্যক্তিগত কারণেও অনেকে আসেন। ফলে দেখা যায়, এ পেশায় প্রতি বছরই প্রচুর নতুন মুখ যোগ হচ্ছে। নতুন মুখ যোগ হলেও এরা সবাই কিন্তু তরুণ নন। আইন পড়া ও আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই এবং যেহেতু দেশে দু’ বছর মেয়াদি আইন পড়ার ব্যবস্থা চালু আছে, তাই দেখা যায় এমনকি ৬০ বছরের প্রৌঢ়ও এ পেশায় আসতে পারেন।

আশিকুজ্জামান বলেন, ‘এটা একটা সমস্যা। বিশেষ করে তরুণদের জন্য। দেখা যাচ্ছে, একজন লোক নানা কারণে জেলে ছিলেন এবং সে সুবাদে তিনি আইনের নানা বিষয় বুঝতে পারেন। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি দু’ বছরের একটা কোর্স করে আইনজীবী হয়ে গেলেন। অথবা দেখা গেল কোনো একটা কোম্পানিতে একজন কাজ করতেন। পেশাগত কারণেই তিনি কোম্পানি সংক্রান্ত আইনি বিষয়গুলো বোঝেন। অবসরের পর তিনি একটা কোর্স করে আইনজীবী হয়ে গেলেন। এটা একটা অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে। যে তরুণ পড়াশুনা শেষ করে সদ্য এই পেশায় এসেছেন নবীন হওয়ায় তার সংযোগ ও পরিচিতি কম থাকে বলে তার আয়ের সুযোগ কম। অন্যদিকে ওই বয়ষ্করা তাদের সামাজিক যোগাযোগের কারণে বেশি আয় করতে পারেন।’

আশিকুজ্জামানের মতে, ‘দু বছর মেয়াদি কোর্স বন্ধ করে দেয়া উচিত। কারণ এই স্বল্পমেয়াদি কোর্স একজনকে পরিপূর্ণ আইনজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। এর ফলে তরুণরা শুধু অসম প্রতিযোগিতা নয়, আরও অনেক সমস্যায় পড়েন। সাধারণত এরা পেশার প্রতি দায়বদ্ধ হন না, আদালতের আচরণবিধি মানেন না, মক্কেলদের সঙ্গে সুব্যবহার করেন না, আইন পেশা যে সেবা তা বোঝেন না, দুর্নীতিতে যুক্ত হন। এটা আবার সমস্ত আইনজীবীদের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে। যার ফলটা আবার প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীদের গায়ে লাগে না। দুর্ভোগ পোহাতে হয়, কটু কথা শুনতে হয় তরুণ আইনজীবীদেরই। সুতরাং পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে এমন শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেন সবাই আসেন, এটা নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি এ পেশায় প্রবেশের বয়সও সুনির্দিষ্ট করা উচিত। রাষ্ট্র কিন্তু বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কথা বলে। যদিও আইন পেশার ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না।’

তিনি আরও জানান, ‘তরুণ আইনজীবীদের কাজ শেখার জন্য, পরিচিতির জন্য, সংযোগ বৃদ্ধির জন্য সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। কিন্তু অনেকেই কঠিন পরিশ্রম করলেও কোনো আর্থিক সুবিধা পান না। অন্য সব পেশাতেই কাজ করলে মাস শেষে বেতনের একটা ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু তরুণ আইনজীবীরা অনেকেই মাসের পর মাস, এমনকি বছর কাটিয়ে দিলেও কোনো সন্মানী পান না। এটা একেবারেই তার সিনিয়রের ওপর নির্ভর করবে। পুরোটাই তার মেজাজ মর্জির ব্যাপার। এঅধিকাংশ সিনিয়ররা কোনো টাকা দেন না, দিলেও তা পরিমাণে খুবই কম। ফলে একজন তরুণ আইনজীবীকে টিকে থাকার জন্য বিরাট কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এটাও কিন্তু গটছে আইনজীবী বেমি হওয়ার কারণে। কম আইনজীবী হলে কিন্তু সিনিয়ররা টাকা দিয়েই জুনিয়র ঠিক করতেন। কিন্তু এখন অনেক আইনজীবী, ফলে বিনা মূল্যে শিক্ষানবিস হিসেবে লোক পেতে তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।’

রাষ্ট্র আইনজীবীদের সমস্যা দেখার জন্য বার কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করলেও তা আইনজীবীদের এসব সমস্যা সমাধান এবং পেশাগত উৎকর্ষতা সাধনে তেমন কোনো কার্যকরি ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে না।

৫.
কবির হোসেন কাজ করেন টিকাটুলির একটি ফার্মেসিতে। বয়স তার ৩৯। বেতন মাত্র নয় হাজার টাকা, যদিও বাসা ভাড়া দিতে হয় তাকে সাত হাজার টাকা। সংসারে দুই মেয়ে ও একটি ছোট্ট ছেলে আছে। দুই মেয়েই স্কুলে যায়। একজন চতুর্থ শ্রেণীতে, অন্যজন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। তার স্ত্রী বাসায় সেলাইয়ের কাজ করেন। দু’জন মিলে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। কবির মাঝে মাঝে স্থানীয় ভিত্তিতে দাদন ব্যবসার মতো করে কিছু টাকা ধার দেন সুদের বিনিময়ে। এর দ্বারাই চলতে হয় তাকে।

তবে নিজের অবস্থা নিয়ে খুবই অসন্তুষ্ট তিনি। কারণ ধর্মভীরু ও পাঁচওয়াক্ত নামাজি হলেও তাকে সুদের ব্যবসা করতে হচ্ছে। কবির বলেন, ‘আল্লাহর কসম ভাই, সুদি ব্যবসা করার কোনো ইচ্ছা নাই। কিন্তু কি করমু, পারি না। মাসে কম করেও ১৫ হাজার টাকা খরচ। দুইজনে মিলে আয় করে হয় বেশি হলে ১২ হাজার। বাকি টাকা আসবে কোত্থুকে। ফার্মেসির দোকানে সব সময় টাকা পয়সা থাকে, নিজের হাতেও কিছু রাখতে হয়। যার কাছে কাজ শিখছিলাম, সে এই রাস্তা চিনাইছে। বাজারের অনেক দোকানদারই হুটহাট কম দামে কিছু পেলে আমার কাছে আসে। একবেলার জন্য টাকা ধার চায়। বেশি না অল্প দেই। হাজারে ১০০ টাকা হিসাবে। সকালে নিলে বিকেলে দিয়ে দেয়। এভাবে কিছু আয় করে চলি। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে মাফ চাই। জানি, যা করতেছি এটা খারাপ কাজ। কিন্তু এছাড়া কোনো উপায়ও পাচ্ছি না।’

কবির হোসেনকে আমরা জিজ্ঞেস করি, ওষুধ তো সবারই কিনতে হয়, মানুষ কি রকম ওষুধ কিনতে আসে, মানুষের হাতে টাকা পয়সা কেমন, এটা কি আপনারা দোকানে থেকে বুঝতে পারেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘ওষুধের দোকানে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়া থাকলে আপনি এলাকার মানুষের অবস্থা বুঝে যাবেন। দেখবেন, অনেক মানুষ এসে রোগের কথা বলে ওষুধ চায়। এরা ডাক্তারের কাছে যায় না। অসুস্থ হলে আমাদের কাছে এসে টাকা দেখায়া বলে, এই কয় টাকার ভেতর ওষুধ দেন। এরকম মানুষ অনেক। কিন্তু এরা সাধারণত বেশি অসুস্থ না হলে ওষুধই খায় না। ওষুধ বেশি খায় শিক্ষিত মানুষেরা। তাদের কাছে টাকা পয়সা কেমন এটা বোঝা যায় না। কারণ দোকানে তারা টাকা ছাড়া আসে না। তার পরেও মাঝে মাঝে আমরা ওষুধের স্টক দেখলে বুঝি যে, ওষুধ কম চলছে, মানে মানুষের হাতে টাকা পয়সার অভাব। এটা কিন্তু এক বছরে দুই তিনবার ঘটে।’

প্রতি বছর বাজেটের সময় দাম বাড়ে। জানুয়ারি এলে বাসা ভাড়া বাড়ে। পে স্কেলে পরিবর্তন এলে সেই উপলক্ষ্যেও ব্যয় বাড়ে। দেশে সম্প্রতি সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণ হয়েছে। এটা নির্দেশ করে যে, দ্রুতই জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, ইতিমধ্যে বেড়েছেও। স্বল্প আয়, নিম্ন আয়ের মানুষেরাই কেবল নয়, বিভিন্ন ধরণের পেশাজীবীরা এ অবস্থা সামাল দিতে পারেন না।

মানুষ যদি শ্রম দিয়েও বাঁচার মতো আয় না করতে পারেন, মেধা ও যোগ্যতা দিয়েও কাজ করতে না পারেন, তাহলে এর দায় অবশ্যই রাষ্ট্রের কাঁধে বর্তাবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে তরুণ উদ্যোক্তা, পেশাজীবী ও চাকুরিজীবীদের অধিকারের সুরক্ষার জন্য আজ অবধি কোনো কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। ভুক্তভোগী জনতা এ অবস্থার মধ্য দিয়েই পার করছেন বছরে পর বছর। রাষ্ট্র গড়ার কাজে যারা আছেন, তারা যদি এসব সমস্যাকে আমলে না নেন, তাহলে অবধারিতভাবে এই রাষ্ট্র নতুন চরিত্র ধারণ করার পথে এগুবে, জনতাই রাষ্ট্রকে সেদিকে টেনে নিয়ে যাবে, এটা বলাই যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “জীবন জয়ের বাধা ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা

  1. বিভিন্ন পেশাজীবির তুলে আনা
    বিভিন্ন পেশাজীবির তুলে আনা সমস্যাগুলো থেকে বুঝা যায় বাংলাদেশের শ্রমজীবি ও পেশাজীবিদের বর্তমান অবস্থা। এই অবস্থার জন্য দায়ী রাষ্ট্রিয় অব্যস্থাপনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

90 − 87 =